📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ব্যাধি: ১

📄 নফসের ব্যাধি: ১


অহংকার

অহংকার পতনের মূল—এ-কথা প্রচলিত। নৈতিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে এটি যেমন সত্য, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এ-কথা প্রমাণিত যে, অহংকার ও দাম্ভিকতা পতন ডেকে আনে।

আত্ম-অহমিকা বলা হয়—নিজের গুনে নিজেই মুগ্ধ হয়ে নিজেকে বড় মনে করা। আর অহংকার বলা হয়—নিজের গুনে নিজেই মুগ্ধ হয়ে নিজেকে বড় ভাবার পাশাপাশি, অন্যকে তুচ্ছ মনে করা। শরিয়তের দৃষ্টিতে উভয়টিই হারাম।

আত্ম-অহমিকা, দাম্ভিকতা ও অহংকার নফসের এক নিকৃষ্ট ব্যাধি। নফসের এই ব্যাধি দূর করা আমাদের উপর আবশ্যক। কেননা, অহংকারী মানুষকে আল্লাহ খুব অপছন্দ করেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন..

‘নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) অহংকারীদের ভালোবাসেন না।’ ১৫

মহান আল্লাহ'র সঙ্গে কৃত সর্বপ্রথম গোনাহ হলো অহংকার। আল্লাহ তাআলা বলেন...

‘যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল। শুধু সে অহংকারবশত সিজদা করতে অস্বীকার করল। আর সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো।’ ১৬

অহংকার, ইবলিসকে শয়তানে পরিণত করেছে। সে অহংকার করেছিল নফসের প্ররোচনায়। লাগামহীন নফস যখন ইবলিসের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তখন সে অহংকারবশত তার স্বীয় রবের হুকুম অমান্য করে। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

অহংকার শয়তানি কাজ। আর অহংকার মুক্ত থাকা, আল্লাহ ওয়ালাদের কাজ। অহংকার একজন মানুষের পরিচয় প্রকাশ করে-সে কি আল্লাহ ওয়ালা, নাকি শয়তান ওয়ালা। এতদসত্ত্বেও আজ আমরা অহংকার নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত।

অহংকারীদের জায়গা হচ্ছে, জাহান্নাম। যেটা রাসূল সা. সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন...

হারিস ইবনু ওয়াহাব খুযাঈ রাযি. থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোকদের পরিচয় বলবো না? তারা দুর্বল এবং অসহায়; কিন্তু তারা যদি কোনো ব্যাপারে আল্লাহ'র নামে কসম করে বসেন, তাহলে তা পূরণ করে দেন। আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামী লোকদের পরিচয় বলবো না? তারা রূঢ় স্বভাব, অধিক মোটা এবং অহংকারী তারাই জাহান্নামী।"

অপর একটি হাদীসে এসেছে...
অহংকারী মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, 'যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। একজন সাহাবি বলেন, মানুষ তো চায় যে তার কাপড় সুন্দর হোক এবং তার জুতা সুন্দর হোক (এটা কি অহংকার বলে গণ্য হবে?) রাসুল (সা.) বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর। অতএব তিনি সুন্দর পছন্দ করেন। তবে অহংকার হচ্ছে সত্য প্রত্যাখ্যান ও মানব অবমূল্যায়ন।১৮

একবার বনি ইসরাঈলের এক ব্যক্তি গর্ব করলে, আল্লাহ তাআলা তাকে কঠিন শাস্তি দেন। রাসুল (সা.)-এর যুগেও এমন একটি ঘটনা ঘটে যায়।

আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, 'একদা এক ব্যক্তি এক জোড়া জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে (রাস্তা দিয়ে) চলছিল। তা নিয়ে তার খুব গর্ব বোধ হচ্ছিল। তার জমকালো লম্বা চুলগুলো সে খুব যত্নসহকারে আঁচড়ে রেখেছিল। হঠাৎ আল্লাহ তা'আলা তাকে ভূমিতে ধসিয়ে দেন এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই নিচের দিকে নামতে থাকবে।'১৯

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা অহংকারী ও দাম্ভিকের সঙ্গে কথা বলবেন না, তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাকে গোনাহ থেকে পবিত্র করবেন না।

আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, 'তিন ব্যক্তির সঙ্গে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা কথা বলবেন না, তাদের গোনাহ থেকেও পবিত্র করবেন না, তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতেও তাকাবেন তাকাবেন না এবং তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তারা হচ্ছে বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যুক রাষ্ট্রপতি ও দাম্ভিক ফকির।'

একটু ভাবুন-একজন অহংকারী ব্যক্তির ব্যাপারে এত বড় বড় ওয়িদ এসেছে। তবু আজ আমরা দাম্ভিকতা আর অহমিকায় লিপ্ত। আমরা নিজেরাই নিজের গুণে নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করি। আর কেউ যদি আমাদের কাজের দরুন প্রশংসা করে, তখন তো পা মাটিতেই পড়তে চায় না। আর এটা আমাদের জন্য হয় খুবই ক্ষতিকর। কেননা, নিজের প্রশংসা অন্যের কাছে শুনে আমরা ধীরে ধীরে কাজের প্রতি উদাসীন হয়ে যাই। নিজের মধ্যে যে যোগ্যতাটুকু ছিলো তাও হারিয়ে বসি। মোটকথা, অহংকার একজন মানুষের ক্ষেত্রে ইহকাল-পরকাল উভয় জগতের জন্য ক্ষতিকর।

তাই, আমাদের ওপর আবশ্যক হলো-যত দ্রুত সম্ভব অহংকার নামক নফসের ব্যাধি দূর করা। নফসের ব্যাধি দূর না করা অবধি চারিত্রিক, আত্মিক কোনোটারই উন্নতি হবে না।

কিছু কথন

অহংকার ধ্বংসের সুতো বুনে। আর আমরা সেই সুতো ব্যবহার করে নিজেরাই নিজেদের আত্মিক উন্নয়নে কপাট লাগাই!

