📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস

📄 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস


নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস [রবিউল আওয়াল মাসের দিল্লি রেডিওর আমন্ত্রণে পঠিত প্রবন্ধ]

যদি আমরা পরস্পরকে জিজ্ঞেস করি: মানব জাতির ইতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিন কোনটি, যা সমগ্র মানব জাতির কাছে শীর্ষ মর্যাদা ও বিরল সম্মান পাবার যোগ্য বিবেচিত হতে পারে, যা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং মানুষ যা কখনও ভুলবে না, যা চিরন্তন দিবসের মর্যাদার অধিকারী হবে, ইতিহাসের নানা কাল আর যুগে দুই পৃথিবীর মাঝে ভেদরেখা হিসেবে চিহ্নিত হবে?

যদি আমরা পরস্পরকে জিজ্ঞেস করি: কোন্ সে দিবসটি, জাতি ধর্ম, শ্রেণী, স্তর, দর্শন-মতবাদ, চিন্তা ও ভাবধারার শত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যে দিবসে সকলেই পালন করবে মহাউৎসব, মহাআনন্দ? কারণ এ দিবসেই সমগ্র মানব জাতি সুদীর্ঘ বঞ্চনার পর চরম সৌভাগ্যের সোনালী সূর্যের আলোক দর্শনে হয়েছিল পরম ধন্য, যুগ-যুগান্তর স্থায়ী পদস্খলনের পর লাভ করেছিল পুনরুজ্জীবন।

যদি আমরা পরস্পকে জিজ্ঞেস করি: সে দিবস কোনটি, যা পৃথিবীর নবজন্মের উৎস দিবস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, বিবেচিত হতে পারে সৌভাগ্য যুগের সূচনাক্ষণ হিসেবে, যেদিন বিজয় হয়েছিল অমর্যাদার ওপর মর্যাদার, অকল্যাণের ওপর কল্যাণের, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের, শ্রেণী বৈষম্যের ওপর সাম্যের, পাশবিকতার ওপর মানবতার, পাষণ্ডতার ওপর দয়া ও ভালবাসার, বাতিলের ওপর হকের, মিথ্যার ওপর সত্যের, যেদিন বিজয় হয়েছিল জংলী জীবন ও দলীয় আইন-কানুনের ওপর সুশৃংখল জীবন বিধান ও পরিপূর্ণ আইন-শৃংখলার? এক কথায় সকল প্রকার জাহিলিয়াতের ওপর চূড়ান্ত বিজয় হয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ঈমানের।

আমরা যদি পরস্পর প্রশ্ন করি: সে কোন্ দিবসটি, যেদিন সকল অকল্যাণের মূলোৎপাটন করতে, সকল ফেৎনা-ফ্যাসাদের গতির সামনে চরম প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, আল্লাহর ওপর প্রগাঢ় ঈমান, সৎ কর্মের প্রতি উৎসাহ প্রদান ও অসৎ কর্ম থেকে নিরুৎসাহিত করতে? আল্লাহভীতি ও মানবসেবার ওপর প্রতিষ্ঠিত, চক্ষু শীলতকারী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল এক প্রচণ্ড কর্মচঞ্চল ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি; যে সমাজ জন্ম দিয়েছিল এমন সব মানুষ যাঁরা অন্তরের দিকে থেকে ছিলেন সবচেয়ে সৎ, জ্ঞানে ছিলেন সবচেয়ে গভীর, মানবতার সৌভাগ্যের লক্ষ্যে আল্লাহতায়ালা তাঁদের নির্বাচিত করেছিলেন, যাঁরা মানব জাতিকে সুপ্রাচীন গভীর তমসা থেকে বের করে এনেছিলেন আলো ঝলমল পথে, মানবতাকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্তি দিয়ে টেনে এনেছিলেন আলোর পথে এবং আল্লাহর দাসত্বের দিকে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বের করে পথ প্রদর্শন করেছিলেন পৃথিবীর প্রশস্ততার দিকে, যাঁরা এ পথে অকাতরে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন নিজেদের জানমাল, শৌর্য-বীর্য, যাবতীয় শক্তি-সামর্থ্য, ঐশ্বর্য ও হাসি মুখে বরণ করে নিতেন সকল প্রকার দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন-নিপীড়ন ও বিপর্যয়; সকল প্রকার উত্থান-পতন ও ভাঙা-গড়ার সম্মুখীন হতে হতেন না কখনও পিছপা, কোন প্রকারে বিরোধিতা ও সমালোচনা তাঁদের এ পথ থেকে পিছু হটাতে সক্ষম হতো না, বন্ধুর বন্ধুত্ব, শত্রুর শত্রুতা তাঁদের প্ররোচিত করতে পারত না কোন অন্যায় আচরণে, যাঁরা মুমিনদের প্রতি ছিলেন সদয়, বিনয়ী আল্লাহদ্রোহীর বিরুদ্ধে ছিলেন বজ্রকঠিন, আল্লাহর পথে করে যেতেন অবিরাম জিহাদ, ভয় করতেন না কোন সমালোচনা কটাক্ষের।

আমরাও যদি একে অপরকে প্রশ্ন করি, কোন্ দিনটিতে আরবরা নব জীবন লাভে ধন্য হয়েছিল? বরং সে দিনেই তারা প্রকৃতপক্ষে নব জন্ম লাভ করেছিল এবং বিশ্ব ইতিহাসের মঞ্চে প্রথমবার তাদের আবির্ভাব ঘটেছিল, অধিষ্ঠিত হয়েছিল মর্যাদার সুউচ্চ আসনে, আর তখনই তারা একটি সুসভ্য জাতির মর্যাদা লাভ করেছিল। কারণ ইতিপূর্বে তারা হাজারো দলে বিভক্ত গোত্রীয় জীবন যাপন করত। বিভক্ত ছিল আত্মঘাতী নানা দল-উপদলে, পরস্পর সংঘাতমুখর নেতৃত্বে। তারা ছিল বিশ্ব জাতিসত্তার নিভৃত কোণে বসবাসরত এক পরিচিত জনগোষ্ঠী, মানব জীবনের কোন ক্ষেত্রে তাদের ছিল না কোন পদচারণা-কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। আর না ছিল গৌরব করার মত কোন অবদান। বিশ্ব রাজনীতি ও জীবন ব্যবস্থার ওপর তাদের ছিল না কোন সম্মানজনক স্থান ও অবস্থান। নৈতিকতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে তাদের ছিল না কোন মর্যাদার আসন। মানুষের মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, ভাবধারা মূল্যবোধের ওপর ছিল না তাদের কোন কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব। পৃথিবীর লাইব্রেরী, পাঠশালা, জ্ঞান-গবেষণাগারে ও পৃথিবীর সমৃদ্ধি, উন্নতি ও অগ্রগতির ময়দানে ছিল না তাদের কোন অধিকার ও অংশীদারিত্ব। তারা অধিকারী ছিল মাত্র সামান্য কিছু কাব্যসম্ভারের, যা স্থানীয় ঘটনা প্রবাহ ও তুচ্ছ স্বার্থকে কেন্দ্র করে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহের আলোকে রচিত হতো। অবশ্য এ কাব্যের মাঝে ফুটে উঠত ভাষার অসামান্য রূপ-মাধুর্য ও শোভা-সৌন্দর্যমণ্ডিত রচনা শিল্পের অপূর্ব নৈপুণ্য। শব্দ চয়ন ও বাক্য বিন্যাসের অসাধারণ দক্ষতা, শব্দসম্ভারের পর্যাপ্ততা, এটি দ্বীপ্তিময় হয়ে উঠত তাতে কবির আত্মমর্যাদাবোধ ও স্বাধীনচিত্ততা। কবি আবৃত্তি করত আর অমনি লোকমুখে তার চর্চা হতো এবং সাথে সাথে তা ছড়িয়ে পড়ত শহর-বন্দর, গ্রামে-গঞ্জে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ঠাঁই পেত মর্যাদার আসনে। অতঃপর তা ঝুলিয়ে দেয়া হতো কাবা গৃহে। এই ছিল তার বিস্তার ও মর্যাদার সীমারেখা। না আরব জাহানের বাইরের কোন কবি-সাহিত্যিকদের জানার কোন ব্যবস্থা ও সুযোগ ছিল, আর না ছিল সভ্য দুনিয়ার কোন জীবন্ত ভাষায় তার অনুবাদের ব্যবস্থা। এ সবের পরেও আরব জনগোষ্ঠী সত্য ভাষণে, শক্তিশালী উপস্থাপনায়, চিন্তা-চেতনার স্বচ্ছতায়, সাম্যের প্রতি ভালবাসায়, সহজ-সরল ও সাদামাঠা জীবন যাপনে, প্রচণ্ড লড়াই ও লড়াইয়ের ময়দানে অপূর্ব দৃঢ়তায়, বংশধারার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তারা ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এসবে তাদের ছিল জগতজোড়া খ্যাতি। অপূর্ব চারিত্রিক সৌন্দর্য, অতিথিপরায়ণতা, বদান্যতায় ও আল্লাহপ্রদত্ত অসংখ্য গুণ, যোগ্যতা ও প্রতিভায় তারা ছিল পৃথিবীময় পরিচিত। কিন্তু অজ্ঞতা ও জাহিলিয়াতের তিমির অন্ধকারে এসব গুণ গুমরে গুমরে অশ্রুপাত করছিল, অথচ এসবের সুষ্ঠু বিকাশ ও ব্যবহার সংঘাত-বিক্ষুব্ধ ও অন্ধকার পৃথিবীতে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সংঘটিত করতে পারে মহাবিপ্লব। অশান্ত ধরায় প্রবাহিত করতে পারে শান্তির ফল্গুধারা, দিকভ্রান্ত মানবতাকে দিতে পারে সঠিক পথের সন্ধান। মানবতার দ্বারপ্রান্তে এনে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও বঞ্চিত সুখ-স্বচ্ছান্দ্য। কিন্তু যুগ যুগ ধরে এ বিকাশের সকল পথ ছিল রুদ্ধ।

অকস্মাৎ আরব উপদ্বীপে সৃষ্টি হলো নব জাগরণ। সংঘটিত হলো প্রলয়ংকরী এক মহাবিপ্লব। আরব উপদ্বীপে আবদ্ধ এ জনগোষ্ঠীর সকল সুপ্ত প্রতিভা যেন ফুলে-ফেঁপে উঠল, বিকশিত হলো! বঞ্চিত ও অখ্যাত এ জাতিসত্তা আজ পৃথিবীতে বসবাসকারী সকল জাতিগোষ্ঠীর ভাগ্য নিয়ন্তা হিসেবে ধূমকেতুর মত আত্মপ্রকাশ করল। ফিরিয়ে দিল পৃথিবীর গতি। পাল্টে দিল ধরার পট। বদলে দিল দুনিয়ার দৃশ্য। বিশ্ব সমাজে প্রতিষ্ঠিত করল নিজেদের সভ্যতা-সংস্কৃতি যা ছিল এক নতুন দ্বীন-ধর্ম থেকে সংগৃহীত, এক নতুন শক্তি থেকে আহরিত এবং আল্লাহভীতি ও আমানতদারি দ্বারা সিঞ্চিত ও পরিতৃপ্ত। আরব দ্বীপে আবদ্ধ তাদের সে ভাষা আজ নতুন পৃথিবীর পবিত্র ভাষার মর্যাদা লাভ করল। এর পাঠক-পঠন, এতে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন ও সাহিত্য জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করা, এর উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধনের প্রতি ঝুঁকে পড়ল মানবেতিহাসের সেরা মেধাবী ছাত্ররা। এ ভাষার সাথে পরিচিত লাভ করা, এতে গভীর জ্ঞানার্জন করা পবিত্র দ্বীনী কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত হলো এবং ধার্মিক ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার সোপানে পরিণত হলো যা ছাড়া কোন ব্যক্তি সে সমাজে না পারে মর্যাদার চূড়ায় আরোহণ করতে আর না পারে শিক্ষা, অধ্যাপনা, ফতোয়া, বিচার বিভাগের কোন পদ অলংকৃত করতে।

