📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 মোকাবেলা

📄 মোকাবেলা


কারাবন্দী দু'জন অপরাধী কখনো একজন আরেকজনের জামিন হতে পারে না। কেননা, দুজনই কারাবন্দি। বন্দিশালায় অবস্থান করে একজন আরেকজনের জামিন হওয়া দুষ্কর ব্যাপার। এজন্য, জামিন হতে হলে বাইরের কাউকে প্রয়োজন হবে; মুক্ত-স্বাধীন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন হবে, যে-কিনা জামিন হয়ে তাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবে। একজন অপরাধী • যেমনি-ভাবে আরেকজন অপরাধীকে কারামুক্ত করতে পারে না, ঠিক তদ্রুপ নিজের ভিতরে নফসে আম্মারাকে লালন করে, নিজেকে পরিশুদ্ধ করা যাবে না; তার বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করা যাবে না। লাগামহীন নফসকে নিজের মধ্যে পুষে কখনো নিজেকে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা যাবে না। কেননা, সে নিজেই অপরাধী, সে নিজেই পাপের দিকে আমাদের ধাবিত করে।

তো যেটা বলছিলাম—আমরা যদি নিজেদের মধ্যে শুধুমাত্র আম্মারার গুণাবলী লালন করি, তখন এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হবে। কারণ, সে নিজেই অপরাধী। তাই, আমাদের উচিত ভালো একজন প্রতিপক্ষ তার সামনে দাঁড় করানো। একজন অপরাধীকে কারামুক্ত করার জন্য যেমনি-ভাবে একজন ভালো উকিলের প্রয়োজন হয়, তেমনি আমাদের নফসে আম্মারা'র বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হলে আম্মারা'র সম্মুখে একজন ভালো প্রতিপক্ষ দাঁড় করাতে হবে। আর সে প্রতিপক্ষ হচ্ছে নফসে মুত্বমায়িন্নাহ। যখন আপনি আম্মারা'র সামনে মুত্বমায়িন্নাকে দাঁড় করিয়ে দিবেন, তখন একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আম্মারা'র প্রতিপক্ষ মুত্বমায়িন্নাহ আর মুত্বমায়িন্নার প্রতিপক্ষ হচ্ছে আম্মারা। প্রতিপক্ষ তখনই দাঁড় করাতে পারবেন, যখন নিজের মধ্যে মুত্বমায়িন্নাকে নিজের মধ্যে লালন করতে পারবেন। মুত্বমায়িন্নাকে লালন করতে পারলেই সে তখন আম্মারা'র সাথে মোকাবেলা করতে পারবে।

প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত, উত্তম পরিকল্পনা ও কঠোর শ্রম -এর প্রয়োজন হয়-তবেই উক্ত প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া যায়। তো, নফসে আম্মারা এবং নফসে মুত্বমায়িন্নাহ-এর প্রতিযোগিতাও এরকমই হবে। আপনি আমি অবশ্যই চাইবো নফসে আম্মারা'র উপর নফসে মুত্বমাইয়িন্নাহ বিজয়ী হোক। তাই, যেহেতু আমাদের লক্ষ্য বিজয়ী হওয়া, সেহেতু সঠিক সিদ্ধান্ত, উত্তম পরিকল্পনা, এবং কঠোর শ্রম তো দিতেই হবে।

যেহেতু নফসে আম্মারা শুধুমাত্র আমাদের ক্ষতি সাধন করে, সেহেতু তার বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অতঃপর, কীভাবে নফসে আম্মারা'র কার্যাবলী উৎখাত করা যায়, সেজন্য উত্তম পরিকল্পনা করতে হবে। অতঃপর, কিছু দুঃখ কষ্ট বহন করে, সেভাবেই নফসে আম্মারা'র বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হবে।

সাধারণত যখন আম্মারা আপনাকে আমাকে খারাপ কাজের দিকে ধাবিত করতে চায়, তখন মুত্বমায়িন্না এসে বাধা প্রদান করে। আম্মারা বলে যা সিনেমা দেখে আয়; মজা পাবি। তখন মুত্বমায়িন্নাহ বলে, না! যাস না, এটা খুবই গর্হিত একটি কাজ, এই কাজের দরুন তোকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। ঠিক তেমনি-ভাবে মুত্বমায়িন্নাহ যখন নামাজ পড়ার তাগিদ দেয়, তখন আম্মারা এসে বলে, আরে, এত আরামের ঘুম রেখে নামাজ পড়ার কী দরকার? নামাজ পড়তে হবে না, ঘুমিয়ে থাক।

