📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 সম্ভব হবে কি এর কোন চিকিৎসা

📄 সম্ভব হবে কি এর কোন চিকিৎসা


বিশ্বাস করুন! জাহেলী যুগে সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সুস্থ নগর জীবনের ওপরই শুধু বিপর্যয়ের ধ্বস নেমে আসেনি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও নগর জীবন পরিণত হয়েছিল এক বিকৃত গলিত লাশে। মানুষ মানুষকে শিকার করত হিংস্র নেকড়ের মত। তারপর তার হৃদয়হীনতার সামনে যখন সে মানুষটি মৃত্যুর সাথে লড়াই করত, মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করত তখন এই অমানবিক করুণ দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়েও মজা লুটত তার নিষ্ঠুর দৃষ্টি, পাষাণ হৃদয়, ঠিক সেভাবে যেভাবে আমাদের কারো হৃদয় ফুল বাগান ও গাছপালার মনোরম দৃশ্যে ও ছায়া-ঘেরা পরিবেশে আনন্দে উদ্বেল হয়।

এবার দৃষ্টি ফেরান রোমান ইতিহাসের দিকে। দেখবেন তাদের বিজয় গাথা ও বীরত্বের ইতিহাস আলো ঝলমল। মন কেড়ে নেয় তাদের সুচারু ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ রাজ্য পরিচালনা। সভ্যতা-সংস্কৃতিতেও পিছিয়ে নেই তারা। কিন্তু অপর দিকে কেমন করে তাদের অমানবিকতা ও নিষ্ঠুর চিত্র তুলে ধরেছেন একজন ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিক তাও একটু পড়ে দেখুন:

"রোমানদের কাছে সবচেয়ে বেশি মজাদার ও চিত্তাকর্ষক দৃশ্য হতো সেটি, যখন তরবারির যুদ্ধে দুই স্বগোত্রীয় পাহলোয়ানের মধ্যে পরাজিত ব্যক্তি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্তে লাল হয়ে ঢলে পড়ত মৃত্যুর কোলে আর তার মুখ থেকে শেষবারের মত উচ্চারিত হতো মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের ব্যথা করুণ গোঙানি। তখন তাদের আনন্দের আর সীমা-পরিসীমা থাকত না। মনে হতো তারা যেন তলোয়ারের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত এই মানুষটির সামনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে মজাদার দৃশ্য অবলোকন করছে। হাসি-উল্লাসের বিকৃত ধ্বনি তুলে তারা একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত আনন্দের আতিশয্যে। এই মৃত্যু পথযাত্রী অসহায় মানুষটির গোঙানি তাদের কানে যেন মধু ঢালছে অপূর্ব সংগীতের সুর লহরীর মত! এদিকে শান্তি-শৃংখলা রক্ষাকারী পুলিস বাহিনীর কিছুই করার থাকত না। সব কিছু বেসামাল হয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত।”¹

মোটকথা তখন মানুষ ছিল না, ছিল মানুষের খোলস। মানবতার মোকদ্দমা চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ছিল আল্লাহ্র আদালতে। ঠিক তখনই প্রেরিত হলেন মুহাম্মদ (সা.) আর ঘোষণা এল:

"হে নবী! তোমাকে আমি জগতসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।”

টিকাঃ
১. দ্র. Ko. Lecky প্রণীত History of European Morals.

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) আরব দ্বীপে আবির্ভূত হলেন কেন?

📄 মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) আরব দ্বীপে আবির্ভূত হলেন কেন?


আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও হিকমতের ফয়সালা ছিল, মানবতার হেদায়াত ও নাজাত তথা পথ প্রদর্শন ও মুক্তির এই সূর্য যদ্ধরা সমগ্র সৃষ্টিজগতে আলো বিস্তার লাভ করে, জাযীরাতুল আরবের দ্বিগ্বলয় থেকে উদিত হবে যা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার ভূভাগ আর যে ভূভাগের এই প্রখর আলোক-রশ্মির প্রয়োজন ছিল সর্বাধিক।

আল্লাহ তা'আলা এই দাওয়াতের জন্য আরবদেরকে নির্বাচিত করেন এবং তাদেরকে সমগ্র বিশ্বের তাবলীগ তথা প্রচার-প্রসারে যিম্মেদার বানান এজন্য যে, তাদের হৃদয়পট ছিল একেবারেই স্বচ্ছ ও নির্মল। পূর্ব থেকে কোন অঙ্কিত ছবি কিংবা চিত্র এতে ছিল না যা মোছা কঠিন হতো। এর বিপরীতে রোমক, পারসিক অথবা ভারতীয়দের, যাদের নিজেদের উন্নতি-অগ্রগতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও দর্শনের ব্যাপারে বিরাট গর্ব ছিল, আর এর দরুন তাদের ভেতর এমন কিছু মানসিক গ্রন্থি ও চিন্তাগত জটিলতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল যা দূর হওয়া সহজ ছিল না। আরবদের দিল ও দিমাগ তথা মন-মস্তিষ্কের নিষ্কলঙ্ক পট কেবল সেই মামুলী ও হাল্কা রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিল যা তাদের মূর্খতা, অশিক্ষা ও বেদুঈন জীবন তার ভেতর অঙ্কিত করে দিয়েছিল যা ধোয়া ও মুছে ফেলা এবং তদস্থলে নতুন চিত্র অংকন করা খুবই সহজ ছিল। বর্তমান শাস্ত্রীয় পরিভাষায় তারা "অকাট্য ও নির্ভেজাল মূর্খতা"র শিকার ছিল, আর এটাই ছিল সেই ভুল যার প্রতিবিধান হতে পারত। অপরাপর সুসভ্য ও উন্নত জাতিগোষ্ঠী ছিল মিশ্রিত তথা ভেজাল মূর্খতার ভেতর লিপ্ত যার চিকিৎসা ও প্রতিবিধান এবং তা ধুয়ে নতুন হরফ লেখা সব সময় অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে থাকে।

এই আরবরা তাদের আপন প্রকৃতিতে ছিল সমুজ্জ্বল। মজবুত ও লৌহসম সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল তারা। যদি হক কথা তাদের উপলব্ধিতে ধরা না দিত তাহলে তারা এর বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে তুলে নিতে এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করত না। আর যদি সত্য স্বচ্ছ সুন্দর দর্পণের ন্যায় তাদের সামনের পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ত তাহলে তা তারা মনে-প্রাণে গ্রহণ করত, প্রাণের অধিক ভালবাসত, তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরত এবং এর জন্য প্রয়োজনে জীবন বিলিয়ে দিতেও এতটুকু দ্বিধা করত না।

এই আরবীয় মন-মানসিকতা সুহায়ল ইবন আমরের সেই কথার ভেতর প্রতিফলিত হয় যা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের সময় তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল। সন্ধি চুক্তির সূচনা হয়েছিল নিম্নোক্ত বাক্য দ্বারা: "এ সেই ফয়সালা যা আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সা.) করেছেন।" এতে সুহায়ল বলে ওঠে: "আল্লাহর কসম! যদি আমরা জানতাম ও মানতাম, আপনি আল্লাহর রসূল তাহলে কখনো আপনাকে আল্লাহর ঘর যিয়ারতে বাধা দিতাম না, আর আপনার সঙ্গে লড়াই-সংঘর্ষেও প্রবৃত্ত হতাম না।" এই একই মন-মানসিকতা ইকরীমা (রা.) ইবন আবী জাহলের কথায়ও ফুটে ওঠে যখন ইয়ারমুক যুদ্ধ প্রবল তুঙ্গে। তখন তাঁর ওপর প্রতিপক্ষের প্রবল চাপ। রোমক সৈন্যরা প্রচণ্ড বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে হযরত ইকরীমা (রা.)-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন: "জ্ঞানবুদ্ধির দুশমনেরা! (যত দিন পর্যন্ত আমার মাথায় এ সত্য আসেনি) আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মোকাবিলায় সর্বত্র প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে মুখোমুখি হয়েছি। আর আজ আমি তোমাদের থেকে পালিয়ে যাব?" এরপর তিনি হাঁক ছেড়ে বলে ওঠেন: "এমন কেউ আছে, যে আমার হাতে মৃত্যুর শপথ নিতে পার?" এতে কিছু সংখ্যক লোক এগিয়ে এলেন এবং বায়আত নিলেন। এরপর সকলে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন, অতঃপর আহত হয়ে শাহাদত লাভ করলেন।

আরবের লোকেরা ছিল বড়ই বাস্তবতাপ্রিয়, চিন্তাশীল, মননশীল, ধীরস্থির প্রকৃতির, স্পষ্টভাষী, কঠোরপ্রাণ ও সহিষ্ণু। তারা না প্রতারিত করত আর না নিজেদেরকে প্রতারণার মধ্যে রাখা পছন্দ করত। তারা সত্য ও পরিপক্ক কথায় অভ্যস্ত, কথার সম্মান রক্ষাকারী ও সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল। এর একটি সুস্পষ্ট নমুনা ও প্রমাণ আমরা দেখতে পাব আকাবার দ্বিতীয় বায়আতে যার পরই হিজরতের সূচনা হয় মদীনা তায়্যিবার দিকে। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, যখন আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় আকাবা উপত্যকায় রসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণের উদ্দেশে সমবেত হয় তখন আব্বাস ইবন উবাদা আল-খাযরাজী স্বীয় গোত্রকে সম্বোধন করে বলেন: হে খাযরাজের লোকেরা! তোমাদের কি জানা আছে, তোমরা মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)-এর হাতে কোন্ বিষয়ের ওপর বায়আত গ্রহণ করতে যাচ্ছ? উত্তরে তারা বলল: আমরা জানি। তিনি বললেন: তোমরা তাঁর হাতে সাদা-কালো সকল বর্ণের মানুষের সাথে যুদ্ধের ওপর বায়আত করছ (অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে যুদ্ধের শপথ নিতে চলেছ)। যদি তোমরা ভেবে থাক, তোমাদের সম্পদ লুণ্ঠিত হবে, ধ্বংস ও বরবাদ করা হবে, তোমাদের অভিজাত সন্তান ও গোত্রের নেতৃবর্গ নিহত হবে, সেক্ষেত্রে তোমরা তাঁকে শত্রুর হাতে তুলে দিয়ে নিজেরা সরে দাঁড়াবে, তাহলে শুরুতেই এই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যাক আর তা এজন্য, যদি এমন কিছু কর তবে আল্লাহর কসম! দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই তোমরা লজ্জিত ও অপমানিত হবে। আর তোমাদের সিদ্ধান্ত যদি এই হয়ে থাকে, যেই বস্তুর জন্য তোমরা তাঁকে দাওয়াত দিয়েছে তা তোমরা পূরণ করবে, এতে তোমাদের গোটা বিত্ত-সম্পদ তছনছ হয়ে গেলেও তোমাদের নেতা ও অভিজাত সম্প্রদায় মারা গেলেও তোমরা পরওয়া করবেন না, তবে তোমরা তাঁর হাতে হাত দিও। সেক্ষেত্রে আল্লাহর কসম! এতে দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জাহানেই তোমাদের জন্য সাফল্য ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তারা সকলেই সমস্বরে বলল: আমরা আমাদের বিত্ত-সম্পদের ধ্বংস ও নেতৃবর্গের মৃত্যু সকল কিছুর বিনিময়েও আপনার হাতে বায়আত করতে চাই। কিন্তু হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি পাব? আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেনঃ জান্নাত। তারা বলল: আপনি হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি দস্ত মুবারক সামনে বাড়িয়ে দিলে সকলেই বায়আত করল।

