📄 মানুষের সঙ্গে ইবলীছের সাক্ষাতের কয়েকটা ঘটনা
ইবলীছ শয়তানের যে অস্তিত্ব আছে তা তো দিবালোকের ন্যায় সত্য। নবী সাহাবী ও মনীষীদের অনেকের সাথে ইবলীছের সাক্ষাতও ঘটেছে। নিম্নে কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করা হল।
ঘটনা নং ১: রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে একবার ইবলীছ শয়তান আত্মপ্রকাশিত হয়েছিল। ঘটনাটি তাবারানী কাবীরে হযরত জাবের ইবনে সামুরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একদিন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামায আদায় করছিলেন। তিনি তাঁর সামনে থেকে কিছু একটা জিনিসকে তাড়া করছিলেন। যখন তিনি নামায থেকে ফারেগ হলেন, আমরা তাকে বিষয়টা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, ও ছিল শয়তান। আমাকে নামায থেকে বিচ্যুত করার জন্য আমার পায়ের উপর সে আগুনের অঙ্গার ঢেলে দিয়েছিল। তিনি বলেন, আমি ওকে তাড়িয়ে দিয়েছি। ধরতে পারলে মসজিদের এক পিলারের সাথে ওকে বেঁধে রাখা হত, যাতে মদীনার বাচ্চারা ওকে নিয়ে ঘুরাতে পারে।
ঘটনা নং ২: হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সামনে শয়তানের আত্মপ্রকাশ এবং হযরত ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক শয়তানকে কংকর নিক্ষেপের ঘটনা সকলেরই জানা। তাবারানী কাবীর ও মুসনাদে আহমদ কিতাবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) কর্তৃক উক্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। উক্ত রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ী যখন হযরত ইবরাহীম (আ.) কে হজ্জের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন হজ্জের সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় স্থান সরেজমিনে চেনানোর জন্য হযরত জিবরাঈল (আ.) হযরত ইবরাহীম (আ.) কে নিয়ে মক্কা থেকে রওয়ানা হন। মিনায় জামরাতুল কুবরা (বড় জামরা)-এর কাছে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সামনে শয়তান দৃশ্যমান হয়। হযরত ইবরাহীম (আ.) তখন শয়তানকে ৭টি কংকর নিক্ষেপ করেন। ফলে শয়তান অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর জামরাতুল উস্তা এবং জামরাতুস সুগরা-এর কাছে আবারও শয়তান দৃশ্যমান হলে তিনি প্রতিবার তাকে ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করেন।
ঘটনা নং ৩: হযরত নূহ (আ.)-এর সঙ্গে ইবলীছের সাক্ষাতের ঘটনা প্রসিদ্ধ। আল্লামা বদরুদ্দীন শিবলী তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ "আকামুল মারজান"-এ সনদ সহকারে ঘটনাটা উল্লেখ করেছেন। হযরত নূহ (আ.)-এর সময় তুফানে যখন কাফেররা মারা গেল এবং নৌকা থেমে গেল, তখন হযরত নূহ (আ.) দেখলেন নৌকার গলুইয়ে শয়তান বসে আছে। শয়তান তাকে জিজ্ঞাসা করল— আপনার প্রতিপালকের কাছে জিজ্ঞাসা করুন আমার জন্য তওবার কোন ব্যবস্থা আছে কি না। হযরত নূহ (আ.) আল্লাহর কাছে দুআ করলে আল্লাহ তাআলা ওহী পাঠালেন যে, তার জন্য তওবা হল সে আদমের কবরে সাজদা করবে। ইবলীছ তা শুনে বলে উঠল, জীবিত অবস্থায় তাকে সাজদা করিনি এখন মৃত অবস্থায় তাকে সাজদা করব? (সম্ভব নয়।)
ঘটনা নং ৪: হযরত মূসা (আ.)-এর সঙ্গে ইবলীছের সাক্ষাতের ঘটনাও প্রসিদ্ধ। ইবলীছ তাকেও বলেছিল যে সে আদমের কবরে সাজদা করে ক্ষমা লাভ করতে রাজি নয়।
ঘটনা নং ৫: বোখারী শরীফে হযরত আবূ হুরায়রা (রা.)-এর সঙ্গে শয়তানের সাক্ষাতের এক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে রমযানে উসূল হওয়া যাকাতের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এক লোক এসে সেখান থেকে খাদ্য-খাবার কোষ ভরে নিয়ে যাচ্ছিল। তিন রাত তাকে ধরার পর লোকটা নিজেকে বাঁচাতে আয়াতুল কুরছী পাঠের শিক্ষা দেয় এবং বলে— আয়াতুল কুরছী পাঠ করলে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন তোমাকে হেফাজত করবে, আর শয়তান তোমার কাছে আসবে না। পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, জেনে রাখ সে তো সত্য বলেছে যদিও সে চরম মিথ্যুক; সে হচ্ছে শয়তান।
ঘটনা নং ৬: শয়তান মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে কীভাবে কেটে পড়ে শিরোনামের অধীনে বদর যুদ্ধের ময়দানে শয়তানের সটকে পড়ার ঘটনা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
📄 শয়তানের প্রশ্ন: শয়তানকে বানানো হল কেন?
