📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 হেরা গুহার আলো

📄 হেরা গুহার আলো


আমি জাবালে নূরে আরোহণ করলাম। এই নূর পর্বতের সেই বিখ্যাত গুহাটিতে গিয়ে দাঁড়ালাম যার নাম হেরা গুহা। এখানে দাঁড়িয়ে আমি আমার মনকে বললাম, এই সেই গুহা যেখানে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয়তম রাসূলকে নবুওয়াত দান করেছিলেন। এই সেই গিরিকন্দর যেখানে তাঁর প্রিয় নবীর প্রতি সর্বপ্রথম ওহী নাযিল করেছিলেন। সুতরাং যথার্থভাবেই বলা যায়, যে সূর্যের বিমল কিরণ সারা জাহানকে আলোকিত করেছিল সেই সূর্যের প্রথম উদয় হয়েছিল এইখানে। অতঃপর পৃথিবী লাভ করেছিল নব জীবন।

এই পৃথিবী প্রতিদিনই একটি নতুন প্রভাতকে আলিঙ্গন করে, স্বাগত জানায়। কিন্তু সাধারণভাবে পৃথিবী তার এই নতুন প্রভাতে কোন নতুনত্ব পায় না, কোন চমক খুঁজে পায় না। খুঁজে পায় না নতুন প্রভাতে নতুন কোন সৌভাগ্যের পরশ। তাই নতুন প্রভাতের আগমনে পৃথিবীর অধিবাসীরা জেগে ওঠে। তারা ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসে কিন্তু তাদের অন্তরনিদ্রা ভাঙ্গে না। অলস নিদ্রায় ডুবে থাকে তার অন্তরাত্মা। এই নিদ্রার কোন শেষ নেই। এই মিথ্যা প্রভাতেরও কোন অন্ত নেই, অথচ এই গিরিকন্দর থেকে যে প্রভাত সূচিত হলো, হেরা গুহার এই গর্তে যে সূর্যের উদয় হলো সে ছিল এক ভিন্ন প্রভাত, বরং সে ছিল এক সুবহে সাদিক যার আলোয় উজালা হলো সারা জগত। জাগৃতি এল সব কিছুতে, এই প্রভাতেই ইতিহাস খুঁজে পেল নতুন মোড়, নতুন পথ। নতুন রাঙিয়ে রোল উঠল পৃথিবী, যুগ। সত্যিকার অর্থে এটাই ছিল এক নতুন সকাল।

এই প্রভাতের আগে মানবতার স্বভাবজাত উন্নতি থেমে গিয়েছিল। উন্নতির সব পথ ছিল তালাবদ্ধ। মানব উন্নয়ন ও বিকাশের সব দরজা রুদ্ধ ছিল। মানুষের বিবেকগুলোও ছিল তালা মারা। সে সময়ের চিন্তাবিদ দার্শনিকরা বিবেকের সেসব জট খুলতে পারেন নি। মানুষের হৃদয়ের তালা ঝুলছিল। ওয়ায়েজ, সাধক, সংস্কারকরা সেই তালাও খুলতে পারেন নি। মানুষের প্রতিভাগুলোও ছিল তালাবদ্ধ। সমকালীন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সমাজ ব্যবস্থা কোনটাই সেই তালা খুলতে সাহস করেনি, সক্ষম হয়নি। সেকালের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশেষ কোন অর্থবহ ছিল না। সেকালের বিদ্বান, শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষকমণ্ডলীও এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অর্থবহ করতে অক্ষম ছিলেন। আদালতের স্থান প্রাঙ্গণ ছিল ঠিকই। কিন্তু ইনসাফের দরজা ছিল বন্ধ। অসহায় ফরিয়াদীর কান্না শোনার সেখানে কেউ ছিল না। বংশ ও দ্বন্দ্ব নিরসনে ছিল অসহায়। শাহী দরবারগুলোর দরজা ছিল অনেক উঁচুতে। মেহনতী কিষাণ, অসহায় দিনমজুর আর নির্যাতিত প্রজারা সেই দরজা পর্যন্ত কোনক্রমেই পৌঁছতে পারত না। ধনকুবের আর বিত্তবানদের দরজা ছিল তালাবদ্ধ। নিঃস্বজনদের ক্ষুধা তাদের স্ত্রীদের নাঙ্গা বদন আর দুগ্ধপায়ী শিশুদের কান্নার অবিরাম আর্তনাদও বিত্তবানদের দরজা খুলতে পারেনি।

অনেক বড় সংস্কারক কঠিন প্রত্যয় ও অঙ্গীকার নিয়ে ময়দানে পদার্পণ করেছেন। অনেক বড় আইনপ্রণেতা পাহাড়সম হিম্মত ও স্বপ্ন নিয়ে ময়দানে এসেছেন। কিন্তু তারা জীবন সংসারের এই অসংখ্য তালা থেকে একটি তালাও খুলতে পারেন নি। কারণ এসব তালার প্রকৃত চাবি তাদের হাতে ছিল না। এই চাবি হারিয়ে গিয়েছিল অনেক আগে। আর তালাতো তার নিজস্ব চাবি ছাড়া খোলা যায় না।

তারা তাদের নিজেদের তৈরী চাবি দ্বারা অবশ্য খোলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই চাবি তালায় বসাতেই পারেন নি। অনেকে আবার তালাগুলোই ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছেন। কিন্তু তালা ছিল এত শক্ত, উল্টো তাদের আসবাবপত্রই গুঁড়িয়ে গেছে। আহত বিক্ষত হয়েছে তাদের হাত।

ঠিক এই সময় সভ্য জগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বাহ্যত হতমান গুমনাম ছোট্ট একটা পর্বতের ওপর মহান প্রভু হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে রিসালাতের মহামহিম মর্যাদায় ভূষিত করলেন; আর বিশ্বমানবতা ফিরে পেল শত শত বছরের হারানো সেই চাবি যে চাবির অভাবে পৃথিবীর সেই কঠিনতম গ্রন্থিকে পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিক, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক মিলেও উন্মোচন করতে পারেন নি; যে সমস্যার জট খুলতে পারেনি পৃথিবীর নামী দামী দেশের সকল রাজধানী। আর সেই চাবি হলো ঈমান। আল্লাহর প্রতি ঈমান, রাসূলের প্রতি ঈমান, আখিরাতের প্রতি ঈমান।

মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.) 'গারে হেরা' হেরা গুহা থেকে এই চাবি নিয়ে নেমে আসলেন মানুষের সমাজে। শতবর্ষের তালাবদ্ধ সকল দরজা এক এক করে খুলে দিলেন তিনি। জীবনের সকল কপাট খুলে গেল। বদ্ধতার বদলে সর্বত্র পরিলক্ষিত হলো মুক্তি।

তিনি যখন নবুওয়াত ও রিসালাতের এই চাবিটি তালাবদ্ধ বিবেকের ওপর রাখলেন তখন বিবেকের সব গ্রন্থি আলগা হয়ে গেল। বিবেকের সকল বক্রতা, প্যাঁচ ও জটিলতা কেটে গেল। তার চিন্তায় উদ্যম এল। এখন সে তার নিজের ভেতর ও আবিশ্ব পৃথিবী ও সুউচ্চ আকাশমণ্ডলীতে আল্লাহর অসীম কুদরত দেখতে পায়। সৃষ্টির বিচিত্র লীলায় ডুবে সে আবিষ্কার করে তার সৃষ্টিকর্তাকে। শত পূজ্যের পর্দা ভেদ করে আবিষ্কার করে নূরময় এক অদ্বিতীয় সত্তাকে। সে এখন মুক্ত বিবেক। তার চিন্তায় এখন শিক মূর্তিবজন আর ধারণাপ্রসূত পূজাপাটের কানাকড়ির দাম নেই, অথচ ইতোপূর্বে বিবেক এসব বিষয়ে অনুপ্রবেশ করার সাহসই করেনি, বরং শত শত বছর ধরে সে তার আসল থেকে বঞ্চিত বিতাড়িত ছিল। বিবেক ছিল বিবেকশূন্য।

এই চাবির পরশে মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.) মানুষের আত্মার তালা খুলে দিলেন। জেগে উঠল তখন ঘুমন্ত হৃদয়। তার মৃত অনুভূতি ও চেতনায় চাঞ্চল্য এল। জীবন এল সবখানে। আত্মার বাধা-নিষেধ থেকে মুক্ত যে নফস এতদিন কেবল মন্দ কাজের আদেশ দিত, এখন আত্মার সক্রিয় সঞ্চালনে সেই নফস-ই হলো নাফসে লাওয়ামা। এখন আর সে মন্দ কাজের আদেশ করে না, বরং মন্দ কাজের তিরস্কার করে, নিন্দাবাদ করে। অবশেষে দেখতে দেখতে সেই নাফস-ই বনে গেল নাফসে মুতমাইন্না। এখন আর সেখানে অন্যায় প্রবেশের কোন পথ নেই। অপরাধ এখন তার জন্যে চূড়ান্ত অসহ্য যার ফলশ্রুতিতে এখন পাপী নিজেই মুহাম্মদুর রাসূল (সা.)-এর দরবারে এসে স্বীয় পাপের স্বীকৃতি জানিয়ে জীবনের কঠিনতম শাস্তি প্রার্থনা করে নিজেরই বিরুদ্ধে।

এক গোনাহগার নারী! নবীজীর দরবারে এসে পাথর মারার শাস্তি প্রার্থনা করেছেন নিজের বিরুদ্ধেই। রাসূল (সা.) শরীয়তসম্মত কারণেই তাঁর শাস্তি বিলম্বিত করেন। তিনি চলে যান তাঁর গ্রামের নিবাসে, অথচ তাঁর প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্যে কোন সিআইডি নেই। তাকে পুনর্বার দরবারে উপস্থিত করার জন্যে কোন পুলিসও নেই। কিন্তু তিনি যথাসময়ে মদীনায় উপস্থিত। উপস্থিত হয়ে শাস্তি লাভের জন্যে রীতিমত পীড়াপীড়ি, অথচ সেই শাস্তি মৃত্যুর চাইতেও ভয়াবহ কঠিন!

ইরান এখন বিজিত হলো তখনকার কথা! এক গরীব ফৌজী! তার হাতেই এসে পড়েছে কিসরার মুকুট। সময়ের সবচে' দামী সম্পদ। তিনি কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে সেই মুকুট পৌঁছে দিচ্ছেন আমীরের খেদমতে। গোপনে দিচ্ছেন এই কারণে, যাতে আমানত আদায় হয় যথাযথভাবে আবার তার আমানতদারীরও প্রদর্শনী না হয়।

মানুষের হৃদয়গুলোতেও তালা ঝুলছিল। শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা ছিল না তাতে। আল্লাহর ভয়ও ছিল না। প্রাকৃতিক কোমলতা ও আর্দ্রতা কিছুই ছিল না। কিন্তু যখন তিনি তাঁর নবুওয়াতী চাবি বুলিয়ে দিলেন মুহূর্তে বদলে গেল হৃদয়ের অবস্থা। অতি সামান্য ঘটনা থেকেও বিরাট বড় শিক্ষা গ্রহণ করে। স্বীয় সত্তা ও পৃথিবীব্যাপী ব্যাপ্ত যে কোন নিদর্শনই তাদের বিশ্বাস ও আত্মায় শক্তি যোগায়। নির্যাতনের বেদনাবিধুর দশা তাদের অন্তরে যাতনার ঝড় তোলে। এখন আর তারা অসহায় গরীব-দুঃখীকে ঘৃণা করে না, তাচ্ছিল্য করে না, বরং ভীষণভাবে ভালবাসে।

