📄 নফসের চিকিৎসা করুন, নয়তো পচন ধরবে
নোংরা পচা জিনিসের দুর্গন্ধ আমরা সহ্য করতে পারি না, আমরা কখনো দুর্গন্ধের ধারে কাছেও যাই না। সব সময় নোংরা-পচা জিনিস থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি। কেননা, নোংরা-পচা দুর্গন্ধময় জিনিস থেকে আমাদের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে যেতে পারে। এজন্য, অপারগ হয়ে কখনো যদি নোংরা-পচা জিনিসকে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে হয়, অথবা নিজের অজান্তে পচা দুর্গন্ধময় জিনিস আমাদের গায়ে লেগে যায়, তখন কোনো ধরনের কালবিলম্ব ছাড়াই, দ্রুত ওই জায়গা ধোয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। যতক্ষণ না ধৌত করছি, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বস্তি মিলে না। কারণ, নোংরা-পচা জিনিসই রোগজীবাণুর কারখানা। এটা যদি আমাদের গায়ে লেগে যায়, তখন ধৌত না করলে এটার প্রভাব আমাদের সারা শরীরে বিস্তার করবে। ফলে, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
বাহ্যিক পচা দুর্গন্ধময় ময়লা আবর্জনা থেকে তো নিজেকে অনেকবার দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। কখনো কি নিজের দুর্গন্ধময় নফস থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন? না, আমরা কেউ করি না, আর এটা সম্ভবও নয়। কারণ, নফস আমাদের সাথেই রয়েছে। তার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অসম্ভব। তবে, নফসের ময়লা-আবর্জনা, দুর্গন্ধ দূর করার উপকরণ রয়েছে বহু। আমরা চেষ্টা করলেই পারব, নফসের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি, যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা দূর করে নিজেকে পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ করতে।
এখন হয়তো আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—নফস আবার দুর্গন্ধময় হয় কীভাবে? আরে, নফস যখন এত বেশি গোনাহ করে, গোনাহ করতে করতে এক পর্যায়ে সে লাগামহীন হয়ে যায়, তখন তার কাছে কোনো গোনাহ আর গোনাহ মনে হয় না। কোনো পাপ আর তার দৃষ্টিতে পাপ মনে হয় না। সর্বদা খারাপ কাজ করেও সে অনুতপ্ত হয় না—তখন বুঝে নিবেন, ঐ নফস অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে পাপ কাজ করতে করতে নিজেকে জখম করে ফেলেছে।
আমরা জানি, যে-কোনো অসুস্থ বস্তুর চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। তাই, আমাদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে গোনাহ হওয়ার পরও যখন গোনাহ মনে হয়নি, তখন উচিত ছিল, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করা। আত্মশুদ্ধি করে তার জখম দূর করা। কিন্তু, আমরা তা করিনি। তাকে তার মতো ছেড়ে দিয়েছি। ফলে, নফস ধীরে ধীরে তার সুস্থতা হারিয়ে অসুস্থ পথে হেঁটেছে। সে যে ফিতরাতে ছিলো, তা পরিবর্তন হয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।
আচ্ছা, জখমের স্থান চিকিৎসা না করে এমনি এমনি ছেড়ে দিলে, কখনো কি জখম দূর হবে? নাকি উক্ত স্থানে পচন ধরে দিন দিন দুর্গন্ধ ছড়াবে? অবশ্যই দুর্গন্ধ ছড়াবে। আমরা যখন কোনো জখমের স্থান চিকিৎসা না করে এমনি এমনি রেখে দিই, তখন ধীরে ধীরে জখমের স্থানে পচন ধরে। আর যখন তাতে পচন ধরে, তখন তা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
ঠিক আমাদের নফসের ক্ষেত্রে এরকমই। গোনাহের কাজ করলে নফস কখনো সতেজ হয় না; উল্টো তা অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর যখন নফস অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন গোনাহের কাজ করলেও আর গোনাহ মনে হয় না। এরকমটা অনেকের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। তাই, যখন দেখবেন গোনাহ করার পরও আর গোনাহ মনে হচ্ছে না, তখন বুঝে নিবেন-নফস আক্রান্ত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায়, তাৎক্ষণিক নফসের চিকিৎসার সুব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো, কিছু দিন পর তা পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াবে; যদিও তা অনুভূত হবে না।
📄 শেকলেবন্দি—আমার কাছে নফস, নাকি নফসের কাছে আমি?
