📄 জান্নাত, জাহান্নাম ও কবর আযাব প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা
আল্লাহর অস্তিত্বের দলীল নিয়ে কথা বলতে বলতে নফস্ ও শয়তান বহুদূর নিয়ে গেল। মূর্তি পূজা, ছবি, প্রতিকৃতি, স্মৃতিস্তম্ভ— কত বিষয়ের দিকে নিয়ে গেল। প্রায়শঃই এমন হয় নফস্ ও শয়তান এক কথার চিন্তা থেকে অন্য কথার চিন্তায় চলে যায়। দেখবেন নফস্ ও শয়তানের সাথে এক বিষয়ে বাহাছ শুরু হয়েছে, কিন্তু আলোচনা বেশিক্ষণ সে বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে দিক থেকে দিগন্তরে চলে গেছে। বিশেষত ইবাদত-বন্দেগী করতে শুরু করলে সেই ইবাদত-বন্দেগী কেন করা হচ্ছে এ চিন্তা উদিত হবে। তখন মনের মধ্যে আসবে আল্লাহর জন্য করা হচ্ছে, কবর আযাব ও জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচার জন্য করা হচ্ছে, জান্নাত হাছিল করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। এ চিন্তা আসার সাথে সাথে নফস্ ও শয়তানের পক্ষ থেকে প্রশ্ন আসবে আসলেই আল্লাহ আছেন কি? আসলেই কবরের আযাব বলে কিছু আছে কি? আসলেই জান্নাত জাহান্নাম আছে কি? প্রায়শই ইবাদত-বন্দেগীর সময় নফস্ ও শয়তানের পক্ষ হতে এ প্রশ্নগুলো এসে থাকে। এগুলো হল নফস্ ও শয়তানের কমন (common) প্রশ্ন বা কমন ওয়াছওয়াছা। কমন প্রশ্নের জবাব দিতে অপারগ হওয়া নিতান্তই ব্যর্থ ছাত্র সাব্যস্ত হওয়ার পরিচায়ক। আমরা এমন ব্যর্থ ছাত্র সাব্যস্ত হতে যাবে কেন? তাই এসব কমন প্রশ্নের জবাব অতি অবশ্যই জানা থাকতে হবে।
এখন এসব কমন প্রশ্নের জবাবের বিষয়ে আলোচনায় আসা যেতে পারে। এর মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব থাকার বিষয়ে পূর্বে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। রইল কবরের আযাব বলে কিছু আছে কি, আসলেই জান্নাত জাহান্নাম আছে কি— এসব প্রশ্নের উত্তরে বক্তব্য কি হওয়া চাই? অনেক সাধারণ মুসলমানও এসব প্রশ্নের জবাব নিজ নিজ এ্যাঙ্গেলে দিতে পারেন। আমি যখন পশ্চিম নাখালপাড়া বাইতুল আতীক জামে মসজিদে ইমামত করতাম, সেসময় একজন মুসল্লী আমাকে বলেছিলেন, হুজুর! মনের মধ্যে অনেক সময়ই ওয়াছওয়াছা আসে যে, কবরের আযাব যদি প্রকৃতপক্ষে না-ই থাকে, জাহান্নামের আযাব যদি প্রকৃতপক্ষে না-ই থাকে, জান্নাত যদি প্রকৃতপক্ষে না-ই থাকে, তাহলে ইবাদত-বন্দেগীর পেছনে এত কষ্ট করা তো বেকার যাবে! তাহলে কেন ইবাদত-বন্দেগীর পেছনে এত কষ্ট করা? আমি তাকে বলেছিলাম, মনের মধ্যে এসব প্রশ্ন এসে থাকে নফস্ ও শয়তানের পক্ষ হতে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নফসের এসব প্রশ্নের জবাবে আপনি কী বলেন? তিনি বলেছিলেন, আমি বলি, এগুলো আছে কি নেই এই সন্দেহে ইবাদত-বন্দেগী করলাম না, কিন্তু যদি থাকে তাহলে কী হবে? (নাউযু বিল্লাহ) যদি এসব না থাকে তাহলে তো ইবাদত-বন্দেগী করায় যা একটু কষ্ট হয়েছে তার বেশি আমার কোন ক্ষতি নেই, আর যৎসামান্য যা কিছু কষ্ট হয়েছে, তার জন্যও কোন দুঃখ হবে না, কারণ তখন তো তোমার কথামত আমরাই থাকব না। জান্নাত জাহান্নামই যদি না থাকে, তাহলে আমরাও তো থাকব না, বিলীন হয়ে যাব, তাহলে দুঃখ করার জন্য আমাদের মনও থাকবে না। কিন্তু যদি জান্নাত জাহান্নাম থাকে আর ইবাদত-বন্দেগী না করে থাকি, তাহলে কী উপায় হবে? তখন তো অনন্তকালের কষ্টে ভুগতে হবে। একথা বলার পর নফছ চুপ হয়ে যায়।