আমরা যদি একে অপরকে প্রশ্ন করি: সে কোন্ দিবসটি যে দিবস নিরাশ মানব মনে জাগ্রত হয়েছিল নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষার, ভগ্ন মানব মনে সঞ্চারিত হয়েছিল নতুন পৃথিবী গড়ার, নতুনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন-সাধ? এই দিনেই বিজয় হয়েছিল 'অশুভ'র ওপর 'শুভ'র, যা মানব জাতিকে করে রেখেছিল নিরাশ-কর্মক্ষম, যা বিস্তার লাভ করেছিল পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে? পরিবেষ্টন করে রেখেছিল সকল জাতিগোষ্ঠীকে, যা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল মানুষের মন-মানসিকতা ও বুদ্ধি-বিবেকের সুগভীরে, যা প্রভাবিত করে রেখেছিল আকীদা-বিশ্বাস ও সকল কর্মকাণ্ডকে। পরিণতিতে সকল সভ্যতা-সংস্কৃতির সলিল সমাধি হতে চলেছিল। সেখানে মানুষ মানুষের পূজা করত। নিজেদের ভবিষ্যত সম্পর্কে তারা হয়ে পড়েছিল নিরাশ। ধরাবক্ষে অবশিষ্ট থাকার সমূহ যোগ্যতা, গুণাবলী, যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ও অধিকার তারা হারিয়ে ফেলেছিল। সমগ্র মানব জাতি অবধারিত শাস্তি আর নিশ্চিত ধ্বংসের উপযুক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই দিনের সুপ্রভাত শুভাগমন তাদের জন্য আবার বয়ে আনল বেঁচে থাকার পয়গাম, এনে দিল সমাজ পুনর্গঠনের অবকাশ ও সুযোগ। তার জীবন হলো দীর্ঘায়িত, আবার ফিরে পেল বেঁচে থাকার যোগ্যতা ও অধিকার, পুনরুদ্ধার হলো হারানো গৌরব ও মর্যাদা। পুনরুজ্জীবিত হলো বিলুপ্ত আখলাক-চরিত্র, শৌর্য-বীর্য, ফিরে পেল নির্ভরশীলতা। প্রাপ্ত হলো জালেমের শাস্তি নিধান এবং মজলুমের সাহায্য যোগানোর শক্তি-সাহস। তার মর্যাদার উপযুক্ত সমাজ ব্যবস্থা লাভে সে ধন্য হলো, যা যথার্থই তার সৃষ্টির উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। গোটা সৃষ্টিকুলের লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল। এ দিবসটি ছিল তার দীর্ঘায়ু প্রাপ্তির দিবস, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার প্রাপ্তির দিবস, উন্নতি-অগ্রগতির পথে অগ্রসর হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ প্রাপ্তির দিবস। তাই যেসব ব্যক্তি এ দিবসের পর পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে, তারা সকলেই এ মহাদানের কাছে থাকবে চিরঋণী।

কোন প্রকার মতপার্থক্য সন্দেহ ছাড়া এসব প্রশ্নের উত্তর হবে এটি-সেদিন, যেদিন ধরাবক্ষে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম (সা.)। এই সে দিন, যে দিন মানবতা ফিরে পেয়েছিল তার হারানো ঈমান। যুগ যুগ ধরে সে ছিল তার অন্বেষী। এ ঈমান ছিল সকল সৃষ্টির স্রষ্টার ওপর, তার একত্ববাদের ওপর, আখেরাতের ওপর, ভাল-মন্দ কর্মের পুরস্কার ও তিরস্কারের ওপর ঈমান, মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের ওপর ঈমান। মানুষ এ মহামূল্যবান ঈমান পেয়েছে এমন সময় যখন সে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়েছিল এবং ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ ক্ষণস্থায়ী জীবন ও প্রবৃত্তির দাসত্বের প্রতি। এ ঈমান ছিল সকল প্রকার নবী-রাসূল ও পথ প্রদর্শকদের ওপর। এমন সময় যখন ধর্মে বিকৃতিসাধনকারী দানবগোষ্ঠী ধর্মকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল। তারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়ে রাখত, অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করত মানুষের সম্পদ। মানুষের মর্যাদা যখন ছিল আক্রান্ত ও ভূলুণ্ঠিত, সৃষ্টির সেরা মানুষ যখন তার মর্যাদাময় মস্তককে অবনত করেছিল পাথর, বৃক্ষ, জীবজন্তু, নদ-নদী ও পাহাড়-পর্বতের সম্মুখে। কিন্তু এই ঈমানের বরকতে সে বিশ্বাস করতে শিখল দুনিয়ার সব কিছু তারই সেবার উদ্দেশে সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টির আর সবকিছু তার সেবায়ই সদা নিয়োজিত। আর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে ‘আখেরাতের উদ্দেশে’। আজ সে মানব মর্যাদা ও ভেদাভেদের কৃত্রিম মানদণ্ড বিশ্বাস করে না, বরং মনে করে, আল্লাহভীতিই একমাত্র মর্যাদার মানদণ্ড। না আরব অনারবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর না অনারব আরবের চেয়ে। একমাত্র তাকওয়া ও আল্লাহভীতিই মর্যাদার মাপকাঠি। কারণ সকল মানুষই আদম সন্তান, আর আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। সে আজ সকলের অধিকারে বিশ্বাসী। সকলের অধিকার স্বীকৃত এবং অধিকার আদায় করা তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য। সে অন্যের অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও দয়ালু। স্বীয় অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে বিনম্র ও মধ্যম পন্থার অনুসারী। সর্বোপরি তারা কর্তব্য প্রতিপালনে সে তৎপর ও কর্মচঞ্চল। নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা সকলেই অভিভাবক, তোমাদের সকলকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নারী আজ এ সমাজে অবহেলিত ও উপেক্ষিত নয়, বরং সে পুরুষের মর্যাদাময় সহকর্মী ও সহধর্মিণী। পুরুষের যেমন নারীর ওপর অধিকার রয়েছে, যা সে যথাযথভাবে আদায় করতে বাধ্য, তেমনি নারীরও পুরুষের ওপর ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যা সে আদায় করতে বাধ্য। এ হলো ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তব শিক্ষা ও বিজ্ঞজনোচিত উপদেশমালা, যা নিয়ে আবির্ভূত হলেন মানবতার মুক্তির দূত, বিশ্ব শান্তির অগ্রপথিক, পথভ্রষ্ট মানবতার পথের দিশারী, স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত সৃষ্টির প্রতি সর্বশেষ বাণীবাহক মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.) যাঁর আবির্ভাবের ফলে ধরাপৃষ্ঠে অস্তিত্ব লাভ করে নজিরবিহীন একটি সুসভ্য কল্যাণময় পূর্ণাঙ্গ আদর্শ সমাজ। প্রতিটি যুগ ও প্রতিটি দেশেই শুধু এ উপদেশমালা ও শিক্ষার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে দিনেই পৃথিবী এসব উপদেশমালা ও বিজ্ঞজনোচিত শিক্ষার সাথে পরিচিত হয়েছে। এরপর পৃথিবীতে এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থার আর কোন উদাহরণ নেই। তবে মানব ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে এর অস্তিত্ব ও প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় যদিও তা পূর্বের ন্যায় ততটা পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ ছিল না।

ইসলামের পূর্বেকার সমাজের অবস্থা ছিল, কখনও কখনও সেসব সমাজে সংস্কার ও রেনেসাঁর স্লোগান উঠত কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা ও পরিস্থিতির চাপে তা তিমির আঁধারে অদৃশ্য হয়ে যেত। দুর্গন্ধময় সমাজ তা গ্রাণ করে ফেলত। কারণ এ রেনেসাঁ আন্দোলনের পেছনে এমন সব ব্যক্তি থাকতেন না যারা এ লক্ষ্য অর্জনের পথে নিজেদের জান, মাল, ইজ্জত, মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা- প্রতিপত্তি সবকিছু বিপদের মুখে নিক্ষেপ করে যুগের সব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে পারেন। এমন কোন দলও দৃষ্টিগোচর হতো না, যারা তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা বাজি রেখে মানবতাকে উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। কিন্তু মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)-এর আগমনে সীসা ঢালা প্রাচীরের মত মজবুত ও হিমাদ্রির মত অটল অবিচল এমন এক সংঘবদ্ধ দলের আবির্ভাব ঘটে, যাদের জীবন-মরণ সর্বস্ব উৎসর্গীকৃত ছিল মানবতার মুক্তির পবিত্র দাওয়াতের উদ্দেশ্যে। এ পথে অবিরাম জিহাদের উদ্দেশে। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন:
কুনতুম খাইরা উম্মাতিন উখরিজাত লিননা-সি তা'মুরুনা বিল মা'রুফি ওয়া তানহাওনা আনিল মুনকারি ওয়া তু'মিনুনা বিল্লাহ।
"তোমরা সেরা উম্মত, মানবতার কল্যাণ সাধনার্থে তোমাদের আবির্ভাব ঘটেছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করে থাক ও অসৎ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখ এবং তোমরা আল্লাহর ওপর ঈমান রাখ” (আল ইমরান, ১১০)। এরা এমন এক জাতি যারা এ দাওয়াতের উদ্দেশে নিজেদের প্রাণকে উৎসর্গ করে দেয়। এ দাওয়াতের উন্নতি, অগ্রগতি ও এর জীবন-মরণের সাথেই বেঁধে দেয় নিজেদের জীবন-মরণ ও ভবিষ্যৎকে।

