📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 ছবি, প্রতিকৃতি ও বিভিন্ন রকম স্মৃতিস্তম্ভ প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা

📄 ছবি, প্রতিকৃতি ও বিভিন্ন রকম স্মৃতিস্তম্ভ প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা


আমি একবার মনে মনে ভাবছিলাম— ছবি তোলা ও প্রতিকৃতি বানানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে যেসব কারণে, তার মধ্যে একটা বিশেষ কারণ কি এ-ও যে, ছবি তুললে বা প্রতিকৃতি বানালে সেই ছবি বা প্রতিকৃতির প্রতি কিছুটা হলেও মনোনিবেশ নিবদ্ধ হবে। এভাবে যতটুকু মনোনিবেশ ছবি বা প্রতিকৃতির প্রতি নিবদ্ধ হবে আসল ব্যক্তি (যার ছবি/প্রতিকৃতি) ততটুকু মনোনিবেশ থেকে বঞ্চিত হবে। আল্লাহর ছবি বা প্রতিকৃতি হলে তার প্রতি মনোযোগ প্রদান তো আল্লাহর প্রতি মনোযোগের ক্ষেত্রে শরীকানার শামিল হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে তো ছবি বা প্রতিকৃতি হয়ে দাঁড়াল শিরক অনুপ্রবেশের এক সুক্ষ্ম চোরা গলি। বোধ হয় এ জন্যই যারা ছবি কিংবা মূর্তি/প্রতিকৃতি বানায় কেয়ামতের দিন তাদেরকে সেই ছবি বা মূর্তি/প্রতিকৃতিতে জীবন সঞ্চারের জন্য বলা হবে যে, আমার সাথে শরীকানার মত কাজ করেছিলে, আমার শরীক তৈরি করেছিলে তোমরা, শরীকরা আমার ইবাদতে শরীক হয়েছে আর সেই শরীকদেরকে তৈরি করেছিলে তোমরা, সেমতে তোমরা হলে বড় শরীক, যেন শরীকদের স্রষ্টা। তাহলে এখন ওগুলোর মধ্যে জীবন সঞ্চার করে দেখাও কতটুকু তোমাদের ক্ষমতা, কেমন স্রষ্টা তোমরা! যদি এর ক্ষমতা না-ই থাকবে, তাহলে এমন কাজ করেছিলে কেন? হাদীছে এসেছে— রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذِّبُونَ وَيُقَالُ لَهُمْ أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمُ .»
অর্থাৎ, এই ছবি/প্রতিকৃতি নির্মাতাদেরকে শাস্তি প্রদান করা হবে এবং তাদেরকে বলা হবে তোমরা এই যা তৈরি করেছিলে তাতে জীবন সঞ্চার কর। (মুসলিম: হাদীছ নং ২১০৭)

ছবি, মূর্তি/প্রতিকৃতিতে ভক্তি নিবেদন তো কিছু ধূলোবালি একত্র করে তার প্রতি ভক্তি নিবেদন বৈ কিছু নয়। একটা ঘটনা শুনুন। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ২১ তারিখ অন্যান্য ২১ ফেব্রুয়ারীর মতই ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হল। যারা ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনারে সরাসরি ফুল মাল্য যা কিছু নিবেদন করার তা করল। পরের দিন একটা বহুল প্রচলিত দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় শেরপুর থেকে তোলা একটা ছবি দেখলাম। ছবিতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন বালক বালিকা রাস্তার পাশে কয়েকটা ইটের টুকরো দাঁড় করিয়ে তাতে মনের আবেগ মিশ্রিত করে ফুল মাল্য প্রদান করছে। সাংবাদিক সাহেব এটাকে খুব প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে মূল্যায়ন করে রিপোর্ট করেছেন। আমার মনে হল জাহিলী যুগের মানুষদের সম্বন্ধে শুনেছি তারা পথে ঘাটে মনে চাইলে কিছু ধূলোবালি একত্র করে তাতেই পূজা নিবেদন আরম্ভ করে দিত। এমনসব কাণ্ডকারখানার কারণেই তাদেরকে অন্ধ যুগের মানুষ বলে গালি দেয়া হয়। কিন্তু শেরপুরের এই চিত্রে তার চেয়ে খুব একটা ব্যতিক্রম কী পাওয়া গেল?

