📄 নফস নিয়ন্ত্রণে যাকাতের ভূমিকা
লোভ-লালসা, কৃপণতা নফসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। লোভ-লালসা নফসের এক প্রকার প্রবৃত্তি। এই লোভ-লালসার কারণে নফস উদ্ধত হয়ে যায়। লোভ-লালসা নফসের এক অনন্য ব্যাধি। লোভ ও কৃপণতা নফসের খুবই নিকৃষ্ট স্বভাব। যারা কৃপণ এবং লোভী, তারা যাকাত দিতে হাত গুটিয়ে নেয়। ফলে, নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করতে পারে না আবার নিজের ধন-সম্পদও পবিত্র করতে পারে না。
লোভ-লালসা অন্তর বিধ্বংসী একটি স্বভাব। এর কারণে আজ অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত। অপর দিকে যাকাত একজন ব্যক্তির নফসকে পরিশুদ্ধ করে; আত্মিক উন্নয়ন ঘটায়। আর তাছাড়া, যাকাত একটি ফরয বিধান। তা অবশ্যই পালনীয়। এতে রয়েছে ফরয পালনের পাশাপাশি নফসের গোলামীর প্রতিষেধক। তাই আমাদের উচিত ছিলো—যাকাত প্রদানের মাধ্যমে নফসের লোভ-লালসাকে দূর করা। কিন্তু, আজ আমরা নফস থেকে লোভ লালসা দূর করার পরিবর্তে, নফসের গোলামী করে যাকাত প্রদান থেকে বিরত থাকছি。
কৃপণতা নফসের একটা ব্যাধি। এই ব্যাধি দূর করতে, অবশ্যই যাকাত প্রদান করতে হবে; নয়তো নফস ধীরে ধীরে দুরারোগ্য হয়ে পড়বে। তখন সে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম কোনো কিছু বিবেচনা করবে না। সব সময় হারাম ভক্ষণে মনোনিবেশ করবে। আর তখন হারাম খেতে খেতে নফস অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে হারাম থেকে বেঁচে থাকা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়বে。
যাকাতের চারিত্রিক ফায়দা:
১. যাকাত ব্যক্তিকে দানশীল ও বদান্যদের কাতারে শামিল করে। যখন আপনি দান-সদকায় অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন, তখন নফস ধীরে ধীরে সতেজ হয়ে উঠবে।
২. যাকাত প্রমাণ করে, যাকাত আদায়কারী অভাবীদের প্রতি রহম, দয়া ও অনুগ্রহশীল, আর আল্লাহ দয়াশীলদের উপর দয়া করেন।
৩. মুসলিমদের উপর আর্থিক ও শারীরিক সেবা প্রদান অন্তঃকরণকে প্রশস্ত ও প্রফুল্ল করে এবং মানুষের নিকট যাকাত দাতাকে প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ করে তুলে।
৪. যাকাতে রয়েছে লোভ ও কৃপণতা থেকে মুক্তি。
যাকাতের সামাজিক উপকারিতা:
১. যাকাতের ফলে অভাবীদের অভাব দূর হয়, দুনিয়ার অধিকাংশ জায়গায় যাদের সংখ্যাই বেশী।
২. যাকাতের ফলে মুসলিমদের শক্তি অর্জন হয় ও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, কারণ যাকাতের একটি খাত জিহাদ।