প্রকৃত ব্যাপার এই, তারা সেই প্রতিজ্ঞা পালন করেছিল যেই প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য তারা রাসূল আকরাম (সা.)-এর হাতে বায়আত নিয়েছিল। হযরত সা'দ ইবন মু'আয (রা.) তাঁর বিখ্যাত উক্তির মধ্যে সব কিছুর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: "আল্লাহর কসম! (ইয়া রাসূলাল্লাহ্!) আপনি যদি চলতে চলতে বারকুল গিমাদ অবধি পৌছে যান তখনও আমরা আপনাদের সাথে চলতে থাকব। যদি আপনি সমুদ্র পার হতে চান তবে সেক্ষেত্রেও আমরা আপনার সঙ্গে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ব।"

অটুট সংকল্প ও সুদৃঢ় এই ইচ্ছাশক্তি ও সততা, কর্মের স্থিরতা, সত্যের সামনে মস্তক অবনত করে দেয়ার মেযাজ ও মানসিকতা সেই বাক্য থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত যা মুসলিম ফৌজের বিখ্যাত সিপাহসালার উকবা ইবনে নাফে (রা.) উচ্চারণ করেছিলেন, যখন বিজয়ের পর বিজয়ের মাধ্যমে সম্মুখে অগ্রসর হতে গিয়ে আটলান্টিক মহাসমুদ্র তাঁর পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ সময় তিনি বলেছিলেন : "হে আল্লাহ! এই মহাসমুদ্র আমার অগ্রযাত্রার পথের প্রতিবন্ধক। নইলে আমার মন চায় সমান্তরাল গতিতে আমি সামনে এগিয়ে যাই এবং জলে-স্থলে তোমার নামের মহিমা গাই।"

এর বিপরীতে গ্রীস, রোম ও পারস্যের লোকেরা যুগ স্রোতে ভেসে যেতে ও হাওয়ার অনুকূলে পাল তোলাতে অভ্যস্ত ছিল। কোন প্রকার জুলুম ও বাড়াবাড়ি তাদের ভেতর আন্দোলন সৃষ্টি করতে ছিল অক্ষম। নীতিপরায়ণতা ও সত্যের প্রতি কোন আকর্ষণ তাদের ভেতর ছিল না। কোন দাওয়াত বা আহ্বান ও আকীদা বিশ্বাস তাদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তাধারা ও তাদের আবেগ-অনুভূতির ওপর এভাবে ছাপ ফেলত না যার জন্য নিজেদের সত্তাকে তারা বিস্মৃত হতে পারে এবং নিজেদের আরাম-আয়েশ ও পার্থিব ভোগ-বিলাসকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। আরবগণ সভ্যতা-সংস্কৃতি, ভোগ-বিলাস ও আরামপ্রিয়তা থেকে সৃষ্ট এসব রোগ-ব্যাধি ও খারাপ অভ্যাস থেকে ছিল মুক্ত যার চিকিৎসা বড় কঠিন। এটা কোন ঈমান-আকীদার জন্য উত্তাপ সৃষ্টিতে ও আত্মোৎসর্গের ক্ষেত্রে সর্বদাই প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে এবং অধিকাংশ সময় মানুষের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেয়। তাদের ভেতর সত্যবাদিতা ছিল, আমানতদারিও ছিল, ছিল বীরত্বও। মোনাফেকি, গাদ্দারী ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাদের প্রকৃতি ছিল সামঞ্জস্যহীন। লড়াইয়ের ক্ষেত্রে জীবন বাজি রেখে লড়াকু যোদ্ধা, অশ্বপৃষ্ঠে অধিকক্ষণ অতিবাহিতকারী, কঠোর প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সহ্য শক্তির অধিকারী সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত, অশ্বারোহণ ও যুদ্ধ-বিগ্রহপ্রিয় যা এমন এক সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর জন্য আবশ্যকীয় শর্ত যাকে দুনিয়ায় কোন বড় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে যেতে হবে, বিশেষত সেই যুগে যখন লড়াই-সংঘর্ষ ও অভিযান পরিচালনার ধারাবাহিকতা চলতে থাকে এবং বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্যের সাধারণ প্রচলন ঘটতে থাকে।

দ্বিতীয় বিষয়, তাদের চিন্তাধারাগত ও কার্যকর সমূহ শক্তি ও স্বভাবজাত প্রাকৃতিক যোগ্যতাসমূহ নিরাপদ ও সুরক্ষিত ছিল এবং কাল্পনিক দর্শন, অনুকারী যুক্তিতর্কের কচকচানি ও খুঁটিনাটি বিষয়াদি, ইলমে কালামের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও নাজুক অধ্যায়সমূহে অথবা স্থানীয় ও আঞ্চলিক গৃহযুদ্ধগুলোতে তা বিনষ্ট হয়নি। এটি একটি উর্বর এবং এই দিক দিয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত জাতিগোষ্ঠী ছিল তাদের জীবন উত্তাপ, আবেগ-উদ্দীপনা, আনন্দ-প্রফুল্লতা, অটুট সংকল্প এবং লৌহসুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দ্বারা ছিল ভরপুর। স্বাধীনতা ও সাম্য, প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর সঙ্গে ভালবাসা, অনাড়ম্বর ও সারল্য তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে ছিল। তাদেরকে কখনো বিদেশী শক্তির সামনে মাথা নত করতে হয়নি। এই জাতি গোলামী, একজন আরেক জনের ওপর ছড়ি ঘোরাবে এবং প্রভুত্ব করবে এরূপ অর্থের সঙ্গে অপরিচিত ছিল। তারা ইরানী ও রোমক রাজতন্ত্রের গর্ব ও অহমিকা এবং মানুষ মানুষকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে দেখবে এরূপ অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। এর বিপরীতে পারস্য সম্রাটদেরকে (যারা আরব উপদ্বীপের প্রতিবেশী ছিল) অতিমানব জ্ঞান করা হতো। যদি পারস্য সম্রাট রক্ত মোক্ষণ করাতেন কিংবা কোন ঔষধ ব্যবহার করতেন তবে রাজধানীতে ঘোষণা প্রদান করা হতো, আজ মহামান্য সম্রাট রক্ত মোক্ষণ করিয়েছেন কিংবা ঔষধ ব্যবহার করেছেন। এই ঘোষণার পর শহরে কোন পেশাজীবী আপন পেশায় নিমগ্ন হতে কিংবা কোন সরকারী কর্মকর্তা বা সভাসদ কাজ করতে পারত না। যদি কখনও সম্রাটের হাঁচি আসত তবে তাঁর জন্য কোন মঙ্গলবাণী উচ্চারণের অধিকার ছিল না। যদি তিনি নিজে কোন মঙ্গলবাক্য উচ্চারণ করতেন তবুও এর সমর্থনে কিছু বলা যেত না। যদি তিনি কখনও কোন উজীর কিংবা আমীরের বাসভবনে গমন করতেন তবে এই দিনটিকে খুবই অস্বাভাবিক ও গুরুত্ববহ মনে করা হতো। সেই দিন থেকে সেই খান্দানের নতুন বর্ষপঞ্জী শুরু হতো এবং চিঠিপত্রে নতুন তারিখ বসানো হতো। একটি নির্ধারিত সময়সীমার জন্য তার ট্যাক্স মাফ করা হতো। উল্লিখিত ব্যক্তিকে নানা রকমের সম্মান, পুরস্কার, ক্ষমা ও পদোন্নতি দ্বারা ভূষিত করা হতো কেবল এজন্য, সম্রাট পদধূলি দ্বারা তাকে ধন্য ও অনুগৃহীত করেছেন।

এ সেই সব আদব, বন্দেগী ও সম্রাটকে তাজীম প্রদর্শনের আবশ্যকীয় শর্তের অতিরিক্ত যেগুলো প্রদর্শন করা সাম্রাজ্যের কর্মকর্তা, দরবারে সভাসদবর্গ ও অপরাপর সকল মানুষের জন্য অপরিহার্য ছিল। যেমন সম্রাটের সামনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা (অর্থাৎ বুকের ওপর হাত রেখে আদবের সাথে মাথা নিচু করে দেয়া), তাঁর সামনে এভাবে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা যেভাবে নামাযে আল্লাহর সামনে কেউ দাঁড়ায়। এ সেই সম্রাটের আমলের কথা বলা হচ্ছে যিনি নওশেরওয়ানে 'আদিল বা ন্যায়বিচারক নওশেরওয়া' নামে পৃথিবী খ্যাত অর্থাৎ খসরু ১ম (৫৩১-৫৭৯ খৃঃ)। এ থেকে পরিমাপ করা যেতে পারে, ইরানী রাজতন্ত্রে মতামত ও চিন্তার স্বাধীনতার ওপর কত কঠিন বাধা-নিষেধ আরোপিত ছিল এবং শাহী দরবারে মুখ খোলার কি মূল্য পরিশোধ করতে হতো। ঘটনাটি 'সাসানী আমলে ইরান' নামক গ্রন্থের লেখক ঐতিহাসিক তাবারীর সূত্রে লিপিবদ্ধ করেছেনঃ "সম্রাট একটি কাউন্সিল সভার আয়োজন করেন এবং রাজস্ব বিভাগের পরিচালক/সচিবকে নির্দেশ দেন জমির খাজনার নতুন ভাষ্য সজোরে পাঠ করে শোনাতে। তিনি তা পাঠ করলে সম্রাট খসরু (নওশেরওয়াঁ) উপস্থিত লোকদেরকে দু'বার জিজ্ঞেস করেন: কারো কোন আপত্তি নেই তো? সকলেই ছিল নিশ্চুপ। যখন সম্রাট তৃতীয়বারের মত একই প্রশ্ন করলেন তখন একজন দাঁড়িয়ে সসম্মানে জিজ্ঞেস করল: সম্রাটের ইচ্ছা কি এই, অস্থাবর জিনিসের ওপর স্থায়ী ট্যাক্স বসাবেন যা কাল-পরিক্রমায় অবিচার ও বে-ইনসাফীতে পর্যবসিত হবে? এতে সম্রাট ক্রোধে চিৎকার করে বলে ওঠেন: ওহে অভিশপ্ত বেআদব! তোর পরিচয় কি? কোত্থেকে এসেছিস তুই? সে উত্তরে জানাল, সে রাজস্ব কর্মকর্তাদের একজন। সম্রাট তখন নির্দেশ দেন কলমদানি দিয়ে পিটিয়ে তাকে মেরে ফেলতে। এরপর পরিচালক/সচিবদের সকলেই তাকে কলমদানি দিয়ে পেটাতে শুরু করে। ফলে বেচারা সেখানেই মারা যায়। এরপর সকলেই বলল: সম্রাট! আপনি যে খাজনা আমাদের ওপর ধার্য করেছেন তা খুবই যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়ানুগ হয়েছে।”

