📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ধোঁকায় পৃথিবীর সর্বপ্রথম হত্যাযজ্ঞ

📄 নফসের ধোঁকায় পৃথিবীর সর্বপ্রথম হত্যাযজ্ঞ


আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য করার পর, তিনি হযরত আদম আ. ও বিবি হাওয়া আ. -কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। পৃথিবীতে আগমনের পর হযরত আদম আ. ও বিবি হাওয়া আ.-এর সন্তান জন্ম হতে লাগল। ধীরে ধীরে মানুষ বাড়তে লাগলো পৃথিবীতে। কিন্তু এখানে দৃশ্যত একটি সীমাবদ্ধতা থেকে গেল। আদম আ. ও হাওয়া আ. যেহেতু পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী, তাই তাদের পরের প্রজন্মে যত সন্তানের জন্ম হবে, তারা সকলেই হবে ভাই-বোন। শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে, ভাই-বোনের মাঝে কখনো বিয়ে হয় না। সেই হিসেবে এটিই হতো পৃথিবীর শেষ মানব প্রজন্ম। এরপর মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু এখানে তো পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন, তাই বিশেষ একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে এর সমাধান করা হলো。

বিবি হাওয়ার গর্ভে তখন সন্তান জন্ম নিতো জোড়ায় জোড়ায়। প্রতি জোড়ায় একজন ছেলে আর একজন মেয়ে জন্ম হত। এক-ই জোড়ার ছেলে ও মেয়ে পরস্পর বিয়ে করতে পারবে না; বিয়ে করতে হলে ভিন্ন জোড়ার কাউকে করতে হবে। কাবিল ও হাবিল ছিল ভিন্ন জোড়ার, তাই তাদের ব্যাপারটি স্বাভাবিক নিয়মেই সমাধান হয়ে যায়-একজন আরেকজনের জোড়ার মেয়েকে বিয়ে করবে。

কিন্তু এখানে একটি সমস্যা দেখা দেয়-হাবিলের জোড়ার মেয়েটি তেমন সুন্দরী ছিল না। সেই তুলনায় কাবিলের জোড়ার মেয়েটি ছিল অনেক বেশি সুন্দরী। নিয়ম অনুসারে হাবিল অধিক সুন্দরী মেয়েটিকে পায় আর কাবিল পায়, কম সুন্দরী মেয়েটিকে। কিন্তু, কাবিল বেঁকে বসে-সে হাবিলের জোড়ার মেয়েটিকে বিয়ে করবে না। যেভাবেই হোক, নিজের জোড়ার সুন্দরী মেয়েটিকেই বিয়ে করবে。

এমতাবস্থায়, পিতা হযরত আদম আ. একটি মীমাংসা করলেন। তাদের দু'জনকে আল্লাহর নামে কুরবানি দিতে বললেন। যার কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করবেন, তার ইচ্ছেই জয়ী হবে। কার কুরবানি গৃহীত হলো, আর কার কুরবানি গৃহীত হলো না, তা কীভাবে বোঝা যায়? তখনকার কুরবানি এখনকার কুরবানির মতো ছিল না-সে সময়ে কোনো জিনিস কুরবানি দিলে আসমান থেকে আগুন এসে ঐ জিনিসকে পুড়িয়ে দিত। কুরবানির বস্তুকে ভূমি থেকে উপরে কোনো স্থানে উপস্থাপন করা হত, আকাশ থেকে আগুন এসে যদি বস্তুকে পুড়িয়ে দিতো, তাহলে বোঝা যেত-আল্লাহ কর্তৃক কুরবানি গৃহীত হয়েছে。

তো, পিতা আদম আ. -এর দেওয়া মীমাংসা অনুযায়ী, তারা উভয়েই কুরবানির বস্তু উপস্থাপন করল। হাবিল একটি সুস্থ ও মোটাতাজা দুম্বা উৎসর্গ করলো, অপরদিকে কাবিল তার কিছু সবজি ও শস্য উৎসর্গ করল। তখন সবজি ও শস্যও কুরবানির জন্য উৎসর্গ করা যেত। কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়-হাবিল উৎসর্গ করেছিল উৎকৃষ্ট মানের দুম্বা, আর কাবিলের শস্য ছিল নিকৃষ্ট মানের。