কতজন-ই তো বলে—আমি তাহাজ্জুদে উঠতে পারি না, তাহাজ্জুদে মন ফিরাতে পারি না। ফজরে উঠতে পারি না, জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে পারি না। যাকাত দিতে পারি না। সময়ে অসময়ে মিথ্যার আশ্রয় নিই। গীবত থেকে নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখতে পারি না। পরনিন্দা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারি না। বেগানা নারী থেকে নজর ফেরাতে পারি না। ভালো কিছু করতে গেলেই যেন, ভিতর থেকে এক ধরনের বাধা আসে। মনে হয় সৎ কাজ থেকে দূরে রাখতে, কেউ আমাকে শেকলবন্দি করেছে। মনে হয়-আমার আর নেক আমলের মধ্যে কেউ একজন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি এক-পা দু-পা করে এগিয়ে যাই-সৎ কাজের উদ্দেশ্যে! তখনই মনে হয়, পেছন থেকে কেউ আমার পা ধরে টানছে। ভেতর থেকে কেউ একজন তাকে সাহায্য করছে। ভেতর থেকে ক্রমাগত বাধা-বিপত্তি আসছে।
আমি অশ্লীল খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে চাই! হারাম থেকে বেঁচে থাকতে চাই। গীবত ও পরনিন্দা থেকে নিজের জবানকে হেফাজত রাখতে চাই। নারীর ছলনা থেকে মুক্ত থাকতে চাই। যখনই এগুলো থেকে পরিপূর্ণভাবে সরে আসতে চাই, তখনই মনে হয়—কেউ একজন আমাকে জোর করে এগুলোর মধ্যে নিক্ষেপ করছে। মনে হয়, কেউ একজন পেছন থেকে তাড়াচ্ছে। ভেতর থেকে বারবার ফুসলিয়ে দিচ্ছে। বারবার মনে হয়—তার কাছে আমি পরাজিত। তার গোলামিতে সিদ্ধহস্ত। আমি জানতে চাই, কে সে? কে আমাকে এভাবে ঘোরাচ্ছে? আমি জানতে চাই, কে আমার কাছ থেকে জান্নাতের চাবি কেড়ে নিয়ে, জাহান্নামের তালা খুলছে? সে আর কেউ নয়; সে তো শয়তানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লাগামহীন নফস।
আজ নফস আপনাকে জোর করে পাপ কাজে ঠেলে দিচ্ছে। নফস আপনার জবান দিয়ে অশালীন কথাবার্তা বের করছে। নফস আপনাকে শেকলবন্দি করেছে। নফস আপনাকে সৎকাজ থেকে বিরত রাখছে। আর আপনি নফসের গোলামী করে তাকে মনিব বানিয়েছেন। ফলে সে আপনাকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই ঘোরাচ্ছে। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করছে। আর আপনি তার দাসত্ব করেই যাচ্ছেন। উচিত ছিল, আপনি নফসকে শেকলবন্দি করবেন। কিন্তু উল্টো, সে আপনাকে শেকলবন্দি করেছে। যার কারণে, আপনি নামাজ থেকে দূরে; নেক কাজ থেকে বিরত। পাপ কাজে জড়িত; পাপের সাগরে ডুবন্ত।
