📄 নফস নিয়ন্ত্রণ করতে জরিমানা আরোপ করুন
নফস হচ্ছে অবুঝ বাচ্চাদের মতো। বাচ্চাদের যা ভালো লাগে তারা তাই করে। আর যা ভালো লাগে না তার ধারে কাছেও যায় না। উদাহরণস্বরূপ: বাচ্চারা স্বভাবগত আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। এজন্য, লক্ষ্য করে দেখবেন, কোন একটি বাচ্চা হুট করে পাঞ্জাবি পড়ে ফেলেছে, পাগড়ী মাথায় দিয়ে দিয়েছে, আবার আযান পড়ার সাথে সাথে মসজিদে চলে যাচ্ছে। আবার দেখবেন, কিছুদিন পরে সে মসজিদের ধারে কাছেও নেই। মোটকথা, যখন যা ভাল লাগে তাই করে。
বাচ্চারা যদি মসজিদে আসে, তখন আমরা তাদেরকে সাধারণত উৎসাহ দিয়ে থাকি। বলি-মাশাল্লাহ, এভাবে নিয়মিত নামাজে আসবা। আর যখন সে মসজিদ বিমুখ হয়ে যায়, তখন আমরা তাকে শাসন করি। বলি-মসজিদে যাস না কেন, তোকে যেতে হবে, ইত্যাদি। তো আমাদের নফসটাও এরকম-ই। যখন যা ভাল লাগে তাই করে। কোনো এক দুর্ঘটনায় নফস যখন ভয় পেয়ে যায়, তখন মনে মনে বলে, যাই নামাজ পড়ি। আবার যখন দুর্ঘটনার সেই ভয় নফস থেকে দূর হয়ে যায়, তখন আবার নামাজ ছেড়ে দেয়। মোটকথা, যখন যা ভালো লাগে, তাই করে。
নফসের এই বাচ্চা-সুলভ আচরণ'কে বিলুপ্ত করতে আমাদের উচিত, নফসের ওপর জরিমানা আরোপ করা। যদি আমাদের দ্বারা কোনো গোনাহ সংঘটিত হয়, নেক কাজ ছুটে যায়, তাওবাহ ও ভর্ৎসনা দ্বারাও ঠিক না হয়; বার বার খারাপ কাজে লিপ্ত হতেই থাকে, তখন নফসের ওপর কিছু শিক্ষা মূলক শাস্তি বা জরিমানা আরোপ করা যায়। এতে করে নফস, কিছুটা সোজা হয়ে যাবে। আশরাফ আলী থানুবী রহি. বলেছেন-আপনি যখন নফসের ওপর জরিমানা আরোপ করবেন, তখন নফস এমনি এমনি সোজা হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আপনি যদি ধনী হয়ে থাকেন, তখন নফস'কে বলবেন-হে নফস, তুই যদি একটা খারাপ কাজ করিস, তাহলে তোকে ১০০ রাকাত নামাজ পড়তে হবে! আর আপনি যদি গরিব হয় থাকেন, তখন নফসকে বলবেন, হে নফস, তুই যদি একটা খারাপ কাজ করিস, তবে প্রত্যেক খারাপ কাজের বিনিময়ে মসজিদে ১০০ টাকা করে দিতে হবে। দু'দিন চার দিন এভাবে ১০০ টাকা করে দিলে, এমনি সে সোজা হয়ে যাবে। কেননা, নিজের উপর চাপ-নফস-ও নিতে পারে না; সেটা দৈহিক হোক, অথবা আর্থিক。
মোটকথা, নফসের ওপর কিছু শাস্তি আরোপ করা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। এতে করে ভালো একটা ফলাফল আসবে, ইন শা আল্লাহ। যেমন: প্রয়োজনীয় পানাহার ও বিশ্রামের দিকে খেয়াল রেখে, অতিরিক্ত আরামদায়ক বিশ্রাম পরিহার করা। যে খাবার খেলে টিকে থাকা যায়-সে পরিমাণ খাবার খেয়ে অতিরিক্ত গুলো পরিহার করা। আবার, নফল রোজা, নফল নামাজ, দান-সদকা ইত্যাদি জরিমানা করলেও নফস কিছুটা কাতু হয়。
একবার আবু বকর সিদ্দিক রাযি. এভাবে নিজেকে শাস্তি দিয়েছিলেন...
