📄 কুরআনে বর্ণিত কয়েকটি দলিল
প্রথমে আমরা কুরআন কারিমে উল্লিখিত এমন কিছু আয়াত পেশ করছি, যা থেকে দৃষ্টিসংযম আবশ্যক হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
প্রথম দলিল : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ .
আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য রয়েছে অধিক পবিত্রতা। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন। [সুরা নুর আয়াত : ৩০]
এখানে আমরা লক্ষ করছি যে, আল্লাহ তাআলা আয়াতে কারিমায় কেবল মুমিনদের সম্বোধন করেছেন। কেননা, মুমিন ও মুত্তাকিরাই আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়; কারণ তাদের অন্তর থাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।
আল্লামা ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ উল্লিখিত আয়াতের তাফসির করতে গিয়ে বলেন, 'এ আদেশ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রতি—তাদের জন্য যা দেখা হারাম করা হয়েছে, তা থেকে তারা নজর হেফাজত করবে। তারা নিষিদ্ধ কোনোকিছুর দিকে তাকাবে না; হারাম সবকিছু থেকে নজরকে হেফাজত করবে; যদি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হারাম কিছু চোখে পড়েই যায়, তবে তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নেবে। [৪]
আল্লামা সা'আদি রাহিমাহুল্লাহ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'অর্থাৎ, আপনি মুমিনদের নির্দেশনা দিন, তাদের বলুন—যারা ঈমানদার, তারা যেন ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়াবলি থেকে বিরত থাকে। তারা যেন অন্যের সতর, বেগানা নারী এবং ফিতনার কারণ হতে পারে এমন সুশ্রী বালকদের থেকে নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে। তা ছাড়া এমন চাকচিক্যময় জিনিস থেকেও নজরকে হেফাজতে রাখা চাই, যা দেখার কারণে গুনাহে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'
'তারা যেন অবৈধ উপায়ে কোনোরকম সম্ভোগে লিপ্ত না হয়—হোক তা যোনিপথে, পায়ুপথে কিংবা ভিন্ন কোনো উপায়ে। পাশাপাশি, তারা যেন পরনারীকে স্পর্শ করা কিংবা দেখা থেকে বিরত থাকে। চোখ ও যৌনাঙ্গের এই সংযম তাদের জন্য অধিক পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধির কারণ হবে; তাদের আমলকে বৃদ্ধি করবে। কারণ, যে ব্যক্তি নিজের চক্ষু ও যৌনাঙ্গ সংযত রাখবে, সে এমনিতেই অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকবে। একই সাথে নফস যে-সকল মন্দ কাজের প্রতি প্ররোচিত করে, তা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে তার আমলও পরিশুদ্ধ হবে।'
'যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় সামান্য ত্যাগও স্বীকার করবে, আল্লাহ তাকে তার ত্যাগের চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করবেন। আর যে ব্যক্তি নজরের হেফাজত করবে, আল্লাহ তার অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেবেন। কারণ, যে বান্দা প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা উপেক্ষা করে হারাম সবকিছু থেকে নিজের চোখ ও যৌনাঙ্গ হেফাজতে রাখে; অন্যান্য খারাপ কাজ থেকে তো সে এমনিতেই দূরে থাকে।'
'একারণে আল্লাহ তাআলা 'হেফাজত' বা 'সংরক্ষণের' কথা বলেছেন। কেননা, 'মাহফুজ' তথা সংরক্ষিত কিছু হেফাজতের পেছনে যদি হাফিজ তথা সংরক্ষণকারীর কোনো ভূমিকাই না থাকে; সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উপায় অবলম্বনের ব্যাপার যদি নাই ঘটে, তবে তো আর সেটাকে হেফাজত বলা যায় না। নজর ও যৌনাঙ্গ হেফাজতের বিষয়টি ঠিক তেমনই। অপরদিকে বান্দা যদি এ-দুটি অঙ্গ হেফাজতের পেছনে সচেষ্ট না হয়, তবে এগুলো তার জন্য ভীষণ বিপদ ও মারাত্মক ফিতনার কারণ হয়ে যেতে পারে।'[৫]
উলামায়ে কিরাম বলেন, 'আয়াতে কারিমায় 'يغضوا' শব্দটি 'বিবৃতিমূলক ক্রিয়া' হলেও এর আগে একটি 'অনুজ্ঞামূলক ক্রিয়া' উহ্য রয়েছে। আর এখানে অনুজ্ঞামূলক ক্রিয়াটি উল্লেখ না করে কেবল বিবৃতিমূলক ক্রিয়া উল্লেখ করার কারণ হলো—মুমিন তো এমনই হবে—তাকে দৃষ্টিসংযমের আদেশ করামাত্রই সে তা পালন করবে।'
এ হিসেবে আয়াতের মূলরূপ দাঁড়াবে এমন - قل للمؤمنين غضوا يغضوا ... অর্থাৎ, 'আপনি মুমিনদের বলুন, তোমরা দৃষ্টি সংযত রাখো, অতঃপর তারা দৃষ্টি সংযত রাখে...।'
টিকাঃ
[৪] তাফসিরু ইবনু কাসির, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৮২।
[৫] তাফসিরুস সা'আদি, পৃষ্ঠা: ৭৮৬।
📄 এই আদেশ নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতি
সর্বোপরি মুমিনের শান তো এমনই হওয়া উচিত, যেমনটি কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا .
আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়। [সুরা আহযাব, আয়াত : ৩৬]
এই আদেশ নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতি
কেউ যেন এমনটি মনে না করে যে, দৃষ্টিসংযমের আদেশ কেবল পুরুষদের প্রতি। বিষয়টি মোটেও এমন নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা পুরুষদের আদেশ করার পরপরই নারীদের উদ্দেশে ইরশাদ করেন—
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ ..
আপনি ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। [সুরা নূর, আয়াত: ৩১]
📄 যৌনাঙ্গের আগে চক্ষু হেফাজতের আদেশ কেন?
'এটি যেমন মুমিন নারীদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশ, তেমনি তাদের স্বামী তথা মুমিন বান্দাদের জন্য আত্মমর্যাদারও বিষয়। অপরদিকে এটিই তাদের ও জাহিলি যুগের মুশরিক নারীদের মধ্যে অন্যতম পার্থক্যরেখা। [৬]
আর এ-বিষয়টি অনস্বীকার্য যে, নারীর প্রতি পুরুষের যেমন দুর্বলতা রয়েছে, তেমনি পুরুষের প্রতিও রয়েছে নারীর দুর্বলতা। পুরুষ যেমন নারীর প্রতি আসক্তি অনুভব করে, তেমনি নারীর মনেও জাগে পুরুষের প্রতি কামনা-বাসনা। আর এই আসক্তি ও কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণে না থাকলেই মূলত সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়ে। এসব থেকে রক্ষা করতেই আল্লাহ তাআলা দৃষ্টিসংযমের আদেশ দিয়েছেন, যা এক্ষেত্রে ঢালস্বরূপ।
যৌনাঙ্গের আগে চক্ষু হেফাজতের আদেশ কেন?
কুরআন কারিমে গোপনাঙ্গ সংযত রাখার পূর্বে চোখ হেফাজতে রাখার আদেশ করা হয়েছে। এর কারণ হলো— চোখ বা নজর মূলত জিনা-ব্যভিচারের অগ্রদূত হিসেবে কাজ করে। যেহেতু জিনা-ব্যভিচার মারাত্মক অপরাধ। আবার সুযোগ পেলে তা থেকে বেঁচে থাকাও অধিক কঠিন, তাই এসবের উদ্দীপক—কুদৃষ্টি থেকেই বেঁচে থাকতে আদেশ দেওয়া হয়েছে। কেননা, কুদৃষ্টিই মূলত পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার প্রথম ধাপ। আর দৃষ্টিসংযম অন্তরস্থ রোগ প্রতিরোধে বেশ কার্যকরী।
টিকাঃ
[৬] তাফসিরু ইবনু কাসির, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৮৩।
📄 দৃষ্টি সূক্ষ্ম বিষয়
প্রথমত, আল্লাহ তাআলা দৃষ্টিসংযম ও যৌনাঙ্গ হেফাজতের বিষয় দুটি পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। কারণ, প্রতিটি অশ্লীল কাজ সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। যার প্রথম ধাপ হলো দৃষ্টির অসংযত ব্যবহার। একজন পুরুষ যখন পরনারীর দিকে বেপরোয়া দৃষ্টিপাত করে, তখন তার মনে সেই নারীর রূপসৌন্দর্য নানারকম জল্পনা-কল্পনা তৈরি করে। হৃদয়ের গভীরে এই জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে। একপর্যায়ে সে আর নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে লিপ্ত হয় পাপাচারে, অশ্লীল কাজে। একারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ.
হে ঈমানদারগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তখন তো শয়তান অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের আদেশ করবেই। [সুরা নূর, আয়াত: ২১]
শয়তান সর্বদা মানুষের জন্য তার জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে ওঁত পেতে আছে। এজন্য পদে পদে যে ব্যক্তি ফিতনার দিকে উঁকি দেয়, ফিতনা তাকে একদম তলানিতে নিয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তাআলা কেন বললেন, 'قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ [৭] দেখুন, আল্লাহ তাআলা দৃষ্টিসংযমের বেলায় 'من' তথা, 'থেকে' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অপরদিকে যখন ‘وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ [৮] বলে যৌনাঙ্গ হেফাজতের আদেশ দিয়েছেন, তখন আর 'من' শব্দটি ব্যবহার করেননি। কিন্তু কেন?
এ প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, মুসলিমদের ওপর সর্বাবস্থায়ই যৌনাঙ্গের সদ্ব্যবহার আবশ্যক। কিন্তু দৃষ্টিসংযমের বিষয়টি একটু ভিন্ন—এই অর্থে যে, এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে মৌলিকভাবে দৃষ্টি সংযত রাখা আবশ্যক হলেও বিশেষ প্রয়োজনে পরনারীর দিকে দৃষ্টিপাত পুরুষের জন্য বৈধ বলা হয়। উদাহরণত : বিয়ের উদ্দেশ্যে কনের দিকে তাকানো, সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নারী সাক্ষীর দিকে তাকানো, নারী ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে রোগীর নির্দিষ্ট অঙ্গের দিকে তাকানো। তবে এসকল ক্ষেত্রে অন্তত একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমান মাহরামের উপস্থিতি আবশ্যক।
টিকাঃ
[৭] অর্থাৎ 'আপনি মুমিনদের বলুন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখে।' [সুরা নূর, আয়াত: ৩০]
[৮] অর্থাৎ, 'যেন তারা যৌনাঙ্গের হেফাজত করে।' [সুরা নুর, আয়াত: ৩০]