📄 একটু ওঠা-বসা করা ইত্যাদি- এর পেছনে কী যুক্তি আছে
প্রশ্ন: এই যে নামায- একটু ওঠা-বসা করা, একটু কোমর বাঁকা করা, একটু মাটিতে কপাল ঠেকানো- নামাযের এই পদ্ধতির পেছনে কী যুক্তি আছে? এসব ওঠা-বসা, ঝোঁকা, মাথা ঠোকানো ইবাদত হতে যাবে কেন? ইবাদত তো বিরাট শানদার কিছু হওয়াই যুক্তিযুক্ত।
উত্তর: যার জন্য ইবাদত করব তিনি যদি এইসব ওঠা-বসাতেই খুশি থাকেন, তাহলে আমার যুক্তি খোঁজার দরকার কী? আমার যুক্তিমত বিরাট কোন পদ্ধতি নির্ধারণ করে সেভাবে ইবাদত করলাম আর তিনি তাতে খুশি হলেন না তাহলে সেই বিরাট কিছু করে লাভ কী? যার ইবাদত করব তিনি তাঁর ইবাদতের জন্য যে পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন, সেখানে তো আমার যুক্তি খোঁজার দরকার নেই। তিনি যে পদ্ধতিতে ইবাদত করলে সন্তুষ্ট হন আমার তো তা-ই করা চাই। আমি তো তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই ইবাদত করি। আমার যুক্তিবোধকে সন্তুষ্ট করার জন্য তো ইবাদত করি না। কেউ যদি কাউকে বলে, ভাই তুমি আমার কাছে কিছুক্ষণ বসে থাক, তাতে আমার মনটা খুব ভাল লাগবে, সেখানে সে যদি চিন্তা করে আমি ওনার কাছে বসে থাকলে ওনার কী লাভ হবে, আমি বরং ওনার ক্ষেতটা কুপিয়ে দিয়ে আসি, তাতে ওনার ক্ষেতের ফসলটা ভাল হবে, তাহলে কি ওই ক্ষেত কোপানোটা ভাল হবে? এবং তাতে সে খুশি হবে? আদৌ না। বরং তার কথামত তার কাছে বসে থাকলেই তার মন খুশি হবে। বস্তুত কাউকে খুশি করার পদ্ধতি হল তিনি যাতে খুশি হন তা-ই করা, সেখানে নিজের যুক্তি চলে না। সেখানে নিজের যুক্তি চালানো ঠিক নয়। অতএব আল্লাহ তাআলা যদি এসব ওঠা-বসাতেই খুশি হয়ে যান, এই পদ্ধতিতে ইবাদত করলেই খুশি হন, ব্যস তাতেই আমরা খুশি, এখানে আমাদের যুক্তি খোঁজার দরকার নেই।
এ তো গেল ইবাদতের মধ্যে নামাযের রুকনসমূহের কোন যুক্তি না খুঁজে মেনে নেয়ার দিক। এবার শোন যুক্তি খোঁজার দিক। এসব পদ্ধতির পশ্চাতে পর্যাপ্ত যুক্তিও রয়েছে। নামাযের শুরুতে তাকবীরে তাহরীমার জন্য হাত উঁচু করে মহান আল্লাহর সামনে সারেন্ডার বোঝানো হয়। হাত বেঁধে দাঁড়ানোর দ্বারা মুনিবের সামনে দাসত্ব জ্ঞাপন করা হয়। রুকুতে অল্প ঝুঁকে নতি স্বীকার বোঝানো হয়। সাজদাতে আরও ঝুঁকে আরও নতি স্বীকার বোঝানো হয়। মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে নিজের সমস্ত আমিত্বকে বিলীন করে দেওয়ার অভিব্যক্তি ঘটানো হয়।
📄 রোযায় তথা না খেয়ে থাকা ইবাদত হবে কেন
প্রশ্ন: রোযায় কয়েক ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হয়, না খেয়ে থাকা ইবাদত হবে কেন? আমি না খেয়ে থাকলে আল্লাহর লাভ কী?
উত্তর: রোযায় পান, আহার ও যৌন চাহিদা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে প্রমাণ দেয়া হয় আমরা আল্লাহর জন্য আমাদের মৌলিক সব চাহিদাকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত আছি। এভাবে আল্লাহ যখন আমাদের থেকে দেখতে পান আমরা তাঁর জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে পারি, তখন তিনি খুশি হয়ে যান। দুনিয়াতেও কোন মানুষ যখন কারও থেকে এর প্রমাণ পায় যে, সে তার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত, তখন সে তার প্রতি খুশি হয়ে যায়। কাজেই রোযায় না খেয়ে থাকার মাধ্যমে এটা ইবাদত হওয়ার মধ্যেও যুক্তি রয়েছে। ইবাদত বলাই তো হয় চরম দাসত্বের অভিব্যক্তি ঘটানো। একজন দাস যেমন তার মনিবের জন্য তার সব চাহিদা, চেতনা ও ইচ্ছা-আকাঙ্খাকে বিসর্জন দিয়ে দেয়, আর একেই বলে দাসত্ব, তদ্রূপ বান্দাও তার মাওলা তথা মনিবের জন্য তার সব চাহিদা, চেতনা ও কামনা-বাসনাকে বিসর্জন দিবে, এটাই তো হবে ইবাদত। এ-ই তো ইবাদতের স্বরূপ।
তাছাড়া পূর্বেও বলেছি, কাউকে খুশি করার পদ্ধতি হল তিনি যাতে খুশি হন তা-ই করা, এখানে নিজের যুক্তি চলে না। এখানে নিজের যুক্তি চালানো ঠিক নয়। এখন আল্লাহ যদি তাঁর উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণ না খেয়ে কষ্ট করলে খুশি হন তাতেই আমরাও খুশি, এখানেও আমাদের যুক্তি খোঁজার দরকার নেই।
📄 আল্লাহ কি বায়তুল্লার মধ্যে থাকেন যে, ওখানে ঘুরতে হবে?
