📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ব্যাধি: ৩

📄 নফসের ব্যাধি: ৩


| গীবত |

এক

নফসের এক অন্যতম ব্যাধি হচ্ছে, গীবত। গীবত নফসে আম্মারাহ -এর খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু! নফস, অন্যের গীবত করতে খুবই পছন্দ করে। গীবত বলা হয়: কারো অনুপস্থিতিতে তাঁর সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে।

গীবত করার পিছনে কিছু কারন সমূহ:
মানব প্রবৃত্তির কাছে গীবত খুবই মজাদার! মজাদার হওয়ার কয়েকটি কারণ....
১। নিজের দোষের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা বিরক্তিকর। তাই, অন্যের অগোচরে তার দোষ চর্চা করে, নিজের দোষ মস্তিষ্ক থেকে যেন সরিয়ে নেয়া যায়।
২। নিজের সুনাম ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সহজ উপায়, গীবত। কেননা, সরাসরি কেউ তার নিজের প্রশংসা, নিজের বড়ত্ব, অন্যত্র প্রকাশ করতে পারে না।

আর তাছাড়া, নিজের বড়ত্ব নিজে বলে বেড়ানো অনেকটা দৃষ্টিকটু। তাই ঐ ব্যক্তি নিজের প্রশংসা নিজে না করে, অন্যেদের গীবতের মাধ্যমে সহজেই প্রমান করে—সকলেই দোষযুক্ত; আমি কত ভালো!

নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করতে, অন্যকে ছোট করতে— অনেকেই এই ধরনের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে একে অপরের গীবত করে থাকে। নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করতে অন্যকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। অথচ, এইক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কাকে পছন্দ করেন, কাকে ভালোবাসেন—আমরা কেউ বলতে পারি না। আবার, কার কোন একটি আমল আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করে, তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে, তাকে প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করে ফেলেছেন-সেটাও আমরা জানি না! তাহলে কীভাবে একজন ব্যক্তিকে আমরা ছোট বা হেয় করতে পারি? যাকে হেয় করতে যাচ্ছেন, সেই ব্যক্তি যদি রবের প্রিয় বান্দা হয়ে থাকে, তাহলে নিজের অবস্থা কী হবে-একটু চিন্তা করা প্রয়োজন। তাই, কাউকে ছোট করার মানসিকতাই রাখা ঠিক নয়। কেননা, এটা গীবতের উৎস।

দুই

হিংসা-বিদ্বেষের তাড়নায় অনেকেই অন্যের গীবতে জড়িয়ে পড়ে। কারো উন্নতি বা প্রশংসা দেখলেই তৃতীয় পক্ষের কাছে তার অগোচরে দোষ চর্চা করে। শুধু তাই নয়-ব্যক্তিজীবনের অনেক গোপনীয় কথাও অন্যত্র প্রকাশ করে দেয়, যেন ঐ ব্যক্তিকে ছোট করা যায়। অনেকেই আছে, যারা সব সময় বেহুদা কাজে সময় ব্যয় করে; সব সময় অবসর সময় কাটায়, তারাই অন্যের গীবতে সিদ্ধহস্ত। কারণ, তাদের কোনো কাজ থাকে না। সময় কাটানোর মাধ্যম হিসাবে তারা ঐ নোংরা পথকেই বেছে নেয়।

তাইতো বলা হয়-গীবত থেকে বেঁচে থাকতে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকো; আড্ডাবাজি পরিহার করো।

|| গীবতের প্রকারভেদ ||

১. দৈহিক কাঠামোর গীবত:
কারো কাছে কোনো ব্যক্তির দৈহিক ত্রুটি উল্লেখ করাও গীবত। যেমন: অমুক ব্যক্তি খুব মোটা, তার নাক বোঁচা, চোখ খুবই ছোট, চোখে দেখে না, মাথায় চুল নেই, পেটে ভূড়ি আছে, ইত্যাদি।
আজকাল এটাকে আমরা গীবত-ই মনে করিনা। একজন মানুষের অগোচরে, তার শারীরিক গঠন নিয়ে কত যে মন্তব্য করি- তার ইয়ত্তা নেই। অথচ, এটাই অনেক বড় ধরনের গীবত; কেননা, আপনি যদি তার উপস্থিতিতে, তার সামনা সামনি এই কথাগুলো বলেন তাহলে অবশ্যই সে কষ্ট পাবে। সেজন্যই তো আপনি তার অনুপস্থিতিতেই অন্যের কাছে তার শারীরিক গঠন নিয়ে আলাপ করলেন।

২. পোশাকের গীবত :
যেমন: অমুকের পোশাক কত সস্তা, অমুকের পোশাক খুবই বিশ্রী। দেখ, দেখ, কেমন একটা জামা পড়েছে। সব সময় ছেঁড়া জামা পড়ে, ইত্যাদি।

৩. বংশের গীবত :
তুচ্ছ করার জন্য কাউকে বলা, অমুকের বংশ নিচু, অমুকের পূর্ব পুরুষেরা ছিলো—কুলি-মজুর বা চোর-ডাকাত ইত্যাদি! অমুকের তো কোনো বংশই নেই, ইত্যাদি বলা।

