📄 কে সবচেয়ে বড় শত্রু, শয়তান নাকি নফস?
এক
শয়তান হচ্ছে এডভাইজার, আর নফস হচ্ছে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। শয়তান পরামর্শ দিয়ে থাকে, আর নফস তা বাস্তবায়ন করে। শয়তান মানুষকে পাপকাজের পথ দেখিয়ে দেয়; আর নফস আপনাকে আমাকে নিয়ে সে পথে হাঁটে। তো দেখা যাচ্ছে—নফস এবং শয়তান দু'টোই আমাদের শত্রু। আমাদের দ্বারা যতগুলো পাপ কাজ সংঘটিত হয়, সব কিছুর পিছনে এ- দু'জনের হাত রয়েছে। তাহলে কে সবচে' বড় শত্রু? শয়তান, নাকি নফস?
অনেককে দেখা যায়—বিভিন্ন পাপ কাজ করার পর বলে থাকে, 'আরে ভাই! আর বলবেন না, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে এটা করে ফেলেছি, ওটা করে ফেলেছি।' একবারও কিন্তু বলে না—'নফসের ধোঁকায় এটা করেছি, নফসের ধোঁকায় ওটা করেছি।' সে মনে করে, শয়তান-ই তার সবচে' বড় শত্রু। অথচ, নফস নামক এক ভয়ংকর শত্রু যে তার অভ্যন্তরে বসে আছে, সেটা কি তার খেয়াল আছে? নফস আপনাকে আমাকে নিয়ে খেলছে। তার ইচ্ছামত নাচাচ্ছে। আর আজ আপনি আমি ভাবছি— শয়তান-ই সবচে' বড় শত্রু; নফস আবার কীসের শত্রু!
আচ্ছা বলুন তো—শুধুমাত্র শয়তান-ই যদি আমাদেরকে গুমরাহ করে, তো শয়তানকে গুমরাহ করেছে কে? শয়তান-ই যদি আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে, তো শয়তানকে পথভ্রষ্ট করলো কে? শয়তানের পূর্বে তো কোনো শয়তান ছিলো না, তাহলে শয়তানকে দিকভ্রান্ত করলো কে? শয়তানকে দিকভ্রান্ত করেছে তার 'নফস'। নফস তাকে অহংকারী বানিয়েছে। নফস তাকে উদ্যত করেছে। নফস তাকে দিশেহারা করেছে। নফস তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। এতদসত্ত্বেও, কেন আজ নফসের ব্যাপারে আমরা এত উদাসীন?!
ইবলিশ অনেক ইবাদত গুজারি ছিলো। সে পথভ্রষ্ট হওয়ার আগে, এত বেশি ইবাদত বন্দেগী করেছে, তার সেই ইবাদতের সাথে আমাদের ইবাদতের তুলনা করলে, নিজের ইবাদতকে খুবই স্বল্প মনে হবে। এতদসত্ত্বেও, নফস কিন্তু তাকে দিকভ্রান্ত করে দিয়েছে। তাহলে এই নফস আপনাকে আমাকে দিশেহারা করার জন্য কি যথেষ্ট নয়? এই নফস আপনাকে আমাকে বিপথগামী করার জন্য যথেষ্ট নয়? তাহলে আজ নফসের ব্যপারে কেন এত বেখেয়াল? আরে, পাপ কাজের চিন্তা-চেতনা লালন করে এই নফস। পাপ কাজ সম্পাদন করে এই নফস। পাপ কাজের পরিকল্পনা করে এই নফস। আর শয়তান? শয়তান তো কেবল পরামর্শ দেয়; পথ দেখিয়ে দেয়। এজন্যই তো ময়দানে মাহশারে শয়তান বলবে, 'আমার কী দোষ? আমি তো তোর হাত ধরে গোনাহ করাইনি; আমি তো কেবল রাস্তা দেখিয়েছি, বাকি সব তো তুই নিজেই করেছিস।' শয়তান যদিও এ-কথা বলবে, তবু সে অপরাধী।
যাহোক, যেটা বলছিলাম-শয়তান আমাদের বড় শত্রু; নাকি নফস? এখন নিজেই চিন্তা করে দেখুন, কে আমাদের বড় শত্রু, শয়তান নাকি নফস। মনে রাখবেন, শয়তানের পূর্বে কিন্তু কোনো শয়তান ছিলো না; নফস তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। তাই ধরে নিন, আমাদের সবচে' বড় শত্রু নফস। এটা আমাদের ভিতরেই অবস্থান করে। এটাই আমাদের বড় শত্রু। এই নফসের উপর যদি লাগাম দেয়া যায়, তবে শয়তানের পরামর্শ কোনো কাজেই আসবে না। নফস ঠিক হলে শয়তান আপনাকে কখনোই বিভ্রান্ত করতে পারবে না।
মনে রাখবেন-নফস কিন্তু শয়তানের বন্ধু। এই বন্ধুর হাত ধরেই শয়তান আমাদের মধ্যে বিচরণ করে। শয়তান সর্বপ্রথম নফসের সাথে বন্ধুত্ব করে; অতঃপর, তাকে বিভিন্ন পাপকাজের পরামর্শ দেয় এবং বিভিন্ন অশ্লীল, নোংরা কাজকে তার কাছে সুশোভিত করে তোলে। ফলে, নফস তখন সে কাজ বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে যায়। তাই, সর্বপ্রথম আমাদের নফসকে পরিশুদ্ধ করতে হবে; নফসের উপর লাগাম দিতে হবে। যদি নফসের উপর লাগাম না দিই, তাহলে শয়তান এসে নফসের সাথে বন্ধুত্ব করে আপনার আমার উপর পাপের বোঝা চাপিয়ে দিবে।
দুই
আমরা জানতে পেরেছি-নফস এবং শয়তানের মধ্যে একটা যোগসূত্র রয়েছে। তাদের পরস্পরের মধ্যে একটা কমিউনিকেশন রয়েছে। দু'জন-ই এক নায়ের মাঝি। একজন পাল তুলে রাস্তা দেখিয়ে দেয়, অপরজন সেদিকে বৈঠা চালায়। তারা একজন ছাড়া অন্যজন কিছুটা অপূর্ণ। শয়তান পথ দেখিয়ে দেয়, আর নফস সেই পথে হাঁটতে শুরু করে। শয়তানের সমস্ত কাজ নফসের উপর নির্ভরশীল। নফস ছাড়া সে কখনোই তার কৃত-পরিকল্পনায় সফল হতে পারে।