মানুষের সুপ্ত বন্ধ্যা প্রতিভায় যখন আঘাত করল এই চাবি, তখন এতদিন মানুষের অনিষ্ট সাধনে ঘর্মক্লান্ত প্রতিভাই হঠাৎ করে আভাময় হয়ে উঠল। প্রচণ্ড সয়লাবের মত তরঙ্গময় হয়ে উঠল তাদের সুপ্ত লুপ্ত সব শক্তি ও প্রতিভা। দিকভ্রান্ততার অন্ধকার থেকে উঠে এসে শুদ্ধ পথের যাত্রী হলো। ফলে এতোদিন যারা বকরী ভেড়ার ফেরী করে ফিরত তারাই এখন জাতির কর্ণধার হলো, জাতি থেকে বিশ্ব পর্যায়ের নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করল তারাই। যিনি ইতোপূর্বে একটি গোত্র কিংবা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন কিংবা ছিলেন খ্যাতনামা এক অশ্বারোহী যুবক, এখন তার নেতৃত্বেই দেশের পর দেশ জয় হতে লাগল, শক্তি ও দর্পে আকাশছোঁয়া খ্যাতির অধিকারী রাষ্ট্র ও শক্তি নত মস্তকে পরাজয় স্বীকার করতে লাগল তারই সম্মুখে।

তিনি এই চাবি দ্বারা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালাও খুলে দিলেন। তালা খুলে দিতেই সেখানে সাড়া জাগল নব জীবনের। অণুতে-পরমাণুতে দোলা জাগল নতুন সাধের, নতুন স্বপ্নের, অথচ ইতোপূর্বে এখানে স্তূপ পড়েছিল বরফের। বিদ্যার উষ্ণতা না প্রতিষ্ঠানে ছিল, না ছিল শিক্ষকদের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কোন আকর্ষণ ছিল না। আন্তরিকতা কিংবা আদৌ উন্মাদনা ছিল না কোথাও। তিনি (সা.) জ্ঞান-বিদ্যার মর্যাদার কথা সকলকে বললেন। জ্ঞানীদের মহান মর্যাদা ও সম্মানের কথা তুলে ধরলেন সকলের সামনে। ইসলাম ও বিদ্যার পারস্পরিক সম্পর্কের কথাও বললেন। তখন সকলেই বিদ্যার প্রতি ইল্ম ও জ্ঞানের প্রতি প্রচণ্ড অনুরাগী হয়ে উঠল। তাদের ঝোঁক সৃষ্টি হলো বিদ্যা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি। তারা সক্রিয় সচেষ্ট হলো। দেখা গেল মুসলমানদের প্রতিটি নিবাস প্রতিটি মসজিদ একটি মাদরাসায় একটি বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রত্যেক মুসলমানই একজন শিক্ষার্থী এবং অন্যের জন্যে একজন শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। কারণ ইসলামে জ্ঞানার্জনের মর্যাদা অসীম।

আদালতের রুদ্ধ কপাট খুলে দিলেন তিনি এই চাবি দিয়েই। আদালতের বদ্ধ কপাট খুলে যেতেই সেখানকার সকল বিচারক ন্যায়বান বিশ্বস্ত বিচারকে পরিণত হলো। তাদের মধ্যে ন্যায় ও ইনসাফের অনুভূতি ব্যাপ্তময় হয়ে উঠল। মুসলমানগণ কেবলই সত্যের খাতিরে সত্য সাক্ষ্য দেয়াটা নিজেদের কর্তব্য বলে ভাবতে লাগল। আল্লাহ্ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস যখন প্রতিষ্ঠিত হলো তখন ইনসাফ ও নীতির উচ্চারণ এমনিতেই সমুন্নত হলো। আল্লাহ্ ও ঈমানের অনুভূতি যখন জাগ্রত হলো তখন অন্যায়-অবিচার ও মিথ্যা সাক্ষ্য সবই বিলীন হয়ে গেল।

মানুষের সামাজিক লেনদেন তো রসাতলে গিয়েছিল! পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, এমন কি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও ব্যবধান ছিল বিস্তর। বিভেদ, স্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রিক লাভ-লোকসানের এই দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা সমাজের সর্বত্র ঘনায়মান ছায়ার মত বিস্তার করেছিল। সর্বত্রই ছিল কেবল আত্মস্বার্থ। কিছু খরিদ করলে সাড়ে ষোল আনায় বুঝে নিতে আলসেমি করত না। আর দিতে গেলে ভাবত কেবল ঠকাবার কথা। পবিত্র কুরআনে এর বিবরণ দেয়া হয়েছে এভাবে:
"তারা যখন অন্যের কাছ থেকে গ্রহণ করে তখন পরিপূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন মেপে দেয় তখন দেয় পরিমাণে কম।"

মুহাম্মদ রাসূল (সা.) তাঁর নববী চাবির ছোঁয়ায় সমাজের এই ভয়ানক বদ্ধতা ও সংকীর্ণতাও খুলে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে গভীর ঈমান, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার দীপ্ত প্রত্যাশা, পরকালের প্রতি ভরাট কামনা ও শংকায় তাদের ভেতরগুলো পূর্ণ করে দিয়েছেন। তাদেরকে শুনিয়েছেন আল্লাহর বাণী:
“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদের সকলকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গিনীকে এবং সেই যুগল থেকেই ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রচুর নারী ও পুরুষ। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যার উসিলা নিয়ে তোমরা পরস্পরে যাঞ্চা কর এবং আত্মীয়তার প্রতি লক্ষ্য রেখ। নিশ্চয় আল্লাহতা'য়ালা তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।" [সূরা নিসা : ১]

তিনি সমাজের প্রতি পরিপূর্ণ দৃষ্টিপাত করলেন। সমাজের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি কিছু দায়িত্ব আরোপ করলেন এবং এভাবেই তিনি পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজালেন। প্রতিষ্ঠিত করলেন পূর্ণাঙ্গ ন্যায়, ইনসাফ, প্রেম-প্রীতি ও সততার ওপর। অধিকন্তু তিনি মানব সমাজকে করে তুললেন নীতিসচেতন। সমাজের প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সততা ও আমনতদারির গভীর অনুভূতি ও আল্লাহভীতির এমন শিকড়স্পর্শী চেতনা জাগ্রত করে তুললেন, সমাজের নেতৃশ্রেণী পর্যন্ত সাচ্চা পরহেজগার ও সরল জীবনের উন্নত নমুনায় রূপান্তরিত হলো। সমাজের নেতারা নিজেদেরকে সমাজের সেবক মনে করতে শুরু করেছে। সরকারপ্রধানরা নিজেদেরকে একজন এতীমের অভিভাবকের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারতেন না। নিজের ব্যক্তিমালিকানায় কিছু থাকলে সরকারী সম্পদের প্রতি কখনোই হাত বাড়াত না। তাও না থাকলে বেঁচে থাকার মত সামান্য ভাতার ওপরই তুষ্ট থাকত। এভাবেই রাজা-বাদশাহ ও ধনবান ব্যবসায়ীদের মধ্যে পার্থিব সব কিছুর প্রতি বিরাগ আর পরকালের প্রতি অগাধ অনুরাগ সৃষ্টি হয়। তিনি তাদেরকে বলেছেন: সম্পদের প্রকৃত মালিক তো আল্লাহ। তিনি খরচ করবার জন্যে তোমাদেরকে তাঁর প্রতিনিধি করেছেন মাত্র। ইরশাদ হয়েছে:
"আল্লাহ্ তার সম্পদে তোমাদেরকে যে প্রতিনিধিত্ব দিয়েছেন তোমরা তা থেকে খরচ কর।" [সূরা হাদীদ : ৭]

"আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন তা থেকে অসহায় লোকদেরকে দান কর।" [সূরা নূর]

আর যারা আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করে না, সম্পদ সঞ্চিত গচ্ছিত করে রাখে, তাদেরকে হুঁশিয়ার করেছেন এভাবে:
"আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে। সেদিন বলা হবে, এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার।" [সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫]

রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় পয়গাম ও দাওয়াত দ্বারা যাদেরকে গড়ে তুলেছিলেন তারা যখন সমাজ প্রাঙ্গণে অবতীর্ণ হলেন তখন তাদের মধ্যে ছিল আল্লাহর প্রতি খাঁটি বিশ্বাস, সত্যের প্রতি অসীম প্রেম, আল্লাহর প্রতি সীমাহীন ভালবাসা, আমানত ও সত্যবাদিতার পতাকাবাহী, আখিরাতের জন্যে পার্থিব সব বিসর্জন দেয়ার প্রগাঢ় ক্ষমতা ও বস্তুর ওপর বিজয়ী আত্মিকতা। অধিকন্তু তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, এই পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে সকলই আমাদের জন্যে। কিন্তু আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে শুধুই পরকালের জন্যে।

এ কারনেই তারা যখন ব্যবসার ময়দানে অবতরণ করতেন তখন তারা পরিপূর্ণ ঈমানদার ও সত্যবাদী বলেই প্রমাণিত হতেন। মজদুরী করলে তাতেও নেহাৎ মেহনতী ও নিষ্ঠাবানের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতেন। তাদের কারো কাছে বিত্ত থাকলে সেই সাথে আন্তরিকতা, দয়া ও দানশীলতাও সঞ্চিত থাকত। তাদের কেউ গরীব হলে একান্ত বিপদ ও ঝুঁকির মুহূর্তেও তারা আত্মমর্যাদাকে আহত করতেন না। আর বিচারকের চেয়ারে অধিষ্ঠিত হলে উপলব্ধি, বিশ্বাস ও ন্যায়পরায়ণতার প্রমাণ অবশ্যই রেখে যেতেন। রাজত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হলে সেখানে অবশ্যই চিত্রিত হতো এক নিঃস্বার্থ নিষ্ঠাবান শাসকের আলোকিত রূপ। মালিক ও মনিব হলে তারা হতেন দয়ার্দ্র কোমলমনা মালিক ও মনিব। চাকর হলে তার প্রতিটি পদক্ষেপে ঝরে পড়ত চঞ্চলতা, সততা ও আনুগত্য। জাতির সম্পদের রক্ষক নিযুক্ত হলে সেখানে দিতেন একান্ত জাগ্রত সচেতন এক বিজ্ঞ রক্ষকের পরিচয়।

মূলত এদের ইট-পাথর দিয়েই নির্মিত হয়েছিল ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার সৌধ। এর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি। এ কারনেই সেকালের সমাজ ও রাষ্ট্র ছিল নাগরিকদের চরিত্র-স্বভাবের এক উন্নত বিকাশালয়। সদস্যের ভিন্ন ভিন্ন গুণের সুন্দর সমন্বয় ঘটেছিল সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে। সেখানে ব্যবসায়ীর সততা ও বিশ্বস্ততা ছিল। গরীব অসহায় জনদের আত্মমর্যাদাবোধ ও ক্লেশ সহ্য করার চিত্র সেখানে ছিল। মজদুরের পরিশ্রমী মন ও কল্যাণকামিতা ছিল। ধনবানদের বদান্যতা ও সহমর্মিতার রূপরসও ছিল সেখানে। সেখানে বিচারকের বিচক্ষণতা ও ইনসাফ ছিল। শাসকের নিষ্ঠা ও সাধুতার আলো ছিল। মনিবের দয়ার্দ্রতা ও আন্তরিকতা সেখানে ছিল। গোলাম ও চাকরের আনুগত্য, কর্মচঞ্চলতা ও ধৈর্য ছিল সেখানে। সেখানে আরও ছিল প্রহরী ও সম্পদ রক্ষকের পরিপূর্ণ সতর্কতা দীপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ। অর্থাৎ রাজ্য ও প্রজা উভয় দিক থেকেই ছিল সমৃদ্ধ ও কল্যাণপূর্ণ। প্রজাদের সকল সুন্দর গুণে আলোকিত উদ্ভাসিত ছিল সেই রাজ্য। রাজ্যের সর্বত্র সততা, স্বচ্ছতা, নিয়মানুবর্তিতা ও শৃংখলা সমানভাবে বিরাজমান। জনগণের সম্পদ লুট করার পরিবর্তে তখন তাদেরকে বিশ্বাসের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা হতো প্রশাসন থেকে। আর এ কারণেই সমাজ ও নাগরিকের জীবন বৃক্ষের পত্রে পত্রে ঝরে পড়ত বসন্তের যৌবন আর সর্বত্র অনুভূত হতো স্বর্গীয় স্বভাব সৌরভের অতুগ্র গন্ধ, মনমাতানো সুরভি।