যাহোক বলা হচ্ছিল, আল্লাহর ছবি বা প্রতিকৃতি বানালে আল্লাহর প্রতি মনোযোগিতায় আল্লাহর শরীকানা হয়ে যায়। এটা সূক্ষ্মভাবে শিরকের সূচনা করে। এভাবে আল্লাহকে তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিতও করা হয়। এমনিভাবে গুরুজনের ছবি বা প্রতিকৃতি হলে যতটুকু ভক্তি তাদের ছবি বা প্রতিকৃতির প্রতি নিবেদিত হয় গুরুজন ততটুকু ভক্তি থেকে বঞ্চিত হন, অথচ অনুসারী ও ভক্তবৃন্দের ভক্তির পূরোটা পাওয়াই ছিল তাদের প্রাপ্য অধিকার। স্নেহাস্পদের ছবি বা মূর্তি হলে যতটুকু স্নেহ তার ছবি/প্রতিকৃতির প্রতি নিবেদিত হয়, সেই স্নেহাস্পদ ততটুকু স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, অথচ মুরব্বী ও গুরুজনদের স্নেহের পূরোটা পাওয়াই ছিল তাদের প্রাপ্য অধিকার। প্রেমাষ্পদের ছবি বা প্রতিকৃতি হলে যতটুকু প্রেম সেই ছবি বা প্রতিকৃতির প্রতি নিবেদিত হয় প্রেমাষ্পদ ততটুকু প্রেম থেকে বঞ্চিত হয়, অথচ প্রেমিকদের অখণ্ড প্রেম পাওয়াই ছিল তাদের প্রাপ্য অধিকার। এভাবে ছবি বা প্রতিকৃতি গুরুজন, স্নেহাস্পদ ও প্রেমাষ্পদ সকলের অধিকার কিছুটা হলেও কেড়ে নেয়। ছবি বা প্রতিকৃতিই তখন গুরুজনের ভক্তিতে, স্নেহাস্পদের স্নেহে এবং প্রেমাষ্পদের প্রেমে শরীক হয়ে দাঁড়ায়। আর যদি ছবি/প্রতিকৃতিকে নিয়েই এমন ব্যস্ত থাকা হল যে, আসল ব্যক্তি মন থেকে সম্পূর্ণই হারিয়ে গেল, যেমনটা মূর্তিপূজারী অংশীবাদীদের বেলায় দেখা যায়, তাহলে তো ছবি/প্রতিকৃতিই হল তাদের সব বঞ্চনার উৎস। অতএব সারকথা বলা যায়— ছবি বা প্রতিকৃতি দ্বারা কোন কোন ক্ষেত্রে শিরকের সূচনা হয় আর কোন কোন ক্ষেত্রে তা দ্বারা অধিকার লংঘিত হয়। এ দৃষ্টিভংগীতে বিচার করলে ছবি বা প্রতিকৃতি একাধারে খোদার অধিকার ও মানুষের অধিকার উভয়টি লংঘিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিধায় নিষিদ্ধ হওয়াই যুক্তিসংগত।

যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে, ছবি বা প্রতিকৃতির মধ্যে ভাল দিকও তো রয়েছে। মৃত গুরুজন ও মৃত আপনজনদের ছবি বা প্রতিকৃতি দেখলে তো তাদের কথা স্মরণ হয়, তাদের জন্য কিছু করার চেতনা জাগ্রত হয়।

তাহলে আপনি বলতে পারেন, ছবি বা প্রতিকৃতির মধ্যে খারাবের যে দিকগুলো রয়েছে তার ভিত্তিতেই তা খারাপ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কোন জিনিসে ভাল ও মন্দ দুটো দিক থাকলে সেই খারাবের পরিমাণ যদি বেশি বা মারাত্মক হয়, তাহলে সেটা গর্হিত বিবেচিত হতে আর অন্য কিছু চিন্তায় আনার দরকার হয় না। তদুপরি কথিত ভাল দিকটার বাস্তবতা যদি প্রকৃতপক্ষেই শূন্যের কোটায় থাকে, তাহলে তো সেদিকটার ভিত্তিতে বিবেচনার প্রয়োজনই অবশিষ্ট থাকে না। ছবি বা প্রতিকৃতি দেখলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বেশি কিছু করা হয়— কথিত এ দিকটার কোন বাস্তবতা নেই, এটা বাস্তবতা-বিরোধী কথা। পূর্বসূরীরা মুরব্বীদের জন্য বেশি করত না কি ছবি/প্রতিকৃতি দেখে এই যুগের লোকেরা বেশি করে? এই যুগে যারা নিষ্ঠার সাথে ছবি/প্রতিকৃতি সংস্কৃতির চর্চা করে, তারা ছবি দেখে মৃত আপনজনদের স্মরণ করে সত্য, কিন্তু তাদের জন্য করার মত কিছুই করে না। যা-ও বা করে তা কোন কাজের কিছু নয়। কেউ তো ছবি/প্রতিকৃতির সামনে হাত জোড় করে মাথা নত করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে, যাতে মৃত ব্যক্তির তো কোন উপকার হয়ই না, উপরন্তু তা দ্বারা সে নিজে শিরকের পর্যায়ভুক্ত কর্মে লিপ্ত হয়। কেউ তো ছবি/প্রতিকৃতির গলায় ফুলের মালা দেয়, কিন্তু এতে কি মৃতের কোন উপকার হয়? আমাদের তো এমন কিছু করা উচিত, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আত্মার উপকার সাধিত হয়। কিন্তু ছবি/প্রতিকৃতির গলায় মালা ঝোলানো দ্বারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আত্মার কী উপকার সাধিত হয়ে থাকে? কিছুই না। যদি তা-ই হয়, এতে তাদের কোনো উপকার সাধিত না হয়, তাহলে তাদের উদ্দেশে কিছু করার নামে নিস্ফল ও অবান্তর কিছু করা দ্বারা কি তাদের মূল্যায়ন হল, না তাদের সাথে উপহাস হল? তাই বলছিলাম, যারা ছবি বা প্রতিকৃতি রাখে তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বেশি কিছু করে— এ কথা আদৌ বাস্তবসম্মত নয়। বরং যেসব দ্বীনদার ব্যক্তি ওসব ছবি বা প্রতিকৃতি না রাখে তারাই বেশি কিছু করে থাকে। তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর পিতা-মাতা ও গুরুজনদের জন্য দুআ করে থাকে, সবসময় তাদের জন্য দান-খয়রাত ও ঈসালে ছওয়াব করে থাকে। ছবি বা প্রতিকৃতি রাখে এ গোছের লোকেরা মৃত আপনজনদের জন্য খুব বেশি কিছু করলেও সেটা হল বৎসরান্তে একটা মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে ক্ষান্ত হওয়া। অথচ বিশুদ্ধ মতানুসারে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করলে ছওয়াব তো নয়ই বরং উল্টো গোনাহ হয়। যেহেতু মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা বেদআত, আর বেদআত হল গোমরাহী। অতএব বেদআত চর্চা করা গোনাহে কবীরা। একটা দীর্ঘ হাদীছের একাংশে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ».
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই প্রত্যেকটা নতুনসৃষ্ট বিষয় হল বিদ'আত। আর সব বিদ'আত হল গোমরাহী। (আবু দাউদ ও মুসলিম)