ধরুন-মনে মনে পরিকল্পনা করলেন আপনি সিনেমা দেখতে যাবেন। আর এই পরিকল্পনা আপনার নফস আপনাকে বাতলে দিয়েছে। আপনার নফস সিনেমা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে। এদিকে তার মনে এক ধরনের ভয় কাজ করছে-ইশ, সিনেমা দেখতে যাবো-কেউ যদি দেখে ফেলে? আমার মা-বাবা যদি জেনে ফেলে? আর তাছাড়া, টাকাই-বা পাবো কোথায়? এমতাবস্থায় আপনার নফস হতবুদ্ধি হয়ে যায়। মনে মনে ভাবতে থাকে, টাকা কোথায় পাবো? তখন-ই শয়তানের পরামর্শ শুরু হয়ে যায়। শয়তান তখন চুরি করার নানান পন্থা বাতলে দেয়। শুধু তাই নয়-কীভাবে সবার অগোচরে সিনেমা হলে যাওয়া যায়, সেই পরামর্শ শয়তান-ই দিয়ে থাকে। তখন আপনার নফস নতুন করে সাহস যুগিয়ে ফেলে। ফলে, তার পক্ষে কর্মটি সম্পাদন করা খুবই সহজ হয়ে যায়। এটাই হচ্ছে শয়তান এবং নফসের এক অনন্য সেতুবন্ধন। তাই আমাদের উচিত, নফস এবং শয়তানের সেই সেতুবন্ধনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা।
আপনি শয়তানের উপর কোনো ধরনের প্রভাব খাটাতে পারবেন না। কেননা, সে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাহিরে। তবে, নফস কিন্তু আমাদের গন্ডির ভিতরে। সে আমাদের ধরাছোঁয়ার ভিতরেই। তাই, শয়তানের কুপরামর্শ থেকে বাঁচতে হলে, অবশ্যই আপনার আমার প্রভাব নফসের উপর খাটাতে হবে। এর জন্য উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে—তাদের উভয়ের চিন্তা- চেতনা কর্মপদ্ধতি ইত্যাদির মধ্যে ভিন্নতা তৈরি করা। এতে করে উভয়ের সেতুবন্ধন এমনি এমনি ছিন্ন হয়ে যাবে।
আমরা সাধারণত যখন বন্ধু নির্বাচন করি, তখন ঠিক আমাদের মতন একজনকেই বেছে নিই। যেমন: কোনো বন্ধু নির্বাচন করার পূর্বে আমরা দেখে নিই—তার চিন্তা-চেতনা, তার স্বভাব, তার চালচলন ইত্যাদি বিষয় আমার মতনই কি-না! যখন অপর জনের চিন্তা-চেতনা, চালচলন, স্বভাবজাত ইত্যাদি আমাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়, তখন আমাদের মাঝে একটা বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক গড়ে উঠে। আমরা জানি, বিপরীত চিন্তাধারার, বিপরীত স্বভাবের দু'জন ব্যক্তি কখনো বন্ধু হতে পারে না! ঠিক তদ্রুপ, নফস আর শয়তান যদি বিপরীতমুখী হয়, তবে তাদের মাঝেও কখনো বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারবে না। এজন্যই, আপনার নফস যখন শয়তানের কর্মপদ্ধতি, শয়তানের চিন্তা-চেতনা, ইত্যাদি সর্ববিষয়ে বিপরীত হয়ে যাবে, তখন শয়তান এবং নফসের মধ্যে কোনো ধরনের সেতুবন্ধন থাকবে না। আর তাদের উভয়ের মধ্যে যদি একটা যোগসূত্র না থাকে, তখন ধীরে ধীরে নফস আপনার আমার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে; নফসের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত থাকা যাবে।
এজন্য যেটা করতে হবে—শয়তান যা চায়, এর বিপরীত কাজটাই আপনাকে আমাকে করতে হবে। যেমন: শয়তান চায় আপনি ফজরের সময় নামাজ না পড়ে ঘুমিয়ে থাকেন। সাথে সাথে নফসও আরামের জন্য এরকমটাই চায়। এখন আপনার কাজ হচ্ছে নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে শয়তানের চাহিদার বিপরীত করা। শয়তান চায় আপনি গোনাহের মধ্যে লিপ্ত হন। ঠিক তখন যদি আপনি গোনাহ থেকে বিরত থাকতে পারেন, দেখবেন আপনার নফস ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। ধীরে ধীরে সে এসলাহ হচ্ছে। তাই, সৎ কাজের জন্য, নফসের উপর সব সময় জোরজবরদস্তি করতে হয়। পক্ষান্তরে, গোনাহের কাজ থেকে বিরত থাকার জন্যও, নফসের বিরুদ্ধে জোরজবরদস্তি চালাতে হবে। যখন আপনি আপনার জোরজবরদস্তি বহাল রাখবেন, তখন নফস-ও তার খারাপ চিন্তা ধারার অস্তিত্ব হারাবে। আর যখন নফসও তার খারাপ চিন্তা ধারার অস্তিত্ব হারিয়ে এসলাহ হয়ে যাবে, তখন সে সম্পূর্ণভাবে শয়তানের চিন্তাধারার বিপরীত হয়ে যাবে। আর যখন নফস শয়তানের বিপরীত হয়ে যাবে, তখন এমনি এমনি তাদের মধ্যকার কমিউনিকেশন বন্ধ হয়ে যাবে।
এতকিছু করার পর শয়তান আগের মত ঠিকই নফসকে কুপরামর্শ দিবে; কিন্তু নফস যখন এর বিরুদ্ধাচরণ করবে, তখন শয়তানও বিরক্তবোধ করবে। এমতাবস্থায়, নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনা আপনার আমার জন্য অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
📄 নফসের ভিত্তিতে সৃষ্টির সেরা জীব
এক
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। ফেরেশতাদের ওপরও মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে—এটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। তবে এটা কি জানি, সেই শ্রেষ্ঠত্ব লাভে নফসেরও ভূমিকা রয়েছে? ফেরেশতারা সব সময় আল্লাহ তাআলার ইবাদতে নিয়োজিত থাকে। কখনো তারা আল্লাহ তাআলার হুকুম অমান্য করে না; কিন্তু মানুষ আল্লাহ তাআলার কত হুকুমই-না অমান্য করে। তবুও মানুষকে ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। এর কারণ, ফেরেশতাদের মধ্যে নফস নেই, নেই কোনো অনুভূতি শক্তি। তাদের মধ্যে কেবল জীবনী শক্তি বিদ্যমান; কোনো অনুভূতি শক্তি নেই। তাদের পেটের ক্ষুধার অনুভূতি নেই; নেই যৌবনের ক্ষুধার অনুভূতি। কিন্তু মানুষের মধ্যে সেই অনুভূতি দান