এ নবাগত চিরন্তন জাতি, যার সাথে এ দাওয়াতের ভবিষ্যৎ যুক্ত, তাদের নেতৃত্ব দেবে আরবরা, যারা এর সর্বপ্রথম ধারক-বাহক, যারা সত্যনিষ্ঠার সাথে ঈমান এনেছিল, যারা মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে হাত রেখে শপথ করেছিল, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। নিজেদের জান-মাল ও মালিকানাধীন সব কিছুর ওপর তাঁর প্রাধান্যকে অবনত মস্তকে মেনে নিয়েছিল। নিজেদের জান-মাল, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কামনা-বাসনাকেও পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছার অধীন করে দিয়েছিল। এরাই তাঁর প্রথম নিষ্ঠাবান সঙ্গী, আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত দল। এ দাওয়াতে বিশ্বস্ত বাহক। বিশ্বের দরবারে এ দাওয়াতের নিষ্ঠাবান আদর্শ প্রতিনিধি দল। এ দাওয়াতকে গভীরভাবে বোঝার ও অনুধাবনের ক্ষেত্রে তারাই অগ্রপথিক। এ পথে সর্বাধিক জানমালের কোরবানী দিত। যারা এরই জন্য সকল প্রকার দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছিলেন, নির্দ্বিধায় শিকার হয়েছেন এ পথের সকল প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয়ের। নিজেদের ভবিষ্যতকেও দাওয়াতের ভবিষ্যতের সাথে এবং নিজেদের স্থায়িত্বকে এর স্থায়িত্বের সাথে বেঁধে দিয়েছিলেন। নিজেদের বিত্ত-বৈভব, নিজেদের সর্বস্ব বিপন্ন করে দিয়েও একে পৃথিবীর সামনে সমুন্নত করে রেখেছিলেন। এ কারণে হুযুর (সা.) বদর প্রান্তে মহৎপ্রাণ জামাত সম্পর্কে যথার্থই বলেছিলেন, হে আল্লাহ, মুষ্টিমেয় দলটি যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে ধরাপৃষ্ঠে তোমার ইবাদত হবে না (সীরাতে ইবনে হিশাম)। আল্লাহতা'আলা পৃথিবীতে এ আরবদেরকে-ই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাদেরকে দিয়েছিলেন অনন্য মর্যাদা, যখন তারা বিশ্বের দরবারে ছিল অবহেলিত ও লাঞ্ছিত। তাদের ঐশ্বর্যময় করেছিলেন, যখন তারা ছিল দরিদ্র। তাদের শক্তিশালী করেছিলেন, যখন তারা ছিল দুর্বল। তাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, যখন তারা ছিল বিভিন্ন গোত্র ও দলে বিভক্ত। তাদের ভাষাকে আধুনিক বিশ্বের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ, পবিত্র ধর্মীয় ও আন্তর্জাতিক ভাষার সম্মান দানে ভূষিত করেছিলেন, অথচ তা ছিল আরব দ্বীপে আবদ্ধ এক অখ্যাত ভাষা। পৃথিবীময় এ ভাষার প্রচার-প্রসারের এক স্থায়ী ব্যবস্থা করেছিলেন। মানুষের অন্তরে দান করলেন এর প্রতি অকৃত্রিম ভক্তি ও ভালবাসা। 'দজলা' প্রান্ত থেকে 'আটলাস পর্বতমালা' পর্যন্ত পৃথিবীর এক বিশাল জনগোষ্ঠী নিজেদের পূর্ব ভাষা পরিত্যাগ করে এ ভাষাকে গ্রহণ করল নিজেদের ভাষা হিসেবে, অথচ এ ছিল শুধু মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীদের ভাষা। আজ আল্লাহর ফজলে ও মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের বরকতে এ ভাষা লাভ করল সুবিশাল নতুন মুসলিম বিশ্বের ধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা ও লেখনীর ভাষা হওয়ার বিরল মর্যাদা। বিশ্ববক্ষে আল্লাহপাক আরবদের দান করলেন শক্তিশালী সুদৃঢ় অবস্থান ও মর্যাদা। মুসলিম বিশ্বে সকল প্রকার উত্থান-পতন, আঞ্চলিকতা ও খণ্ড জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চরমপন্থী আন্দোলনের আত্মপ্রকাশের পরেও এ মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে, যদি তারা ইসলামকেই একমাত্র দ্বীন হিসেবে মেনে চলে, ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষার ওপর প্রগাঢ় আস্থা ও বিশ্বাস রাখে, তাঁর বিধানাবলীকে নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করে, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাত ও তাঁর আনীত আদর্শকে প্রকৃত মর্যাদা দান করতে থাকে। মুক্ত কণ্ঠে ও স্বগৌরবে বিশ্বের সামনে এ কথার ঘোষণা ও স্বীকৃতি প্রদান করতে থাকে, মুহাম্মাদুর রাসুল (সা.) একমাত্র ব্যক্তি যাঁর আগমনই সমগ্র মানব জাতিকে দিয়েছিল মুক্তি, মর্যাদা ও স্বাধীনতা। আরবরা পেয়েছিল গৌরবময় মর্যাদা ও পৃথিবীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্ব।

এই সেই নতুন পৃথিবী যেখানে মানব জাতি সুখে স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পারে। এখানে সে এর ওপর বুক ফুলিয়ে গৌরব করতে পারে। সে উপভোগ করতে পারে সকল প্রকার বৈষম্যমুক্ত ন্যায্য সামাজিক ও নাগরিক অধিকার। এখানে বয়ে চলে অনাবিল স্বাধীনতা ও সাম্যের ফল্গুধারা। এখানে কোন অধিকার-বঞ্চিতের ক্রন্দন শ্রবণ করতে হয় না। অগ্রাহ্য হয় না কোন ফরিয়াদীর ফরিয়াদ। সে এমনও সব অধিকার লাভ করে, যা প্রাচীন পৃথিবীতে গুমরে গুমরে অশ্রুপাত করত, শ্বাসরুদ্ধ ও পরিত্যক্ত ছিল। কিন্তু এ দিগন্ত বিস্তীর্ণ নতুন পৃথিবীতে সভ্যতা-সংস্কৃতির ও সকল প্রকার উন্নতি-অগ্রগতির দ্বার অবারিত উন্মুক্ত। এ সে নতুন পৃথিবী, যেখানে আরবরা লাভ করল নতুন মর্যাদা, নতুন নেতৃত্ব। ধন্য হলো এক নতুন জীবন লাভে, অধিকারী হলো বিশাল এক সাম্রাজ্যের। মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব ও ইসলাম ছাড়া এ মর্যাদা অর্জন করা কোনভাবে সম্ভব ছিল না।

আল্লাহ্ তাঁর ওপর অবতীর্ণ করুন অসংখ্য দরূদ ও সালাম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অধিকাংশ সময়ই আমরা অনুভব করি না, এ মহাইনকিলাব, এ বিরল সৌভাগ্য, যার সুফল আমরা সকলেই উপভোগ করছি এবং যা থেকে আমরা গোটা মানব জাতি উপকৃত হচ্ছি, এর মূল উৎস ছিল মুহাম্মাদুর রাসূলের মুবারক আবির্ভাব, যা এ দিনেই সংঘটিত হয়েছিল। মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.) আল্লাহর শেষ নবী। সমগ্র মানব জাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশেষ দূত, শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক, সত্যের মহান দিশারী। সুতরাং এ দিবসটিই মানব ইতিহাসের সর্বাধিক গৌরবময় দিবস। তার স্মরণে মানব জাতি সগৌরব আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে অলংকৃত ভাষায় সুর লহরিত কণ্ঠে আবৃত্তি করবে: জন্ম নিল পথের দিশা/সৃষ্টি নিয়ে আলোকিত ভাই/ফুটল হাসি কালের মুখেও/পঞ্চমুখর তব প্রশংসায়।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 রসুলুল্লাহর জন্ম (সা.): এক নতুন পৃথিবীর জন্ম

📄 রসুলুল্লাহর জন্ম (সা.): এক নতুন পৃথিবীর জন্ম


প্রত্যেক মানুষের কাছেই তাঁর জন্ম দিবসটি অত্যন্ত প্রিয়। আমরা যে পৃথিবীতে বসবাস করছি তারও একটি জন্ম দিবস আছে। আর তা হলো রসুলুল্লাহর আগমনের মুবারক দিবস। এমনিতে তো পৃথিবীর বয়স অনেক দীর্ঘ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এ পৃথিবী অনেকবারই নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে, আবার জাগ্রত হয়েছে। মারা গিয়েও আবার জীবন লাভ করেছে। সর্বশেষ যে দিনে এ পৃথিবী মৃত্যুর নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়, হুঁশ ফিরে পায় এবং চক্ষু মেলে তাকায়, সে দিনটি ছিল রসুলুল্লাহর আগমনের অর্থাৎ রবিউল আওয়ালের ১২ তারিখ। কারণ এ দিনেই মক্কার প্রধান সরদার আবদুল মুত্তালিবের গৃহে তাঁর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) জন্ম লাভ করেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ইয়াতীম হয়ে, কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা করেন সমগ্র মানব জাতির এবং পৃথিবীকে উপহার দেন এক নতুন জীবন।

ঘুমন্ত অবস্থায় জীবনের যে অংশ অতিবাহিত হয়ে যায় তা তো আসলে কোন জীবনই নয় অথবা আত্মহত্যার আয়োজনে সে সময় অতিবাহিত হয়, তা কোন জীবন বলারই যোগ্য নয়। তাই সত্যি কথা বলতে কি, পৃথিবীর প্রকৃত ও কাজের বয়স চৌদ্দ শত বছরের বেশী নয়।

খৃস্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে মানবতার গাড়ী একটি ঢালু পথে এক গভীর খাদের দিকে চলতে আরম্ভ করে। অন্ধকার বিস্তার লাভ করতে থাকে। পথের উৎরাই বাড়তেই থাকে এবং ক্রমেই এর গতি দ্রুত হতে থাকে। এ গাড়ীর আরোহী ছিল বিশ্বে বসবাসরত সমগ্র মানব কাফেলা এবং আদমের সমস্ত পরিবার। হাজার বছরের সভ্যতা সংস্কৃতি, যুগ যুগ ধরে জ্ঞানী-গুণী মানুষের পরিশ্রমের ফসল এ গাড়ীতে ছিল ভর্তি। কিন্তু গাড়ীর আরোহীরা ছিল গভীর সুখ-নিদ্রায় বিভোর অথবা গাড়ীতে আরো উন্নত জায়গা দখলের প্রতিযোগিতায় মত্ত। তারা ছিল সংকীর্ণ প্রকৃতির। সহযাত্রীদের সাথে মতবিরোধ হলেই এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত একে অপর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকত। সেখানে কিছু এমন মানুষও ছিল যারা নিজেদেরই মত আরও কিছু মানুষকে হুকুমের দাস বানিয়ে রেখেছিল। কিছু তো এমনও ছিল, যারা উন্নত খানাপিনার আয়োজনে ব্যস্ত। আর কিছু ছিল গান-বাজনা ও আনন্দ উল্লাসে মত্ত। সকলেই নিজ নিজ কাজে ও নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ ফিরে দেখছিল না গাড়ী কোন্ গভীর খাদে নিপতিত হতে যাচ্ছে। একটু পরে গাড়ী ও গাড়ীর আরোহীদের পরিণতি কি হবে? গাড়ী কী ভয়াবহ পরিণতির দ্বারপ্রান্তে উপনীত!