যাইদ ইবনু আসলাম রাযি তাঁর পিতা থেকে বর্ণিত: উমার ইবনে খাত্তাব রাযি. আবু বকর সিদ্দীক রাযি. -এর নিকট গিয়ে দেখলেন যে, আবু বকর সিদ্দিক রাযি. স্বীয় জিহ্বা ধরে টানছেন। উমার রাযি. বললেন, রাখুন (অর্থাৎ এই রকম করবেন না), আল্লাহ্ আপনাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর আবু বকর রাযি. বললেন, এই জিহ্বাই তো আমাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে。
জিহ্বার দ্বারা গোনাহ সংঘটিত হয়েছিল বলে তিনি জিহ্বাকে টেনে ধরেছিলেন। জিহ্বার উপর শাস্তি আরোপ করেছেন। আর আমরা?! আমরা কী করছি? আমাদের নফসের তাড়নায় এত এত গোনাহের কাজে ধাবিত হচ্ছি, তবু নফসের উপর কোনো শাস্তি প্রয়োগ করছি না!
তাই, নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে, তার আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকতে, অবশ্যই তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করা জরুরী। সে বিগড়ে গেলে তার ওপর কিছু শিক্ষা মূলক শাস্তি আরোপ করা—যেন ধীরে ধীরে নফস দলিত হয়。
তবে, এমন কোন শাস্তি আরোপ করবো না— যা শরীয়ত বিরোধী। যেমন: বিয়ে-শাদী ত্যাগ করা, প্রয়োজনীয় পানাহার ও নিদ্রা ত্যাগ করা, ভবঘুরে হয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো, ইত্যাদি。
টিকাঃ
মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস- ১৭৯৬
📄 নফস নিয়ন্ত্রণ করতে বেশি বেশি আত্মসমালোচনা করুন
এক
নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার আরেকটি সহজ পদ্ধতি হচ্ছে-আত্মসমালোচনা। যে ব্যক্তি সব সময় নিজের সমালোচনায় ব্যস্ত, সে নফসে আম্মারা দ্বারা খুব কমই প্রভাবিত হয়। আর যে ব্যক্তি সব সময় অন্য মানুষের সমালোচনায় ব্যস্ত, সে-ই নফসের কাছে কাবু হয়ে থাকে। এজন্য, যে ব্যক্তি নিখুঁতভাবে আত্মসমালোচনা করতে পারে, সে খুব কমই খারাপ কাজে ধাবিত হয়। বিবেক তখন বাধা হয়ে দাঁড়ায়! কেননা, যখন কোনো জান্নাত প্রত্যাশী ব্যক্তি নফসের সমালোচনা করে, তখন তার যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি তার কাছে পরিলক্ষিত হয়। ঠিক তখনই, সে স্বীয় নফসকে ভর্ৎসনা করতে শুরু করে। নিজেই নিজের নফসকে শাসাতে শুরু করে। আর এই শাসনের ফলে, নফস খারাপ কাজে অগ্রসর হতে প্রেরণা হারিয়ে ফেলে。
আর তাছাড়া, নিজের নফসের সমালোচনাকারীকে রাসুল সা. জ্ঞান বুদ্ধি সম্পন্ন বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণকারীকে নির্বোধ বলে আখ্যায়িত করেছেন。
শাদ্দাদ ইবনু আওস রাযি. থেকে বর্ণিত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: সে ব্যক্তি জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন, যে তার নিজের আত্মপর্যালোচনা করে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য (নেক) আমল করে। আর ঐ লোক নির্বোধ, যে স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, আবার আল্লাহর কাছে অবাস্তব আশা পোষণ করে। ২৯
যাহোক, আত্মসমালোচনায় নিজেকে অনেকটা পরিশুদ্ধ করা যায়। আত্মসমালোচনার দ্বারা নিজের কৃতকর্ম গুলো নিজের চোখের সামনে ভেসে উঠে। এর দ্বারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করা যায়। আত্মসমালোচনা এভাবে করতে পারেন-বিগত এক মাসে অতিবাহিত হওয়া কার্যাবলী গুলি স্মরণ করুন। দেখুন তন্মধ্যে কয়টি ভালো কাজ করেছেন আর কয়টি খারাপ কাজ করেছেন। এরপর এগুলোকেও মনের দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করুন। এতে করে বুঝে নিতে পারবেন-আপনার নফস আপনার নিয়ন্ত্রণ আছে, নাকি বাহিরে। এভাবেও করতে পারেন-যখনই নফস কোন কাজে আগ্রহী হয়, তখন ঐ কাজ সম্পর্কে ভেবে দেখবেন-এটা কি ভালো কাজ, নাকি খারাপ কাজ। যদি ভালো কাজ হয় তাহলে করতে পারেন। আর যদি খারাপ হয় তখন নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাকে সংযত রাখতে হবে。
মোটকথা, নফস নিয়ে সমালোচনা করতেই হবে। অন্যের সমালোচনা বাদ দিয়ে নিজের নফসের সমালোচনা করতে হবে। আজ আমরা যত্রতত্র বসে অন্যের সমালোচনায় ব্যস্ত। একে অন্যকে বলি-দেখেছিস অমুক কী কান্ড-টাই না করলো! কীভাবে পারলো সে এটা করতে? তার কি একটুও লজ্জা-শরম নেই? তার কি একটুও সম্মানবোধ নেই? তার কি আল্লাহর ভয় নেই? সে এত বাজে হলো কীভাবে? ছিঃ ছিঃ!