সুতারাং মৃত আপনজনের ছবি বা প্রতিকৃতি রাখলে তা দেখে তাদের কথা স্মরণ হবে, ফলে তাদের জন্য বেশি কিছু করা হবে— এ যুক্তি আদৌ বাস্তবসম্মত নয়।

যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে, যারা বিদেশ বিভুইয়ে বসবাস করে, তারা আপনজনের ছবি দেখে মনের তৃষ্ণা নিবারণ করে থাকে, ছবি তাদের আপনজনের সাক্ষাত বঞ্চিত অন্তরে শান্ত্বনার এক বিরাট উপকরণ। তাদের জন্য ছবি নিষিদ্ধ হওয়া তো তাদের আত্মাকে বঞ্চিত করার মত একটা পাষণ্ডতা!

তাহলে আপনি বলতে পারেন, ছবি দেখে মনের তৃষ্ণা নিবারণ না করলে তো যোগাযোগ করে সেই তৃষ্ণা নিবারণ করত। এখন ছবি দেখে তৃষ্ণা নিবারণ হওয়ায় যোগাযোগ রাখার স্পৃহায় কিছুটা হলেও ভাটা পড়ে, ফলে আপনজন সেই পরিমাণ যোগাযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। আর খোদা না করুক যদি সেই বিদেশ বিভুইয়ে বসে কোন গায়র মাহরাম নারীর ছবি দেখে আর সেই ছবি দেখার ফলে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে যায় (বিবির ছবি দেখলেও অনুরূপ হতে পারে) তাহলে তো সেই চাপ সরাতে অবৈধ পথে অগ্রসর হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। তাহলে তো বিবির আরও বঞ্চনা। তাইতো বলছিলাম, ছবি বা প্রতিকৃতি মানুষের অধিকার বঞ্চনার উৎস। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হবে।

আর ছবি দেখে অশান্ত মনে শান্ত্বনা লাভের প্রসঙ্গে কথা হল— বিদেশ বিভুইয়ে বসে আপনজনের ছবি দেখলে কি মনের শান্ত্বনা লাভ হয় না মনের অশান্তি আরও বেড়ে যায়? প্রথমত একটু শান্তনা লাভ হলেও পরে কিন্তু মনের অস্থিরতাই বৃদ্ধি পায়। ওরকম ছবি দেখতে দেখতে তো মন তাদের সান্নিধ্য লাভ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এরকম ব্যাকুল হওয়া অনেককে তখন ভিটে মাটি বিক্রি করে সংগ্রহ করা বিদেশে যাওয়ার অর্থটুকু উপার্জন হওয়ার পূর্বেই দেশে রিটার্ন ব্যাক করতে দেখা যায়। তাহলে ছবি দেখে লাভ হল না লোকসান হল? সামান্য ঐটুকু শান্ত্বনা কি তাদের বিরাট স্থায়ী অশান্ত্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াল না?

যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে যে, অনেক মানুষ বৈবাহিক জীবনের প্রথম পর্যায়ের অনেক স্মৃতি অডিও/ভিডিও-এর মাধ্যমে স্থির চিত্রে বা চলচ্চিত্রে ধারণ করে রাখে, পরবর্তী জীবনে সেগুলো দেখে মনে আনন্দ লাভ করে থাকে। তাদের জন্য তো ছবি হারানো জীবনের আনন্দ পুনরুদ্ধারের একটা উপায়। এজন্যই তো এখন প্রগতিশীল সমাজ অডিও ভিডিও সবকিছুর মাধ্যমে পুরাতন স্মৃতি ধরে রাখে।

তাহলে আপনি বলতে পারেন, পুরনো জীবনের চিত্র দেখার মধ্যে ক্ষতিও আছে। পুরণো চিত্রে বিবির টানাটানা চেহারা ও যৌবনকালের নিটোল নিডৌল দেহ-বল্লরী দেখার পর বর্তমান অবস্থার লোলচর্ম দেখলে হাল অবস্থার প্রতি অস্পৃহভাব জাগতে পারে। আর একবার যদি কোনভাবে স্ত্রীর হাল অবস্থার প্রতি অস্পৃহভাব মনে এসে যায়, তাহলে তো বিবি এই শেষ বয়সে ছিটেফোটা যতটুকু আদর-আহ্লাদ পাচ্ছিল তা থেকেও বঞ্চিত হয়ে যাবে। তাই আবার পূর্বের কথার পুনরাবৃত্তি করতে হয় যে, ছবি বা প্রতিকৃতি হল মানুষের অধিকার বঞ্চনার উৎস। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হবে। এভাবে হারানো জীবনের আনন্দ পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে এখনকার আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হওয়ার আশংকা রয়েছে। আর যদি আগের চিত্র দেখে ওরকম আর একটা নিটোল নিডৌল সংগিনী লাভের চিন্তা মনের মধ্যে ঘুরঘুর করতে আরম্ভ করে, আর সেই চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটেই যায়, তাহলে তো পুরণো বিবির আনন্দের সীমা থাকবে না, সতীনের সাথে মহানন্দে (?) যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে! রয়ে গেল প্রগতিশীলদের পুরাতন স্মৃতি ধরে রাখার কালচার প্রসঙ্গ। এ ব্যাপারে কথা হল— যারা নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবী করে, তাদের পক্ষে তো পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করাই অসংগতিপূর্ণ। তারা কি ভেবে দেখে না যে, পেছনের দিকে ফিরে তাকানো প্রগতিশীলতার পরিপন্থী! প্রগতিশীল হতে গেলে নাকি পেছনের সবকিছুকে গলা ছেড়ে গালি দিতে হয়, পুরণো সবকিছুকে জীবনের অঙ্গন থেকে ঝেড়ে মুছে ওয়াশিং পাউডার দিয়ে ক্লিন করে নিতে হয়? নইলে তো প্রগতিশীল হওয়া হল না, সেকেলেই থেকে যাওয়া হল! তাহলে প্রগতিশীলদের কাছে একটা প্রশ্ন রাখা কি অসংগত হবে যে, নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবী করার পর পুরণো স্মৃতি ধরে রাখার এই স্ববিরোধিতা কেন?

যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে যে, ছবি বা প্রতিকৃতির মধ্যে কি কোনোই ইতিবাচক দিক নেই? আজকাল জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্মরণে অনেক রকম প্রতিকৃতি বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে রাখা হয়, সেসব প্রতিকৃতি বা স্মৃতিস্তম্ভ দেখে সকলের মধ্যে ওরকম জাতীয় পর্যায়ের অবদান রাখার চেতনা উজ্জীবিত হয়। জাতি সেসব প্রতিকৃতি বা স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পন করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে। ঐসব ঐতিহাসিক দিবস আসলে জাতির মধ্যে জাগরণের সাড়া পড়ে যায়। এগুলো কি কোনোই ফায়দা নয়?