এটাই হচ্ছে মুত্বমায়িন্নাহ এবং আম্মারা'র মোকাবেলা। যাকে বলা হয়- কারাবন্দি এবং মুক্ত স্বাধীনের মোকাবেলা। এ মোকাবেলায় সে-ই বিজয়ী হবে, যে প্রতিপক্ষ হিসেবে মজবুত। এজন্য, আপনি আমি যদি নফসে আম্মারা'র উপর, নফসে মুত্বমায়িন্নাকে বিজয়ী করতে চাই, তবে নফসে মুত্বমায়িন্নাকে সেরকম মজবুত করেই রাখতে হবে। যদি সে দুর্বল হয়, তবে সে আম্মারা'র কাছে পরাজিত হয়ে যাবে। তখন আম্মারা আপনাকে আমাকে ব্যবহার করে শুধু খারাপ কাজই করাবে। তবে, মুত্বমায়িন্নাকে যদি মজবুত ভাবে তার সামনে দাঁড় করানো যায়, তখন সে পরাজয় বহন করতে বাধ্য। এজন্য আম্মারা'র বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হলে, আমাদের সর্বপ্রথম মুত্বমায়িন্নাকে মজবুত করতে হবে। অতঃপর আম্মারা'র সামনে তাকে দাঁড় করাতে হবে।

একটা কথা না-বললেই নয়-মানুষের ফিতরাত হচ্ছে, প্রশান্ত আত্মা (ভালো নফস)। সুতরাং, নফসে মুত্বমায়িন্নাহ সবার মধ্যেই বিদ্যমান। কিন্তু, নফসের ওপর লাগাম না থাকায়, তার ব্যাপারে উদাসীন থাকায়, নফস তার ফিতরাতের গন্ডি পেরিয়ে আম্মারায় পরিণত হয়ে যায়।

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের খোরাক, রূহের খোরাক

📄 নফসের খোরাক, রূহের খোরাক


যখনই আমাদের গোনাহ-এর পাল্লা ভারী হয়ে যায়, তখন নফস ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয় বটে, তবে আমাদের রুহ দূর্বল হয়ে পড়ে। গোনাহের কারণে রুহ তার সজীবতা হারিয়ে ফেলে। রুহ অসুস্থ হয়ে পড়ে—যাকে আমরা রুহানি বেমার বলে থাকি। রুহানি বেমার এমনি এমনি হয় না; তা গোনাহের কারণেই হয়ে থাকে।

নফসের প্রধান হাতিয়ার হলো, শরীর। শরীর আর রুহ একটি অপরটির সম্পূর্ণ বিপরীত। যেমন: যে-সব কাজের দ্বারা শরীর দুর্বল হয়ে যায়, সে-সব কাজের দ্বারা রুহ শক্তিশালী হয়। আর যে-সব কাজের দ্বারা রুহ শক্তিশালী হয়, সে-সব কাজের দ্বারা শরীর দূর্বল হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে—সাধারণত রোজা রাখলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়, কিন্তু রোজার দ্বারা আমাদের রুহ শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিও বেশি খাবারের দ্বারা আমাদের শরীর শক্তিশালী হয়, কিন্তু বেশি খাবারের দ্বারা রুহ দুর্বল হয়ে পড়ে।

আমরা নফসের ক্ষুধা ঠিকই নিবারণ করছি; রুহের ক্ষুধা নয়। নফসকে নিয়মিত খাবার দিচ্ছি; কিন্তু রুহকে নয়। এতে করে দিন দিন নফস সবল হয়ে যাচ্ছে; অপরদিকে রুহ দূর্বল হয়ে পড়ছে। খাবারের অভাবে একজন সুস্থ সবল মানুষ যেমনি-ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি রুহের খাবারের ব্যবস্থা না করলে, রুহও দুর্বল হয়ে পড়ে।

