📄 এই আদেশ নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতি
সর্বোপরি মুমিনের শান তো এমনই হওয়া উচিত, যেমনটি কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا .
আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়। [সুরা আহযাব, আয়াত : ৩৬]
এই আদেশ নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতি
কেউ যেন এমনটি মনে না করে যে, দৃষ্টিসংযমের আদেশ কেবল পুরুষদের প্রতি। বিষয়টি মোটেও এমন নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা পুরুষদের আদেশ করার পরপরই নারীদের উদ্দেশে ইরশাদ করেন—
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ ..
আপনি ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। [সুরা নূর, আয়াত: ৩১]
📄 যৌনাঙ্গের আগে চক্ষু হেফাজতের আদেশ কেন?
'এটি যেমন মুমিন নারীদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশ, তেমনি তাদের স্বামী তথা মুমিন বান্দাদের জন্য আত্মমর্যাদারও বিষয়। অপরদিকে এটিই তাদের ও জাহিলি যুগের মুশরিক নারীদের মধ্যে অন্যতম পার্থক্যরেখা। [৬]
আর এ-বিষয়টি অনস্বীকার্য যে, নারীর প্রতি পুরুষের যেমন দুর্বলতা রয়েছে, তেমনি পুরুষের প্রতিও রয়েছে নারীর দুর্বলতা। পুরুষ যেমন নারীর প্রতি আসক্তি অনুভব করে, তেমনি নারীর মনেও জাগে পুরুষের প্রতি কামনা-বাসনা। আর এই আসক্তি ও কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণে না থাকলেই মূলত সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়ে। এসব থেকে রক্ষা করতেই আল্লাহ তাআলা দৃষ্টিসংযমের আদেশ দিয়েছেন, যা এক্ষেত্রে ঢালস্বরূপ।
যৌনাঙ্গের আগে চক্ষু হেফাজতের আদেশ কেন?
কুরআন কারিমে গোপনাঙ্গ সংযত রাখার পূর্বে চোখ হেফাজতে রাখার আদেশ করা হয়েছে। এর কারণ হলো— চোখ বা নজর মূলত জিনা-ব্যভিচারের অগ্রদূত হিসেবে কাজ করে। যেহেতু জিনা-ব্যভিচার মারাত্মক অপরাধ। আবার সুযোগ পেলে তা থেকে বেঁচে থাকাও অধিক কঠিন, তাই এসবের উদ্দীপক—কুদৃষ্টি থেকেই বেঁচে থাকতে আদেশ দেওয়া হয়েছে। কেননা, কুদৃষ্টিই মূলত পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার প্রথম ধাপ। আর দৃষ্টিসংযম অন্তরস্থ রোগ প্রতিরোধে বেশ কার্যকরী।
টিকাঃ
[৬] তাফসিরু ইবনু কাসির, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৮৩।
📄 দৃষ্টি সূক্ষ্ম বিষয়
প্রথমত, আল্লাহ তাআলা দৃষ্টিসংযম ও যৌনাঙ্গ হেফাজতের বিষয় দুটি পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। কারণ, প্রতিটি অশ্লীল কাজ সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। যার প্রথম ধাপ হলো দৃষ্টির অসংযত ব্যবহার। একজন পুরুষ যখন পরনারীর দিকে বেপরোয়া দৃষ্টিপাত করে, তখন তার মনে সেই নারীর রূপসৌন্দর্য নানারকম জল্পনা-কল্পনা তৈরি করে। হৃদয়ের গভীরে এই জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে। একপর্যায়ে সে আর নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে লিপ্ত হয় পাপাচারে, অশ্লীল কাজে। একারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ.
হে ঈমানদারগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তখন তো শয়তান অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের আদেশ করবেই। [সুরা নূর, আয়াত: ২১]
শয়তান সর্বদা মানুষের জন্য তার জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে ওঁত পেতে আছে। এজন্য পদে পদে যে ব্যক্তি ফিতনার দিকে উঁকি দেয়, ফিতনা তাকে একদম তলানিতে নিয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তাআলা কেন বললেন, 'قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ [৭] দেখুন, আল্লাহ তাআলা দৃষ্টিসংযমের বেলায় 'من' তথা, 'থেকে' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অপরদিকে যখন ‘وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ [৮] বলে যৌনাঙ্গ হেফাজতের আদেশ দিয়েছেন, তখন আর 'من' শব্দটি ব্যবহার করেননি। কিন্তু কেন?