তাহলে আপনি বলতে পারেন, হে শয়তান! তুমি কিছু লোককে এরকম বুঝাতে পেরেছ বলেই তো আজ এমনটা হচ্ছে। তাদেরকে তো এভাবে ভেবে দেখারই সুযোগ দিচ্ছ না যে, প্রতিকৃতি বা স্মৃতিস্তম্ভে ফুল অর্পন করা দ্বারা কি আসলেই ঘটনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন হয়ে থাকে। শ্রদ্ধা পাওয়ার ব্যক্তি রইল কোথায় আর ফুল দেয়া হল কোথায়? ব্যক্তি রইল একখানে, আর অন্যত্র ফুলের তোড়া অর্পন করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মহড়া দেয়া হল— এটা অসংগতিমূলক ও হাস্যকর হয়ে যায় কি না তা কি একবারও ভেবে দেখার সুযোগ তাদেরকে দিয়েছো? তাদের কবরের কাছে গিয়ে ফুল অর্পন করলেও অন্তত এই অসংগতির দায় কিছুটা হলেও হয়তো এড়ানো যেত। তবে পুরোপুরি এড়ানো যেত না এ কারণে যে, কবর একটা ভিন্ন জগত আর ফুল দেয়া হয় একটা ভিন্ন জগতে। কাজেই একান্তই যদি ফুল দিতেই হয়, তাহলে কবরের কাছে ফুল না দিয়ে এই জগতের অন্য যে কোন স্থানে ফুল দিলেও চলত এবং তা একই কথাই হত। তা যখন করা হয় না, তখন ফুল প্রদানের এই মহড়াই সমূলে বাদ দিলে হয়। যদি কেউ বলতে চান যে, যেখানে ফুল অর্পন করা হয় সেখানে তাদের আত্মার উপস্থিতি কল্পনা করে ফুল অর্পন করা হয়ে থাকে, তাহলে বলা যেতে পারে, প্রত্যেকে যার যার ঘরে তাদের আত্মার উপস্থিতি কল্পনা করে নিজ নিজ ঘরেই ফুলের মাল্য ঝুলিয়ে রাখতে পারেন, তাতে উদ্দেশ্যও সিদ্ধি হবে, নিজের ঘরের শোভা বর্দ্ধনও ঘটবে, আবার এত মূল্যবান ফুলের তোড়াগুলো অরণ্যে নিবেদন হওয়া থেকেও রক্ষা পাবে। আর রইল এসবের মাধ্যমে জাতির মধ্যে ওরকম অবদান রাখার চেতনা জাগ্রত করার দিক, সেটা অন্যভাবেও হতে পারে। তাদের সংশ্লিষ্ট ইতিহাস ব্যাপকভাবে আলোচনার দ্বারা সেটা হতে পারে, তাদের অধস্তনদের জাতীয়ভাবে মূল্যায়ন করা দ্বারাও সেটা হতে পারে। যুক্তিসংগত আরও কত পন্থায় তা হতে পারে। কিন্তু সে পন্থাগুলো কি আদৌ গ্রহণ করা হয়। এমনও দেখা যায় যারা জাতির জন্য অবদান রাখে, তাদের স্মৃতিস্তম্ভে দেয়া হয় ফুলের ডালি অথচ তাদের অধস্তনদের হাতে থাকে ভিক্ষার ঝুলি।

যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে যে, তাহলে এসব স্মৃতিস্তম্ভের বিরুদ্ধে আপনাদের আলেম সমাজ সোচ্চার হন না কেন? যেমন ফটো ছবি ও মূর্তির বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার? এ অন্যায়ের ব্যাপারে তারা নীরব কেন? অন্যায়ের ব্যাপারে নীরব থাকাও তো পাপ। তারাই তো বলেন,
السَّاكِتُ عَنِ الْحَقِّ شَيْطَانٌ أَخْرَسُ
অর্থাৎ, ন্যায় কথা বলা থেকে যে নীরব থাকে, সে হল বোবা শয়তান।

তাহলে আপনি বলতে পারেন, এবার কি তাহলে আলেম সমাজকে পুলিশের ঠেঙ্গানী খাওয়ার দিকে ঠেলে দিতে চাচ্ছ? যেকোনোভাবে বনী আদমকে কষ্টের দিকে ঠেলে দিতে পারলেই তো তুমি আনন্দে বগল বাজাতে পার। মস্তান সন্ত্রাসীদেরকে উস্কানী দিয়ে অপরাধের দিকে অগ্রসর কর, তারপর যখন তারা পুলিশের গুতানী খায়, রিমান্ডের বর্বর নির্যাতনে ক্লিষ্ট হতে থাকে, তখন তোমার কোন পাত্তা থাকে না, তুমি তখন চুপিসারে কেটে পড়। তখন তো তুমি পুলিশের লোকজনকে নির্যাতন না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে আস না এই ভেবে যে, এ বেচারারা তো আমার কথািতে এ পথে এসেছিল। কাজেই তাদের উপর আপতিত এই বিপদ সাধ্যমত কিছুটা হলেও প্রতিহত করার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা যথার্থই বলেছেন,
كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنْسَانِ اكْفُرُ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِييٌ مِْنكَ.
অর্থাৎ, (মুনাফেকরা) শয়তানের মত। শয়তান বলে তোমরা কুফরী কর, তারপর যখন তারা কুফরী করে তখন এই বলে কেটে পড়ে যে, তোমার এ ব্যাপারে আমার কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। (সূরা হাশর: ১৬)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُبِينٌ . অর্থাৎ, অবশ্যই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা ইউসুফ: ৫) আর শত্রুর কাজ তো যেকোনো উপায়ে শত্রুতা চরিতার্থ করা। শত্রুর প্রতি কেউ দয়া করে না, শয়তানও তাই তার শত্রু বনী আদমের প্রতি কখনও দয়া করবে তা হতে পারে না।

