📄 দুআর মধ্যে কান্নাকাটির বিষয়ে ওয়াসওয়াসা
দুআর মধ্যে কান্নাকাটি একটি কাম্য বিষয়। কান্নাকাটি ও রোনাযারী করে দুআ করা শরীয়তে প্রশংসনীয় ও ফযীলতের বিষয়। এরূপ চোখের পানি জাহান্নামের আগুনকে নিভিয়ে দেয়, জাহান্নামের শাস্তিকে প্রতিহত করে। এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ দুধ তার থনে ফিরে না আসে। (তিরমিযী: হাদীছ নং ১৬৩৩)
এই কান্নার ব্যাপারে শয়তান কয়েক রকম ওয়াছওয়াছা দিয়ে থাকে। যথা:
• শুরুতে শয়তান এই ওয়াছওয়াছা দেয় যে, কান্নাকাটি করা একটা লজ্জার বিষয়। এই চিন্তায় কাঁদতে লজ্জা বোধ হয়। শয়তান এভাবে লজ্জার চেতনা উস্কে দিয়ে কান্নাকাটি থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। অথচ শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা লজ্জার বিষয় নয়।
• উপরোক্ত ভুয়া লজ্জার চেতনা ঠেলে ফেলে যখন কেউ দুআ মুনাজাতের মধ্যে কান্নাকাটি শুরুই করতে যায় তখন শয়তান এই ওয়াছওয়াছা দেয় যে, তোমার তো কান্না আসে না, তুমি তো জোর করে কাঁদতে চাও, এটা তো কৃত্রিম কান্না।
• উপরোক্ত ওয়াছওয়াছাও উপেক্ষা করে যখন কেউ দুআ মুনাজাতের মধ্যে কান্নাকাটি শুরুই করতে যায়, তখন শয়তান এই ওয়াছওয়াছা দেয় যে, কান্নাকাটি করলে মানুষে বুযুর্গ বলবে, তাহলে সে কান্নাকাটি তো রিয়া হয়ে যাবে।
• উপরোক্ত ওয়াছওয়াছাও উপেক্ষা করে যখন সত্যিকার আল্লাহর ভয় ও আযাবের ভয়ে দুআ মুনাজাতে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়া হয়, তখন শয়তান এই ওয়াছওয়াছা দেয় যে, তুমি মাশা আল্লাহ আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছ। তবে এই কান্নাকাটি মানুষের সামনেও বেশি বেশি হওয়া দরকার, যাতে মানুষ তোমার কান্না দেখে কাঁদতে শিখে। শয়তান এ ওয়াছওয়াছা দেয় এই বদ-মতলবে যাতে তার ভবিষ্যতের কান্না মানুষকে শেখানোর উদ্দেশ্যে হয়, আল্লাহর ভয়ে না হয়।
এই ওয়াছওয়াছা মোকাবেলা করার পদ্ধতি হল আমার কান্না থেকে কে শিখবে না শিখবে, কে জানবে না জানবে- এসব চিন্তা মনের মধ্যে মন্থিত না করা, বরং শুধুই আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের চিন্তা মনের মধ্যে জাগরুক করে কাঁদতে থাকা। শয়তানের কাজ ওয়াছওয়াছা দিতে থাকা, তা সে করে যাক, আপনার কাজ কাঁদতে থাকা তা আপনি করে যান।
📄 দুআ কবুল না হওয়ার ওয়াসওয়াসা
অনেক সময় এই ওয়াছওয়াছা হয় যে, আমরা আল্লাহর কাছে কত দুআ করি, আলেম-উলামা বুযুর্গানে দ্বীনও দুআ করেন কিন্তু দুআ কবুল হয় কৈ? এই যে সারা দুনিয়ায় মুসলমানদের উপর অমুসলিমদের জুলুম-নিপীড়ন চলছে, সবাই দুআ করছে কিন্তু মুসলমানদের উপর থেকে বিপদ তো হটছে না। এই ওয়াছওয়াছার কয়েকটি উত্তর। যথা:
১. যে বিপদ-মুসীবত তাকদীরে মুআল্লাক¹-এর পর্যায়ে তা সংশ্লিষ্ট দুআ-দুরূদের দ্বারা দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে যে বিপদ-মুসীবত তাকদীরে মুবরাম²-এর পর্যায়ে তা কোনো কিছু দ্বারাই দূরীভূত হয় না।
২. বিপদ-মুসীবত দ্বারা অনেক সময় পাপ মোচন হয়, কখনও কখনও মর্যাদা বুলন্দ হয়।
৩. বান্দার সব দুআই কবুল হয় যদি কবুল হওয়ার শর্তাবলী পূরণ হয়। তবে কখনও কখনও সরাসরি বান্দা যা যেভাবে চায় সেভাবেই কবুল করা হয়, কখনও কখনও বান্দা যা চায় আল্লাহ তা না দিয়ে অন্য কিছু তাকে দেন। কারণ আল্লাহর বিবেচনায় সেটিই বান্দার জন্য বেশি দরকারী।
৪. অনেক সময় বান্দা দুনিয়ার জন্য কিছু চায় কিন্তু আল্লাহ তাকে দুনিয়ায় জন্য তা না দিয়ে আখেরাতে তার জন্য কিছু বরাদ্দ করেন। আখেরাতে যখন মানুষ এরূপ প্রাপ্তি দেখতে পাবে তখন বলবে, হায় দুনিয়ার জন্য আল্লাহর কাছে যতকিছু চেয়েছিলাম তার কোনটা যদি দুনিয়াতে না দিয়ে সেগুলোর বদলে আখেরাতে দেয়া হত তাহলে আরও কত ভাল হত!
