📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ধোঁকায় আযীযের স্ত্রী জুলাইখার পদস্খলন

📄 নফসের ধোঁকায় আযীযের স্ত্রী জুলাইখার পদস্খলন


বিনা অপরাধে ইউসুফ আ.-কে কারাবদ্ধ হয়ে থাকতে হয় বেশ কিছুদিন। মাঝখানে এক বাদশাহ ইউসুফ আ.-এর করা স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও তদবির শুনে মুগ্ধ হয়ে যান এবং তিনি অনুমান করেন যে, এই ব্যক্তি যাকে বেশ কিছুদিন থেকে জেলে রাখা হয়েছে, তিনি অসাধারণ জ্ঞান, মর্যাদা ও উচ্চ যোগ্যতার অধিকারী। সুতরাং বাদশাহ তাকে দরবারে উপস্থিত করার জন্য আদেশ দিলেন。

কিন্তু, ইউসুফ আ. এভাবে কারামুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। কেননা, ইউসুফ আ. যখন দেখলেন - বাদশাহ সম্মান দিতে প্রস্তুত, তখন তিনি এইভাবে শুধু অনুগ্রহের পাত্র হয়ে জেল থেকে বের হওয়া পছন্দ করলেন না; বরং, আপন চরিত্রকে উচ্চ এবং নিজের পবিত্রতাকে সাব্যস্ত করাকে প্রাধান্য দিলেন, যাতে পৃথিবীর সামনে তার নির্মল চরিত্র ও সুউচ্চ মর্যাদা পরিস্ফুটিত হয়ে যায়। ইউসুফ আ.-এর দাবি-আমি নির্দোষ এটা প্রমাণ হতে হবে, এবং ঐ মহিলাকে তা অকপটে স্বীকার করতে হবে যে, সে নিজেই অপরাধী。

বাদশাহ, ইউসুফ আ.-এর এই বক্তব্য শুনে, ঐ মহিলাদের জিজ্ঞেস করলে, প্রত্যেকেই ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতার কথা স্বীকার করল। এখন আযীযের স্ত্রী জুলাইখারও এই কথা স্বীকার করা ছাড়া কোনো উপায় থাকল না। সে স্বীকার করল যে, "ইউসুফ নির্দোষ এবং প্রেমের পয়গাম আমার পক্ষ থেকেই ছিল। ইউসুফের এই ত্রুটির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।"

সে আরো বললো-আমি নিজেকে দোষমুক্ত মনে করি না; কেননা, নফস তো মন্দ কাজে প্ররোচিত করতেই থাকে। অর্থাৎ, আযীযের স্ত্রী'র বক্তব্য- আমাকে আমার নফস তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। নফসের প্রতারণায় পড়ে আমি ইউসুফকে আমার ফাঁদে ফেলার ইচ্ছে করেছিলাম। কিন্তু সে আমার ফাঁদে পড়েনি। আমার নফস আমাকে এই খারাপ কাজে অগ্রসর করেছে。

এবার আসি মূল আলোচনায়। এই ঘটনার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করলাম এটা জানানোর জন্য যে, জুলাইখাও কিন্তু নফসের ধোঁকায় পড়ে এই কান্ড ঘটিয়েছিলো। নফসের প্রতারণায় সে ইউসুফ আ.-কে তার প্রতি ফুঁসলিয়েছে। আর তার এই নফস ছিল লাগাম ছাড়া, নফসে আম্মারা। যদি তার নফস লাগামহীন না হতো, তাহলে কখনোই সে এই অসামাজিক অশালীন কান্ড ঘটাত না। এটাই কুরআন পাকে বর্ণিত হয়েছে—

وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةُ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ

জুলাইখার বক্তব্য: আমি নিজেকে দোষমুক্ত মনে করি না, কেননা মানুষের নফস তো খারাপ কর্ম-প্রবন。

অতএব, আমাদের নফস যদি লাগামহীন হয়ে যায়, তাহলে সে কাউকে ছাড় দিবে না, তাই, আমাদের উচিত সময় থাকতে নফসকে নিয়ন্ত্রণ আনা। সময় থাকতে তাকে লাগাম পড়ানো। সময় থাকতে তাকে শেকলবন্দি করা।