মানবতার দেহ তরতাজা ও সতেজ ছিল। কিন্তু অন্তর ছিল মৃতপুরী, মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় ও হৃদয় অনুভূতিহীন মৃত, ধমনী অবসাদগ্রস্ত, আঁখি নিষ্প্রভ ও ঘোলাটে। মানবতা, ঈমান ও ইয়াকীনের মহামূল্যবান সম্পদ থেকে ছিল দীর্ঘদিন যাবৎ বঞ্চিত। রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত অনুসন্ধান করেও একজন ঈমান ও ইয়াকীনের অধিকারী মানুষ পাওয়া ছিল ডুমুরের ফুলের মতই দুর্লভ! সর্বত্রই ছিল সন্দেহবাদীদের রাজত্ব। মানুষ নিজেই নিজেকে অপমানের চরম গহ্বরে নিমজ্জিত করে রেখেছিল। মানুষ তারই সেবায় নিয়োজিত বস্তুর সম্মুখে মস্তক অবনত করত। মানবতার এ উন্নত শির এক আল্লাহ্ ছাড়া আর সব কিছুর সম্মুখেই অবনত হতো। হারামে সে ছিল নেশাগ্রস্ত, সুরার নেশায় বিভোর, এ ছিল তার দিবা-নিশির জীবনসঙ্গী। রাজরাজড়ারা প্রজার খুনের ওপর আয়েশ করত। অঞ্চলের পর অঞ্চল মানব বসতি তাদের অঙ্গুলি হেলনে উজাড় ও বিরান হয়ে যেত। তাদের কুকুরগুলো স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন যাপন করত, অথচ বুভুক্ষ মানবতা সামান্য দানাপানির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে ফিরত। জীবনযাত্রার মান এত বুলন্দ হয়ে গিয়েছিল, সেখানে জীবন ধারণ হয়ে গিয়েছিল সীমাহীন কষ্টসাধ্য। যে ব্যক্তি এই মানে উত্তীর্ণ হতে না পারত তাকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না, বরং তাকে চতুষ্পদ জন্তুর অন্তর্ভুক্ত করা হতো। নিত্য নতুন করের ভারে কৃষিজীবী ও হস্তশিল্প মালিকদের কোমর ভেঙে পড়ছিল, গর্দান বেঁকে যাচ্ছিল। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও কথায় কথায় সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য উজাড় এবং জাতির পর জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া তাদের বাঁ হাতের খেলা ছিল। সকলেই জীবন চিন্তার অক্টোপাসে ছিল বন্দী। জুলুম ও অত্যাচারে সমগ্র মানবতা ছিল অতিষ্ঠ। সারা দেশ অনুসন্ধান করেও এমন একজন আল্লাহর বান্দার সন্ধান করেও পাওয়া যেত না, যার মধ্যে তার সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির চিন্তা-ভাবনা অথবা সঠিক পথের অনুসন্ধিৎসা ছিল। মোটকথা, এ পৃথিবীতে নামমাত্র জীবন ছিল। প্রকৃতপক্ষে এ ছিল এক বড় ধরনের আত্মহত্যার আয়োজন।

দুনিয়ার সংস্কার-সংশোধন হয়ে পড়েছিল মানবীয় শক্তি সাধ্যের বর্হিভূত। পানি বিপদসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সমস্যা কোন এক দেশের উন্নতি অথবা কোন এক জাতির মুক্তির ছিল না। সমস্যা ছিল সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী। সমস্যা ছিল সমগ্র মানব জাতির মুক্তি ও নাজাতের এবং সমগ্র মানব জাতির হায়াত-মওত তথা জীবন-মৃত্যুর। প্রশ্ন কোন একটি অপরাধের ছিল না। মানবতার পুরো দেহ ছিল ক্ষত-বিক্ষত। তার আঁচল ছিল ছিন্ন-ভিন্ন। যারাই সংস্কার প্রচেষ্টায় এগিয়ে আসত, তারাই এই বলে পশ্চাপদ হয়ে যেত, "তোমার সর্বাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত, পট্টি বাঁধবো কোথায়?” দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক সকলেই এ ময়দানের মর্দে মুজাহিদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার সৎ সাহস দেখাতে অক্ষমতা প্রকাশ করে, বরং সকলেই এই সর্বগ্রাসী মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। নিজেরাই যারা রোগী তারা অন্য রোগীর চিকিৎসা কিভাবে করবে? যাদের নিজেদের অন্তর ইয়াকীনের আলোশূন্য অন্ধকার, তারা অন্যের অন্তরকে কিভাবে ইয়াকীনের আলোয় পূর্ণ করতে পারে? যারা নিজেরাই পিপাসায় কাতর তারা অন্যকে কোত্থেকে পানি পান করাবে?

মানবতার ভাগ্যদ্বার আজ এক ভারী তালাবদ্ধ, যার চাবির সন্ধান মিলছে না। জীবনের ফিতা জড়িয়ে গিয়েছে, যার কোন প্রান্ত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।........এই ছিল সে সময়কার গোটা মানব বিশ্বের চিত্র। কিন্তু এ পৃথিবীর মালিক ও স্রষ্টার কাছে এ অবস্থা ও এই চিত্র ছিল ভীষণ অপছন্দনীয় ও সম্পূর্ণ অসহনীয়। তাই তিনি এই অবস্থার প্রতিকারের দিকে মনোনিবেশ করলেন। সর্বশেষে তিনি আরব দেশে (যারা স্বাধীনচেতা, উদার ও মুক্ত মন-মানসিকতা এবং সহজ-সরল জীবনবোধের অধিকারী যা ছিল স্বভাব ও ফিতরাতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ) এক নবী প্রেরণ করলেন। কারণ নবী ছাড়া এ মহামারী আক্রান্ত বিধ্বস্ত ও ঘুণে-ধরা সমাজ আর কারো পক্ষে সংস্কার করা সম্ভব ছিল না। এ মহান পয়গাম্বর ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ। আল্লাহর লাখ লাখ দরুদ ও সালাম তাঁর ওপর!

এ জীবনের সব কিছু সহীহ-সালামতেই ছিল, কিন্তু তার ব্যবহার হচ্ছিল অপাত্রে। জীবনের চাকা চলছিল ঠিকই, কিন্তু ভুল পথে। প্রকৃত সমস্যা ছিল এই, জীবনের লক্ষ্যচ্যুতি হয়ে গিয়েছিল। এটাই ছিল সকল অপরাধের মূল উৎস। লক্ষ্য কি ছিল? এ লক্ষ্য ছিল নিজের, এ পৃথিবীর স্রষ্টার সঠিক পরিচয় লাভ এবং তাঁর ইবাদত-বন্দেগী ও আনুগত্যের ফয়সালা। তাঁর প্রেরিত পয়গম্বরদের মান্য করা এবং তাঁদের নির্দেশনা ও তা'লীম মাফিক জীবন যাপন করা। মৃত্যুপরবর্তী জীবনের ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখা।

নবী আগমন করলেন। মানবতার প্রকৃত সমস্যা উপলব্ধি করলেন এবং জীবনের স্থানচ্যুত লক্ষ্যকে সঠিক স্থানে স্থাপন করলেন। কিন্তু এ পথে তাকে হাজারো সমস্যা, সংকট ও সীমাহীন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হলো। নিজের গোটা পরিবারকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করে, নিজের সর্বস্ব কুরবানী করে, এ পথের সকল ঝড়-ঝঞ্ঝাকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করে, মানবতার তুফানবেষ্টিত তরীকে কূলে ভেড়ালেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি রাজমুকুট, ধন-দৌলত ও আরাম-আয়েসের বড় থেকে বড় উপঢৌকনকেও প্রত্যাখ্যান করলেন, প্রিয় মাতৃভূমি ত্যাগ করলেন, সারা জীবন আরামহীন জীবন অতিবাহিত করলেন। পেটে পাথর বাঁধলেন। কখনো উদরপূর্ণ করে খানাপিনা করলেন না। দুনিয়ার সকল বিপদ-আপদ ও সকল ত্যাগ-তিতিক্ষায় ছিলেন সবার অগ্রগামী। সকল প্রকার ভোগ-বিলাস পরিহার করলেন। তিনি ধরাপৃষ্ঠ থেকে বিদায় নেয়ার পূর্বেই পৃথিবীর সব কিছুকে সঠিক স্থানে স্থাপন করে গেলেন। পরিবর্তন করে দিলেন তিনি ইতিহাসের ধারাকে। তেইশ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তিনি পৃথিবীর গতিই পাল্টে দিলেন! পৃথিবী ফিরে পেল জাগ্রত বিবেক। জন্ম নিল সৎ কর্মের মানসিকতা। পৃথিবী শিখল ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে। উন্মুক্ত হলো আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর পথসমূহ। মানুষের সামনে মানুষ এবং তারই সেবার উদ্দেশে সৃজিত অন্য সব সৃষ্টিলোকের সম্মুখে মস্তক অবনত করার কথা আজ কেউ কল্পনাও করতে পারে না। উঁচু-নীচুর ভেদাভেদ বিদূরিত হলো। গোত্রীয় ও বংশীয় অহংকার বিলুপ্ত হলো। নারী তার অধিকার ফিরে পেল। দুর্বল ও অসহায় নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেল। দেখতে দেখতে সম্পূর্ণ দৃশ্যপটই বদলে গেল। যেখানে গোটা দেশে একজন আল্লাহভীরু মানুষ খুঁজেও পাওয়া যেত না, সেখানে লক্ষ লক্ষ এমন মানুষ জন্মলাভ করল যাঁরা দীনের আলো ও রাতের আঁধারে আল্লাহকে সমানভাবে ভয় করত, যাদের অন্তর অগাধ বিশ্বাস ও আল্লাহর ইয়াকীনে পরিপূর্ণ ছিল, যারা দুশমনের প্রতিও ইনসাফ করতে কুণ্ঠাবোধ করত না, ন্যায়ের ক্ষেত্রে স্বীয় সন্তানকেও পরোয়া করত না, যাঁরা নিজের বিরুদ্ধেও সাক্ষ্য দিতে ছিল প্রস্তুত, তারা অন্যের আরামের খাতিরে নিজেদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে দ্বিধা করত না। দুর্বলকে সবলের ওপর প্রাধান্য দিত, যারা রাত্রে ইবাদত গুজার, দিনে ছিল ঘোড় সওয়ার। ঐশ্বর্য ও রাজত্ব, শক্তি ও খাহেশাত সব কিছুর ওপর ছিল তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। শুধু আল্লাহর নির্দেশের সামনেই তাঁরা মাথা ঝোকাত। আজ তাদের একমাত্র পরিচয়, তারা আল্লাহর বান্দা। তারা অশান্ত পৃথিবীকে ইল্ম ও ইয়াকীন, ন্যায়-নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও আল্লাহর যিকিরে পূর্ণ করে দিল। যমানার রথ গেল বদলে। শুধু মানুষই নয়, গোটা পৃথিবীটাই বদলে গেল!

এই ঐতিহাসিক বিপ্লব ও জগতজোড়া এই পরিবর্তন সংঘাত-বিক্ষুদ্ধ ধারায় প্রেরিত আল্লাহর সেই পয়গাম্বরের অনন্য শিক্ষারই ফল ছিল। সমগ্র মানব জাতির ওপর কোন মানুষ এমন এহসান ও অনুগ্রহ করেন নি যেমনটি করেছেন মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। যদি মুহাম্মদ (সা.)-প্রদত্ত অনুগ্রহসমূহ ফিরিয়ে নেয়া হয়, তবে মানব সভ্যতা হাজার হাজার বছর পিছিয়ে যাবে আর বিশ্বমানবতা হারাবে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু।

বেলাদতে নববীর এই দিনটি কেন মুবারক হবে না? আজকের এ দিনেই তো দুনিয়ার সবচেয়ে মুবারক মানব ধরাপৃষ্ঠে আবির্ভূত হয়েছিলেন যিনি এ পৃথিবীকে দিয়েছেন নতুন ঈমান, নতুন জীবন।

কবির ভাষায় “ধরাব্যাপী বসন্তের এ সমারোহ তাঁরই অবদান।"

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 হেরা গুহার আলো

📄 হেরা গুহার আলো


আমি জাবালে নূরে আরোহণ করলাম। এই নূর পর্বতের সেই বিখ্যাত গুহাটিতে গিয়ে দাঁড়ালাম যার নাম হেরা গুহা। এখানে দাঁড়িয়ে আমি আমার মনকে বললাম, এই সেই গুহা যেখানে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয়তম রাসূলকে নবুওয়াত দান করেছিলেন। এই সেই গিরিকন্দর যেখানে তাঁর প্রিয় নবীর প্রতি সর্বপ্রথম ওহী নাযিল করেছিলেন। সুতরাং যথার্থভাবেই বলা যায়, যে সূর্যের বিমল কিরণ সারা জাহানকে আলোকিত করেছিল সেই সূর্যের প্রথম উদয় হয়েছিল এইখানে। অতঃপর পৃথিবী লাভ করেছিল নব জীবন।