করা হয়েছে। আর সেই অনুভূতি শক্তির নাম হচ্ছে নফস বা প্রবৃত্তি। আল্লাহ তাআলা মানুষদের নফস দান করেছেন, যার কারণে সমস্ত সৃষ্টি কুলের মধ্যে মানুষ সেরা। নফস যখন আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে, তখন সেই নফসকে এসলাহ করা আমাদের উপর কতটা গুরুত্বপূর্ণ—একবার কি ভেবে দেখেছেন? আপনি নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করলেই আপনি সকলের উপর শ্রেষ্ঠ। যদি তা না করে নফসের ধোঁকায় পড়ে তার গোলামী করতে শুরু করেন, তখন কি আর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হবে? না, নফসের গোলামী করে, নফসকে অপবিত্র রেখে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হবে. না। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হলে অবশ্যই আপনাকে নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এবং বিজয় অর্জন করতে হবে। বস্তুত, আপনি আমি কি সেটা করছি?
দু'জন ব্যক্তিকে দু'টি জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হল, বলা হলো—দু'জনকে এই জঙ্গল অতিক্রম করে অপর প্রান্তে যেতে হবে। একটি জঙ্গল একদম নিরাপদ- নেই কোনো বাধা, নেই কোনো ভয়ংকর জানোয়ার।
অপরদিকে, অন্য জঙ্গলে রয়েছে নানান বাধা-বিপত্তি, পথিমধ্যে রয়েছে খাল-বিল ইত্যাদি। তার ওপর সাপ, ভয়ংকর জানোয়ার-বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ, ইত্যাদি তো রয়েছেই। তারা দু'জনেই জঙ্গল অতিক্রম করে অপর প্রান্তে গেল। একজন আরামসে-কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই; কোনো জানোয়ারকে হত্যা করা ছাড়াই। অপরদিকে, অন্যজন নানান বাধা-বিপত্তির মোকাবেলা করে, সাপ, বাঘ, ভাল্লুক, সিংহকে হত্যা করে অপর প্রান্তে পৌঁছেছে। এখন বলুনতো-কাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হবে? অবশ্যই তাকে, যে নানান বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে, ভয়ঙ্কর জানোয়ারকে হত্যা করে অপর প্রান্তে পৌঁছেছে। তাকেই পুরস্কৃত করা হবে, যে নানান বাধা-বিপত্তির মোকাবেলা করেছে; তাকে নয়-যার রাস্তায় কোনো বাধা ছিলো না।
ঠিক এভাবেই, ফেরেশতাদের ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের কোনো জৈবিক চাহিদা নেই। পাপ কাজে জড়ানোর সেই মন মানসিকতা নেই। নেই তাদের কোনো অনুভূতি শক্তি। নেই যৌবনের চাহিদা, নেই ভক্ষণের চাহিদা। তাই, তাদেরকে কোনো কিছুর মোকাবেলা করতে হয় না। কোন বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় না।
নফস হচ্ছে লবণের মতো। লবণ ছাড়া যেমনি-ভাবে খাবারের কোনো মূল্য নেই; তেমনি নফস ছাড়াও মানুষের কোনো মূল্য নেই。
আপনি গরুর গোশত রান্না করলেন, কিন্তু লবণ দিলেন না। এটা কি আর খাবারের উপযুক্ত থাকবে? লবণ ছাড়া তরকারির স্বাদ পাবেন? পাবেন না। লবণ ছাড়া তরকারির কোনো মূল্যই নেই। এটা কেউ খেতেই পারবে না। ঠিক নফসের ক্ষেত্রেও এরকম-নফস ছাড়া আপনি যতই ইবাদত করেন, তার কোনো স্বাদ থাকবে না। ওই ইবাদতের কোনো বিনিময় থাকবে না। যেমন: ফেরেশতাদের নফস নেই। তাদের ইবাদতের কোনো মূল্য নেই এবং এই ইবাদতের কোনো বিনিময়ও নেই। তারা শুধু তাদের রবের হুকুম মান্য করছে। তাদের আমলের দরুন তারা কিছুই লাভ করবে না। পক্ষান্তরে, যাদের মধ্যে নফস রয়েছে অর্থাৎ ‘মানুষ’, তারা যদি একবার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে, সাথে সাথে তার আমলনামায় শত শত নেকি যুক্ত হয়ে যায়। যতই ইবাদত করবে, যতই নেক আমল করবে; এর বিনিময় হিসেবেও পরকালে পাবে অফুরন্ত পুরস্কার। আর এটা হয়ে থাকে কেবল নফসের-ই কারণে। এই নফস যদি না থাকতো, তবে কি সেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানিত হতো? এই নফসের কারণেই আপনার শ্রেষ্ঠত্ব; আপনার কবুলিয়্যাত।
ওপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়-শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয় কর্মের গুণে। আর সবকিছুর ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার কারণ হচ্ছে, আমরা নফসের বিরুদ্ধে মুজাহিদ। যে ব্যক্তি নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় অর্জন করেছে, নফসের গোলামী থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছে-সে-ই প্রকৃতপক্ষে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন-আপনি আমি কি সত্যিই নফসের বিরুদ্ধে মোজাহিদ? সত্যি কি আমরা নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করছি? সত্যি কি আমরা নফসের হুকুম অমান্য করে রবের হুকুম মেনে চলছি? যদি আপনার উত্তর হয়, ‘না’, তাহলে আপনি কীসের সৈনিক, কীসের মুজাহিদ? আর কোন ভিত্তিতে আপনি সৃষ্টির সেরা জীব?