আর শয়তান যে এখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও তাতে ফুলের ডালি দেয়ার অন্যায়ের প্রতিবাদে আলেমদের সোচ্চার না হওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছিল, সে ব্যাপারে বলতে পারেন, তাহলে কি তুমি বোঝাতে চাচ্ছ যেহেতু আলেম সমাজ এ ব্যাপারে সোচ্চার নন তাই এটা অন্যায় নয়? তা অন্যায়ের ব্যাপারে নীরব থাকা কখন পাপ কখন পাপ না, কোন্ পরিস্থিতিতে কতটুকু নীরব থাকার অবকাশ আছে, কোন্ পরিস্থিতিতে সোচ্চার হওয়া দরকার, কখন নীরব থাকতে হয়— এসবের নিয়ম-কানুন, মাসলা-মাসায়েল আলেম সমাজ ভাল করেই জানেন, তাদেরকে তা শেখানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। নিশ্চয়ই আলেম সমাজকে একটা উৎকট ঝামেলায় ফেলানোর মতলবে তুমি এ কথা বলছ। আলেম সমাজের সাথে তোমার শত্রুতার মাত্রা বেশি তা এ কথা থেকেও বুঝা যাচ্ছে।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 জান্নাত, জাহান্নাম ও কবর আযাব প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা

📄 জান্নাত, জাহান্নাম ও কবর আযাব প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা


আল্লাহর অস্তিত্বের দলীল নিয়ে কথা বলতে বলতে নফস্ ও শয়তান বহুদূর নিয়ে গেল। মূর্তি পূজা, ছবি, প্রতিকৃতি, স্মৃতিস্তম্ভ— কত বিষয়ের দিকে নিয়ে গেল। প্রায়শঃই এমন হয় নফস্ ও শয়তান এক কথার চিন্তা থেকে অন্য কথার চিন্তায় চলে যায়। দেখবেন নফস্ ও শয়তানের সাথে এক বিষয়ে বাহাছ শুরু হয়েছে, কিন্তু আলোচনা বেশিক্ষণ সে বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে দিক থেকে দিগন্তরে চলে গেছে। বিশেষত ইবাদত-বন্দেগী করতে শুরু করলে সেই ইবাদত-বন্দেগী কেন করা হচ্ছে এ চিন্তা উদিত হবে। তখন মনের মধ্যে আসবে আল্লাহর জন্য করা হচ্ছে, কবর আযাব ও জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচার জন্য করা হচ্ছে, জান্নাত হাছিল করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। এ চিন্তা আসার সাথে সাথে নফস্ ও শয়তানের পক্ষ থেকে প্রশ্ন আসবে আসলেই আল্লাহ আছেন কি? আসলেই কবরের আযাব বলে কিছু আছে কি? আসলেই জান্নাত জাহান্নাম আছে কি? প্রায়শই ইবাদত-বন্দেগীর সময় নফস্ ও শয়তানের পক্ষ হতে এ প্রশ্নগুলো এসে থাকে। এগুলো হল নফস্ ও শয়তানের কমন (common) প্রশ্ন বা কমন ওয়াছওয়াছা। কমন প্রশ্নের জবাব দিতে অপারগ হওয়া নিতান্তই ব্যর্থ ছাত্র সাব্যস্ত হওয়ার পরিচায়ক। আমরা এমন ব্যর্থ ছাত্র সাব্যস্ত হতে যাবে কেন? তাই এসব কমন প্রশ্নের জবাব অতি অবশ্যই জানা থাকতে হবে।

