📄 রিমাইন্ডার
নফসকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে, তাকে বেশি বেশি রিমাইন্ডার দিতে হবে। তাকে ভীতি প্রদর্শন করতে হবে। কী কী রিমাইন্ডার দিবেন, আসুন জেনে নিই...
১. নফসকে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিন। এজন্য, এই আয়াতটি সব সময় মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ অর্থ- প্রত্যেক নফস, মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। এই আয়াতটি বেশি বেশি তেলাওয়াত করে নফসকে রিমাইন্ডার দিন। তাকে সজাগ করুন। তাকে জানিয়ে দিন- কুল্লু নাফসিন জা-ইক্বাতুল মাউত। এটা হবে তার জন্য একটি রিমাইন্ডার。
মৃত্যুর কথা স্মরণ হলে, নফস কিছুটা কান্ত হয়। দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। যখন কেউ একাকী নিভৃতে, গভীর মনোযোগ সহকারে তার অন্তিম যাত্রা নিয়ে চিন্তা-ফিকর করে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করে। আর সেই ভয় নফসে গোঁড়ামির প্রতিষেধক হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এজন্য, নফস নিয়ন্ত্রণে উত্তম মাধ্যম হচ্ছে, মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা। তাকে ভীতি প্রদর্শন করা। আর উক্ত আয়াতটি অর্থসহ মনোযোগ সহকারে বেশি বেশি পাঠ করা。
২. জাহান্নামের আগুনের ভয়। কোনো একদিন এমনি এমনি আগুনে হাত দিয়ে নিজের নফসকে রিমাইন্ডার দিন। আগুনে হাত রাখুন, হাতে আগুন লাগলেও এর ব্যাথা কিন্তু নফস অনুভব করে। তাই, জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করে তাকে রিমাইন্ডার দিন। তাকে জানিয়ে দিন, আজকের এই কৃতকর্মের কারণে সেদিন জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে。
৩. চলমান, ঘটমান অবস্থা দিয়ে নফসকে রিমাইন্ডার দিন। নফস বেশিরভাগ গোনাহের দিকে ধাবিত হয়, দু'টি জিনিস পেতে। ১- যৌবনের ক্ষুধা ২- পেটের ক্ষুধা। এই দু'টি ক্ষুধা নিবারণের জন্য নফস সব সময় মুখিয়ে থাকে। এই দু'টি চাহিদা পূরণ করতে, ভালো-খারাপ হারাম-হালাল কিছুই দেখে না। এজন্য অবস্থাভেদে তাকে রিমাইন্ডার দিতে হবে。
সেদিন আমি একটি আম কেটে খাচ্ছিলাম। আম কাটার সময় আমের চির হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। পড়ে যাচ্ছে, পড়ে যাচ্ছে। হাতের তালুতে তিনবার লাফ খেয়েছে। চতুর্থ বার তাকে আয়ত্বে নিয়ে আসি। মনে মনে ভেবেই নিয়েছিলাম, আমটি হয়তো আর খাওয়াই হবে না। কিন্তু, কীভাবে জানি দু-তিনবার হাতের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে আবার হাতের মুঠোয় আটকে যায়। তখন মনে মনে নফসকে বলি—এটাই রিজিক। এটাই তাকদির। খাবারের জন্য তুই এদিক ওদিক খারাপ চিন্তা আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিস, অথচ আমার আল্লাহ আমার রিজিকের ফায়সালা পূর্ব থেকেই করে রেখেছেন। যা আমার জন্য নির্ধারিত তা হস্তচ্যুত হতে হতে আবার হাতেই আটকে পড়বে। আর তাছাড়া, আমার আল্লাহ আমার জন্য যা বরাদ্দ রেখেছেন, তা আমি ভক্ষণ করবই। আর যা আমার রিজিকে নেই, তা শত চেষ্টা করেও হাসিল করতে পারবো না。