আমি বললাম, আপনার বক্তব্যে নফস্ ও শয়তান চুপ হয়ে যায় বটে, তবে আপনার বক্তব্যে কিন্তু জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব ইত্যাদি ঈমান-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাথে "যদি” কথাটি ব্যবহৃত হয়। আর "যদি” কথাটি সন্দেহ জ্ঞাপক, ঈমানের ক্ষেত্রে যা গর্হিত। এ হিসেবে আপনার কথাটি সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে খুব একটা ভাল নয়, তবে সন্দেহ না থাকলে এরূপ ক্ষেত্রে এমন বলাতে আপত্তি নেই। কারণ, প্রতিপক্ষ নফস্ ও শয়তানের ওয়াছওয়াছাকে এ পন্থায় হলেও যে প্রতিহত করা যায় সে হিসেবে পন্থাটি বাহ্য দৃষ্টিতে খারাপ নয়। প্রতিপক্ষ (নফস্ ও শয়তান) বলে, যদি এসব না থাকে তাহলে ... আর আপনি বলেন যদি থাকে তাহলে ... একে বলে প্রতিপক্ষের কথা দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমন করা। বাহাছে বিজয়ী হওয়ার এ-ও একটা তরীকা বা কৌশল। আমাদের বাগধারায় বলা হয় কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। যাহোক এভাবে বাহাছে বিজয়ী হয়ে থাকেন ভাল কথা। তবে এরূপ ক্ষেত্রে মুখে "যদি” বললেও অন্তরে কিন্তু দ্ব্যর্থহীন বিশ্বাস রাখা চাই যে, জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব ইত্যাদি বিষয় অবশ্যই রয়েছে। নতুবা হতে পারে ঐ "যদি"-র মধ্য দিয়েই শয়তান ঈমানী বিষয়ে আপনার মধ্যে একটু হলেও সন্দেহের লেশ ঢুকিয়ে দিল বা রেখে দিল। শয়তান অতি ধুরন্ধর শত্রু বিধায় তার ব্যাপারে এমনতর সুক্ষ্মভাবেও সতর্ক থাকা চাই।
ঐ মুসল্লীর কথিত ভাষায় জবাব দিলেই যে নফস্ ও শয়তান এ ব্যাপারে পূর্ণ ক্ষান্ত হয়ে যাবে তা নাও হতে পারে। এ ব্যাপারে মনের মধ্যে আরও ২টা কমন ওয়াছওয়াছা উত্থাপিত হয়ে থাকে। (১) জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব আসলেই আছে কি? কেউ কি দেখেছে? (২) মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, সর্বনিম্ন জান্নাতীকে কমপক্ষে এই দুনিয়ার দশ গুণ পরিমাণ স্থান দেয়া হবে। এত জায়গা কোথায়? নিম্নে এই দুটো বিষয় সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা পেশ করা গেল।
নামাযের মধ্যে শয়তানের সঙ্গে বাহাছ করতে নেই— মনে রাখা চাই নামায, যিকির, তেলাওয়াত, মুতালাআ ইত্যাদি জরুরী কাজে মগ্ন থাকার মুহূর্তে নফস্ ও শয়তানের সাথে বাহাছ করতে নেই। কারণ, তখন এসব ছওয়াল জবাবে মশগুল হলে আপনি সেসব জরুরী কাজের মগ্নতা হারিয়ে ফেলবেন। তাহলে নফস্ ও শয়তান এভাবে কামিয়াব হয়ে যাবে যে, জরূরী কাজের মগ্নতা থেকে আপনাকে বঞ্চিত করে দিতে সক্ষম হল। যেসব কাজে মগ্নতা আবশ্যক, সেসব কাজের মুহূর্তে এসব চিন্তা মনে এলে সেদিকে কোনক্রমেই মনোযোগ না দেয়া চাই। শয়তানের এসব ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা ও তা নিয়ে বাহাছ চর্চা করতে হলে নামাযের বাইরে করবেন, নামাযের মধ্যে নয়।
📄 জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব আসলেই আছে কি?
জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব আসলেই আছে কি? কেউ কি দেখেছে? না দেখে বিশ্বাস করা কি অন্ধ বিশ্বাস নয়? এ ওয়াছওয়াছার জবাব হল— হাঁ আসলেই আছে, কেউ দেখেনি এমন নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখেছেন। আমাদের মধ্যকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের সকলের পক্ষ হতে তাঁকে দেখানো হয়েছে। মেরাজের রাতে তিনি শুধু আল্লাহকে নয়, জান্নাত জাহান্নাম ইত্যাদি যা কিছু আমরা না দেখে বিশ্বাস করি সেসব কিছু তিনি স্ব-চোখে দেখেছেন। এমন একজন দেখে এসে বলেছেন, যাকে দুনিয়ার কেউ মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি। ঘোর শত্রু পর্যন্ত যাকে মিথ্যুক বলতে পারেনি। আমাদের মত লক্ষ মানুষকে যদি দেখানো হত, আর আমরা দেখে এসে বলতাম, তবুও মানুষ অস্বীকার করতে পারত যে, হয়তো পরিকল্পিতভাবে আমরা মিথ্যা বলছি। কিন্তু এমন একজনকে দেখানো হয়েছে, যাকে কেউ মিথ্যুক বলতে পারেনি এবং পারবেও না। আমাদের মত লক্ষ কোটি মানুষের দেখার চেয়ে তাঁর একার দেখার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি। তিনি দেখে এসে বলেছেন, অতএব এটাতে বিশ্বাস স্থাপন করা অন্ধ বিশ্বাস হতে পারে না।
📄 জান্নাতে এত জায়গা কোথায়?
যদি ওয়াছওয়াছা হয় সর্বনিম্ন জান্নাতীকে কমপক্ষে এই দুনিয়ার দশ গুণ পরিমাণ স্থান দেয়া হবে। এত জায়গা কোথায়? এ ওয়াছওয়াছার প্রথম জবাব হল এটা সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। হাদীছে এসেছে সর্বশেষে যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে তাকে আল্লাহ তাআলা বলবেন, «اذْهَبْ فَادْخُلِ الْجَنَّةَ فَإِن مِثْلَ الدُّنْيَا وَعَشَرَةَ أَمْثَالِهَا .» অর্থাৎ, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর, তোমার জন্য রয়েছে দুনিয়ার সমপরিমাণ ও তার দশ গুণ। (মুসলিম: হাদীছ নং ৩০৮)
এ গেল হাদীছের বক্তব্য দিয়ে জবাব। হাদীছের জবাব তো নিশ্চয়ই শয়তান মানবে না। তাহলে দ্বিতীয় জবাব হল বিজ্ঞানীদের বক্তব্য দিয়ে জবাব। বিজ্ঞানীরা বলে, সারা পৃথিবীতে যত বালুকণা আছে তার তুলনায় একটা বালুকণা যত ক্ষুদ্র, মহাবিশ্বের সামনে পৃথিবী তার চেয়েও ক্ষুদ্র। আর বিজ্ঞানীদের ভাষায় যে মহাবিশ্ব জান্নাত তার চেয়েও বড়। তাহলে সর্বনিম্ন জান্নাতীকে দশ দুনিয়া পরিমাণ কেন দশ হাজার দুনিয়া পরিমাণ জায়গা দিলেও জান্নাতের জায়গা ফুরাবে না। বিজ্ঞানীদের আর একটা তথ্য শুনুন। বেশ কিছু বছর পূর্বে বিজ্ঞানীরা একটা নতুন নক্ষত্র আবিষ্কার করেছিল, যার নাম দিয়েছিল তারা "কোয়াসার”। এটা ছিল তখনকার আবিষ্কৃত সবচেয়ে দূরবর্তী নক্ষত্র। বিজ্ঞানীদের ভাষায় সেটা এক হাজার কোটি আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ এতদূরে যে, আলোর গতিতে (প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল তথা প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার গতিতে) কোন যানবাহন যদি দুনিয়া থেকে চলা শুরু করে, তাহলে সেই নক্ষত্র পর্যন্ত পৌঁছতে সময় লাগবে এক হাজার কোটি বছর। আরও মনে রাখুন কুরআনে কারীমের ভাষ্যমতে প্রথম আসমানকে গ্রহ-নক্ষত্র দ্বারা সাজানো হয়েছে। তাহলে এই কোয়াসার নামক নক্ষত্রও প্রথম আসমানের নিচে। তার কত উপরে প্রথম আসমান তা-ও আমাদের জানা নেই। তারপর দ্বিতীয় আসমান, তারপর তৃতীয় আসমান, এভাবে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমান। সপ্তম আসমানের উপরে জান্নাত। তাহলে জান্নাতের এরিয়া যে কত বিশাল বিস্তীর্ণ তা আমাদের কল্পনায়ও আনা সম্ভব নয়। এভাবে চিন্তা করলে মনে হয় সর্বনিম্ন জান্নাতীকে দশ দুনিয়া কেন দশ লক্ষ দুনিয়া পরিমাণ এবং অন্যদেরকে তাদের মর্যাদা অনুপাতে আরও বেশি পরিমাণ দিলেও হয়তো জান্নাতের জায়গা ফুরাবে না। সুবহানাল্লাহ!