এখন এসব কমন প্রশ্নের জবাবের বিষয়ে আলোচনায় আসা যেতে পারে। এর মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব থাকার বিষয়ে পূর্বে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। রইল কবরের আযাব বলে কিছু আছে কি, আসলেই জান্নাত জাহান্নাম আছে কি— এসব প্রশ্নের উত্তরে বক্তব্য কি হওয়া চাই? অনেক সাধারণ মুসলমানও এসব প্রশ্নের জবাব নিজ নিজ এ্যাঙ্গেলে দিতে পারেন। আমি যখন পশ্চিম নাখালপাড়া বাইতুল আতীক জামে মসজিদে ইমামত করতাম, সেসময় একজন মুসল্লী আমাকে বলেছিলেন, হুজুর! মনের মধ্যে অনেক সময়ই ওয়াছওয়াছা আসে যে, কবরের আযাব যদি প্রকৃতপক্ষে না-ই থাকে, জাহান্নামের আযাব যদি প্রকৃতপক্ষে না-ই থাকে, জান্নাত যদি প্রকৃতপক্ষে না-ই থাকে, তাহলে ইবাদত-বন্দেগীর পেছনে এত কষ্ট করা তো বেকার যাবে! তাহলে কেন ইবাদত-বন্দেগীর পেছনে এত কষ্ট করা? আমি তাকে বলেছিলাম, মনের মধ্যে এসব প্রশ্ন এসে থাকে নফস্ ও শয়তানের পক্ষ হতে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নফসের এসব প্রশ্নের জবাবে আপনি কী বলেন? তিনি বলেছিলেন, আমি বলি, এগুলো আছে কি নেই এই সন্দেহে ইবাদত-বন্দেগী করলাম না, কিন্তু যদি থাকে তাহলে কী হবে? (নাউযু বিল্লাহ) যদি এসব না থাকে তাহলে তো ইবাদত-বন্দেগী করায় যা একটু কষ্ট হয়েছে তার বেশি আমার কোন ক্ষতি নেই, আর যৎসামান্য যা কিছু কষ্ট হয়েছে, তার জন্যও কোন দুঃখ হবে না, কারণ তখন তো তোমার কথামত আমরাই থাকব না। জান্নাত জাহান্নামই যদি না থাকে, তাহলে আমরাও তো থাকব না, বিলীন হয়ে যাব, তাহলে দুঃখ করার জন্য আমাদের মনও থাকবে না। কিন্তু যদি জান্নাত জাহান্নাম থাকে আর ইবাদত-বন্দেগী না করে থাকি, তাহলে কী উপায় হবে? তখন তো অনন্তকালের কষ্টে ভুগতে হবে। একথা বলার পর নফছ চুপ হয়ে যায়।

আমি বললাম, আপনার বক্তব্যে নফস্ ও শয়তান চুপ হয়ে যায় বটে, তবে আপনার বক্তব্যে কিন্তু জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব ইত্যাদি ঈমান-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাথে "যদি” কথাটি ব্যবহৃত হয়। আর "যদি” কথাটি সন্দেহ জ্ঞাপক, ঈমানের ক্ষেত্রে যা গর্হিত। এ হিসেবে আপনার কথাটি সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে খুব একটা ভাল নয়, তবে সন্দেহ না থাকলে এরূপ ক্ষেত্রে এমন বলাতে আপত্তি নেই। কারণ, প্রতিপক্ষ নফস্ ও শয়তানের ওয়াছওয়াছাকে এ পন্থায় হলেও যে প্রতিহত করা যায় সে হিসেবে পন্থাটি বাহ্য দৃষ্টিতে খারাপ নয়। প্রতিপক্ষ (নফস্ ও শয়তান) বলে, যদি এসব না থাকে তাহলে ... আর আপনি বলেন যদি থাকে তাহলে ... একে বলে প্রতিপক্ষের কথা দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমন করা। বাহাছে বিজয়ী হওয়ার এ-ও একটা তরীকা বা কৌশল। আমাদের বাগধারায় বলা হয় কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। যাহোক এভাবে বাহাছে বিজয়ী হয়ে থাকেন ভাল কথা। তবে এরূপ ক্ষেত্রে মুখে "যদি” বললেও অন্তরে কিন্তু দ্ব্যর্থহীন বিশ্বাস রাখা চাই যে, জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব ইত্যাদি বিষয় অবশ্যই রয়েছে। নতুবা হতে পারে ঐ "যদি"-র মধ্য দিয়েই শয়তান ঈমানী বিষয়ে আপনার মধ্যে একটু হলেও সন্দেহের লেশ ঢুকিয়ে দিল বা রেখে দিল। শয়তান অতি ধুরন্ধর শত্রু বিধায় তার ব্যাপারে এমনতর সুক্ষ্মভাবেও সতর্ক থাকা চাই।

ঐ মুসল্লীর কথিত ভাষায় জবাব দিলেই যে নফস্ ও শয়তান এ ব্যাপারে পূর্ণ ক্ষান্ত হয়ে যাবে তা নাও হতে পারে। এ ব্যাপারে মনের মধ্যে আরও ২টা কমন ওয়াছওয়াছা উত্থাপিত হয়ে থাকে। (১) জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব আসলেই আছে কি? কেউ কি দেখেছে? (২) মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, সর্বনিম্ন জান্নাতীকে কমপক্ষে এই দুনিয়ার দশ গুণ পরিমাণ স্থান দেয়া হবে। এত জায়গা কোথায়? নিম্নে এই দুটো বিষয় সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা পেশ করা গেল।