৩. যাকাত গরীবদের অন্তর থেকে ধনীদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে দেয়। কারণ গরীবরা যখন দেখে ধনীরা তাদের সম্পদ দ্বারা যাবতীয় প্রয়োজন পুরো করে, কিন্তু তাদের সম্পদ থেকে তারা কোনভাবে উপকৃত হয় না, এ কারণে অনেক সময় ধনীদের প্রতি তাদের অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম নেয়, যেহেতু ধনীরা তাদের অধিকার রক্ষা করে না, তাদের কোন প্রয়োজনে তারা সাড়া দেয় না। কিন্তু ধনীরা যদি বছর শেষে গরীবদের যাকাত দেয়, তাহলে তাদের অন্তর থেকে এসব বিষয় দূরীভূত হয় এবং উভয় শ্রেণীর মধ্যে মহব্বত ও ভালবাসার সৃষ্টি হয়।
৪. যাকাতের ফলে সম্পদ বৃদ্ধি পায় ও তাতে বরকত হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কোন সদকা সম্পদ হ্রাস করেনি”।
অর্থাৎ, সদকার ফলে যদিও সম্পদের অংক কমে, কিন্তু তার বরকত কমে না, বরং আল্লাহ তার সম্পদে বরকত দেন এবং তার বিনিময়ে আরো অধিক দান করেন。
অনেকেই আজ নফসের ধোকায় পড়ে যাকাত প্রদানে বিরত রয়েছে। যদিও মাঝে মধ্যে দিতে মন চায়-কিন্তু নফস সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নফস তখন বলে-যাকাত দেয়ার কী দরকার, শুধু শুধু টাকা নষ্ট, মাল কমে যাবে, ইত্যাদি। আসলে, যাকাত দিলে কখনো মাল কমে না; আরো বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও যাকাত প্রদানে নফস পরিশুদ্ধ হয়। যেমন: নফসের ব্যাধি-অহংকার, হিংসা, লোভ, কৃপণতা ইত্যাদি যাকাত প্রদানের মাধ্যমে অন্তর থেকে দূর হয়ে যায়। আর এই ব্যাধি গুলো অন্তর থেকে দূর হয়ে গেলে নফস এমনি এমনি সতেজ হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ। তাই, আমাদের যাকাত প্রদানে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
📄 লাগামহীন নফস বিষাক্ত সাপের মতো
লাগামহীন নফস হলো বিষাক্ত সাপের ন্যায়। একটি বিষাক্ত সাপ বাড়ির আঙিনায় ঘুরে বেড়ানো মানে, পুরো পরিবারের জন্য আতংকের বার্তা। ঠিক তদ্রুপ আমাদের লাগামহীন নফস আমাদের মাঝে অবস্থান করা মানে, আমাদের জন্য আতংকের বার্তা। সময়মতো তাকে পরিশুদ্ধ না করলে, ইহকাল পরকাল উভয় জগতে পরিতাপের কারণ হবে。
ইতিপূর্বে নফসকে নিয়ন্ত্রণের অনেক পদ্ধতি বর্ণনা করেছি। উক্ত পদ্ধতি গুলো কাজে লাগালে ভালো ফলাফল আসবে, ইনশা'আল্লাহ। তবে এই কথা ভুলে গেলে চলবে না-লাগামহীন নফস কিন্তু একটি বিষাক্ত সাপের ন্যায়。
কিছুদিন আগে একজন সাপুড়ে'কে দেখেছিলাম-গর্ত থেকে সাপ ধরতে। প্রথমে সে কয়েকজন লোক দিয়ে কোদাল শাবল দিয়ে গর্তের উপর থেকে মাটি সরালো। মাটির সরানোর প্রাক্কালে হঠাৎ ওই সাপটি সাপুড়ের দৃষ্টি গোচর হল। তখন সে ওই ব্যক্তিদের বললো, 'আশেপাশে গর্তের সমস্ত মুখ বন্ধ করে দাও এবং শুধুমাত্র সাপের লেজের দিকের গর্তের মুখটা খোলা রাখো।' তারাও তার আদেশ অনুযায়ী ওই গর্তের আশেপাশের সব জায়গা মাটি দিয়ে আবার ঢেকে দিল এবং শুধুমাত্র লেজের পাশ খুলা রাখলো。