হেরা গুহায় দাঁড়িয়ে আমি মনে মনে এসব কথা ভাবছিলাম। আমি ভাবনা ও অতীতের স্মৃতির দরিয়ায় এমনভাবে ডুবে গিয়েছিলাম আমি ভুলেই গিয়েছিলাম নিজের অস্তিত্বের কথা। আমার ভাবনা-কল্পনা আমাকে আমার বর্তমান ও চারপাশের পৃথিবী থেকে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আমার ভাবনাগুলো তখন সেই হারানো দিনের সোনালী স্মৃতির ছবি আঁকছিল। সেই ছবিতে আমি অতীত দিনের বিমল কান্তি প্রাণভরে আস্বাদন করছিলাম। খুঁটে খুঁটে দেখছিলাম তার প্রতিটি অঙ্গকণা। আমার তখন মনে হচ্ছিল আমার চারপাশে ছেয়ে আছে সেই সোনালী দিনের সব আয়োজন। আমি সেই সুরভিত সমাজের স্বর্গীয় গন্ধ প্রাণভরে উপভোগ করছি। কল্পনার এই ভুবনেই মনে হলো সেই সময়ের কথা, সত্যিকার অর্থে যেই সমাজে আমি এখন বসবাস করছি যেমন পরিবেশে এখন আমি আছি সেই পরিবেশের কথা মনে হলো। তখন আমার মনে হলো আজও তো জীবনের সর্বত্র বেশ কিছু নতুন তালা ঝুলছে! চারপাশে কত বিচিত্র ধরনের সমস্যা! কত শত সংঘাত-দ্বন্দ্ব আর জটিলতা। আচ্ছা, সেই পুরানো চাবিটি দিয়ে কি এই নতুন তালাগুলো খোলা যায় না?

আমার মনে এই প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে উঠল। আমি তখন ভাবলাম, আমাকে আগে এই তালাগুলো ভাল করে দেখে নিতে হবে। এর ধরন-প্রকৃতি না জানার আগে কিছু বলা ঠিক হবে না। অতঃপর আমি যখন এই তালাগুলো হাতে নিয়ে দেখলাম তখন বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠল। আমি দেখলাম, এগুলো কোন নতুন তালা নয়। এগুলো সেই পুরান তালাই। নতুন কেবল তার রং। সাথে কিছু জটিলতার যোগ হয়েছে। কিন্তু শেকড় সেই পুরানোই।

এখনও মূল সমস্যা ব্যক্তি। ব্যক্তির সমস্যাই সব সময় মূল সমস্যা ছিল। কারণ সমাজ সভ্যতার ভিত্তি নির্মিত হবার ক্ষেত্রে ব্যক্তি হলো তার ইটস্বরূপ। সমাজ ও দেশ এই ইট দিয়েই নির্মিত প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ এই ব্যক্তির সবচে' বড় সমস্যা হলো সে এখন বস্তু ও শক্তির বাইরে কোন কিছু মানতে প্রস্তুত নয়। তার মতলব একটাই—মন ও প্রবৃত্তির অনুসরণে চাহিদা পূরণ। তার কাছে এই পার্থিব জগতের দাম প্রকৃত মূল্যের চাইতে অনেক বেশি। ভোগ ও বিলাসের পূজায় সে আত্মহারা। আল্লাহ্, রাসূল আর আখিরাতের সাথে তার কোনই সম্পর্ক নেই। ব্যক্তি পর্যায়ের এই অধঃপতনই মূলত সমাজ ব্যবস্থার সকল অধঃপতন ও বিপর্যয়ের উৎস। সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুর্ভাগ্যের মূল বিন্দুও এটাই।

পতিত এই ব্যক্তি যখন ব্যবসা করতে যায় তখন তার থেকে লোভ ও সঞ্চয়ের নিকৃষ্টতম রূপই প্রকাশ পায়। দ্রব্যমূল্যের নিম্নগতির সময় মালপত্র গুদামজাত করে তারাই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং দ্রব্যমূল্যের চড়া গতির সময় তা বাজারে ছেড়ে দেয়। এতে তারা অধিক লাভবান হয় আর সাধারণ মানুষ মরে ক্ষুধা-তৃষ্ণায়। এই ব্যক্তি যখন দরিদ্র হয়ে পড়ে তখন চেষ্টা করে নিজে পরিশ্রম না করে অন্যের পরিশ্রমের ফল বসে বসে ভোগ করতে। এরা শ্রমিক হলে চেষ্টা করে কাজে ফাঁকি দিয়ে মূল্য পারিশ্রমিক ষোলআনা বুঝে নিতে। এরা ধনী হলে সেই সাথে সেরা কঞ্জুস, কৃপণ ও কঠিনহৃদয় হয়। হাতে ক্ষমতা আসলে সততার ধার ধারে না। মালিক হলে স্বার্থ আর অত্যাচারই তার ভূষণ হয়। এরা নিজের বাইরে কারও মধ্যে লাভ ও শান্তি দেখতে চায় না। কর্মচারী হলে কাজে ফাঁকি দেয়। সম্পদের সংরক্ষক নিযুক্ত হলে ধোঁকা ও চুরি করতে বিন্দুমাত্র আলসেমি করে না। মন্ত্রী কিংবা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হলে উদর পূজারী হিসেবেই কাটে তার জীবন। তাদের কেউ নেতা হলে নিজেকে বেশ প্রগতিশীল বলে প্রচার করলেও স্বীয় সম্প্রদায় ও দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যেতে পারে না। অধিকন্তু সে নিজের দেশ ও জাতির সম্মান প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কত দেশ ও জাতির সম্মান ভূলুণ্ঠিত করে তার কোন হিসেবে থাকে না। আইন প্রণয়নের সুযোগ কখনো হাতে এলে জুলুম নির্যাতন আর ট্যাক্সের এমন বোঝা জাতির ওপর চাপিয়ে দেয় জাতি আর শির দাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। আবিষ্কারের ক্ষমতা মাথায় থাকলে আবিষ্কার করে কেবল বিধ্বংসী যন্ত্র। গ্যাস-ট্যাংক-কামান-গোলা-বারুদসহ বিষাক্ত ভয়ংকর সেই আবিষ্কার থেকে মানুষ তো বটেই স্বাভাবিক পৃথিবীর অন্য প্রাণীরাও মুক্তি পায় না। মানুষের বসতি হয় বিরান গণকবরস্থান।

এটা স্বাভাবিক কথা, ভালো মানুষের সমন্বয়ে গঠিত সমাজ ও দেশ যখন সকল কল্যাণময় আলোকিত গুণের স্বচ্ছ দর্পণ হবে তখন মন্দ ও পতিত মানুষদের সমন্বয়ে গঠিত সমাজ ও রাষ্ট্র হবে ভয়ানক ঘৃণিত কলংকিত এক বীভৎস চিত্র। এখানকার ব্যবসায়ীরা সম্পদ গুদামজাত করবে, লোভে ভোগে বেসামাল হবে। অসহায়রা অবাধ্য হবে; মজদুর শ্রমিক কম শ্রমে অধিক পারিশ্রমিক প্রত্যাশী হবে; ধনীদের কার্পণ্য, শাসকের অত্যাচার, প্রভু ও মালিকদের দোর্দণ্ড প্রতাপ, চাকর-বাকরদের ধূর্তামি ও খেয়ানত সংরক্ষকদের চুরি ও চালাকি, উজীর-নাজিরদের স্বার্থপূজাই হবে সে সমাজের সাধারণ রূপ।

এটা মূলত সকল অনিষ্টের উৎস। সকল অস্থিরতা, বিপর্যয় ও বিশৃংখলার মূল হলো ব্যক্তি-চরিত্রের সমস্যা। ব্যক্তিসমস্যার বিস্ফোরণেই আজ বিশ্বময় মানবতা অস্থিরতার শিকার। আর এই ব্যক্তিসমস্যার মূল ব্যাধিটা হলো বস্তুপূজা।

বস্তুই সকল কিছুর মূল শক্তি। এই ধারণাই সকল কিছু ঘুলিয়ে রেখেছে। কালো বাজারী, সুদ, ঘুষ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কৃত্রিম সংকট তৈরি, গুদামজাতকরণ সবই এই বস্তুতান্ত্রিক মনোভাবের স্বাভাবিক ফসল। পৃথিবীর সকল চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী এসব সমস্যার যথার্থ সমাধান দিতে পারছে না। তারা একটা সমাধান আবিষ্কার করতে গেলে নতুন আরেকটা সমস্যায় আটকে যান। গ্রন্থি একটি উন্মোচিত হলে আরও দশটি বেঁধে যায়। আজ বরং একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না, তারা আজ সমস্যা উন্মোচনের বদলে নতুন সমস্যারই জন্ম দিয়ে চলছেন অর্থাৎ হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসায় যা হবার তাই হচ্ছে। একটি রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে তারা অগণন রোগের সৃষ্টি করছে। ডাক্তারের পরিচয় ঘটছে নতুন নতুন ব্যাধির সাথে। তার অভিজ্ঞতার পরিধিতো বাড়ছে। কিন্তু রোগীর দশা? আমাদের বুদ্ধিজীবীদের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা একবার মনে করেছেন একনায়কতন্ত্রই এসব সমস্যার মূল। তাই তারা একনায়কতন্ত্রকে কবর দিয়ে গণতন্ত্রকে প্রসব করলেন। কিন্তু এতেও যখন ব্যাধির কিছু হলো না তখন সেই 'সমাধিস্থ মৃত একনায়কতন্ত্র ও ডিক্টেটরশীপকেই টেনে বের করলেন, অথচ দেখা গেল সমস্যা আরও বেড়েছে। তারা ফিরে এলেন আবার গণতন্ত্রের কাছে। আবার কখনো ঝুঁকে গেছে পুঁজিবাদের দিকে, কখনো কমিউনিজমের কাছে, আবার কখনো দ্বারস্থ হয়েছে সমাজতন্ত্রের। যন্ত্রণার ডাকে ছোটাছুটি করেছেন অনেক। কিন্তু বেদনার উপশম হয়নি এক বিন্দু। ব্যাধি যা ছিল তাই রয়ে গেল। কারণ সকল চিকিৎসাই ছিল ত্বকের ওপরে ওপরে। সমস্যার শিকড় কেউ স্পর্শ করতে পারেনি অর্থাৎ যে ব্যক্তি থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সৃষ্টি সেই ব্যক্তির অসুস্থতা, বিপর্যয় ও পচন শোধরাবার চেষ্টা কেউ করেনি। ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় এই বাস্তবতা উপলব্ধ হয়নি যার কারণে সমাজ ও রাষ্ট্র রুগ্ন ছিল, রুগ্নই রয়ে গেছে।

অবশ্য আমি বলব, আমাদের এই বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদগণ যদি এই কঠিন সত্য উপলব্ধিও করেন, তারা যদি প্রকৃত রোগের সন্ধান পেয়েও বসেন, তবুও তারা এর চিকিৎসা করতে পারবেন না। মানলাম তাদের কাছে ইল্ম প্রচারের সকল মাধ্যম তাদের হাতে আছে। আর এই যুগটাও শিক্ষা-প্রশিক্ষণের যুগ।

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, তাদের হাতে সেই শক্তি নেই যা দ্বারা মানুষকে মন্দ থেকে ভালোর দিকে ও ধ্বংস থেকে সৃষ্টির দিকে নিয়ে যেতে পারবেন। কারণ তাদের মন, মেধা ও বিশ্বাসের কোথাও রুহানিয়াত ও আত্মিকতার ছোঁয়া নেই। তাদের অন্তরে ঈমান নেই। অন্তরের আত্মার কোন খোরাক তাদের কাছে নেই। হৃদয়ে ঈমানের বৃক্ষ রোপণের ব্যবস্থাও তাদের হাতে নেই। বান্দা ও প্রভুর মধ্যে বন্ধন স্থাপন করবার ক্ষমতা তাদের হাত থেকে ছুটে গেছে। এই নশ্বর জীবনকে অবিনশ্বর জীবনের সাথে, আত্মাকে বস্তুর সাথে, বিদ্যাকে চরিত্রের সাথে গ্রন্থিত করার ক্ষমতা তাদের নেই। আত্মিক দরিদ্রতা, অন্ধ বস্তুবিশ্বাস আর বিবেকের অসার অহংকার তাদেরকে এমন স্থানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ধ্বংস ও বিনাশের শেষ তীরটিও তাদের ধনুক থেকে বেরিয়ে গেছে যার অনিবার্য পরিণতি বিশ্বমানব পরিবারের ধ্বংস; এই পৃথিবী রূপান্তরিত হবে এক বিরান গ্রহে।

আল্লাহ্ না করুন, যদি পৃথিবীর যুদ্ধবাজ শক্তিগুলো এই ধ্বংসাত্মক অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের মাঠে নেমে পড়ে তাহলে মানুষের নব সৃষ্টি এই আধুনিক অস্ত্রলীলা, সভ্যতা ও মানবতার কবর রচনা করে ছাড়বে!