যারা বলে, পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারি না, ইবাদতে মন বসাতে পারি না, তারাই সেই লোক—যাদের শেকলবন্দি করেছে, নিজের মধ্যে লালন করা ভয়ংকর নফস। তাই, কেউ যদি নফসকে শেকলবন্দি না করে, উল্টো তার কাছে শেকলবন্দি হয়ে যায়, তখন সে আর পাপের সমুদ্র থেকে বের হতে পারে না।
📄 নফসের ব্যাপারে সতর্ক হোন
নফসের ওপর কখনো আস্থা রাখবেন না। নফস খুবই ভয়ঙ্কর। যখন তখন আপনাকে ধোঁকায় ফেলে তার মনোবৃত্তি পূরণ করতে পারে। তাই, আশঙ্কাজনক কোনো ক্ষেত্র থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করুন। কেননা, নফস হচ্ছে ক্ষুধার্ত বিড়ালের ন্যায়। বিড়াল যেমনি-ভাবে দুধ দেখলেই তাতে মুখ দিয়ে দেয়, ঠিক তদ্রুপ নফস যদি আশঙ্কাজনক স্থানে থাকে তবে সেখানে কোনো কিছু ঘটাবেই। তাই, নিজেকে যথাসম্ভব আশঙ্কাজনক ক্ষেত্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করুন। নয়তো নফসের তাড়নায় জড়িয়ে পড়তে পারেন, বড় কোনো অপরাধে।
হযরত ওমর রাযি. নিজের নফসকে বিশ্বাস করতেন না। তিনি নফসকে অনেক বড় শত্রু মনে করতেন। নফস কখন কী করে বসে—এই ভেবে নিজেকে হেফাজত রাখার চেষ্টা করতেন।
একবার, হযরত ওমর রাযি. বাহিরে শুয়ে আছেন। শীতের মৌসুম। প্রচন্ড শীত। ওপরে কোন ছাউনি নেই। তবু তিনি কষ্ট করে বাহিরে শুয়ে আছেন। তখন একজন সাহাবী তাকে দেখতে পেলেন। হযরত ওমরকে বাহিরে শুয়ে থাকতে দেখে হতবাক হয়ে গেলেন—একজন আমিরুল মু'মিনিন এই শীতের রাতে বাহিরে শুয়ে আছে! ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন ওমরের কাছে। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন,' হে আমিরুল মু'মিনিন! এই শীতে আপনি বাহিরে শুয়ে আছেন কেন?' তিনি জবাবে বললেন,' আমি আমার নফসকে অনেক ভয় করি। তার ওপর আমার মোটেও আস্থা নেই। সে আমার অনেক বড় শত্রু। নফসের প্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্য, আমি বাহিরে শুয়ে আছি। কারণ, হুযুর সা.-এর স্ত্রী, আমার কন্যা হাফসা আজ বাড়িতে এসেছে। আর আমার বাড়ি হচ্ছে এক রুম বিশিষ্ট।
যে ঘরে আমার কন্যা ঘুমিয়ে আছে, সেখানে আমি থাকতে পারি না। কারণ, আমি আমার নফসকে বিশ্বাস করি না। তাই আমি বাহিরে শুয়ে আছি।
দেখুন, একজন জান্নাতি সাহাবী স্বীয় নফসের ব্যাপারে কতটা সতর্ক ছিলেন। আর আজকাল আমরা?
📄 এই গোনাহের পিছনে ইন্ধনদাতা কে?