আচ্ছা, আপনি আমি সৃষ্টির সেরা জীব-এটা কি আমাদের কাজে-কর্মে, আমাদের চিন্তা-চেতনায় প্রকাশ পায়? বলতে পারছেন না? তাহলে আসুন, নিজের অবস্থান সম্পর্কে আরেকটু জানি। আসুন নিজেকে হায়ওয়ান -এর সাথে একটু পর্যালোচনা করে দেখি...
আল্লাহ তাআলা হায়ওয়ান -এর ওপর মানুষকে এক বিশেষ বিশেষণে বৈশিষ্ট মন্ডিত করেছেন। সেটা হলো-আকল, বুদ্ধি, বিবেক। যেন তা দ্বারা সে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম, ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। কল্যাণ-অকল্যাণ ইত্যাদি বিষয়ও অনুধাবন করতে পারে। শুধু তাই নয়-এর দ্বারা যেন, তার জৈবিক চাহিদার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম-এর মধ্যে পার্থক্য করে চলতে পারে। বস্তুত, এতেই তার মনুষত্ব ও মানবিক দিকের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে। তাই, কেউ যদি তার নফসের গোলামী করে—ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম বিবেচনা না-করে জৈবিক চাহিদা পূরণ করে, তবে তার আর হায়ওয়ান -এর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে কি?
আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা ছাড়া-মানুষ, জিন, হায়ওয়ান, সবার মধ্যে নফস দিয়েছেন। সবার মধ্যে একটা জৈবিক চাহিদা দান করেছেন। আর সেই চাহিদা হলো-যৌন চাহিদা, খাবারের চাহিদা, আরাম আয়েশের চাহিদা, ইত্যাদি। মানুষের মধ্যে যেমনি-ভাবে এই চাহিদাগুলো বিদ্যমান। ঠিক তদ্রুপ, হায়ওয়ানের মধ্যেও এরকম জৈবিক চাহিদা রয়েছে; তারাও তাদের নফসের তাড়নায় এই চাহিদাগুলো পূরণ করে। (মানুষ এবং হায়ওয়ানের মধ্যে চাহিদার ক্ষেত্রেও কমবেশির তারতম্য রয়েছে) তবে হায়ওয়ান এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য, মানুষকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে। যেন, সে এটার মাধ্যমে ভালো-মন্দ সবকিছু পার্থক্য করতে পারে। হালাল-হারাম চিহ্নিত করে জীবন-যাপন করতে পারে। কিন্তু, আজকাল দেখা যায়-নফসের তাড়নায় কিছু মানুষ, তাদের আকল, বিবেক, বুদ্ধি সব হারিয়ে ফেলেছে। ফলে, সব কিছু তার পশু- সুলভ হয়ে গেছে।
বস্তুত, হায়ওয়ান কেবল তাদের জৈবিক চাহিদা পূরণে ব্যস্ত। পেট আর লিঙ্গ হচ্ছে তাদের চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর। তাই বলা যেতে পারে-মানুষের মধ্যে যারা শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যস্ত; পেট আর লিঙ্গ তাদের চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর, তারা তো পশুর চেয়েও আরো বেশি নিকৃষ্ট। পশুর চেয়ে আরো বেশি নিকৃষ্ট এ- কারণে যে-মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণ করার জন্য শরীয়তের কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে; রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। তাই, সে যদি জৈবিক চাহিদা পূরণ করার জন্য সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তখন তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। পক্ষান্তরে, পশুর ক্ষেত্রে এরকম সীমাবদ্ধতা নেই। নেই তাদের কোনো বিধি-নিষেধ: নেই কোনো হিসাব-নিকাশের দায়বদ্ধতা। কিন্তু মানুষ?