অহংকার পতনের মূল। কারণ, অহংকার হচ্ছে সত্যকে উপেক্ষা করে মিথ্যের আশ্রয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। নিজেকে বড় মনে করে কল্পনার রাজ্যে এক বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করা। যেই অট্টালিকায় শুধু আপনি-ই রাজা; বাকি সব প্রজা।

অহঙ্কার দমিয়ে রাখতে শিখুন, নতুবা এক দরজা দিয়ে বাঘ হয়ে ঢুকে, অপর দরজা দিয়ে ইঁদুর হয়ে বের হতে হবে।

নফসকে এসলাহ করা যাবে না, যতক্ষণ না অহঙ্কারের মতো বড় শত্রু থেকে নিজেকে আত্মগোপন করছেন।

আমি জানি-আমার মাথা আমার টুপির চেয়ে বড় নয়; আমি জানি-আমার দেহ আমার জামা থেকে বড় নয়। ঠিক তদ্রুপ, আমার কর্মও কখনো শিক্ষার উর্ধ্বে নয়; আমার ব্যক্তিত্বও অমুকের উর্ধ্বে নয়। তবে কেনো এত অহংকার? যদি তোমার আত্মমর্যাদা তোমার হৃদয়ের চেয়ে বড় এবং তোমার অহংকার তোমার মাথার চেয়ে বড় হয়, তবে তা দূর করার চেষ্টা করো। কেননা, এটাই তোমাকে বিষন্নতায় নিক্ষেপ করবে; ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে।

> তুমি যতোই নিজেকে অহংকার মুক্ত দাবি করো-না কেন। অকারণে অন্যকে ঘৃণা করা, তোমার অহংকারী পরিচয় সর্বত্র প্রচার করছে। তাই, নিজেকে অহংকার মুক্ত দাবি না-করে, অহংকারের গোড়ায় নম্রতার পানি ঢালো।

> সংসারের উনুনে যদি অহংকারের আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়, তবে সেই সংসার সুখের মুখ দেখতে পায় না। কর্তা-কর্তীর মুখ নামক উনুন থেকে শুধু আগুনের ধোঁয়া-ই বের হয়; হিমেল শীতল হাওয়া নয়। এজন্যই বলা হয়-একজন অহংকারী মহিলা সংসারের পুরো কাঠামো বিনষ্ট করতে যথেষ্ট; একজন অহংকারী মহিলা গৃহে আগুন লাগাতে যথেষ্ট।

> অহংকার এমন এক চাদর, যা মানুষের সকল গুনাবলি ঢেকে নেয়। অহংকার এমন এক আবরণ, যা একজন মহৎ ব্যক্তির মহত্বকে ঢেকে দেয়। অহংকার এমন এক চাদর, যা একজন ভুলে ভরা মানুষের সমস্ত ভুলের উপর পর্দা টেনে দেয়। ফলে, ওই ব্যক্তি কখনো নিজস্ব ভুলের ব্যাপারে সম্যক অবগত হতে পারে না।

অহংকার নিজের মধ্যেই পোষা যায়। খাবার সংগ্রহের কোনো চিন্তা থাকে না। কেননা, নফস জানে কীভাবে অহংকার নিজের মধ্যে পোষতে হয়; কীভাবে তাকে মোটা-তাজা করতে হয়।

এই অনিশ্চিত জীবনে কীসের এত অহংকার? যেখানে প্রাণ বিয়োগে টানতে হয় অস্তিত্বের ইতি!

মনে রাখবেন-অহংকার আপনাকে আমাকে মানসিক রোগী বানানোর জন্য যথেষ্ট। কেননা, অহংকারী নফস সর্বদাই প্রশংসার দাবিদার। এদিকে আপনার আমার খ্যাতি সীমিত সময় পর্যন্ত বহাল থাকে। এক সময় প্রশংসার পরিবর্তে নিন্দা পেতে হয়—নানান জনের কাছ থেকে। তখন অহংকারী নফস এটা কখনোই মেনে নিতে পারে না। যার ফলে ডিপ্রেশন সর্বদাই আমাদের দরজায় কড়া নাড়তে থাকে。

অহংকার নফসের এমন এক বিপদজনক অবস্থা, যা সর্বদাই আপনার আমার ধ্বংসের কূপ খননে ব্যস্ত। অহংকার নফসের এমন এক ব্যাধি, যা দু'জন ঘনিষ্ঠ মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে অগাধ ভূমিকা রাখে। অহংকার নফসের এমন এক ব্যাধি, যা মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত ভালোবাসা এবং যাবতীয় গুণাবলীকে গ্রাস করে নেয়। অহংকার নফসের এমন এক ব্যাধি, যা জ্ঞান অর্জনের রাস্তায় সর্বদাই প্রতিবন্ধকতা।

আমরা বলি অমুক শিক্ষিত হয়েছে, অনেক বড় ডিগ্রি অর্জন করেছে, তাই দিন দিন তার অহংকার বৃদ্ধি পাচ্ছে—আসলে এই ধারণা ভুল। প্রকৃতপক্ষে, কোনো জ্ঞানী-ই, অহংকারী হতে পারে না। জ্ঞান হলো অহংকার দূর করার মাধ্যম, যতই জ্ঞান বাড়বে অহংকার ততই হ্রাস পাবে। পক্ষান্তরে যতই জ্ঞান কমবে, অহংকার ততই বৃদ্ধি পাবে।

জীবনের দূরপাল্লায় তুমি কখনো সফলতার মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না, যদি তোমার অহংকার, তোমার ওপর বিজয় অর্জন করে। আগে অহংকার'কে পরাজিত করো, তারপর অন্যত্র বিজয় তালাশ করো।

হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান গঙ্গোহী রহি. যখন কোনো ত্বলিবে ইলমের মধ্যে অহংকার দেখতে পেতেন, তখন তার এই অহংকারের চিকিৎসার জন্য তাকে আদেশ দিতেন, "তুমি দৈনিক পাঠকক্ষের সামনে ছাত্রদের জুতো ঠিক করে রাখবে!" আর যখন কোনো ত্বলিবুল ইলমকে বিনয়ী দেখতেন, তখন তার জুতো তিনি নিজেই ঠিক করে দিতেন! আল্লাহু আকবার!