আল্লাহ হাবিলের কুরবানিকেই কবুল করলেন। উপর থেকে আগুন দিয়ে দুম্বাটিকে পুড়িয়ে নিলেন, কিন্তু কাবিলের শস্যকে কিছুই করলেন না। সে হিসেবে বিয়ের নিয়ম আগের মতই রইল, হাবিল বিয়ে করবে কাবিলের জোড়ায় জন্ম নেয়া মেয়েটিকে。

কিন্তু কাবিল এই অপমান সহ্য করতে পারল না। সে ভাবল-হাবিলের জন্য তার কুরবানি আল্লাহ গ্রহণ করেননি। কুরবানিতে প্রত্যাখ্যাত হওয়াতে এবং স্ত্রী হিসেবে কাঙ্ক্ষিত মেয়েকে না পাওয়াতে সে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে গেল। ক্রোধের বশে হাবিলকে সে বলল, "তোর ইচ্ছে কোনোভাবেই আমি পূরণ হতে দেব না। প্রয়োজনে তোকে হত্যা করব, যেন তুই আমার জোড়ার মেয়েটিকে বিয়ে করতে না পারিস।"

কাবিলের এমন আচরণে হাবিল অনেক সুন্দর উত্তর দিয়েছিল। সে বলেছিল, "আল্লাহ তাদের কুরবানিই কবুল করেন যার উদ্দেশ্য সৎ। আর তুমি আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালেও, আমি আমার হাত তোমার দিকে সম্প্রসারিত করব না। কারণ, আমি আমার প্রতিপালককে ভয় করি।" কিন্তু এই কথায় কাবিলের উদ্দেশ্যের কোনো পরিবর্তন হলো না। উল্টো তার নফস তাকে ভ্রাতৃহত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অতঃপর সে তাকে হত্যা করল。

এরপরই কাবিলের মন গলে যায় এবং অনুভব করে, আহারে, কত বড় ভুল করে ফেলল সে! নিজের ভাইকে নিজ হাতে মেরে ফেলল, এর চেয়ে বড় ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে! ভেতরে ভেতরে সে অনেক অনুতপ্ত হলো এবং নিজের অপকর্ম কীভাবে ঢাকবে, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল। তখনো মৃতদেহ সৎকারের ব্যাপারে কোনো নিয়ম তৈরি হয়নি, কারণ এর আগে কোনো মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। মৃত দেহটিকে নিয়ে কী করবে এ নিয়ে যখন সে চিন্তায় মগ্ন তখন দেখল, একটি কাক তার ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে একটি গর্ত করল। তারপর সেই গর্তে একটি মৃত কাককে টেনে এনে কবর দিয়ে দিল। এটি দেখে কাবিল ভাবল, তাকেও হয়তো এভাবে কবর দিতে বলা হচ্ছে। তাই একটি গর্ত করে সে তার ভাইকে কবর দিয়ে দিল。

ইসলামের ইতিহাস অনুসারে এটিই ছিল মানবজাতির প্রথম কবর। কোনো কোনো উৎস থেকে জানা যায়, কাক দু'টি ছিল ফেরেশতা এবং এদেরকে আল্লাহই পাঠিয়েছিলেন, যেন এদের দেখে কাবিল শিখতে পারে। আর একটি কথা না বললেই নয়—পৃথিবীতে যতগুলো হত্যার কান্ড ঘটবে, তার পাপের একটি অংশ কাবিলের নামেও যাবে。

এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস আছে। রাসুল (সা:) বলেছেন, "পৃথিবীতে যখনই অন্যায়ভাবে কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তখন পাপের একটি অংশ অবশ্যই আদমের প্রথম পুত্র কাবিলের উপর পড়ে। কেননা সে-ই প্রথম ব্যক্তি, যে অন্যায় হত্যাকাণ্ডের সূচনা করে।”