এখানে আমি কেন পশুর আলোচনা করলাম? করেছি এ কারণে যে, আজকাল অনেক মানুষ পশু-সুলভ হয়ে গেছে। তারা তাদের বিবেক-বুদ্ধি সবকিছু খুইয়ে ফেলেছে। তারা এখন আর ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। হালাল-হারাম মেনে জীবন-যাপন করে না। তাদের জীবন-ব্যবস্থা হয়ে গেছে অনেকটা পশুদের মত। বললাম না-পশুর চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে, পেট এবং লিঙ্গ। এখন আমাদের সমাজের কিছু মানুষেরও চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর, পেট এবং লিঙ্গ। তারা খাওয়া-দাওয়া আর যৌবনের চাহিদা মিটানো ছাড়া, অন্য কিছু ভাবেই না। তার কারণ হচ্ছে, সে নফসের কাছে পরাজিত; তার নফস লাগামহীন। আর এই লাগামহীন নফস, তাকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বানিয়েছে।
দুই
নফসকে তুলনা করা যায় জমির সাথে...। জমি যখন আগাছায় ভরপুর হয়ে যায়, তখন জমি তার উর্বরতা হারিয়ে ফেলে। ঠিক তদ্রুপ, কিছু কিছু নফস যখন ইসলামবিদ্বেষী নানান কর্মকান্ড নামক আগাছায় ভরপুর হয়ে যায়, তখন ঐ নফসও তার উর্বরতা হারিয়ে ফেলে। সব জমি এক নয়; কিছু কিছু জমি আছে, যাতে উৎকৃষ্ট মানের ফসলের পরিবর্তে, নানান ধরনের আগাছা, লতাপাতা, কাটা-বৃক্ষ জন্ম নেয়। ঠিক তদ্রুপ, কিছু কিছু নফসও এরকম-যাতে ইসলামবিদ্বেষী নানান কর্মকাণ্ড, ফেতনা-ফাসাদ, অপসংস্কৃতি, কুফরী, শিরক ইত্যাদি বাসা বাঁধে।
এজন্য, জমি থেকে উৎকৃষ্টমানের শস্য পেতে হলে তার যত্ন নিতে হবে, আগাছা পরিষ্কার করতে হবে, উত্তম ভাবে হাল-চাষ করতে হবে। পরিমাণ মতো পানি দিতে হবে, কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তবেই সেখান থেকে ভালো ফসল আশা করা যাবে। ঠিক আমাদের নফসটাও এরকমই। যখন দেখবেন, নফস তার উর্বরতা হারিয়ে ফেলেছে, লাগামহীন হয়ে গেছে, তখনই অনতিবিলম্বে তাকে এসলাহ করতে হবে, তার প্রয়োজনীয় খাবারের বন্দোবস্ত করতে হবে। যেমন: জিকির-আজকার, কুরআন তেলাওয়াত, নফল ইবাদত ইত্যাদি। অতঃপর, তার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। তবেই নিজের আত্মিক উন্নয়ন ঘটবে। আর যদি আগাছা মুক্ত না রাখেন, তবে উক্ত আগাছা তাকে সামনে আগাতে দিবে না। নফসকে এসলাহ করতে সর্বদাই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য, নফসের মধ্যে যত আগাছা রয়েছে, তা সময় থাকতেই ছাঁটাই করতে হবে। যেমন: বিভিন্ন বদ-অভ্যাস, অশ্লীল চিন্তা-ভাবনা, খারাপ মনোভাব, ইত্যাদি।
মনে রাখতে হবে-জমি'র আগাছা পরিষ্কার করা খুবই সহজ, কিন্তু নফসের আগাছা দূর করা খুবই কঠিন। এজন্য, নফসের আগাছা দূর করতে যা যা প্রয়োজন, তা-ই করতে হবে। এক্ষেত্রে, নফসের বিরুদ্ধে তো যেতে হবেই; নয়তো আগাছা পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। আর যখন আপনি আগাছা পরিষ্কার করার জন্য নফসের বিরুদ্ধে যাবেন, তখন সে হা-হুতাশ করতে থাকবে; তার কষ্ট হবে। তাই, কষ্টের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না; নফসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তবেই নফসকে আগাছামুক্ত করা যাবে; অন্যথায়, আগাছায় আচ্ছাদিত হয়ে নফস তার আলোর দিশা হারাবে।
📄 নফসের হাতে তুলে দিচ্ছি আমাদের ক্ষতি সাধনের যাবতীয় অস্ত্র
কৃত অপরাধের কারণে সাধারণত অপরাধীদের কারাবন্দি করে রাখা হয়। যেন সে আর কোনো অপরাধ করার সুযোগ না পায়। এমনকি, আমরা আমাদের শত্রুদের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকতে তাকে গৃহবন্দি করে রাখার চেষ্টা করি। সে যে-সকল জিনিস দ্বারা আমাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে, সে-সব জিনিস তার হাতের নাগাল থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি—যেন ঐ সব ব্যবহার করে আমাদের ওপর আক্রমণ করতে না পারে। মোটকথা, আত্মরক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন, সব কিছুরই বন্দোবস্ত করি। কেননা, আমরা কেউ-ই চাই না—শত্রুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে। এজন্য, সর্বদাই শত্রুর মোকাবেলায় পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে থাকি।
শত্রুর মোকাবেলায় সজাগ থাকতে হবে, এটাই স্বাভাবিক! কেউ যদি শত্রুর মোকাবেলায় অসতর্ক থাকে, তবে সে তার শত্রুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। কেউ যদি শত্রুর ব্যাপারে গাফেল থাকে, তাহলে সুযোগ বুঝে সে আক্রমণ করবেই— এ- কথা ভেবে সকলেই তার শত্রুর ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্বন করে। একজন সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন ব্যক্তি তার ক্ষতি সাধনকারী ব্যক্তির ব্যাপারে কখনো উদাসীন থাকতে পারে না।
আমরা আমাদের শত্রুদের ভয় করি। তার আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। তার মোকাবেলায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিই। পারলে তাকে কারাবন্দি করার চেষ্টা করি, যেন তার আক্রমণের সমস্ত দ্বার বন্ধ হয়ে যায়। অথচ, আমরা আমাদের নফসের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিই না। সে একজন বড় অপরাধী, তবুও তাকে কারাবন্দি করি না। সে আমাদের সবচে বড় শত্রু, তবু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিই না। নফস যে-সকল হাতিয়ার ব্যবহার করে আমাদের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করছে, তা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা তো দূরের কথা; উল্টো তার হাতেই সকল উপকরণ তুলে দিচ্ছি。
যদি একজন শত্রুর হাতে ক্ষতি সাধনের অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়, তখন সে আমাদের ওপর আক্রমণ করবে, আমাদের ক্ষতি করবে, আমাদের বিপদে নিপতিত করবে—এটাই তো স্বাভাবিক। ঠিক নফসের ক্ষেত্রেও এরকম। আমরা যদি আমাদের নফসের হাতে ক্ষতি সাধনের যাবতীয় আসবাব, যাবতীয় উপায়-উপকরণ তুলে দিই, তখন সে আমাদের ক্ষতি না করে কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে— আমরা কীভাবে আমাদের নফসের হাতে আমাদের ক্ষতি সাধনের অস্ত্র তুলে দিচ্ছি? আসুন জেনে নিই, কীভাবে আমরা আমাদের নফসের হাতে আমাদের ক্ষতি সাধনের যাবতীয় অস্ত্র তুলে দিচ্ছি.....