টিকাঃ
১২ সূরা: নাহল, আয়াত: ২৩
১৬ সূরা: বাকারা, আয়াত: ৩৪, " সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৪৯১৮
* মুসলিম, হাদিস : ৯১
" বুখারি, হাদিস : ৫৭৮৯
* মুসলিম, হাদিস : ১০৭

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ব্যাধি: ২

📄 নফসের ব্যাধি: ২


| রাগ |

এক

রাগ, নফসের এক অনন্য ব্যাধি। রাগ এমন, যা একজন মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। রাগের সময় বিবেক বুদ্ধি অচল হয়ে পড়ে; হুঁশ-জ্ঞান পরিপূর্ণভাবে লোপ পায়। যার কারণে অবাঞ্ছিত, অপ্রত্যাশিত কথাবার্তা এমনিতেই মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়। আর সেখান থেকেই শুরু হয়- ঝগড়াঝাটি, মারামারি, খুন-খারাবি ইত্যাদি। এই রাগের অশুভ পরিণতিতে ঝরে পড়ে কত প্রাণ, নষ্ট হয় কত ধন-সম্পদ। শুধু তাই নয়-মামলা-মোকদ্দমার বেড়াজালে আটকে পড়ে হারাতে হয় মনের প্রশান্তি।

রাগ নফসের এমন ব্যাধি, যা আপনাকে সফলতার মঞ্চ থেকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে দিবে। এমনকি, আপনার সুখি সংসারেও বয়ে আনবে অশান্তির ঝড়। আর তাছাড়া, রাগ নষ্ট করে আমাদের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। এজন্য, এই রাগকে নিয়ন্ত্রন করা আমাদের ওপর আবশ্যক। নয়তো, এই রাগ আমাদের নিমজ্জিত করবে অধঃপতনের অতল গহ্বরে।

রাগ এমন এক ব্যাধি, যা মানুষের জ্ঞান'কে হ্রাস করে। কেননা, রাসুল সা. বলেছেন - "الغضب ياكل العقل অর্থাৎ:" রাগ মানুষের জ্ঞানকে খেয়ে ফেলে"। তাহলে আপনিও কি চান, রাগ আপনার জ্ঞান'কে খেয়ে ফেলুক? আপনিও কি চান—আপনার অর্জিত জ্ঞানটুকু রাগের কারণে লোপ পাক? আপনি লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন-যারা সবসময় রাগারাগি করে, তাদের অধিকাংশই জ্ঞানহীন। রাগারাগি করতে করতে এক পর্যায়ে তাদের আকল লোপ পায়। তাদের বিবেক বুদ্ধি অচল হয়ে পড়ে। যার ফলে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে তো পারে-ই না; এমনকি সহজ বিষয়েও পুরো গোলমাল পাকিয়ে বসে।

কোনো এক বিষয় নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হলে, কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা আপনাকে দলিল এবং যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবে— প্রকৃতপক্ষে তারাই হচ্ছে জ্ঞানী। আবার কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা দলিল এবং যুক্তি পেশ করে সমস্যার নিরসন করতে না-পেরে, আপনার সাথে রাগারাগি করবে। কটু কথা বলবে। একপর্যায়ে আপনাকে গালাগালি করবে, তবু তার ভুল স্বীকার করবে না। তারাই হচ্ছে ওই লোক, যাদের জ্ঞান'কে 'রাগ' খেয়ে ফেলেছে। যারা দলিল এবং যুক্তি পেশ করে সমস্যা নিরসন করতে পারে না; আবার নিজের ভুলও স্বীকার করে না, তারাই ঐ সকল লোক, যারা স্বীয় জ্ঞান'কে বিক্রি করেছে রাগের কাছে।

এক ব্যক্তি শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহি.)-এর সন্তানকে জিজ্ঞেস করল, এই যুগের সবচে' বড় আল্লাহ'র ওলি কে? তিনি বললেন মসজিদে গিয়ে দেখুন, মসজিদের এক কোণে তিনজন ব্যক্তি ইবাদতে মশগুল। আপনি তাদের কাছে গিয়ে এক-এক করে প্রত্যেকের গালে একটি করে চড় দিবেন। তারপর আমার কাছে ফিরে আসবেন।

ওই ব্যক্তি তার কথামতো মসজিদে গিয়ে প্রথম ব্যক্তির গালে ঠাস করে একটি চড় বসিয়ে দিল। তখন ঐ ব্যক্তি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। সেও পাল্টা তার গালে একটি চড় বসিয়ে দিল। তারপর সে দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে গেল। তার গালে জোরে একটা চড় বসাল। তখন ওই ব্যক্তি মাথা তুলে তার দিকে তাকাল এবং মাথা নিচু করে আবার ইবাদতে মশগুল হয়ে গেল। সর্বশেষ, সে তৃতীয় ব্যক্তির কাছে গেল। তার গালেও একটা চড় বসাল। তখন ওই ব্যক্তি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল এবং তার হাত ধরে বলতে লাগল—ভাই, আপনি আমাকে মেরেছেন, আপনি হাতে ব্যাথা পাননি তো?

