📄 অসংযত দৃষ্টি মানুষের মান-সম্মান ক্ষুণ্নকারী
একজন সম্মানী ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে যত্রতত্র দৃষ্টিপাত— নিঃসন্দেহে তার সম্মানের জন্য হানিকর। জেনে অবাক হবেন, জাহিলি যুগের সেই বরবর মানুষদের মধ্যেও এই ধারণা প্রচলিত ছিল যে, উন্নত চরিত্রের কোনো পুরুষ কখনো পরনারীর দিকে তাকায় না। এ প্রসঙ্গে আল্লামা কাহতানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন— 'পরনারীর প্রতি যাদের থাকে দৃষ্টি লোভাতুর, তারা তো মাংস নিয়ে কাড়াকাড়ি করা কুকুর।'
কিন্তু অত্যন্ত আফসোস ও পরিতাপের বিষয় এই যে, এ-যুগের অধিকাংশ মুসলিম পরনারীদের থেকে নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখেন না, রাখার প্রয়োজনও মনে করেন না। অনেক যুবকের তো রাস্তা-ঘাটে নারী-দর্শনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা অভ্যাসেই পরিণত হয়ে গিয়েছে। দুঃখ নিয়ে বলতে হয়, পরনারীর দিকে দৃষ্টিপাত গর্হিত কাজ জেনে জাহিলি যুগের মূর্খরা যে কাজটি করত, সভ্যতা ও ভদ্রতার দাবিদার এই আমাদের পক্ষে আজ সেটুকুও সম্ভব হয় না।
📄 দৃষ্টিসংযম আবশ্যক হওয়ার দলিল
হারাম জিনিস থেকে নজর হেফাজত করা ওয়াজিব—এ মর্মে কুরআন কারিম ও হাদিসে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহর কসম—দৃষ্টিসংযম সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহে যদি একটি দলিলও বর্ণিত না হতো, তবুও একজন মুসলিমের চারিত্রিক পবিত্রতা তাকে এমন অশুভ কাজ থেকে বাধা দেওয়ার কথা ছিল।
📄 কুরআনে বর্ণিত কয়েকটি দলিল
প্রথমে আমরা কুরআন কারিমে উল্লিখিত এমন কিছু আয়াত পেশ করছি, যা থেকে দৃষ্টিসংযম আবশ্যক হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
প্রথম দলিল : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ .
আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য রয়েছে অধিক পবিত্রতা। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন। [সুরা নুর আয়াত : ৩০]
এখানে আমরা লক্ষ করছি যে, আল্লাহ তাআলা আয়াতে কারিমায় কেবল মুমিনদের সম্বোধন করেছেন। কেননা, মুমিন ও মুত্তাকিরাই আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়; কারণ তাদের অন্তর থাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।
আল্লামা ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ উল্লিখিত আয়াতের তাফসির করতে গিয়ে বলেন, 'এ আদেশ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রতি—তাদের জন্য যা দেখা হারাম করা হয়েছে, তা থেকে তারা নজর হেফাজত করবে। তারা নিষিদ্ধ কোনোকিছুর দিকে তাকাবে না; হারাম সবকিছু থেকে নজরকে হেফাজত করবে; যদি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হারাম কিছু চোখে পড়েই যায়, তবে তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নেবে। [৪]
আল্লামা সা'আদি রাহিমাহুল্লাহ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'অর্থাৎ, আপনি মুমিনদের নির্দেশনা দিন, তাদের বলুন—যারা ঈমানদার, তারা যেন ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়াবলি থেকে বিরত থাকে। তারা যেন অন্যের সতর, বেগানা নারী এবং ফিতনার কারণ হতে পারে এমন সুশ্রী বালকদের থেকে নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে। তা ছাড়া এমন চাকচিক্যময় জিনিস থেকেও নজরকে হেফাজতে রাখা চাই, যা দেখার কারণে গুনাহে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'