ভারতবর্ষে সম্মান ও সম্ভ্রমের অপমান ও অবমাননা এবং সেসব পশ্চাৎপদ শ্রেণীর প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন (যাদেরকে বিজয়ী আর্য জাতিগোষ্ঠী দেশীয় আইন একটি নিকৃষ্টতম সৃষ্টি হিসেবে অভিহিত করেছিল এবং যারা গৃহপালিত পশু থেকে কেবল এ দিক দিয়ে ভিন্ন ছিল, এরা দু'পায়ে ভর দিয়ে চলত এবং দেখতে মানুষের মত) কল্পনাতীত ছিল উক্ত আইনে এটি নিয়মিত ধারা হিসেবে বর্ণিত ছিল, যদি কোন শূদ্র কোন ব্রাহ্মণকে মারার উদ্দেশে হাত ওঠায় কিংবা লাঠি ওঠায় তবে তার হাত কেটে দিতে হবে। যদি লাথি মারে তবে তার পা কেটে দিতে হবে। যদি সে দাবি করে, সে ব্রাহ্মণকে লেখাপড়া শেখাতে পারে, তাকে ফুটন্ত তেল পান করানো হবে। এই আইনের দৃষ্টিতে কুকুর, ব্যাঙ, গিরগিটি, কাক, উল্লু ও অদ্যুৎ বা অস্পৃশ্য শ্রেণীর কাউকে হত্যা করলে তার জরিমানা ছিল একই রূপ। রোমকরাও এ ব্যাপারে ইরানীদের থেকে বেশি কিছু ভিন্ন ছিল না, যদিও নির্লজ্জতা ও মানবতাকে অপমানিত-অপদস্ত করার ক্ষেত্রে এই সর্বনিম্ন পর্যায়ে তারা পৌঁছতে পারেনি। একজন পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক Victor Chopart তদীয় The Roman World নামক গ্রন্থে বলেন: "রোম সম্রাট কাইজারকে উপাস্য মনে করা হতো। বিষয়টি মৌরছী ও পারিবারিকভাবে ছিল না, বরং যিনিই সিংহাসন ও রাজমুকুটের মালিক হতেন তাকেই খোদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হতো যদিও তার ভেতর এমন কোন নিশানী কিংবা চিহ্ন থাকত না যা তাকে এই স্তরে অধিষ্ঠিত হবার দিকে ইঙ্গিত দেয়। Augustus-এর শাহী উপাধি এক সম্রাট থেকে অপর সম্রাট অবধি সংবিধান ও আইন অনুযায়ী স্থানান্তরিত হতো না, বরং রোমক সরকারী সংসদের কাজ কেবল এতটুকুই ছিল, এমন প্রতিটি নির্দেশ যা তরবারির তীক্ষ্ম ধারের জোরে প্রচারিত হবে তা প্রচারিত হতে দেয়া। এই রাজত্ব ও বাদশাহী ছিল কেবল এক ধরনের সামরিক একনায়কতন্ত্রেরই রূপ।”

যদি এর তুলনা করা হয় আরবদের সেই স্বাধীনতাপ্রিয়তা, আত্মসম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে, যা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে তাদের মাঝে দেখতে পাওয়া যায়, তাহলে এ দুই জাতিগোষ্ঠীর মেযাজ এবং আরব ও অনারব সমাজের পার্থক্য সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে। তারা কখনোও কোন সময় তাদের বাদশাহকে "আম সাবাহান" ও "আবায়তাল লআন" (অর্থাৎ আপনি সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকুন এবং আপনার প্রভাত কল্যাণময় হোক)-এর মত শব্দ সমষ্টি দ্বারা সম্বোধন করত। এই স্বাধীনতা ও আত্মপরিচিতি, আপন মান-সম্ভ্রমের হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণ আরবদের মধ্যে এই পরিমাণে ছিল, তারা তাদের বাদশাহ ও আমীরদের কোন কোন দাবি ও ফরমায়েশ পূরণ করতেও অনেক সময় আপত্তি করত। এই সম্পর্কিত একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনী ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত হয়েছে, একবার এক আরব বাদশাহ বনী তামীমের এক ব্যক্তির নিকট একটি ঘোটকী, যার নাম ছিল সিকাব, চেয়ে বসে। লোকটি ঘোটকী দিতে পরিষ্কার অস্বীকার করে এবং নিম্নোক্ত বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি করে:

"হে রাজন! এ বহু দামী ও সুন্দরী ঘোটকী; একে না ধারে দেওয়া যায়, না বিক্রয় করা যায়। আপনি একে পাবার জন্য চেষ্টা করবেন না; আপনার হাত থেকে একে ফেরানো আমার পক্ষে সম্ভব।"

এই স্বাধীনতা, আত্মশাসন, আত্মার সমুন্নতি, আভিজাত্য ও অটুট মনোবল সর্বস্তরের জনগণের মধ্যেই বর্তমান ছিল এবং নারী-পুরুষ সকলের মধ্যে পাওয়া যেত। এর একটি নমুনা আমরা হীরার শাসনকর্তা আমর ইবন হিন্দ-এর হত্যার ঘটনায় দেখতে পাই। আরব ঐতিহাসিকগণ ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমর ইবন হিন্দ বিখ্যাত আরব ঘোড়সওয়ার ও কবি 'আমর ইবন কুলছুমকে দাওয়াত দেন এবং আগ্রহ ব্যক্ত করেন, তাঁর (কবির) শাসনকর্তার মায়ের সঙ্গে দাওয়াতে যেন শরীক হন। অনন্তর 'আমর ইবন কুলছুম বনু তাগলিবের একটি জামা'আতের সঙ্গে জযীরা থেকে হীরা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং তাঁর মা লায়লা বিনতে মুহালহিলও বনু তাগলিবের কিছু সংখ্যক দায়িত্বশীল লোকের সঙ্গে রওয়ানা হন। 'আমর ইবন হিন্দের তাঁবু হীরা ফুরাতের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপন করা হয়। একদিকে 'আমর ইবন হিন্দ আপন তাঁবুতে প্রবেশ করেন এবং অপরদিকে লায়লাও। হিন্দ তাঁর মাকে বলে দিয়েছিলেন, যখন খাবার পরিবেশন করা হবে তখন নওকরদের একটু আলাদা করে দেবে এবং কোন প্রয়োজন দেখা দিলে লায়লাকে দিয়ে তা করিয়ে নেবে। অতঃপর আমর ইবনে হিন্দ দস্তরখান বিছানোর নির্দেশ দিলেন, এরপর খাবার পরিবেশ করলেন। এর ভেতর হিন্দ লায়লাকে সম্বোধন করে বলল, বোন! এই পাত্রটা আমাকে একা উঠিয়ে দাও তো! লায়লা বলল, যার প্রয়োজন সে নিজেই উঠিয়ে নিক। এরপর হিন্দ দ্বিতীয়বার চাইল এবং পীড়াপীড়ি করতে থাকল। এ সময় লায়লা চিৎকার করে উঠল, হায়! কী লজ্জা ও অপমান! ওহে বনু তাগলিব! এই আওয়াজ আমর ইবন কুলছুম শুনতেই তাঁর চক্ষু রক্তবর্ণ ধারণ করে। তিনি এক লাফে 'আমর ইবন হিন্দের সামনে ঝুলন্ত তরবারি টেনে নেন এবং তা দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। সেই সাথে বনু তাগলিব তাঁর তাঁবু লুট করে এবং জযীরার দিকে ফিরে আসে। এই ঘটনাকে উপলক্ষ করেই আমর ইবন কুলছুম সেই বিখ্যাত কাসীদা পাঠ করেন যা "ঝুলন্ত সপ্তক" (সাব 'আঃ মু'আল্লাকা)-এর অন্তর্গত।

ঠিক এমনই একটি ঘটনা সংঘটিত হয় যখন হযরত মুগীরা ইবন শু'বা (রা.) মুসলিম পক্ষের দূত হিসাবে পারসিক সেনাপতি রুস্তমের দরবারে গিয়েছিলেন। রুস্তম পূর্ণ জাঁকজমক ও শাহী ঠাঁটবাটের সঙ্গে স্বীয় সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। মুগীরা ইবন শু'বা (রা.) আরবদের অভ্যাস মাফিক রুস্তমের পাশাপাশি স্থাপিত কুরসীতে গিয়ে বসে পড়েন। তাঁর দরবারীরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে টেনে নিচে নামিয়ে আনে। এতে তিনি বলেনঃ আমরা খবর পেয়েছিলাম তোমরা নাকি খুবই বুদ্ধিমান! কিন্তু আমার চোখে তোমাদের চেয়ে বেওকুফ আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আমরা আরবরা তো সকলের সঙ্গে সমান ব্যবহার করে থাকি। আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে গোলাম বানায় না একমাত্র যুদ্ধাবস্থা ছাড়া। আমার ধারণা ছিল, তোমরাও তোমাদের জাতির সঙ্গে ঠিক তেমনি সাম্যের আচরণ করে থাকবে। এর চেয়ে এই ভাল ছিল, তোমরা আমাকে প্রথমেই অবহিত করতে, তোমরা একে অপরকে নিজদের খোদা বানিয়ে রেখেছ এবং এ বিষয়ে তোমাদের সঙ্গে নিষ্পত্তি হবে না। এমতাবস্থায় আমরা তোমাদের সঙ্গে এই আচরণ করতাম না, আর তোমাদের নিকটও আগমন করতাম না। কিন্তু তোমরা নিজেরাই আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছ।

আরব উপদ্বীপে শেষ নবী প্রেরণের দ্বিতীয় কারণ হলো, আরব উপদ্বীপেও মক্কা মুআজ্জামায় কা'বার অস্তিত্ব ও উপস্থিতি যা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এজন্যই নির্মাণ করেছিলেন যেন তাতে এক আল্লাহর ইবাদত করা হয় এবং এই জায়গাটি চিরদিনের তরে তাওহীদের দাওয়াতের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) গ্রন্থে ব্যাপক পরিমাণ বিকৃতি সত্ত্বেও "বাক্কা' উপত্যকা" শব্দটি অদ্যাবধি বর্তমান, কিন্তু অনুবাদকগণ একে 'বুকা' উপত্যকা বানিয়ে দিয়েছেন এবং একে নির্দিষ্ট জ্ঞাপকের পরিবর্তে অনির্দিষ্ট জ্ঞাপকে পরিণত করেছেন। "মাজামিরে দাউদ"-এর সমষ্টি যা আরবী ভাষায় এসেছে তা এই: "বরকতময় ও পবিত্র সেই মানুষ যার ভেতর তোমার পক্ষ থেকে শক্তি নিহিত, যাঁর অন্তরে রয়েছে তোমার ঘরের রাস্তা যিনি বুকা উপত্যকা অতিক্রমরত অবস্থায় তাকে একটি কুয়া বানান" (গীত সংহিতা, ৮৪ : ৫,৬,৭)। কিন্তু ইহুদী পণ্ডিতগণ কয়েক শতাব্দী পর অনুভব করতে সক্ষম হন, এই অনুবাদটি ভুল। অনন্তর Jewish Encyclopaedia-তে এই স্বীকারোক্তি বর্তমান, এটি এক নির্দিষ্ট উপত্যকা যেখানে পানি পাওয়া যেত না। যারা উল্লিখিত কথা লিখেছেন তাদের মস্তিষ্কে এমন একটি উপত্যকার ছবি ছিল যার ছিল বিশেষ কুদরতী অবস্থা, যার প্রতিনিধিত্ব তারা উল্লিখিত শব্দ সমষ্টি দ্বারা করেছেন। ওইসব সহীফার ইংরেজী অনুবাদকগণ অনুবাদের ক্ষেত্রে আরবী অনুবাদকদের তুলনায় অধিকতর বিশ্বস্ততা ও সর্তকতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁরা "বাক্কা" শব্দটিকে মূল সহীফার ন্যায় আবিকৃত ও বিশুদ্ধ অবস্থায় হুবহু অবশিষ্ট রেখেছেন এবং ইংরেজী "b" অক্ষরে না লিখে বড় "B" অক্ষরে লিখেছেন যা সাধারণত মূলভ-এর ক্ষেত্রে লেখা হয়ে থাকে। ইংরেজী অনুবাদ নিম্নে উদ্ধৃত করা গেল: "Blessed is the man whose strength is in thee; in whose heart are the ways of them. Who passing through the valley of Baca make it a well." (Psalm 84: 5-6). মুবারকবাদ সেই সব লোকের প্রতি যাদের সম্মান ও শক্তি রয়েছে তোমার সাথে, যাদের অন্তরে তাদের রাস্তা রয়েছে যা বাক্কা উপত্যকা অতিক্রম করবে এবং তাকে একটি কুয়া বানাবে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আবির্ভাব ছিল হযরত ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর সেই দোয়ার ফল যা তাঁরা কাবাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করতে গিয়ে ও তা নির্মাণ করার সময় করেছিলেন। দোয়াটি এই : "হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকে তাদের নিকট এক রসূল প্রেরণ কর যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট আবৃত্তি করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা বাকারা : ১২৯]