৪. অভ্যাস বা আচার-আচরণের গীবত:
কোন ব্যক্তির আচার-ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করা। যেমন: সে মানুষকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে, ব্যবহার খারাপ, অভদ্র, পেটুক, অলস, ইত্যাদি。

৫. ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে গীবত :
কোনো ব্যক্তির অসহায় অবস্থা অভিনয় বা ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে দেখানো। যেমন: অন্ধ, বোবা, ইত্যাদি সেজে দেখানো। এমনকি সমালোচনার জন্য কারো চালচলন, কথা, পোশাক ইত্যাদি নকল করে অভিনয় করাটাও গীবত। সরাসরি নামোল্লেখ না করে এমন কিছু ইঙ্গিতবহ উপমা ব্যবহার করে দোষ বর্ণনা করা যে, লোকেরা উপমা শুনেই বুঝে ফেলে কার কথা বলা হচ্ছে।
অর্থাৎ গীবত করার সময় নাম না নিলেও এমন ভাবে কোন ব্যাক্তির দোষ- ত্রুটি বলা যে, মানুষের আর বুঝতে বাকি থাকে না—কার কথা বলা হচ্ছে। এটাও গীবতেরই অন্তর্ভুক্ত।

৬. কানের গীবত :
নিজে না-বললেও কারো গীবত শোনা এবং শোনার সময় কোনরুপ বাধা না-দেয়া—এটাই কানের গীবত।

৭. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে গীবত :
নিজের হাত, পা, চোখ ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য লোকের নিকট কোন ব্যক্তির দোষ বর্ণনা করা। যেমন: কোনো ব্যক্তি কোনো মজলিস থেকে উঠে চলে যাওয়ার পর তার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য চোখ অথবা হাতের ব্যবহার করা।

৮. লেখনীর মাধ্যমে গীবত :
কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য মেসেন্জারে তৃতীয় পক্ষের কাছে তার দোষ লিখে মেসেজিং করা। কারো ব্যক্তিগত কথপোকথন স্ক্রিনশট নিয়ে অন্যদের সাথে শেয়ার করা।
এ- গীবত আমাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু হলেই সঠিকটা যাচাই-বাছাই না-করেই মেসেঞ্জারে একে অন্যের দোষ বর্ণনা করি! ম্যাসেঞ্জারের ব্যক্তিগত কথাবার্তা স্ক্রিনশট দিয়ে অন্যদের সাথে শেয়ার করি—এগুলোও গীবত।

৯. দাওয়াতে লিপ্ত এক মুসলিম অন্য মুসলিমের গীবত। আজ মাঠে কাজ করা অধিকাংশ দাঈ -রা একজন আরেকজনের গীবতে ব্যস্ত। ফলে, ব্যক্তির ক্ষতি যতটা হচ্ছে, তারচে দাওয়াতের ক্ষেত্র বেশী নষ্ট হচ্ছে। সাধারন মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দলাদলি বেড়েই চলেছে। এই ফাঁকে ইসলামের শত্রুরা দীনের ক্ষতি করার আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।

|| গীবতের পরিণতি ||

গীবতের পরিণতি প্রসঙ্গে হাদীসে কুদসীতে এসেছে: নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন বান্দাকে তার আমলনামা খোলা অবস্থায় দেয়া হবে। সে তাতে এমন কতগুলো নেকী দেখবে, যা সে আমল করেনি। সে বলবে, 'হে প্রভু! আমি এই নেকীগুলো অর্জন করিনি।' তিনি বলবেন, 'লোকেরা তোমার নিন্দা করেছিল, তারই বদলে আমি এগুলো লিপিবদ্ধ করেছি।' অপর এক বান্দার সামনে কিয়ামতের দিন তার আমলনামা খুলে দেয়া হবে। সে বলবে,' হে প্রভু! আমি কি অমুক দিন অমুক পুণ্য করিনি? তখন তাকে বলা হবে, 'তুমি লোকদের নিন্দা করতে। ফলে সে-সব পুণ্য তোমার আমলনামা হতে মুছে ফেলা হয়েছে।'

গীবত থেকে বাঁচার জন্য আজ শুধু এতটুকু জেনে নিই—গীবত ও পরনিন্দার শাস্তি কত কঠিন...

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: মে'রাজের সময় আমি কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, যাদের ছিল তামার নখ। সেই নখ দিয়ে তারা নিজেদের চেহারা এবং বুক ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি বললাম, জিবরীল! এরা কারা? উত্তরে তিনি বললেন, যারা (দুনিয়াতে) মানুষের গোশত খেত (গীবত করত) এবং মানুষের সম্মান হানি করত।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে এ স্বভাবের নিন্দা করে বলেন...
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ.
অর্থ: দুর্ভোগ প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির, যে পেছনে ও সামনে মানুষের নিন্দা করে।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন....
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

কিছু কথন

> গীবত করে কোনো ফায়দা নেই; ক্ষতি ছাড়া। ইসলামের অন্যতম স্কলার, হাসান আল-বাসরী রহি. যখন শুনতেন কেউ তার গীবত করেছে, তখন তিনি তার বাসায় মিষ্টি খেজুর পাঠাতেন। অতঃপর বলতেন, 'আপনি আপনার নেক আমল গুলো আমাকে হাদিয়া দিয়েছেন, এর বিনিময় দেয়া আমার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়, তাও আমি আপনাকে সামান্য হাদিয়া দিলাম!'