এই পৃথিবী প্রতিদিনই একটি নতুন প্রভাতকে আলিঙ্গন করে, স্বাগত জানায়। কিন্তু সাধারণভাবে পৃথিবী তার এই নতুন প্রভাতে কোন নতুনত্ব পায় না, কোন চমক খুঁজে পায় না। খুঁজে পায় না নতুন প্রভাতে নতুন কোন সৌভাগ্যের পরশ। তাই নতুন প্রভাতের আগমনে পৃথিবীর অধিবাসীরা জেগে ওঠে। তারা ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসে কিন্তু তাদের অন্তরনিদ্রা ভাঙ্গে না। অলস নিদ্রায় ডুবে থাকে তার অন্তরাত্মা। এই নিদ্রার কোন শেষ নেই। এই মিথ্যা প্রভাতেরও কোন অন্ত নেই, অথচ এই গিরিকন্দর থেকে যে প্রভাত সূচিত হলো, হেরা গুহার এই গর্তে যে সূর্যের উদয় হলো সে ছিল এক ভিন্ন প্রভাত, বরং সে ছিল এক সুবহে সাদিক যার আলোয় উজালা হলো সারা জগত। জাগৃতি এল সব কিছুতে, এই প্রভাতেই ইতিহাস খুঁজে পেল নতুন মোড়, নতুন পথ। নতুন রাঙিয়ে রোল উঠল পৃথিবী, যুগ। সত্যিকার অর্থে এটাই ছিল এক নতুন সকাল।

এই প্রভাতের আগে মানবতার স্বভাবজাত উন্নতি থেমে গিয়েছিল। উন্নতির সব পথ ছিল তালাবদ্ধ। মানব উন্নয়ন ও বিকাশের সব দরজা রুদ্ধ ছিল। মানুষের বিবেকগুলোও ছিল তালা মারা। সে সময়ের চিন্তাবিদ দার্শনিকরা বিবেকের সেসব জট খুলতে পারেন নি। মানুষের হৃদয়ের তালা ঝুলছিল। ওয়ায়েজ, সাধক, সংস্কারকরা সেই তালাও খুলতে পারেন নি। মানুষের প্রতিভাগুলোও ছিল তালাবদ্ধ। সমকালীন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সমাজ ব্যবস্থা কোনটাই সেই তালা খুলতে সাহস করেনি, সক্ষম হয়নি। সেকালের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশেষ কোন অর্থবহ ছিল না। সেকালের বিদ্বান, শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষকমণ্ডলীও এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অর্থবহ করতে অক্ষম ছিলেন। আদালতের স্থান প্রাঙ্গণ ছিল ঠিকই। কিন্তু ইনসাফের দরজা ছিল বন্ধ। অসহায় ফরিয়াদীর কান্না শোনার সেখানে কেউ ছিল না। বংশ ও দ্বন্দ্ব নিরসনে ছিল অসহায়। শাহী দরবারগুলোর দরজা ছিল অনেক উঁচুতে। মেহনতী কিষাণ, অসহায় দিনমজুর আর নির্যাতিত প্রজারা সেই দরজা পর্যন্ত কোনক্রমেই পৌঁছতে পারত না। ধনকুবের আর বিত্তবানদের দরজা ছিল তালাবদ্ধ। নিঃস্বজনদের ক্ষুধা তাদের স্ত্রীদের নাঙ্গা বদন আর দুগ্ধপায়ী শিশুদের কান্নার অবিরাম আর্তনাদও বিত্তবানদের দরজা খুলতে পারেনি।

অনেক বড় সংস্কারক কঠিন প্রত্যয় ও অঙ্গীকার নিয়ে ময়দানে পদার্পণ করেছেন। অনেক বড় আইনপ্রণেতা পাহাড়সম হিম্মত ও স্বপ্ন নিয়ে ময়দানে এসেছেন। কিন্তু তারা জীবন সংসারের এই অসংখ্য তালা থেকে একটি তালাও খুলতে পারেন নি। কারণ এসব তালার প্রকৃত চাবি তাদের হাতে ছিল না। এই চাবি হারিয়ে গিয়েছিল অনেক আগে। আর তালাতো তার নিজস্ব চাবি ছাড়া খোলা যায় না।

তারা তাদের নিজেদের তৈরী চাবি দ্বারা অবশ্য খোলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই চাবি তালায় বসাতেই পারেন নি। অনেকে আবার তালাগুলোই ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছেন। কিন্তু তালা ছিল এত শক্ত, উল্টো তাদের আসবাবপত্রই গুঁড়িয়ে গেছে। আহত বিক্ষত হয়েছে তাদের হাত।

ঠিক এই সময় সভ্য জগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বাহ্যত হতমান গুমনাম ছোট্ট একটা পর্বতের ওপর মহান প্রভু হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে রিসালাতের মহামহিম মর্যাদায় ভূষিত করলেন; আর বিশ্বমানবতা ফিরে পেল শত শত বছরের হারানো সেই চাবি যে চাবির অভাবে পৃথিবীর সেই কঠিনতম গ্রন্থিকে পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিক, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক মিলেও উন্মোচন করতে পারেন নি; যে সমস্যার জট খুলতে পারেনি পৃথিবীর নামী দামী দেশের সকল রাজধানী। আর সেই চাবি হলো ঈমান। আল্লাহর প্রতি ঈমান, রাসূলের প্রতি ঈমান, আখিরাতের প্রতি ঈমান।

মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.) 'গারে হেরা' হেরা গুহা থেকে এই চাবি নিয়ে নেমে আসলেন মানুষের সমাজে। শতবর্ষের তালাবদ্ধ সকল দরজা এক এক করে খুলে দিলেন তিনি। জীবনের সকল কপাট খুলে গেল। বদ্ধতার বদলে সর্বত্র পরিলক্ষিত হলো মুক্তি।

তিনি যখন নবুওয়াত ও রিসালাতের এই চাবিটি তালাবদ্ধ বিবেকের ওপর রাখলেন তখন বিবেকের সব গ্রন্থি আলগা হয়ে গেল। বিবেকের সকল বক্রতা, প্যাঁচ ও জটিলতা কেটে গেল। তার চিন্তায় উদ্যম এল। এখন সে তার নিজের ভেতর ও আবিশ্ব পৃথিবী ও সুউচ্চ আকাশমণ্ডলীতে আল্লাহর অসীম কুদরত দেখতে পায়। সৃষ্টির বিচিত্র লীলায় ডুবে সে আবিষ্কার করে তার সৃষ্টিকর্তাকে। শত পূজ্যের পর্দা ভেদ করে আবিষ্কার করে নূরময় এক অদ্বিতীয় সত্তাকে। সে এখন মুক্ত বিবেক। তার চিন্তায় এখন শিক মূর্তিবজন আর ধারণাপ্রসূত পূজাপাটের কানাকড়ির দাম নেই, অথচ ইতোপূর্বে বিবেক এসব বিষয়ে অনুপ্রবেশ করার সাহসই করেনি, বরং শত শত বছর ধরে সে তার আসল থেকে বঞ্চিত বিতাড়িত ছিল। বিবেক ছিল বিবেকশূন্য।

এই চাবির পরশে মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.) মানুষের আত্মার তালা খুলে দিলেন। জেগে উঠল তখন ঘুমন্ত হৃদয়। তার মৃত অনুভূতি ও চেতনায় চাঞ্চল্য এল। জীবন এল সবখানে। আত্মার বাধা-নিষেধ থেকে মুক্ত যে নফস এতদিন কেবল মন্দ কাজের আদেশ দিত, এখন আত্মার সক্রিয় সঞ্চালনে সেই নফস-ই হলো নাফসে লাওয়ামা। এখন আর সে মন্দ কাজের আদেশ করে না, বরং মন্দ কাজের তিরস্কার করে, নিন্দাবাদ করে। অবশেষে দেখতে দেখতে সেই নাফস-ই বনে গেল নাফসে মুতমাইন্না। এখন আর সেখানে অন্যায় প্রবেশের কোন পথ নেই। অপরাধ এখন তার জন্যে চূড়ান্ত অসহ্য যার ফলশ্রুতিতে এখন পাপী নিজেই মুহাম্মদুর রাসূল (সা.)-এর দরবারে এসে স্বীয় পাপের স্বীকৃতি জানিয়ে জীবনের কঠিনতম শাস্তি প্রার্থনা করে নিজেরই বিরুদ্ধে।

এক গোনাহগার নারী! নবীজীর দরবারে এসে পাথর মারার শাস্তি প্রার্থনা করেছেন নিজের বিরুদ্ধেই। রাসূল (সা.) শরীয়তসম্মত কারণেই তাঁর শাস্তি বিলম্বিত করেন। তিনি চলে যান তাঁর গ্রামের নিবাসে, অথচ তাঁর প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্যে কোন সিআইডি নেই। তাকে পুনর্বার দরবারে উপস্থিত করার জন্যে কোন পুলিসও নেই। কিন্তু তিনি যথাসময়ে মদীনায় উপস্থিত। উপস্থিত হয়ে শাস্তি লাভের জন্যে রীতিমত পীড়াপীড়ি, অথচ সেই শাস্তি মৃত্যুর চাইতেও ভয়াবহ কঠিন!

ইরান এখন বিজিত হলো তখনকার কথা! এক গরীব ফৌজী! তার হাতেই এসে পড়েছে কিসরার মুকুট। সময়ের সবচে' দামী সম্পদ। তিনি কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে সেই মুকুট পৌঁছে দিচ্ছেন আমীরের খেদমতে। গোপনে দিচ্ছেন এই কারণে, যাতে আমানত আদায় হয় যথাযথভাবে আবার তার আমানতদারীরও প্রদর্শনী না হয়।

মানুষের হৃদয়গুলোতেও তালা ঝুলছিল। শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা ছিল না তাতে। আল্লাহর ভয়ও ছিল না। প্রাকৃতিক কোমলতা ও আর্দ্রতা কিছুই ছিল না। কিন্তু যখন তিনি তাঁর নবুওয়াতী চাবি বুলিয়ে দিলেন মুহূর্তে বদলে গেল হৃদয়ের অবস্থা। অতি সামান্য ঘটনা থেকেও বিরাট বড় শিক্ষা গ্রহণ করে। স্বীয় সত্তা ও পৃথিবীব্যাপী ব্যাপ্ত যে কোন নিদর্শনই তাদের বিশ্বাস ও আত্মায় শক্তি যোগায়। নির্যাতনের বেদনাবিধুর দশা তাদের অন্তরে যাতনার ঝড় তোলে। এখন আর তারা অসহায় গরীব-দুঃখীকে ঘৃণা করে না, তাচ্ছিল্য করে না, বরং ভীষণভাবে ভালবাসে।

মানুষের সুপ্ত বন্ধ্যা প্রতিভায় যখন আঘাত করল এই চাবি, তখন এতদিন মানুষের অনিষ্ট সাধনে ঘর্মক্লান্ত প্রতিভাই হঠাৎ করে আভাময় হয়ে উঠল। প্রচণ্ড সয়লাবের মত তরঙ্গময় হয়ে উঠল তাদের সুপ্ত লুপ্ত সব শক্তি ও প্রতিভা। দিকভ্রান্ততার অন্ধকার থেকে উঠে এসে শুদ্ধ পথের যাত্রী হলো। ফলে এতোদিন যারা বকরী ভেড়ার ফেরী করে ফিরত তারাই এখন জাতির কর্ণধার হলো, জাতি থেকে বিশ্ব পর্যায়ের নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করল তারাই। যিনি ইতোপূর্বে একটি গোত্র কিংবা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন কিংবা ছিলেন খ্যাতনামা এক অশ্বারোহী যুবক, এখন তার নেতৃত্বেই দেশের পর দেশ জয় হতে লাগল, শক্তি ও দর্পে আকাশছোঁয়া খ্যাতির অধিকারী রাষ্ট্র ও শক্তি নত মস্তকে পরাজয় স্বীকার করতে লাগল তারই সম্মুখে।