আরে ভাই! আপনি অন্যের সমালোচনা করছেন। একবারও কি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? নিজের অভ্যন্তরে যে একটি অশ্লীল দানব লুকিয়ে আছে—সেটা কখনো খেয়াল করছেন? অমুক একটি খারাপ কাজ করেছে বলে আপনি তার সমালোচনায় ব্যস্ত। তার নাম ধরে ধরে তাকে ভর্ৎসনা করছেন। তাকে ঘৃনার চোখে দেখছেন। ছিঃ ছিঃ করছেন। একবারও কি নিজের নফসের সমালোচনা করেছেন। তার কৃতকর্মের জন্য তাকে ভর্ৎসনা করেছেন? সে যে পর্ন দেখার জন্য সব সময় মুখিয়ে থাকে, বেগানা নারী দেখলে ছটফট করে, নিজের স্বার্থের জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়-এগুলো কি খারাপ কাজ নয়? এজন্য, দৈনন্দিন কয়বার নফসকে ভর্ৎসনা করেছেন? অন্যের কৃতকর্ম দেখে আপনার তার প্রতি ঘৃণা জন্ম নেয়, অথচ নিজের নফসের কৃতকর্মের জন্য কেন অনুতপ্ত হচ্ছেন না? জানেন ভাই, আরবিতে একটা প্রবাদ আছে, 'সবচে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বা বিচক্ষণ মানুষ হলো ওই ব্যক্তি যে নিজের দোষ-ত্রুটি দেখে।' এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি সত্যি বিচক্ষণ? আপনি কি স্বীয় নফসের সমালোচনা করছেন?
শুধু আপনি আর আমি এরকম করছি, তা নয়। এমন অনেক মানুষ আছে, যারা অন্যের দোষ-ত্রুটি নিয়ে সর্বদাই সমালোচনায় মত্ত। অথচ স্বীয় নফস কু-প্রবৃত্তির গোলাম। অধিকাংশ মানুষ নিজের নফসের গোলামীতে ডুবে থেকে অন্যের সংশোধনে বেশি উদগ্রীব! এটি কোনো ঈমানদারের কাজ হতে পারে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন-
'তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেরা নিজেদেরকে ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর? তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না?'
নিজেদের দোষ, ভুল-ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে পারলেই নফস পরিশুদ্ধ ও উন্নত হবে। নফসকে পরিশুদ্ধ করতে নফসের সমালোচনার কোনো বিকল্প নেই। তাই, নিজের মধ্যে কোন্ কোন্ দোষ বা ভুলগুলো রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে অবশ্যই আত্মসমালোচনা করতে হবে। এজন্য নিজের চেষ্টা থাকা সবচে বেশি জরুরী। এ চেষ্টার নাম হচ্ছে ইহতেসাব বা আত্মসমালোচনা。
কোনো ব্যক্তি যখন নিজের দোষ বের করতে 'আত্ম-সমালোচনা' করে, তখন সে তা দেখতে পায়; তার দোষগুলো তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাই আত্ম-সমালোচনার জন্য, নির্জনে, একান্তে, নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব, কর্তব্য, করণীয়-বর্জনীয়, সফলতা-ব্যর্থতা এবং ভালো ও মন্দ কাজগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। নিজের ভালো ও মন্দ কাজগুলো নিয়ে হিসাব-নিকাশ করলেই বেরিয়ে আসবে-নিজের ভালো- মন্দ সব দোষ ও গুণ。
মনে রাখতে হবে-মহান আল্লাহ তা'আলা মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য দিয়েছেন বিবেক নামক এক বিশেষ যোগ্যতা ও ক্ষমতা। যা দ্বারা মানুষ ভালো-মন্দের বিচার করতে পারে। এ- বিবেক তার মাঝে আয়নার মতো ভালো ও মন্দগুলোকে তুলে ধরে। বান্দাও সে বিবেক-বিবেচনার জোরে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'বরং মানুষ নিজেই নিজের ব্যাপারে খুব ভালো জানে।'৩১
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, '(পরকালে) হিসেবের সম্মুখীন হওয়ার আগে তোমরা নিজরা নিজেদের হিসাব নাও এবং (পরকালে) তোমাদেরকে মাপার আগে তোমরা নিজেরা নিজেদের মেপে নাও। কেননা, আজকের তোমার নিজের এ- হিসাব-নিকাশ করাটা আগামীর হিসাব দেয়ার চেয়ে অনেক সহজ।
তাই প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের উচিত নিজেদের দোষ-ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা এবং তা থেকে নিজেদের সংশোধন করা। পরকালের জীবনকে সুন্দর করা।