> গীবত করে কখনো খালি কলসি ভরাট করা যায় না; উল্টো, ভরা কলসি গীবতের দ্বারা খালি হয়ে যায়। তাই, নিজের কলসি'র পানি দিয়ে অন্যের কলসি ভরাট করো না। অন্যথায়, দুনিয়ায় এতো পানি বহন করেও, ময়দানে মাহসারে খালি কলসি নিয়ে দৌড়াতে হবে।

> ইবনে মুবারক রাযি. বলেন-আমি যদি গীবত করতাম, তবে অবশ্যই আমি আমার মাতা-পিতার গীবত করতাম। কেননা, তারাই আমার নেকী পাওয়ার অধিক হকদার!

> সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ রহি. বলেন: গীবত ঋণের চেয়েও মারাত্মক। ঋণ পরিশোধ করা যায়; কিন্তু গীবত পরিশোধ করা যায় না।

> আজ হয়তো বিভিন্ন মজলিসে বসে কারো মুখ থেকে তার অনুপস্থিত কারো গীবত শুনছি, আর বেশ মজা নিচ্ছি। আরে, যে আপনার সম্মুখে অন্যের সমালোচনা করে, সে তো আপনার সমালোচনা অন্য কারো কাছেও করে। কেননা, গীবতকারী কখনো একের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মজলিস পেলেই সেখানে গীবতের আসর বানায়। হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে গীবত করে যায়।

> গীবত থেকে বেঁচে থাকতে, কোন মজলিসে অন্য কারো সম্পর্কে আলাপ না করে, নিজের সম্পর্কে বা কোনো কল্যানমূলক কাজের আলাপ করুন। কুরআন হাদীসের শিক্ষা নিয়ে আলাপ করার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকুন।

> যত কম কথা বলা হবে, ততই গীবত করা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তাছাড়া, চুপ থাকাটাও এক ধরনের ইবাদত। এজন্যই বলা হয়-কম ঘুমাও, কম খাও, কম কথা বলো। বেশি কথা বলা গীবতের দরজা তো খুলেই, পাশাপাশি নিজের বিপদও টেনে আনে।

> গীবতের পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখুন, তাহলে আখেরাতের ভয়াবহতা ও দুনিয়ায় লাঞ্চিত হওয়ার ভয়ে নিজেকে গীবত থেকে সংযত রাখা যাবে।

> সবসময় নিজের দোষ-ত্রুটি নিয়ে ভাবুন। কেননা, নিজের ত্রুটির কথা স্মরণ থাকলে, অন্যের চেয়ে নিজেকেই ছোট মনে হবে এবং অন্যের সমালোচনা করার কথা মাথায়ও আসবে না।

> নবী রাসূলদের জীবনী পড়ুন। এতে দুনিয়ার জীবনের লোভ-লালসা, হিংসা, রাগ থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার আগ্রহ আসবে ইন শা আল্লাহ।

> আখেরাতের জীবন ও দুনিয়ার জীবন নিয়ে তুলনামূলক জ্ঞান অর্জন করুন। এর ফলে আখেরাতের জীবনে প্রাধান্য আসবে। সেই সুবাদে গীবত নামক ব্যাধি থেকেও সতর্ক থাকা যাবে।

> বেশি বেশি রবের কাছেই দু'আ করুন, যেনো আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আমাকে এই ব্যাধি থেকে নিরাপদ রাখেন!

টিকাঃ
২২ সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৭৮
২৩ সূরা হুমাযাহ, : ১
২৪ সূরা হুজরাত, আয়াত - ১২

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ব্যাধি: ৪

📄 নফসের ব্যাধি: ৪


| লোভ |

নফসের আরেকটি ব্যাধি হচ্ছে লোভ। লোভ মানুষকে একদম অধঃপতনের অতল গহবরে নিমজ্জিত করে। একজন লোভী মানুষ কখনো সুখী হতে পারে না। সুখের সমস্ত দ্বার, লোভ নামক ব্যাধি পরিপূর্ণভাবে রুদ্ধ করে দেয়; তার জীবন থেকে সুখ কেড়ে নেয়। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তাআলা যে-সকল নেয়ামত তাকে দান করেছেন, তার শুকরিয়া তো কখনো আদায় করেই না; উল্টো আল্লাহ তাআলা তাকে যা দান করেছেন, তার চে বেশী কিছু আকাঙ্ক্ষা করে। এমনকি, যদি সেটা পূর্ণ হয়ে যায়, তখন সে আবার নতুন করে ভিন্ন কিছু চাইতে থাকে।