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ধোঁকায় অপবাদ রটানো

📄 নফসের ধোঁকায় অপবাদ রটানো


নফসের গোলামী করার আরেকটি ক্ষতি হচ্ছে-সে আপনাকে অপবাদকারী রুপে ব্যবহার করবে। নফস যদি লাগামহীন হয়ে যায়, তখন তার চোখে আলোকে অন্ধকার, আর অন্ধকারকে মনে হয় আলো। মিষ্টি'কে মনে হয় তিক্ত, আর তিক্তকে মনে হয় মিষ্টি। সাদাকে মনে হয় কালো, আর কালোকে মনে হয় সাদা! মোটকথা, তার অন্তর্দৃষ্টি সঠিক বিষয়টা অনুধাবন করতে পারে না। ফলে সে সতী-সাধ্বী নারীদের উপর অপবাদ আরোপ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করে না। তার কাছে সবাই নিকৃষ্ট, সবাই খারাপ। আর এটা হয়, নফসের ত্রুটি বিচ্যুতির কারণেই। সে অশ্লীল পাপাচারে লিপ্ত থেকে তার নফসকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে-এখন দুনিয়ার সবাইকেই তার নিজের মত মনে হয়। মনে হয় সবাই খারাপ, সবাই পাপাচারে লিপ্ত, সকলেই তার মতো কোনো না কোনো গর্হিত কাজে নিয়োজিত。

নফস যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তখন পাপাচারে লিপ্ত হয়ে একদম কুলুষিত হয়ে যায়। ফলে তার অন্তর্দৃষ্টি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, সর্বদাই সতী-সাধ্বী নারীদেরকে অপবাদে সিদ্ধহস্ত। সব সময় সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখে। প্রকৃত বিষয়টি যাচাই-বাছাই না করেই, যে-কারো উপর মিথ্যে অপবাদ আরোপ করে。

সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই নিন্দনীয় এবং দণ্ডনীয়। ইসলামে নারীর মর্যাদা অন্য যে-কোনো ধর্মের চেয়ে বেশি। অমুসলিম বিশিষ্ট নারীরাও এ কথা স্বীকার করেছেন। দুনিয়ার সব সমাজেই নারীর মর্যাদা ক্ষুন্ন করার ক্ষেত্রে অপবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইসলামে অপবাদ সৃষ্টি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদের যে-কোনো প্রবণতার বিরুদ্ধে ইসলাম কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে। কেউ যাতে তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনায় সাহসী না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করতে পবিত্র কুরআনুল কারিমে মহান আল্লাহপাক ঘোষণা করেন...

إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

অনুবাদ : 'যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ মু'মিন নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে গুরুতর শাস্তি।'১৩

উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহপাক সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন— কোনো সতী-সাধ্বী নারীর ওপর ব্যভিচার ও অশ্লীলতার অপবাদ আরোপকারী ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত, তার জন্য গুরুতর শাস্তি অপেক্ষমাণ। দুনিয়াতেও তাকে শাস্তি পেতে হবে。

আর তাছাড়া, সতী-সাধ্বী নারীর ওপর অপবাদ দেওয়া সমাজভুক্ত মানুষের সুসম্পর্ক নষ্ট করে। সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য সৃষ্টির মদদ জোগায়- এ- ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রবণতা。

জাহেলি যুগের আরব অধিবাসীরা একে অপরের বিরুদ্ধে অপবাদ সৃষ্টি এবং সংঘাতে মদদ জুগিয়ে আনন্দ পেত। ইসলামে এ- ধরনের কর্মকাণ্ডকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে。

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও দেখা যায়, সাধারণত অজ্ঞ এবং কুচক্রী লোকজনই অপরের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ায়। অযৌক্তিকভাবে তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কারোর চরিত্র সম্পর্ক প্রশ্ন তোলা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে তা কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ঘোষণা করা হয়েছে。

সতী-সাধ্বী নারীদের ওপর মিথ্যা অপবাদ রটানোর প্রবণতা পূর্বেই ছিলো। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর ওপরও অপবাদ রটানো হয়েছে。

যাহোক, নারীদের চরিত্রের ওপর অপবাদ রটনাকারীরা কী পরিমাণে অভিশপ্ত, তা বোঝানোর জন্য একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি। রাসূল সা. বলেছেন...

সাতটি ধ্বংসকারী পাপ থেকে তোমরা বেঁচে থাক। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, সা. ঐ গুলো কী? উত্তরে তিনি বললেন, ঐগুলো হলো- আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করা এবং সতী-সাধ্বী, সরল মুমিনা স্ত্রী লোকের ওপর অপবাদ আরোপ করা。

টিকাঃ
১৩. সূরা আননূর-২৩
১৪. ফাতহুল কারী ৫/৪৬২ মুসলিম ১/৯২, উদ্ধৃত: তাফসীরে ইবনে কাসীর।

ফন্ট সাইজ
15px
17px