দুনিয়ার সফলতার সঙ্গে সঙ্গে পরকালের সফলতার প্রতি জোর দেয়া। প্রতিটি মুহূর্তে মহান রবের কাছে নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করা এবং বেশি বেশি তাওবাহ-ইসতেগফার করা জরুরী。
আপনার আমার মাঝে নিজেকে সংশোধনের আগ্রহ বা চেষ্টা থাকলে, ধীরে ধীরে নফসের গোঁড়ামি হ্রাস পেতে থাকবে。
দুই
আত্মসমালোচনার কিছু উপকারিতা:
১. নিজের দোষ-ত্রুটি নিজের সামনে প্রকাশ করার মাধ্যমে মানুষ স্বীয় ভুল-ত্রুটি জানতে পারে। ফলে তার হৃদয় ভালো কাজের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারে।
২. আত্মসমালোচনা দীনের উপর দৃঢ়তা অর্জনের সবচে কার্যকরী মাধ্যম, যা মানুষকে আল্লাহর দরবারে মুহসিন ও মুখলিছ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে।
৩. আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নেয়ামতসমূহ, অধিকারসমূহ জানতে পারে। আর সে যখন আল্লাহ'র নেয়ামত ও তার অবস্থান সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে, তখন সে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ে উদ্বুদ্ধ হয়।
৪. আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মানুষের মাঝে পরকালীন জবাবদিহিতার উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। মাইমুন বিন মিহরান বলতেন, 'মুত্তাক্বী ব্যক্তি সে-ই, যে নিজের জবাবদিহিতা এমন কঠোরভাবে গ্রহণ করে যেন সে একজন অত্যাচারী শাসক'।
৫. আত্মসমালোচনা জীবনের লক্ষ্যকে সবসময় সজীব করে রাখে। এর মাধ্যমে আমরা অনুভব করতে পারি—আমাদেরকে এই পৃথিবীর বুকে অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। পার্থিব জীবন শুধু খাওয়া-দাওয়া, হাসি-ঠাট্টার নয়, এ জীবনের পরবর্তী যে অনন্ত এক জীবন, তার জন্য যে আমাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে—আত্মসমালোচনা আমাদেরকে সর্বক্ষণ তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
৬. মুহাসাবার ফলে কোনো পাপ দ্বিতীয়বার করতে গেলে বিবেকে বাধা দেয়। ফলে পাপের কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়。
আত্মসমালোচনা না করার ফলাফল :
ইবনুল ক্বাইয়িম রহি. বলেন, আত্মসমালোচনা পরিত্যাগ করার অর্থ হলো, কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলা। এতে মানুষের অন্তর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ আত্মসমালোচনা পরিত্যাগ করার ফলে দীনের প্রতি তার শিথিলতা চলে আসে, যা তাকে নিশ্চিতভাবেই দুনিয়াবী জীবন ও পরকালীন জীবনে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। কেবল প্রতারিত আত্মাই আত্মসমালোচনা পরিত্যাগ করতে পারে। ফলশ্রুতিতে সে কোন কিছুর পরিণাম চিন্তা করে না। সমস্ত পাপ তার কাছে অত্যন্ত সহজ বিষয় হয়ে যায়। অবশেষে একসময় পাপ থেকে বেরিয়ে আসাটা তার কাছে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কখনো যদি সে সৎপথের সন্ধান পায়ও, তবুও সে তার অন্যায় অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করে। (৪)
আত্মসমালোচনার পদ্ধতি : আত্মসমালোচনা দু'ভাবে করা যায়। যথা-
১। কোন আমল শুরু করার পূর্বে আত্মসমালোচনা করা : অর্থাৎ, কোনো কাজের সংকল্প করার পূর্বেই সে কাজটি সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে— 'কাজটি ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জীবনের জন্য উত্তম, নাকি ক্ষতিকর? কাজটি কি হারাম, নাকি হালাল? কাজটিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে, নাকি নেই? অতঃপর যখন মনে হবে, কাজটি উত্তম, তখন আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রেখে কাজে নেমে পড়তে হবে。