'তারা যেন অবৈধ উপায়ে কোনোরকম সম্ভোগে লিপ্ত না হয়—হোক তা যোনিপথে, পায়ুপথে কিংবা ভিন্ন কোনো উপায়ে। পাশাপাশি, তারা যেন পরনারীকে স্পর্শ করা কিংবা দেখা থেকে বিরত থাকে। চোখ ও যৌনাঙ্গের এই সংযম তাদের জন্য অধিক পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধির কারণ হবে; তাদের আমলকে বৃদ্ধি করবে। কারণ, যে ব্যক্তি নিজের চক্ষু ও যৌনাঙ্গ সংযত রাখবে, সে এমনিতেই অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকবে। একই সাথে নফস যে-সকল মন্দ কাজের প্রতি প্ররোচিত করে, তা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে তার আমলও পরিশুদ্ধ হবে।'
'যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় সামান্য ত্যাগও স্বীকার করবে, আল্লাহ তাকে তার ত্যাগের চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করবেন। আর যে ব্যক্তি নজরের হেফাজত করবে, আল্লাহ তার অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেবেন। কারণ, যে বান্দা প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা উপেক্ষা করে হারাম সবকিছু থেকে নিজের চোখ ও যৌনাঙ্গ হেফাজতে রাখে; অন্যান্য খারাপ কাজ থেকে তো সে এমনিতেই দূরে থাকে।'
'একারণে আল্লাহ তাআলা 'হেফাজত' বা 'সংরক্ষণের' কথা বলেছেন। কেননা, 'মাহফুজ' তথা সংরক্ষিত কিছু হেফাজতের পেছনে যদি হাফিজ তথা সংরক্ষণকারীর কোনো ভূমিকাই না থাকে; সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উপায় অবলম্বনের ব্যাপার যদি নাই ঘটে, তবে তো আর সেটাকে হেফাজত বলা যায় না। নজর ও যৌনাঙ্গ হেফাজতের বিষয়টি ঠিক তেমনই। অপরদিকে বান্দা যদি এ-দুটি অঙ্গ হেফাজতের পেছনে সচেষ্ট না হয়, তবে এগুলো তার জন্য ভীষণ বিপদ ও মারাত্মক ফিতনার কারণ হয়ে যেতে পারে।'[৫]
উলামায়ে কিরাম বলেন, 'আয়াতে কারিমায় 'يغضوا' শব্দটি 'বিবৃতিমূলক ক্রিয়া' হলেও এর আগে একটি 'অনুজ্ঞামূলক ক্রিয়া' উহ্য রয়েছে। আর এখানে অনুজ্ঞামূলক ক্রিয়াটি উল্লেখ না করে কেবল বিবৃতিমূলক ক্রিয়া উল্লেখ করার কারণ হলো—মুমিন তো এমনই হবে—তাকে দৃষ্টিসংযমের আদেশ করামাত্রই সে তা পালন করবে।'
এ হিসেবে আয়াতের মূলরূপ দাঁড়াবে এমন - قل للمؤمنين غضوا يغضوا ... অর্থাৎ, 'আপনি মুমিনদের বলুন, তোমরা দৃষ্টি সংযত রাখো, অতঃপর তারা দৃষ্টি সংযত রাখে...।'
টিকাঃ
[৪] তাফসিরু ইবনু কাসির, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৮২।
[৫] তাফসিরুস সা'আদি, পৃষ্ঠা: ৭৮৬।
📄 এই আদেশ নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতি
সর্বোপরি মুমিনের শান তো এমনই হওয়া উচিত, যেমনটি কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا .
আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়। [সুরা আহযাব, আয়াত : ৩৬]
এই আদেশ নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতি
কেউ যেন এমনটি মনে না করে যে, দৃষ্টিসংযমের আদেশ কেবল পুরুষদের প্রতি। বিষয়টি মোটেও এমন নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা পুরুষদের আদেশ করার পরপরই নারীদের উদ্দেশে ইরশাদ করেন—
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ ..
আপনি ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। [সুরা নূর, আয়াত: ৩১]