নফসের তাকাযা অনুযায়ী সমাজ ব্যবস্থা: আজ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন যে—কেউ যদি কোনো খারাপ কাজ সম্পাদনের ভিত্তি স্থাপন করে, তখন আমরা তাকে বাধা না দিয়ে, সংবর্ধনা জানাই। আমাদের সুশীল সমাজের বক্তব্য হয়—সে যা করছে তাকে করতে দাও, তার কাজে কোনো ধরনের বাধা দিও না, তার স্বাধীনতাকে হরণ করো না। যে ব্যক্তি যে কাজে শান্তি পাচ্ছে; তাকে তা-ই করতে দাও। যে ব্যক্তি যা খেয়ে মজা পাচ্ছে, তাকে তা-ই খেতে দাও। তার কাজে, তার পরিকল্পনায়, তার জীবন ব্যবস্থায় বাধা'র দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে না।'
বাস্তবতা এটাই—আজকাল খারাপ কাজের কোনো বাধা নেই। না ব্যক্তিত্বের বাধা, না আইনের বাধা, আর না উপায়-উপকরণের বাধা। মোটকথা, ব্যক্তি এবং খারাপ কাজের মাঝখানে কোনো দেয়াল নেই। যখন ইচ্ছে তখনই খারাপ কাজ সম্পাদন করতে পারছে। যখন ইচ্ছে তখনই তার সাহওয়াত পূরণ করতে পারছে। যখন ইচ্ছে তখনই মজা ভোগ করতে পারছে। আমরাই সমস্ত খারাপ কাজের দরজা উন্মোচন করে দিচ্ছি, আর তার সূত্র ধরেই নফস সমস্ত খারাপ কাজ সম্পাদন করছে। আমরাই নফসের হাতে খারাপ কাজের আসবাবপত্র তুলে দিচ্ছি, ফলে এখন যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই সে খারাপ কাজ সম্পাদন করতে পারছে।
ক | অসৎ কর্মে রাষ্ট্রীয় কোনো বাধা-বিপত্তি নেই। ছেলে-মেয়ে অবাধে মেলামেশা করছে-এ ব্যাপারে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেই। পার্ক, মল, থিয়েটারে-ছেলে-মেয়ের নির্জন বাসেও নেই কোনো বাধা। ফলে, নফস তার অশ্লীল মনোবৃত্তি খুব সহজেই পূরণ করতে পারছে।
খ | এখনো দেশের হাজার হাজার হোটেলে চলছে রমরমা দেহ ব্যবসা। রয়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানান শ্রেণীর পতিতালয়। যেখানে একজন যুবক খুব সহজেই তার যৌন চাহিদা মিটিয়ে আসতে পারছে। খুব সহজেই নফসের চাহিদা পূরণ করতে পারছে। খুব সহজেই হরেক রকম নারী সে উপভোগ করতে পারছে।
গ | আজ শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ-সবার হাতেই স্মার্টফোন। বাচ্চারাও আজকাল এডাল্ট ফিল্মের সাথে পরিচিত। এই মোবাইল যুগের পূর্বে ১৮ বছরের একজন যুবক যা চিনতো না, আজ ৮ বছরের বাচ্চাও তা চিনে। ফলে, একটা ছেলে কিশোর অবস্থায়ই পর্ণ আসক্ত হয়ে পড়ছে। খুব সহজেই মোবাইলে নীল ছবি দেখে নফসে আম্মারার চাহিদা পূরণ করতে পারছে।
এছাড়াও অসংখ্য বিষয় রয়েছে, যা সমাজ ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। সমাজের এই চিত্রের কারণে নফস খুব সহজেই তার চাহিদা নিবারণ করতে পারছে। খুব সহজেই সে আমাদের ব্যবহার করে নানান অপকর্ম সম্পাদন করতে পারছে। আমরা খুব সহজেই তার হাতে সকল অশ্লীলতার উপকরণ তুলে দিচ্ছি। ফলে, হাতের নাগালে পেয়ে সে আরো বেশি নিকৃষ্ট পথে হাঁটছে। খুব সহজেই তা ব্যবহার করে আমাদের ক্ষতি সাধন করছে। আমাদের দ্বারা যাবতীয় অশ্লীল মনোবৃত্তি পূরণ করছে। অথচ আমরা ভুলে বসেছি-সে আমাদের সবচে বড় শত্রু! তার আক্রমণ থেকে বাঁচতে, তাকে প্রতিহত করতে উচিত ছিল—সতর্কতা অবলম্বন করা; তার মোকাবেলায় পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা। সে যে-সকল উপকরণ ব্যবহার করে আমাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা উৎখাত করা। প্রয়োজনে তাকে কারাবন্দি করা, যেন তার কোনো কর্মপরিকল্পনা আমাদের উপর বাস্তবায়িত না হয়। কোনো চাহিদা যেন আমাদের ব্যবহার করে বাস্তবায়ন করতে না পারে।
কিন্তু আফসোস, আজ আমরা তার ব্যাপারে খুবই উদাসীন। তার বিরুদ্ধে লড়াই করার মনোভাব প্রকাশ করি না। উল্টো, তার হাতেই তুলে দিই, আমাদের ক্ষতি সাধনের সকল মাধ্যম।
এজন্য, সর্বপ্রথম নফসের অশ্লীল কাজ সম্পাদনের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে হবে। তার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে হবে। কাজ সম্পাদনের যাবতীয় উপায়-উপকরণ বন্ধ করতে হবে। তার হাতের নাগাল থেকে যাবতীয় হারাম উপকরণ দূরে রাখতে হবে। নয়তো নফসের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা প্রায় অসম্ভব!