টিকাঃ
১। মানুষের জীবনের কিছু বিষয়ের তাকদীর এভাবে লেখা যে, বান্দা যদি অমুক কাজ করে বা অমুক আমল করে তাহলে এরকম হবে আর অমুক কাজ বা অমুক আমল না করলে এরূপ হবে। এ পর্যায়ের তাকদীরকে বলা হয় তাকদীরে মুআল্লাক তথা কোনকিছুর উপর ঝুলন্ত তাকদীর।
২। মানুষের জীবনের কিছু বিষয় তাকদীরে এমনভাবে লেখা আছে যা কোন কাজ বা কোন আমলের উপর ঝুলন্ত নয়, বরং তা যেমন নির্ধারিত তেমনই অকাট্যভাবে তা ঘটবে, কোন কিছুতে তার কোন পরিবর্তন ঘটবে না। এ পর্যায়ের তাকদীরকে বলা হয় তাকদীরে মুবরাম তথা অপরিবর্তনীয় তাকদীর।
📄 বিপদ-আপদ বিষয়ক দুআ দুরূদের ফায়দা নিয়ে ওয়াসওয়াসা
মানুষ বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি বা নিরাপত্তা লাভের জন্য যেসব দুআ-দুরূদ পাঠ করে এ নিয়েও শয়তান ওয়াছওয়াছা দিয়ে থাকে। যেমন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট দুআ পড়লে বাইরের সব রকম আপদ বালা থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা। গাড়িতে আরোহণের দুআ পড়লে এক্সিডেন্ট দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা। নৌযানে আরোহণের দুআ পড়লে নৌযান ডুবি থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা ইত্যাদি। এসব দুআ-দুরূদ পাঠ করার পরও যদি সংশ্লিষ্ট বিপদ-মুসীবত দেখা দেয় তখন শয়তানের পক্ষ থেকে এরূপ ওয়াছওয়াছা আসে যে, কৈ দুআ পড়ার পরও তো বিপদ থেকে রক্ষা হল না, তাহলে কি এসব দুআ ইত্যাদি ভুয়া?
এ ওয়াছওয়াছার উত্তর হল- যে বিপদ-মুসীবত তাকদীরে মুআল্লাকের পর্যায়ে তা সংশ্লিষ্ট দুআ-দুরূদের দ্বারা দূরীভূত হয়। পক্ষান্তরে যে বিপদ-মুসীবত তাকদীরে মুবরামের পর্যায়ে তা কোনো কিছু দ্বারাই দূরীভূত হয় না। অতএব দুআ-দুরূদ পাঠ করার পরও যখন এই বিপদ-মুসীবত দেখা দিয়েছে তাহলে বুঝা গেল এটা তাকদীরে মুবরামের পর্যায়ভুক্ত ছিল। কিন্তু কার জীবনের কোন্ বিপদ তাকদীরে মুআল্লাকের পর্যায়ভুক্ত আর কোন্টা তাকদীরে মুবরামের পর্যায়ভুক্ত তা যেহেতু জানা নেই, তাই সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির জন্যই সংশ্লিষ্ট দুআ-দুরূদ, আল্লাহর কাছে মুক্তি কামনা ইত্যাদি করে যেতে হবে।