এ প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, মুসলিমদের ওপর সর্বাবস্থায়ই যৌনাঙ্গের সদ্ব্যবহার আবশ্যক। কিন্তু দৃষ্টিসংযমের বিষয়টি একটু ভিন্ন—এই অর্থে যে, এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে মৌলিকভাবে দৃষ্টি সংযত রাখা আবশ্যক হলেও বিশেষ প্রয়োজনে পরনারীর দিকে দৃষ্টিপাত পুরুষের জন্য বৈধ বলা হয়। উদাহরণত : বিয়ের উদ্দেশ্যে কনের দিকে তাকানো, সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নারী সাক্ষীর দিকে তাকানো, নারী ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে রোগীর নির্দিষ্ট অঙ্গের দিকে তাকানো। তবে এসকল ক্ষেত্রে অন্তত একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমান মাহরামের উপস্থিতি আবশ্যক।
টিকাঃ
[৭] অর্থাৎ 'আপনি মুমিনদের বলুন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখে।' [সুরা নূর, আয়াত: ৩০]
[৮] অর্থাৎ, 'যেন তারা যৌনাঙ্গের হেফাজত করে।' [সুরা নুর, আয়াত: ৩০]
📄 কুরআন থেকে দ্বিতীয় দলিল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ
তিনি জানেন—চোখ যে খেয়ানত করে এবং অন্তর যা গোপন করে রাখে। [সুরা গফির, আয়াত : ১৯]
আল্লাহ তাআলা এ-আয়াতে কারিমায় জানিয়ে দিলেন যে, তিনি ছোট-বড়ো, দূরে-কাছে, ক্ষুদ্র-বৃহৎ, সূক্ষ্ম-ভারি, তুচ্ছ- দামি—সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত। এ-বিষয়টি খেয়াল করে যেন বান্দা আল্লাহর অবগতির ব্যাপারে সতর্ক থাকে; তাঁর প্রতি লজ্জাবনত থাকে; তাঁকে যথাযথভাবে ভয় করে এবং মনে রাখে—তিনি স্পষ্টভাবে তাকে দেখছেন। এ ছাড়াও তিনি চোখের খেয়ানত সম্পর্কে জানেন, যদিও কেউ আমানতদার সাজতে চায়। তিনি অন্তরে লুক্কায়িত বিষয়াবলি সম্পর্কেও জানেন, যদিও সে তা গোপন রাখতে চায়।
চোখের সকল খেয়ানত আল্লাহ তাআলা খুব ভালো করে জানেন। চোখের খেয়ানত কী, তা স্পষ্ট করেছেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। (তিনি বলেন) 'চোখের খেয়ানতের উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তির দৃষ্টিপাতের মতো, যে লোকজনের উপস্থিতিতে কোনো বাড়িতে প্রবেশ করল। আর সেখানে সকলের সামনে দিয়ে অতিক্রম করল কোনো সুন্দরী নারী। এমতাবস্থায় লোকেরা তার থেকে অমনোযোগী হলেই সে নারীটির দিকে তাকায়, আবার মনোযোগী হলে দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। অনুরূপভাবে, তারা বেখেয়াল থাকলেই সে ওই নারীর দিকে তাকায়, আবার খেয়াল করলেই না দেখার ভান করে।'
প্রিয় ভাই ও বোনেরা আমার! আপনি কি কখনো এভাবে ভেবে দেখেছেন? আপনি কি কখনো অনুধাবন করেছেন— কোনো নারীর দিকে আপনার দৃষ্টিপাত আল্লাহ তাআলা এতটা ভালোভাবে দেখেন; এমনকি আপনি যা অন্তরে লুকিয়ে রাখেন তাও তিনি জানেন।
হজরত জুনাইদ বাগদাদি রাহিমাহুল্লাহকে দৃষ্টি সংযত রাখার উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'তুমি তোমার ইলম তথা জ্ঞানের সাহায্য নিতে পার। অর্থাৎ তুমি স্মরণে রাখবে যে, মানুষের দৃষ্টিপাতের চেয়ে আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিপাত অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং দ্রুত।'
আমরা যারা অবৈধ জিনিস দেখি, তারা কি একবারও চিন্তা করেছি, আমাদের দৃষ্টিপাতের আগেই তা আল্লাহ নজরে ধরা পড়ে যায়। কসম আল্লাহর, এভাবে ভেবে দেখলে লজ্জায় আমাদের মস্তক অবনত হয়ে আসবে।