📄 জিন দেখার কয়েকটা ঘটনা
• জিনদের সাথে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহুবার সাক্ষাত হয়েছে। তার মধ্যে প্রসিদ্ধ একটা ঘটনা নিম্নরূপ। ঘটনাটা তাবারানী কাবীরে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, হিজরতের পূর্বের কথা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন মক্কার এক প্রান্তে বের হয়েছিলেন। আমি সঙ্গে ছিলাম। মক্কার উঁচু এলাকায় আমরা পৌঁছলাম। সেখানে তিনি একটা জায়গায় কদম মুবারক দিয়ে দাগ টেনে আমাকে তার মধ্যে থাকতে নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, আমি তোমার নিকট ফিরে না আসা পর্যন্ত এখান থেকে বের হবে না, কোন কিছু দেখে ভীত হবে না। এই বলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছুদূর সামনে গিয়ে বসে পড়লেন। তখন দেখলাম হাবশীদের মত কাল গোছের বহু লোক পাহাড়ের চূড়া থেকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নেমে আসছে। আমার ইচ্ছা হয়েছিল আমি গিয়ে সাধ্যমত তাদেরকে প্রতিহত করি। তলোয়ার উঁচু করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্ধার করার নিয়ত করলাম। কিন্তু পরক্ষণেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ স্মরণ করে থেমে গেলাম। কিছুক্ষণ পর লোকগুলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। আমি তাদেরকে বলতে শুনলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি, আমরা চলে যাচ্ছি, আমাদেরকে খাদ্য-পাথেয় দিন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা যত হাড়ের কাছে যাবে তার উপর গোসত পাবে, আর যত গোবরের কাছে যাবে সেগুলো তোমাদের জন্য খেজুরে পরিণত হবে।¹ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, তাদের চলে যাওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে এলেন, ফজরের নামাযে ইমামত করলেন। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার নির্দেশমত সেভাবে ছিলে তো? আমি বললাম, আপনি না আসা পর্যন্ত এক মাস হয়ে গেলেও সেভাবেই থাকতাম। তারপর আমি যা করতে উদ্যত হয়েছিলাম তা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শোনালাম। তখন তিনি বললেন, তুমি ঐ জায়গা থেকে বের হয়ে গেলে কেয়ামত পর্যন্ত তোমার আমার মধ্যে আর সাক্ষাত ঘটত না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ওরা কারা? তিনি বললেন, ওরা নসীবাইন² এলাকার জিন।
• হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা.) বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থেকে মানুষের সঙ্গেও লড়াই করেছি, জিনের সঙ্গেও লড়াই করেছি। জিজ্ঞাসা করা হল কীভাবে আপনি মানুষ ও জিনের সঙ্গে লড়াই করলেন? তিনি বললেন, আমরা এক সফরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলাম। পথিমধ্যে এক স্থানে অবস্থান নেয়া হল। আমি পানির মশক ও বালতি নিয়ে পানি সংগ্রহে বের হব এ সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সাবধান পানি সংগ্রহে তোমাকে একজন বাধা দিবে! তারপর যখন কুয়ার কাছে গিয়েছি, একজন কাল কুচকুচে লোক এসে বলল, আল্লাহর কসম এক বালতি পানিও তোমাকে নিতে দিব না। তখন সেও আমাকে ধরল আমিও তাকে ধরলাম। আমি তাকে আছড়ে ফেলে দিলাম। তারপর একটা পাথর নিয়ে তার মুখ ও নাক ভেঙ্গে দিলাম। তারপর মশক ভরে পানি নিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, পানির নিকট কেউ তোমার কাছে এসেছিল? আমি বললাম, হাঁ। তারপর আমি ঘটনার বিবরণ শোনালাম। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ও ছিল এক জিন শয়তান।
• আবু আইয়ূব ইয়াহইয়া ইবনে ছাবেত বলেন, আমি হাফস আত-তাইফীর সঙ্গে মিনায় ছিলাম। তখন সাদা চুল দাড়িওয়ালা একজন শায়খ বয়ান করছিলেন, বিভিন্ন বিষয়ে ফতওয়া দিচ্ছিলেন। তখন হাফস আমাকে বললেন, আবু আইয়ূব! জান এই শায়খ কে? ও হচ্ছে একজন জিন। তারপর হাফস তার দিকে এগুলেন, আমিও এগোলাম। হাফসকে দেখেই সে তার জুতো তুলে নিয়ে ভাগতে শুরু করল। লোকজন তার পিছে পিছে দৌড়াচ্ছিল আর বলছিল, হে লোকেরা! তোমরা দেখ এই যে জিন।