এবার আসি মূল আলোচনায়। আপনাদের বোঝার সুবিধার্থে এই ঘটনাটি এখানে উল্লেখ করলাম। কাবিল কর্তৃক হাবিলকে হত্যার ঘটনা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। এটা কি জানি—কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করতে নফস উদ্যত করেছিল? এই নফসের ধোকায় পড়ে কাবিল তার ভাইকে হত্যা করেছে। এই ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত আছে—

فَطَوَّعَتْ لَهُ نَفْسُهُ قَتْلَ أَخِيهِ فَقَتَلَهُ فَأَصْبَحَ مِنَ الْخَاسِرِين

অনুবাদ: অতঃপর তার নফস তাকে ভ্রাতৃহত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।”

দেখুন, এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—কাবিলকে তার নফস উদ্বুদ্ধ করেছে, তার ভাইকে হত্যা করতে। যদিও, প্রকৃতপক্ষে মেয়েলী কারণে সে বেঁকে বসে, কিন্তু সেটাও ছিলো নফসের-ই ধোঁকা। শেষ পর্যন্ত নফসের গোলামী করে সে তার ভাইকে হত্যা করে。

নফস কী-না করতে পারে, যদি তা লাগাম ছাড়া হয়! পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম হত্যা যজ্ঞ নফসের তাড়নায় সংঘটিত হয়। আর এই নফসের কারণেই, আজ অবধি যতো হত্যার ঘটনা ঘটবে, প্রত্যেক হত্যার পাপের একটা অংশ কাবিলের নামেও যাবে। যদিও শয়তান ছিল সেখানে পরামর্শদাতা, তবে সব কিছু বাস্তবায়ন করেছে কাবিলের নফস। একটা লাগামহীন নফস, কাবিলকে দিয়ে হত্যার সূচনা করে। একটি পাপ কাজের সূচনা করে। এখন এই লাগামহীন নফস আমাদের দিয়ে কোন পাপ কাজের সূচনা করবে না—তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে? না, নেই। তা এখনো বলবৎ আছে। এখনো এরকম অনেক পাপ কাজের সূচনা হচ্ছে, যা মূলত শয়তানের পরামর্শ আর নফসের বাস্তবায়নে হয়। এখন আপনি আমি যদি, নফসের উপর লাগাম না দিই, তাহলে আমাদের দ্বারাও নতুন নতুন পাপ কাজের সূচনা হবে। আর সেই পাপ কাজ এ-পৃথিবীতে যতদিন সংঘটিত হবে, সেই পাপ কাজের একটা গোনাহের অংশ আপনার আমার কাঁধেও যাবে। তাই, সময় থাকতে আমাদের প্রত্যেকের উচিত নফসের উপর লাগাম দেওয়া; নফসের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া。

টিকাঃ
১১. আল বিদায়া ওয়ান নিয়াহা সূত্রে মুসনাদে আহমদ, ১২. সূরা মায়িদা, আয়াত- ৩০

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ধোঁকায় আযীযের স্ত্রী জুলাইখার পদস্খলন

📄 নফসের ধোঁকায় আযীযের স্ত্রী জুলাইখার পদস্খলন


বিনা অপরাধে ইউসুফ আ.-কে কারাবদ্ধ হয়ে থাকতে হয় বেশ কিছুদিন। মাঝখানে এক বাদশাহ ইউসুফ আ.-এর করা স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও তদবির শুনে মুগ্ধ হয়ে যান এবং তিনি অনুমান করেন যে, এই ব্যক্তি যাকে বেশ কিছুদিন থেকে জেলে রাখা হয়েছে, তিনি অসাধারণ জ্ঞান, মর্যাদা ও উচ্চ যোগ্যতার অধিকারী। সুতরাং বাদশাহ তাকে দরবারে উপস্থিত করার জন্য আদেশ দিলেন。