এটাই ঘটমান রিমাইন্ডার! তাৎক্ষণিক কোনো কিছু ঘটে গেলেই, তা দিয়ে নফসকে শিক্ষা দেয়া। আসলে নফসকে বুঝাতে হবে— যা তাকদিরে আছে তা-ই হবে। যা আসার কথা তা আসবেই। মাঝখানে শুধু শুধু হারামে জড়ানো। আমার তাকদিরে লেখা আছে, এই সপ্তাহে আমি এক লক্ষ টাকার মালিক হবো। এটা আগে থেকেই ফায়সালা করা। এটা যেভাবেই হোক আমার কাছে আসবেই। এখন যে ব্যক্তি হারাম রুজিতে জড়িত, সে কিন্তু এক লক্ষ টাকা অর্জন করতে হারাম পন্থাই অবলম্বন করবে। অথচ, এই টাকাটা তার ভাগ্যে পূর্ব থেকে লেখা ছিলো। এটা এমনি এমনি যে-কোনো উপায়ে সময় সাপেক্ষ তার কাছে আসতো। কিন্তু, সে নফসের তাড়নায় শুধু শুধু হারাম পন্থায় এটা অর্জন করলো। শুধু শুধু এটার মধ্যে খারাপ একটা জিনিস মিশ্রণ করলো。
৪. নফসকে রিমাইন্ডার দিতে একাকী নিভৃতে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একটু ভাবুন। ভাবুন-আমি কে? আমি কোথায় ছিলাম? আমি কেন এসেছি? আমার কাজ কী? আমার গন্তব্য স্থল কোথায়? আমাকে কোথায় যেতে হবে?
আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন, জগতের কোনো কিছু তিনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। তাহলে আজ আমি কেন নফসের তাড়নায় অনর্থক কাজে লিপ্ত? কেন আজ নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে, নিজের দায়িত্ব ভুলে গিয়ে অনর্থক খেল-তামাশায় সময় ব্যয় করছি? প্রশ্ন করুন, ভালো করে নিজেকে প্রশ্ন করুন! অস্তিত্ব নিয়ে ভাবুন। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে যত বেশি ভাববেন, তত বেশি নিজেকে খুঁজে পাবেন। নিজের মধ্যে নিজেকে সেভাবেই খুঁজুন, যেভাবে আপনি আমি হারিয়ে গেছি নিজের মধ্যে। আজ আমরা আমাদের মধ্যেই হারিয়ে গেছি। নিজের নফসের গোলামী করে পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে ভ্রমণ করছি। অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে আলোর পথ ভুলে গেছি। সেইসাথে ভুলে গেছি-কে আমি? কোথায় আছি? কেন এসেছি? আবার কোথায় যাবো?
এজন্য, বেশি বেশি নিজের অস্তিত্বের কথা স্মরণ করে নিজের নফসকে রিমাইন্ডার দিতে হবে। নয়ত নিজের মধ্যেই নিজেকে ঘুরপাক খেতে হবে। হারিয়ে যেতে হবে ধ্বংসাত্মক 'আমি' নামক জগতে।
📄 নফস নিয়ন্ত্রণে নামাজের ভূমিকা
নফস যখন উদ্যত হয়ে যায়, যখন লাগামহীন হয়ে যায়, তখন নামাজের মধ্যে সবচে' বেশি গাফিলতি চলে আসে। নফস সর্বদাই আপনাকে আমাকে নামাজ থেকে বিমুখ রাখার চেষ্টা করে। ফজরে ঘুম থেকে উঠতে গেলেই নফস বলে, আরে ঘুমা ঘুমা; এই আরামের ঘুম রেখে উঠার কী দরকার。
যোহরের ওয়াক্ত আসলে নফস তখন বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততা দেখায়। বলে, আগে কাজ, পড়ে নামাজ; কাজ না করলে খাবি কী? তখন এমনি এমনি ওয়াক্ত চলে যায়; নামাজ আর পড়া হয় না। আসরের ওয়াক্ত আসলেও কাজের দোহাই দিয়ে নামাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। আর যুবক হলে খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাগরিবের ওয়াক্ত, এশার ওয়াক্ত এমনি এমনি কেটে যায়; নামাজ আর পড়া হয় না। এভাবে একদিন দুইদিন করে করে, মাস বছরের জন্য আপনাকে আমাকে বেনামাজি বানিয়ে দেয়। নফসের নামাজ পড়তে ভালো লাগে না, তার নামাজে তৃপ্তি আসে না। অন্যান্য কাজে সে সময় ব্যয় করে, কিন্তু নামাজের পড়ার সময় তার হয়না। নামাজ পড়াটা সে সময় ব্যয় মনে করে।(নাউজুবিল্লাহ)
আজ নফসের ধোঁকায় পড়ে আপনি আমি কত নামাজ কাজা করছি। নফসের কথা মতো নামাজ তরক করছি। আজ আমরা নফসের বিরুদ্ধে যেতে পারছি না। নফস সর্বদাই আমাদের উপর কর্তৃত্ব চালাচ্ছে; আর আমাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে জাহান্নামের দিকে...