আল্লাহ তা'আলার এক চিরন্তন নিয়ম এই, তিনি তাঁর মুখলিস (একনিষ্ঠ), সাদিকীনীন (সত্যনিষ্ঠ) ও আপন মহান সত্তার সঙ্গে মিলনাকাঙ্ক্ষী ও ক্ষমা ভিক্ষার আঁচল বিস্তারকারীদের দোয়া অবধারিতভাবে কবুল করে থাকেন। আম্বিয়াই কিরাম ও নবীয়ে মুরসালদের সম্মান তাঁদের চেয়েও উচ্চে। আসমানী সহীফা ও সত্য সংবাদসমূহ এসব উদাহরণে ভরপুর। স্বয়ং তাওরাতে এর প্রমাণ বিদ্যমান, আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর এই দোয়া কবুল করেন। পুস্তকে (২০) পরিষ্কারভাবে লিখিত আছে : "এবং ইসমাঈলের অনুকূলে আমি তোমার কথা শুনলাম। দেখ, আমি তাকে প্রাচুর্য দান করব, তাকে সৌভাগ্যশালী করব এবং তাকে খুব বর্ধিত করব; তার থেকে বার জন সর্দার জন্ম নেবে এবং তাকে বিরাট বড় জাতি (কওম) বানাব।" এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেন, "আমি ইবরাহীম (আ.)-এর দোয়া ও ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদের ফসল।” তাওরাত (ওল্ড টেস্টামেন্ট) বা পুরাতন নিয়ম-এর বিকৃতি সত্ত্বেও অদ্যাবধি এর সাক্ষ্য মিলবে, এই দোয়া কবুল হয়। দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তক (১৫-১৮) মূসা (আ.)-এর ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে: "খোদাওয়ান্দ তোমার প্রভু, তোমার রব, তোমার নিমিত্ত তোমারই ভেতর থেকে তোমারই ভাইদের থেকে আমার মত একজন নবী পাঠাবেন; তোমরা গভীর মনোযোগের সাথে তাঁর কথা শুনবে।" (একওয়াকে - তোমার ভাই) শব্দ নিজে থেকেই বলে দিচ্ছে, এর দ্বারা বনী ইসমাঈলকেই বোঝানো হয়েছে, বনী ইসরাঈলের চাচার বংশধর। উক্ত সহফিতেই দুটি শ্লোকের পর এই বাক্য লিপিবদ্ধ রয়েছে। "আর খোদাওয়ান্দ আমাকে বললেন, তারা যা বলেছে তা ভালই বলেছে। আমি তাদের নিমিত্ত তাদের ভাইদের মধ্যে থেকে তোমার মত একজন নবী পাঠাব, আর আমি আমার বাক্য তার মুখে নিক্ষেপ করব এবং যা কিছু আমি তাকে বলব সে তা সব তাদেরকে বলবে।" [যাত্রা পুস্তক-২,২৮: ১৭-১৮] "আমি আমার কথা তার মুখে নিক্ষেপ করব"-এই বাক্যটি মুহাম্মদ (সা.)-কে নির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেননা তিনিই একমাত্র নবী যাঁর ওপর আল্লাহর কালাম শব্দগত ও অর্থগতভাবে নাযিল হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা তার ঘোষণাও দিয়েছেন: "এবং সে মনগড়া কথা বলে না; এতো ওহী যা তার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট হয়।" (সূরা নাজম: ৩-৪)। অন্যত্র বলা হয়েছে : "কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না, সামনের থেকেও নয়, পেছন থেকেও নয়; এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসা আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ।” [হামীম আস-সাজদা : ৪২]

এর বিপরীত বনী ইসরাঈলের নবীদের সহীফাসমূহ আদৌ এ দাবি করে না, সেগুলো শব্দগত ও অর্থগতভাবে আল্লাহর কালাম। তাদের পণ্ডিতগণ সে সবকে তাদের নবীদের দিকে সম্পর্কযুক্ত করার ক্ষেত্রে কৃত্রিমতার আশ্রয় গ্রহণ করে না। Jewish Encyclopaedia তে বলা হয়েছে : “ওল্ড টেস্টামেন্ট (পুরাতন নিয়ম)-এর প্রথম পাঁচটি পুস্তক (যেমন প্রাচীন ইয়াহুদী ধর্মীয় বর্ণনাসমূহ আমাদেরকে বলে) মূসা নবীর রচনা। শেষ আটটি শ্লোক বাদে [ যেগুলোতে মূসা (আ.)-র ইনতিকালের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে] রিব্বী (ইয়াহুদী ‘আলিম) এই বৈপরীত্য ও একে অপরের থেকে ভিন্ন বর্ণনার ওপর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে যা এসব সহীফায় এসেছে এবং এর মধ্যে আপন প্রজ্ঞা ও মেধার সাহায্যে সংস্কার-সংশোধন করে থাকে।” ইঞ্জিল চতুষ্টয়ের সম্পর্ক যতখানি, যেগুলোকে “নিউ টেস্টমেন্ট বা নতুন নিয়ম” বলা হয়, সেগুলো শব্দগত ও অর্থগতভাবে আল্লাহর কালাম হওয়ার ব্যাপারে দূরতম সম্পর্কও নেই। এ ব্যাপারে তারাই সন্দেহ নিরসন করতে পারেন যারা এগুলো পড়ে দেখেছেন। প্রকৃত ব্যাপার এই, এসব পুস্তক জীবনী ও কাহিনীমূলক পুস্তক হিসেবেই অধিক প্রতিভাত। আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব হিসেবে, যার ভিত্তি হয় ওহী ও ইলহাম, তা এতে খুবই কম দৃষ্ট হয়।

এর পরের নম্বরে আসে জযীরাতুল আরবের তথা আরব উপদ্বীপের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানের যা একে দাওয়াতের কেন্দ্র হিসেবে সর্বাধিক উপযোগী রূপ দান করেছে, যেখানে থেকেই এই দাওয়াত ও পয়গাম সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে দেয়া যায় এবং পৃথিবীর তাবৎ জাতিগোষ্ঠীকে সম্বোধন করা যায়। একদিকে এটি এশিয়া মহাদেশের একটি অংশ, অপরদিকে তা আফ্রিকা মহাদেশ, এরপর ইউরোপেরও কাছাকাছি এবং এসব সেই এলাকা যা সভ্যতা ও কৃষ্টি, জ্ঞান ও শিল্পকলা, ধর্ম ও দর্শনের সর্বদাই কেন্দ্র থেকেছে এবং যেখানে বিরাট বিস্তৃত ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য কায়েম হয়েছে। অতঃপর এই এলাকা বাণিজ্যিক কাফেলার অতিক্রমস্থলও ছিল যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের লোক একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতো। এটি ছিল কয়েকটি মহাদেশের সঙ্গমস্থল এবং এক জায়গার নির্দিষ্ট বস্তুসামগ্রী ও উৎপাদিত দ্রব্য, যেখানে এর প্রয়োজন পড়ত, সেখানে স্থানান্তরিত করত। এই আরব উপদ্বীপ দু' বিরাট প্রতিদ্বন্দী শক্তির মাঝে অবস্থিত ছিল খ্রীস্টান শক্তি ও অগ্নি উপসাক শক্তি, প্রাচ্য শক্তি ও পাশ্চাত্য শক্তি। কিন্তু এতসত্ত্বেও তারা নিজস্ব স্বাধীনতা ও আপন ব্যক্তিত্বের সর্বদাই সংরক্ষণ করেছে এবং নিজের কতিপয় সীমান্ত এলাকা ও কয়েকটি গোত্র ব্যতিরেকে তারা কখনো ঐ সব শক্তির অধীনতা স্বীকার করেনি। আরব উপদ্বীপ বিনা প্রশ্নে নির্দ্বিধায় নবুওতের এমন এক বিশ্বব্যাপী দাওয়াতের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারত যা আন্তর্জাতিক রেখার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, মানবতাকে সমুন্নত মঞ্চ থেকে সম্বোধন করবে, সর্বপ্রকার রাজনৈতিক চাপ ও বিদেশী প্রভাব থেকে পরিপূর্ণরূপে স্বাধীন হবে।

এই সমস্ত কারণে আল্লাহ্ তা'আলার আরব উপদ্বীপ ও মক্কা মুকাররামাকে রাসূল (সা.)-এর আবির্ভাব, আসমানী ওহীর অবতরণ ও দুনিয়ার বুকে ইসলাম প্রচারের বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রে ও সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্বাচিত করেন। "আল্লাহই বেশী জানেন তাঁর পয়গাম কোথায় এবং কাকে সোপর্দ করা হবে।" [সূরা আনআম: ১২৪]