ওই ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হয়ে, শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহি -এর ছেলের কাছে ফিরে আসল। অতঃপর ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটি তার কাছে বর্ণনা করল। তখন তিনি জবাবে বললেন, ওই তৃতীয় ব্যক্তি হচ্ছে বর্তমান যুগের সবচে' বড় ওলি।

রাগ হচ্ছে নফসের অস্ত্র। এই রাগকে ব্যবহার করেই নফস আপনাকে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় ছোট করছে, আপনাকে আমাকে লাঞ্ছিত অপমানিত করছে। তাই, যদি মহৎ ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চান, তবে নফসের ওপর লাগাম দিয়ে, রাগকে সংযত করুন।

দুই

রাগ নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এক সাহাবি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে অল্প কথায় কিছু নসিহত করুন।' তখন রাসুল (সা.) বললেন, 'রাগ বর্জন করো।' সাহাবি কয়েকবার বললেন, 'আরও নসিহত করুন।' কিন্তু, প্রত্যেকবারই রাসুল (সা.) বললেন, 'রাগ বর্জন করো।'

রাগ নিয়ন্ত্রণ-সুখের চাবিকাঠি; সংসারের আলোর প্রদীপ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহি.-এর স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলেন। যখন দাফনের সময় হলো, তিনি বলে উঠলেন, 'হে উম্মে আবদুল্লাহ! তোমার কবর শান্তিময় হোক। সুদীর্ঘ ত্রিশ বছরের বৈবাহিক জীবনে আমাদের মধ্যে একবারও ঝগড়া- বিবাদ হয়নি।'

এ-কথা শুনে তার এক ছাত্র অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ইমাম! এটা কীভাবে সম্ভব?'

জবাবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহি. বললেন, 'যখনই আমি তার প্রতি রেগে যেতাম, তখন তিনি চুপ থাকতেন, আর যখন তিনি আমার প্রতি রেগে যেতেন, তখন আমি চুপ থাকতাম। তাই আমাদের মধ্যে কখনোই ঝগড়া-বিবাদ হয়নি।'

রাগ মানবিক আবেগের অংশ বিশেষ। রাগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে অনিয়ন্ত্রিত রাগ মারাত্মক ক্ষতিকারক। জ্ঞানীরা বলেন, রাগ হলো বারুদের গুদামের মতো। আগুনের স্ফুলিঙ্গের ছোঁয়ায়, সব কিছু ধ্বংস করে দিতে পারে এই রাগ। এ- কারণে রাগ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোনো কোনো মানুষ দ্রুত রেগে যায় এবং তাদের রাগও প্রচন্ড। এমনকি, মানুষ রেগে গিয়ে গালিগালাজ শুরু করতে পারে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশাও বাদ দিতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তিরা রাগের কারণে নানা দৈহিক রোগেও আক্রান্ত হতে পারে।

শরিয়ত মানুষকে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দিয়েছে। রাগ মানুষকে জ্ঞান, বিবেক ও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়। রাগের কারণে মানুষের আচার-আচরণ ও চিন্তা-চেতনায় খারাপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাই, রাগান্বিত অবস্থায় ক্ষমা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে শরিয়ত। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকার পরও প্রতিশোধ না নেয় এবং ক্ষমা করে দেয়, তাহলে তার এ কাজটি শরিয়তের দৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, বড় বড় মনিষীরা ক্ষমা করার ক্ষেত্রে ছিলেন অগ্রগামী। তারা রাগান্বিত হলে সূরা আল ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতটি তেলাওয়াত করতেন। এ আয়াতে বলা হয়েছে, 'যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থায়ই অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে ও অন্যের দোষ-ত্রুটি মাফ করে দেয়। এ ধরনের সৎলোকদের আল্লাহ অত্যন্ত ভালোবাসেন।

মহান ও আধ্যাত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ ব্যক্তিরা সব সময় অন্যের জন্য দুআ করেন। মানুষকে সংশোধন করে দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন জানান। তাদের কথা হলো, কোনো আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব আপনার ওপর রেগে থাকলে ক্ষুব্ধ লোকটির কাছে গিয়ে নম্রভাবে তাকে স্বান্তনা দিন, তার ক্ষোভ উপশমের ব্যবস্থা করুন, যাতে সে শান্ত হয়। এমনটি করলে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিটির ক্ষোভ কমবে, তার কোনো ক্ষতি করার পরিকল্পনা থাকলে তা থেকে সরে আসবে।

বস্তুত রাগ মানুষের জীবনকে সহজেই বিষাক্ত করে তুলতে পারে। রাগের মাথায় এমন সব কাজ ঘটে যেতে পারে-যা ব্যক্তি, সমাজ তথা গোটা বিশ্বের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। তাই রাগ হলে বেশি বেশি 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম' পড়তে হবে। রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসুল সা. আমাদেরকে উত্তম নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তা হলো-যদি হঠাৎ করে রাগ উঠে যায়, তাহলে বসে পড়ো। এরপরেও যদি রাগ প্রশমিত না হয়, তাহলে শুয়ে পড়ো। এরপরেও যদি রাগ কন্ট্রোল করতে তুমি ব্যর্থ হও, তখন অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করো, ইনশাআল্লাহ রাগ এমনিতেই কমে যাবে।

কিছু কথন

> রাসুল সা. বলেছেন-'সে প্রকৃত বীর নয়, যে কাউকে কুস্তীতে হারিয়ে দেয়; বরং সেই প্রকৃত বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।' এখন ভেবে দেখুন তো-আপনি কি সেই বীরের কাতারে পড়েন? কখনো নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে রাগকে প্রশমিত করতে পেরেছেন? যদি না পারেন, তাহলে কেন এতো দাপট? কেন নিজেকে বীর মনে করেন?

> রাসুল সা. বলেছেন- নিশ্চয় রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে। আর শয়তান আগুনের তৈরি। নিশ্চয় পানির দ্বারা আগুন নির্বাপিত হয়। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয় সে যেন অজু করে। রাগ নিয়ন্ত্রণে রাসুল সা. কত সুন্দর সমাধান দিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও, কেন আজ রাগ নিয়ন্ত্রণে পরাজিত?