প্রশ্ন: হজ্জে যা করা হয়, তারই বা যুক্তি কী? আল্লাহকে পাওয়ার জন্য বায়তুল্লাহর পাশে ঘোরা হয়। আল্লাহ কি বায়তুল্লাহর মধ্যে থাকেন যে, তাকে পাওয়ার জন্য ওখানে ঘুরতে হবে? হাজেরা (আ.) তার সন্তানের জন্য পানির খোঁজে ছোটাছুটি করেছিলেন, হজ্জে তার নকল করা হয়, হযরত ইব্রাহীম (আ.) শয়তানকে পাথর মেরেছিলেন, এখন তারই নকল করে হাওয়ার উপর পাথর ছোড়া হয়। এখন তো শয়তান সেখানে পাথর খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না। তাহলে এখন ওখানে পাথর মেরে লাভ কী? এগুলোর পেছনে কোন যুক্তি নেই। এগুলো কেন ইবাদত হতে গেল?
উত্তর: পূর্বেই তো বলেছি, ইবাদত হল আল্লাহকে খুশি করার জন্য। আর মা হাজেরা ও ইব্রাহীম (আ.) প্রমুখ আল্লাহর কতিপয় বান্দা-বান্দীর কিছু কাজে আল্লাহ খুশি হয়ে স্থির করেছেন, যারা আমার এই বান্দা-বান্দীদের এইসব কাজের নকল করবে তাদের প্রতিও আমি খুশি, তাহলে সেখানেও বা আমার যুক্তি খোঁজার দরকার কী? তিনি যা কিছুতে খুশি আমরাও সেই সবকিছুতেই খুশি। অতএব আমাদের যুক্তি খোঁজার দরকার নেই।
রইল আল্লাহকে পাওয়ার জন্য বাইতুল্লাহর চতুর্দিকে ঘোরার বিষয়টা, তা এখানে আসল কথা হল প্রেমিক যেমন তার প্রেমাষ্পদকে পাওয়ার জন্য তার আশপাশে ঘুরঘুর করে, আমরাও আমাদের প্রেমাষ্পদ আল্লাহকে পাওয়ার জন্য তাঁর আশপাশে ঘুরঘুর করতে চাই। কিন্তু আল্লাহর সত্তা যেহেতু সৃষ্টির সবকিছুর চেয়ে বড়, তাঁর পক্ষে নির্দিষ্ট কোন স্থানে সীমাবদ্ধ থাকা সম্ভব নয়, তাহলে আমরা তাঁর পাশে ঘুরঘুর করব কীকরে? কোথায় ঘুরঘুর করব? তাই আল্লাহ তাআলা বাইতুল্লাহ তথা কা'বা শরীফকে তাঁর রহমত ও মনোযোগের কেন্দ্র নির্ধারণ করে দিয়ে বলেছেন, তোমরা একে কেন্দ্র করেই ঘুরে দেখাও কে কে আমাকে পাওয়ার জন্য ঘুরঘুর করার মানসিকতা পোষণ কর। আমরা সেই মানসিকতা পোষণের প্রমাণ স্বরূপ প্রতীকীভাবে বাইতুল্লাহর চক্কর দিয়ে থাকি। আল্লাহ তাআলা বাইতুল্লাহর মধ্যে রয়েছেন এই ভেবে আমরা বাইতুল্লাহর চক্কর দেই না। বরং এটা হল একটা প্রতীকী আমল, এই ঘোরা হল প্রতীকী ঘোরা। আর আল্লাহ এই দেখে উৎফুল্ল হন যে, ওরা আমাকে পাওয়ার জন্য প্রতীকী ঘুরঘুর পালন করছে, যদি প্রকৃতপক্ষেই ওরা আমাকে নির্দিষ্ট কোন স্থানে পেত তাহলে ওরা ঠিকই সেখানে ঘুরঘুর করত। ব্যস আল্লাহ এতেই তাওয়াফকারীদেরকে তাঁর প্রেমিকদের মধ্যে গণ্য করে নেন।
📄 হজ্জ তো হচ্ছে একটা মেলা
প্রশ্ন: হজ্জ আর এমন কী ইবাদত? হজ্জ তো হচ্ছে একটা মেলা। নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বাজারঘাট করা- এই তো হজ্জ। হজ্জ আর মেলার মধ্যে কী পার্থক্য?
উত্তর: পার্থক্য তো স্পষ্ট। মেলায় হয় মেলামেশা, আড্ডা আর বাজারঘাট করা, আর হজ্জ বলা হয় ইহরাম বাঁধা, তাওয়াফ সায়ী করা, উকূফে আরাফা করা ইত্যাদিকে। নারী পুরুষে অবাধ মেলামেশা আর বাজারঘাট করা হজ্জের কোনোই অংশ নয়। হজ্জের নিয়মের মধ্যে তো কোথাও এমন কিছু লেখা হয়নি যে, নারী পুরুষে অবাধ মেলামেশা করতে হবে, বাজারঘাট করতে হবে। যদি কেউ হজ্জের মূল কাজ বাদ দিয়ে এগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকে তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত ভুল। কিন্তু তাই বলে প্রকৃত হজ্জকে তো আর মেলা বলা যায় না।