বেশ খানিকক্ষণ বাদ, ওই সাপুড়ে, সাপের লেজ ধরলো এবং ঐ লোকদের বললো, 'মাটি দিয়ে তার চারপাশ টাইট করে ফেলো-যেন সে নাড়াচাড়া করতে না পারে।' তারা তার আদেশে তা-ই করলো। যখন মাটি সাপ'টিকে চেপে ধরলো, তখন সে অনেক চেষ্টা করেও নড়াচড়া করতে পারেনি। আর সাপুড়ে ধীরে ধীরে আলতো করে দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে তাকে গর্ত থেকে বের করে। সে জানে তাকে যদি এক টান দিয়ে বের করে নেয়, তখন সে ঘাড় বেঁকিয়ে তার উপর আক্রমণ করতে পারে। এমনকি তাকে ছোবলও মারতে পারে। এজন্য তার চতুরপাশ মাটি দিয়ে টাইট করে, আলতো করে লেজের দিক দিয়ে টেনে টেনে সাপটি বের করে। সে জানে—কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়া, হুটহাট তাড়াহুড়া করে তাকে বের করতে যায় তখন বিপদ অনিবার্য! এজন্য সে পূর্ণ প্রস্তুতিসহ পরিকল্পনা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় নিয়ে তাকে গর্ত থেকে বের করে। অবশেষে ওই সাপটিকে সে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। অতঃপর তাকে কাবু করতে সক্ষম হয়。
এটা প্রত্যেক সাপুড়ের, সাপ'কে নিয়ন্ত্রণে আনার, তাকে গর্ত থেকে টেনে বের করার একটা পদ্ধতি। প্রত্যেক সাপুড়ে সাপ কে ধরার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করে থাকেন。
আমাদের নফসের ক্ষেত্রেও এরকমটাই করতে হবে। সবকিছুর প্রস্তুতি নিয়ে, পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধীরে ধীরে সময় নিয়ে নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কোনো ধরনের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ছাড়াই, হুটহাট তাড়াহুড়া করে যদি তাকে কাবু করতে যান, তখন সুফলের তুলনায় কুফল'টা-ই বেশি হবে। আপনি যদি মনে করেন— আমি আমার নফসকে এক দিনেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবো, এক দিনেই তাকে আমি পরিশুদ্ধ করে ফেলব; তাকে কাবু করে ফেলবো, তবে আপনার এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধীরে ধীরে তার গোঁড়ামি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। ধীরে ধীরে তাকে ভালো কাজে অভ্যস্ত করতে হবে। নয়তো সে বিগড়ে গিয়ে উল্টো রিয়েকশান করবে।
📄 কিছু কথন
১. প্রেমে তো সবাই পড়ে। কেউ প্রেমে পড়ে স্রষ্টার; কেউ প্রেমে পড়ে সৃষ্টির। সৃষ্টির প্রেমের প্রেমিক হচ্ছে, নফস। আর স্রষ্টার প্রেমের প্রেমিক হচ্ছে, রুহ। এখন আপনি কোন প্রেমিককে প্রাধান্য দিবেন? যে স্রষ্টার প্রেমে মত্ত হয়েছে তাকে, নাকি যে সৃষ্টির প্রেমে মত্ত হয়েছে তাকে?