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 রহমত রূপে রাসূল (সা.)

📄 রহমত রূপে রাসূল (সা.)


ঈসায়ী ষষ্ঠ শতকের কথা। তখন ব্যাপক হারে আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি এই মানুষ আত্মহত্যার জন্য কেবল উদ্যতই ছিল না, বরং উন্মত্ত এক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিল। আত্মহত্যার প্রতি তাদের প্রবণতাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যেন এ আত্মহত্যাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া। আত্মহত্যার জন্যে সে যেন মানত করেছে, কসম খেয়েছে। সে কসম যেন কোনক্রমেই ভাঙা যাবে না! পবিত্র কুরআন সে ভয়াবহ পরিস্থিতিরই চিত্রাঙ্কন করেছে অত্যন্ত নিপুণভাবে, যে চিত্রাঙ্কন অসম্ভব কোন সুদক্ষ শিল্পী, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক কিংবা ঐতিহাসিকের পক্ষে।

"আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন। ফলে আল্লাহর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গিয়েছ। তোমরা অবস্থান করছিলে এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন।" [সূরা আল ইমরান: ১০৩]

ঐতিহাসিক ও জীবনচরিতকারদের প্রতি আল্লাহ রহম করুন! জাহেলী যুগের সঠিক ও যথার্থ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরতে তারা সক্ষম হননি। আসলে এজন্যে তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাদের প্রতি আমরা ভীষণ কৃতজ্ঞ। কেননা তখনকার সেই অবর্ণনীয় ভয়াবহ ও সঙ্গীন পরিস্থিতির সঠিক চিত্রাঙ্কন কলমের পক্ষে ছিল অসম্ভব। তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল ভাষা ও সাহিত্যের নাগালের বাইরে। সুতরাং একজন ঐতিহাসিকের পক্ষে তার যথার্থ চিত্রাঙ্কন কিভাবে সম্ভব?

মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবকালে জাহেলী যুগের সমস্যা কি শুধু সামাজিক বিপর্যয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের সমস্যা ছিল? শুধু কি মূর্তি পূজার সমস্যা ছিল? শুধু কি মদ-জুয়া, অশ্লীলতা, নগ্নতা, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যায়ের-অবিচারের সমস্যা ছিল? নাকি জালিম শাসকের জুলুম ও অর্থনৈতিক শোষণের সমস্যা ছিল? সে সমস্যা কি শুধু নিরপরাধ ও নিষ্পাপ নবজাত কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করার সমস্যা ছিল? না! বরং আসল সমস্যা ছিল গোটা মানবতাকে মাটি চাপা দিয়ে নির্দয়ভাবে হত্যা করার সমস্যা।

অন্ধকার যুগ পেরিয়ে গেছে। সে যুগের হিংস্র মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মাটির নিচে। সেই লোমহর্ষক চিত্র এখন দৃষ্টির অন্তরালে। এখন কি করে আমরা তার চিত্রাঙ্কন করব? কিভাবে তা অনুভবযোগ্য ও দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলে ধরব? শুধু বলতে পারি, সে ছিল জাহেলী যুগ।

অন্ধকারাচ্ছন্ন এক পৃথিবী! সভ্যতা-সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন এক আঁধার দুনিয়া। সে যুগের সে পৃথিবীর বাসিন্দা ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না সে যুগকে। উপলব্ধি করতে পারবে না সে যুগের ভয়াবহতাকে। কোন চিত্রশিল্পী যদি এখন একটি ছবি আঁকে, যাতে গোটা মানব জাতিকে এক দারুণ সুদর্শন ও দৃষ্টিনন্দন মানুষের আকৃতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সমস্ত সৃষ্টিলোকের ভেতরে যার সৌন্দর্যের অপূর্ব ঝলক নজরে পড়েছে, যাকে আল্লাহ খেলাফতের তাজ পাঠিয়েছেন, শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন সমস্ত সৃষ্টিলোকের মাঝে, যার আগমনে এই উজাড় ও বিরান পৃথিবী পরিণত হয়েছে বসন্ত বিরাজিত উদ্যানে। অতঃপর চোখের সামনে ভেসে উঠল আরেকটি চিত্র। একটু আগের সেই মানুষটি ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হচ্ছে এক গভীর পরিখায় যেখান থেকে উদীরণ হচ্ছে আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত। ঝাঁপ দেবার জন্যে সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পা সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে, এক্ষুণি সে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কয়েক মুহূর্ত পেরুতে না পেরুতেই ঝাঁপিয়েও পড়ল। হারিয়ে গেল ভয়ংকর অন্ধকারে, অনন্ত মৃত্যু বিভীষিকায়। তাহলে সম্ভবত চিত্রশিল্পীর এই চিত্রাংকনে রাসূলের আবির্ভাবকালীন জাহেলী যুগের কিঞ্চিত চিত্র ফুটে উঠতে পারে। এই বাস্তবতার দিকে ইশারা করেই আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে অত্যন্ত সংক্ষেপে, অথচ ই'জাযপূর্ণভাবে:

"আর তোমরা ছিলে জাহান্নামের এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে, সেখান থেকে তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করলেন।"

এই বিষয়টি নবুওয়াতের ভাষায় আরো বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, "আমার এই দাওয়াত ও হিদায়াতের উপমা যা নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, এমন ব্যক্তির ন্যায় যে আগুন প্রজ্জ্বলিত করল, যখন তার আলো আশপাশে ছড়িয়ে পড়ল তখন পোকা-মাকড় ও কীটপতঙ্গ আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। অনুরূপ তোমরাও আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত আর আমি তোমাদের বাহু ধরে তোমাদেরকে বাঁচাতে চাই" (সহীহ বুখারী)। আসলে মানবতার কিশতিকে নিরাপদে পাড়ে ভিড়ানোই ছিল মূল সমস্যা। কেননা মানুষ যখন সঠিক অবস্থায় ফিরে আসবে, যখন তার জীবনে আসবে স্বস্তি, ভারসাম্য ও সঠিক চেতনাবোধ, তখন মানুষের স্থাপত্যশিল্প, উন্নয়নশীলতা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি মূর্তিমান হয়ে বিকশিত হবে তাদের সামনে যাদের আছে যোগ্যতা, যারা মানবতার বন্ধু ও সাহায্যকারী। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, গোটা মানবতাই নবী-রাসূলদের কাছে ঋণী। তাঁরাই তো মানবতাকে উদ্ধার করেছেন সেই মহাবিপদ থেকে, যা নাঙ্গা তলোয়ারের মত মানবতার মাথার ওপর এক চরম মুহূর্তের অপেক্ষা করছিল। দুনিয়ার কোন্ বিদ্যাপীঠ, কোন্ দর্শন এবং কোন্ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তাঁদের ঋণ শোধ করতে পারবে? সত্যি কথা বলতে কি, বর্তমান পৃথিবী ও সাম্প্রতিক বিশ্বও তাঁদের কাছে ঋণী। কারণ তাঁরা মানবতাকে উদ্ধার না করলে কে পেত জীবনের স্বাদ ও স্বাধীনতার সুখ? কেননা পরিস্থিতি এমন নাযুক আকার ধারণ করেছিল, মানুষ অবস্থার নীরব ভাষায় বারবার শুনিয়ে দিয়েছে, সে এই পৃথিবীতে বসবাসের অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। তার হৃদয় এখন পাষাণ, দয়ামায়াশূন্য। মানবতার জন্য এখন সে বহন করে না কোন করুণা ও রহমতের পয়গাম। সে নিজের বিরুদ্ধে এখন নালিশ জানাচ্ছে মহাপ্রভুর আদালতে, সাক্ষ্য দিচ্ছে নিজের বিরুদ্ধে, চূড়ান্ত রায়ের জন্য মোকদ্দমার কাগজপত্র পুরা প্রস্তুত।

এক কঠিন শাস্তির জন্য নিজেকে পেশ করেছে, বেছে নিয়েছে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। সভ্যতা-সংস্কৃতি যখন স্বাভাবিক সীমারেখা অতিক্রম করে, বিস্মৃত হয়ে পড়ে চারিত্রিক উৎকর্ষের কথা, বরং আরো এক ধাপ সামনে বাড়িয়ে পরিষ্কার ভাষায় অস্বীকার করে বসে চারিত্রিক উৎকর্ষের অবদানকে, যখন মানুষ গাফেল হয়ে যায় যাবতীয় মহান উদ্দেশ্য সম্পর্কে, যখন সে জাগতিকতাকে বুকে আঁকড়ে ধরে উপেক্ষা করে অন্য সব বাস্তবতাকে, যখন সে পাশবিকতার দিকচিহ্নহীন দিগন্তে লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার মত ছুটে বেড়ায়, যখন সে সকল প্রকার মানবীয় গুণের বদলে হিংস্র জনপদের আকৃতি ধারণ করে, যখন তার মাঝে জন্ম নেয় এক কাল্পনিক উৎস, যখন সে স্বীকার করে নেয় নফসে আম্মারার পূর্ণ বশ্যতা, যখন মানবতাকে ঘিরে ফেলে পাগলামির ঘোর আচ্ছন্নতা, তখনই (মানবতার সেই মহাদুর্দিনে) অপারেশন ও অস্ত্রোপচার, সমূলে কেটে ফেলেন বিষাক্ত অংশ, দূর করে দেন পাগলামির নেশা। কোন জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকৃতি ও বিলুপ্তি দেশ ও রাজ্য হারানোর চেয়েও সাংঘাতিক ও ভয়াবহ। এক দুর্বল রোগী যদি পাগল হয়ে যায়, তাহলে তার কারণে আশপাশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু একটু ভেবে বলুন তো, গোটা মানবতাই যদি পাগল হয়ে যায়, যদি ভেঙে যায় হাজার বছরের লালিত সভ্যতা-সংস্কৃতি, দলিত-মথিত হয়ে যায় মানবতা ও ইনসানিয়াতের সবুজ কোমল দূর্বাগুলো, তবে সীমা থাকবে কি অশান্তি ও নৈরাজ্যের?