নামাজ হলো সমস্ত ইবাদতের মূল। ঈমানের পরই নামাজের কথা বলা হয়েছে। এই নামাজ মুসলিম আর বিধর্মীদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। নামাজ একটি ফরজ বিধান। যা আমাদের উপর অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে। নামাজের ব্যাপারে কুরআনুল কারীমে প্রায় ৮০ জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। নামাজের ব্যাপারে খুবই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রাসুল সা. -ও বহু হাদিসে নামাজের ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন。
এ ব্যাপারে কিছু হাদিস জেনে নিই...
এক হাদীসে নবীজী সা. ইরশাদ করেন: “কোনো বান্দা আর কুফর-শিরকের মাঝে পার্থক্য বোঝা যাবে, তার নামায তরকের দ্বারা।”৩৬
অপর আরেকটি হাদীসে রয়েছে...
যে ব্যক্তি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যত্নের সাথে আদায় করবে, কেয়ামতের সময় এ নামায তার জন্য আলো হবে, তার ঈমান ও ইসলামের দলিল হবে এবং তার নাজাতের ওসিলা হবে। আর যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত নামায আদায় করবে না, কেয়ামতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে নামায তার জন্য আলো হবে না, দলিল হবে না এবং সে আযাব ও শাস্তি থেকে রেহাইও পাবে না।”৩৭
এই হাদীস আমাদের কী ম্যাসেজ দিলো? আমরা যদি নামাজে যত্নবান না হই, তবে হাশরের ময়দানে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে—এটা আমাদের চিন্তা করা উচিত। ভাবা দরকার。
নামাজের অনেক উপকারিতা রয়েছে। যেমন: নামাজের উপকারিতা সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে একটি রেওয়ায়েত রয়েছে...
“বলো তো, তোমাদের কারো ঘরের পাশেই যদি নহরনালা বহমান থাকে, আর সে তাতে দিনে পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসুল আল্লাহ! কোনো ময়লা থাকতে পারে না। নবীজী বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযেরও উদাহরণ তেমন। এর বরকতে বান্দার গোনাহখাতা মাফ হয়ে যায়।” ৩৮
হায় আফসোস, নামাজের ব্যাপারে আমাদেরকে কত তাগিদ দেয়া হয়েছে, আমাদের জন্য কত পুরস্কার রাখা হয়েছে, এতদ্বসত্ত্বেও আজ আমরা নামাজ পড়ি না। নফসের ধোকায় পড়ে নামাজ থেকে দূরে সরে আছি। আমরা সবাই জান্নাত কামনা করি, অথচ জান্নাতে যাওয়ার আমল করি না。
আজ নফসের ধোঁকায় পড়ে নামাজ চলাকালীন সময় মসজিদ'কে উপেক্ষা করে বাজারের দিকে যাচ্ছি। পারবো কি সেদিন, এভাবে জান্নাত'কে উপেক্ষা করে জাহান্নামের দিকে যেতে? না, পারবো না। তাহলে কেন আজ নফসের গোলামী করে নিজেকে এভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? মনে রাখবেন-নফসকে ঠিক না করা অবধি আমাদের নামাজে খুশু খুজু আসবে না। নামাজে মন বসবে না। নামাজে ভালো লাগা তৈরি হবে না। নফসে আম্মারা তো বিষধর কালসাপ! এটাকে সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ালে আপনি তো সর্বদাই ঝুঁকির মধ্যে থাকবেন。