অনেক সময় শয়তানের ওয়াছওয়াছায় মনের মধ্যে এই প্রশ্ন জাগে যে, শয়তানকে বানানো হল কেন? তাকে বানানো না হলে পাপের ওয়াছওয়াছা দেয়ার কেউ থাকত না, তাহলে সকলেই নেককার পরহেযগার হতে পারত! শয়তানকে বানানোর ফলেই তো সব ঝামেলাটা লেগেছে।
উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তর হল— যদি খারাপ চেতনা উদ্রেক করে দেয়ার মত কেউ না থাকত আর খারাপ চেতনা তথা পাপের চেতনা সৃষ্টিই না হত, তাহলে তো আমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানোরই প্রয়োজন ছিল না। পাপের চেতনা সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও আমরা পাপ থেকে বিরত থাকব, এভাবে আমরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হব— এরূপ পরীক্ষার জন্যই তো আমাদেরকে দুনিয়ায় প্রেরণ। নতুবা আমাদেরকে দুনিয়ায় প্রেরণের প্রয়োজন ছিল না। পাপের চেতনামুক্ত ইবাদতকারী তথা ফেরেশতাদেরকে তো আমাদের আগেই সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারা তো আল্লাহর ইবাদত করেই যাচ্ছিল এবং এখনও করে যাচ্ছে। আমাদের সৃষ্টি করার প্রয়োজনই বা কি ছিল? এই পরীক্ষার জন্যই তো আমাদের সৃষ্টি করা।
📄 ইবলীছের কী দোষ আল্লাহই তো তাকে এমন বানিয়েছেন
অনেক সময় শয়তানের ওয়াছওয়াছায় মনের মধ্যে এই প্রশ্ন জাগে যে, শয়তানের কী দোষ? আল্লাহই তো পরিকল্পিতভাবে তাকে দাঁড় করিয়েছেন। মনের মধ্যে এই প্রশ্ন জাগলে মনকে বলতে হবে, শয়তানের কোন দোষ না থাকলে শয়তানই তা নিয়ে আল্লাহর সাথে বোঝাপড়া করুকগে, শয়তানের বিষয় নিয়ে চিন্তা করে আমার ঘুম নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। শয়তান আমার কোন খাতেরী লোক নয় যে, তাকে নিয়ে আমার ভাবতে হবে! তবুও সংক্ষেপে একটু উত্তর দেই। শয়তানের যদি কোনই দোষ না থাকবে তাহলে মানুষকে ধোঁকা দেয়ার মত এরকম একটা বাজে কাজের বোঝা তার মাথায় পড়ল কেন? একটা ঘটনা বলি। পুরনো ঢাকার বড়কাটারা মাদ্রাসার ঘটনা। একবার কিছু মাস্তান ধরনের লোকজন মাদ্রাসার আঙিনায় দাঁড়িয়ে হৈ হল্লা করতে থাকল। আল্লাহরই ইচ্ছা একটা বড় সাইজের ইটের টুকরো গিয়ে পড়ল প্রধান মাস্তানের মাথায়। অমনি পুরনো ঢাকাইয়াদের স্টাইলে উর্দু বাংলা মিলিয়ে মাস্তানটা চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, এত্ত বড় ছাহছ কার, মেরে ছার পর ইটা? ইটা কিছু নে গিরায়া? কাহাঁ ছে গিরা? তখন আর এক ঢাকাইয়া বলে উঠল, জিছ নে ভি গিরায়া, জাহাঁ ছে ভি গিরা, তেরে ছার পর কোঁ গিরা, ইছ লিয়ে কে ছালা তু পাপী হায়!
📄 ইবলীছ কি ভাল হতে পারে না?
অনেকে মনে করে ইবলীছ যদি ভাল হয়ে যেত তাহলে তো দুনিয়ার কেউ আর খারাপ পথে যেত না। সকলেই জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজেই অবলম্বন করতে পারত। কিন্তু ইবলীছের ভাল হতে হলে তাকে তওবা করতে হবে। সে তো তওবা করতে রাজি নয়। ইবলীছের তওবার উপায় কি তা বোঝার জন্য ইবলীছের পাপটা কি ছিল তা বুঝা দরকার। ইবলীছের পাপ ছিল অহংকার। তার অহংকারই ইবলীছকে ইবলীছে পরিণত করেছিল। আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার পর যখন ইবলীছকে সাজদা করতে হুকুম দিয়েছিলেন, সে বলেছিল— আমি আগুনের তৈরী আর আদম মাটির তৈরী। আগুনের স্বভাব উপরের দিকে থাকা, তাই আমি নিচের দিকে নত হয়ে তাকে সাজদা করতে পারি না। এভাবে অহংকারবশত আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করায় সে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হল। একবার ইবলীছের সাথে হযরত মূসা (আ.)-এর দেখা হলে হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর কাছে তার জন্য আবেদন জানালেন। আল্লাহ তাআলা বললেন, সে যদি আদমের কবরের কাছে গিয়ে সাজদা করে তবে তাকে ক্ষমা করা হবে। হযরত মূসা (আ.) ইবলীছকে জানালে সে বলে উঠল— জীবিত আদমের কাছে মাথা নত করিনি, এখন মৃত আদমের কাছে মাথা নত করব? (অসম্ভব!)