কিন্তু, ইউসুফ আ. এভাবে কারামুক্ত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। কেননা, ইউসুফ আ. যখন দেখলেন - বাদশাহ সম্মান দিতে প্রস্তুত, তখন তিনি এইভাবে শুধু অনুগ্রহের পাত্র হয়ে জেল থেকে বের হওয়া পছন্দ করলেন না; বরং, আপন চরিত্রকে উচ্চ এবং নিজের পবিত্রতাকে সাব্যস্ত করাকে প্রাধান্য দিলেন, যাতে পৃথিবীর সামনে তার নির্মল চরিত্র ও সুউচ্চ মর্যাদা পরিস্ফুটিত হয়ে যায়। ইউসুফ আ.-এর দাবি-আমি নির্দোষ এটা প্রমাণ হতে হবে, এবং ঐ মহিলাকে তা অকপটে স্বীকার করতে হবে যে, সে নিজেই অপরাধী。

বাদশাহ, ইউসুফ আ.-এর এই বক্তব্য শুনে, ঐ মহিলাদের জিজ্ঞেস করলে, প্রত্যেকেই ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতার কথা স্বীকার করল। এখন আযীযের স্ত্রী জুলাইখারও এই কথা স্বীকার করা ছাড়া কোনো উপায় থাকল না। সে স্বীকার করল যে, "ইউসুফ নির্দোষ এবং প্রেমের পয়গাম আমার পক্ষ থেকেই ছিল। ইউসুফের এই ত্রুটির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।"

সে আরো বললো-আমি নিজেকে দোষমুক্ত মনে করি না; কেননা, নফস তো মন্দ কাজে প্ররোচিত করতেই থাকে। অর্থাৎ, আযীযের স্ত্রী'র বক্তব্য- আমাকে আমার নফস তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। নফসের প্রতারণায় পড়ে আমি ইউসুফকে আমার ফাঁদে ফেলার ইচ্ছে করেছিলাম। কিন্তু সে আমার ফাঁদে পড়েনি। আমার নফস আমাকে এই খারাপ কাজে অগ্রসর করেছে。

এবার আসি মূল আলোচনায়। এই ঘটনার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করলাম এটা জানানোর জন্য যে, জুলাইখাও কিন্তু নফসের ধোঁকায় পড়ে এই কান্ড ঘটিয়েছিলো। নফসের প্রতারণায় সে ইউসুফ আ.-কে তার প্রতি ফুঁসলিয়েছে। আর তার এই নফস ছিল লাগাম ছাড়া, নফসে আম্মারা। যদি তার নফস লাগামহীন না হতো, তাহলে কখনোই সে এই অসামাজিক অশালীন কান্ড ঘটাত না। এটাই কুরআন পাকে বর্ণিত হয়েছে—

وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةُ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ

জুলাইখার বক্তব্য: আমি নিজেকে দোষমুক্ত মনে করি না, কেননা মানুষের নফস তো খারাপ কর্ম-প্রবন。

অতএব, আমাদের নফস যদি লাগামহীন হয়ে যায়, তাহলে সে কাউকে ছাড় দিবে না, তাই, আমাদের উচিত সময় থাকতে নফসকে নিয়ন্ত্রণ আনা। সময় থাকতে তাকে লাগাম পড়ানো। সময় থাকতে তাকে শেকলবন্দি করা।

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ধোঁকায় অপবাদ রটানো

📄 নফসের ধোঁকায় অপবাদ রটানো


নফসের গোলামী করার আরেকটি ক্ষতি হচ্ছে-সে আপনাকে অপবাদকারী রুপে ব্যবহার করবে। নফস যদি লাগামহীন হয়ে যায়, তখন তার চোখে আলোকে অন্ধকার, আর অন্ধকারকে মনে হয় আলো। মিষ্টি'কে মনে হয় তিক্ত, আর তিক্তকে মনে হয় মিষ্টি। সাদাকে মনে হয় কালো, আর কালোকে মনে হয় সাদা! মোটকথা, তার অন্তর্দৃষ্টি সঠিক বিষয়টা অনুধাবন করতে পারে না। ফলে সে সতী-সাধ্বী নারীদের উপর অপবাদ আরোপ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করে না। তার কাছে সবাই নিকৃষ্ট, সবাই খারাপ। আর এটা হয়, নফসের ত্রুটি বিচ্যুতির কারণেই। সে অশ্লীল পাপাচারে লিপ্ত থেকে তার নফসকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে-এখন দুনিয়ার সবাইকেই তার নিজের মত মনে হয়। মনে হয় সবাই খারাপ, সবাই পাপাচারে লিপ্ত, সকলেই তার মতো কোনো না কোনো গর্হিত কাজে নিয়োজিত。