টিকাঃ
১. তারিখে তাবারী, ৪খ. ৩৬ পৃ.।
২. সীরাতে ইবন হিশাম, ১ম খ., ৪৪৬ পৃ.।
৩. বারকুর গিমাদ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। একটি মত, এটা ইয়ামনের একটি দূরবর্তী এলাকা। সুহায়লী বলেন, এর দ্বারা আবিসিনিয়াকে বোঝানো হয়েছে। এর উদ্দেশে এই, যদি দূরবর্তী এলাকা পর্যন্ত গমন করেন তবুও আমরা আপনার সঙ্গে থাকব, সঙ্গ পরিত্যাগ করব না।
৪. যাদুল মাআদ, ২খ. সীরাত ইবনে হিশাম, খ. বোখারী ও মুসলিমের অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।
৫. কামিল, ইবনে আছীর, ৪খ. সাসানী আমলে ইরান, পৃ. ৫৩৫-৩৬।
৬. দ্র. সাসানী আমলে ইরান, ৫১১ পৃ.।
৭. সাসানী আমলে ইরান।
৮. এজন্য আরবী ভাষায় একটি স্থায়ী বাগধারা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। বলা হতো : কফার ফালান অর্থাৎ অমুক নত হয়ে নিজ হাত বুকের ওপর স্থাপন করে শ্রদ্ধাবশে মাথা নুইয়ে দিল। এটা ছিল ইরানের সাধারণ রেওয়াজ এবং সেখান থেকেই এই পরিভাষা সৃষ্টি হয় এবং আরবী ভাষায় প্রবেশ করে। লিসানুল আরব গ্রন্থে আছে, কফার-এর অর্থ ইরানীদের তাদের সম্রাটকে সম্মান করা এবং আহলে কিতাবদের তাকফীর এই আদাব তসলীম হিসেবে মানুষ তাঁর মাথা নুইয়ে দেবে। তারা জারীরের সেই কবিতা থেকে দলিল পেশ করত।
৯. সাসানী আমলে ইরান, ৫১১ পৃ.।
১০. মনুসংহিতা, ১০ম অধ্যায়।
১১. The Roman World. London 1928. p. 418.
১২. কিতাবু'শ শির ওয়াশ-শু'আরা, ইবন কুতায়বা, পৃ. ৩৬।
১৩. তারীখে তাবারী, ৪খ. ১০৮।
১৪. বাক্কা পবিত্র মক্কার অপর নাম। বাক্কা ও মক্কা উভয় নামই ব্যবহৃত হয়। এজন্য আরবী ভাষায় মীম ও বার মধ্যে পারস্পরিক পরিবর্তন ঘটে থাকে; যেমন লাজিম ও লাজিব এবং বালিহিত ও মালিহিত।
১৫. Vol, ii. p 415।
১৬. মাওলানা আব্দুল মাজেদ দুরিয়াবাদকৃত তফসীর মাজেদী, কাজী সুলায়মান মুনসুর পূরীর "রাহামাতুল্লিাল আলামীন", ১ম খণ্ড থেকে গৃহীত।
১৭. Jewish Encyclopaedia; Vol. 8. p. 589.
১৮. বিস্তারিত দ্র. লেখকের মনসব-ই নবুওয়ত-এর ৭ম খণ্ড বক্তৃতা খতমে নবুওয়ত এর আসমানী সহীফা কোরআন জ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে নামক অধ্যায়।
১৯. ড. হুসায়ন কামালুদ্দীন রিয়াদ ভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার সভাপতি। তিনি এক সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেন, তিনি এক নতুন ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণে উপনীত হয়েছেন, যদ্বারা প্রমাণিত হয়, মক্কা মুকাররামা পৃথিবীর শুষ্ক অংশের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। তিনি তাঁর গবেষণার সূচনা করেছেন এমন একটি চিত্র দ্বারা যেখানে মক্কা মুকাররামা থেকে পৃথিবীর অপরাপর স্থানের দূরত্ব দেখানো হয়েছিল। এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প মূল্যের এমন একটি যন্ত্রের নির্মাণ যা কেবলার দিক নির্ধারণ করবে। ইতোমধ্যে তাঁর কাছে এই সত্যও দিবালোকের মতই স্পষ্ট হয়ে গেছে, মক্কা মুকাররামা ঠিক দুনিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। এই গবেষণা দ্বারা তাঁর সামনে এই রহস্যও উন্মোচিত হয়েছে, মক্কা মুকাররামাকে বায়তুল্লাহর কেন্দ্র ও আসমানী হেদায়াতের সূচনাবিন্দু বানাবার মধ্যে আল্লাহর কি রহস্য ও কুদরত নিহিত ছিল।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অবদানে নতুন পৃথিবী

📄 হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অবদানে নতুন পৃথিবী


মানবতার সেবায় নিবেদিত ব্যক্তি ও দলের সংখ্যা প্রচুর। ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক যারা পৃথিবীর নির্মাণ ও উন্নতি সাধনে অকাতরে শ্রম দিয়েছেন, বরং ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা যায়, অগণন অসংখ্য মানুষ এসে ভিড় করেছে এবং নিজেদেরকে মানবতার সেবক ও নির্মাতা হিসেবে দাঁড় করাতে যারপরনাই চেষ্টা করছে। তাঁরাও মানবতার সেবা ও নির্মাণের মাপকাঠিতে বিবেচিত ও উত্তীর্ণ হতে চান। আমরাও বলি, পৃথিবী ও মানবতার প্রতি তাঁদের সমূহ চেষ্টা-অবদান বিচার করে দেখা দরকার। সূক্ষ্ম নিক্তিতে মেপে দেখা দরকার মানবতার নির্মাণ, প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের মাপকাঠিতে পরিপূর্ণভাবে উত্তীর্ণ হতে পারেন কে?

প্রথমেই ভাবতে হয় চিন্তাবিদ, দার্শনিকদের কথা। পরম গাম্ভীর্য আর শ্রদ্ধাস্নাত এই কাফেলাটি রীতিমতই সম্মানিত আদর পেয়ে আসছে মানব সভ্যতায় যুগে যুগে। বড় বড় গ্রীক দার্শনিক আর ভারতবর্ষের নামী-দামী জ্ঞান-গুরুর ছোঁয়ায় এ কাফেলা বরাবরই ছিল অনন্য-বরেণ্য। দর্শন ও বিজ্ঞানের প্রতি দুর্বলচিত্ত আমরা এই কাফেলার প্রতি চোখ তুলতেই আরেকবার নড়ে উঠি। অবলীলায় বলে উঠি, এরাই মানব জাতির মাথা উঁচু করেছে! মানবতার উভয় হাত জ্ঞান-বিজ্ঞানের মণি-মুক্তায় পূর্ণ করে দিয়েছে, অথচ আমরা যদি একবার একদিকদর্শিতা আর নিজস্ব লালিত বিশ্বাসের গণ্ডিমুক্ত হয়ে ভাবি এবং চিন্তা করি, আচ্ছা, বিজ্ঞানী আর দার্শনিকদের এই কাফেলাটি কি মানবতার জন্য বিশেষ কোন করুণা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে? আচ্ছা, জিজ্ঞেস করি মানবতা তাঁদের কাছে কি পেয়েছে? মানবতার কোন্ কোন্ তৃষ্ণা নিবারণ করেছে এই কাফেলা? মানবতার কোনো যন্ত্রণার চিকিৎসা করেছে এই জ্ঞানগুরুর দল-দার্শনিক কাফেলা?

আমরা এসব প্রশ্ন নিয়ে যতই ভাবি শূন্যতা আর দীনতা ছাড়া কিছুই খুঁজে পাই না। কেবল পাই সাগর সাগর নৈরাশ্য। আপনি নিজেই দর্শনশাস্ত্র পড়ুন। দার্শনিকদের জীবনপাতাগুলো উল্টে দেখুন! মনে হবে, দর্শনের জীবনসমুদ্রের ছোট একটি দ্বীপ ছিল। কিছু রক্ষিত জায়গা ছিল। সীমানা পাতা ক্ষুদ্র একটি এলাকা ছিল। জ্ঞানগুরু-দার্শনিকরা আল্লাহপ্রদত্ত তাঁদের সকল শক্তি ও মেধা সেই ছোট্ট ক্ষুদ্র রক্ষিত ভূমিতেই শেষ করে দিয়েছেন।

মানবতার যেসব চাহিদা ছিল আশু পূরণীয়, যেসব সমস্যাকে এক মুহূর্তের জন্য রেখে দেয়া যায় না, যেসব সমস্যার গ্রন্থি উন্মোচন ব্যতিরেকে মানবতার গাড়ি এক পা এগুতে পারে না, জ্ঞানগুরু দার্শনিকরা সেসব সমস্যার প্রতি একবার চোখ তুলে তাকানও নি। এসব সমস্যা উত্তরণে মানবতাকে সহায়তা করা তো অনেক পরের কথা, এসব সমস্যা নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনাও হয়নি, বাক-বিতণ্ডাও হয়নি। তাঁরা বরং তাঁদের সেই জ্ঞানভূমিতে, চিন্তা ও দর্শনের দ্বীপরাজ্যে নিরাপদ শান্তিময় জীবন যাপন করেছেন; কিন্তু মানবতা তো আর সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপরাজ্যে বন্দী থাকেনি! দার্শনিকদের আবাদভূমি গ্রীকেও তো অদার্শনিক কম ছিল না! এই দার্শনিকগণ আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে খুব ভেবেছেন। নক্ষত্রের বিচরণ পথ, আকাশমণ্ডলী, আরো কত কিছু নিয়ে মাথা ক্ষয় করেছেন; কিন্তু অদার্শনিকদের ওসবের সাথে কি সম্পর্ক! তাছাড়া মানবতাই বা এসব থেকে কি পেয়েছে? মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই বা ওসবের দ্বারা কতটুকু উপকৃত হয়েছে? উদ্ভ্রান্ত, পথহারা, ম্রিয়মাণ মানবতার জন্য তাঁরা কি করেছেন? তাঁরা জীবন যাপন করেছেন, অথচ জীবনের সাথে তাঁদের সম্পর্কই ছিল না। জীবনের চারপাশে জ্ঞান ও দর্শনের প্রাণহীন দেয়াল এঁটে রেখেছিলেন তাঁরা, সম্পর্ক যা ছিল তা কেবল দর্শনের কয়েকটি কেতাবী কথা।

এখন চলছে রাজনীতির যুগ। সর্বত্র রাজনীতির হৈ চৈ! আমাদের দেশ এখন স্বাধীন। আশা করি এই উপমাটি দার্শনিকদের অবস্থান নির্ণয়ে যথেষ্ট সাহায্য করবে! আপনারা সকলেই জানেন, আমাদের এই দেশে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস আছে। কোনোটা আমেরিকার দূতাবাস, কোনটা রাশিয়ার। কোনটা মিশরের দূতাবাস, আবার কোনোটা ইরানের। এসব দূতাবাসের ভেতরেও মানুষ আছে। জীবন যাপন-প্রাণচাঞ্চল্য সবই আছে। সেখানে তারা খানাপিনা করে, পড়া-লেখা করে। অনেক বড় বড় শিক্ষিত, রাজনৈতিক বিশ্লেষকের নিবাস এই দূতাবাসগুলো, অথচ আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ের সাথে এদের এক বিন্দু সম্পর্ক নেই। আমাদের পরস্পর ঝগড়া-বিবাদের সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের দারিদ্র্য, ঐশ্বর্য, চারিত্রিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি-অবনতি নিয়েও তাদের কোনো ভাবনা-ব্যথা নেই, বরং তাদের নির্ধারিত কিছু কাজ আছে। তাও সীমিত অঙ্গনে তারা কেবল সেই কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তাই তারা আমাদের দেশে থেকেও যেন নেই! দর্শনের বিষয়টিও ছিল অনুরূপ। জ্ঞানগুরু দার্শনিকরা সেই দূতাবাসের বদ্ধ নিবাসে বসে জ্ঞান চর্চায় মগ্ন থাকতেন। জীবনযুদ্ধের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

দার্শনিকদের পরেই আসে কবি-সাহিত্যিকদের পালা। কাব্য-সাহিত্যের প্রতি আমাদেরও ঝোঁক আছে। তাই আমরা কাব্য-সাহিত্যকে খাটো করে দেখছি না। তবুও আমাকে মাফ করবেন। আমি বলতে বাধ্য, কবি-সাহিত্যিকরাও মানবতার ব্যথা দূর করতে সচেষ্ট হয়নি। মানবতার দীর্ঘ যন্ত্রণা আর ভয়াল জখম বেদনার চিকিৎসা না করে তারা আমাদেরকে দিয়েছেন কিছু বিনোদন মাত্র, অবসর কাটাবার নিষ্ফল সওদা। সন্দেহ নেই, তারা আমাদের সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন; কিন্তু মানবতার ব্যথায় বিমূঢ় হয়নি তাদের মাথা। মানবতার ইসলাহ্ ও সংশোধনের চিন্তা করতে পারেননি তারা। আর এটা তাদের সাধ্যাতীতও বটে! জীবনের উত্থান-পতন হয়েছে। মানবতা ভেঙেছে-গড়েছে। আর কবি-সাহিত্যিকরা বসে বসে মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনিয়েছেন। এর উদাহরণ হলো এমন, মানুষ বিভিন্ন সমস্যায় নিপীড়িত। কেউ জ্বলছে। কেউ লড়াই করে মরছে। আরেকজন বাঁশিওয়ালা মিষ্টি সুরে বাঁশি বাজাচ্ছে আর হাঁটছে। হতে পারে লড়াকু যোদ্ধা আর পীড়িত জনরাও তার সুরে কিছুটা হলেও আমোদিত হবে। ভাবের ভোগে শরীক হবে, কিন্তু তারা সেই সুর মূর্ছনায় জীবনের সমস্যা তো পার হবে না! অধিকন্তু তার সুরে সমস্যার জট খোলার কোনো নির্দেশনাও নেই।