নফসের খাবার হচ্ছে—শাহওয়াতে নফসানিয়্যাহ (মনের কুপবৃত্তি) খারাপ কাজ। অপরদিকে রুহের খাবার হচ্ছে—নেক কাজ। আপনি যত বেশি নেক কাজ করবেন, রুহ তত বেশি সতেজ হয়ে উঠবে। অপরদিকে, আপনি যত বেশি বদকাজ করবেন, নফস ততবেশি সতেজ হয়ে উঠবে। আর নফস সতেজ হলে তার বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করা, খুবই কষ্টকর।

রুহকে সতেজ করতে হলে আমাদেরকে বেশি বেশি জিকির করতে হবে। কেননা, জিকির হলো রুহের খোরাক। পক্ষান্তরে, নফসকে দমিয়ে রাখার জন্য আমাদেরকে বেশি বেশি রোজা রাখতে হবে। কেননা, রোজা নফসকে দূর্বল করতে অগাধ ভূমিকা রাখে। তাই, আমাদের উচিত সবসময় রুহকে সতেজ রাখা। আর রুহকে সতেজ রাখতে হলে বেশি বেশি নেক কাজ তো করতেই হবে। যখন আপনার রুহ পরিপূর্ণভাবে সতেজ হয়ে যাবে, তখন সেখানে নফস, তার নেতৃত্ব হারাবে। নফস কখনোই আপনার মাঝে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। আর যখন নফস প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না, তখন বদকাজের চিন্তা-ভাবনা এমনি দূরিভূত হয়ে যাবে।

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের হাতিয়ার

📄 নফসের হাতিয়ার


নফস মানুষের দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মত নয়; তার রয়েছে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। সাধারণত, আমাদের দেহে যতগুলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, তার প্রত্যেকটি নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আর তাদের ভূমিকা পালন করতে সহায়তা করছে, নফস। নফসের রয়েছে অনুভূতি শক্তি, সে সব কিছু অনুভব করতে পারে। তার রয়েছে কল্পনা শক্তি, সে সব কিছু কল্পনা করতে পারে। তার রয়েছে যে-কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়ার শক্তি। সেই সুবাদে সে যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে থাকে। যেমন: নফস যখন লাগামহীন হয়ে যায়, তখন সে সিদ্ধান্ত নেয় চুরি করবে, সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করণার্থে তখন দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে থাকে। এটা এভাবে যে-চুরি করার জন্য অবশ্যই তাকে ওই স্থানে যেতে হবে-যেখানে সে চুরি করবে। এজন্য তাঁকে হেঁটে হেঁটে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। এক্ষেত্রে প্রথমত সে 'পা'-কে ব্যবহার করে। অতঃপর রাস্তা চিনে যাওয়ার জন্য 'চোখ'-কে ব্যবহার করে। এমনি-ভাবে হাত-সহ আরো কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে সে তার কৃত-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।

মোটকথা, নফস হলো রাজা, আর দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হচ্ছে তার সিপাহী। নফস হচ্ছে মালিক, আর অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হচ্ছে তার শ্রমিক। মালিক যা আদেশ করে শ্রমিক তা-ই করে। শ্রমিক আদেশ পাওয়ার পর ভেবে দেখে না-কোনটা তার মালিকের জন্য ভালো, আর কোনটা খারাপ। আদেশ পাওয়ার পর সাথে সাথে তা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে, আমাদের দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোনো ধরনের অনুভূতি শক্তি নেই। নেই কোনো সিদ্ধান্তের শক্তি। অনুভূতি শক্তি তো নফসের এক সতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। নফস তার অনুভূতি শক্তি কাজে লাগিয়ে যে-কোনো সিদ্ধান্তে স্থির হয়। অতঃপর তা বাস্তবায়নে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে।

তাই আমাদের শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা যে-কোনো কাজ করার আগে, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। যাতে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা কোনো গোনাহের কাজ সম্পন্ন না হয়।

আমাদের শরীরের এমন কতক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, যাদের বদৌলতে নফস, তার হীন চরিতার্থ বাস্তবায়ন করে। যাদের সাহায্যে খুব সহজেই তার মনোবৃত্তি পূরণ করে।

ঐ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলা যায়, 'নফসের হাতিয়ার'। নফসের অনেকগুলো হাতিয়ার রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, চোখ।

নফসের সবচে বড় হাতিয়ার হচ্ছে চোখ। নফস চোখকে ব্যবহার করে তার মনোবৃত্তি পূরণ করছে।