উদাহরণ স্বরূপ: একজন ব্যক্তি পায়ে হেঁটে দৈনিক তার কর্মস্থলে যায়। যাওয়ার পথে তার দৃষ্টিগোচর হয়—অনেকেই সাইকেল ব্যবহার করে তার কর্মস্থলে যাচ্ছে। যখন সে এটা দেখে, তখন মনে মনে সাইকেল আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। বলতে থাকে—'অবশ্যই আমার একটা সাইকেল চাই। এটা পাওয়ার জন্য যা কিছু করতে হয়, আমি তাই করবো।' এখান থেকেই তার লোভের যাত্রা শুরু। সে পায়ে হেঁটে তার কর্মস্থলে যেতে পারে এটাই তো অনেক কিছু। এরকম অনেক মানুষ রয়েছে, যারা হাঁটতে পারে না; যাদের পা নেই। এদিকে, আল্লাহ তা'আলা তাকে পা দিয়েছেন, সেই পায়ে হেঁটে হেঁটে তার গন্তব্যস্থলে যেতে পারছে। এতদ্বসত্ত্বেও, তার রবের শুকরিয়া জ্ঞাপন না করে, আরো বড় কিছু আকাঙ্ক্ষা করে বসলো। সাইকেল কেনার জন্য যা যা করা লাগে, সে তাই তাই করল। যখন সে সাইকেল কিনলো, তখন সে বাইক দেখে সেটার দিকে মনোনিবেশ করল। এবার সে মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো, এবার সাইকেল রেখে বাইকে করে কর্মস্থলে যাবে।'

অতঃপর সে বাইকও ক্রয় করে। এভাবে দিন দিন তার লোভের মাত্রা বাড়তেই থাকে। একটার পর একটা চাইতেই থাকে। যা পেয়েছে তাতে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। যা আছে তার কখনো শুকরিয়া আদায় করে না। লোভ করতে করতে এক পর্যায়ে তার আকাঙ্ক্ষা তার সামর্থের বাইরে চলে যায়। তার আকাঙ্ক্ষা আকাশচুম্বী; কিন্তু তাঁর সামর্থ্য শেকলবন্দি। এমতাবস্থায় যখন সে তার সামর্থ্য দ্বারা তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে না, তখন সে অসামাজিক কাজে আত্মনিয়োগ করে। অর্থের জন্য, হারাম পথ বেছে নেয়। যা তার দুনিয়া আখেরাত উভয়টাই ধ্বংস করে।

এভাবেই চলতে থাকে জীবন; চলতে থাকে তার লোভের চক্র। লোভ যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন এই লোভের চক্র থেকে বের হয়ে আসা, তার পক্ষে দুষ্কর হয়ে যায়। ফলে, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থেকেও সে আকাঙ্ক্ষা করে-আমার মৃত্যুটা যেন জাঁকজমকপূর্ণ হয়, মৃত্যুর সংবাদে যেন মানুষের ঢল নেমে আসে; জানাযা যেন লাখো মানুষের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়।

লোভী ব্যক্তি ধন-সম্পদ অর্জন করে ক্রয় করে: নফসের কষ্ট, ব্যস্ত অন্তর, পরকালের শক্ত হিসাব। আর একজন শুকর গুজারি দারিদ্র ব্যক্তি ক্রয় করে: নফসের শান্তি, মুক্ত স্বাধীন অন্তর, পরকালের সহজ হিসাব।

অসংখ্য রেওয়ায়েত লোভের নিন্দায় বর্ণিত হয়েছে। যার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হল।

আনাস ইবনু মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যদি বনি আদমের স্বর্ণ ভরা একটা উপত্যকা থাকে, তথাপি সে তার জন্য দু'টি উপত্যকা হওয়ার কামনা করবে। তার মুখ মাটি ব্যতীত অন্য কিছুতেই ভরবে না। তবে যে ব্যক্তি তাওবাহ করবে, আল্লাহ্ তার তাওবাহ কবুল করবেন।

ইমাম সাদিক রহি. বলেছেন : 'লোভী দু'টি উৎকৃষ্ট গুণ হতে বঞ্চিত, ফলশ্রুতিতে সে দু'টি দোষের অধিকারী; সে পরিতৃপ্ত হওয়া থেকে বঞ্চিত ফলে প্রশান্তিকে হাতছাড়া করেছে, [আর] সন্তুষ্টি হতে বঞ্চিত ফলে বিশ্বাসকে খুইয়েছে'।

ইমাম আলী রহি. বলেছেন: 'সেই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা ধনি যে লোভের বন্দি নয়'।

ইমাম সাদিক রহি. বলেছেন: আমিরুল মু'মিনীন বলতেন যে, হে আদমের সন্তানেরা! যদি তুমি দুনিয়া হতে পরিমাণ মতো চাও, তাহলে সেটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু যদি পরিমাণের চেয়ে বেশী চাও, সমস্ত দুনিয়াও তোমার জন্য যথেষ্ঠ নয়'।

প্রয়োজনের বেশি ধারণ ক্ষমতার বাইরে মানুষ খেতে পারে না, পড়তে পারে না, করতে পারে না-এসব জানা সত্ত্বেও মানুষ অতিরিক্ত পাওয়ার নেশায় কত রকম ধান্দার পেছনে যে জীবন নষ্ট করে দেয়, তা আমাদের চারপাশের মানুষজনকে দেখলেই বোঝা যায়।

লোভ-লালসা হচ্ছে মানুষের হীনতম বৈশিষ্ট্যের একটি। ভাই-বোনের মধ্যে ধন-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ, সম্পর্ক নষ্ট। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদ এবং পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে মামলা-মোকাদ্দমা ইত্যাদি, এ-সবকিছু লোভের-ই ফসল।

