📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফস ঠিক তো, সব ঠিক

📄 নফস ঠিক তো, সব ঠিক


এক

একটি গাড়ি। তার রয়েছে বিভিন্ন পার্টস। সাথে থাকে তার মূল ইঞ্জিন-যা ছাড়া পুরো গাড়িটাই অস্তিত্বহীন। ইঞ্জিনের উপর নির্ভরশীল গাড়ির পুরোটা বডি। অপরদিকে পুরো গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ করে একজন ড্রাইভার। ড্রাইভার যে-ভাবে চালাবে গাড়িটাও সেভাবেই চলবে। সে যদি আস্তে চালায়, গাড়িটাও আস্তেই চলবে। সে যদি জোরে চালায়, গাড়িটাও জোরে চলবে। সে চাইলে গাড়িতে হালাল পণ্য বহন করতে পারে, আবার হারাম পণ্য-ও বহন করতে পারে। চাইলে ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারে, আবার খারাপ কাজেও ব্যবহার করতে পারে। মোটকথা, পুরো গাড়িটাই ঐ ড্রাইভারের নিয়ন্ত্রণে।

ঠিক আমরাও ঐ গাড়ি'র মতোই। গাড়ি'র যেমন বডি রয়েছে, ঠিক আমাদেরও রয়েছে এক মানব দেহ। গাড়ি'র যেমন ইঞ্জিন রয়েছে, ঠিক আমাদেরও একটি ইঞ্জিন রয়েছে। গাড়ি'র যেমন চালক রয়েছে, ঠিক আমাদেরও রয়েছে কোনো এক নিয়ন্ত্রক। আমরা দেহবিশিষ্ট একজন মানুষ। আমাদের মূল ইঞ্জিন হচ্ছে, রুহ। আর আমাদের পুরো দেহের নিয়ন্ত্রক (চালক) হচ্ছে, 'নফস'। অর্থাৎ, আমাদের শরীরের ড্রাইভার হচ্ছে, নফস। যেমনি-ভাবে একজন ড্রাইভার পুরো গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি নফস আমাদের পুরো দেহটা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই, আমাদের উচিত আমাদের ড্রাইভারকে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া। গাড়ির ড্রাইভারকে যদি ঠিকঠাক প্রশিক্ষণ দেয়া না-হয়, তাহলে যেমনি-ভাবে অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে; ঠিক তদ্রুপ, আমাদের নফসকে যদি আমরা ঠিকঠাক প্রশিক্ষণ না দিই, তাহলে আমাদের জীবনেও এক্সিডেন্টের আশঙ্কা সুনিশ্চিত।

একজন মাতাল ড্রাইভার যেমনি-ভাবে তার গাড়ির জন্য আশঙ্কাজনক, তদ্রুপ নফসে আম্মারাও আমাদের জন্য খুবই আশঙ্কাজনক। একজন মাতাল ড্রাইভার সবসময় চাইবে তার গাড়িটাকে ব্যবহার করে হারাম পন্য বহন করতে, তদ্রুপ আমাদের নফসে আম্মারাও সবসময় চায়, আমাদের ব্যবহার করে খারাপ কাজ সম্পাদিত করতে। তাই, সর্বপ্রথম আমাদের নফসকে এসলাহ করতে হবে। ড্রাইভারকে ঠিক না করলে যেমনিভাবে গাড়িটি নিরাপদ নয়, তেমনি আমাদের নফসকে এসলাহ না করা অবধি আমরা নিজেরাও নিরাপদ নই।

কে না চায় নিরাপদে থাকতে! সবাই চায় নিরাপদে থাকতে। এজন্য, সবাই যানবাহন ব্যবহার করার পূর্বে দেখে নেয়, ড্রাইভার ঠিকঠাক কি-না! সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কি-না! তাইতো দেখা যায়, প্রশাসন কর্তৃক বিভিন্ন চেকপোষ্টে গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকে পরীক্ষা করা হয়। দেখা হয়- ড্রাইভার নেশা-টেশা করেছে কি-না। যদি সে নেশাগ্রস্ত হয়, তখন সেখানেই তাকে আটকে দিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। কেননা, একজন ড্রাইভার পুরো গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ করে। এখন ড্রাইভার যদি হয় মাতাল, তখন গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারানোর সমূহ সম্ভাবনা তো থেকেই যায়।

এটা আমরা সবাই বুঝি এবং মানি। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করি। কিন্তু আফসোসের বিষয়-আমাদের জীবনের প্রধান ড্রাইভার 'নফসের' ব্যপারে খুবই উদাসীন! আমাদের সব কিছুর নিয়ন্ত্রক যে মাতাল হয়ে পড়ে আছে-সেদিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করার জন্য এই নফস-ই যথেষ্ট!