নফস হচ্ছে বিড়ালের মতো। বিড়াল যখন কোনো কিছু খেতে আসে, তখন সাধারণত আমরা তাকে তাড়িয়ে দিই। যখন আমরা তাকে তাড়িয়ে দিই তখন সে চলে যায়। তবে যাবার সময় পেছন ফিরে বেশ কয়েকবার তাকায়। কয়েকবার থমকে দাঁড়ায়। আবার সে খাবারের কাছে আসতে চায়। এভাবে থমকে থমকে, পেছন ফিরতে ফিরতে সেখান থেকে চলে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার খাবারের সন্নিকটে আসে। ওই খাবারে আবার মুখ দিতে চায়। ঠিক তখনই আপনি যখন আবার তাকে তাড়িয়ে দিবেন, সে দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর আপনার অগোচরে আবার খেতে আসবে। আপনি তাকে আবার তাড়িয়ে দিবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত এই খাবারটা আপনি তার নাগালের বাইরে না নিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত বেহায়ার মত বারবার ওই খাবারের কাছে যাবেই।
আমাদের নফস ঠিক সেই বিড়ালের মত বেহায়া। সে বারবার তার মনের চাহিদাকে পূরণ করতে চায়। যতক্ষণ পর্যন্ত নফসের উপর লাগাম না দিবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার কৃতকর্ম থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। বেহায়ার মত অশ্লীলতার দিকে ছুটেই চলবে। যতই বাধা দিবেন, ততই সেদিকে যাবে।
উঠতে-বসতে চলতে-ফিরতে নানান সময়, নানান গোনাহ আমাদের দ্বারা সংঘটিত হয়। কোনো গোনাহ শয়তানের প্ররোচনায়, আবার কোনো গোনাহ নফসের প্ররোচনায়। আবার কোনো কোনো গোনাহ উভয়ের ওয়াসওয়াসায় সংঘটিত হয়। আমরা গোনাহ করি, কিন্তু বুঝতে পারি না—গোনাহের পিছনে কার হাত রয়েছে? এই গোনাহের পেছনে কে ওয়াসওয়াসা দিয়েছে—শয়তান, নাকি নফস। আমরা যখন বুঝতে পারি না—আমরা কার দ্বারা প্রভাবিত। তাই এর সঠিক ট্রিটমেন্টও করতে পারি না।
আসুন জেনে নিই, নফস এবং শয়তানের কৃত প্ররোচনার ধরন...
আপনি রাস্তায় বের হয়েছেন। আপনার সামনে দিয়ে একজন বেপর্দা বেগানা নারী হেলে-দুলে হেঁটে যাচ্ছে। প্রথমবার তার দিকে চোখ পড়েছে। এটা শরীয়তে মাফ। প্রথমবার দেখার পর পরই আপনি তার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। এবার নফস এবং শয়তানের খেলমা দেখুন। আপনি ওই মেয়ে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছেন। এবার আপনার মনে যদি এটা উদয় হয়—বাসায় গিয়ে মোবাইলে অশ্লীল ভিডিও দেখবো। বাসায় গিয়ে আকাম-কুকাম করবো। এরকম যদি মনে মনে উদয় হয়, তখন বুঝে নিবেন এগুলোর পেছনে ইন্ধনদাতা হচ্ছে শয়তান। অপরদিকে আপনি ওই মেয়ের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন, আপনি ভাবছেন আর দেখব না, চোখ নিচে নামিয়ে হেঁটে চলে যাব। কিন্তু আপনার ভেতর থেকে ওয়াসওয়াসা আসছে— দেখ, একবার দেখ, একবার দেখলে কিছুই হবে না; বরং মজা পাবি। আপনি বারবার বারণ করছেন, কিন্তু ভেতর থেকে বারবার ওয়াসওয়াসা আসছে—"দেখ দেখ, আবার দেখ, কত সুন্দর মেয়ে, তাড়াতাড়ি দেখ না! নয়তো চলে যাবে।" যদি এরকম হয় তবে আশরাফ আলী তানুভি রহি. বলেন— বুঝে নিবেন, এই গোনাহের পিছনে ইন্ধনদাতা হচ্ছে বেহায়া নফস। বেহায়া এ কারণে যে, আপনি বারবার বারণ করেছেন—"দেখবো না, দেখবো না; এতে আমার পাপ হবে, এর কারণে আমার চোখে গরম সিসা ঢালা হবে।" এতবার বারণ করার পরও সে ওই বেগানা নারী দেখে মনোবৃত্তি পূরণ করল। এজন্যই নফসকে বলা হয়, বিড়ালের মত বেহায়া।