> আপনি কি জানেন? এক মিনিট রাগ করার কারনে কয়েক ঘণ্টা সুখের সময় হারাতে হয়? রেগে থাকলে এমনি মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। যার কারণে কোনো কিছুই স্বাভাবিক থাকে না। কটু কথা তো বিরক্ত লাগেই, পাশাপাশি ভালো কোথাও বিরক্ত লাগে।

> মনে রাখবেন-রেগে গিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না। রাগের কারণে কিঞ্চিৎ সমস্যাও বৃহৎ আকার ধারণ করে। ফলে, ক্ষুদ্র সমস্যার সমাধানের দ্বারও রাগের কারণে রুদ্ধ হয়ে যায়।

> রাগের কাছে নিজের সফলতা বিক্রি করবেন না। মনে রাখবেন-যারা সফল হয়েছে, তারা রাগকে সংযত রেখেই সফল হয়েছে। অতি রাগ, সফলতার জন্য প্রতিবন্ধকতা।

> আপনি কি জানেন, রেগে গিয়ে নিজেই নিজের শরীরে বিষ প্রয়োগ করছেন? রাগ হচ্ছে একধরনের বিষক্রিয়া, যা আপনার নফসের জন্য খুবই ক্ষতিকর। নফস অধিকাংশ সময়, রাগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

> কেউ একজন বলেছিলেন- 'যদি একটি রাগের মুহুর্তে আপনি ধৈর্য ধরেন, তাহলে আপনি ১০০ দিনের দুঃখ থেকে মুক্তি পাবেন।'

> আপনার মেজাজ ঠিক রাখুন। রাগের মাথায় হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন না; অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

> রাগ এমন এক বাতাস, যা মনের প্রদীপকে নির্বাপিত করে। ফলে, অন্তর ধীরে ধীরে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। তখন ভালো কিছু অনুধাবন করতে পারদর্শী ব্যক্তিও অক্ষম হয়ে যায়।

> রাগ করে কার কী ক্ষতি করেছেন? রাগ করে কাকে কোন শাস্তি দিয়েছেন? কাউকেই নয়; কেবল নিজেকে ছাড়া। রাগ করে অন্যকে শাস্তি দেয়া যায় না। রাগ তো নিজের জন্যই শাস্তিস্বরূপ।

টিকাঃ
২১ 'আল ইলমু ওয়াল ওলামা- ৩৩৬

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ব্যাধি: ৩

📄 নফসের ব্যাধি: ৩


| গীবত |

এক

নফসের এক অন্যতম ব্যাধি হচ্ছে, গীবত। গীবত নফসে আম্মারাহ -এর খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু! নফস, অন্যের গীবত করতে খুবই পছন্দ করে। গীবত বলা হয়: কারো অনুপস্থিতিতে তাঁর সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে।

গীবত করার পিছনে কিছু কারন সমূহ:
মানব প্রবৃত্তির কাছে গীবত খুবই মজাদার! মজাদার হওয়ার কয়েকটি কারণ....
১। নিজের দোষের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা বিরক্তিকর। তাই, অন্যের অগোচরে তার দোষ চর্চা করে, নিজের দোষ মস্তিষ্ক থেকে যেন সরিয়ে নেয়া যায়।
২। নিজের সুনাম ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সহজ উপায়, গীবত। কেননা, সরাসরি কেউ তার নিজের প্রশংসা, নিজের বড়ত্ব, অন্যত্র প্রকাশ করতে পারে না।

আর তাছাড়া, নিজের বড়ত্ব নিজে বলে বেড়ানো অনেকটা দৃষ্টিকটু। তাই ঐ ব্যক্তি নিজের প্রশংসা নিজে না করে, অন্যেদের গীবতের মাধ্যমে সহজেই প্রমান করে—সকলেই দোষযুক্ত; আমি কত ভালো!

নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করতে, অন্যকে ছোট করতে— অনেকেই এই ধরনের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে একে অপরের গীবত করে থাকে। নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করতে অন্যকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। অথচ, এইক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কাকে পছন্দ করেন, কাকে ভালোবাসেন—আমরা কেউ বলতে পারি না। আবার, কার কোন একটি আমল আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করে, তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে, তাকে প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করে ফেলেছেন-সেটাও আমরা জানি না! তাহলে কীভাবে একজন ব্যক্তিকে আমরা ছোট বা হেয় করতে পারি? যাকে হেয় করতে যাচ্ছেন, সেই ব্যক্তি যদি রবের প্রিয় বান্দা হয়ে থাকে, তাহলে নিজের অবস্থা কী হবে-একটু চিন্তা করা প্রয়োজন। তাই, কাউকে ছোট করার মানসিকতাই রাখা ঠিক নয়। কেননা, এটা গীবতের উৎস।

দুই

হিংসা-বিদ্বেষের তাড়নায় অনেকেই অন্যের গীবতে জড়িয়ে পড়ে। কারো উন্নতি বা প্রশংসা দেখলেই তৃতীয় পক্ষের কাছে তার অগোচরে দোষ চর্চা করে। শুধু তাই নয়-ব্যক্তিজীবনের অনেক গোপনীয় কথাও অন্যত্র প্রকাশ করে দেয়, যেন ঐ ব্যক্তিকে ছোট করা যায়। অনেকেই আছে, যারা সব সময় বেহুদা কাজে সময় ব্যয় করে; সব সময় অবসর সময় কাটায়, তারাই অন্যের গীবতে সিদ্ধহস্ত। কারণ, তাদের কোনো কাজ থাকে না। সময় কাটানোর মাধ্যম হিসাবে তারা ঐ নোংরা পথকেই বেছে নেয়।