আর কাজটি খারাপ মনে হলে, একইভাবে পূর্ণ একনিষ্ঠতা ও তাওয়াক্কুলের সাথে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিদিন সকালে আন্তরিকভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে, যেন সারাদিন সৎ আমলের সাথে সংযুক্ত থেকে অসৎ আমল থেকে বিরত থাকা যায়。
১। আমল শেষ করার পর আত্মসমালোচনা করা : এটা তিনভাবে করা যায়। যথা-
(ক) আল্লাহর আদেশ সমূহ আদায়ের ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করা:
আমাদের উপর নির্দেশিত ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল গুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা। নিজেকে জিজ্ঞেস করা-আমি কি আমার উপর আরোপিত ফরযগুলো আদায় করেছি? আদায় করলে সাথে সাথে নফল বা মুস্তাহাবগুলো কতটুকু আদায় করেছি? কারণ, ফরযের অপূর্ণতা নফল পরিপূর্ণ করে দেয়。
(খ) অপ্রয়োজনীয় কাজ পরিত্যাগ করা:
দীনি দৃষ্টিকোণ থেকে এমন কোনো হালাল কাজ, যা করার চেয়ে না করাই বেশী উত্তম মনে হয়, তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। কোনো নির্দোষ কিন্তু গুরুত্বহীন কাজ করে থাকলে তা থেকেও নিজেকে সাধ্যমত নিয়ন্ত্রণ করা। এভাবে যে, আগামীতে কেন এটা করব? এর দ্বারা কি আমি আল্লাহর পথে আরো অগ্রসর হতে পারব? এর দ্বারা কি দুনিয়াবী ও পরকালীন জীবনে আমার বা মানবসমাজের কোনো লাভ হবে? তা অন্য কোন লাভজনক কাজ থেকে আমাকে বিরত করছে কি? ইত্যাদি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পেলে, সে পথে আর অগ্রসর না হওয়া。
(গ) ক্ষমা প্রার্থনা করা ও সৎ আমল করা:
পূর্ণ সতর্কতার পরও যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো পাপ হয়ে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা ও তওবা করা। সাথে সাথে সৎআমল দ্বারা এই অপরাধের ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করা। আল্লাহ বলেন, 'নিশ্চয়ই ভালো কাজ মন্দকাজকে দূর করে দেয়, আর এটা উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।'
রাসূল সা. বলেন, 'তুমি যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর। কোন পাপ কাজ সংঘটিত হয়ে গেলে সাথে সাথে সংআমল কর, যাতে তা মিটে যায়'।
ইমাম শাফেঈ রহি. বলেন, 'সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি সে-ই, যে দুনিয়াকে পরিত্যাগ করে দুনিয়া তাকে পরিত্যাগ করার পূর্বেই। কবরকে আলোকিত করে, কবরে বসবাস করার পূর্বেই। স্বীয় প্রভুকে সন্তুষ্ট করে, তার সাথে সাক্ষাৎ লাভের পূর্বেই, জামাতে নামাজ আদায় করে, তার ওপর জামাতে নামাজ (অর্থাৎ জানাযার নামাজ) পঠিত হবার পূর্বেই। নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করে, হিসাব দিবসে তার হিসাব গ্রহণ করার পূর্বেই'।
মোটকথা আত্মিক উন্নয়নের জন্য, আত্মসমালোচনার কোনো বিকল্প নেই। আপনি আমি যত বেশি আত্মসমালোচনা করব, তত বেশি আমরা আমাদের নিজের নফসের কৃতকর্মের ব্যাপারে অবগত হব। আর যখন নিজের নফসের কৃতকর্ম গুলো আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে, তখন তাকে পরিশুদ্ধ করা খুবই সহজ হয়ে যাবে。
তাই, আমাদের উচিত অন্যের সমালোচনা রেখে স্বীয় নফসের সমালোচনা করা। এতে করে দুনিয়া আখেরাত উভয়টাই আলোকিত হয়ে যাবে। নফসের সমালোচনা করতে করতে যখন সে কাবু হয়ে যাবে, তখন দুনিয়াতে সম্মান ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আর পরকালের টা নিজে উপলব্ধি করে নিন....
টিকাঃ
২৯ * রিয়াদুস সলিহীন - ৬৭
সূরা বাকারা: আয়াত ৪৪
সূরা কেয়ামাহ: আয়াত ১৪
০২ ইবনুল কাইয়িম, ইগাছাতুল লাহফান ১/৮২।
আবু দাউদ, মিশকাত হা/১৩৩০ সনদ ছহীহ।
ইহয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৩৯৪।
* তিরমিযী, মিশকাত হা/৫০৮৩।
📄 রিমাইন্ডার
নফসকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে, তাকে বেশি বেশি রিমাইন্ডার দিতে হবে। তাকে ভীতি প্রদর্শন করতে হবে। কী কী রিমাইন্ডার দিবেন, আসুন জেনে নিই...