তৃতীয় পর্যায়ে ভাবা যায় বিজয়ীদের কথা, যারা তরবারির আঘাতে ঝরে পতাকা, খান খান হয় সিংহাসন, যারা দেশের পর দেশ জয় করে সৃষ্টি করেন ইতিহাসের নতুন ধারা এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা এই বিজয়ীদের প্রতি অনেকটা দুর্বল থাকি। তাদের তালোয়ারের ঝনঝনানি আজও আমাদের কানে বাজে। বাহ্যত তাদের চিৎকার শুনে মনে হয়, তারা মানবতার জন্য অনেক কিছু করেছেন; কিন্তু তাদের ইতিহাস কি তা-ই বলে? তাদের ইতিহাস কি ন্যায় ও ইনসাফের ইতিহাস, না ত্রাস ও নারকীয়তার? সেকান্দরের নাম শুনতেই মানুষের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে তার নির্যাতনের বর্বরতর কাহিনীগুলো। তাই কোনোক্রমে তাকে মানবতার বন্ধু হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। সেকান্দার তো গ্রীক থেকে ভারত পর্যন্ত দেশের পর দেশ উলট-পালট করে দিয়েছিল। শত দেশ, শত জাতি তার অত্যাচারে যাবতীয় শান্তি ও নিরাপত্তা থেকে হয়েছিল বঞ্চিত। তার মৃত্যুর হাজার বছর পরও পতিত-নির্যাতিত জাতিগুলো উঠে দাঁড়াতে পারেনি। তাছাড়া সিজার, চেঙ্গিস খানদের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। পৃথিবীর খ্যাতনামা অন্যান্য বিজয়ীও অনুরূপ জীবনধারায় ছিল বিশ্বস্ত। তাই বিজয়ী যোদ্ধারা হতে পারে স্বীয় জাতি ও দেশের জন্য বন্ধু-পরম বন্ধু; কিন্তু অন্যদের জন্য তো নিঃসন্দেহে আযাব ও বিপদ।

চতুর্থ পর্যায়ে আমরা ভাবতে পারি সেই সব সংগ্রামী জীবন-যোদ্ধাদের কথা-যারা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। এই শ্রেণীটির কথা ভাবতে গেলেই শ্রদ্ধায় অবনত হই আমরা। সন্দেহ নেই তারা তাদের মাতৃভূমির জন্য অনেক কিছুই করেছেন; কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়: যারা অন্য দেশের বাসিন্দা তাদের জন্য কি করেছেন তারা? আপনি নিশ্চয় আব্রাহাম লিংকনের নাম শুনেছেন। আধুনিক আমেরিকার স্থপতি তিনি; কিন্তু তিনি ভারত, মিসর, ইরাকসহ অন্যান্য দেশের জন্য কী করতে পেরেছেন? সন্দেহ নেই, আমেরিকাকে পৃথিবীর এক সুপার পাওয়ার হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন; কিন্তু বিশাল পৃথিবীর জন্য কি গোলামী ও দাসত্বের নব শৃঙ্খল সৃষ্টি হয়নি এতে? আচ্ছা, সা'দ যাগলুলের কথাই ভাবুন! মিসরবাসীদের জন্য এক আশীর্বাদ-পুরুষ। মিসরের স্বাধীনতা বিপ্লবের সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তিত্ব, কিন্তু মিসরীদের জন্য তো তিনি কিছুই করতে পারেননি। মূলত এই জাতিপূজা স্বদেশের জন্য আশীর্বাদ হলেও অন্য দেশ ও জাতির জন্য এক মহাবিপদ! কারণ জাতিপূজা আর জাতীয়তাবাদের মূল প্রেরণাটাই হলো, নিজের জাতির মাথা উঁচু করা আর মাথা নত করা অন্য সকল জাতির। এই প্রেরণা ও বাসনা পূরণ করতে গিয়ে স্বীয় জাতির মাথা উঁচু করতে গিয়ে অনেক সময় অনেক জাতিকে দাসত্বের শেকলে আবদ্ধ করতে হয়! এবং একথা সকলেই জানে!

পঞ্চম পর্যায়ে আমরা ভাবতে পারি আধুনিক বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারকদের কথা। নিঃসন্দেহে তারা জাতিকে অনেক নতুন বিষয় দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় অনেক অভিনব আসবাবপত্র আবিষ্কার করেছেন। তাদের এ সেবা অনস্বীকার্য। কারণ তাদের এসব সৃষ্টি ও আবিষ্কার রীতিমত আমাদেরকে উপকৃত করে। বিদ্যুৎ, বিমান, ট্রেন, রেডিও তাদের অবদান। এজন্য তাদেরকে অনেক শ্রম দিতে হয়েছে এবং মানুষ এসব আসবাবপত্র দ্বারা প্রতিনিয়ত আমোদিত আস্বাদিত হচ্ছে। তারপরও একবার ভেবে দেখুন, শুধু এসব আবিষ্কারই কি মানব ও মানবতার জন্য যথেষ্ট? এসব আবিষ্কারের সাথে যদি সদিচ্ছা না থাকে, ধৈর্য ও সংযম না থাকে, সৃষ্টির প্রতি দরদ ও আন্তরিকতা না থাকে, সেবার মনোভাব না থাকে, এর দ্বারা মানবতার মৌলিক সমস্যা ও চাহিদার সমাধান না হয় তাহলে আপনিই বলুন, এই সৃষ্টি মানবতার জন্যে আশীর্বাদ না অভিশাপ! আমাদের বিজ্ঞানীরা মানবগোষ্ঠীকে নতুন নতুন অনেক কিছুই দিয়েছেন; কিন্তু সেগুলো ব্যবহারের সঠিক চেতনা দিতে পারেননি। এই নব্য আবিষ্কারকে কাজে লাগাবার মত মন ও অনুভূতি দিতে পারেনি তাদেরকে। এসব সৃষ্টি ব্যবহার করে অনাসৃষ্টির সম্ভাব্য পথ পরিহার করার পরামর্শ ও শিক্ষা দিতেও দৈন্যের পরিচয় দিয়েছেন আমাদের বিজ্ঞানীরা! ইতোমধ্যেই আমরা দু'টি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছি। আধুনিক আবিষ্কারের জঘন্য ব্যবহারের প্রদর্শনী আমাদেরকে অনেক অভিজ্ঞতা দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি, চারিত্রিক প্রশিক্ষণ আর আল্লাহ-প্রীতি ছাড়া আধুনিক আবিষ্কার ও সৃষ্টি শুধু অভিশাপই নয়, মানব ও মানবতার জন্য এক মহাত্রাস, ভয়ানক আযাব।

নবীরা কখনও একথা বলেন না, আমি কোনো গুপ্তধনের সন্ধান নিয়ে এসেছি। মানুষের শক্তিকে যাদুর কাঠি বুলিয়ে কাবু করবার মত কোনো চমকও তাঁরা দেখান না। নতুন কোনো আবিষ্কারও তাঁদের স্লোগানের অন্তর্ভুক্ত হয় না। ভূগোল কিংবা খনিজ সম্পদ বিষয়ে বিশেষ কোনো দক্ষতার দাবীও তাঁরা করেন না, বরং তাঁরা বলেন: আমরা এই বিশ্ব জাহানের সৃষ্টিকর্তার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে মানুষকে সঠিক ধারণা দেই-তাঁর দেয়া জ্ঞানের আলোকেই ও আমাদের মাধ্যমেই তাঁকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তাঁরা আরও বলেন, এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা একজন। তাঁরই আদেশ ও ইচ্ছাকল্পে এই পৃথিবী চলছে। এই পৃথিবীর শাসন ও সৃষ্টিতে তাঁর কোনো শরীক নেই। এই পৃথিবীকে লক্ষ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি তিনি এবং তাঁর যাত্রাও উদ্দেশ্যহীন নয়। এই জীবনের পর আরেকটি জীবন আছে যে জীবনে এই জীবনের হিসাব নেয়া হবে। সেখানে ভালো কর্মের পুরস্কার আর মন্দ কর্মের জন্য শাস্তি পেতে হবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে আইন ও বিধান যাঁরা নিয়ে এসেছিলেন এবং যাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ বলে দেন তাঁরাই পয়গম্বর, তাঁরাই রাসূল। তাঁরা সকল দেশে, সকল জাতির কাছেই এই আহ্বান নিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের নির্দেশনা ছাড়া কেউ আল্লাহর পথ অতিক্রম করতে পারে না। তাঁদের এই আহ্বান, এই নির্দেশনা শাশ্বত। তাঁদের মত ও পথে কোনো বিরোধ নেই, দ্বিমত নেই, অথচ দু'জন দার্শনিক কোনো একটা বিষয়ে একমত হতে পারেন না।

পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই পৃথিবীতে আগমন করেন তখনও মানবতার গাড়ি চলছিল। তবে লক্ষ্যহীন। দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কবি-সাহিত্যিক, বিজেতা, শাসক, কৃষক ও ব্যবসায়ী সকলেই ছিল প্রচণ্ড ব্যস্ত। কারোরই মাথা ওঠাবার সুযোগ ছিল না। আপন পেশা ও কর্মে যেন উবু হয়ে পড়ে আছে সকলে! তখন শাসকও ছিল, শাসিতও ছিল। অত্যাচারীও ছিল, অত্যাচারিতও ছিল; কিন্তু তারা জানত না কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তারা খুঁজে দেখেনি কেনই বা তাদের এই পৃথিবীতে পদার্পণ! এই অজ্ঞ লক্ষ্যচ্যুত মানবগোষ্ঠীর কাছেই একজন বিশাল মানবের আগমন হয়। তিনি এসে মানবতার পতাকাবাহীদের জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা বলতো, তুমি মানব জাতির প্রতি কেন এই অত্যাচার করেছ? তাদেরকে তাদের প্রভুর সন্ধানটি পর্যন্ত দাওনি। সারা জাহানের বাদশাহ্ দরবার থেকে টেনে এনে নিজের গোলাম বানিয়ে রেখেছ? কোন্ অধিকারে তুমি অপূর্ণ কিশোর মানবতাকে অন্যায় পথে তুলে দিয়েছ? হে অত্যাচারী চালক! তুমি মুসাফিরকে জিজ্ঞেস না করেই কোন্ দিকে জীবনতরী ভাসিয়ে দিয়েছ?