২. হাসান বসরী রহি. বলেন: মুমিন তার নফসের হিসাব ব্যতীত সামনে অগ্রসর হয় না। নফস কী করতে চায়, কী খেতে চায়, কী পান করতে চায়—সব কিছু সে হিসাব করে। পক্ষান্তরে, যারা গোনাহগার, তারা নফসের হিসাব ব্যতীতই সামনে অগ্রসর হয়。
৩. যে স্বীয় নফসের অনুসরণ করেছে, সে নিজের দীন বিক্রি করে ধন- সম্পদ ক্রয় করছে। যে নফসের গোলামী করেছে, সে স্রষ্টাকে ভুলে গিয়ে সৃষ্টির দাসত্ব করছে。
৪. হাসান বসরী রহি. বলেন: বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণ-এর মধ্যেই থাকে, যতক্ষণ তার নফসের মধ্যে একজন ওয়াজকারী, নসিহতকারী, সমালোচককারী থাকে。
৫. মাইমুন ইবনে মেহরান বলেন: একজন ব্যবসায়ী শরিকের হিসাব- নিকাশের ব্যাপারে যতটা কঠোরতা করে, তারচে' অধিক কঠোরতা নিজের নফসের সাথে না করা অবধি, বান্দা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে না। এজন্যই নফসকে বলা হয়— নফস তো বিশ্বাসঘাতক ব্যবসায়ী শরিকের মতো; যদি ঠিকমতো হিসাব না রাখেন, তবে সে আপনার সব কিছু নিয়ে চম্পট দিবেই。
৬. মালেক ইবনে দিনার বলেন: আল্লাহ তাআলা ঐ বান্দার প্রতি দয়া করেন-যে তার নফসকে বলে, হে নফস! তুমি এই কাজ করো, আর এই কাজ করো না। অতঃপর, জোর করে তার ওপর লাগাম পরিয়ে দেয় এবং আল্লাহর কিতাবকে তার উপর অপরিহার্য করে দেয়। তখন কুরআন তার জন্য চালক হয়ে যায়। (অর্থাৎ, কুরআন তাকে পথ দেখায়)।
৭. আবু সুফিয়ান রহি. বলেন: যখন কোনো ব্যক্তি ভালো কাজ করার ইচ্ছে করে, তখন তার নফস থেকে সুগন্ধি ছড়াতে থাকে এবং যখন কোনো ব্যক্তি খারাপ কাজ করার ইচ্ছে করে, তখন তার নফস দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে。
৮. তুমি মানব লড়াইয়ে অন্যকে প্রতিহত করে নিজেকে বীর মুজাহিদ দাবি করছো, অথচ প্রকৃত বীর সে, যে স্বীয় নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাকে সংযত রেখেছে。
৯. নফসের কারাগারে বন্দী হয়ে কেউ কখনো সফল হতে পারে না, সফল তো সেই ব্যক্তি-যে মুক্ত স্বাধীন। ব্যক্তি থেকে নয়; স্বীয় নফসের কারাগার থেকে!
১০. নফসের গোলামী তো সে-ই করে, যে স্বীয় রব থেকে বিমুখতা প্রদর্শন করে। একজন প্রকৃত মাওলা প্রেমিক, নফসের আশেক হতে পারে না!
১১. নফসকে যত বেশি পবিত্র রাখবেন, ততোই সে সংযত থাকবে। অপবিত্র নফস শুধু অশ্লীলতার দিকেই আহ্বান করে। অন্তরকে পবিত্র রাখার অবলম্বনই হলো নফসকে সংযত রাখা。
১২. নফসকে চিনতে না পারলে আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়া কঠিন। কেননা, নফসকে যাচাই বাছাই না করা অবধি নিজের দোষ ত্রুটি পরিলক্ষিত হবে না। ফলে, ধীরে ধীরে সে গাইরুল্লাহ-এর পথেই হাঁটবে。
১৩. হযরত সহল ইবনে আব্দুল্লাহ তসতরী রহি. বলেন: উদরপূর্ণ করে পানাহার করলে তা নফসের লালসার চরম মাত্রায় পৌঁছে দেয়। আর তখন মন্দ চাহিদাগুলো তাদের ইচ্ছে পূরণে উঠে পড়ে লেগে যায়。
১৪. হাজী এমদাদুল্লাহ মোহাজিরে মক্কী রহি. বলেন: দুনিয়াতে নফস ব্যতীত কোন কিছুকেই আমি ভয় করি না。
১৫. হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহি. বলেন: নফসের বাসনা যে ত্যাগ করেছে, সে আল্লাহকে পেয়েছে। আর যে আল্লাহর নৈকট্য অজর্ন করেছে সবকিছুই তার নাগালে এসে গেছে。
১৬. যে ব্যক্তি কু-প্রবৃত্তি দমন করে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়, আল্লাহ প্রকাশ্যে তার মযার্দা বৃদ্ধি করেন。
১৭. হযরত মালেক বিন দিনার রহি. বলেন: যে সবসময় নফসের অনুগত, শয়তান তার কাছে বেশি যাতায়াত করে না। কেননা, শয়তানের কাজ তো নফসের মাধ্যমেই সম্পাদিত হচ্ছে।