তাইতো বলা হয়-গীবত থেকে বেঁচে থাকতে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকো; আড্ডাবাজি পরিহার করো।

|| গীবতের প্রকারভেদ ||

১. দৈহিক কাঠামোর গীবত:
কারো কাছে কোনো ব্যক্তির দৈহিক ত্রুটি উল্লেখ করাও গীবত। যেমন: অমুক ব্যক্তি খুব মোটা, তার নাক বোঁচা, চোখ খুবই ছোট, চোখে দেখে না, মাথায় চুল নেই, পেটে ভূড়ি আছে, ইত্যাদি।
আজকাল এটাকে আমরা গীবত-ই মনে করিনা। একজন মানুষের অগোচরে, তার শারীরিক গঠন নিয়ে কত যে মন্তব্য করি- তার ইয়ত্তা নেই। অথচ, এটাই অনেক বড় ধরনের গীবত; কেননা, আপনি যদি তার উপস্থিতিতে, তার সামনা সামনি এই কথাগুলো বলেন তাহলে অবশ্যই সে কষ্ট পাবে। সেজন্যই তো আপনি তার অনুপস্থিতিতেই অন্যের কাছে তার শারীরিক গঠন নিয়ে আলাপ করলেন।

২. পোশাকের গীবত :
যেমন: অমুকের পোশাক কত সস্তা, অমুকের পোশাক খুবই বিশ্রী। দেখ, দেখ, কেমন একটা জামা পড়েছে। সব সময় ছেঁড়া জামা পড়ে, ইত্যাদি।

৩. বংশের গীবত :
তুচ্ছ করার জন্য কাউকে বলা, অমুকের বংশ নিচু, অমুকের পূর্ব পুরুষেরা ছিলো—কুলি-মজুর বা চোর-ডাকাত ইত্যাদি! অমুকের তো কোনো বংশই নেই, ইত্যাদি বলা।

৪. অভ্যাস বা আচার-আচরণের গীবত:
কোন ব্যক্তির আচার-ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করা। যেমন: সে মানুষকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে, ব্যবহার খারাপ, অভদ্র, পেটুক, অলস, ইত্যাদি。

৫. ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে গীবত :
কোনো ব্যক্তির অসহায় অবস্থা অভিনয় বা ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে দেখানো। যেমন: অন্ধ, বোবা, ইত্যাদি সেজে দেখানো। এমনকি সমালোচনার জন্য কারো চালচলন, কথা, পোশাক ইত্যাদি নকল করে অভিনয় করাটাও গীবত। সরাসরি নামোল্লেখ না করে এমন কিছু ইঙ্গিতবহ উপমা ব্যবহার করে দোষ বর্ণনা করা যে, লোকেরা উপমা শুনেই বুঝে ফেলে কার কথা বলা হচ্ছে।
অর্থাৎ গীবত করার সময় নাম না নিলেও এমন ভাবে কোন ব্যাক্তির দোষ- ত্রুটি বলা যে, মানুষের আর বুঝতে বাকি থাকে না—কার কথা বলা হচ্ছে। এটাও গীবতেরই অন্তর্ভুক্ত।

৬. কানের গীবত :
নিজে না-বললেও কারো গীবত শোনা এবং শোনার সময় কোনরুপ বাধা না-দেয়া—এটাই কানের গীবত।

৭. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে গীবত :
নিজের হাত, পা, চোখ ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য লোকের নিকট কোন ব্যক্তির দোষ বর্ণনা করা। যেমন: কোনো ব্যক্তি কোনো মজলিস থেকে উঠে চলে যাওয়ার পর তার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য চোখ অথবা হাতের ব্যবহার করা।

৮. লেখনীর মাধ্যমে গীবত :
কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য মেসেন্জারে তৃতীয় পক্ষের কাছে তার দোষ লিখে মেসেজিং করা। কারো ব্যক্তিগত কথপোকথন স্ক্রিনশট নিয়ে অন্যদের সাথে শেয়ার করা।
এ- গীবত আমাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু হলেই সঠিকটা যাচাই-বাছাই না-করেই মেসেঞ্জারে একে অন্যের দোষ বর্ণনা করি! ম্যাসেঞ্জারের ব্যক্তিগত কথাবার্তা স্ক্রিনশট দিয়ে অন্যদের সাথে শেয়ার করি—এগুলোও গীবত।

৯. দাওয়াতে লিপ্ত এক মুসলিম অন্য মুসলিমের গীবত। আজ মাঠে কাজ করা অধিকাংশ দাঈ -রা একজন আরেকজনের গীবতে ব্যস্ত। ফলে, ব্যক্তির ক্ষতি যতটা হচ্ছে, তারচে দাওয়াতের ক্ষেত্র বেশী নষ্ট হচ্ছে। সাধারন মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দলাদলি বেড়েই চলেছে। এই ফাঁকে ইসলামের শত্রুরা দীনের ক্ষতি করার আরো বেশি সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।

|| গীবতের পরিণতি ||

গীবতের পরিণতি প্রসঙ্গে হাদীসে কুদসীতে এসেছে: নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন বান্দাকে তার আমলনামা খোলা অবস্থায় দেয়া হবে। সে তাতে এমন কতগুলো নেকী দেখবে, যা সে আমল করেনি। সে বলবে, 'হে প্রভু! আমি এই নেকীগুলো অর্জন করিনি।' তিনি বলবেন, 'লোকেরা তোমার নিন্দা করেছিল, তারই বদলে আমি এগুলো লিপিবদ্ধ করেছি।' অপর এক বান্দার সামনে কিয়ামতের দিন তার আমলনামা খুলে দেয়া হবে। সে বলবে,' হে প্রভু! আমি কি অমুক দিন অমুক পুণ্য করিনি? তখন তাকে বলা হবে, 'তুমি লোকদের নিন্দা করতে। ফলে সে-সব পুণ্য তোমার আমলনামা হতে মুছে ফেলা হয়েছে।'

গীবত থেকে বাঁচার জন্য আজ শুধু এতটুকু জেনে নিই—গীবত ও পরনিন্দার শাস্তি কত কঠিন...