১. নফসকে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিন। এজন্য, এই আয়াতটি সব সময় মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ অর্থ- প্রত্যেক নফস, মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। এই আয়াতটি বেশি বেশি তেলাওয়াত করে নফসকে রিমাইন্ডার দিন। তাকে সজাগ করুন। তাকে জানিয়ে দিন- কুল্লু নাফসিন জা-ইক্বাতুল মাউত। এটা হবে তার জন্য একটি রিমাইন্ডার。
মৃত্যুর কথা স্মরণ হলে, নফস কিছুটা কান্ত হয়। দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। যখন কেউ একাকী নিভৃতে, গভীর মনোযোগ সহকারে তার অন্তিম যাত্রা নিয়ে চিন্তা-ফিকর করে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করে। আর সেই ভয় নফসে গোঁড়ামির প্রতিষেধক হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এজন্য, নফস নিয়ন্ত্রণে উত্তম মাধ্যম হচ্ছে, মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা। তাকে ভীতি প্রদর্শন করা। আর উক্ত আয়াতটি অর্থসহ মনোযোগ সহকারে বেশি বেশি পাঠ করা。
২. জাহান্নামের আগুনের ভয়। কোনো একদিন এমনি এমনি আগুনে হাত দিয়ে নিজের নফসকে রিমাইন্ডার দিন। আগুনে হাত রাখুন, হাতে আগুন লাগলেও এর ব্যাথা কিন্তু নফস অনুভব করে। তাই, জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করে তাকে রিমাইন্ডার দিন। তাকে জানিয়ে দিন, আজকের এই কৃতকর্মের কারণে সেদিন জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে。
৩. চলমান, ঘটমান অবস্থা দিয়ে নফসকে রিমাইন্ডার দিন। নফস বেশিরভাগ গোনাহের দিকে ধাবিত হয়, দু'টি জিনিস পেতে। ১- যৌবনের ক্ষুধা ২- পেটের ক্ষুধা। এই দু'টি ক্ষুধা নিবারণের জন্য নফস সব সময় মুখিয়ে থাকে। এই দু'টি চাহিদা পূরণ করতে, ভালো-খারাপ হারাম-হালাল কিছুই দেখে না। এজন্য অবস্থাভেদে তাকে রিমাইন্ডার দিতে হবে。
সেদিন আমি একটি আম কেটে খাচ্ছিলাম। আম কাটার সময় আমের চির হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। পড়ে যাচ্ছে, পড়ে যাচ্ছে। হাতের তালুতে তিনবার লাফ খেয়েছে। চতুর্থ বার তাকে আয়ত্বে নিয়ে আসি। মনে মনে ভেবেই নিয়েছিলাম, আমটি হয়তো আর খাওয়াই হবে না। কিন্তু, কীভাবে জানি দু-তিনবার হাতের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে আবার হাতের মুঠোয় আটকে যায়। তখন মনে মনে নফসকে বলি—এটাই রিজিক। এটাই তাকদির। খাবারের জন্য তুই এদিক ওদিক খারাপ চিন্তা আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিস, অথচ আমার আল্লাহ আমার রিজিকের ফায়সালা পূর্ব থেকেই করে রেখেছেন। যা আমার জন্য নির্ধারিত তা হস্তচ্যুত হতে হতে আবার হাতেই আটকে পড়বে। আর তাছাড়া, আমার আল্লাহ আমার জন্য যা বরাদ্দ রেখেছেন, তা আমি ভক্ষণ করবই। আর যা আমার রিজিকে নেই, তা শত চেষ্টা করেও হাসিল করতে পারবো না。
এটাই ঘটমান রিমাইন্ডার! তাৎক্ষণিক কোনো কিছু ঘটে গেলেই, তা দিয়ে নফসকে শিক্ষা দেয়া। আসলে নফসকে বুঝাতে হবে— যা তাকদিরে আছে তা-ই হবে। যা আসার কথা তা আসবেই। মাঝখানে শুধু শুধু হারামে জড়ানো। আমার তাকদিরে লেখা আছে, এই সপ্তাহে আমি এক লক্ষ টাকার মালিক হবো। এটা আগে থেকেই ফায়সালা করা। এটা যেভাবেই হোক আমার কাছে আসবেই। এখন যে ব্যক্তি হারাম রুজিতে জড়িত, সে কিন্তু এক লক্ষ টাকা অর্জন করতে হারাম পন্থাই অবলম্বন করবে। অথচ, এই টাকাটা তার ভাগ্যে পূর্ব থেকে লেখা ছিলো। এটা এমনি এমনি যে-কোনো উপায়ে সময় সাপেক্ষ তার কাছে আসতো। কিন্তু, সে নফসের তাড়নায় শুধু শুধু হারাম পন্থায় এটা অর্জন করলো। শুধু শুধু এটার মধ্যে খারাপ একটা জিনিস মিশ্রণ করলো。
৪. নফসকে রিমাইন্ডার দিতে একাকী নিভৃতে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একটু ভাবুন। ভাবুন-আমি কে? আমি কোথায় ছিলাম? আমি কেন এসেছি? আমার কাজ কী? আমার গন্তব্য স্থল কোথায়? আমাকে কোথায় যেতে হবে?
আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন, জগতের কোনো কিছু তিনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। তাহলে আজ আমি কেন নফসের তাড়নায় অনর্থক কাজে লিপ্ত? কেন আজ নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে, নিজের দায়িত্ব ভুলে গিয়ে অনর্থক খেল-তামাশায় সময় ব্যয় করছি? প্রশ্ন করুন, ভালো করে নিজেকে প্রশ্ন করুন! অস্তিত্ব নিয়ে ভাবুন। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে যত বেশি ভাববেন, তত বেশি নিজেকে খুঁজে পাবেন। নিজের মধ্যে নিজেকে সেভাবেই খুঁজুন, যেভাবে আপনি আমি হারিয়ে গেছি নিজের মধ্যে। আজ আমরা আমাদের মধ্যেই হারিয়ে গেছি। নিজের নফসের গোলামী করে পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে ভ্রমণ করছি। অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে আলোর পথ ভুলে গেছি। সেইসাথে ভুলে গেছি-কে আমি? কোথায় আছি? কেন এসেছি? আবার কোথায় যাবো?
এজন্য, বেশি বেশি নিজের অস্তিত্বের কথা স্মরণ করে নিজের নফসকে রিমাইন্ডার দিতে হবে। নয়ত নিজের মধ্যেই নিজেকে ঘুরপাক খেতে হবে। হারিয়ে যেতে হবে ধ্বংসাত্মক 'আমি' নামক জগতে।
📄 নফস নিয়ন্ত্রণে নামাজের ভূমিকা
নফস যখন উদ্যত হয়ে যায়, যখন লাগামহীন হয়ে যায়, তখন নামাজের মধ্যে সবচে' বেশি গাফিলতি চলে আসে। নফস সর্বদাই আপনাকে আমাকে নামাজ থেকে বিমুখ রাখার চেষ্টা করে। ফজরে ঘুম থেকে উঠতে গেলেই নফস বলে, আরে ঘুমা ঘুমা; এই আরামের ঘুম রেখে উঠার কী দরকার。
যোহরের ওয়াক্ত আসলে নফস তখন বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততা দেখায়। বলে, আগে কাজ, পড়ে নামাজ; কাজ না করলে খাবি কী? তখন এমনি এমনি ওয়াক্ত চলে যায়; নামাজ আর পড়া হয় না। আসরের ওয়াক্ত আসলেও কাজের দোহাই দিয়ে নামাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। আর যুবক হলে খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাগরিবের ওয়াক্ত, এশার ওয়াক্ত এমনি এমনি কেটে যায়; নামাজ আর পড়া হয় না। এভাবে একদিন দুইদিন করে করে, মাস বছরের জন্য আপনাকে আমাকে বেনামাজি বানিয়ে দেয়। নফসের নামাজ পড়তে ভালো লাগে না, তার নামাজে তৃপ্তি আসে না। অন্যান্য কাজে সে সময় ব্যয় করে, কিন্তু নামাজের পড়ার সময় তার হয়না। নামাজ পড়াটা সে সময় ব্যয় মনে করে।(নাউজুবিল্লাহ)
আজ নফসের ধোঁকায় পড়ে আপনি আমি কত নামাজ কাজা করছি। নফসের কথা মতো নামাজ তরক করছি। আজ আমরা নফসের বিরুদ্ধে যেতে পারছি না। নফস সর্বদাই আমাদের উপর কর্তৃত্ব চালাচ্ছে; আর আমাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে জাহান্নামের দিকে...
নামাজ হলো সমস্ত ইবাদতের মূল। ঈমানের পরই নামাজের কথা বলা হয়েছে। এই নামাজ মুসলিম আর বিধর্মীদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। নামাজ একটি ফরজ বিধান। যা আমাদের উপর অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে। নামাজের ব্যাপারে কুরআনুল কারীমে প্রায় ৮০ জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। নামাজের ব্যাপারে খুবই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রাসুল সা. -ও বহু হাদিসে নামাজের ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন。
এ ব্যাপারে কিছু হাদিস জেনে নিই...