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 সম্ভব হবে কি এর কোন চিকিৎসা

📄 সম্ভব হবে কি এর কোন চিকিৎসা


বিশ্বাস করুন! জাহেলী যুগে সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সুস্থ নগর জীবনের ওপরই শুধু বিপর্যয়ের ধ্বস নেমে আসেনি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও নগর জীবন পরিণত হয়েছিল এক বিকৃত গলিত লাশে। মানুষ মানুষকে শিকার করত হিংস্র নেকড়ের মত। তারপর তার হৃদয়হীনতার সামনে যখন সে মানুষটি মৃত্যুর সাথে লড়াই করত, মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করত তখন এই অমানবিক করুণ দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়েও মজা লুটত তার নিষ্ঠুর দৃষ্টি, পাষাণ হৃদয়, ঠিক সেভাবে যেভাবে আমাদের কারো হৃদয় ফুল বাগান ও গাছপালার মনোরম দৃশ্যে ও ছায়া-ঘেরা পরিবেশে আনন্দে উদ্বেল হয়।

এবার দৃষ্টি ফেরান রোমান ইতিহাসের দিকে। দেখবেন তাদের বিজয় গাথা ও বীরত্বের ইতিহাস আলো ঝলমল। মন কেড়ে নেয় তাদের সুচারু ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ রাজ্য পরিচালনা। সভ্যতা-সংস্কৃতিতেও পিছিয়ে নেই তারা। কিন্তু অপর দিকে কেমন করে তাদের অমানবিকতা ও নিষ্ঠুর চিত্র তুলে ধরেছেন একজন ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিক তাও একটু পড়ে দেখুন:

"রোমানদের কাছে সবচেয়ে বেশি মজাদার ও চিত্তাকর্ষক দৃশ্য হতো সেটি, যখন তরবারির যুদ্ধে দুই স্বগোত্রীয় পাহলোয়ানের মধ্যে পরাজিত ব্যক্তি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্তে লাল হয়ে ঢলে পড়ত মৃত্যুর কোলে আর তার মুখ থেকে শেষবারের মত উচ্চারিত হতো মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের ব্যথা করুণ গোঙানি। তখন তাদের আনন্দের আর সীমা-পরিসীমা থাকত না। মনে হতো তারা যেন তলোয়ারের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত এই মানুষটির সামনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে মজাদার দৃশ্য অবলোকন করছে। হাসি-উল্লাসের বিকৃত ধ্বনি তুলে তারা একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত আনন্দের আতিশয্যে। এই মৃত্যু পথযাত্রী অসহায় মানুষটির গোঙানি তাদের কানে যেন মধু ঢালছে অপূর্ব সংগীতের সুর লহরীর মত! এদিকে শান্তি-শৃংখলা রক্ষাকারী পুলিস বাহিনীর কিছুই করার থাকত না। সব কিছু বেসামাল হয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত।”¹

মোটকথা তখন মানুষ ছিল না, ছিল মানুষের খোলস। মানবতার মোকদ্দমা চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ছিল আল্লাহ্র আদালতে। ঠিক তখনই প্রেরিত হলেন মুহাম্মদ (সা.) আর ঘোষণা এল:

"হে নবী! তোমাকে আমি জগতসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।”

টিকাঃ
১. দ্র. Ko. Lecky প্রণীত History of European Morals.

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) আরব দ্বীপে আবির্ভূত হলেন কেন?

📄 মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) আরব দ্বীপে আবির্ভূত হলেন কেন?


আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও হিকমতের ফয়সালা ছিল, মানবতার হেদায়াত ও নাজাত তথা পথ প্রদর্শন ও মুক্তির এই সূর্য যদ্ধরা সমগ্র সৃষ্টিজগতে আলো বিস্তার লাভ করে, জাযীরাতুল আরবের দ্বিগ্বলয় থেকে উদিত হবে যা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার ভূভাগ আর যে ভূভাগের এই প্রখর আলোক-রশ্মির প্রয়োজন ছিল সর্বাধিক।

আল্লাহ তা'আলা এই দাওয়াতের জন্য আরবদেরকে নির্বাচিত করেন এবং তাদেরকে সমগ্র বিশ্বের তাবলীগ তথা প্রচার-প্রসারে যিম্মেদার বানান এজন্য যে, তাদের হৃদয়পট ছিল একেবারেই স্বচ্ছ ও নির্মল। পূর্ব থেকে কোন অঙ্কিত ছবি কিংবা চিত্র এতে ছিল না যা মোছা কঠিন হতো। এর বিপরীতে রোমক, পারসিক অথবা ভারতীয়দের, যাদের নিজেদের উন্নতি-অগ্রগতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও দর্শনের ব্যাপারে বিরাট গর্ব ছিল, আর এর দরুন তাদের ভেতর এমন কিছু মানসিক গ্রন্থি ও চিন্তাগত জটিলতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল যা দূর হওয়া সহজ ছিল না। আরবদের দিল ও দিমাগ তথা মন-মস্তিষ্কের নিষ্কলঙ্ক পট কেবল সেই মামুলী ও হাল্কা রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিল যা তাদের মূর্খতা, অশিক্ষা ও বেদুঈন জীবন তার ভেতর অঙ্কিত করে দিয়েছিল যা ধোয়া ও মুছে ফেলা এবং তদস্থলে নতুন চিত্র অংকন করা খুবই সহজ ছিল। বর্তমান শাস্ত্রীয় পরিভাষায় তারা "অকাট্য ও নির্ভেজাল মূর্খতা"র শিকার ছিল, আর এটাই ছিল সেই ভুল যার প্রতিবিধান হতে পারত। অপরাপর সুসভ্য ও উন্নত জাতিগোষ্ঠী ছিল মিশ্রিত তথা ভেজাল মূর্খতার ভেতর লিপ্ত যার চিকিৎসা ও প্রতিবিধান এবং তা ধুয়ে নতুন হরফ লেখা সব সময় অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে থাকে।

এই আরবরা তাদের আপন প্রকৃতিতে ছিল সমুজ্জ্বল। মজবুত ও লৌহসম সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল তারা। যদি হক কথা তাদের উপলব্ধিতে ধরা না দিত তাহলে তারা এর বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে তুলে নিতে এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করত না। আর যদি সত্য স্বচ্ছ সুন্দর দর্পণের ন্যায় তাদের সামনের পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ত তাহলে তা তারা মনে-প্রাণে গ্রহণ করত, প্রাণের অধিক ভালবাসত, তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরত এবং এর জন্য প্রয়োজনে জীবন বিলিয়ে দিতেও এতটুকু দ্বিধা করত না।

এই আরবীয় মন-মানসিকতা সুহায়ল ইবন আমরের সেই কথার ভেতর প্রতিফলিত হয় যা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের সময় তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল। সন্ধি চুক্তির সূচনা হয়েছিল নিম্নোক্ত বাক্য দ্বারা: "এ সেই ফয়সালা যা আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সা.) করেছেন।" এতে সুহায়ল বলে ওঠে: "আল্লাহর কসম! যদি আমরা জানতাম ও মানতাম, আপনি আল্লাহর রসূল তাহলে কখনো আপনাকে আল্লাহর ঘর যিয়ারতে বাধা দিতাম না, আর আপনার সঙ্গে লড়াই-সংঘর্ষেও প্রবৃত্ত হতাম না।" এই একই মন-মানসিকতা ইকরীমা (রা.) ইবন আবী জাহলের কথায়ও ফুটে ওঠে যখন ইয়ারমুক যুদ্ধ প্রবল তুঙ্গে। তখন তাঁর ওপর প্রতিপক্ষের প্রবল চাপ। রোমক সৈন্যরা প্রচণ্ড বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে হযরত ইকরীমা (রা.)-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন: "জ্ঞানবুদ্ধির দুশমনেরা! (যত দিন পর্যন্ত আমার মাথায় এ সত্য আসেনি) আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মোকাবিলায় সর্বত্র প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে মুখোমুখি হয়েছি। আর আজ আমি তোমাদের থেকে পালিয়ে যাব?" এরপর তিনি হাঁক ছেড়ে বলে ওঠেন: "এমন কেউ আছে, যে আমার হাতে মৃত্যুর শপথ নিতে পার?" এতে কিছু সংখ্যক লোক এগিয়ে এলেন এবং বায়আত নিলেন। এরপর সকলে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন, অতঃপর আহত হয়ে শাহাদত লাভ করলেন।

আরবের লোকেরা ছিল বড়ই বাস্তবতাপ্রিয়, চিন্তাশীল, মননশীল, ধীরস্থির প্রকৃতির, স্পষ্টভাষী, কঠোরপ্রাণ ও সহিষ্ণু। তারা না প্রতারিত করত আর না নিজেদেরকে প্রতারণার মধ্যে রাখা পছন্দ করত। তারা সত্য ও পরিপক্ক কথায় অভ্যস্ত, কথার সম্মান রক্ষাকারী ও সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল। এর একটি সুস্পষ্ট নমুনা ও প্রমাণ আমরা দেখতে পাব আকাবার দ্বিতীয় বায়আতে যার পরই হিজরতের সূচনা হয় মদীনা তায়্যিবার দিকে। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, যখন আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় আকাবা উপত্যকায় রসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণের উদ্দেশে সমবেত হয় তখন আব্বাস ইবন উবাদা আল-খাযরাজী স্বীয় গোত্রকে সম্বোধন করে বলেন: হে খাযরাজের লোকেরা! তোমাদের কি জানা আছে, তোমরা মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)-এর হাতে কোন্ বিষয়ের ওপর বায়আত গ্রহণ করতে যাচ্ছ? উত্তরে তারা বলল: আমরা জানি। তিনি বললেন: তোমরা তাঁর হাতে সাদা-কালো সকল বর্ণের মানুষের সাথে যুদ্ধের ওপর বায়আত করছ (অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে যুদ্ধের শপথ নিতে চলেছ)। যদি তোমরা ভেবে থাক, তোমাদের সম্পদ লুণ্ঠিত হবে, ধ্বংস ও বরবাদ করা হবে, তোমাদের অভিজাত সন্তান ও গোত্রের নেতৃবর্গ নিহত হবে, সেক্ষেত্রে তোমরা তাঁকে শত্রুর হাতে তুলে দিয়ে নিজেরা সরে দাঁড়াবে, তাহলে শুরুতেই এই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যাক আর তা এজন্য, যদি এমন কিছু কর তবে আল্লাহর কসম! দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই তোমরা লজ্জিত ও অপমানিত হবে। আর তোমাদের সিদ্ধান্ত যদি এই হয়ে থাকে, যেই বস্তুর জন্য তোমরা তাঁকে দাওয়াত দিয়েছে তা তোমরা পূরণ করবে, এতে তোমাদের গোটা বিত্ত-সম্পদ তছনছ হয়ে গেলেও তোমাদের নেতা ও অভিজাত সম্প্রদায় মারা গেলেও তোমরা পরওয়া করবেন না, তবে তোমরা তাঁর হাতে হাত দিও। সেক্ষেত্রে আল্লাহর কসম! এতে দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জাহানেই তোমাদের জন্য সাফল্য ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তারা সকলেই সমস্বরে বলল: আমরা আমাদের বিত্ত-সম্পদের ধ্বংস ও নেতৃবর্গের মৃত্যু সকল কিছুর বিনিময়েও আপনার হাতে বায়আত করতে চাই। কিন্তু হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি পাব? আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেনঃ জান্নাত। তারা বলল: আপনি হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি দস্ত মুবারক সামনে বাড়িয়ে দিলে সকলেই বায়আত করল।

প্রকৃত ব্যাপার এই, তারা সেই প্রতিজ্ঞা পালন করেছিল যেই প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য তারা রাসূল আকরাম (সা.)-এর হাতে বায়আত নিয়েছিল। হযরত সা'দ ইবন মু'আয (রা.) তাঁর বিখ্যাত উক্তির মধ্যে সব কিছুর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: "আল্লাহর কসম! (ইয়া রাসূলাল্লাহ্!) আপনি যদি চলতে চলতে বারকুল গিমাদ অবধি পৌছে যান তখনও আমরা আপনাদের সাথে চলতে থাকব। যদি আপনি সমুদ্র পার হতে চান তবে সেক্ষেত্রেও আমরা আপনার সঙ্গে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ব।"