নফস যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তখন পাপাচারে লিপ্ত হয়ে একদম কুলুষিত হয়ে যায়। ফলে তার অন্তর্দৃষ্টি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, সর্বদাই সতী-সাধ্বী নারীদেরকে অপবাদে সিদ্ধহস্ত। সব সময় সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখে। প্রকৃত বিষয়টি যাচাই-বাছাই না করেই, যে-কারো উপর মিথ্যে অপবাদ আরোপ করে。

সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই নিন্দনীয় এবং দণ্ডনীয়। ইসলামে নারীর মর্যাদা অন্য যে-কোনো ধর্মের চেয়ে বেশি। অমুসলিম বিশিষ্ট নারীরাও এ কথা স্বীকার করেছেন। দুনিয়ার সব সমাজেই নারীর মর্যাদা ক্ষুন্ন করার ক্ষেত্রে অপবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইসলামে অপবাদ সৃষ্টি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদের যে-কোনো প্রবণতার বিরুদ্ধে ইসলাম কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে। কেউ যাতে তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনায় সাহসী না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করতে পবিত্র কুরআনুল কারিমে মহান আল্লাহপাক ঘোষণা করেন...

إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

অনুবাদ : 'যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ মু'মিন নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে গুরুতর শাস্তি।'১৩

উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহপাক সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন— কোনো সতী-সাধ্বী নারীর ওপর ব্যভিচার ও অশ্লীলতার অপবাদ আরোপকারী ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত, তার জন্য গুরুতর শাস্তি অপেক্ষমাণ। দুনিয়াতেও তাকে শাস্তি পেতে হবে。

আর তাছাড়া, সতী-সাধ্বী নারীর ওপর অপবাদ দেওয়া সমাজভুক্ত মানুষের সুসম্পর্ক নষ্ট করে। সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য সৃষ্টির মদদ জোগায়- এ- ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রবণতা。

জাহেলি যুগের আরব অধিবাসীরা একে অপরের বিরুদ্ধে অপবাদ সৃষ্টি এবং সংঘাতে মদদ জুগিয়ে আনন্দ পেত। ইসলামে এ- ধরনের কর্মকাণ্ডকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে。

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও দেখা যায়, সাধারণত অজ্ঞ এবং কুচক্রী লোকজনই অপরের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ায়। অযৌক্তিকভাবে তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কারোর চরিত্র সম্পর্ক প্রশ্ন তোলা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে তা কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ঘোষণা করা হয়েছে。

সতী-সাধ্বী নারীদের ওপর মিথ্যা অপবাদ রটানোর প্রবণতা পূর্বেই ছিলো। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর ওপরও অপবাদ রটানো হয়েছে。

যাহোক, নারীদের চরিত্রের ওপর অপবাদ রটনাকারীরা কী পরিমাণে অভিশপ্ত, তা বোঝানোর জন্য একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি। রাসূল সা. বলেছেন...

সাতটি ধ্বংসকারী পাপ থেকে তোমরা বেঁচে থাক। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, সা. ঐ গুলো কী? উত্তরে তিনি বললেন, ঐগুলো হলো- আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করা এবং সতী-সাধ্বী, সরল মুমিনা স্ত্রী লোকের ওপর অপবাদ আরোপ করা。

টিকাঃ
১৩. সূরা আননূর-২৩
১৪. ফাতহুল কারী ৫/৪৬২ মুসলিম ১/৯২, উদ্ধৃত: তাফসীরে ইবনে কাসীর।

ফন্ট সাইজ
15px
17px