মানুষ নফসের ধোঁকায় কত সহজেই ফেতনার জালে আটকে যাচ্ছে। কত সহজেই বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। কত সহজেই নফসের গোলামী করে শয়তানকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। এ-সব কিছু থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নামাজ খুবই কার্যকরী। নামাজ, সমস্ত আসক্তি'র এক অনন্য মেডিসিন。
নামাজ, সরাসরি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে যায়, তার উপর কখনো নফস কর্তৃত্ব করতে পারে না। যে ব্যক্তি নামাজের মাধ্যমে তার রব'কে পেয়ে যায়, সে কখনো নফসের গোলামী করতে পারে না; সে তখন শুধুমাত্র রবের দাসত্বেই নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে নেয়。
নামাজ সম্পর্কে, এক আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
ان الصلاة تنهى عن الفحشاء والمنكر
'নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা এবং পাপ থেকে বিরত রাখে'
এই আয়াতের দ্বারা বুঝা যায়—নামাজ যাবতীয় অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বিরত রাখে। পক্ষান্তরে, নফসের খোরাক হচ্ছে, যাবতীয় অশ্লীলতা এবং পাপাচার। এখন নামাজ যদি যাবতীয় অশ্লীলতা পাপাচার থেকে বিরত রাখতে পারে, তখন এমনি এমনি তার খোরাক বন্ধ হয়ে যাবে। আর তার খোরাক বন্ধ হয়ে গেলে, সে নিস্তেজ হতে বাধ্য! তাই আসুন নামাজে পাবন্দি করি। নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনি。
টিকাঃ
৩৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪
৩৭ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৬৫৭৬
৩৮ সহীহ মুসলিম, হাদিস-৬৬৭
📄 নফস নিয়ন্ত্রণে যাকাতের ভূমিকা
লোভ-লালসা, কৃপণতা নফসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। লোভ-লালসা নফসের এক প্রকার প্রবৃত্তি। এই লোভ-লালসার কারণে নফস উদ্ধত হয়ে যায়। লোভ-লালসা নফসের এক অনন্য ব্যাধি। লোভ ও কৃপণতা নফসের খুবই নিকৃষ্ট স্বভাব। যারা কৃপণ এবং লোভী, তারা যাকাত দিতে হাত গুটিয়ে নেয়। ফলে, নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করতে পারে না আবার নিজের ধন-সম্পদও পবিত্র করতে পারে না。
লোভ-লালসা অন্তর বিধ্বংসী একটি স্বভাব। এর কারণে আজ অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত। অপর দিকে যাকাত একজন ব্যক্তির নফসকে পরিশুদ্ধ করে; আত্মিক উন্নয়ন ঘটায়। আর তাছাড়া, যাকাত একটি ফরয বিধান। তা অবশ্যই পালনীয়। এতে রয়েছে ফরয পালনের পাশাপাশি নফসের গোলামীর প্রতিষেধক। তাই আমাদের উচিত ছিলো—যাকাত প্রদানের মাধ্যমে নফসের লোভ-লালসাকে দূর করা। কিন্তু, আজ আমরা নফস থেকে লোভ লালসা দূর করার পরিবর্তে, নফসের গোলামী করে যাকাত প্রদান থেকে বিরত থাকছি。
কৃপণতা নফসের একটা ব্যাধি। এই ব্যাধি দূর করতে, অবশ্যই যাকাত প্রদান করতে হবে; নয়তো নফস ধীরে ধীরে দুরারোগ্য হয়ে পড়বে। তখন সে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম কোনো কিছু বিবেচনা করবে না। সব সময় হারাম ভক্ষণে মনোনিবেশ করবে। আর তখন হারাম খেতে খেতে নফস অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে হারাম থেকে বেঁচে থাকা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়বে。