অটুট সংকল্প ও সুদৃঢ় এই ইচ্ছাশক্তি ও সততা, কর্মের স্থিরতা, সত্যের সামনে মস্তক অবনত করে দেয়ার মেযাজ ও মানসিকতা সেই বাক্য থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত যা মুসলিম ফৌজের বিখ্যাত সিপাহসালার উকবা ইবনে নাফে (রা.) উচ্চারণ করেছিলেন, যখন বিজয়ের পর বিজয়ের মাধ্যমে সম্মুখে অগ্রসর হতে গিয়ে আটলান্টিক মহাসমুদ্র তাঁর পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ সময় তিনি বলেছিলেন : "হে আল্লাহ! এই মহাসমুদ্র আমার অগ্রযাত্রার পথের প্রতিবন্ধক। নইলে আমার মন চায় সমান্তরাল গতিতে আমি সামনে এগিয়ে যাই এবং জলে-স্থলে তোমার নামের মহিমা গাই।"

এর বিপরীতে গ্রীস, রোম ও পারস্যের লোকেরা যুগ স্রোতে ভেসে যেতে ও হাওয়ার অনুকূলে পাল তোলাতে অভ্যস্ত ছিল। কোন প্রকার জুলুম ও বাড়াবাড়ি তাদের ভেতর আন্দোলন সৃষ্টি করতে ছিল অক্ষম। নীতিপরায়ণতা ও সত্যের প্রতি কোন আকর্ষণ তাদের ভেতর ছিল না। কোন দাওয়াত বা আহ্বান ও আকীদা বিশ্বাস তাদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তাধারা ও তাদের আবেগ-অনুভূতির ওপর এভাবে ছাপ ফেলত না যার জন্য নিজেদের সত্তাকে তারা বিস্মৃত হতে পারে এবং নিজেদের আরাম-আয়েশ ও পার্থিব ভোগ-বিলাসকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। আরবগণ সভ্যতা-সংস্কৃতি, ভোগ-বিলাস ও আরামপ্রিয়তা থেকে সৃষ্ট এসব রোগ-ব্যাধি ও খারাপ অভ্যাস থেকে ছিল মুক্ত যার চিকিৎসা বড় কঠিন। এটা কোন ঈমান-আকীদার জন্য উত্তাপ সৃষ্টিতে ও আত্মোৎসর্গের ক্ষেত্রে সর্বদাই প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে এবং অধিকাংশ সময় মানুষের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেয়। তাদের ভেতর সত্যবাদিতা ছিল, আমানতদারিও ছিল, ছিল বীরত্বও। মোনাফেকি, গাদ্দারী ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাদের প্রকৃতি ছিল সামঞ্জস্যহীন। লড়াইয়ের ক্ষেত্রে জীবন বাজি রেখে লড়াকু যোদ্ধা, অশ্বপৃষ্ঠে অধিকক্ষণ অতিবাহিতকারী, কঠোর প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সহ্য শক্তির অধিকারী সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত, অশ্বারোহণ ও যুদ্ধ-বিগ্রহপ্রিয় যা এমন এক সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর জন্য আবশ্যকীয় শর্ত যাকে দুনিয়ায় কোন বড় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে যেতে হবে, বিশেষত সেই যুগে যখন লড়াই-সংঘর্ষ ও অভিযান পরিচালনার ধারাবাহিকতা চলতে থাকে এবং বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্যের সাধারণ প্রচলন ঘটতে থাকে।

দ্বিতীয় বিষয়, তাদের চিন্তাধারাগত ও কার্যকর সমূহ শক্তি ও স্বভাবজাত প্রাকৃতিক যোগ্যতাসমূহ নিরাপদ ও সুরক্ষিত ছিল এবং কাল্পনিক দর্শন, অনুকারী যুক্তিতর্কের কচকচানি ও খুঁটিনাটি বিষয়াদি, ইলমে কালামের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও নাজুক অধ্যায়সমূহে অথবা স্থানীয় ও আঞ্চলিক গৃহযুদ্ধগুলোতে তা বিনষ্ট হয়নি। এটি একটি উর্বর এবং এই দিক দিয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত জাতিগোষ্ঠী ছিল তাদের জীবন উত্তাপ, আবেগ-উদ্দীপনা, আনন্দ-প্রফুল্লতা, অটুট সংকল্প এবং লৌহসুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দ্বারা ছিল ভরপুর। স্বাধীনতা ও সাম্য, প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর সঙ্গে ভালবাসা, অনাড়ম্বর ও সারল্য তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে ছিল। তাদেরকে কখনো বিদেশী শক্তির সামনে মাথা নত করতে হয়নি। এই জাতি গোলামী, একজন আরেক জনের ওপর ছড়ি ঘোরাবে এবং প্রভুত্ব করবে এরূপ অর্থের সঙ্গে অপরিচিত ছিল। তারা ইরানী ও রোমক রাজতন্ত্রের গর্ব ও অহমিকা এবং মানুষ মানুষকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে দেখবে এরূপ অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। এর বিপরীতে পারস্য সম্রাটদেরকে (যারা আরব উপদ্বীপের প্রতিবেশী ছিল) অতিমানব জ্ঞান করা হতো। যদি পারস্য সম্রাট রক্ত মোক্ষণ করাতেন কিংবা কোন ঔষধ ব্যবহার করতেন তবে রাজধানীতে ঘোষণা প্রদান করা হতো, আজ মহামান্য সম্রাট রক্ত মোক্ষণ করিয়েছেন কিংবা ঔষধ ব্যবহার করেছেন। এই ঘোষণার পর শহরে কোন পেশাজীবী আপন পেশায় নিমগ্ন হতে কিংবা কোন সরকারী কর্মকর্তা বা সভাসদ কাজ করতে পারত না। যদি কখনও সম্রাটের হাঁচি আসত তবে তাঁর জন্য কোন মঙ্গলবাণী উচ্চারণের অধিকার ছিল না। যদি তিনি নিজে কোন মঙ্গলবাক্য উচ্চারণ করতেন তবুও এর সমর্থনে কিছু বলা যেত না। যদি তিনি কখনও কোন উজীর কিংবা আমীরের বাসভবনে গমন করতেন তবে এই দিনটিকে খুবই অস্বাভাবিক ও গুরুত্ববহ মনে করা হতো। সেই দিন থেকে সেই খান্দানের নতুন বর্ষপঞ্জী শুরু হতো এবং চিঠিপত্রে নতুন তারিখ বসানো হতো। একটি নির্ধারিত সময়সীমার জন্য তার ট্যাক্স মাফ করা হতো। উল্লিখিত ব্যক্তিকে নানা রকমের সম্মান, পুরস্কার, ক্ষমা ও পদোন্নতি দ্বারা ভূষিত করা হতো কেবল এজন্য, সম্রাট পদধূলি দ্বারা তাকে ধন্য ও অনুগৃহীত করেছেন।

এ সেই সব আদব, বন্দেগী ও সম্রাটকে তাজীম প্রদর্শনের আবশ্যকীয় শর্তের অতিরিক্ত যেগুলো প্রদর্শন করা সাম্রাজ্যের কর্মকর্তা, দরবারে সভাসদবর্গ ও অপরাপর সকল মানুষের জন্য অপরিহার্য ছিল। যেমন সম্রাটের সামনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা (অর্থাৎ বুকের ওপর হাত রেখে আদবের সাথে মাথা নিচু করে দেয়া), তাঁর সামনে এভাবে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা যেভাবে নামাযে আল্লাহর সামনে কেউ দাঁড়ায়। এ সেই সম্রাটের আমলের কথা বলা হচ্ছে যিনি নওশেরওয়ানে 'আদিল বা ন্যায়বিচারক নওশেরওয়া' নামে পৃথিবী খ্যাত অর্থাৎ খসরু ১ম (৫৩১-৫৭৯ খৃঃ)। এ থেকে পরিমাপ করা যেতে পারে, ইরানী রাজতন্ত্রে মতামত ও চিন্তার স্বাধীনতার ওপর কত কঠিন বাধা-নিষেধ আরোপিত ছিল এবং শাহী দরবারে মুখ খোলার কি মূল্য পরিশোধ করতে হতো। ঘটনাটি 'সাসানী আমলে ইরান' নামক গ্রন্থের লেখক ঐতিহাসিক তাবারীর সূত্রে লিপিবদ্ধ করেছেনঃ "সম্রাট একটি কাউন্সিল সভার আয়োজন করেন এবং রাজস্ব বিভাগের পরিচালক/সচিবকে নির্দেশ দেন জমির খাজনার নতুন ভাষ্য সজোরে পাঠ করে শোনাতে। তিনি তা পাঠ করলে সম্রাট খসরু (নওশেরওয়াঁ) উপস্থিত লোকদেরকে দু'বার জিজ্ঞেস করেন: কারো কোন আপত্তি নেই তো? সকলেই ছিল নিশ্চুপ। যখন সম্রাট তৃতীয়বারের মত একই প্রশ্ন করলেন তখন একজন দাঁড়িয়ে সসম্মানে জিজ্ঞেস করল: সম্রাটের ইচ্ছা কি এই, অস্থাবর জিনিসের ওপর স্থায়ী ট্যাক্স বসাবেন যা কাল-পরিক্রমায় অবিচার ও বে-ইনসাফীতে পর্যবসিত হবে? এতে সম্রাট ক্রোধে চিৎকার করে বলে ওঠেন: ওহে অভিশপ্ত বেআদব! তোর পরিচয় কি? কোত্থেকে এসেছিস তুই? সে উত্তরে জানাল, সে রাজস্ব কর্মকর্তাদের একজন। সম্রাট তখন নির্দেশ দেন কলমদানি দিয়ে পিটিয়ে তাকে মেরে ফেলতে। এরপর পরিচালক/সচিবদের সকলেই তাকে কলমদানি দিয়ে পেটাতে শুরু করে। ফলে বেচারা সেখানেই মারা যায়। এরপর সকলেই বলল: সম্রাট! আপনি যে খাজনা আমাদের ওপর ধার্য করেছেন তা খুবই যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়ানুগ হয়েছে।”

ভারতবর্ষে সম্মান ও সম্ভ্রমের অপমান ও অবমাননা এবং সেসব পশ্চাৎপদ শ্রেণীর প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন (যাদেরকে বিজয়ী আর্য জাতিগোষ্ঠী দেশীয় আইন একটি নিকৃষ্টতম সৃষ্টি হিসেবে অভিহিত করেছিল এবং যারা গৃহপালিত পশু থেকে কেবল এ দিক দিয়ে ভিন্ন ছিল, এরা দু'পায়ে ভর দিয়ে চলত এবং দেখতে মানুষের মত) কল্পনাতীত ছিল উক্ত আইনে এটি নিয়মিত ধারা হিসেবে বর্ণিত ছিল, যদি কোন শূদ্র কোন ব্রাহ্মণকে মারার উদ্দেশে হাত ওঠায় কিংবা লাঠি ওঠায় তবে তার হাত কেটে দিতে হবে। যদি লাথি মারে তবে তার পা কেটে দিতে হবে। যদি সে দাবি করে, সে ব্রাহ্মণকে লেখাপড়া শেখাতে পারে, তাকে ফুটন্ত তেল পান করানো হবে। এই আইনের দৃষ্টিতে কুকুর, ব্যাঙ, গিরগিটি, কাক, উল্লু ও অদ্যুৎ বা অস্পৃশ্য শ্রেণীর কাউকে হত্যা করলে তার জরিমানা ছিল একই রূপ। রোমকরাও এ ব্যাপারে ইরানীদের থেকে বেশি কিছু ভিন্ন ছিল না, যদিও নির্লজ্জতা ও মানবতাকে অপমানিত-অপদস্ত করার ক্ষেত্রে এই সর্বনিম্ন পর্যায়ে তারা পৌঁছতে পারেনি। একজন পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক Victor Chopart তদীয় The Roman World নামক গ্রন্থে বলেন: "রোম সম্রাট কাইজারকে উপাস্য মনে করা হতো। বিষয়টি মৌরছী ও পারিবারিকভাবে ছিল না, বরং যিনিই সিংহাসন ও রাজমুকুটের মালিক হতেন তাকেই খোদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হতো যদিও তার ভেতর এমন কোন নিশানী কিংবা চিহ্ন থাকত না যা তাকে এই স্তরে অধিষ্ঠিত হবার দিকে ইঙ্গিত দেয়। Augustus-এর শাহী উপাধি এক সম্রাট থেকে অপর সম্রাট অবধি সংবিধান ও আইন অনুযায়ী স্থানান্তরিত হতো না, বরং রোমক সরকারী সংসদের কাজ কেবল এতটুকুই ছিল, এমন প্রতিটি নির্দেশ যা তরবারির তীক্ষ্ম ধারের জোরে প্রচারিত হবে তা প্রচারিত হতে দেয়া। এই রাজত্ব ও বাদশাহী ছিল কেবল এক ধরনের সামরিক একনায়কতন্ত্রেরই রূপ।”