তিনি এই চাবি দ্বারা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালাও খুলে দিলেন। তালা খুলে দিতেই সেখানে সাড়া জাগল নব জীবনের। অণুতে-পরমাণুতে দোলা জাগল নতুন সাধের, নতুন স্বপ্নের, অথচ ইতোপূর্বে এখানে স্তূপ পড়েছিল বরফের। বিদ্যার উষ্ণতা না প্রতিষ্ঠানে ছিল, না ছিল শিক্ষকদের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কোন আকর্ষণ ছিল না। আন্তরিকতা কিংবা আদৌ উন্মাদনা ছিল না কোথাও। তিনি (সা.) জ্ঞান-বিদ্যার মর্যাদার কথা সকলকে বললেন। জ্ঞানীদের মহান মর্যাদা ও সম্মানের কথা তুলে ধরলেন সকলের সামনে। ইসলাম ও বিদ্যার পারস্পরিক সম্পর্কের কথাও বললেন। তখন সকলেই বিদ্যার প্রতি ইল্ম ও জ্ঞানের প্রতি প্রচণ্ড অনুরাগী হয়ে উঠল। তাদের ঝোঁক সৃষ্টি হলো বিদ্যা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি। তারা সক্রিয় সচেষ্ট হলো। দেখা গেল মুসলমানদের প্রতিটি নিবাস প্রতিটি মসজিদ একটি মাদরাসায় একটি বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রত্যেক মুসলমানই একজন শিক্ষার্থী এবং অন্যের জন্যে একজন শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। কারণ ইসলামে জ্ঞানার্জনের মর্যাদা অসীম।

আদালতের রুদ্ধ কপাট খুলে দিলেন তিনি এই চাবি দিয়েই। আদালতের বদ্ধ কপাট খুলে যেতেই সেখানকার সকল বিচারক ন্যায়বান বিশ্বস্ত বিচারকে পরিণত হলো। তাদের মধ্যে ন্যায় ও ইনসাফের অনুভূতি ব্যাপ্তময় হয়ে উঠল। মুসলমানগণ কেবলই সত্যের খাতিরে সত্য সাক্ষ্য দেয়াটা নিজেদের কর্তব্য বলে ভাবতে লাগল। আল্লাহ্ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস যখন প্রতিষ্ঠিত হলো তখন ইনসাফ ও নীতির উচ্চারণ এমনিতেই সমুন্নত হলো। আল্লাহ্ ও ঈমানের অনুভূতি যখন জাগ্রত হলো তখন অন্যায়-অবিচার ও মিথ্যা সাক্ষ্য সবই বিলীন হয়ে গেল।

মানুষের সামাজিক লেনদেন তো রসাতলে গিয়েছিল! পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, এমন কি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও ব্যবধান ছিল বিস্তর। বিভেদ, স্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রিক লাভ-লোকসানের এই দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা সমাজের সর্বত্র ঘনায়মান ছায়ার মত বিস্তার করেছিল। সর্বত্রই ছিল কেবল আত্মস্বার্থ। কিছু খরিদ করলে সাড়ে ষোল আনায় বুঝে নিতে আলসেমি করত না। আর দিতে গেলে ভাবত কেবল ঠকাবার কথা। পবিত্র কুরআনে এর বিবরণ দেয়া হয়েছে এভাবে:
"তারা যখন অন্যের কাছ থেকে গ্রহণ করে তখন পরিপূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন মেপে দেয় তখন দেয় পরিমাণে কম।"

মুহাম্মদ রাসূল (সা.) তাঁর নববী চাবির ছোঁয়ায় সমাজের এই ভয়ানক বদ্ধতা ও সংকীর্ণতাও খুলে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে গভীর ঈমান, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার দীপ্ত প্রত্যাশা, পরকালের প্রতি ভরাট কামনা ও শংকায় তাদের ভেতরগুলো পূর্ণ করে দিয়েছেন। তাদেরকে শুনিয়েছেন আল্লাহর বাণী:
“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদের সকলকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গিনীকে এবং সেই যুগল থেকেই ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রচুর নারী ও পুরুষ। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যার উসিলা নিয়ে তোমরা পরস্পরে যাঞ্চা কর এবং আত্মীয়তার প্রতি লক্ষ্য রেখ। নিশ্চয় আল্লাহতা'য়ালা তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।" [সূরা নিসা : ১]

তিনি সমাজের প্রতি পরিপূর্ণ দৃষ্টিপাত করলেন। সমাজের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি কিছু দায়িত্ব আরোপ করলেন এবং এভাবেই তিনি পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজালেন। প্রতিষ্ঠিত করলেন পূর্ণাঙ্গ ন্যায়, ইনসাফ, প্রেম-প্রীতি ও সততার ওপর। অধিকন্তু তিনি মানব সমাজকে করে তুললেন নীতিসচেতন। সমাজের প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সততা ও আমনতদারির গভীর অনুভূতি ও আল্লাহভীতির এমন শিকড়স্পর্শী চেতনা জাগ্রত করে তুললেন, সমাজের নেতৃশ্রেণী পর্যন্ত সাচ্চা পরহেজগার ও সরল জীবনের উন্নত নমুনায় রূপান্তরিত হলো। সমাজের নেতারা নিজেদেরকে সমাজের সেবক মনে করতে শুরু করেছে। সরকারপ্রধানরা নিজেদেরকে একজন এতীমের অভিভাবকের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারতেন না। নিজের ব্যক্তিমালিকানায় কিছু থাকলে সরকারী সম্পদের প্রতি কখনোই হাত বাড়াত না। তাও না থাকলে বেঁচে থাকার মত সামান্য ভাতার ওপরই তুষ্ট থাকত। এভাবেই রাজা-বাদশাহ ও ধনবান ব্যবসায়ীদের মধ্যে পার্থিব সব কিছুর প্রতি বিরাগ আর পরকালের প্রতি অগাধ অনুরাগ সৃষ্টি হয়। তিনি তাদেরকে বলেছেন: সম্পদের প্রকৃত মালিক তো আল্লাহ। তিনি খরচ করবার জন্যে তোমাদেরকে তাঁর প্রতিনিধি করেছেন মাত্র। ইরশাদ হয়েছে:
"আল্লাহ্ তার সম্পদে তোমাদেরকে যে প্রতিনিধিত্ব দিয়েছেন তোমরা তা থেকে খরচ কর।" [সূরা হাদীদ : ৭]

"আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন তা থেকে অসহায় লোকদেরকে দান কর।" [সূরা নূর]

আর যারা আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করে না, সম্পদ সঞ্চিত গচ্ছিত করে রাখে, তাদেরকে হুঁশিয়ার করেছেন এভাবে:
"আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে। সেদিন বলা হবে, এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার।" [সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫]

রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় পয়গাম ও দাওয়াত দ্বারা যাদেরকে গড়ে তুলেছিলেন তারা যখন সমাজ প্রাঙ্গণে অবতীর্ণ হলেন তখন তাদের মধ্যে ছিল আল্লাহর প্রতি খাঁটি বিশ্বাস, সত্যের প্রতি অসীম প্রেম, আল্লাহর প্রতি সীমাহীন ভালবাসা, আমানত ও সত্যবাদিতার পতাকাবাহী, আখিরাতের জন্যে পার্থিব সব বিসর্জন দেয়ার প্রগাঢ় ক্ষমতা ও বস্তুর ওপর বিজয়ী আত্মিকতা। অধিকন্তু তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, এই পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে সকলই আমাদের জন্যে। কিন্তু আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে শুধুই পরকালের জন্যে।

এ কারনেই তারা যখন ব্যবসার ময়দানে অবতরণ করতেন তখন তারা পরিপূর্ণ ঈমানদার ও সত্যবাদী বলেই প্রমাণিত হতেন। মজদুরী করলে তাতেও নেহাৎ মেহনতী ও নিষ্ঠাবানের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতেন। তাদের কারো কাছে বিত্ত থাকলে সেই সাথে আন্তরিকতা, দয়া ও দানশীলতাও সঞ্চিত থাকত। তাদের কেউ গরীব হলে একান্ত বিপদ ও ঝুঁকির মুহূর্তেও তারা আত্মমর্যাদাকে আহত করতেন না। আর বিচারকের চেয়ারে অধিষ্ঠিত হলে উপলব্ধি, বিশ্বাস ও ন্যায়পরায়ণতার প্রমাণ অবশ্যই রেখে যেতেন। রাজত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হলে সেখানে অবশ্যই চিত্রিত হতো এক নিঃস্বার্থ নিষ্ঠাবান শাসকের আলোকিত রূপ। মালিক ও মনিব হলে তারা হতেন দয়ার্দ্র কোমলমনা মালিক ও মনিব। চাকর হলে তার প্রতিটি পদক্ষেপে ঝরে পড়ত চঞ্চলতা, সততা ও আনুগত্য। জাতির সম্পদের রক্ষক নিযুক্ত হলে সেখানে দিতেন একান্ত জাগ্রত সচেতন এক বিজ্ঞ রক্ষকের পরিচয়।

মূলত এদের ইট-পাথর দিয়েই নির্মিত হয়েছিল ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার সৌধ। এর ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি। এ কারনেই সেকালের সমাজ ও রাষ্ট্র ছিল নাগরিকদের চরিত্র-স্বভাবের এক উন্নত বিকাশালয়। সদস্যের ভিন্ন ভিন্ন গুণের সুন্দর সমন্বয় ঘটেছিল সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে। সেখানে ব্যবসায়ীর সততা ও বিশ্বস্ততা ছিল। গরীব অসহায় জনদের আত্মমর্যাদাবোধ ও ক্লেশ সহ্য করার চিত্র সেখানে ছিল। মজদুরের পরিশ্রমী মন ও কল্যাণকামিতা ছিল। ধনবানদের বদান্যতা ও সহমর্মিতার রূপরসও ছিল সেখানে। সেখানে বিচারকের বিচক্ষণতা ও ইনসাফ ছিল। শাসকের নিষ্ঠা ও সাধুতার আলো ছিল। মনিবের দয়ার্দ্রতা ও আন্তরিকতা সেখানে ছিল। গোলাম ও চাকরের আনুগত্য, কর্মচঞ্চলতা ও ধৈর্য ছিল সেখানে। সেখানে আরও ছিল প্রহরী ও সম্পদ রক্ষকের পরিপূর্ণ সতর্কতা দীপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ। অর্থাৎ রাজ্য ও প্রজা উভয় দিক থেকেই ছিল সমৃদ্ধ ও কল্যাণপূর্ণ। প্রজাদের সকল সুন্দর গুণে আলোকিত উদ্ভাসিত ছিল সেই রাজ্য। রাজ্যের সর্বত্র সততা, স্বচ্ছতা, নিয়মানুবর্তিতা ও শৃংখলা সমানভাবে বিরাজমান। জনগণের সম্পদ লুট করার পরিবর্তে তখন তাদেরকে বিশ্বাসের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা হতো প্রশাসন থেকে। আর এ কারণেই সমাজ ও নাগরিকের জীবন বৃক্ষের পত্রে পত্রে ঝরে পড়ত বসন্তের যৌবন আর সর্বত্র অনুভূত হতো স্বর্গীয় স্বভাব সৌরভের অতুগ্র গন্ধ, মনমাতানো সুরভি।