তাই, সর্বপ্রথম আমাদের নফসকে এসলাহ করতে হবে। নফসকে ঠিক করতে হবে। নফস ঠিক তো, সবই ঠিক! নফস ঠিক নয়, কোনো কিছুই ঠিক নয়!

দুই

আমরা ইতিপূর্বে জানতে পারলাম-নফস ঠিক তো সব ঠিক। নফসের বেড়াজাল থেকে মুক্তির জন্য অবশ্যই তাকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নফস মাতাল হয়ে যেন আমাদের জন্য আশঙ্কাজনক না-হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। এজন্য যত কষ্টই হোক, নফসের বিরুদ্ধে যেতেই হবে। নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অসুস্থ নফসকে আবার সুস্থ করে তুলতে হবে। যখন নফস চাইবে—একটু টিভি দেখি, খারাপ খারাপ সিন দেখি, তখন নফসকে বারণ করে রাখতে হবে। তার চাহিদার মূল্যায়ন না করে, তার বিপরীত করতে হবে; যদিও তার কষ্ট হয়।

সূচনাকালে কষ্ট কিছুটা হবেই। কেননা, টিভি দেখা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর অভ্যাস হুট করে স্বাভাবিক হয় না। হুট করে অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। তাই, যতক্ষণ না টিভি দেখবে ততক্ষণ পর্যন্ত নফসের শান্তি আসবে না; হা-হুতাশ করতে থাকবে, অস্বস্তি বোধ করতে থাকবে। নফস যতই কষ্ট পাক, যতই হা-হুতাশ করুক, থমকে গেলে চলবে না। নফসের হা-হুতাশ, নফসের অস্বস্তি দেখে নফসের চাহিদার গুরুত্ব দিলেই আপনি শেষ।

নফস, একটি দুর্বল সিংহ। যখন আপনি এর বিরোধিতা করবেন; তখন সিংহ নামক নফস, বিড়ালে পরিনত হবে। তাই, আপনার প্রচেষ্টা থেমে গেলে চলবে না ! চেষ্টার সর্বোচ্চ স্তর তার উপর প্রয়োগ করুন। ইনশাআল্লাহ, নফস ধীরে ধীরে তার ফিতরাতে প্রত্যাবর্তন করবে。

নফস হলো দুধ পান করা বাচ্চার মত। একজন মায়ের কাছে তার সন্তান কতোটা প্রিয়, তা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। বাচ্চা জন্মগ্রহণ করার পর সাধারণত মায়ের বুকের দুধ পান করে। আর পান করাটা একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বহাল থাকে। সবকিছুর একটা নির্ধারিত সময় থাকে, তেমনি দুধপানেরও একটি নির্ধারিত সময়ে রয়েছে। যখন সে নির্ধারিত সময় এসে যায়, তখন মা তার বাচ্চাকে দুধ ছাড়ানোর চেষ্টায় নিয়োজিত হয়।

মা যখন বাচ্চাকে দুধ ছাড়াতে যায়, বাচ্চা তখন হাউ-মাউ করে কাঁদতে শুরু করে। চিৎকার করতে থাকে। মা জানে, দুধ ছাড়তে বাচ্চার কষ্ট হবে, দুধ ছাড়াতে গেলে সে কান্না করবে, চিৎকার চেঁচামেচি করবে, নিজে ঘুমাবে না, তাকেও ঘুমাতে দিবেনা— তবু সে দুধ ছাড়ানোর চেষ্টা করে। তার যতই কষ্ট হোক, সে যতই চেঁচামেচি করুক, যতই কষ্ট দিক—তবু তার দুধ ছাড়াবেই। কারণ, সে জানে, এতেই তার কল্যাণ নিহিত। মা জানে, এখন যদি তার দুধ না-ছাড়ানো হয়, তবে সে ভাত-রুটি খাওয়ার উপযুক্ত হবে না। এজন্য, তাকে দুধ ছাড়ানো লাগবেই।

ধরে নিন, নফস হচ্ছে দুধ বাচ্চা। আর আপনি হলেন তার মা। আপনি দেখছেন সে যদি খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে তবেই মঙ্গল। এজন্য যত কষ্টই হোক, সেটাই করতে হবে, যা তার জন্য কল্যাণকর।