📄 আজ-ই ফার্স্ট আজ-ই লাস্ট
এক
কখনো নফসের চাহিদার পরিসমাপ্তি ঘটবে না। যত দিবেন ততই চাইবে। যখন আপনি নফসের চাহিদা অনুপাতে চলবেন, তখন সে আপনাকে আস্তমতো ব্যবহার করবে। সে আপনাকে এভাবে ধোঁকা দিবে—নফস বলে, 'আমার আম খেতে ইচ্ছে করছে!' কিন্তু আপনার পকেটে টাকা নেই। তখন নফস বলে, 'যা, চুরি করে নিয়ে আয়। তবু আম খেতে চাই।' এমতাবস্থায় আপনি নফসকে বলেন, 'চুরি করা ভালো না। তাই চুরি করা যাবে না।' তখন নফস বলে, 'আরে, আজকেই তো! আর করব না।' তখন আপনি নফসের ধোঁকায় পড়ে, চুরি করে ফেললেন। একবার আপনাকে দিয়ে চুরি করিয়ে সে ক্ষান্ত হয় না; পরের দিন আবার জাম খাওয়ার জন্য চুরির পথে অগ্রসর করে। এভাবে প্রতিনিয়ত একটার পর একটা নতুন কিছু চাইতেই থাকে। কিন্তু তবু সে পরিতৃপ্ত হয় না। হাতে থাকুক বা না-থাকুক, অসৎ উপায়ে হলেও আপনার দ্বারা তার মনোবৃত্তি পূরণ করবেই। একটার পর একটা চাইবেই।
নফস এরকম-ই। নফসকে আপনি কখনো পরিতৃপ্ত করতে পারবেন না। যত দিবেন, ততই তার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকবে। নফস কখনো বলবে না —আমার সমস্ত চাহিদা এবার পরিপূর্ণ হয়েছে; এখন আর আমার কিছুর প্রয়োজন নেই। এ- কথা সে কখনোই বলবে না, কেননা নফসের চাহিদা কখনো শেষ হয় না।
কোনো মানুষের সর্ব-চাহিদা এ- জীবনে কখনও পরিপূর্ণ হবে না। তাই, কেউ যদি ভাবে আমার নফস যা চায় তাই করবো, নফস যা বলবে তাই করবো, তবেই শান্তি পাবো—তাহলে তার ধারণা ভুল। নফসের চাহিদা পূরণ করে কখনো সে সুখের খোঁজ পাবে না। কেননা, নফসের বৈশিষ্ট্য হলো এক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর, অন্য চাহিদার দিকে মনোনিবেশ করা।
এজন্য, আপনি যদি মনে মনে নফসের গোলামী করার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে সারা জীবন তার গোলামী-ই করতে হবে। কারণ, সে সব সময় শুধু চাই চাই করবে, আর আপনাকে সর্বদা দিতেই হবে। দিতে দিতেই পুরো জীবন শেষ হয়ে যাবে; সুখের সাথে আর সাক্ষাৎ হবে না। সফলতার মুখ আর দেখতে হবে না। ইতি টানতে হবে সমস্ত সুখের গল্পে।
নফস হলো ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত। নফস কখনো তার ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না-যদি তা আম্মারাহ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাকে যতই দিবেন, ততই খাবে। যতই পান করাবেন, ততই পান করবে। যতই ভোগ করতে দিবেন, ততই সে ভোগ করবে; তবু তার তৃষ্ণা, তার ক্ষুধা, তার চাহিদা নিবারণ হবে না। তার কাছে শত পাওয়াও, না-পাওয়ার মতো।
এজন্যই, রাসুল সা. বলেছেন, 'কখনো প্রবৃত্তির পিছনে ছুটো না, কখনো নফসের অনুসরণ করো না। কেননা নফস তোমাকে ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিবে।' এজন্য আমাদের উচিত নফসকে নিয়ন্ত্রণ রাখা। তার চাহিদার ভ্রুক্ষেপ না করা।
দুই
আজকাল শোনা যায়-অমুকের মেয়েলি সমস্যা রয়েছে। আসলে এটা কী? মেয়েলি সমস্যা বলতে কী বুঝানো হয়েছে? বিষয়টা অনেকের কাছে পরিষ্কার, আবার অনেকের কাছে ঘোলাটে। এটা সত্যি, আজকাল অনেকের মধ্যেই মেয়েলি সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। এখন জানার বিষয় হচ্ছে, মেয়েলি সমস্যা কী?