নজর হচ্ছে শয়তান এবং নফসের তীর। এর দ্বারা তারা শিকার করে বনি আদমকে। বরবাদ করে বনি আদমের ঈমান ও আমল। ফাঁসিয়ে দেয় পাপের চোরাবালিতে। ডুবিয়ে দেয় পাপের বিষাক্ত সাগরে। নফসের কাছে নজর নামক এই তীর, বনি আদমকে শিকার করার সবচে সহজ অস্ত্র। মানুষ ভাবে, একটু নজরই তো! ব্যস! কিন্তু কখনো কখনো এক নজরেই কুপোকাত হয়ে যায় মানুষের হৃদয়-মন।

কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাআলা তার নিয়ামতরাজি সম্পর্কে আপনাকে আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তখন আপনার আমার উত্তর কী হবে? যখন জিজ্ঞেস করবেন,'আমি তোকে চক্ষু দিয়েছিলাম, তুই তা কোন কাজে ব্যবহার করেছিস?' তখন আপনার আমার উত্তর কী হবে? আমরা কি তা সঠিক পন্থায় ব্যবহার করছি? আমরা কি তার শুকরিয়া আদায় করছি। আমরা কি চোখকে হেফাজত করছি?

কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয় কান, চোখ, হৃদয় এর প্রতিটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (১)

আমাদের সবসময় এ- ভয় করা উচিত—আমি যদি এ চোখ দিয়ে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করি, হারাম জিনিস দেখি, আর আল্লাহ তাআলা আমার এ চোখ অন্ধ করে দেন; ছিনিয়ে নেন দৃষ্টিশক্তি!

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 'আমি চাইলে তাদের চোখ (দৃষ্টিশক্তি) লোপ করে দিতাম। তখন তারা পথ চলতে চাইলে কীভাবে দেখতে পেত!”

সুতরাং, বেশি বেশি দু'আ করা উচিত, হে আল্লাহ! আমাকে রক্ষা কর চোখের যাবতীয় গুনাহ থেকে; সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুনাহ থেকে।

আমরা পথ চলি, আর চোখকে চোর বানিয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্টি প্রসারিত করি। বেগানা নারীদের দেখে নফসের চাহিদা পূরণ করি। আমরা ভাবি— কেউ আমাদের দেখছে না। অথচ, আল্লাহ তাআলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন-"না বান্দা! কেউ দেখছে না; এমন নয়। তোমার সঙ্গে চলতে থাকা মানুষ যদিও দেখছে না; তবে তোমাকে যিনি এ চোখ দান করেছেন, তিনি কিন্তু ঠিক দেখছেন—সেটা মনে রাখা দরকার।

এ-ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:
'তিনি (আল্লাহ) জানেন চোখের চোরাচাহনি এবং সেইসব বিষয়ও, যা বক্ষ-দেশে লুকায়িত।''

আমার চোখ। আমি যদি তা আল্লাহ'র হুকুম মত ব্যবহার না করি, হারাম জিনিস দেখি, তাহলে আমার চোখই কাল কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার দরবারে আমার নামে নালিশ করবে: হে আল্লাহ! সে আমার দ্বারা অমুক পাপ করেছে। অমুক হারাম বস্তুর দিকে তাকিয়েছে।

এ-ব্যাপারে কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, 'তাদের কান, তাদের চোখ, তাদের ত্বক তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষী দিবে তাদের বিরুদ্ধে।

নফস শুধুমাত্র চোখকে ব্যবহার করে, তা কিন্তু নয়; শরীরের অন্যান্য অঙ্গ- প্রত্যঙ্গও ব্যবহার করে থাকে। যেমন: হাত, পা, কান, জবান ইত্যাদি। চোখের ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গোনাহ থেকে কীভাবে বাঁচতে পারি, সে জন্য আমাদের সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে। পাশাপাশি কুরআন-হাদিসে বর্ণিত কার্যকরী কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করলে, আমরা চোখের গোনাহ সহ অন্যান্য গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকতে পারবো।

আসুন, নফসের প্ররোচনায় আমাদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা গোনাহ করার আগে এই কথাগুলো হৃদয়ে গেঁথে নিই...