হেরা গুহায় দাঁড়িয়ে আমি মনে মনে এসব কথা ভাবছিলাম। আমি ভাবনা ও অতীতের স্মৃতির দরিয়ায় এমনভাবে ডুবে গিয়েছিলাম আমি ভুলেই গিয়েছিলাম নিজের অস্তিত্বের কথা। আমার ভাবনা-কল্পনা আমাকে আমার বর্তমান ও চারপাশের পৃথিবী থেকে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আমার ভাবনাগুলো তখন সেই হারানো দিনের সোনালী স্মৃতির ছবি আঁকছিল। সেই ছবিতে আমি অতীত দিনের বিমল কান্তি প্রাণভরে আস্বাদন করছিলাম। খুঁটে খুঁটে দেখছিলাম তার প্রতিটি অঙ্গকণা। আমার তখন মনে হচ্ছিল আমার চারপাশে ছেয়ে আছে সেই সোনালী দিনের সব আয়োজন। আমি সেই সুরভিত সমাজের স্বর্গীয় গন্ধ প্রাণভরে উপভোগ করছি। কল্পনার এই ভুবনেই মনে হলো সেই সময়ের কথা, সত্যিকার অর্থে যেই সমাজে আমি এখন বসবাস করছি যেমন পরিবেশে এখন আমি আছি সেই পরিবেশের কথা মনে হলো। তখন আমার মনে হলো আজও তো জীবনের সর্বত্র বেশ কিছু নতুন তালা ঝুলছে! চারপাশে কত বিচিত্র ধরনের সমস্যা! কত শত সংঘাত-দ্বন্দ্ব আর জটিলতা। আচ্ছা, সেই পুরানো চাবিটি দিয়ে কি এই নতুন তালাগুলো খোলা যায় না?

আমার মনে এই প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে উঠল। আমি তখন ভাবলাম, আমাকে আগে এই তালাগুলো ভাল করে দেখে নিতে হবে। এর ধরন-প্রকৃতি না জানার আগে কিছু বলা ঠিক হবে না। অতঃপর আমি যখন এই তালাগুলো হাতে নিয়ে দেখলাম তখন বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠল। আমি দেখলাম, এগুলো কোন নতুন তালা নয়। এগুলো সেই পুরান তালাই। নতুন কেবল তার রং। সাথে কিছু জটিলতার যোগ হয়েছে। কিন্তু শেকড় সেই পুরানোই।

এখনও মূল সমস্যা ব্যক্তি। ব্যক্তির সমস্যাই সব সময় মূল সমস্যা ছিল। কারণ সমাজ সভ্যতার ভিত্তি নির্মিত হবার ক্ষেত্রে ব্যক্তি হলো তার ইটস্বরূপ। সমাজ ও দেশ এই ইট দিয়েই নির্মিত প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ এই ব্যক্তির সবচে' বড় সমস্যা হলো সে এখন বস্তু ও শক্তির বাইরে কোন কিছু মানতে প্রস্তুত নয়। তার মতলব একটাই—মন ও প্রবৃত্তির অনুসরণে চাহিদা পূরণ। তার কাছে এই পার্থিব জগতের দাম প্রকৃত মূল্যের চাইতে অনেক বেশি। ভোগ ও বিলাসের পূজায় সে আত্মহারা। আল্লাহ্, রাসূল আর আখিরাতের সাথে তার কোনই সম্পর্ক নেই। ব্যক্তি পর্যায়ের এই অধঃপতনই মূলত সমাজ ব্যবস্থার সকল অধঃপতন ও বিপর্যয়ের উৎস। সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুর্ভাগ্যের মূল বিন্দুও এটাই।

পতিত এই ব্যক্তি যখন ব্যবসা করতে যায় তখন তার থেকে লোভ ও সঞ্চয়ের নিকৃষ্টতম রূপই প্রকাশ পায়। দ্রব্যমূল্যের নিম্নগতির সময় মালপত্র গুদামজাত করে তারাই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং দ্রব্যমূল্যের চড়া গতির সময় তা বাজারে ছেড়ে দেয়। এতে তারা অধিক লাভবান হয় আর সাধারণ মানুষ মরে ক্ষুধা-তৃষ্ণায়। এই ব্যক্তি যখন দরিদ্র হয়ে পড়ে তখন চেষ্টা করে নিজে পরিশ্রম না করে অন্যের পরিশ্রমের ফল বসে বসে ভোগ করতে। এরা শ্রমিক হলে চেষ্টা করে কাজে ফাঁকি দিয়ে মূল্য পারিশ্রমিক ষোলআনা বুঝে নিতে। এরা ধনী হলে সেই সাথে সেরা কঞ্জুস, কৃপণ ও কঠিনহৃদয় হয়। হাতে ক্ষমতা আসলে সততার ধার ধারে না। মালিক হলে স্বার্থ আর অত্যাচারই তার ভূষণ হয়। এরা নিজের বাইরে কারও মধ্যে লাভ ও শান্তি দেখতে চায় না। কর্মচারী হলে কাজে ফাঁকি দেয়। সম্পদের সংরক্ষক নিযুক্ত হলে ধোঁকা ও চুরি করতে বিন্দুমাত্র আলসেমি করে না। মন্ত্রী কিংবা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হলে উদর পূজারী হিসেবেই কাটে তার জীবন। তাদের কেউ নেতা হলে নিজেকে বেশ প্রগতিশীল বলে প্রচার করলেও স্বীয় সম্প্রদায় ও দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যেতে পারে না। অধিকন্তু সে নিজের দেশ ও জাতির সম্মান প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কত দেশ ও জাতির সম্মান ভূলুণ্ঠিত করে তার কোন হিসেবে থাকে না। আইন প্রণয়নের সুযোগ কখনো হাতে এলে জুলুম নির্যাতন আর ট্যাক্সের এমন বোঝা জাতির ওপর চাপিয়ে দেয় জাতি আর শির দাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। আবিষ্কারের ক্ষমতা মাথায় থাকলে আবিষ্কার করে কেবল বিধ্বংসী যন্ত্র। গ্যাস-ট্যাংক-কামান-গোলা-বারুদসহ বিষাক্ত ভয়ংকর সেই আবিষ্কার থেকে মানুষ তো বটেই স্বাভাবিক পৃথিবীর অন্য প্রাণীরাও মুক্তি পায় না। মানুষের বসতি হয় বিরান গণকবরস্থান।

এটা স্বাভাবিক কথা, ভালো মানুষের সমন্বয়ে গঠিত সমাজ ও দেশ যখন সকল কল্যাণময় আলোকিত গুণের স্বচ্ছ দর্পণ হবে তখন মন্দ ও পতিত মানুষদের সমন্বয়ে গঠিত সমাজ ও রাষ্ট্র হবে ভয়ানক ঘৃণিত কলংকিত এক বীভৎস চিত্র। এখানকার ব্যবসায়ীরা সম্পদ গুদামজাত করবে, লোভে ভোগে বেসামাল হবে। অসহায়রা অবাধ্য হবে; মজদুর শ্রমিক কম শ্রমে অধিক পারিশ্রমিক প্রত্যাশী হবে; ধনীদের কার্পণ্য, শাসকের অত্যাচার, প্রভু ও মালিকদের দোর্দণ্ড প্রতাপ, চাকর-বাকরদের ধূর্তামি ও খেয়ানত সংরক্ষকদের চুরি ও চালাকি, উজীর-নাজিরদের স্বার্থপূজাই হবে সে সমাজের সাধারণ রূপ।

এটা মূলত সকল অনিষ্টের উৎস। সকল অস্থিরতা, বিপর্যয় ও বিশৃংখলার মূল হলো ব্যক্তি-চরিত্রের সমস্যা। ব্যক্তিসমস্যার বিস্ফোরণেই আজ বিশ্বময় মানবতা অস্থিরতার শিকার। আর এই ব্যক্তিসমস্যার মূল ব্যাধিটা হলো বস্তুপূজা।

বস্তুই সকল কিছুর মূল শক্তি। এই ধারণাই সকল কিছু ঘুলিয়ে রেখেছে। কালো বাজারী, সুদ, ঘুষ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কৃত্রিম সংকট তৈরি, গুদামজাতকরণ সবই এই বস্তুতান্ত্রিক মনোভাবের স্বাভাবিক ফসল। পৃথিবীর সকল চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী এসব সমস্যার যথার্থ সমাধান দিতে পারছে না। তারা একটা সমাধান আবিষ্কার করতে গেলে নতুন আরেকটা সমস্যায় আটকে যান। গ্রন্থি একটি উন্মোচিত হলে আরও দশটি বেঁধে যায়। আজ বরং একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না, তারা আজ সমস্যা উন্মোচনের বদলে নতুন সমস্যারই জন্ম দিয়ে চলছেন অর্থাৎ হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসায় যা হবার তাই হচ্ছে। একটি রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে তারা অগণন রোগের সৃষ্টি করছে। ডাক্তারের পরিচয় ঘটছে নতুন নতুন ব্যাধির সাথে। তার অভিজ্ঞতার পরিধিতো বাড়ছে। কিন্তু রোগীর দশা? আমাদের বুদ্ধিজীবীদের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা একবার মনে করেছেন একনায়কতন্ত্রই এসব সমস্যার মূল। তাই তারা একনায়কতন্ত্রকে কবর দিয়ে গণতন্ত্রকে প্রসব করলেন। কিন্তু এতেও যখন ব্যাধির কিছু হলো না তখন সেই 'সমাধিস্থ মৃত একনায়কতন্ত্র ও ডিক্টেটরশীপকেই টেনে বের করলেন, অথচ দেখা গেল সমস্যা আরও বেড়েছে। তারা ফিরে এলেন আবার গণতন্ত্রের কাছে। আবার কখনো ঝুঁকে গেছে পুঁজিবাদের দিকে, কখনো কমিউনিজমের কাছে, আবার কখনো দ্বারস্থ হয়েছে সমাজতন্ত্রের। যন্ত্রণার ডাকে ছোটাছুটি করেছেন অনেক। কিন্তু বেদনার উপশম হয়নি এক বিন্দু। ব্যাধি যা ছিল তাই রয়ে গেল। কারণ সকল চিকিৎসাই ছিল ত্বকের ওপরে ওপরে। সমস্যার শিকড় কেউ স্পর্শ করতে পারেনি অর্থাৎ যে ব্যক্তি থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সৃষ্টি সেই ব্যক্তির অসুস্থতা, বিপর্যয় ও পচন শোধরাবার চেষ্টা কেউ করেনি। ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় এই বাস্তবতা উপলব্ধ হয়নি যার কারণে সমাজ ও রাষ্ট্র রুগ্ন ছিল, রুগ্নই রয়ে গেছে।

অবশ্য আমি বলব, আমাদের এই বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদগণ যদি এই কঠিন সত্য উপলব্ধিও করেন, তারা যদি প্রকৃত রোগের সন্ধান পেয়েও বসেন, তবুও তারা এর চিকিৎসা করতে পারবেন না। মানলাম তাদের কাছে ইল্ম প্রচারের সকল মাধ্যম তাদের হাতে আছে। আর এই যুগটাও শিক্ষা-প্রশিক্ষণের যুগ।

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, তাদের হাতে সেই শক্তি নেই যা দ্বারা মানুষকে মন্দ থেকে ভালোর দিকে ও ধ্বংস থেকে সৃষ্টির দিকে নিয়ে যেতে পারবেন। কারণ তাদের মন, মেধা ও বিশ্বাসের কোথাও রুহানিয়াত ও আত্মিকতার ছোঁয়া নেই। তাদের অন্তরে ঈমান নেই। অন্তরের আত্মার কোন খোরাক তাদের কাছে নেই। হৃদয়ে ঈমানের বৃক্ষ রোপণের ব্যবস্থাও তাদের হাতে নেই। বান্দা ও প্রভুর মধ্যে বন্ধন স্থাপন করবার ক্ষমতা তাদের হাত থেকে ছুটে গেছে। এই নশ্বর জীবনকে অবিনশ্বর জীবনের সাথে, আত্মাকে বস্তুর সাথে, বিদ্যাকে চরিত্রের সাথে গ্রন্থিত করার ক্ষমতা তাদের নেই। আত্মিক দরিদ্রতা, অন্ধ বস্তুবিশ্বাস আর বিবেকের অসার অহংকার তাদেরকে এমন স্থানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ধ্বংস ও বিনাশের শেষ তীরটিও তাদের ধনুক থেকে বেরিয়ে গেছে যার অনিবার্য পরিণতি বিশ্বমানব পরিবারের ধ্বংস; এই পৃথিবী রূপান্তরিত হবে এক বিরান গ্রহে।

আল্লাহ্ না করুন, যদি পৃথিবীর যুদ্ধবাজ শক্তিগুলো এই ধ্বংসাত্মক অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের মাঠে নেমে পড়ে তাহলে মানুষের নব সৃষ্টি এই আধুনিক অস্ত্রলীলা, সভ্যতা ও মানবতার কবর রচনা করে ছাড়বে!