যদি এর তুলনা করা হয় আরবদের সেই স্বাধীনতাপ্রিয়তা, আত্মসম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে, যা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে তাদের মাঝে দেখতে পাওয়া যায়, তাহলে এ দুই জাতিগোষ্ঠীর মেযাজ এবং আরব ও অনারব সমাজের পার্থক্য সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে। তারা কখনোও কোন সময় তাদের বাদশাহকে "আম সাবাহান" ও "আবায়তাল লআন" (অর্থাৎ আপনি সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকুন এবং আপনার প্রভাত কল্যাণময় হোক)-এর মত শব্দ সমষ্টি দ্বারা সম্বোধন করত। এই স্বাধীনতা ও আত্মপরিচিতি, আপন মান-সম্ভ্রমের হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণ আরবদের মধ্যে এই পরিমাণে ছিল, তারা তাদের বাদশাহ ও আমীরদের কোন কোন দাবি ও ফরমায়েশ পূরণ করতেও অনেক সময় আপত্তি করত। এই সম্পর্কিত একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনী ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত হয়েছে, একবার এক আরব বাদশাহ বনী তামীমের এক ব্যক্তির নিকট একটি ঘোটকী, যার নাম ছিল সিকাব, চেয়ে বসে। লোকটি ঘোটকী দিতে পরিষ্কার অস্বীকার করে এবং নিম্নোক্ত বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি করে:

"হে রাজন! এ বহু দামী ও সুন্দরী ঘোটকী; একে না ধারে দেওয়া যায়, না বিক্রয় করা যায়। আপনি একে পাবার জন্য চেষ্টা করবেন না; আপনার হাত থেকে একে ফেরানো আমার পক্ষে সম্ভব।"

এই স্বাধীনতা, আত্মশাসন, আত্মার সমুন্নতি, আভিজাত্য ও অটুট মনোবল সর্বস্তরের জনগণের মধ্যেই বর্তমান ছিল এবং নারী-পুরুষ সকলের মধ্যে পাওয়া যেত। এর একটি নমুনা আমরা হীরার শাসনকর্তা আমর ইবন হিন্দ-এর হত্যার ঘটনায় দেখতে পাই। আরব ঐতিহাসিকগণ ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমর ইবন হিন্দ বিখ্যাত আরব ঘোড়সওয়ার ও কবি 'আমর ইবন কুলছুমকে দাওয়াত দেন এবং আগ্রহ ব্যক্ত করেন, তাঁর (কবির) শাসনকর্তার মায়ের সঙ্গে দাওয়াতে যেন শরীক হন। অনন্তর 'আমর ইবন কুলছুম বনু তাগলিবের একটি জামা'আতের সঙ্গে জযীরা থেকে হীরা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং তাঁর মা লায়লা বিনতে মুহালহিলও বনু তাগলিবের কিছু সংখ্যক দায়িত্বশীল লোকের সঙ্গে রওয়ানা হন। 'আমর ইবন হিন্দের তাঁবু হীরা ফুরাতের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপন করা হয়। একদিকে 'আমর ইবন হিন্দ আপন তাঁবুতে প্রবেশ করেন এবং অপরদিকে লায়লাও। হিন্দ তাঁর মাকে বলে দিয়েছিলেন, যখন খাবার পরিবেশন করা হবে তখন নওকরদের একটু আলাদা করে দেবে এবং কোন প্রয়োজন দেখা দিলে লায়লাকে দিয়ে তা করিয়ে নেবে। অতঃপর আমর ইবনে হিন্দ দস্তরখান বিছানোর নির্দেশ দিলেন, এরপর খাবার পরিবেশ করলেন। এর ভেতর হিন্দ লায়লাকে সম্বোধন করে বলল, বোন! এই পাত্রটা আমাকে একা উঠিয়ে দাও তো! লায়লা বলল, যার প্রয়োজন সে নিজেই উঠিয়ে নিক। এরপর হিন্দ দ্বিতীয়বার চাইল এবং পীড়াপীড়ি করতে থাকল। এ সময় লায়লা চিৎকার করে উঠল, হায়! কী লজ্জা ও অপমান! ওহে বনু তাগলিব! এই আওয়াজ আমর ইবন কুলছুম শুনতেই তাঁর চক্ষু রক্তবর্ণ ধারণ করে। তিনি এক লাফে 'আমর ইবন হিন্দের সামনে ঝুলন্ত তরবারি টেনে নেন এবং তা দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। সেই সাথে বনু তাগলিব তাঁর তাঁবু লুট করে এবং জযীরার দিকে ফিরে আসে। এই ঘটনাকে উপলক্ষ করেই আমর ইবন কুলছুম সেই বিখ্যাত কাসীদা পাঠ করেন যা "ঝুলন্ত সপ্তক" (সাব 'আঃ মু'আল্লাকা)-এর অন্তর্গত।

ঠিক এমনই একটি ঘটনা সংঘটিত হয় যখন হযরত মুগীরা ইবন শু'বা (রা.) মুসলিম পক্ষের দূত হিসাবে পারসিক সেনাপতি রুস্তমের দরবারে গিয়েছিলেন। রুস্তম পূর্ণ জাঁকজমক ও শাহী ঠাঁটবাটের সঙ্গে স্বীয় সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। মুগীরা ইবন শু'বা (রা.) আরবদের অভ্যাস মাফিক রুস্তমের পাশাপাশি স্থাপিত কুরসীতে গিয়ে বসে পড়েন। তাঁর দরবারীরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে টেনে নিচে নামিয়ে আনে। এতে তিনি বলেনঃ আমরা খবর পেয়েছিলাম তোমরা নাকি খুবই বুদ্ধিমান! কিন্তু আমার চোখে তোমাদের চেয়ে বেওকুফ আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আমরা আরবরা তো সকলের সঙ্গে সমান ব্যবহার করে থাকি। আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে গোলাম বানায় না একমাত্র যুদ্ধাবস্থা ছাড়া। আমার ধারণা ছিল, তোমরাও তোমাদের জাতির সঙ্গে ঠিক তেমনি সাম্যের আচরণ করে থাকবে। এর চেয়ে এই ভাল ছিল, তোমরা আমাকে প্রথমেই অবহিত করতে, তোমরা একে অপরকে নিজদের খোদা বানিয়ে রেখেছ এবং এ বিষয়ে তোমাদের সঙ্গে নিষ্পত্তি হবে না। এমতাবস্থায় আমরা তোমাদের সঙ্গে এই আচরণ করতাম না, আর তোমাদের নিকটও আগমন করতাম না। কিন্তু তোমরা নিজেরাই আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছ।

আরব উপদ্বীপে শেষ নবী প্রেরণের দ্বিতীয় কারণ হলো, আরব উপদ্বীপেও মক্কা মুআজ্জামায় কা'বার অস্তিত্ব ও উপস্থিতি যা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এজন্যই নির্মাণ করেছিলেন যেন তাতে এক আল্লাহর ইবাদত করা হয় এবং এই জায়গাটি চিরদিনের তরে তাওহীদের দাওয়াতের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) গ্রন্থে ব্যাপক পরিমাণ বিকৃতি সত্ত্বেও "বাক্কা' উপত্যকা" শব্দটি অদ্যাবধি বর্তমান, কিন্তু অনুবাদকগণ একে 'বুকা' উপত্যকা বানিয়ে দিয়েছেন এবং একে নির্দিষ্ট জ্ঞাপকের পরিবর্তে অনির্দিষ্ট জ্ঞাপকে পরিণত করেছেন। "মাজামিরে দাউদ"-এর সমষ্টি যা আরবী ভাষায় এসেছে তা এই: "বরকতময় ও পবিত্র সেই মানুষ যার ভেতর তোমার পক্ষ থেকে শক্তি নিহিত, যাঁর অন্তরে রয়েছে তোমার ঘরের রাস্তা যিনি বুকা উপত্যকা অতিক্রমরত অবস্থায় তাকে একটি কুয়া বানান" (গীত সংহিতা, ৮৪ : ৫,৬,৭)। কিন্তু ইহুদী পণ্ডিতগণ কয়েক শতাব্দী পর অনুভব করতে সক্ষম হন, এই অনুবাদটি ভুল। অনন্তর Jewish Encyclopaedia-তে এই স্বীকারোক্তি বর্তমান, এটি এক নির্দিষ্ট উপত্যকা যেখানে পানি পাওয়া যেত না। যারা উল্লিখিত কথা লিখেছেন তাদের মস্তিষ্কে এমন একটি উপত্যকার ছবি ছিল যার ছিল বিশেষ কুদরতী অবস্থা, যার প্রতিনিধিত্ব তারা উল্লিখিত শব্দ সমষ্টি দ্বারা করেছেন। ওইসব সহীফার ইংরেজী অনুবাদকগণ অনুবাদের ক্ষেত্রে আরবী অনুবাদকদের তুলনায় অধিকতর বিশ্বস্ততা ও সর্তকতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁরা "বাক্কা" শব্দটিকে মূল সহীফার ন্যায় আবিকৃত ও বিশুদ্ধ অবস্থায় হুবহু অবশিষ্ট রেখেছেন এবং ইংরেজী "b" অক্ষরে না লিখে বড় "B" অক্ষরে লিখেছেন যা সাধারণত মূলভ-এর ক্ষেত্রে লেখা হয়ে থাকে। ইংরেজী অনুবাদ নিম্নে উদ্ধৃত করা গেল: "Blessed is the man whose strength is in thee; in whose heart are the ways of them. Who passing through the valley of Baca make it a well." (Psalm 84: 5-6). মুবারকবাদ সেই সব লোকের প্রতি যাদের সম্মান ও শক্তি রয়েছে তোমার সাথে, যাদের অন্তরে তাদের রাস্তা রয়েছে যা বাক্কা উপত্যকা অতিক্রম করবে এবং তাকে একটি কুয়া বানাবে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আবির্ভাব ছিল হযরত ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর সেই দোয়ার ফল যা তাঁরা কাবাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করতে গিয়ে ও তা নির্মাণ করার সময় করেছিলেন। দোয়াটি এই : "হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকে তাদের নিকট এক রসূল প্রেরণ কর যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট আবৃত্তি করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা বাকারা : ১২৯]