কিছু পাপ আছে, যা শুধুই মৌলিক পাপ, আর লোভ, হিংসা, অহংকার এমন ধরনের পাপ যা আরো বহু পাপের জন্ম দেয়।

টিকাঃ
২৫ * সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬৪৩৯
২৬ 'আল কাফী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩১৬, হাদীস নং ৭

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ব্যাধি: ৫

📄 নফসের ব্যাধি: ৫


| হিংসা |

নফসের রোগসমূহের মাঝে অন্যতম একটি রোগ হচ্ছে হিংসা। হিংসা, নফসের এক অনন্য ব্যাধি। হিংসুক, হিংসার কারণে ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকে। কারো কোনো গুণ তার সহ্য হয় না। এজন্য, কারো ভালো কিছু দেখলেই তার শত্রুতে পরিণত হয়। শত্রুতা করাই তার কাজ। হিংসা এমন এক রোগ, যা সুস্থ মানুষের মন বিগড়ে দিতে দেরি করে না। গীবতের প্রভাবে তার মধ্যে বিবেক বলতে কিছুই থাকেনা। হিংসা আজ মহামারি আকার ধারণ করেছে। সমাজে কেউ কারো উন্নতি সহ্য করতে পারে না। অন্যের উন্নতি দেখে হিংসার আগুনে জ্বলে ছারখার হয়ে যায় তার বিক্ষিপ্ত অন্তর।

এই হিংসা'র গল্পটা মানব সৃষ্টির শুরু লগ্ন থেকেই। যেমন: আদম আ.-কে সৃষ্টি করার পর ইবলিস যখন আদম আ.-এর গুণ দেখতে পেল, তখনই সে তার শত্রু হয়ে গেল। হিংসা থেকেই সে বলল, আনা খাইরুম মিনহু। আমি তার চেয়ে উত্তম। আবার ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরাও হিংসা করেছিল, তার উপর। ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা যখন দেখল, ইউসুফ তাদের পিতার কাছে প্রিয় সন্তান, তখনই তারা হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে। অবশেষে তারা হিংসার আগুনে জ্বলে ইউসুফ আ.-কে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। যেন, তাদের পিতা শুধুমাত্র তাদের দিকেই দৃষ্টি নিবিষ্ট করেন।

হিংসা প্রত্যেকের ভেতরেই রয়েছে। হিংসা ছাড়া কোনো মানুষ নেই। কারো ভিতরে কম, কারো ভিতরে বেশি। তবে, প্রকৃত মুসলিম, প্রকৃত দীনদার, কখনো হিংসাকে প্রশ্রয় দেয় না। তাই আমাদের উচিত নিজের হিংসার সত্তাকে সংযত রাখা। আর, অন্য কেউ যদি আপনার আমার ওপর হিংসা করে। আপনার উন্নতিতে আপনার সফলতায় তার জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে যায়, তখন ঘাবড়ে যাবেন না। আপনার ভেতর যখন গুণ থাকবে, তখন লোকেরা আপনাকে হিংসা করবে—এটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তার কিছু নেই; বরং কেউ হিংসা করলে আপনার খুশি হওয়া উচিত। কেননা, যে কারণে আপনি হিংসুকের হিংসার পাত্র হয়েছেন, সেই কাজে আপনি পারদর্শী। আপনার মধ্যে সেই যোগ্যতা, সেই গুন আছে বলেই সে আপনাকে হিংসা করেছে। মোটকথা, হিংসুকের হিংসা আপনার দক্ষতার পরিচায়ক। মনে রাখবেন—যার মধ্যে যে গুণের শূন্যতা, সে-ই উক্ত গুণ সম্পন্ন ব্যক্তিকে সহ্য করতে পারে না। যার মধ্যে যে গুণের অভাব, সে গুনের অভাবেই সে হিংসার আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। মনে রাখবেন—কোনো এক প্রহর হিংসুকের হিংসা থেকে মুক্ত থাকা আপনার জন্য দুঃসংবাদ। কেননা, নিকৃষ্ট মানুষকে কেউ হিংসা করে না; হিংসা তো করে সর্ব গুণে গুণান্বিত কোনো এক সফল ব্যক্তির।

এজন্য সবার জন্য উচিত, হিংসা না করে নিজেকে এমন ভাবে গড়ে তোলা, যেন অন্যরা সবাই আপনাকে হিংসা করতে পারে। হিংসুটে না হয়ে হিংসার পাত্র হওয়ার চেষ্টা করুন। নফস আপনাকে হিংসুটে বানাতে চায়; হিংসার পাত্র নয়। এজন্য, নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে হিংসুটে না হয়ে, হিংসার পাত্র হতে হবে।

এবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখুন—আমাদের মধ্যে এই শিক্ষাগুলো কতটুকু আছে? অন্যের দিকে না তাকিয়ে প্রত্যেকে যার যার অবস্থা যাচাই করুন। আমরা আজকাল সবাই কি একটু বেশিই হিংসুটে হয়ে যাচ্ছি না? এমন হিংসুটে ভাব কেন? অন্যের ভালোটা সইতে এত কষ্ট হয় কেন? তার কারণ হচ্ছে—আমরা আজ নফসের কাছে পরাজিত। আজ নফসের দাসত্বে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছি। সাথে সাথে ঈমানের মূল মর্ম আমরা হারিয়ে ফেলেছি। মগজহীন খোসা নিয়ে বেঁচে আছি আমরা। অথচ, ঈমান নিয়ে কবরে যেতে হলে আমাদের স্বভাব পাল্টাতে হবে। বদলাতে হবে নিজেদেরকে। গুণীর গুণের স্বীকৃতি দেয়া শিখতে হবে। কারো ভালো কিছু দেখে কষ্ট হলে কষ্ট ভেতরেই রাখতে হবে। বাইরে যেন প্রকাশ না পায়। ভেতরে ভেতরে কিছুক্ষণ জ্বলবো। একসময় ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

মনে রাখবেন—লোভ, হিংসা, অহংকার ধ্বংসের মূল। হিংসা, সর্বপ্রকার উন্নতির অন্তরায়। যে অন্যকে হিংসা করে, সে মনের শান্তি পায় না। হিংসা আত্মার রোগ। বাঙালির দুরারোগ্য অসুখের নাম হলো হিংসা। হিংসা কারো ক্ষতি করতে পারে না; নিজের ছাড়া।

হিংসা অন্যের দিকে লক্ষ্য করে এবং আঘাত করে। এতে করে নিজের মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায়। আপনি একই সাথে হিংসুক ও সুখী হতে পারবেন না। কেননা, হিংসা সুখী জীবনের অন্তরায়। হিংসা ও প্রশান্তি কখনই একসাথে থাকতে পারে শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি। কেননা, হিংসা প্রজ্জ্বলিত আগুনের ন্যায়—যা সর্বদাই তাকে পোড়াতে থাকে।

তাই, আমাদের উচিত সর্বদা হিংসামুক্ত জীবন লালন করা। হিংসাকে দূর করে আত্মিক উন্নয়নের দরজা খুলে দেয়া।

টিকাঃ
* বানু ইসরাইল, আয়াত: ৬২.

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ব্যাধি: ৬

📄 নফসের ব্যাধি: ৬


| অলসতা |

এক

নফসের আরেকটি ব্যাধি হচ্ছে, অলসতা। নফস হচ্ছে আরাম প্রিয়সী। নফস সব সময় আরাম চায়। এই নফস অলসতাকে কাজে লাগিয়ে আজ আপনাকে আমাকে সর্বপ্রকার ইবাদত থেকে দূরে রাখছে। অলস নফস ফজরের ওয়াক্তে ঘুমিয়ে আরাম পেতে চায়। রমজান মাসে গরম দূর করতে কোল্ড-ড্রিংকস্ খেয়ে আরাম পেতে চায়। এই অলসতা ইবাদত-বন্দেগির প্রতিবন্ধকতা। যার মধ্যে যত বেশি আলসেমি, তার ইবাদতে ততবেশি ঘাটতি। অলসতার দরুণ, আজ অনেকেই ফজরের নামাজ কাজা করে। অলসতায় বশীভূত হয়ে জামাত তরক করে। অলস ব্যক্তি কখনো সফলতার মুখ দেখতে পায় না। অলস ব্যক্তি ইহকালীন-পরকালীন উভয় জগতেই ব্যর্থ। না দুনিয়াতে কিছু করতে পারে; আর না আখেরাতের জন্য কিছু করতে পারে!

একজন অলস ব্যক্তি আজ তার অলসতাকে প্রাধান্য দিয়ে ইবাদত-বন্দেগী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সে কি জানে? সে শুধু ইবাদত থেকে দূরে যাচ্ছে না; বরং জান্নাতের চির সুখ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? সে কি জানে? অলসতাকে প্রশ্রয় দিয়ে, সাময়িক সুখের জন্য চিরস্থায়ী শাস্তির কুটির নির্মাণ করছে?

একজন অলস ব্যক্তি রুজি-রোজগার থেকে হাত গুটিয়ে নেয়। অথচ, হালাল পন্থায় উপার্জন করাও তার ওপর আবশ্যক। কেননা, তার ওপর তার শরীরের একটা হক রয়েছে; তার ওপর তার পরিবারের হক রয়েছে। যদি অলসতায় বশীভূত হয়ে রুজি-রোজগার হতে হাত গুটিয়ে নেয়, তবে তাদের হক আদায় করবে কীভাবে? তাদের হক আদায় করতে তো পারবেই না; উল্টো পেটের ক্ষুধা মেটাতে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিড়বে। নিজেও ছোট হবে, পরিবারকেও ছোট করবে। নিজেও শান্তিতে থাকবে না, পরিবারকেও শান্তিতে রাখতে দিবে না।

অলসতার কারণ:
একজন মানুষ কেন অলস হয়? কেন তাকে অলসতায় গ্রাস করে নেয়? একজন মানুষ অলস হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে...

১. অলস হওয়ার পেছনে দায়ী হচ্ছে, আমাদের বাবা-মা কিংবা পরিবার। ছোটবেলা থেকেই এমন আদুরে পরিবেশে বাচ্চাদের লালন-পালন করা হয়, যার কারণে পরবর্তীতে সে আর আদুরে পরিবেশ থেকে বের হতে চায় না। ছেলে যদি হাটতে চায়, মা বলে, "বাবা, মাটিতে হেঁটো না, পিপড়া কামড়াবে; ওভাবে দৌড়িও না, ব্যাথা পাবে।" বাচ্চা যখন এমনি এমনি আবেগপ্রবণ হয়ে নামাজ পড়তে চায়, তখন বাবা বলে, "বাবা, তুমি এখনো ছোট। ঘুম থেকে ওঠার দরকার নেই; বরং ঘুমিয়েই থাকো। কী দরকার ঘুম থেকে ওঠার? কী দরকার এই ছোট বয়সে এতো কষ্ট করার?" মা-বাবার ভুল প্যারেন্টিং -এর এমন বহু উদাহরণ রয়েছে।

২. অলসতার আরেকটি কারণ হচ্ছে, সিদ্ধান্তে অটল না থাকা। আমরা হয়তো মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই, আগামীকাল থেকে আর দেরিতে ঘুম থেকে উঠবো না। এখন থেকে প্রতিদিন ফজরের আযানের সাথে সাথে ঘুম থেকে উঠবো। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই ঠিকই, কিন্তু সেটা আর বাস্তবায়ন করি না। অলসতাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিদিন নাক ডেকে ঘুমিয়ে থাকি। ফলে, অলসতা ধীরে ধীরে আমাদের ওপর আরো বেশি ভর করে নেয়।

৩. অলসতার আরেকটি কারণ হচ্ছে অজ্ঞতা। অজ্ঞতার জন্যও অবশ্য অলসতাই দায়ী। মানুষ যখন কোন কর্মের ফলাফল সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তখন সে ওই কাজ করার জন্য ভালোভাবে প্রচেষ্টা চালাতে চায় না। যেমন: ভিক্ষুক জানে না-পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জনে কত শান্তি নিহিত রয়েছে। এখানে অবশ্য, সে ভিক্ষুক হওয়ার জন্য তার অজ্ঞতা এবং অলসতা দু'টোই দায়ী।

দুই

প্রতিদিন একই কাজ করতে আমরা অভ্যস্ত। সেই সাতসকালে কর্মস্থলে যাওয়া আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আরো কত কিছু করার ইচ্ছে, কিন্তু অলসতার কারণে তা আর করা হয় না। ইবাদত-বন্দেগিতেও অলসতা ভর করে। মসজিদে যাব যাব বলে আর যাওয়া হয় না। ফরজ নামাজের পর নফল পড়বো বলে মনস্থির করলেও, ফরজ শেষ করার পর নফলের জন্য দাঁড়াতে আর মন চায় না। তাসবিহ-তাহলিল পড়বো পড়বো বলে আর পড়া হয়না। মোটকথা, অলসতার দরুন কোনো কিছুই হয়ে উঠে না- সম্ভাব্য কাজটুকু অসম্পাদিত রয়ে যায়; সম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা কাজটুকুও অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। তাই তো বলা হয়, অলসতা সফলতার প্রতিবন্ধকতা। তাই, যাবতীয় কাজ সম্পাদন করতে, ইবাদত-বন্দেগীতে মন বসাতে অবশ্যই আমাদেরকে অলসতাকে এড়িয়ে যেতে হবে। অলসতা নামক হিংস্র পশুকে ভিতর থেকে বের করতে হবে। কিন্তু, অলসতাকে কীভাবে দূর করবো, কীভাবে অলসতা মুক্ত জীবন যাপন করব-সেটা ভাবতে ভাবতে অনেক সময় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাই। আসুন, এবার জেনে নিই, কীভাবে অলসতাকে দূর করবেন....

১. শুরুটা সহজ কিছু দিয়ে হোক:
এক বছরে ১০০ বই পড়ার ইচ্ছে। এদিকে ১০০ বইয়ের নাম শুনেই ভয়ে কুপোকাত। ফলে শুরুটা আর হচ্ছে না। কাঠিন্যতার ভয় দেখিয়ে অলসতা সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে। শুরুতেই কঠিন কিছুকে অভ্যাস হিসেবে তৈরি করা বেশ কঠিন। তাই, শুরু করুন সহজ কিছু দিয়ে। নিজের ওপর চাপ না হয় এমন কিছু দিয়ে। যেমন: প্রথম মাসে একটি বই, দ্বিতীয় মাসে দু'টি বই, তৃতীয় মাসে ৫ টি বই—এভাবে ক্রমাগতভাবে মাস অনুযায়ী বাড়াতে থাকবেন। তাহলে এটা খুব সহজেই আপনার মস্তিষ্ক কেচ করবে। অন্যথায়, চাপ মনে করে অলসতা বাসা বাঁধবে।

নেক কাজ, ইবাদত-বন্দেগীর ক্ষেত্রেও এমনটাই করুন। নফল নামাজের ক্ষেত্রে প্রথমদিন দু'রাকাত দ্বিতীয় দিন চার রাকাত তৃতীয় দিন ছ' রাকাত— এভাবে শুরুটা সহজভাবে করে ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকুন। কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রথম দিন দুই পৃষ্ঠা, দ্বিতীয় দিন চার পৃষ্ঠা, তৃতীয় দিন ছয় পৃষ্ঠা—এভাবে ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকুন। প্রথম দিনে যদি ১০০ রাকাত নফল নামাজ পড়ার এবং পাঁচ পারা কুর'আন তেলাওয়াত করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে সেটা শুরু করতে অলসতার বাধা আসবে। তাই, শুরুটা স্বাভাবিকভাবে সহজ ভাবে করুন।