কষ্ট হবে ভেবে নফসকে যদি তার চাহিদা অনুপাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন এর ফলাফল ভয়াবহ হবে, এটা সুনিশ্চিত। এক ব্যক্তির নজরে সমস্যা, মেয়েদের দিকে না তাকালে শান্তি মিলে না। এক ব্যক্তি সুদি কারবারের অভ্যস্ত, কারো মিথ্যা বলার অভ্যাস, কারো গীবত করার অভ্যাস, কারো পর্ণ দেখার অভ্যাস—এখন যদি তাকে এ- সমস্ত কাজ থেকে দূরে রাখা হয়, তখন সে কষ্ট পাবে—এটাই স্বাভাবিক। সবকিছু বাস্তবায়ন করে নফস। এখন যদি তার কর্মে বাধা দেয়া হয়, তখন কিঞ্চিৎ ব্যথিত তো হবেই। এখন যদি নফসের কষ্টের কথা ভেবে তাকে সকল কৃত কর্মে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে কোনো দিন অপকর্ম থেকে সে বের হয়ে আসতে পারবে না। আজীবন পাপের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে হবে। এজন্য, পাপ কাজ থেকে বের হয়ে আসার জন্য নফসের বিরুদ্ধে যাওয়াটা অতিব প্রয়োজনীয়। যত কষ্টই হোক, নফসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। যত কষ্টই হোক, তার বিরোধিতা করতেই হবে। আবারো বলছি, 'নফস ঠিক তো, সব ঠিক'।

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের গোলামী করাও এক প্রকার শিরক

📄 নফসের গোলামী করাও এক প্রকার শিরক


শিরক পিপীলিকার পদধ্বনির চেয়েও সূক্ষ্ম, যা থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের অনেক জায়গায় বারবার শিরক করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা সকল গোনাহ মাফ করলেও শিরকের গোনাহ কখনো মাফ করবেন না। যারা শিরক করবে, তাদের শাস্তিও মারাত্মক। আসুন জেনে নিই, শিরকের ব্যপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কী বলেন...

অনুবাদ: নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব, যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন এবং যে আল্লাহর সাথে শরীক করল, সে এক মহা অপবাদ আরোপ করল।

শিরক মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। শিরক এক ভয়াবহ গোনাহ! শিরক থেকে বেঁচে থাকতে রাসুল সা. বারংবার সতর্ক করেছেন। কিন্তু তবু আজকাল আমরা শিরকে লিপ্ত হয়ে যাই। জেনে অথবা না-জেনে; বুঝে অথবা না-বুঝে-বিভিন্ন সময় শিরকের মতো জঘন্য পাপ করে বসি।

যাহোক, আমার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, নফস! এখানে শিরকের কথা এজন্য নিয়ে এসেছি-নফসের গোলামী করাও এক ধরনের শিরক। কুরআনে, আল্লাহ পাক বলেন...

আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার কুপ্রবৃত্তিকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে?"

এ আয়াতের দ্বারা বুঝা যায়-কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করা, তার গোলামী করাও এক ধরণের শিরক। আর এটা এভাবে যে-

১. আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হচ্ছে واقيموا الصلاه : তোমরা নামায কায়েম করো। আর নফস বলে: নামাজ রেখে খেলতে যা।

২. আল্লাহ তাআলার নির্দেশ: واتوا الزكاه তোমরা যাকাত প্রদান করো। আর নফস বলে: যাকাত দিস না; মাল কমে যাবে।

৩. আল্লাহ তাআলার নির্দেশ : وتصوم رمضان তোমরা রমজান মাসের রোজা রাখো। আর নফস বলে: রোজা রাখলে শুকিয়ে যাবি, তোর কষ্ট হবে।

৪. আল্লাহ তাআলার নির্দেশ : وتحج البيت : তোমরা বাইতুল্লাহ শরীফের হজ্ব করো। আর নফস বলে: আরে, এত কষ্ট করার কী দরকার? কষ্ট করার দরকার নেই; হজ্ব করারও দরকার নেই!

৫. আল্লাহ তাআলার নির্দেশ: لا تقربوا الزنا : তোমরা যিনার নিকটবর্তী হয়ো না। আর নফস বলে: মেয়েদের পিছনে ছোটতে হবে, তাদের সাথে হারাম সম্পর্কে জড়াতে হবে। ভোগ করতে হবে, নিজের যৌন চাহিদা মেটাতে হবে।

লক্ষ্য করে দেখুন-নফসে আম্মারা বিস-সো, আল্লাহ তাআলার বিপরীত হুকুম প্রদান করছে। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক সৎকাজের আদেশ প্রদান করছেন, আর নফস সেখানে বিপরীত নির্দেশ দিচ্ছে। নফস প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার হুকুমের বিরোধিতা করছে।

এ কারণেই তো আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার কুপ্রবৃত্তিকে ইলাহ বানিয়েছে"। এ আয়াতকে সামনে রেখে অনেক বড় বড় স্কলারগন বলেছেন-নফসের গোলামী করাও শিরক!

নফস আপনাকে আদেশ করছে, আর আপনি আমি তা বাস্তবায়ন করছি। এখন আপনি যদি নফসের হুকুম মান্য করে চলেন, তার চাহিদার মূল্যায়ন করেন, তবে এটা হবে নফসের গোলামী। আর যদি আল্লাহ তাআলার হুকুম মান্য করেন, তখন এটা হবে আল্লাহ তাআলার গোলামী। এখন আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনি কার গোলামী করছেন? নফসের নাকি স্বীয় রবের? আল্লাহ তাআলা বলেন—তোমরা নামায আদায় করো। আর নফস বলে, শীতের সকাল, ঘুম থেকে ওঠার দরকার নেই; আরেকটি ঘুমা, মজা পাবি। তখন আপনি যদি নফসের হুকুম উপেক্ষা করে, আরামের নিদ্রা ত্যাগ করে, নামাজে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন, তবে সেটা হবে আল্লাহ’র গোলামী। আর যদি নফসের কথামতো কম্বল টানা দিয়ে শুয়ে পড়েন, তখন সেটা হবে নফসের গোলামী।

আপনি যদি সর্বদা নফসের হুকুম মানতে শুরু করে দেন, তখন সেটা তার গোলামীর পরিচয় বহন করবে। শরীয়তের যত বিধি-বিধান রয়েছে, তা পালন করা আমাদের উপর আবশ্যক। আর আমরা তা পালন করার জন্য সর্বদাই চেষ্টা করি। যখন আপনি আমি ওই বিধি-বিধান পালন করতে যাই, তখন সেখানে নফস এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে বিপরীত হুকুম প্রদান করে। তখন আপনি আমি যদি তার হুকুম মান্য করে তার ফাঁদে পা দিয়ে দিই, তখন সেটা হবে তার গোলামী। আর আমরা ইতিপূর্বে জানতে পেরেছি, নফসের গোলামী করাটাও এক ধরনের শিরক।

তাই, আমাদের উচিত নফসের গোলামী ত্যাগ করে এই শিরক থেকে বেঁচে থাকা। নফস যখন বলবে— নামায পড়ার দরকার নেই, ঘুমিয়ে থাক। তখন আপনি বলবেন, হে নফস! আমি তোর বান্দা নই, আর তুইও আমার রব না। আমি তোর হুকুম মানতে বাধ্য নই। আমার আল্লাহ বলেছেন নামায পড়তে, এখন আমার যত কষ্টই হোক, যত ঠান্ডাই লাগুক, আমি অবশ্যই আমার রবের হুকুম মানতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে। তুই আমার রব না; আমিও তোর বান্দা না, সুতরাং আমি তোর হুকুম মানতে বাধ্য নই।

সর্বোপরি একটা কথাই বলবো—নফসের গোলামী করে শিরক -এর মতো জঘন্য পাপে আমরা যেন জড়িয়ে না যাই।

টিকাঃ
* সূরা নিসা, আয়াত- ৪৮
*সূরা জাসিয়া, আয়াত- ২৩

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 মোকাবেলা

📄 মোকাবেলা


কারাবন্দী দু'জন অপরাধী কখনো একজন আরেকজনের জামিন হতে পারে না। কেননা, দুজনই কারাবন্দি। বন্দিশালায় অবস্থান করে একজন আরেকজনের জামিন হওয়া দুষ্কর ব্যাপার। এজন্য, জামিন হতে হলে বাইরের কাউকে প্রয়োজন হবে; মুক্ত-স্বাধীন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন হবে, যে-কিনা জামিন হয়ে তাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবে। একজন অপরাধী • যেমনি-ভাবে আরেকজন অপরাধীকে কারামুক্ত করতে পারে না, ঠিক তদ্রুপ নিজের ভিতরে নফসে আম্মারাকে লালন করে, নিজেকে পরিশুদ্ধ করা যাবে না; তার বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করা যাবে না। লাগামহীন নফসকে নিজের মধ্যে পুষে কখনো নিজেকে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা যাবে না। কেননা, সে নিজেই অপরাধী, সে নিজেই পাপের দিকে আমাদের ধাবিত করে।

তো যেটা বলছিলাম—আমরা যদি নিজেদের মধ্যে শুধুমাত্র আম্মারার গুণাবলী লালন করি, তখন এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হবে। কারণ, সে নিজেই অপরাধী। তাই, আমাদের উচিত ভালো একজন প্রতিপক্ষ তার সামনে দাঁড় করানো। একজন অপরাধীকে কারামুক্ত করার জন্য যেমনি-ভাবে একজন ভালো উকিলের প্রয়োজন হয়, তেমনি আমাদের নফসে আম্মারা'র বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হলে আম্মারা'র সম্মুখে একজন ভালো প্রতিপক্ষ দাঁড় করাতে হবে। আর সে প্রতিপক্ষ হচ্ছে নফসে মুত্বমায়িন্নাহ। যখন আপনি আম্মারা'র সামনে মুত্বমায়িন্নাকে দাঁড় করিয়ে দিবেন, তখন একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আম্মারা'র প্রতিপক্ষ মুত্বমায়িন্নাহ আর মুত্বমায়িন্নার প্রতিপক্ষ হচ্ছে আম্মারা। প্রতিপক্ষ তখনই দাঁড় করাতে পারবেন, যখন নিজের মধ্যে মুত্বমায়িন্নাকে নিজের মধ্যে লালন করতে পারবেন। মুত্বমায়িন্নাকে লালন করতে পারলেই সে তখন আম্মারা'র সাথে মোকাবেলা করতে পারবে।

প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত, উত্তম পরিকল্পনা ও কঠোর শ্রম -এর প্রয়োজন হয়-তবেই উক্ত প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া যায়। তো, নফসে আম্মারা এবং নফসে মুত্বমায়িন্নাহ-এর প্রতিযোগিতাও এরকমই হবে। আপনি আমি অবশ্যই চাইবো নফসে আম্মারা'র উপর নফসে মুত্বমাইয়িন্নাহ বিজয়ী হোক। তাই, যেহেতু আমাদের লক্ষ্য বিজয়ী হওয়া, সেহেতু সঠিক সিদ্ধান্ত, উত্তম পরিকল্পনা, এবং কঠোর শ্রম তো দিতেই হবে।

যেহেতু নফসে আম্মারা শুধুমাত্র আমাদের ক্ষতি সাধন করে, সেহেতু তার বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অতঃপর, কীভাবে নফসে আম্মারা'র কার্যাবলী উৎখাত করা যায়, সেজন্য উত্তম পরিকল্পনা করতে হবে। অতঃপর, কিছু দুঃখ কষ্ট বহন করে, সেভাবেই নফসে আম্মারা'র বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হবে।

সাধারণত যখন আম্মারা আপনাকে আমাকে খারাপ কাজের দিকে ধাবিত করতে চায়, তখন মুত্বমায়িন্না এসে বাধা প্রদান করে। আম্মারা বলে যা সিনেমা দেখে আয়; মজা পাবি। তখন মুত্বমায়িন্নাহ বলে, না! যাস না, এটা খুবই গর্হিত একটি কাজ, এই কাজের দরুন তোকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। ঠিক তেমনি-ভাবে মুত্বমায়িন্নাহ যখন নামাজ পড়ার তাগিদ দেয়, তখন আম্মারা এসে বলে, আরে, এত আরামের ঘুম রেখে নামাজ পড়ার কী দরকার? নামাজ পড়তে হবে না, ঘুমিয়ে থাক।

এটাই হচ্ছে মুত্বমায়িন্নাহ এবং আম্মারা'র মোকাবেলা। যাকে বলা হয়- কারাবন্দি এবং মুক্ত স্বাধীনের মোকাবেলা। এ মোকাবেলায় সে-ই বিজয়ী হবে, যে প্রতিপক্ষ হিসেবে মজবুত। এজন্য, আপনি আমি যদি নফসে আম্মারা'র উপর, নফসে মুত্বমায়িন্নাকে বিজয়ী করতে চাই, তবে নফসে মুত্বমায়িন্নাকে সেরকম মজবুত করেই রাখতে হবে। যদি সে দুর্বল হয়, তবে সে আম্মারা'র কাছে পরাজিত হয়ে যাবে। তখন আম্মারা আপনাকে আমাকে ব্যবহার করে শুধু খারাপ কাজই করাবে। তবে, মুত্বমায়িন্নাকে যদি মজবুত ভাবে তার সামনে দাঁড় করানো যায়, তখন সে পরাজয় বহন করতে বাধ্য। এজন্য আম্মারা'র বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হলে, আমাদের সর্বপ্রথম মুত্বমায়িন্নাকে মজবুত করতে হবে। অতঃপর আম্মারা'র সামনে তাকে দাঁড় করাতে হবে।

একটা কথা না-বললেই নয়-মানুষের ফিতরাত হচ্ছে, প্রশান্ত আত্মা (ভালো নফস)। সুতরাং, নফসে মুত্বমায়িন্নাহ সবার মধ্যেই বিদ্যমান। কিন্তু, নফসের ওপর লাগাম না থাকায়, তার ব্যাপারে উদাসীন থাকায়, নফস তার ফিতরাতের গন্ডি পেরিয়ে আম্মারায় পরিণত হয়ে যায়।

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের খোরাক, রূহের খোরাক

📄 নফসের খোরাক, রূহের খোরাক


যখনই আমাদের গোনাহ-এর পাল্লা ভারী হয়ে যায়, তখন নফস ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয় বটে, তবে আমাদের রুহ দূর্বল হয়ে পড়ে। গোনাহের কারণে রুহ তার সজীবতা হারিয়ে ফেলে। রুহ অসুস্থ হয়ে পড়ে—যাকে আমরা রুহানি বেমার বলে থাকি। রুহানি বেমার এমনি এমনি হয় না; তা গোনাহের কারণেই হয়ে থাকে।

নফসের প্রধান হাতিয়ার হলো, শরীর। শরীর আর রুহ একটি অপরটির সম্পূর্ণ বিপরীত। যেমন: যে-সব কাজের দ্বারা শরীর দুর্বল হয়ে যায়, সে-সব কাজের দ্বারা রুহ শক্তিশালী হয়। আর যে-সব কাজের দ্বারা রুহ শক্তিশালী হয়, সে-সব কাজের দ্বারা শরীর দূর্বল হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে—সাধারণত রোজা রাখলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়, কিন্তু রোজার দ্বারা আমাদের রুহ শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিও বেশি খাবারের দ্বারা আমাদের শরীর শক্তিশালী হয়, কিন্তু বেশি খাবারের দ্বারা রুহ দুর্বল হয়ে পড়ে।

আমরা নফসের ক্ষুধা ঠিকই নিবারণ করছি; রুহের ক্ষুধা নয়। নফসকে নিয়মিত খাবার দিচ্ছি; কিন্তু রুহকে নয়। এতে করে দিন দিন নফস সবল হয়ে যাচ্ছে; অপরদিকে রুহ দূর্বল হয়ে পড়ছে। খাবারের অভাবে একজন সুস্থ সবল মানুষ যেমনি-ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি রুহের খাবারের ব্যবস্থা না করলে, রুহও দুর্বল হয়ে পড়ে।

নফসের খাবার হচ্ছে—শাহওয়াতে নফসানিয়্যাহ (মনের কুপবৃত্তি) খারাপ কাজ। অপরদিকে রুহের খাবার হচ্ছে—নেক কাজ। আপনি যত বেশি নেক কাজ করবেন, রুহ তত বেশি সতেজ হয়ে উঠবে। অপরদিকে, আপনি যত বেশি বদকাজ করবেন, নফস ততবেশি সতেজ হয়ে উঠবে। আর নফস সতেজ হলে তার বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করা, খুবই কষ্টকর।

রুহকে সতেজ করতে হলে আমাদেরকে বেশি বেশি জিকির করতে হবে। কেননা, জিকির হলো রুহের খোরাক। পক্ষান্তরে, নফসকে দমিয়ে রাখার জন্য আমাদেরকে বেশি বেশি রোজা রাখতে হবে। কেননা, রোজা নফসকে দূর্বল করতে অগাধ ভূমিকা রাখে। তাই, আমাদের উচিত সবসময় রুহকে সতেজ রাখা। আর রুহকে সতেজ রাখতে হলে বেশি বেশি নেক কাজ তো করতেই হবে। যখন আপনার রুহ পরিপূর্ণভাবে সতেজ হয়ে যাবে, তখন সেখানে নফস, তার নেতৃত্ব হারাবে। নফস কখনোই আপনার মাঝে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। আর যখন নফস প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না, তখন বদকাজের চিন্তা-ভাবনা এমনি দূরিভূত হয়ে যাবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px