আল্লাহ তা'আলার এক চিরন্তন নিয়ম এই, তিনি তাঁর মুখলিস (একনিষ্ঠ), সাদিকীনীন (সত্যনিষ্ঠ) ও আপন মহান সত্তার সঙ্গে মিলনাকাঙ্ক্ষী ও ক্ষমা ভিক্ষার আঁচল বিস্তারকারীদের দোয়া অবধারিতভাবে কবুল করে থাকেন। আম্বিয়াই কিরাম ও নবীয়ে মুরসালদের সম্মান তাঁদের চেয়েও উচ্চে। আসমানী সহীফা ও সত্য সংবাদসমূহ এসব উদাহরণে ভরপুর। স্বয়ং তাওরাতে এর প্রমাণ বিদ্যমান, আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর এই দোয়া কবুল করেন। পুস্তকে (২০) পরিষ্কারভাবে লিখিত আছে : "এবং ইসমাঈলের অনুকূলে আমি তোমার কথা শুনলাম। দেখ, আমি তাকে প্রাচুর্য দান করব, তাকে সৌভাগ্যশালী করব এবং তাকে খুব বর্ধিত করব; তার থেকে বার জন সর্দার জন্ম নেবে এবং তাকে বিরাট বড় জাতি (কওম) বানাব।" এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেন, "আমি ইবরাহীম (আ.)-এর দোয়া ও ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদের ফসল।” তাওরাত (ওল্ড টেস্টামেন্ট) বা পুরাতন নিয়ম-এর বিকৃতি সত্ত্বেও অদ্যাবধি এর সাক্ষ্য মিলবে, এই দোয়া কবুল হয়। দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তক (১৫-১৮) মূসা (আ.)-এর ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে: "খোদাওয়ান্দ তোমার প্রভু, তোমার রব, তোমার নিমিত্ত তোমারই ভেতর থেকে তোমারই ভাইদের থেকে আমার মত একজন নবী পাঠাবেন; তোমরা গভীর মনোযোগের সাথে তাঁর কথা শুনবে।" (একওয়াকে - তোমার ভাই) শব্দ নিজে থেকেই বলে দিচ্ছে, এর দ্বারা বনী ইসমাঈলকেই বোঝানো হয়েছে, বনী ইসরাঈলের চাচার বংশধর। উক্ত সহফিতেই দুটি শ্লোকের পর এই বাক্য লিপিবদ্ধ রয়েছে। "আর খোদাওয়ান্দ আমাকে বললেন, তারা যা বলেছে তা ভালই বলেছে। আমি তাদের নিমিত্ত তাদের ভাইদের মধ্যে থেকে তোমার মত একজন নবী পাঠাব, আর আমি আমার বাক্য তার মুখে নিক্ষেপ করব এবং যা কিছু আমি তাকে বলব সে তা সব তাদেরকে বলবে।" [যাত্রা পুস্তক-২,২৮: ১৭-১৮] "আমি আমার কথা তার মুখে নিক্ষেপ করব"-এই বাক্যটি মুহাম্মদ (সা.)-কে নির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেননা তিনিই একমাত্র নবী যাঁর ওপর আল্লাহর কালাম শব্দগত ও অর্থগতভাবে নাযিল হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা তার ঘোষণাও দিয়েছেন: "এবং সে মনগড়া কথা বলে না; এতো ওহী যা তার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট হয়।" (সূরা নাজম: ৩-৪)। অন্যত্র বলা হয়েছে : "কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না, সামনের থেকেও নয়, পেছন থেকেও নয়; এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসা আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ।” [হামীম আস-সাজদা : ৪২]

এর বিপরীত বনী ইসরাঈলের নবীদের সহীফাসমূহ আদৌ এ দাবি করে না, সেগুলো শব্দগত ও অর্থগতভাবে আল্লাহর কালাম। তাদের পণ্ডিতগণ সে সবকে তাদের নবীদের দিকে সম্পর্কযুক্ত করার ক্ষেত্রে কৃত্রিমতার আশ্রয় গ্রহণ করে না। Jewish Encyclopaedia তে বলা হয়েছে : “ওল্ড টেস্টামেন্ট (পুরাতন নিয়ম)-এর প্রথম পাঁচটি পুস্তক (যেমন প্রাচীন ইয়াহুদী ধর্মীয় বর্ণনাসমূহ আমাদেরকে বলে) মূসা নবীর রচনা। শেষ আটটি শ্লোক বাদে [ যেগুলোতে মূসা (আ.)-র ইনতিকালের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে] রিব্বী (ইয়াহুদী ‘আলিম) এই বৈপরীত্য ও একে অপরের থেকে ভিন্ন বর্ণনার ওপর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে যা এসব সহীফায় এসেছে এবং এর মধ্যে আপন প্রজ্ঞা ও মেধার সাহায্যে সংস্কার-সংশোধন করে থাকে।” ইঞ্জিল চতুষ্টয়ের সম্পর্ক যতখানি, যেগুলোকে “নিউ টেস্টমেন্ট বা নতুন নিয়ম” বলা হয়, সেগুলো শব্দগত ও অর্থগতভাবে আল্লাহর কালাম হওয়ার ব্যাপারে দূরতম সম্পর্কও নেই। এ ব্যাপারে তারাই সন্দেহ নিরসন করতে পারেন যারা এগুলো পড়ে দেখেছেন। প্রকৃত ব্যাপার এই, এসব পুস্তক জীবনী ও কাহিনীমূলক পুস্তক হিসেবেই অধিক প্রতিভাত। আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব হিসেবে, যার ভিত্তি হয় ওহী ও ইলহাম, তা এতে খুবই কম দৃষ্ট হয়।

এর পরের নম্বরে আসে জযীরাতুল আরবের তথা আরব উপদ্বীপের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানের যা একে দাওয়াতের কেন্দ্র হিসেবে সর্বাধিক উপযোগী রূপ দান করেছে, যেখানে থেকেই এই দাওয়াত ও পয়গাম সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে দেয়া যায় এবং পৃথিবীর তাবৎ জাতিগোষ্ঠীকে সম্বোধন করা যায়। একদিকে এটি এশিয়া মহাদেশের একটি অংশ, অপরদিকে তা আফ্রিকা মহাদেশ, এরপর ইউরোপেরও কাছাকাছি এবং এসব সেই এলাকা যা সভ্যতা ও কৃষ্টি, জ্ঞান ও শিল্পকলা, ধর্ম ও দর্শনের সর্বদাই কেন্দ্র থেকেছে এবং যেখানে বিরাট বিস্তৃত ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য কায়েম হয়েছে। অতঃপর এই এলাকা বাণিজ্যিক কাফেলার অতিক্রমস্থলও ছিল যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের লোক একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতো। এটি ছিল কয়েকটি মহাদেশের সঙ্গমস্থল এবং এক জায়গার নির্দিষ্ট বস্তুসামগ্রী ও উৎপাদিত দ্রব্য, যেখানে এর প্রয়োজন পড়ত, সেখানে স্থানান্তরিত করত। এই আরব উপদ্বীপ দু' বিরাট প্রতিদ্বন্দী শক্তির মাঝে অবস্থিত ছিল খ্রীস্টান শক্তি ও অগ্নি উপসাক শক্তি, প্রাচ্য শক্তি ও পাশ্চাত্য শক্তি। কিন্তু এতসত্ত্বেও তারা নিজস্ব স্বাধীনতা ও আপন ব্যক্তিত্বের সর্বদাই সংরক্ষণ করেছে এবং নিজের কতিপয় সীমান্ত এলাকা ও কয়েকটি গোত্র ব্যতিরেকে তারা কখনো ঐ সব শক্তির অধীনতা স্বীকার করেনি। আরব উপদ্বীপ বিনা প্রশ্নে নির্দ্বিধায় নবুওতের এমন এক বিশ্বব্যাপী দাওয়াতের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারত যা আন্তর্জাতিক রেখার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, মানবতাকে সমুন্নত মঞ্চ থেকে সম্বোধন করবে, সর্বপ্রকার রাজনৈতিক চাপ ও বিদেশী প্রভাব থেকে পরিপূর্ণরূপে স্বাধীন হবে।

এই সমস্ত কারণে আল্লাহ্ তা'আলার আরব উপদ্বীপ ও মক্কা মুকাররামাকে রাসূল (সা.)-এর আবির্ভাব, আসমানী ওহীর অবতরণ ও দুনিয়ার বুকে ইসলাম প্রচারের বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রে ও সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্বাচিত করেন। "আল্লাহই বেশী জানেন তাঁর পয়গাম কোথায় এবং কাকে সোপর্দ করা হবে।" [সূরা আনআম: ১২৪]

টিকাঃ
১. তারিখে তাবারী, ৪খ. ৩৬ পৃ.।
২. সীরাতে ইবন হিশাম, ১ম খ., ৪৪৬ পৃ.।
৩. বারকুর গিমাদ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। একটি মত, এটা ইয়ামনের একটি দূরবর্তী এলাকা। সুহায়লী বলেন, এর দ্বারা আবিসিনিয়াকে বোঝানো হয়েছে। এর উদ্দেশে এই, যদি দূরবর্তী এলাকা পর্যন্ত গমন করেন তবুও আমরা আপনার সঙ্গে থাকব, সঙ্গ পরিত্যাগ করব না।
৪. যাদুল মাআদ, ২খ. সীরাত ইবনে হিশাম, খ. বোখারী ও মুসলিমের অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।
৫. কামিল, ইবনে আছীর, ৪খ. সাসানী আমলে ইরান, পৃ. ৫৩৫-৩৬।
৬. দ্র. সাসানী আমলে ইরান, ৫১১ পৃ.।
৭. সাসানী আমলে ইরান।
৮. এজন্য আরবী ভাষায় একটি স্থায়ী বাগধারা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। বলা হতো : কফার ফালান অর্থাৎ অমুক নত হয়ে নিজ হাত বুকের ওপর স্থাপন করে শ্রদ্ধাবশে মাথা নুইয়ে দিল। এটা ছিল ইরানের সাধারণ রেওয়াজ এবং সেখান থেকেই এই পরিভাষা সৃষ্টি হয় এবং আরবী ভাষায় প্রবেশ করে। লিসানুল আরব গ্রন্থে আছে, কফার-এর অর্থ ইরানীদের তাদের সম্রাটকে সম্মান করা এবং আহলে কিতাবদের তাকফীর এই আদাব তসলীম হিসেবে মানুষ তাঁর মাথা নুইয়ে দেবে। তারা জারীরের সেই কবিতা থেকে দলিল পেশ করত।
৯. সাসানী আমলে ইরান, ৫১১ পৃ.।
১০. মনুসংহিতা, ১০ম অধ্যায়।
১১. The Roman World. London 1928. p. 418.
১২. কিতাবু'শ শির ওয়াশ-শু'আরা, ইবন কুতায়বা, পৃ. ৩৬।
১৩. তারীখে তাবারী, ৪খ. ১০৮।
১৪. বাক্কা পবিত্র মক্কার অপর নাম। বাক্কা ও মক্কা উভয় নামই ব্যবহৃত হয়। এজন্য আরবী ভাষায় মীম ও বার মধ্যে পারস্পরিক পরিবর্তন ঘটে থাকে; যেমন লাজিম ও লাজিব এবং বালিহিত ও মালিহিত।
১৫. Vol, ii. p 415।
১৬. মাওলানা আব্দুল মাজেদ দুরিয়াবাদকৃত তফসীর মাজেদী, কাজী সুলায়মান মুনসুর পূরীর "রাহামাতুল্লিাল আলামীন", ১ম খণ্ড থেকে গৃহীত।
১৭. Jewish Encyclopaedia; Vol. 8. p. 589.
১৮. বিস্তারিত দ্র. লেখকের মনসব-ই নবুওয়ত-এর ৭ম খণ্ড বক্তৃতা খতমে নবুওয়ত এর আসমানী সহীফা কোরআন জ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে নামক অধ্যায়।
১৯. ড. হুসায়ন কামালুদ্দীন রিয়াদ ভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার সভাপতি। তিনি এক সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেন, তিনি এক নতুন ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণে উপনীত হয়েছেন, যদ্বারা প্রমাণিত হয়, মক্কা মুকাররামা পৃথিবীর শুষ্ক অংশের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। তিনি তাঁর গবেষণার সূচনা করেছেন এমন একটি চিত্র দ্বারা যেখানে মক্কা মুকাররামা থেকে পৃথিবীর অপরাপর স্থানের দূরত্ব দেখানো হয়েছিল। এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প মূল্যের এমন একটি যন্ত্রের নির্মাণ যা কেবলার দিক নির্ধারণ করবে। ইতোমধ্যে তাঁর কাছে এই সত্যও দিবালোকের মতই স্পষ্ট হয়ে গেছে, মক্কা মুকাররামা ঠিক দুনিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। এই গবেষণা দ্বারা তাঁর সামনে এই রহস্যও উন্মোচিত হয়েছে, মক্কা মুকাররামাকে বায়তুল্লাহর কেন্দ্র ও আসমানী হেদায়াতের সূচনাবিন্দু বানাবার মধ্যে আল্লাহর কি রহস্য ও কুদরত নিহিত ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00