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহীদের যে স্লোগান উচ্চারণ করেছিলেন তার সুর ও আহ্বানে পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল দর্শন ও সকল চিন্তাই কম-বেশী প্রভাবিত হয়েছে। তিনি সারা পৃথিবীকে জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের প্রভু মাত্র একজন। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করা চরম অপমানের বিষয়। আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদমের সামনে ফিরিশতাদের মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন যাতে আদম সন্তানরা তাদের মাথা আর কারো সামনে নত না করে এবং তারা যেন বুঝতে পারে সৃষ্টির এই মহান গোষ্ঠীর মাথা-ই যখন আমাদের সামনে অবনত, তখন আমরা তো এই পৃথিবীর কারো সামনে নত করতে পারি না আমাদের মাথা। যেদিন থেকে পৃথিবীর মানুষ তাওহীদের এই মর্মকথা শুনেছে সেদিন থেকে 'শিরক' নিজে নিজেই লজ্জায় অবনত হয়েছে। পরাজয় বরণ করেছে নিজে নিজেই। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কণ্ঠে উচ্চারিত তাওহীদ ও একত্ববাদের সুর-ই ভিন্ন। এখানে শুধু আমলের কথাই নয়, বরং এখানে তাওহীদের রয়েছে নিজস্ব ব্যাখ্যা, রয়েছে তার স্বতন্ত্র দর্শন। কারণ তাওহীদ এখন আত্মার গহীনে আশ্রয় পেয়েছে।

অতঃপর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইলম ও বিশ্বাসের সাথে এমন এক শক্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন যাতে সহস্র পুলিস, অযুত-লক্ষ আদালত ও প্রশাসনের চাইতে অধিক ক্ষমতা নিহিত। সে শক্তি আত্মার। সত্যের প্রতি অনুরাগ, মন্দের প্রতি অনীহা আর জবাবদিহিতার আত্মউপলব্ধিই সেই শক্তি। মূলত এই চেতনা, এই শক্তির বরকতে এক সাহাবী পাপ কর্মে জড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনুশোচনায় অস্থির হয়ে পড়েন। কেঁপে ওঠে হৃদয় তাঁর গভীর বেদনায়। দৌড়ে আসেন তিনি নবীজীর খেদমতে। এসে নিবেদন করেন: হে রাসূল! আমাকে পবিত্র করে দিন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চেহারা ফিরিয়ে নেন। তিনি আবার মুখোমুখি দাঁড়ান। আরয করেন: আমাকে পবিত্র করুন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নেন। সাহাবী আবার সামনে এসে দাঁড়ান। প্রিয় নবীজী খোঁজ-খবর নেন। সে আবার মানসিক রোগী নয়তো? জানতে পারেন, লোকটি পূর্ণ সুস্থ। নবীজী তাকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করেন। প্রশ্ন হলো: সে কোন্ শক্তি যা তাকে শাস্তি গ্রহণে উৎসাহিত করেছিল? তিনি কোন্ শক্তি যা তাকে অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য করেছিল?

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীকে এই তিনটি অমূল্য সম্পদ দান করেছেন। বিশুদ্ধ জ্ঞান, দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস আর কল্যাণ ও সৎ কর্মের প্রতি আন্তরিক টান, শক্তিমান আকর্ষণ। আজ অবধি পৃথিবীকে কেউ এর চাইতে দামী কোনো কিছু দিতে পারেননি এবং নবীজীর চাইতে অধিক অনুগ্রহও কেউ করতে পারেননি। পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে অহংকার করা উচিত, আমাদেরই একজন মানুষ এই নিখিল ভুবনে মানবতার মাথা উঁচু করেছেন। আমাদেরই স্বজাতি এক আরব সন্তান গোটা মানব জাতির নাম আলোকিত করেছেন। তিনি যদি আগমন না করতেন তাহলে এ পৃথিবীর কি দশা হতো? আর আমরা মানব জাতির গর্ব-অহংকার করারই কোনো উপায় থাকত কি? নিশ্চয় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত মানব জাতির। তিনি এই পৃথিবীর এক চিরন্তন আলো, মানব জাতির অনন্ত গৌরব। তিনি বিশেষ কোনো জাতির নন, বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের নন, বিশেষ কোনো দেশের সম্পদও নন তিনি। তিনি বরং সমগ্র মানবতার সম্পদ। বিশ্ব মানব জাতির হৃদয়ের ধন তিনি। আজ পৃথিবীর যে কোন দেশের যে কোন নাগরিক অন্তত গর্ব আর অসীম আনন্দভরা কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পারে, আমি সেই মানুষ-যে মানুষরূপে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মতো ব্যক্তিত্ব এই পৃথিবীতে এসেছিলেন।

সমগ্র পৃথিবীর প্রতি তাঁর অনুগ্রহ স্বল্প কোথায়! তিনিই তো সর্বপ্রথম ঘোষণা দিলেন: আল্লাহ্ কোনো বিশেষ জাতি, গোষ্ঠী কিংবা বিশেষ কোনো দেশের নন, বরং আল্লাহ্ সারা জাহানের ও সমগ্র মানবগোষ্ঠীর। যে পৃথিবীতে "আর্যদের খোদা, ইহুদীদের খোদা, মিসরীদের খোদা ও ইরানীদের খোদা" বলে আল্লাহকে সংকীর্ণ বলয়ে আবদ্ধ করে রাখত সেই পৃথিবীতেই তিনি ঘোষণা করলেন: "সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর।" অনন্তর এই ঘোষণাকে সালাতের অংশ হিসেবে নির্বাচন করলেন। এই পৃথিবীতে অনেক দার্শনিক এসেছেন, বিজ্ঞানী এসেছেন, কবি-সাহিত্যিক এসেছেন, যোদ্ধা, দেশ বিজেতা, রাজনীতিক নেতা, আবিষ্কারক কতজনই তো এসেছেন; কিন্তু নবীদের আগমনে পৃথিবীতে যে বসন্ত এসেছে তা কি অন্য কারো আগমনে এসেছে? অনন্তর সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনে পৃথিবীতে সৌভাগ্য, কল্যাণ, রহমত, বরকত, শান্তি ও মানবতার যে ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়েছে তা কি অন্য কারও আগমনে ঘটেছে?! ঘটেনি। কারণ মানবতাকে তিনি যা দিয়েছেন তা আর অন্য কেউ দিতে পারেননি।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 সমকালীন পৃথিবীর প্রতি সীরাতে মুহাম্মদীর পয়গাম

📄 সমকালীন পৃথিবীর প্রতি সীরাতে মুহাম্মদীর পয়গাম


আমাদের সামনে যখন অন্ধকার যুগের নাম আসে, অনায়াসেই তখন চোখের সামনে প্রতিমূর্ত হয়ে ওঠে খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকের সেই তমসাচ্ছন্ন যুগ যাতে বিশ্বনবী (সা.) আবির্ভূত হয়েছিলেন। এটি তাঁর হিদায়েত ও প্রশিক্ষণের সর্বপ্রথম ও উল্লেখযোগ্য মু'জিযা। জাহিলিয়াত শব্দটি শুনতেই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে আরব সম্প্রদায়, তাদের বর্বরোচিত বৈশিষ্ট্য, চরিত্র ও বেপরোয়া চলাফেরার দৃশ্য ঐতিহাসিকগণ যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগ শুধু সে কালের সাথে বিশেষিত নয়, ইসলামের পরিভাষায় ঐ যুগ ওহী ও নববী দিক নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত এবং আম্বিয়ায়ে কেরামের আলোক রশ্মি যেখানে হয়ত পৌঁছেছে, কিন্তু লোকেরা তা থেকে বিমুখ থেকেছে, চাই সেটা খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকের দিগন্তবিস্তৃত বর্বরতা হোক, সাধারণ অন্ধকার যুগ হিসেবে যাকে স্মরণ করা হয় অথবা বিংশ শতাব্দীর দীপ্তিময় আলোকোজ্জ্বল, সভ্য ও অগ্রগতির যুগ হোক, আমরা যা অতিক্রম করছি।

কুরআনে কারীমের ভাষায় ভূমণ্ডলে আলোকরশ্মি একটাই এবং এর উৎসও একটাই। ইরশাদ হচ্ছে "আল্লাহ্ তা'আলা সপ্তাকাশ ও জমিনের আলোকরশ্মি।” তবে আঁধার অসংখ্য অগণিত। যদি আল্লাহ্ তা'আলার আলোকরশ্মির (যা শুধু আম্বিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে বিচ্ছুরিত হয়) দীপ্তি না থাকত, তাহলে থাকত না পৃথিবীতে আঁধারের কোন সুনির্দিষ্ট ঠিকানা, বরং পরিলক্ষিত হতো জীবনের বাঁকে বাঁকে, পরতে পরতে আঁধার আর আঁধার। ইরশাদ হচ্ছে, "অথবা (তাদের কর্ম) প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ, যার ওপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের ওপর এক অন্ধকার যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আল্লাহতা'আলা যাকে জ্যোতি দেন না, তার কোন জ্যোতিই নেই।"

একথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট, পাশ্চাত্য জগতে যেখানে সূর্য উদিত হয় না, অস্ত যায়, নববী আলোর বিম্বের ছোঁয়া লেগেছে খুব কম। এখানে আসমানী আলোক রশ্মি চিত্রায়ণের প্রচেষ্টা করা হয়েছে প্রতিনিয়ত মানব মস্তিষ্কপ্রসূত আলোকরশ্মি দিয়ে। মানবিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে গ্রীস ও রোমানদের সোনালী যুগ নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এক দীপ্ত অধ্যায়; কিন্তু নববী প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনার তুলনায় তা যেন নিষ্প্রভ, তিমিরাবগুণ্ঠিত বর্বর যুগ! আল্লাহ্ তা'আলার যাত, ছিফাতের ব্যাপারে এখানে কোন আলোকরশ্মি ও দিকনির্দেশক ছাড়াই শুধু যুক্তির ঘোড় দৌড়ানো হয়েছে। “এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু আন্দাজের অনুসরণ করে।" বিজ্ঞান ও দর্শনের যে ম্যাজিক তারা বিস্তৃত করেছে, তা কল্পনাপ্রসূত ও বিস্ময়কর।

এতদসত্ত্বেও এ বাস্তবতাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে পাশ্চাত্যে আল্লাহ্ তা'আলায় বিশ্বাস পরকালের চিন্তা-চেতনা খৃস্টবাদেরই অনিবার্য ফল আসমানী ধর্ম যতই রূপান্তরিত হোক, আল্লাহ্ পরকালের কল্পনা শিরায় শিরায় থাকে প্রবাহিত। খৃস্টীয় পনের ও ষোড়শ শতকে ইউরোপে যৌক্তিকতা তথা বস্তুবাদ ও ইন্দ্রিয় পূজার যে বিপ্লব সৃষ্টি হলো, পাশ্চাত্য জগতকে তা দিবালোকে লাগিয়ে দিল জড়পূজায়। ধীরে ধীরে ইউরোপ হয়ে উঠল জড়পূজারী। তাদের জীবনধারা এমন ছাঁচে ঢালা, যাতে না আছে আল্লাহ্, না পরকাল। আজ একথা বলা বিলকুল যথার্থ, ইউরোপের ধর্ম খৃস্টবাদ নয়, বরং বস্তুবাদ।

আল্লাহ্ বিস্মৃতির দ্বিতীয় পরিণাম হলো আত্মবিস্মৃতি। কোরআন কারীম এ বাস্তব সত্যটির বিবরণ দিয়েছে, "আল্লাহ্ বিস্মৃতির শাস্তি আত্মবিস্মৃতি"- ইরশাদ হচ্ছেঃ “তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে যায়। অন্যথায় আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে আত্মবিস্তৃত বানিয়ে দেবেন।” বিংশ শতাব্দীর মানুষ আত্মবিস্মৃতির পরিপূর্ণ মডেল। সে বেমালুম ভুলে গেছে তার মূল সত্তা, ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য, জীবনের ও জন্মলাভের মূল উদ্দেশ্য। অবলম্বন করেছে সে পশুসুলভ জড়বাদী জীবন যাপন। রূপান্তরিত হয়েছে সে টাকা তৈরির মেশিনে। এক পশ্চিমা লেখক এর বাস্তবতাকে সুস্পষ্টরূপে স্বীকার করে বলেছেন: আমাদের বিস্ময়কর শৈল্পিক বিজয় ও লজ্জাকর ছেলেমানুষী চরিত্রে যে ব্যবধান, এর কারণে আমাদের জীবনের বাঁকে বাঁকে জন্ম নিচ্ছে প্রচুর সমস্যা। চড়ুই পাখির মত তোমরা আকাশে উড়তে জান, মৎস্যরাজির মত পানিতে সাঁতরাতে জান, কিন্তু এখনও মানুষের মত পৃথিবীতে চলতে জান না।