মেয়েলি সমস্যা হচ্ছে, একজন যুবক মেয়েদের সাথে মিশতে মিশতে তাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে মেয়ে ছাড়া কিছুই বুঝে না। এক মেয়ে থেকে আরেক মেয়ে-এভাবে শুধু মেয়েদের পিছনেই ছুটতে থাকে। নিত্য নতুন মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়ানো তার নেশায় পরিণত হয়। একদিন এই ঘাটে, আরেকদিন ওই ঘাটে। একদিন এই নায়ে, অপরদিন ওই নায়ে-একের মধ্যে সে সীমাবদ্ধ থাকে না। হরেক রকম মেয়েদের সাথে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তার চিন্তা-চেতনায় শুধু মেয়েরাই ঘুরে। কীভাবে একটি মেয়েকে দ্রুত পটানো যায়, কীভাবে তাকে বশে আনা যায়—সে ভাবনায় বিভোর।
এটা একজন যুবকের জন্য খুবই ক্ষতিকর বদঅভ্যাস! এটা খুবই ধ্বংসাত্মক আসক্তি। এটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুবই কষ্টকর! যারা এই মেয়েলি সমস্যায় পতিত হয়েছে, তারাই বুঝতে পারে—এটা কত বড় নেশা! একটা ছেলে বিয়ের আগে এই কর্মকান্ডে লিপ্ত, তার মানে এই নয়—বিয়ের পর সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। বিয়ের পর এটা আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। বিয়ের পর সে তার স্ত্রীর উপর সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। পর নারীদের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। একাধিক মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। এতে করে সংসারে নেমে আসে, অশান্তির ঝড়! উক্ত ঝড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় প্রত্যাশিত সাজানো-গোছানো সংসার!
এই মেয়েলি সমস্যা নফসের তাড়নায়-ই হয়ে থাকে! একটি মেয়ের সাথে হারাম সম্পর্কে জড়ানোর পর, তাকে ভোগ করে অন্যত্র জাল ফেলে। একটি মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর, নফস তখন আরো মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রথমত নফস বলে,' মেয়েটার সাথে সম্পর্ক কর; এটাই ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট। আর লাগবে না।' কিন্তু কিছুদিন পর ঠিকই অন্য মেয়ের প্রতি আসক্ত করতে বাধ্য করে।
নফস প্রথমত এভাবেই ধোঁকা দেয়। একটি মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর, পরবর্তীতে আরো মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়াতে বলে। আপনি যখন তার ধোঁকায় পরে একটি সম্পর্কে জড়িয়ে গেলেন, তখন সে অন্যত্র জাল বিছানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়। তাই আমি বলি—নফসকে যত দিবেন সে ততই চাইবে। যদি মনে করেন এটাই ফার্স্ট, এটাই লাস্ট, তাহলে ভুল ভাবছেন।
শুধু মেয়েলি সমস্যা-ই না! যারা পর্ণ আসক্ত, যারা হস্তমৈথুনে অভ্যস্ত— তাদের জিজ্ঞেস করুন, তারা কীভাবে আসক্ত হয়েছে। প্রথমত নফস এই বলে ধোঁকা দিয়েছে—'এইতো, একবার পর্ণ দেখে নে'। একবার দেখলে কিছুই হবে না।' নফসের এই কৃত পরামর্শ যখন কানে নিয়ে নিলেন, তখনই আটকে গেলেন ধ্বংসের বেড়াজালে! একবার পর্ণ দেখার পর, নফস আবার বলে, 'আরেকবার দেখে নে', কিচ্ছু হবে না।' আপনি তখন নফসের চাহিদা পূরণ করতে আবার দেখে নিলেন। ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। এভাবে প্রতিনিয়ত সে আপনাকে ধোঁকা দিচ্ছে। প্রতিদিন এই বলে ধোকা দিচ্ছে—'আজ-ই শেষ দিন, আর কখনো দেখবো না।'
ঠিক হস্তমৈথুনের বেলায়-ও একই কথা। প্রথমত নফস বলে, 'আজ-ই ফার্স্ট, আজ-ই লাস্ট; আর কখনো হস্তমৈথুন করতে হবে না।' নফসের এই কুত পরামর্শ যখন কানে নিয়ে নিলেন, তখন সে আপনাকে দিয়ে প্রতিনিয়ত হস্তমৈথুন করালো। এখন নফস বলে, 'আজ-ই শেষ দিন; আর কখনো হস্তমৈথুন করবো না। কিন্তু পরক্ষণেই এই কথা ভুলে গিয়ে আপনি আবার হস্তমৈথুনে অগ্রসর হন।
নফস এরকমই! তাকে আপনি যতই দিবেন, ততই চাইবে। সে কখনো নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন মানুষকে সকল অপকর্মে আসক্ত করার পিছনে মূল হচ্ছে এই নফস। নফস কোনো একটি অপকর্ম আপনাকে দিয়ে সম্পাদন করতে চাইলে আপনি যদি তার ধোঁকায় পরে উক্ত অপকর্ম করে ফেলেনে, তখন প্রতিনিয়ত আপনাকে দিয়ে সে ঐ কাজটাই করাবে। একপর্যায়ে তা নেশায় পরিনত হয়ে যাবে। মনে রাখবেন—ধোঁকা দিতে নফসের সবচে বড় হাতিয়ার হলো,' আজ-ই ফার্স্ট, আজ-ই লাস্ট।'
"আজ-ই ফার্স্ট, আজ-ই লাস্ট। আজকেই শেষ বার। কাল থেকে ভালো হয়ে যাব। একদম কোমর বেঁধে নামব। আর পাপ কাজে জড়াব না। আর কোনো দিন নামাজ কাজা করব না"—এই কথাগুলো যদি আপনার মাঝে স্থান করে নেয়, তাহলে কালবিলম্ব না-করে দ্রুত নফসের চিকিৎসা করুন। কেননা, এগুলো শ্রেফ নফস আর শয়তানের ধোঁকা। এই ধোঁকায় পড়ে থাকলে কখনো গোনাহের রাজ্য থেকে ফিরে আসা হবে না। কাল কাল করতে করতেই বেজে যাবে পরকালের ঘন্টা—ফেরা আর হবে না। ফিরবো ফিরবো বলে ফিরে যেতে হবে, সৃষ্টির উপাদান সেই মাটিতেই।