• ইবনে আবিদ্দুনিয়া হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবী লাইলা থেকে বর্ণনা করেছেন। জনৈক ব্যক্তি ইশার নামায পড়তে বের হন তারপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তার স্ত্রী হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর কাছে গিয়ে ঘটনা জানালে তিনি তাকে চার বছর পর্যন্ত স্বামীর অপেক্ষায় থাকতে বলেন। চার বছর পর তার সাবেক স্বামী ফিরে এল। লোকটি বলল, হযরত! আমার যে ওজর আছে। আমি ইশার নামায পড়তে বের হয়েছিলাম, এক জিন আমাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। আমি তাদের মধ্যে বহুদিন অবস্থান করতে থাকি। তারপর একদল মুমিন জিনদের সাথে ঐ জিনদের লড়াই বাঁধে। মুমিন জিনরা ওদের উপর বিজয়ী হয়ে ওদের অনেককে বন্দী করে নিয়ে যায়। তারা আমাকে স্বাধীনতা দেয় হয় তাদের মধ্যে থাকব কিংবা ফিরে আসব। আমি ফিরে আসাকে নির্বাচন করি। তারপর তারা আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে যায়।
• হযরত রশীদ আহমদ গঙ্গোহী (রহ.) তার মুরব্বী হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.)-এর জিন দেখার একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, সাহারানপুরে একটা বাড়ি ছিল, ভয়াবহ এক জিনের কারণে সে বাড়িতে কেউ বাস করার সাহস পেত না। একবার হযরত হাজী সাহেব সাহারানপুরে গেলে সেই বাড়ির মালিক হযরত হাজী সাহেবকে দাওয়াত দিয়ে সেই বাড়িতে থাকতে দিল। হাজী সাহেব সেই বাড়িতে রাত্র যাপন করছিলেন। তাহাজ্জুদের জন্য তিনি উঠেছেন তখন একজন লোক সামনে এসে হযরত হাজী সাহেবকে সালাম দিল। হযরত হাজী সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে? সে জওয়াব দিল, আমি সেই জিন যার কারণে এই বাড়িটা জনশূন্য হয়ে আছে। হযরত! আমি দীর্ঘদিন যাবত আপনার সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছি। হযরত হাজী সাহেব তাকে তাওবা করালেন।
টিকাঃ
১। অন্য আরও কিছু রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে মুহাদ্দিছীনে কেরামের অনেকে বলেছেন, হাড়ের উপর তারা মাংস পায়, আর এটা হয় তাদের (জিনদের) নিজেদের জন্য খাবার। পক্ষান্তরে গোবর পেলে সেটা হয় তাদের প্রাণীদের জন্য খাবার।
২। "নসীবাইন” দাজলা ও ফুরাত নদীর মধ্যবর্তী জাযীরা নামক বৃহৎ এলাকার অন্তর্গত একটি জনপদ।
📄 জিন টের পাওয়ার কয়েকটা ঘটনা
• নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ উসদুল গাবা, আল-বিদায়া ওয়ান্নিহা, আল-ইস্তীআব, আল-মুনতাজাম ফী তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম প্রভৃতি কিতাবে মদীনার খাযরাজ গোত্রের নেতা হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রা.) এর মৃত্যু পরবর্তী জিনদের আওয়াজ শোনার একটি কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রা.) শামে যেয়ে বসবাস করতে থাকেন। সেখানে তার মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যুর পর শহরে অদৃশ্য থেকে লোকেরা আওয়াজ শুনতে পায়—
قتلنا سيد الخزرج سعد بن عباده + رميناه بسهم فلم يخطئ فؤاده
অর্থাৎ, খাযরাজ-নেতা সা'দ ইবনে উবাদাকে আমরা হত্যা করেছি। তার প্রতি এক তীর নিক্ষেপ করেছি, যা তার কলিজা ভেদ করতে ভুল করেনি। সবাই বুঝতে পারে এটা ছিল জিনদের আওয়াজ।¹
• আবু মা'ন আনসারী বলেন, আমরা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের সঙ্গে মক্কায় যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে জনশূন্য এক প্রান্তরে উপনীত হলাম। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয একটা মৃত সাপ দেখতে পেয়ে মাটি খুড়ে সাপটিকে এক খণ্ড কাপড়ে পেঁচিয়ে দাফন করলেন। তখন অদৃশ্য থেকে কেউ একজন—যাকে কেউ দেখতে পাচ্ছিল না—বলল, হে সুরাক! আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি অবশ্যই আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, "হে সুরাক! তুমি এক জনশূন্য প্রান্তরে মৃত্যুবরণ করবে আর তোমাকে দাফন করবে আমার উম্মতের এক উত্তম ব্যক্তি।” তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) ঐ অদৃশ্যের লোকটিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কে? সে বলল, আমি হলাম একজন জিন, আর এই মৃত হল সুরাক। সে আর আমি ব্যতীত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে বায়আত করেছিল এমন কেউ আর বাকি নেই।
টিকাঃ
১। অনুমান করা হয় হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রা.) কে হত্যা করার কারণ ছিল তিনি গোসলখানায় কোন গর্তে পেশাব করেছিলেন যাতে জিন বাস করত, কিংবা গোসলখানায় দাঁড়িয়ে পেশাব করেছিলেন যে পেশাব জিনদের গায়ে লেগেছিল, এরই ফলে আক্রোশে তারা তাকে হত্যা করে।