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 রহমত রূপে রাসূল (সা.)

📄 রহমত রূপে রাসূল (সা.)


ঈসায়ী ষষ্ঠ শতকের কথা। তখন ব্যাপক হারে আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি এই মানুষ আত্মহত্যার জন্য কেবল উদ্যতই ছিল না, বরং উন্মত্ত এক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিল। আত্মহত্যার প্রতি তাদের প্রবণতাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যেন এ আত্মহত্যাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া। আত্মহত্যার জন্যে সে যেন মানত করেছে, কসম খেয়েছে। সে কসম যেন কোনক্রমেই ভাঙা যাবে না! পবিত্র কুরআন সে ভয়াবহ পরিস্থিতিরই চিত্রাঙ্কন করেছে অত্যন্ত নিপুণভাবে, যে চিত্রাঙ্কন অসম্ভব কোন সুদক্ষ শিল্পী, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক কিংবা ঐতিহাসিকের পক্ষে।

"আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন। ফলে আল্লাহর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গিয়েছ। তোমরা অবস্থান করছিলে এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন।" [সূরা আল ইমরান: ১০৩]

ঐতিহাসিক ও জীবনচরিতকারদের প্রতি আল্লাহ রহম করুন! জাহেলী যুগের সঠিক ও যথার্থ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরতে তারা সক্ষম হননি। আসলে এজন্যে তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাদের প্রতি আমরা ভীষণ কৃতজ্ঞ। কেননা তখনকার সেই অবর্ণনীয় ভয়াবহ ও সঙ্গীন পরিস্থিতির সঠিক চিত্রাঙ্কন কলমের পক্ষে ছিল অসম্ভব। তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল ভাষা ও সাহিত্যের নাগালের বাইরে। সুতরাং একজন ঐতিহাসিকের পক্ষে তার যথার্থ চিত্রাঙ্কন কিভাবে সম্ভব?

মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবকালে জাহেলী যুগের সমস্যা কি শুধু সামাজিক বিপর্যয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের সমস্যা ছিল? শুধু কি মূর্তি পূজার সমস্যা ছিল? শুধু কি মদ-জুয়া, অশ্লীলতা, নগ্নতা, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যায়ের-অবিচারের সমস্যা ছিল? নাকি জালিম শাসকের জুলুম ও অর্থনৈতিক শোষণের সমস্যা ছিল? সে সমস্যা কি শুধু নিরপরাধ ও নিষ্পাপ নবজাত কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করার সমস্যা ছিল? না! বরং আসল সমস্যা ছিল গোটা মানবতাকে মাটি চাপা দিয়ে নির্দয়ভাবে হত্যা করার সমস্যা।

অন্ধকার যুগ পেরিয়ে গেছে। সে যুগের হিংস্র মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মাটির নিচে। সেই লোমহর্ষক চিত্র এখন দৃষ্টির অন্তরালে। এখন কি করে আমরা তার চিত্রাঙ্কন করব? কিভাবে তা অনুভবযোগ্য ও দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলে ধরব? শুধু বলতে পারি, সে ছিল জাহেলী যুগ।

অন্ধকারাচ্ছন্ন এক পৃথিবী! সভ্যতা-সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন এক আঁধার দুনিয়া। সে যুগের সে পৃথিবীর বাসিন্দা ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না সে যুগকে। উপলব্ধি করতে পারবে না সে যুগের ভয়াবহতাকে। কোন চিত্রশিল্পী যদি এখন একটি ছবি আঁকে, যাতে গোটা মানব জাতিকে এক দারুণ সুদর্শন ও দৃষ্টিনন্দন মানুষের আকৃতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সমস্ত সৃষ্টিলোকের ভেতরে যার সৌন্দর্যের অপূর্ব ঝলক নজরে পড়েছে, যাকে আল্লাহ খেলাফতের তাজ পাঠিয়েছেন, শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন সমস্ত সৃষ্টিলোকের মাঝে, যার আগমনে এই উজাড় ও বিরান পৃথিবী পরিণত হয়েছে বসন্ত বিরাজিত উদ্যানে। অতঃপর চোখের সামনে ভেসে উঠল আরেকটি চিত্র। একটু আগের সেই মানুষটি ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হচ্ছে এক গভীর পরিখায় যেখান থেকে উদীরণ হচ্ছে আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত। ঝাঁপ দেবার জন্যে সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পা সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে, এক্ষুণি সে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কয়েক মুহূর্ত পেরুতে না পেরুতেই ঝাঁপিয়েও পড়ল। হারিয়ে গেল ভয়ংকর অন্ধকারে, অনন্ত মৃত্যু বিভীষিকায়। তাহলে সম্ভবত চিত্রশিল্পীর এই চিত্রাংকনে রাসূলের আবির্ভাবকালীন জাহেলী যুগের কিঞ্চিত চিত্র ফুটে উঠতে পারে। এই বাস্তবতার দিকে ইশারা করেই আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে অত্যন্ত সংক্ষেপে, অথচ ই'জাযপূর্ণভাবে:

"আর তোমরা ছিলে জাহান্নামের এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে, সেখান থেকে তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করলেন।"

এই বিষয়টি নবুওয়াতের ভাষায় আরো বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, "আমার এই দাওয়াত ও হিদায়াতের উপমা যা নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, এমন ব্যক্তির ন্যায় যে আগুন প্রজ্জ্বলিত করল, যখন তার আলো আশপাশে ছড়িয়ে পড়ল তখন পোকা-মাকড় ও কীটপতঙ্গ আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। অনুরূপ তোমরাও আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত আর আমি তোমাদের বাহু ধরে তোমাদেরকে বাঁচাতে চাই" (সহীহ বুখারী)। আসলে মানবতার কিশতিকে নিরাপদে পাড়ে ভিড়ানোই ছিল মূল সমস্যা। কেননা মানুষ যখন সঠিক অবস্থায় ফিরে আসবে, যখন তার জীবনে আসবে স্বস্তি, ভারসাম্য ও সঠিক চেতনাবোধ, তখন মানুষের স্থাপত্যশিল্প, উন্নয়নশীলতা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি মূর্তিমান হয়ে বিকশিত হবে তাদের সামনে যাদের আছে যোগ্যতা, যারা মানবতার বন্ধু ও সাহায্যকারী। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, গোটা মানবতাই নবী-রাসূলদের কাছে ঋণী। তাঁরাই তো মানবতাকে উদ্ধার করেছেন সেই মহাবিপদ থেকে, যা নাঙ্গা তলোয়ারের মত মানবতার মাথার ওপর এক চরম মুহূর্তের অপেক্ষা করছিল। দুনিয়ার কোন্ বিদ্যাপীঠ, কোন্ দর্শন এবং কোন্ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তাঁদের ঋণ শোধ করতে পারবে? সত্যি কথা বলতে কি, বর্তমান পৃথিবী ও সাম্প্রতিক বিশ্বও তাঁদের কাছে ঋণী। কারণ তাঁরা মানবতাকে উদ্ধার না করলে কে পেত জীবনের স্বাদ ও স্বাধীনতার সুখ? কেননা পরিস্থিতি এমন নাযুক আকার ধারণ করেছিল, মানুষ অবস্থার নীরব ভাষায় বারবার শুনিয়ে দিয়েছে, সে এই পৃথিবীতে বসবাসের অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। তার হৃদয় এখন পাষাণ, দয়ামায়াশূন্য। মানবতার জন্য এখন সে বহন করে না কোন করুণা ও রহমতের পয়গাম। সে নিজের বিরুদ্ধে এখন নালিশ জানাচ্ছে মহাপ্রভুর আদালতে, সাক্ষ্য দিচ্ছে নিজের বিরুদ্ধে, চূড়ান্ত রায়ের জন্য মোকদ্দমার কাগজপত্র পুরা প্রস্তুত।

এক কঠিন শাস্তির জন্য নিজেকে পেশ করেছে, বেছে নিয়েছে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। সভ্যতা-সংস্কৃতি যখন স্বাভাবিক সীমারেখা অতিক্রম করে, বিস্মৃত হয়ে পড়ে চারিত্রিক উৎকর্ষের কথা, বরং আরো এক ধাপ সামনে বাড়িয়ে পরিষ্কার ভাষায় অস্বীকার করে বসে চারিত্রিক উৎকর্ষের অবদানকে, যখন মানুষ গাফেল হয়ে যায় যাবতীয় মহান উদ্দেশ্য সম্পর্কে, যখন সে জাগতিকতাকে বুকে আঁকড়ে ধরে উপেক্ষা করে অন্য সব বাস্তবতাকে, যখন সে পাশবিকতার দিকচিহ্নহীন দিগন্তে লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার মত ছুটে বেড়ায়, যখন সে সকল প্রকার মানবীয় গুণের বদলে হিংস্র জনপদের আকৃতি ধারণ করে, যখন তার মাঝে জন্ম নেয় এক কাল্পনিক উৎস, যখন সে স্বীকার করে নেয় নফসে আম্মারার পূর্ণ বশ্যতা, যখন মানবতাকে ঘিরে ফেলে পাগলামির ঘোর আচ্ছন্নতা, তখনই (মানবতার সেই মহাদুর্দিনে) অপারেশন ও অস্ত্রোপচার, সমূলে কেটে ফেলেন বিষাক্ত অংশ, দূর করে দেন পাগলামির নেশা। কোন জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকৃতি ও বিলুপ্তি দেশ ও রাজ্য হারানোর চেয়েও সাংঘাতিক ও ভয়াবহ। এক দুর্বল রোগী যদি পাগল হয়ে যায়, তাহলে তার কারণে আশপাশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু একটু ভেবে বলুন তো, গোটা মানবতাই যদি পাগল হয়ে যায়, যদি ভেঙে যায় হাজার বছরের লালিত সভ্যতা-সংস্কৃতি, দলিত-মথিত হয়ে যায় মানবতা ও ইনসানিয়াতের সবুজ কোমল দূর্বাগুলো, তবে সীমা থাকবে কি অশান্তি ও নৈরাজ্যের?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00