১. চোখ: চোখ দিয়ে মানুষ দেখে। দেখার ক্ষেত্রে ভালো ও খারাপ দু'টিই দেখার সুযোগ রয়েছে। তাই চোখ দিয়ে খারাপ কোনো কিছু দেখার আগে এই ভাবনা মানুষকে গোনাহ করা থেকে বিরত রাখতে পারে- এই চোখ-ই কেয়ামতের দিন এ-অন্যায়ের ব্যাপারে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।

২. হাত : হাতের উপর নির্ভর করে সে বিভিন্ন খারাপ কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকে। হাত দিয়ে মানুষ কাজ করে। ভালো ও মন্দ উভয় কাজই হাত দ্বারা করা যায়। সুতরাং, হাত দিয়ে খারাপ কোনো কিছু করার আগে এই ভাবনা মানুষকে গোনাহ করা থেকে বিরত রাখতে পারে-এই হাত-ই কেয়ামতের দিন এ- অন্যায়ের ব্যাপারে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।

৩. পা : নফস বিভিন্ন খারাপ কাজের জন্য এই পা'কে ব্যবহার করেই খারাপ কাজগুলো সম্পাদন করে। পা দিয়ে মানুষ চলাফেরা করে। ভালো ও মন্দ উভয় পথেই চলা সম্ভব। তাই, পা দিয়ে খারাপ কোনো কিছুর দিকে ধাবিত হওয়া বা কোনো খারাপ কাজ করার প্রতি এগিয়ে যাওয়ার সময় এই ভাবনা মানুষকে গোনাহ করা থেকে বিরত রাখতে পারে-এই পা-ই কেয়ামতের দিন এ- অন্যায় কাজের দিকে ধাবিত হওয়ার ব্যাপারে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে。

৪. কান: এটা ব্যবহার করে গান-বাজনা, অশ্লীল কথাবার্তা, অন্যের সমালোচনা সহ বিভিন্ন ধরনের খারাপ কাজে নফস তাকে ব্যবহার করে থাকে। কান দিয়ে শোনা যায়। মানুষ চাইলে ভালো কিছু শুনতে পারে, আবার খারাপ কথা কিংবা সংলাপও শুনতে পারে। তাই, কান দিয়ে যদি খারাপ কোনো কিছু শুনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়, তবে এই ভাবনা মানুষকে গোনাহ করা থেকে বিরত রাখতে পারে-এই কান-ই কেয়ামতের দিন মন্দ কিছু শোনার দিকে ধাবিত হওয়ার ব্যাপারে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।

৫. মুখ: এটা দ্বারা মিথ্যা বলা, গালাগালি করা, চোগলখোরী করা; অন্যের গীবত করা সহ আরো বিভিন্ন গোনাহ আঞ্জাম দিতে নফস এই মুখ'কে ব্যবহার করে থাকে। মুখ দিয়ে মানুষ কথা বলে। খাওয়া-দাওয়া করে। এ মুখ দ্বারা যে-সব অন্যায় কাজ সংঘটিত হবে, সে-সব কাজ সেদিন দৃশ্যমান হবে। নিজের বিরুদ্ধে কেয়ামতের ময়দানে সাক্ষ্য দেবে। সুতরাং, মুখ দ্বারা কথা বলার সময়, খাওয়ার সময় এ- চিন্তাই মানুষকে গোনাহের কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে- 'মুখের কথা ও কাজ কেয়ামতের দিন নিজের বিরুদ্ধে দুনিয়ার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে।

সুতরাং, হাত, পা, চোখ, কান, নাক, মুখ ইত্যাদি অঙ্গের দ্বারা যে-কোনো কাজ করার আগে মানুষের জন্য এ- চিন্তা করা খুব বেশি প্রয়োজন- 'আমি যে কাজ করছি, কেয়ামতের দিন এসব অঙ্গই আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে; কাজের বিবরণ দেবে। এ চিন্তা করলেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গোনাহ থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
*সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত – ৩৬
'সূরা ইয়াসীন, আয়াত- ৬৬
*সূরা মুমিন, আয়াত – ১৯
* সূরা হা-মীম সিজদাহ, আয়াত- ২০

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের চিকিৎসা করুন, নয়তো পচন ধরবে