এক হাদীসে নবীজী সা. ইরশাদ করেন: “কোনো বান্দা আর কুফর-শিরকের মাঝে পার্থক্য বোঝা যাবে, তার নামায তরকের দ্বারা।”৩৬
অপর আরেকটি হাদীসে রয়েছে...
যে ব্যক্তি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যত্নের সাথে আদায় করবে, কেয়ামতের সময় এ নামায তার জন্য আলো হবে, তার ঈমান ও ইসলামের দলিল হবে এবং তার নাজাতের ওসিলা হবে। আর যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত নামায আদায় করবে না, কেয়ামতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে নামায তার জন্য আলো হবে না, দলিল হবে না এবং সে আযাব ও শাস্তি থেকে রেহাইও পাবে না।”৩৭
এই হাদীস আমাদের কী ম্যাসেজ দিলো? আমরা যদি নামাজে যত্নবান না হই, তবে হাশরের ময়দানে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে—এটা আমাদের চিন্তা করা উচিত। ভাবা দরকার。
নামাজের অনেক উপকারিতা রয়েছে। যেমন: নামাজের উপকারিতা সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে একটি রেওয়ায়েত রয়েছে...
“বলো তো, তোমাদের কারো ঘরের পাশেই যদি নহরনালা বহমান থাকে, আর সে তাতে দিনে পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসুল আল্লাহ! কোনো ময়লা থাকতে পারে না। নবীজী বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযেরও উদাহরণ তেমন। এর বরকতে বান্দার গোনাহখাতা মাফ হয়ে যায়।” ৩৮
হায় আফসোস, নামাজের ব্যাপারে আমাদেরকে কত তাগিদ দেয়া হয়েছে, আমাদের জন্য কত পুরস্কার রাখা হয়েছে, এতদ্বসত্ত্বেও আজ আমরা নামাজ পড়ি না। নফসের ধোকায় পড়ে নামাজ থেকে দূরে সরে আছি। আমরা সবাই জান্নাত কামনা করি, অথচ জান্নাতে যাওয়ার আমল করি না。
আজ নফসের ধোঁকায় পড়ে নামাজ চলাকালীন সময় মসজিদ'কে উপেক্ষা করে বাজারের দিকে যাচ্ছি। পারবো কি সেদিন, এভাবে জান্নাত'কে উপেক্ষা করে জাহান্নামের দিকে যেতে? না, পারবো না। তাহলে কেন আজ নফসের গোলামী করে নিজেকে এভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? মনে রাখবেন-নফসকে ঠিক না করা অবধি আমাদের নামাজে খুশু খুজু আসবে না। নামাজে মন বসবে না। নামাজে ভালো লাগা তৈরি হবে না। নফসে আম্মারা তো বিষধর কালসাপ! এটাকে সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ালে আপনি তো সর্বদাই ঝুঁকির মধ্যে থাকবেন。
মানুষ নফসের ধোঁকায় কত সহজেই ফেতনার জালে আটকে যাচ্ছে। কত সহজেই বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। কত সহজেই নফসের গোলামী করে শয়তানকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। এ-সব কিছু থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নামাজ খুবই কার্যকরী। নামাজ, সমস্ত আসক্তি'র এক অনন্য মেডিসিন。
নামাজ, সরাসরি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে যায়, তার উপর কখনো নফস কর্তৃত্ব করতে পারে না। যে ব্যক্তি নামাজের মাধ্যমে তার রব'কে পেয়ে যায়, সে কখনো নফসের গোলামী করতে পারে না; সে তখন শুধুমাত্র রবের দাসত্বেই নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে নেয়。
নামাজ সম্পর্কে, এক আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
ان الصلاة تنهى عن الفحشاء والمنكر
'নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা এবং পাপ থেকে বিরত রাখে'
এই আয়াতের দ্বারা বুঝা যায়—নামাজ যাবতীয় অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বিরত রাখে। পক্ষান্তরে, নফসের খোরাক হচ্ছে, যাবতীয় অশ্লীলতা এবং পাপাচার। এখন নামাজ যদি যাবতীয় অশ্লীলতা পাপাচার থেকে বিরত রাখতে পারে, তখন এমনি এমনি তার খোরাক বন্ধ হয়ে যাবে। আর তার খোরাক বন্ধ হয়ে গেলে, সে নিস্তেজ হতে বাধ্য! তাই আসুন নামাজে পাবন্দি করি। নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনি。
টিকাঃ
৩৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪
৩৭ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৬৫৭৬
৩৮ সহীহ মুসলিম, হাদিস-৬৬৭