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: মে'রাজের সময় আমি কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, যাদের ছিল তামার নখ। সেই নখ দিয়ে তারা নিজেদের চেহারা এবং বুক ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি বললাম, জিবরীল! এরা কারা? উত্তরে তিনি বললেন, যারা (দুনিয়াতে) মানুষের গোশত খেত (গীবত করত) এবং মানুষের সম্মান হানি করত।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে এ স্বভাবের নিন্দা করে বলেন...
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ.
অর্থ: দুর্ভোগ প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির, যে পেছনে ও সামনে মানুষের নিন্দা করে।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন....
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

কিছু কথন

> গীবত করে কোনো ফায়দা নেই; ক্ষতি ছাড়া। ইসলামের অন্যতম স্কলার, হাসান আল-বাসরী রহি. যখন শুনতেন কেউ তার গীবত করেছে, তখন তিনি তার বাসায় মিষ্টি খেজুর পাঠাতেন। অতঃপর বলতেন, 'আপনি আপনার নেক আমল গুলো আমাকে হাদিয়া দিয়েছেন, এর বিনিময় দেয়া আমার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়, তাও আমি আপনাকে সামান্য হাদিয়া দিলাম!'

> গীবত করে কখনো খালি কলসি ভরাট করা যায় না; উল্টো, ভরা কলসি গীবতের দ্বারা খালি হয়ে যায়। তাই, নিজের কলসি'র পানি দিয়ে অন্যের কলসি ভরাট করো না। অন্যথায়, দুনিয়ায় এতো পানি বহন করেও, ময়দানে মাহসারে খালি কলসি নিয়ে দৌড়াতে হবে।

> ইবনে মুবারক রাযি. বলেন-আমি যদি গীবত করতাম, তবে অবশ্যই আমি আমার মাতা-পিতার গীবত করতাম। কেননা, তারাই আমার নেকী পাওয়ার অধিক হকদার!

> সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ রহি. বলেন: গীবত ঋণের চেয়েও মারাত্মক। ঋণ পরিশোধ করা যায়; কিন্তু গীবত পরিশোধ করা যায় না।

> আজ হয়তো বিভিন্ন মজলিসে বসে কারো মুখ থেকে তার অনুপস্থিত কারো গীবত শুনছি, আর বেশ মজা নিচ্ছি। আরে, যে আপনার সম্মুখে অন্যের সমালোচনা করে, সে তো আপনার সমালোচনা অন্য কারো কাছেও করে। কেননা, গীবতকারী কখনো একের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মজলিস পেলেই সেখানে গীবতের আসর বানায়। হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে গীবত করে যায়।

> গীবত থেকে বেঁচে থাকতে, কোন মজলিসে অন্য কারো সম্পর্কে আলাপ না করে, নিজের সম্পর্কে বা কোনো কল্যানমূলক কাজের আলাপ করুন। কুরআন হাদীসের শিক্ষা নিয়ে আলাপ করার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকুন।

> যত কম কথা বলা হবে, ততই গীবত করা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তাছাড়া, চুপ থাকাটাও এক ধরনের ইবাদত। এজন্যই বলা হয়-কম ঘুমাও, কম খাও, কম কথা বলো। বেশি কথা বলা গীবতের দরজা তো খুলেই, পাশাপাশি নিজের বিপদও টেনে আনে।

> গীবতের পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখুন, তাহলে আখেরাতের ভয়াবহতা ও দুনিয়ায় লাঞ্চিত হওয়ার ভয়ে নিজেকে গীবত থেকে সংযত রাখা যাবে।

> সবসময় নিজের দোষ-ত্রুটি নিয়ে ভাবুন। কেননা, নিজের ত্রুটির কথা স্মরণ থাকলে, অন্যের চেয়ে নিজেকেই ছোট মনে হবে এবং অন্যের সমালোচনা করার কথা মাথায়ও আসবে না।

> নবী রাসূলদের জীবনী পড়ুন। এতে দুনিয়ার জীবনের লোভ-লালসা, হিংসা, রাগ থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার আগ্রহ আসবে ইন শা আল্লাহ।

> আখেরাতের জীবন ও দুনিয়ার জীবন নিয়ে তুলনামূলক জ্ঞান অর্জন করুন। এর ফলে আখেরাতের জীবনে প্রাধান্য আসবে। সেই সুবাদে গীবত নামক ব্যাধি থেকেও সতর্ক থাকা যাবে।

> বেশি বেশি রবের কাছেই দু'আ করুন, যেনো আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আমাকে এই ব্যাধি থেকে নিরাপদ রাখেন!

টিকাঃ
২২ সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৭৮
২৩ সূরা হুমাযাহ, : ১
২৪ সূরা হুজরাত, আয়াত - ১২

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ব্যাধি: ৪

📄 নফসের ব্যাধি: ৪


| লোভ |

নফসের আরেকটি ব্যাধি হচ্ছে লোভ। লোভ মানুষকে একদম অধঃপতনের অতল গহবরে নিমজ্জিত করে। একজন লোভী মানুষ কখনো সুখী হতে পারে না। সুখের সমস্ত দ্বার, লোভ নামক ব্যাধি পরিপূর্ণভাবে রুদ্ধ করে দেয়; তার জীবন থেকে সুখ কেড়ে নেয়। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তাআলা যে-সকল নেয়ামত তাকে দান করেছেন, তার শুকরিয়া তো কখনো আদায় করেই না; উল্টো আল্লাহ তাআলা তাকে যা দান করেছেন, তার চে বেশী কিছু আকাঙ্ক্ষা করে। এমনকি, যদি সেটা পূর্ণ হয়ে যায়, তখন সে আবার নতুন করে ভিন্ন কিছু চাইতে থাকে।