২. কাজের গুরুত্ব, প্রয়োজন ও ফলাফল কী হবে, সেটা মাথায় রাখা:
ব্যক্তিজীবন ও কর্মক্ষেত্রে কোনো কাজের গুরুত্ব কেমন তা বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। কাজের প্রকৃতিকে যদি গুরুত্ব ও প্রয়োজন বুঝে কাজ ভাগ করতে পারেন, তাহলে সহজেই অলসতা কাটানো যায়। যেমন: "আপনার কাছে এমন একটি কাজ আসলো, যা করলে আপনি কিছু অর্থ পাবেন। আর ওই অর্থের দিকে আপনার পুরো পরিবার তাকিয়ে আছে।" এটা ভাবলে ওই কাজের গুরুত্ব আপনার বুঝে আসবে এবং এর ফলাফল কী, সেটাও বুঝে আসবে। ঠিক ইবাদতের ক্ষেত্রেও ইবাদতের গুরুত্ব এবং তা আদায় করার পর কী ফলাফল আসবে—তা নিয়ে ভাবুন। যখন শরীয়তের বিধি-বিধান এর গুরুত্ব সম্পর্কে জানবেন তা সম্পাদনে আগ্রহী হবেন। অতঃপর যখন এর ফলাফল তথা জান্নাত লাভের কথা ভাববেন, তখন অলসতার দরজা এমনিতেই তালাবদ্ধ হয়ে যাবে।

৩. নিয়মে অভ্যস্ত হোন:
কাল সকাল থেকে নিজেকে বদলে ফেলবো। কাল থেকে আর নামাজ ত্যাগ করব না-এমন করে কতই-না অনুপ্রেরণা দিই, কতই-না প্রতিজ্ঞা করি। কিন্তু সময় আসলে সেটা আর বাস্তবায়ন করি না। নিজেকে বদলে ফেলব বলে সিদ্ধান্ত নিই, কিন্তু বদলানোর জন্য চেষ্টা করি না। নিয়মিত নামাজ পড়বো, নামাজ ছাড়বো না বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই-কিন্তু নামাজের সময় আসলে সেটা আর মাথায় থাকে না। অনেক সময় শুরুটা করি ঠিক, কিন্তু সেটা আর নিয়ম তান্ত্রিক হয় না। একদিন দু'দিন, পরে সেই আগের মতই।

৪. সময়ের কাজ সময়ে শেষ করুন:
আজকে সারাদিন কী কী কাজ করবেন, কী কী আমল করবেন-তা ছোট একটি কাগজে লিখে নিন। অতঃপর, নোট করা সেই কাজগুলো সে-দিনেই সম্পন্ন করুন। আগামীকালের জন্য ফেলে রাখবেন না। আগামীকালের জন্য ফেলে রাখলেই তা জমা হয়ে যায়। আর জমা কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে, অলসতার বাধা আসে।

৫. বই পড়ুন:
বই পড়ার মতন আনন্দ আর কোনো কাজে নেই। ইসলামিক আত্মউন্নয়নমূলক, আত্মশুদ্ধি মূলক বই পড়ুন। বই পড়ার মাধ্যমে প্রকৃত অর্থেই আপনার আত্ম-উন্নতি ঘটবে। তাই ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অলসতা দূর করতে বই পড়ার অভ্যাস অত্যন্ত সহায়ক।

৬. কল্পনা করুন:
সকালে উঠে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন, আপনি ভবিষ্যতে ঠিক কীভাবে নিজেকে দেখতে চান। আপনার সাফল্যের চিত্রটি ঠিক কীরকম হবে? সেই বিষয়ে কল্পনা করুন।

কিছু কথন

> অলস ব্যক্তি কিছু না-করার মধ্যে পরিতৃপ্ত হলেও, কিছু না- পাওয়ার কারণে ঠিকই ছটফট করে। এমন নয়—সে কিছু করে না বলে তার কোনো চাহিদা নেই। বাস্তবে, সে চায় ঠিকই, কিন্তু আমল করে না।

> অলস ব্যক্তির কাছে অলসতা কত মধুর, কিন্তু বাস্তবে অলসতা হলো ক্ষুধার্ত সাপের মতো। যা তার টুকটাক চাওয়া-পাওয়া গুলো অলসতা নামক ক্ষুধার্ত সাপ খেয়ে ফেলে।

> অলস ব্যক্তির জন্য অনুপ্রেরণা হলো এক অতিথি, যে স্বেচ্ছায় তাকে পরিদর্শন করে না। কেননা, অলসকে নিজে থেকে যতই বুঝাতে আসবেন, কোনো লাভ হবে না। আপনি বোঝাবেন, সে বলবে: আমি বুঝতে চাই না।

টিকাঃ
২৯ * রিয়াদুস সলিহীন - ৬৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px