পরকাল অস্বীকৃতি কিংবা পরকাল বিস্মৃতির পর আমোদ-প্রমোদ ও উপভোগের এ আবেগ, আমরা মুসলমান যাকে ছেলেমী মনে করি, পরকাল অস্বীকৃতি হিসেবে হুবহু ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি। যারা এ জীবনের পর আরেকটি জীবন আছে তা ভাবতে পারে না তারা কেন ত্রুটি করবে- এ জীবনের স্বাদ উপভোগে, আত্মার দাহ নেভাতে। এ যেন জীবনের এক তীব্র তৃণা, যা নির্বাপিত হবার নয়! এক প্রচণ্ড ক্ষুধা, যা নিবারণ হবার নয়। দিন দিন বাড়তে লাগল জীবনের প্রয়োজন। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মুকাবেলা এতে মদদ যুগিয়েছে।

পরকাল অস্বীকৃতির দ্বিতীয় স্বাভাবিক পরিণাম হলো, দুনিয়ার উপকরণ ও তার কর্ম অত্যধিক সুসজ্জিত, বিবেকসম্মত ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়। জন্ম নেয় বস্তুবাদী মানসিকতা ও স্থূল দৃষ্টি, বাস্তবতা পর্যন্ত যা পৌঁছাতে পারে না। ইরশাদ হচ্ছে, "যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, আমি তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকাণ্ডকে সুশোভিত করে দিয়েছি। অতএব তারা উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।”

পরকাল অস্বীকৃতির এক বিশেষ গুণ হলো, অহংকার আখেরাত অস্বীকারকারীর দাম্ভিক হওয়ার অন্তরায় হয় না। কোন কিছু যে তার চেয়ে বড় কোন শক্তিধর, এ জীবনের পর অন্য কোন জীবন ও প্রতিদান দেবার প্রতি বিশ্বাস রাখে না, তাকে এক লাগামহীন উদ্ধত মানুষ হওয়া থেকে রুখতে পারে কিসে? এরূপ পরজীবন অস্বীকারকারী, বস্তুবাদী সম্প্রদায়ের হিংস্র থাবা, তাদের অত্যাচারী পাকড়াও এবং তাদের বিজয় যেন এক ভয়াবহ ভূমিকম্প, যা শহরের পর শহর, দেশের পর দেশকে উলট-পালট করে দেয়।

অনুরূপ পাশ্চাত্যবাসীরা রাসূল (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনয়নের দৌলত থেকে বঞ্চিত। যদিও তারা হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে মেনে নিয়েছে কিন্তু তারা তাঁকে জীবনাদর্শ ও অনুসরণীয় রাসূল হিসাবে কার্যত মেনে নেয়নি। খৃস্ট সম্প্রদায় তাদের বাস্তব জীবন মুক্ত করে নিল হযরত ঈসা (আ.)-এর নেতৃত্ব ও গির্জার তত্ত্বাবধান থেকে। জীবন যাপন করতে লাগল বাধাবন্ধনহীন যেন তারা কোন নবীর উম্মত নয়। তারা জাগতিক উপকরণ সঞ্চয় করেছে প্রচুর। কিন্তু কল্যাণপ্রবণতা তো অর্জিত হয় শুধু আম্বিয়ায়ে কেরামের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও সংশোধনেই।

বিগত যুদ্ধ সমাপ্তির পর মাস্টার লয়েড জর্জ বলেছিলেন, "যদি হযরত মাসীহ (আ.) এ ধরায় আগমন করেন তো বেশি দিন বাঁচবেন না।” লক্ষণীয় বিষয় হলো, দু' হাজার বছর পরও মানুষ ফেৎনা-ফাসাদ, রক্তপাত, হত্যা, লুণ্ঠনে নিয়মিত জড়িত, বরং ভয়াবহ এখন তো মানবতার প্রতিবিম্ব থেকে, ইতিহাসের সবচেয়ে মহাযুদ্ধের প্রভাব থেকে ঝরছে তপ্ত খুন লহরী। কী দেখবেন হযরত এসে? ভ্রাতৃত্ববোধে পরস্পর হাত মেলাতে? না তার বিপরীত সেই মহাযুদ্ধের চেয়ে বড় ধ্বংসাত্মক, বেদনাদায়ক যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে? মানুষের কুপ্রবৃত্তির অবস্থা বর্ণনায় ঘোষিত হয়েছে, "তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গেল এবং শয়তান তাদের কাছে সুশোভিত করে দেখাল, যে কাজ তারা করছিল।"

আজ থেকে সাড়ে তের শ' বছর পূর্বের সভ্য জগত রোম ও ইরান তথা প্রাচ্যের সম্রাটদের হাতে ছিল যার দিক নির্দেশনা, তা আজকের জগতের সাথে প্রায়ই মিলে যায়। মানুষ আল্লাহকে ভুলে গিয়ে আত্মবিস্মৃতিতে নিমজ্জিত হয়েছিল। জগত জুড়ে এক আল্লাহ্র পরিবর্তে বহু খোদার পূজা, উপাসনার মায়াজাল বিস্তৃত ছিল। শাসকগোষ্ঠী লিপ্ত ছিল নির্যাতন, নিপীড়ন, বলাৎকার, অন্যায়ভাবে বল প্রয়োগ করে রাজত্ব পরিচালনা, মানুষকে কষ্ট দেয়া ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগতকরণে। ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল আমীরগণ।

তৎকালে ঐ সভ্য জগতের (যাতে ঘুণে ধরেছে সম্পূর্ণরূপে) ভিন্ন কিন্তু একেবারেই নিকটবর্তী, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী উভয় সম্রাটের ঠিক মাঝখানে উম্মীদের মাঝে আল্লাহ্ তা'আলা আবির্ভাব ঘটালেন এক উম্মী নবীর। তিনি যেন শতাব্দীভর নিপতিত শাস্তি থেকে উদ্ধার করেন জগতকে। সপ্তম হিজরী সনে নবীয়ে উম্মী (সা.) মদীনা থেকে রোম সম্রাট বরাবর একটি বার্তা পাঠালেন যাতে দাওয়াত ছিল এই, “হে আহলে কিতাবগণ! একটি কালেমা-বিষয়ের দিকে আস, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না।"

হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) ইরানের প্রতাপী সেনাপতি আমীর রুস্তমের আহ্বানে হযরত রাবয়ী ইবনে আমের (রা.)-কে দূত হিসেবে পাঠালেন। হযরত রাবয়ী (রা.) রাজদরবারে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, শরীরে মোটা মোটা পরিচ্ছদ, হাতে নাঙ্গা তালোয়ার, ঢাল। রুস্তম জিজ্ঞেস করলঃ এদেশে কি উদ্দেশে আপনার আগমন? তিনি জবাব দিলেন অত্যন্ত বলিষ্ঠ জবাব: আল্লাহ্ তা'আলা এক মহৎ কাজের জন্য আমাদেরকে নিয়োজিত করেছেন। তা হলো, আমরা তাঁর নির্দেশে তাঁর বান্দাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহ্র বন্দেগীতে, পার্থিব সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে প্রশস্ততায়, ধর্মের নামে রকমারি নির্যাতন নিপীড়ন থেকে উদ্ধার করে ইসলামের ন্যায়নীতির ছায়াতলে প্রবেশ করাতে তিনি আমাদেরকে স্বীয় ধর্মসহ মাখলুকের প্রতি পাঠিয়েছেন।

রুস্তম বলল: আপনি কি মুসলমানদের সরদার? হযরত রাবয়ী বললেন: না, সমস্ত মুসলমান এক শরীরসদৃশ। তাদের মধ্যে সর্বনিম্ন জনেরও সর্বোচ্চ জনের মুকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার আছে।

হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) এক রোমীয় রাজদরবারে দূত হিসেবে গেলেন। রাজদরবারে সোনালী কিংখাবের ফরশ বিছানো ছিল। হযরত মুয়াজ (রা.) জমিনে বসে গেলেন এবং বললেন: আমি এমন বিছানায় বসতে চাই না, যা গরীব অসহায়দের অধিকার হরণ করে তৈরি করা হয়েছে। খৃস্টানগণ বলল: আমরা তোমাকে সম্মানিত করতে চাচ্ছিলাম। হযরত মুয়াজ (রা.) বললেন: তোমরা যাকে সম্মান মনে করো, আমার তার পরোয়া নেই। যদি জমিনে বসা দাসদের অভ্যাস হয়ে থাকে, তাহলে আমার চেয়ে আল্লাহ্ বড় দাস আর কে?

এসব সংশোধন, অগ্রগতি, আল্লাহ্ তা'আলাকে একক উপাস্য মেনে নেয়া, নিজেকে তাঁর সমীপে অর্পণ করা এবং এক নিষ্পাপ নবীর তত্ত্বাবধান ও লালন-পালনে নিজেকে সোপর্দ করার অনিবার্য ফল। এ দ্বারা যেন তার জীবনধারা তার আসল ছাঁচে মিলে গেছে। এসে গেছে প্রত্যেকে তার স্ব স্ব স্থানে। যারা ছিল পশুর গুণে গুণান্বিত, তারা বিভূষিত হলো ফেরেস্তার ভূষণে। যারা ছিল লুণ্ঠনকারী ডাকাত, তারাই রক্ষাকারী হয়ে গেল অন্যের সম্পদ, সম্মান, জীবন সম্ভ্রমের। তাদের অন্তরে যে ঈর্ষা, দ্বেষ, ক্রোধ ছিল তা দূর হয়ে গেল।

ষোল শতাব্দীতে যখন তাদের আঁখিযুগল খুলল, কল্পনায় ভেসে উঠল তখন তাদের সমস্ত বিপর্যয়ের চিকিৎসা হলো গির্জার গোলামী থেকে মুক্তি লাভ করা। কিন্তু 'লা-ইলাহা'-এর পুরো মনযিল তারা অতিক্রম করেনি তখন। বিংশ শতাব্দীর জগতের প্রতি, যার নেতৃত্ব আজ পাশ্চাত্যের হাতে—সীরাতে মুহাম্মদীর মৌলিক বার্তা হলো, "হে আল্লাহ্ থেকে পলায়নকারি! আল্লাহ্র দিকে ধাবিত হও। তাঁকে ছাড়া কাউকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করো না।"

অতএব, তোমরা আল্লাহুর দিকে ধাবিত হও। আমি তার তরফ থেকে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট সতর্ককারী। তোমরা আল্লাহ্র সাথে কোন উপাস্য সাব্যস্ত করো না। হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রেরিত হওয়ার পর ব্যক্তি, সম্প্রদায়, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, প্রাচীন-আধুনিক-সকলের জন্য আল্লাহ্ তা'আলার ফয়সালা হলো, সৌভাগ্য ও সফলতা তাঁর আদর্শ অনুকরণেই নিহিত। দুর্ভাগ্য, ধ্বংস, বঞ্চনা আর অকৃতকার্যতা তাঁকে বর্জনেরই অনিবার্য পরিণাম।

সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00