📄 নফসের চিকিৎসা করুন, নয়তো পচন ধরবে


নোংরা পচা জিনিসের দুর্গন্ধ আমরা সহ্য করতে পারি না, আমরা কখনো দুর্গন্ধের ধারে কাছেও যাই না। সব সময় নোংরা-পচা জিনিস থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি। কেননা, নোংরা-পচা দুর্গন্ধময় জিনিস থেকে আমাদের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে যেতে পারে। এজন্য, অপারগ হয়ে কখনো যদি নোংরা-পচা জিনিসকে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে হয়, অথবা নিজের অজান্তে পচা দুর্গন্ধময় জিনিস আমাদের গায়ে লেগে যায়, তখন কোনো ধরনের কালবিলম্ব ছাড়াই, দ্রুত ওই জায়গা ধোয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। যতক্ষণ না ধৌত করছি, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বস্তি মিলে না। কারণ, নোংরা-পচা জিনিসই রোগজীবাণুর কারখানা। এটা যদি আমাদের গায়ে লেগে যায়, তখন ধৌত না করলে এটার প্রভাব আমাদের সারা শরীরে বিস্তার করবে। ফলে, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

বাহ্যিক পচা দুর্গন্ধময় ময়লা আবর্জনা থেকে তো নিজেকে অনেকবার দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। কখনো কি নিজের দুর্গন্ধময় নফস থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন? না, আমরা কেউ করি না, আর এটা সম্ভবও নয়। কারণ, নফস আমাদের সাথেই রয়েছে। তার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অসম্ভব। তবে, নফসের ময়লা-আবর্জনা, দুর্গন্ধ দূর করার উপকরণ রয়েছে বহু। আমরা চেষ্টা করলেই পারব, নফসের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি, যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা দূর করে নিজেকে পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ করতে।

এখন হয়তো আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—নফস আবার দুর্গন্ধময় হয় কীভাবে? আরে, নফস যখন এত বেশি গোনাহ করে, গোনাহ করতে করতে এক পর্যায়ে সে লাগামহীন হয়ে যায়, তখন তার কাছে কোনো গোনাহ আর গোনাহ মনে হয় না। কোনো পাপ আর তার দৃষ্টিতে পাপ মনে হয় না। সর্বদা খারাপ কাজ করেও সে অনুতপ্ত হয় না—তখন বুঝে নিবেন, ঐ নফস অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে পাপ কাজ করতে করতে নিজেকে জখম করে ফেলেছে।

আমরা জানি, যে-কোনো অসুস্থ বস্তুর চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। তাই, আমাদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে গোনাহ হওয়ার পরও যখন গোনাহ মনে হয়নি, তখন উচিত ছিল, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করা। আত্মশুদ্ধি করে তার জখম দূর করা। কিন্তু, আমরা তা করিনি। তাকে তার মতো ছেড়ে দিয়েছি। ফলে, নফস ধীরে ধীরে তার সুস্থতা হারিয়ে অসুস্থ পথে হেঁটেছে। সে যে ফিতরাতে ছিলো, তা পরিবর্তন হয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।

আচ্ছা, জখমের স্থান চিকিৎসা না করে এমনি এমনি ছেড়ে দিলে, কখনো কি জখম দূর হবে? নাকি উক্ত স্থানে পচন ধরে দিন দিন দুর্গন্ধ ছড়াবে? অবশ্যই দুর্গন্ধ ছড়াবে। আমরা যখন কোনো জখমের স্থান চিকিৎসা না করে এমনি এমনি রেখে দিই, তখন ধীরে ধীরে জখমের স্থানে পচন ধরে। আর যখন তাতে পচন ধরে, তখন তা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোটা স্বাভাবিক ব্যাপার।

ঠিক আমাদের নফসের ক্ষেত্রে এরকমই। গোনাহের কাজ করলে নফস কখনো সতেজ হয় না; উল্টো তা অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর যখন নফস অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন গোনাহের কাজ করলেও আর গোনাহ মনে হয় না। এরকমটা অনেকের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। তাই, যখন দেখবেন গোনাহ করার পরও আর গোনাহ মনে হচ্ছে না, তখন বুঝে নিবেন-নফস আক্রান্ত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায়, তাৎক্ষণিক নফসের চিকিৎসার সুব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো, কিছু দিন পর তা পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াবে; যদিও তা অনুভূত হবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px