যাকাতের চারিত্রিক ফায়দা:
১. যাকাত ব্যক্তিকে দানশীল ও বদান্যদের কাতারে শামিল করে। যখন আপনি দান-সদকায় অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন, তখন নফস ধীরে ধীরে সতেজ হয়ে উঠবে।
২. যাকাত প্রমাণ করে, যাকাত আদায়কারী অভাবীদের প্রতি রহম, দয়া ও অনুগ্রহশীল, আর আল্লাহ দয়াশীলদের উপর দয়া করেন।
৩. মুসলিমদের উপর আর্থিক ও শারীরিক সেবা প্রদান অন্তঃকরণকে প্রশস্ত ও প্রফুল্ল করে এবং মানুষের নিকট যাকাত দাতাকে প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ করে তুলে।
৪. যাকাতে রয়েছে লোভ ও কৃপণতা থেকে মুক্তি。
যাকাতের সামাজিক উপকারিতা:
১. যাকাতের ফলে অভাবীদের অভাব দূর হয়, দুনিয়ার অধিকাংশ জায়গায় যাদের সংখ্যাই বেশী।
২. যাকাতের ফলে মুসলিমদের শক্তি অর্জন হয় ও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, কারণ যাকাতের একটি খাত জিহাদ।
৩. যাকাত গরীবদের অন্তর থেকে ধনীদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে দেয়। কারণ গরীবরা যখন দেখে ধনীরা তাদের সম্পদ দ্বারা যাবতীয় প্রয়োজন পুরো করে, কিন্তু তাদের সম্পদ থেকে তারা কোনভাবে উপকৃত হয় না, এ কারণে অনেক সময় ধনীদের প্রতি তাদের অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম নেয়, যেহেতু ধনীরা তাদের অধিকার রক্ষা করে না, তাদের কোন প্রয়োজনে তারা সাড়া দেয় না। কিন্তু ধনীরা যদি বছর শেষে গরীবদের যাকাত দেয়, তাহলে তাদের অন্তর থেকে এসব বিষয় দূরীভূত হয় এবং উভয় শ্রেণীর মধ্যে মহব্বত ও ভালবাসার সৃষ্টি হয়।
৪. যাকাতের ফলে সম্পদ বৃদ্ধি পায় ও তাতে বরকত হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কোন সদকা সম্পদ হ্রাস করেনি”।
অর্থাৎ, সদকার ফলে যদিও সম্পদের অংক কমে, কিন্তু তার বরকত কমে না, বরং আল্লাহ তার সম্পদে বরকত দেন এবং তার বিনিময়ে আরো অধিক দান করেন。
অনেকেই আজ নফসের ধোকায় পড়ে যাকাত প্রদানে বিরত রয়েছে। যদিও মাঝে মধ্যে দিতে মন চায়-কিন্তু নফস সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নফস তখন বলে-যাকাত দেয়ার কী দরকার, শুধু শুধু টাকা নষ্ট, মাল কমে যাবে, ইত্যাদি। আসলে, যাকাত দিলে কখনো মাল কমে না; আরো বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও যাকাত প্রদানে নফস পরিশুদ্ধ হয়। যেমন: নফসের ব্যাধি-অহংকার, হিংসা, লোভ, কৃপণতা ইত্যাদি যাকাত প্রদানের মাধ্যমে অন্তর থেকে দূর হয়ে যায়। আর এই ব্যাধি গুলো অন্তর থেকে দূর হয়ে গেলে নফস এমনি এমনি সতেজ হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ। তাই, আমাদের যাকাত প্রদানে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
📄 লাগামহীন নফস বিষাক্ত সাপের মতো
লাগামহীন নফস হলো বিষাক্ত সাপের ন্যায়। একটি বিষাক্ত সাপ বাড়ির আঙিনায় ঘুরে বেড়ানো মানে, পুরো পরিবারের জন্য আতংকের বার্তা। ঠিক তদ্রুপ আমাদের লাগামহীন নফস আমাদের মাঝে অবস্থান করা মানে, আমাদের জন্য আতংকের বার্তা। সময়মতো তাকে পরিশুদ্ধ না করলে, ইহকাল পরকাল উভয় জগতে পরিতাপের কারণ হবে。