উদাহরণ স্বরূপ: একজন ব্যক্তি পায়ে হেঁটে দৈনিক তার কর্মস্থলে যায়। যাওয়ার পথে তার দৃষ্টিগোচর হয়—অনেকেই সাইকেল ব্যবহার করে তার কর্মস্থলে যাচ্ছে। যখন সে এটা দেখে, তখন মনে মনে সাইকেল আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। বলতে থাকে—'অবশ্যই আমার একটা সাইকেল চাই। এটা পাওয়ার জন্য যা কিছু করতে হয়, আমি তাই করবো।' এখান থেকেই তার লোভের যাত্রা শুরু। সে পায়ে হেঁটে তার কর্মস্থলে যেতে পারে এটাই তো অনেক কিছু। এরকম অনেক মানুষ রয়েছে, যারা হাঁটতে পারে না; যাদের পা নেই। এদিকে, আল্লাহ তা'আলা তাকে পা দিয়েছেন, সেই পায়ে হেঁটে হেঁটে তার গন্তব্যস্থলে যেতে পারছে। এতদ্বসত্ত্বেও, তার রবের শুকরিয়া জ্ঞাপন না করে, আরো বড় কিছু আকাঙ্ক্ষা করে বসলো। সাইকেল কেনার জন্য যা যা করা লাগে, সে তাই তাই করল। যখন সে সাইকেল কিনলো, তখন সে বাইক দেখে সেটার দিকে মনোনিবেশ করল। এবার সে মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো, এবার সাইকেল রেখে বাইকে করে কর্মস্থলে যাবে।'

অতঃপর সে বাইকও ক্রয় করে। এভাবে দিন দিন তার লোভের মাত্রা বাড়তেই থাকে। একটার পর একটা চাইতেই থাকে। যা পেয়েছে তাতে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। যা আছে তার কখনো শুকরিয়া আদায় করে না। লোভ করতে করতে এক পর্যায়ে তার আকাঙ্ক্ষা তার সামর্থের বাইরে চলে যায়। তার আকাঙ্ক্ষা আকাশচুম্বী; কিন্তু তাঁর সামর্থ্য শেকলবন্দি। এমতাবস্থায় যখন সে তার সামর্থ্য দ্বারা তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে না, তখন সে অসামাজিক কাজে আত্মনিয়োগ করে। অর্থের জন্য, হারাম পথ বেছে নেয়। যা তার দুনিয়া আখেরাত উভয়টাই ধ্বংস করে।

এভাবেই চলতে থাকে জীবন; চলতে থাকে তার লোভের চক্র। লোভ যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন এই লোভের চক্র থেকে বের হয়ে আসা, তার পক্ষে দুষ্কর হয়ে যায়। ফলে, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থেকেও সে আকাঙ্ক্ষা করে-আমার মৃত্যুটা যেন জাঁকজমকপূর্ণ হয়, মৃত্যুর সংবাদে যেন মানুষের ঢল নেমে আসে; জানাযা যেন লাখো মানুষের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়।

লোভী ব্যক্তি ধন-সম্পদ অর্জন করে ক্রয় করে: নফসের কষ্ট, ব্যস্ত অন্তর, পরকালের শক্ত হিসাব। আর একজন শুকর গুজারি দারিদ্র ব্যক্তি ক্রয় করে: নফসের শান্তি, মুক্ত স্বাধীন অন্তর, পরকালের সহজ হিসাব।

অসংখ্য রেওয়ায়েত লোভের নিন্দায় বর্ণিত হয়েছে। যার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হল।

আনাস ইবনু মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যদি বনি আদমের স্বর্ণ ভরা একটা উপত্যকা থাকে, তথাপি সে তার জন্য দু'টি উপত্যকা হওয়ার কামনা করবে। তার মুখ মাটি ব্যতীত অন্য কিছুতেই ভরবে না। তবে যে ব্যক্তি তাওবাহ করবে, আল্লাহ্ তার তাওবাহ কবুল করবেন।

ইমাম সাদিক রহি. বলেছেন : 'লোভী দু'টি উৎকৃষ্ট গুণ হতে বঞ্চিত, ফলশ্রুতিতে সে দু'টি দোষের অধিকারী; সে পরিতৃপ্ত হওয়া থেকে বঞ্চিত ফলে প্রশান্তিকে হাতছাড়া করেছে, [আর] সন্তুষ্টি হতে বঞ্চিত ফলে বিশ্বাসকে খুইয়েছে'।

ইমাম আলী রহি. বলেছেন: 'সেই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা ধনি যে লোভের বন্দি নয়'।

ইমাম সাদিক রহি. বলেছেন: আমিরুল মু'মিনীন বলতেন যে, হে আদমের সন্তানেরা! যদি তুমি দুনিয়া হতে পরিমাণ মতো চাও, তাহলে সেটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু যদি পরিমাণের চেয়ে বেশী চাও, সমস্ত দুনিয়াও তোমার জন্য যথেষ্ঠ নয়'।

প্রয়োজনের বেশি ধারণ ক্ষমতার বাইরে মানুষ খেতে পারে না, পড়তে পারে না, করতে পারে না-এসব জানা সত্ত্বেও মানুষ অতিরিক্ত পাওয়ার নেশায় কত রকম ধান্দার পেছনে যে জীবন নষ্ট করে দেয়, তা আমাদের চারপাশের মানুষজনকে দেখলেই বোঝা যায়।

লোভ-লালসা হচ্ছে মানুষের হীনতম বৈশিষ্ট্যের একটি। ভাই-বোনের মধ্যে ধন-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ, সম্পর্ক নষ্ট। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদ এবং পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে মামলা-মোকাদ্দমা ইত্যাদি, এ-সবকিছু লোভের-ই ফসল।

কিছু পাপ আছে, যা শুধুই মৌলিক পাপ, আর লোভ, হিংসা, অহংকার এমন ধরনের পাপ যা আরো বহু পাপের জন্ম দেয়।

টিকাঃ
২৫ * সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬৪৩৯
২৬ 'আল কাফী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩১৬, হাদীস নং ৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية