📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের ভিত্তিতে সৃষ্টির সেরা জীব

📄 নফসের ভিত্তিতে সৃষ্টির সেরা জীব


এক

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। ফেরেশতাদের ওপরও মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে—এটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। তবে এটা কি জানি, সেই শ্রেষ্ঠত্ব লাভে নফসেরও ভূমিকা রয়েছে? ফেরেশতারা সব সময় আল্লাহ তাআলার ইবাদতে নিয়োজিত থাকে। কখনো তারা আল্লাহ তাআলার হুকুম অমান্য করে না; কিন্তু মানুষ আল্লাহ তাআলার কত হুকুমই-না অমান্য করে। তবুও মানুষকে ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। এর কারণ, ফেরেশতাদের মধ্যে নফস নেই, নেই কোনো অনুভূতি শক্তি। তাদের মধ্যে কেবল জীবনী শক্তি বিদ্যমান; কোনো অনুভূতি শক্তি নেই। তাদের পেটের ক্ষুধার অনুভূতি নেই; নেই যৌবনের ক্ষুধার অনুভূতি। কিন্তু মানুষের মধ্যে সেই অনুভূতি দান করা হয়েছে। আর সেই অনুভূতি শক্তির নাম হচ্ছে নফস বা প্রবৃত্তি। আল্লাহ তাআলা মানুষদের নফস দান করেছেন, যার কারণে সমস্ত সৃষ্টি কুলের মধ্যে মানুষ সেরা। নফস যখন আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে, তখন সেই নফসকে এসলাহ করা আমাদের উপর কতটা গুরুত্বপূর্ণ—একবার কি ভেবে দেখেছেন? আপনি নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করলেই আপনি সকলের উপর শ্রেষ্ঠ। যদি তা না করে নফসের ধোঁকায় পড়ে তার গোলামী করতে শুরু করেন, তখন কি আর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হবে? না, নফসের গোলামী করে, নফসকে অপবিত্র রেখে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হবে. না। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হলে অবশ্যই আপনাকে নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এবং বিজয় অর্জন করতে হবে। বস্তুত, আপনি আমি কি সেটা করছি?

দু'জন ব্যক্তিকে দু'টি জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হল, বলা হলো—দু'জনকে এই জঙ্গল অতিক্রম করে অপর প্রান্তে যেতে হবে। একটি জঙ্গল একদম নিরাপদ- নেই কোনো বাধা, নেই কোনো ভয়ংকর জানোয়ার।

অপরদিকে, অন্য জঙ্গলে রয়েছে নানান বাধা-বিপত্তি, পথিমধ্যে রয়েছে খাল-বিল ইত্যাদি। তার ওপর সাপ, ভয়ংকর জানোয়ার-বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ, ইত্যাদি তো রয়েছেই। তারা দু'জনেই জঙ্গল অতিক্রম করে অপর প্রান্তে গেল। একজন আরামসে-কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই; কোনো জানোয়ারকে হত্যা করা ছাড়াই। অপরদিকে, অন্যজন নানান বাধা-বিপত্তির মোকাবেলা করে, সাপ, বাঘ, ভাল্লুক, সিংহকে হত্যা করে অপর প্রান্তে পৌঁছেছে। এখন বলুনতো-কাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হবে? অবশ্যই তাকে, যে নানান বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে, ভয়ঙ্কর জানোয়ারকে হত্যা করে অপর প্রান্তে পৌঁছেছে। তাকেই পুরস্কৃত করা হবে, যে নানান বাধা-বিপত্তির মোকাবেলা করেছে; তাকে নয়-যার রাস্তায় কোনো বাধা ছিলো না।

ঠিক এভাবেই, ফেরেশতাদের ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের কোনো জৈবিক চাহিদা নেই। পাপ কাজে জড়ানোর সেই মন মানসিকতা নেই। নেই তাদের কোনো অনুভূতি শক্তি। নেই যৌবনের চাহিদা, নেই ভক্ষণের চাহিদা। তাই, তাদেরকে কোনো কিছুর মোকাবেলা করতে হয় না। কোন বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় না।

নফস হচ্ছে লবণের মতো। লবণ ছাড়া যেমনি-ভাবে খাবারের কোনো মূল্য নেই; তেমনি নফস ছাড়াও মানুষের কোনো মূল্য নেই。

আপনি গরুর গোশত রান্না করলেন, কিন্তু লবণ দিলেন না। এটা কি আর খাবারের উপযুক্ত থাকবে? লবণ ছাড়া তরকারির স্বাদ পাবেন? পাবেন না। লবণ ছাড়া তরকারির কোনো মূল্যই নেই। এটা কেউ খেতেই পারবে না। ঠিক নফসের ক্ষেত্রেও এরকম-নফস ছাড়া আপনি যতই ইবাদত করেন, তার কোনো স্বাদ থাকবে না। ওই ইবাদতের কোনো বিনিময় থাকবে না। যেমন: ফেরেশতাদের নফস নেই। তাদের ইবাদতের কোনো মূল্য নেই এবং এই ইবাদতের কোনো বিনিময়ও নেই। তারা শুধু তাদের রবের হুকুম মান্য করছে। তাদের আমলের দরুন তারা কিছুই লাভ করবে না। পক্ষান্তরে, যাদের মধ্যে নফস রয়েছে অর্থাৎ ‘মানুষ’, তারা যদি একবার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে, সাথে সাথে তার আমলনামায় শত শত নেকি যুক্ত হয়ে যায়। যতই ইবাদত করবে, যতই নেক আমল করবে; এর বিনিময় হিসেবেও পরকালে পাবে অফুরন্ত পুরস্কার। আর এটা হয়ে থাকে কেবল নফসের-ই কারণে। এই নফস যদি না থাকতো, তবে কি সেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানিত হতো? এই নফসের কারণেই আপনার শ্রেষ্ঠত্ব; আপনার কবুলিয়্যাত।

ওপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়-শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয় কর্মের গুণে। আর সবকিছুর ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার কারণ হচ্ছে, আমরা নফসের বিরুদ্ধে মুজাহিদ। যে ব্যক্তি নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় অর্জন করেছে, নফসের গোলামী থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছে-সে-ই প্রকৃতপক্ষে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন-আপনি আমি কি সত্যিই নফসের বিরুদ্ধে মোজাহিদ? সত্যি কি আমরা নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করছি? সত্যি কি আমরা নফসের হুকুম অমান্য করে রবের হুকুম মেনে চলছি? যদি আপনার উত্তর হয়, ‘না’, তাহলে আপনি কীসের সৈনিক, কীসের মুজাহিদ? আর কোন ভিত্তিতে আপনি সৃষ্টির সেরা জীব?

আচ্ছা, আপনি আমি সৃষ্টির সেরা জীব-এটা কি আমাদের কাজে-কর্মে, আমাদের চিন্তা-চেতনায় প্রকাশ পায়? বলতে পারছেন না? তাহলে আসুন, নিজের অবস্থান সম্পর্কে আরেকটু জানি। আসুন নিজেকে হায়ওয়ান -এর সাথে একটু পর্যালোচনা করে দেখি...

আল্লাহ তাআলা হায়ওয়ান -এর ওপর মানুষকে এক বিশেষ বিশেষণে বৈশিষ্ট মন্ডিত করেছেন। সেটা হলো-আকল, বুদ্ধি, বিবেক। যেন তা দ্বারা সে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম, ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। কল্যাণ-অকল্যাণ ইত্যাদি বিষয়ও অনুধাবন করতে পারে। শুধু তাই নয়-এর দ্বারা যেন, তার জৈবিক চাহিদার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম-এর মধ্যে পার্থক্য করে চলতে পারে। বস্তুত, এতেই তার মনুষত্ব ও মানবিক দিকের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে। তাই, কেউ যদি তার নফসের গোলামী করে—ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম বিবেচনা না-করে জৈবিক চাহিদা পূরণ করে, তবে তার আর হায়ওয়ান -এর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে কি?

আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা ছাড়া-মানুষ, জিন, হায়ওয়ান, সবার মধ্যে নফস দিয়েছেন। সবার মধ্যে একটা জৈবিক চাহিদা দান করেছেন। আর সেই চাহিদা হলো-যৌন চাহিদা, খাবারের চাহিদা, আরাম আয়েশের চাহিদা, ইত্যাদি। মানুষের মধ্যে যেমনি-ভাবে এই চাহিদাগুলো বিদ্যমান। ঠিক তদ্রুপ, হায়ওয়ানের মধ্যেও এরকম জৈবিক চাহিদা রয়েছে; তারাও তাদের নফসের তাড়নায় এই চাহিদাগুলো পূরণ করে। (মানুষ এবং হায়ওয়ানের মধ্যে চাহিদার ক্ষেত্রেও কমবেশির তারতম্য রয়েছে) তবে হায়ওয়ান এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য, মানুষকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে। যেন, সে এটার মাধ্যমে ভালো-মন্দ সবকিছু পার্থক্য করতে পারে। হালাল-হারাম চিহ্নিত করে জীবন-যাপন করতে পারে। কিন্তু, আজকাল দেখা যায়-নফসের তাড়নায় কিছু মানুষ, তাদের আকল, বিবেক, বুদ্ধি সব হারিয়ে ফেলেছে। ফলে, সব কিছু তার পশু- সুলভ হয়ে গেছে।

বস্তুত, হায়ওয়ান কেবল তাদের জৈবিক চাহিদা পূরণে ব্যস্ত। পেট আর লিঙ্গ হচ্ছে তাদের চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর। তাই বলা যেতে পারে-মানুষের মধ্যে যারা শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যস্ত; পেট আর লিঙ্গ তাদের চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর, তারা তো পশুর চেয়েও আরো বেশি নিকৃষ্ট। পশুর চেয়ে আরো বেশি নিকৃষ্ট এ- কারণে যে-মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণ করার জন্য শরীয়তের কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে; রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। তাই, সে যদি জৈবিক চাহিদা পূরণ করার জন্য সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তখন তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। পক্ষান্তরে, পশুর ক্ষেত্রে এরকম সীমাবদ্ধতা নেই। নেই তাদের কোনো বিধি-নিষেধ: নেই কোনো হিসাব-নিকাশের দায়বদ্ধতা। কিন্তু মানুষ?

এখানে আমি কেন পশুর আলোচনা করলাম? করেছি এ কারণে যে, আজকাল অনেক মানুষ পশু-সুলভ হয়ে গেছে। তারা তাদের বিবেক-বুদ্ধি সবকিছু খুইয়ে ফেলেছে। তারা এখন আর ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। হালাল-হারাম মেনে জীবন-যাপন করে না। তাদের জীবন-ব্যবস্থা হয়ে গেছে অনেকটা পশুদের মত। বললাম না-পশুর চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে, পেট এবং লিঙ্গ। এখন আমাদের সমাজের কিছু মানুষেরও চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর, পেট এবং লিঙ্গ। তারা খাওয়া-দাওয়া আর যৌবনের চাহিদা মিটানো ছাড়া, অন্য কিছু ভাবেই না। তার কারণ হচ্ছে, সে নফসের কাছে পরাজিত; তার নফস লাগামহীন। আর এই লাগামহীন নফস, তাকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বানিয়েছে।

দুই

নফসকে তুলনা করা যায় জমির সাথে...। জমি যখন আগাছায় ভরপুর হয়ে যায়, তখন জমি তার উর্বরতা হারিয়ে ফেলে। ঠিক তদ্রুপ, কিছু কিছু নফস যখন ইসলামবিদ্বেষী নানান কর্মকান্ড নামক আগাছায় ভরপুর হয়ে যায়, তখন ঐ নফসও তার উর্বরতা হারিয়ে ফেলে। সব জমি এক নয়; কিছু কিছু জমি আছে, যাতে উৎকৃষ্ট মানের ফসলের পরিবর্তে, নানান ধরনের আগাছা, লতাপাতা, কাটা-বৃক্ষ জন্ম নেয়। ঠিক তদ্রুপ, কিছু কিছু নফসও এরকম-যাতে ইসলামবিদ্বেষী নানান কর্মকাণ্ড, ফেতনা-ফাসাদ, অপসংস্কৃতি, কুফরী, শিরক ইত্যাদি বাসা বাঁধে।

এজন্য, জমি থেকে উৎকৃষ্টমানের শস্য পেতে হলে তার যত্ন নিতে হবে, আগাছা পরিষ্কার করতে হবে, উত্তম ভাবে হাল-চাষ করতে হবে। পরিমাণ মতো পানি দিতে হবে, কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তবেই সেখান থেকে ভালো ফসল আশা করা যাবে। ঠিক আমাদের নফসটাও এরকমই। যখন দেখবেন, নফস তার উর্বরতা হারিয়ে ফেলেছে, লাগামহীন হয়ে গেছে, তখনই অনতিবিলম্বে তাকে এসলাহ করতে হবে, তার প্রয়োজনীয় খাবারের বন্দোবস্ত করতে হবে। যেমন: জিকির-আজকার, কুরআন তেলাওয়াত, নফল ইবাদত ইত্যাদি। অতঃপর, তার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। তবেই নিজের আত্মিক উন্নয়ন ঘটবে। আর যদি আগাছা মুক্ত না রাখেন, তবে উক্ত আগাছা তাকে সামনে আগাতে দিবে না। নফসকে এসলাহ করতে সর্বদাই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য, নফসের মধ্যে যত আগাছা রয়েছে, তা সময় থাকতেই ছাঁটাই করতে হবে। যেমন: বিভিন্ন বদ-অভ্যাস, অশ্লীল চিন্তা-ভাবনা, খারাপ মনোভাব, ইত্যাদি।

মনে রাখতে হবে-জমি'র আগাছা পরিষ্কার করা খুবই সহজ, কিন্তু নফসের আগাছা দূর করা খুবই কঠিন। এজন্য, নফসের আগাছা দূর করতে যা যা প্রয়োজন, তা-ই করতে হবে। এক্ষেত্রে, নফসের বিরুদ্ধে তো যেতে হবেই; নয়তো আগাছা পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। আর যখন আপনি আগাছা পরিষ্কার করার জন্য নফসের বিরুদ্ধে যাবেন, তখন সে হা-হুতাশ করতে থাকবে; তার কষ্ট হবে। তাই, কষ্টের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না; নফসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তবেই নফসকে আগাছামুক্ত করা যাবে; অন্যথায়, আগাছায় আচ্ছাদিত হয়ে নফস তার আলোর দিশা হারাবে।

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফসের হাতে তুলে দিচ্ছি আমাদের ক্ষতি সাধনের যাবতীয় অস্ত্র

📄 নফসের হাতে তুলে দিচ্ছি আমাদের ক্ষতি সাধনের যাবতীয় অস্ত্র


কৃত অপরাধের কারণে সাধারণত অপরাধীদের কারাবন্দি করে রাখা হয়। যেন সে আর কোনো অপরাধ করার সুযোগ না পায়। এমনকি, আমরা আমাদের শত্রুদের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকতে তাকে গৃহবন্দি করে রাখার চেষ্টা করি। সে যে-সকল জিনিস দ্বারা আমাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে, সে-সব জিনিস তার হাতের নাগাল থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি—যেন ঐ সব ব্যবহার করে আমাদের ওপর আক্রমণ করতে না পারে। মোটকথা, আত্মরক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন, সব কিছুরই বন্দোবস্ত করি। কেননা, আমরা কেউ-ই চাই না—শত্রুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে। এজন্য, সর্বদাই শত্রুর মোকাবেলায় পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে থাকি।

শত্রুর মোকাবেলায় সজাগ থাকতে হবে, এটাই স্বাভাবিক! কেউ যদি শত্রুর মোকাবেলায় অসতর্ক থাকে, তবে সে তার শত্রুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। কেউ যদি শত্রুর ব্যাপারে গাফেল থাকে, তাহলে সুযোগ বুঝে সে আক্রমণ করবেই— এ- কথা ভেবে সকলেই তার শত্রুর ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্বন করে। একজন সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন ব্যক্তি তার ক্ষতি সাধনকারী ব্যক্তির ব্যাপারে কখনো উদাসীন থাকতে পারে না।

আমরা আমাদের শত্রুদের ভয় করি। তার আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। তার মোকাবেলায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিই। পারলে তাকে কারাবন্দি করার চেষ্টা করি, যেন তার আক্রমণের সমস্ত দ্বার বন্ধ হয়ে যায়। অথচ, আমরা আমাদের নফসের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিই না। সে একজন বড় অপরাধী, তবুও তাকে কারাবন্দি করি না। সে আমাদের সবচে বড় শত্রু, তবু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিই না। নফস যে-সকল হাতিয়ার ব্যবহার করে আমাদের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করছে, তা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা তো দূরের কথা; উল্টো তার হাতেই সকল উপকরণ তুলে দিচ্ছি。

যদি একজন শত্রুর হাতে ক্ষতি সাধনের অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়, তখন সে আমাদের ওপর আক্রমণ করবে, আমাদের ক্ষতি করবে, আমাদের বিপদে নিপতিত করবে—এটাই তো স্বাভাবিক। ঠিক নফসের ক্ষেত্রেও এরকম। আমরা যদি আমাদের নফসের হাতে ক্ষতি সাধনের যাবতীয় আসবাব, যাবতীয় উপায়-উপকরণ তুলে দিই, তখন সে আমাদের ক্ষতি না করে কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে।

এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে— আমরা কীভাবে আমাদের নফসের হাতে আমাদের ক্ষতি সাধনের অস্ত্র তুলে দিচ্ছি? আসুন জেনে নিই, কীভাবে আমরা আমাদের নফসের হাতে আমাদের ক্ষতি সাধনের যাবতীয় অস্ত্র তুলে দিচ্ছি.....

নফসের তাকাযা অনুযায়ী সমাজ ব্যবস্থা: আজ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন যে—কেউ যদি কোনো খারাপ কাজ সম্পাদনের ভিত্তি স্থাপন করে, তখন আমরা তাকে বাধা না দিয়ে, সংবর্ধনা জানাই। আমাদের সুশীল সমাজের বক্তব্য হয়—সে যা করছে তাকে করতে দাও, তার কাজে কোনো ধরনের বাধা দিও না, তার স্বাধীনতাকে হরণ করো না। যে ব্যক্তি যে কাজে শান্তি পাচ্ছে; তাকে তা-ই করতে দাও। যে ব্যক্তি যা খেয়ে মজা পাচ্ছে, তাকে তা-ই খেতে দাও। তার কাজে, তার পরিকল্পনায়, তার জীবন ব্যবস্থায় বাধা'র দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে না।'

বাস্তবতা এটাই—আজকাল খারাপ কাজের কোনো বাধা নেই। না ব্যক্তিত্বের বাধা, না আইনের বাধা, আর না উপায়-উপকরণের বাধা। মোটকথা, ব্যক্তি এবং খারাপ কাজের মাঝখানে কোনো দেয়াল নেই। যখন ইচ্ছে তখনই খারাপ কাজ সম্পাদন করতে পারছে। যখন ইচ্ছে তখনই তার সাহওয়াত পূরণ করতে পারছে। যখন ইচ্ছে তখনই মজা ভোগ করতে পারছে। আমরাই সমস্ত খারাপ কাজের দরজা উন্মোচন করে দিচ্ছি, আর তার সূত্র ধরেই নফস সমস্ত খারাপ কাজ সম্পাদন করছে। আমরাই নফসের হাতে খারাপ কাজের আসবাবপত্র তুলে দিচ্ছি, ফলে এখন যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই সে খারাপ কাজ সম্পাদন করতে পারছে।

ক | অসৎ কর্মে রাষ্ট্রীয় কোনো বাধা-বিপত্তি নেই। ছেলে-মেয়ে অবাধে মেলামেশা করছে-এ ব্যাপারে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেই। পার্ক, মল, থিয়েটারে-ছেলে-মেয়ের নির্জন বাসেও নেই কোনো বাধা। ফলে, নফস তার অশ্লীল মনোবৃত্তি খুব সহজেই পূরণ করতে পারছে।

খ | এখনো দেশের হাজার হাজার হোটেলে চলছে রমরমা দেহ ব্যবসা। রয়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানান শ্রেণীর পতিতালয়। যেখানে একজন যুবক খুব সহজেই তার যৌন চাহিদা মিটিয়ে আসতে পারছে। খুব সহজেই নফসের চাহিদা পূরণ করতে পারছে। খুব সহজেই হরেক রকম নারী সে উপভোগ করতে পারছে।

গ | আজ শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ-সবার হাতেই স্মার্টফোন। বাচ্চারাও আজকাল এডাল্ট ফিল্মের সাথে পরিচিত। এই মোবাইল যুগের পূর্বে ১৮ বছরের একজন যুবক যা চিনতো না, আজ ৮ বছরের বাচ্চাও তা চিনে। ফলে, একটা ছেলে কিশোর অবস্থায়ই পর্ণ আসক্ত হয়ে পড়ছে। খুব সহজেই মোবাইলে নীল ছবি দেখে নফসে আম্মারার চাহিদা পূরণ করতে পারছে।

এছাড়াও অসংখ্য বিষয় রয়েছে, যা সমাজ ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। সমাজের এই চিত্রের কারণে নফস খুব সহজেই তার চাহিদা নিবারণ করতে পারছে। খুব সহজেই সে আমাদের ব্যবহার করে নানান অপকর্ম সম্পাদন করতে পারছে। আমরা খুব সহজেই তার হাতে সকল অশ্লীলতার উপকরণ তুলে দিচ্ছি। ফলে, হাতের নাগালে পেয়ে সে আরো বেশি নিকৃষ্ট পথে হাঁটছে। খুব সহজেই তা ব্যবহার করে আমাদের ক্ষতি সাধন করছে। আমাদের দ্বারা যাবতীয় অশ্লীল মনোবৃত্তি পূরণ করছে। অথচ আমরা ভুলে বসেছি-সে আমাদের সবচে বড় শত্রু! তার আক্রমণ থেকে বাঁচতে, তাকে প্রতিহত করতে উচিত ছিল—সতর্কতা অবলম্বন করা; তার মোকাবেলায় পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা। সে যে-সকল উপকরণ ব্যবহার করে আমাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা উৎখাত করা। প্রয়োজনে তাকে কারাবন্দি করা, যেন তার কোনো কর্মপরিকল্পনা আমাদের উপর বাস্তবায়িত না হয়। কোনো চাহিদা যেন আমাদের ব্যবহার করে বাস্তবায়ন করতে না পারে।

কিন্তু আফসোস, আজ আমরা তার ব্যাপারে খুবই উদাসীন। তার বিরুদ্ধে লড়াই করার মনোভাব প্রকাশ করি না। উল্টো, তার হাতেই তুলে দিই, আমাদের ক্ষতি সাধনের সকল মাধ্যম।

এজন্য, সর্বপ্রথম নফসের অশ্লীল কাজ সম্পাদনের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে হবে। তার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে হবে। কাজ সম্পাদনের যাবতীয় উপায়-উপকরণ বন্ধ করতে হবে। তার হাতের নাগাল থেকে যাবতীয় হারাম উপকরণ দূরে রাখতে হবে। নয়তো নফসের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা প্রায় অসম্ভব!

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 আজ-ই ফার্স্ট আজ-ই লাস্ট

📄 আজ-ই ফার্স্ট আজ-ই লাস্ট


এক

কখনো নফসের চাহিদার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। যত দিবেন ততই চাইবে। যখন আপনি নফসের চাহিদা অনুপাতে চলবেন, তখন সে আপনাকে আস্তমতো ব্যবহার করবে। সে আপনাকে এভাবে ধোঁকা দিবে—নফস বলে, 'আমার আম খেতে ইচ্ছে করছে!' কিন্তু আপনার পকেটে টাকা নেই। তখন নফস বলে, 'যা, চুরি করে নিয়ে আয়। তবু আম খেতে চাই।' এমতাবস্থায় আপনি নফসকে বলেন, 'চুরি করা ভালো না। তাই চুরি করা যাবে না।' তখন নফস বলে, 'আরে, আজকেই তো! আর করব না।' তখন আপনি নফসের ধোঁকায় পড়ে, চুরি করে ফেললেন। একবার আপনাকে দিয়ে চুরি করিয়ে সে ক্ষান্ত হয় না; পরের দিন আবার জাম খাওয়ার জন্য চুরির পথে অগ্রসর করে। এভাবে প্রতিনিয়ত একটার পর একটা নতুন কিছু চাইতেই থাকে। কিন্তু তবু সে পরিতৃপ্ত হয় না। হাতে থাকুক বা না-থাকুক, অসৎ উপায়ে হলেও আপনার দ্বারা তার মনোবৃত্তি পূরণ করবেই। একটার পর একটা চাইবেই।

নফস এরকম-ই। নফসকে আপনি কখনো পরিতৃপ্ত করতে পারবেন না। যত দিবেন, ততই তার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকবে। নফস কখনো বলবে না —আমার সমস্ত চাহিদা এবার পরিপূর্ণ হয়েছে; এখন আর আমার কিছুর প্রয়োজন নেই। এ- কথা সে কখনোই বলবে না, কেননা নফসের চাহিদা কখনো শেষ হয় না।

কোনো মানুষের সর্ব-চাহিদা এ- জীবনে কখনও পরিপূর্ণ হবে না। তাই, কেউ যদি ভাবে আমার নফস যা চায় তাই করবো, নফস যা বলবে তাই করবো, তবেই শান্তি পাবো—তাহলে তার ধারণা ভুল। নফসের চাহিদা পূরণ করে কখনো সে সুখের খোঁজ পাবে না। কেননা, নফসের বৈশিষ্ট্য হলো এক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর, অন্য চাহিদার দিকে মনোনিবেশ করা।

এজন্য, আপনি যদি মনে মনে নফসের গোলামী করার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে সারা জীবন তার গোলামী-ই করতে হবে। কারণ, সে সব সময় শুধু চাই চাই করবে, আর আপনাকে সর্বদা দিতেই হবে। দিতে দিতেই পুরো জীবন শেষ হয়ে যাবে; সুখের সাথে আর সাক্ষাৎ হবে না। সফলতার মুখ আর দেখতে হবে না। ইতি টানতে হবে সমস্ত সুখের গল্পে।

নফস হলো ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত। নফস কখনো তার ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না-যদি তা আম্মারাহ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাকে যতই দিবেন, ততই খাবে। যতই পান করাবেন, ততই পান করবে। যতই ভোগ করতে দিবেন, ততই সে ভোগ করবে; তবু তার তৃষ্ণা, তার ক্ষুধা, তার চাহিদা নিবারণ হবে না। তার কাছে শত পাওয়াও, না-পাওয়ার মতো।

এজন্যই, রাসুল সা. বলেছেন, 'কখনো প্রবৃত্তির পিছনে ছুটো না, কখনো নফসের অনুসরণ করো না। কেননা নফস তোমাকে ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিবে।' এজন্য আমাদের উচিত নফসকে নিয়ন্ত্রণ রাখা। তার চাহিদার ভ্রুক্ষেপ না করা।

দুই

আজকাল শোনা যায়-অমুকের মেয়েলি সমস্যা রয়েছে। আসলে এটা কী? মেয়েলি সমস্যা বলতে কী বুঝানো হয়েছে? বিষয়টা অনেকের কাছে পরিষ্কার, আবার অনেকের কাছে ঘোলাটে। এটা সত্যি, আজকাল অনেকের মধ্যেই মেয়েলি সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। এখন জানার বিষয় হচ্ছে, মেয়েলি সমস্যা কী?

মেয়েলি সমস্যা হচ্ছে, একজন যুবক মেয়েদের সাথে মিশতে মিশতে তাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে মেয়ে ছাড়া কিছুই বুঝে না। এক মেয়ে থেকে আরেক মেয়ে-এভাবে শুধু মেয়েদের পিছনেই ছুটতে থাকে। নিত্য নতুন মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়ানো তার নেশায় পরিণত হয়। একদিন এই ঘাটে, আরেকদিন ওই ঘাটে। একদিন এই নায়ে, অপরদিন ওই নায়ে-একের মধ্যে সে সীমাবদ্ধ থাকে না। হরেক রকম মেয়েদের সাথে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তার চিন্তা-চেতনায় শুধু মেয়েরাই ঘুরে। কীভাবে একটি মেয়েকে দ্রুত পটানো যায়, কীভাবে তাকে বশে আনা যায়—সে ভাবনায় বিভোর।

এটা একজন যুবকের জন্য খুবই ক্ষতিকর বদঅভ্যাস! এটা খুবই ধ্বংসাত্মক আসক্তি। এটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুবই কষ্টকর! যারা এই মেয়েলি সমস্যায় পতিত হয়েছে, তারাই বুঝতে পারে—এটা কত বড় নেশা! একটা ছেলে বিয়ের আগে এই কর্মকান্ডে লিপ্ত, তার মানে এই নয়—বিয়ের পর সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। বিয়ের পর এটা আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। বিয়ের পর সে তার স্ত্রীর উপর সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। পর নারীদের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। একাধিক মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। এতে করে সংসারে নেমে আসে, অশান্তির ঝড়! উক্ত ঝড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় প্রত্যাশিত সাজানো-গোছানো সংসার!

এই মেয়েলি সমস্যা নফসের তাড়নায়-ই হয়ে থাকে! একটি মেয়ের সাথে হারাম সম্পর্কে জড়ানোর পর, তাকে ভোগ করে অন্যত্র জাল ফেলে। একটি মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর, নফস তখন আরো মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রথমত নফস বলে,' মেয়েটার সাথে সম্পর্ক কর; এটাই ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট। আর লাগবে না।' কিন্তু কিছুদিন পর ঠিকই অন্য মেয়ের প্রতি আসক্ত করতে বাধ্য করে।

নফস প্রথমত এভাবেই ধোঁকা দেয়। একটি মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর, পরবর্তীতে আরো মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়াতে বলে। আপনি যখন তার ধোঁকায় পরে একটি সম্পর্কে জড়িয়ে গেলেন, তখন সে অন্যত্র জাল বিছানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়। তাই আমি বলি—নফসকে যত দিবেন সে ততই চাইবে। যদি মনে করেন এটাই ফার্স্ট, এটাই লাস্ট, তাহলে ভুল ভাবছেন।

শুধু মেয়েলি সমস্যা-ই না! যারা পর্ণ আসক্ত, যারা হস্তমৈথুনে অভ্যস্ত— তাদের জিজ্ঞেস করুন, তারা কীভাবে আসক্ত হয়েছে। প্রথমত নফস এই বলে ধোঁকা দিয়েছে—'এইতো, একবার পর্ণ দেখে নে'। একবার দেখলে কিছুই হবে না।' নফসের এই কৃত পরামর্শ যখন কানে নিয়ে নিলেন, তখনই আটকে গেলেন ধ্বংসের বেড়াজালে! একবার পর্ণ দেখার পর, নফস আবার বলে, 'আরেকবার দেখে নে', কিচ্ছু হবে না।' আপনি তখন নফসের চাহিদা পূরণ করতে আবার দেখে নিলেন। ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। এভাবে প্রতিনিয়ত সে আপনাকে ধোঁকা দিচ্ছে। প্রতিদিন এই বলে ধোকা দিচ্ছে—'আজ-ই শেষ দিন, আর কখনো দেখবো না।'

ঠিক হস্তমৈথুনের বেলায়-ও একই কথা। প্রথমত নফস বলে, 'আজ-ই ফার্স্ট, আজ-ই লাস্ট; আর কখনো হস্তমৈথুন করতে হবে না।' নফসের এই কুত পরামর্শ যখন কানে নিয়ে নিলেন, তখন সে আপনাকে দিয়ে প্রতিনিয়ত হস্তমৈথুন করালো। এখন নফস বলে, 'আজ-ই শেষ দিন; আর কখনো হস্তমৈথুন করবো না। কিন্তু পরক্ষণেই এই কথা ভুলে গিয়ে আপনি আবার হস্তমৈথুনে অগ্রসর হন।

নফস এরকমই! তাকে আপনি যতই দিবেন, ততই চাইবে। সে কখনো নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন মানুষকে সকল অপকর্মে আসক্ত করার পিছনে মূল হচ্ছে এই নফস। নফস কোনো একটি অপকর্ম আপনাকে দিয়ে সম্পাদন করতে চাইলে আপনি যদি তার ধোঁকায় পরে উক্ত অপকর্ম করে ফেলেনে, তখন প্রতিনিয়ত আপনাকে দিয়ে সে ঐ কাজটাই করাবে। একপর্যায়ে তা নেশায় পরিনত হয়ে যাবে। মনে রাখবেন—ধোঁকা দিতে নফসের সবচে বড় হাতিয়ার হলো,' আজ-ই ফার্স্ট, আজ-ই লাস্ট।'

"আজ-ই ফার্স্ট, আজ-ই লাস্ট। আজকেই শেষ বার। কাল থেকে ভালো হয়ে যাব। একদম কোমর বেঁধে নামব। আর পাপ কাজে জড়াব না। আর কোনো দিন নামাজ কাজা করব না"—এই কথাগুলো যদি আপনার মাঝে স্থান করে নেয়, তাহলে কালবিলম্ব না-করে দ্রুত নফসের চিকিৎসা করুন। কেননা, এগুলো শ্রেফ নফস আর শয়তানের ধোঁকা। এই ধোঁকায় পড়ে থাকলে কখনো গোনাহের রাজ্য থেকে ফিরে আসা হবে না। কাল কাল করতে করতেই বেজে যাবে পরকালের ঘন্টা—ফেরা আর হবে না। ফিরবো ফিরবো বলে ফিরে যেতে হবে, সৃষ্টির উপাদান সেই মাটিতেই।

📘 নফসের বিরুদ্ধে লড়াই 📄 নফস ঠিক তো, সব ঠিক

📄 নফস ঠিক তো, সব ঠিক


এক

একটি গাড়ি। তার রয়েছে বিভিন্ন পার্টস। সাথে থাকে তার মূল ইঞ্জিন-যা ছাড়া পুরো গাড়িটাই অস্তিত্বহীন। ইঞ্জিনের উপর নির্ভরশীল গাড়ির পুরোটা বডি। অপরদিকে পুরো গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ করে একজন ড্রাইভার। ড্রাইভার যে-ভাবে চালাবে গাড়িটাও সেভাবেই চলবে। সে যদি আস্তে চালায়, গাড়িটাও আস্তেই চলবে। সে যদি জোরে চালায়, গাড়িটাও জোরে চলবে। সে চাইলে গাড়িতে হালাল পণ্য বহন করতে পারে, আবার হারাম পণ্য-ও বহন করতে পারে। চাইলে ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারে, আবার খারাপ কাজেও ব্যবহার করতে পারে। মোটকথা, পুরো গাড়িটাই ঐ ড্রাইভারের নিয়ন্ত্রণে।

ঠিক আমরাও ঐ গাড়ি'র মতোই। গাড়ি'র যেমন বডি রয়েছে, ঠিক আমাদেরও রয়েছে এক মানব দেহ। গাড়ি'র যেমন ইঞ্জিন রয়েছে, ঠিক আমাদেরও একটি ইঞ্জিন রয়েছে। গাড়ি'র যেমন চালক রয়েছে, ঠিক আমাদেরও রয়েছে কোনো এক নিয়ন্ত্রক। আমরা দেহবিশিষ্ট একজন মানুষ। আমাদের মূল ইঞ্জিন হচ্ছে, রুহ। আর আমাদের পুরো দেহের নিয়ন্ত্রক (চালক) হচ্ছে, 'নফস'। অর্থাৎ, আমাদের শরীরের ড্রাইভার হচ্ছে, নফস। যেমনি-ভাবে একজন ড্রাইভার পুরো গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি নফস আমাদের পুরো দেহটা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই, আমাদের উচিত আমাদের ড্রাইভারকে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া। গাড়ির ড্রাইভারকে যদি ঠিকঠাক প্রশিক্ষণ দেয়া না-হয়, তাহলে যেমনি-ভাবে অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে; ঠিক তদ্রুপ, আমাদের নফসকে যদি আমরা ঠিকঠাক প্রশিক্ষণ না দিই, তাহলে আমাদের জীবনেও এক্সিডেন্টের আশঙ্কা সুনিশ্চিত।

একজন মাতাল ড্রাইভার যেমনি-ভাবে তার গাড়ির জন্য আশঙ্কাজনক, তদ্রুপ নফসে আম্মারাও আমাদের জন্য খুবই আশঙ্কাজনক। একজন মাতাল ড্রাইভার সবসময় চাইবে তার গাড়িটাকে ব্যবহার করে হারাম পন্য বহন করতে, তদ্রুপ আমাদের নফসে আম্মারাও সবসময় চায়, আমাদের ব্যবহার করে খারাপ কাজ সম্পাদিত করতে। তাই, সর্বপ্রথম আমাদের নফসকে এসলাহ করতে হবে। ড্রাইভারকে ঠিক না করলে যেমনিভাবে গাড়িটি নিরাপদ নয়, তেমনি আমাদের নফসকে এসলাহ না করা অবধি আমরা নিজেরাও নিরাপদ নই।

কে না চায় নিরাপদে থাকতে! সবাই চায় নিরাপদে থাকতে। এজন্য, সবাই যানবাহন ব্যবহার করার পূর্বে দেখে নেয়, ড্রাইভার ঠিকঠাক কি-না! সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কি-না! তাইতো দেখা যায়, প্রশাসন কর্তৃক বিভিন্ন চেকপোষ্টে গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকে পরীক্ষা করা হয়। দেখা হয়- ড্রাইভার নেশা-টেশা করেছে কি-না। যদি সে নেশাগ্রস্ত হয়, তখন সেখানেই তাকে আটকে দিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। কেননা, একজন ড্রাইভার পুরো গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ করে। এখন ড্রাইভার যদি হয় মাতাল, তখন গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারানোর সমূহ সম্ভাবনা তো থেকেই যায়।

এটা আমরা সবাই বুঝি এবং মানি। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করি। কিন্তু আফসোসের বিষয়-আমাদের জীবনের প্রধান ড্রাইভার 'নফসের' ব্যপারে খুবই উদাসীন! আমাদের সব কিছুর নিয়ন্ত্রক যে মাতাল হয়ে পড়ে আছে-সেদিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করার জন্য এই নফস-ই যথেষ্ট!

তাই, সর্বপ্রথম আমাদের নফসকে এসলাহ করতে হবে। নফসকে ঠিক করতে হবে। নফস ঠিক তো, সবই ঠিক! নফস ঠিক নয়, কোনো কিছুই ঠিক নয়!

দুই

আমরা ইতিপূর্বে জানতে পারলাম-নফস ঠিক তো সব ঠিক। নফসের বেড়াজাল থেকে মুক্তির জন্য অবশ্যই তাকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নফস মাতাল হয়ে যেন আমাদের জন্য আশঙ্কাজনক না-হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। এজন্য যত কষ্টই হোক, নফসের বিরুদ্ধে যেতেই হবে। নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অসুস্থ নফসকে আবার সুস্থ করে তুলতে হবে। যখন নফস চাইবে—একটু টিভি দেখি, খারাপ খারাপ সিন দেখি, তখন নফসকে বারণ করে রাখতে হবে। তার চাহিদার মূল্যায়ন না করে, তার বিপরীত করতে হবে; যদিও তার কষ্ট হয়।

সূচনাকালে কষ্ট কিছুটা হবেই। কেননা, টিভি দেখা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর অভ্যাস হুট করে স্বাভাবিক হয় না। হুট করে অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। তাই, যতক্ষণ না টিভি দেখবে ততক্ষণ পর্যন্ত নফসের শান্তি আসবে না; হা-হুতাশ করতে থাকবে, অস্বস্তি বোধ করতে থাকবে। নফস যতই কষ্ট পাক, যতই হা-হুতাশ করুক, থমকে গেলে চলবে না। নফসের হা-হুতাশ, নফসের অস্বস্তি দেখে নফসের চাহিদার গুরুত্ব দিলেই আপনি শেষ।

নফস, একটি দুর্বল সিংহ। যখন আপনি এর বিরোধিতা করবেন; তখন সিংহ নামক নফস, বিড়ালে পরিনত হবে। তাই, আপনার প্রচেষ্টা থেমে গেলে চলবে না ! চেষ্টার সর্বোচ্চ স্তর তার উপর প্রয়োগ করুন। ইনশাআল্লাহ, নফস ধীরে ধীরে তার ফিতরাতে প্রত্যাবর্তন করবে。

নফস হলো দুধ পান করা বাচ্চার মত। একজন মায়ের কাছে তার সন্তান কতোটা প্রিয়, তা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। বাচ্চা জন্মগ্রহণ করার পর সাধারণত মায়ের বুকের দুধ পান করে। আর পান করাটা একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বহাল থাকে। সবকিছুর একটা নির্ধারিত সময় থাকে, তেমনি দুধপানেরও একটি নির্ধারিত সময়ে রয়েছে। যখন সে নির্ধারিত সময় এসে যায়, তখন মা তার বাচ্চাকে দুধ ছাড়ানোর চেষ্টায় নিয়োজিত হয়।

মা যখন বাচ্চাকে দুধ ছাড়াতে যায়, বাচ্চা তখন হাউ-মাউ করে কাঁদতে শুরু করে। চিৎকার করতে থাকে। মা জানে, দুধ ছাড়তে বাচ্চার কষ্ট হবে, দুধ ছাড়াতে গেলে সে কান্না করবে, চিৎকার চেঁচামেচি করবে, নিজে ঘুমাবে না, তাকেও ঘুমাতে দিবেনা— তবু সে দুধ ছাড়ানোর চেষ্টা করে। তার যতই কষ্ট হোক, সে যতই চেঁচামেচি করুক, যতই কষ্ট দিক—তবু তার দুধ ছাড়াবেই। কারণ, সে জানে, এতেই তার কল্যাণ নিহিত। মা জানে, এখন যদি তার দুধ না-ছাড়ানো হয়, তবে সে ভাত-রুটি খাওয়ার উপযুক্ত হবে না। এজন্য, তাকে দুধ ছাড়ানো লাগবেই।

ধরে নিন, নফস হচ্ছে দুধ বাচ্চা। আর আপনি হলেন তার মা। আপনি দেখছেন সে যদি খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে তবেই মঙ্গল। এজন্য যত কষ্টই হোক, সেটাই করতে হবে, যা তার জন্য কল্যাণকর।

কষ্ট হবে ভেবে নফসকে যদি তার চাহিদা অনুপাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন এর ফলাফল ভয়াবহ হবে, এটা সুনিশ্চিত। এক ব্যক্তির নজরে সমস্যা, মেয়েদের দিকে না তাকালে শান্তি মিলে না। এক ব্যক্তি সুদি কারবারের অভ্যস্ত, কারো মিথ্যা বলার অভ্যাস, কারো গীবত করার অভ্যাস, কারো পর্ণ দেখার অভ্যাস—এখন যদি তাকে এ- সমস্ত কাজ থেকে দূরে রাখা হয়, তখন সে কষ্ট পাবে—এটাই স্বাভাবিক। সবকিছু বাস্তবায়ন করে নফস। এখন যদি তার কর্মে বাধা দেয়া হয়, তখন কিঞ্চিৎ ব্যথিত তো হবেই। এখন যদি নফসের কষ্টের কথা ভেবে তাকে সকল কৃত কর্মে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে কোনো দিন অপকর্ম থেকে সে বের হয়ে আসতে পারবে না। আজীবন পাপের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে হবে। এজন্য, পাপ কাজ থেকে বের হয়ে আসার জন্য নফসের বিরুদ্ধে যাওয়াটা অতিব প্রয়োজনীয়। যত কষ্টই হোক, নফসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। যত কষ্টই হোক, তার বিরোধিতা করতেই হবে। আবারো বলছি, 'নফস ঠিক তো, সব ঠিক'।

ফন্ট সাইজ
15px
17px