ইতিপূর্বে নফসকে নিয়ন্ত্রণের অনেক পদ্ধতি বর্ণনা করেছি। উক্ত পদ্ধতি গুলো কাজে লাগালে ভালো ফলাফল আসবে, ইনশা'আল্লাহ। তবে এই কথা ভুলে গেলে চলবে না-লাগামহীন নফস কিন্তু একটি বিষাক্ত সাপের ন্যায়。
কিছুদিন আগে একজন সাপুড়ে'কে দেখেছিলাম-গর্ত থেকে সাপ ধরতে। প্রথমে সে কয়েকজন লোক দিয়ে কোদাল শাবল দিয়ে গর্তের উপর থেকে মাটি সরালো। মাটির সরানোর প্রাক্কালে হঠাৎ ওই সাপটি সাপুড়ের দৃষ্টি গোচর হল। তখন সে ওই ব্যক্তিদের বললো, 'আশেপাশে গর্তের সমস্ত মুখ বন্ধ করে দাও এবং শুধুমাত্র সাপের লেজের দিকের গর্তের মুখটা খোলা রাখো।' তারাও তার আদেশ অনুযায়ী ওই গর্তের আশেপাশের সব জায়গা মাটি দিয়ে আবার ঢেকে দিল এবং শুধুমাত্র লেজের পাশ খুলা রাখলো。
বেশ খানিকক্ষণ বাদ, ওই সাপুড়ে, সাপের লেজ ধরলো এবং ঐ লোকদের বললো, 'মাটি দিয়ে তার চারপাশ টাইট করে ফেলো-যেন সে নাড়াচাড়া করতে না পারে।' তারা তার আদেশে তা-ই করলো। যখন মাটি সাপ'টিকে চেপে ধরলো, তখন সে অনেক চেষ্টা করেও নড়াচড়া করতে পারেনি। আর সাপুড়ে ধীরে ধীরে আলতো করে দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে তাকে গর্ত থেকে বের করে। সে জানে তাকে যদি এক টান দিয়ে বের করে নেয়, তখন সে ঘাড় বেঁকিয়ে তার উপর আক্রমণ করতে পারে। এমনকি তাকে ছোবলও মারতে পারে। এজন্য তার চতুরপাশ মাটি দিয়ে টাইট করে, আলতো করে লেজের দিক দিয়ে টেনে টেনে সাপটি বের করে। সে জানে—কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়া, হুটহাট তাড়াহুড়া করে তাকে বের করতে যায় তখন বিপদ অনিবার্য! এজন্য সে পূর্ণ প্রস্তুতিসহ পরিকল্পনা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় নিয়ে তাকে গর্ত থেকে বের করে। অবশেষে ওই সাপটিকে সে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। অতঃপর তাকে কাবু করতে সক্ষম হয়。
এটা প্রত্যেক সাপুড়ের, সাপ'কে নিয়ন্ত্রণে আনার, তাকে গর্ত থেকে টেনে বের করার একটা পদ্ধতি। প্রত্যেক সাপুড়ে সাপ কে ধরার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করে থাকেন。
আমাদের নফসের ক্ষেত্রেও এরকমটাই করতে হবে। সবকিছুর প্রস্তুতি নিয়ে, পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধীরে ধীরে সময় নিয়ে নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কোনো ধরনের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ছাড়াই, হুটহাট তাড়াহুড়া করে যদি তাকে কাবু করতে যান, তখন সুফলের তুলনায় কুফল'টা-ই বেশি হবে। আপনি যদি মনে করেন— আমি আমার নফসকে এক দিনেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবো, এক দিনেই তাকে আমি পরিশুদ্ধ করে ফেলব; তাকে কাবু করে ফেলবো, তবে আপনার এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধীরে ধীরে তার গোঁড়ামি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। ধীরে ধীরে তাকে ভালো কাজে অভ্যস্ত করতে হবে। নয়তো সে বিগড়ে গিয়ে উল্টো রিয়েকশান করবে।