নামাযের মধ্যে শয়তানের সঙ্গে বাহাছ করতে নেই— মনে রাখা চাই নামায, যিকির, তেলাওয়াত, মুতালাআ ইত্যাদি জরুরী কাজে মগ্ন থাকার মুহূর্তে নফস্ ও শয়তানের সাথে বাহাছ করতে নেই। কারণ, তখন এসব ছওয়াল জবাবে মশগুল হলে আপনি সেসব জরুরী কাজের মগ্নতা হারিয়ে ফেলবেন। তাহলে নফস্ ও শয়তান এভাবে কামিয়াব হয়ে যাবে যে, জরূরী কাজের মগ্নতা থেকে আপনাকে বঞ্চিত করে দিতে সক্ষম হল। যেসব কাজে মগ্নতা আবশ্যক, সেসব কাজের মুহূর্তে এসব চিন্তা মনে এলে সেদিকে কোনক্রমেই মনোযোগ না দেয়া চাই। শয়তানের এসব ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা ও তা নিয়ে বাহাছ চর্চা করতে হলে নামাযের বাইরে করবেন, নামাযের মধ্যে নয়।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব আসলেই আছে কি?

📄 জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব আসলেই আছে কি?


জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব আসলেই আছে কি? কেউ কি দেখেছে? না দেখে বিশ্বাস করা কি অন্ধ বিশ্বাস নয়? এ ওয়াছওয়াছার জবাব হল— হাঁ আসলেই আছে, কেউ দেখেনি এমন নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখেছেন। আমাদের মধ্যকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের সকলের পক্ষ হতে তাঁকে দেখানো হয়েছে। মেরাজের রাতে তিনি শুধু আল্লাহকে নয়, জান্নাত জাহান্নাম ইত্যাদি যা কিছু আমরা না দেখে বিশ্বাস করি সেসব কিছু তিনি স্ব-চোখে দেখেছেন। এমন একজন দেখে এসে বলেছেন, যাকে দুনিয়ার কেউ মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি। ঘোর শত্রু পর্যন্ত যাকে মিথ্যুক বলতে পারেনি। আমাদের মত লক্ষ মানুষকে যদি দেখানো হত, আর আমরা দেখে এসে বলতাম, তবুও মানুষ অস্বীকার করতে পারত যে, হয়তো পরিকল্পিতভাবে আমরা মিথ্যা বলছি। কিন্তু এমন একজনকে দেখানো হয়েছে, যাকে কেউ মিথ্যুক বলতে পারেনি এবং পারবেও না। আমাদের মত লক্ষ কোটি মানুষের দেখার চেয়ে তাঁর একার দেখার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি। তিনি দেখে এসে বলেছেন, অতএব এটাতে বিশ্বাস স্থাপন করা অন্ধ বিশ্বাস হতে পারে না।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 জান্নাতে এত জায়গা কোথায়?

📄 জান্নাতে এত জায়গা কোথায়?


যদি ওয়াছওয়াছা হয় সর্বনিম্ন জান্নাতীকে কমপক্ষে এই দুনিয়ার দশ গুণ পরিমাণ স্থান দেয়া হবে। এত জায়গা কোথায়? এ ওয়াছওয়াছার প্রথম জবাব হল এটা সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। হাদীছে এসেছে সর্বশেষে যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে তাকে আল্লাহ তাআলা বলবেন, «اذْهَبْ فَادْخُلِ الْجَنَّةَ فَإِن مِثْلَ الدُّنْيَا وَعَشَرَةَ أَمْثَالِهَا .» অর্থাৎ, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর, তোমার জন্য রয়েছে দুনিয়ার সমপরিমাণ ও তার দশ গুণ। (মুসলিম: হাদীছ নং ৩০৮)

এ গেল হাদীছের বক্তব্য দিয়ে জবাব। হাদীছের জবাব তো নিশ্চয়ই শয়তান মানবে না। তাহলে দ্বিতীয় জবাব হল বিজ্ঞানীদের বক্তব্য দিয়ে জবাব। বিজ্ঞানীরা বলে, সারা পৃথিবীতে যত বালুকণা আছে তার তুলনায় একটা বালুকণা যত ক্ষুদ্র, মহাবিশ্বের সামনে পৃথিবী তার চেয়েও ক্ষুদ্র। আর বিজ্ঞানীদের ভাষায় যে মহাবিশ্ব জান্নাত তার চেয়েও বড়। তাহলে সর্বনিম্ন জান্নাতীকে দশ দুনিয়া পরিমাণ কেন দশ হাজার দুনিয়া পরিমাণ জায়গা দিলেও জান্নাতের জায়গা ফুরাবে না। বিজ্ঞানীদের আর একটা তথ্য শুনুন। বেশ কিছু বছর পূর্বে বিজ্ঞানীরা একটা নতুন নক্ষত্র আবিষ্কার করেছিল, যার নাম দিয়েছিল তারা "কোয়াসার”। এটা ছিল তখনকার আবিষ্কৃত সবচেয়ে দূরবর্তী নক্ষত্র। বিজ্ঞানীদের ভাষায় সেটা এক হাজার কোটি আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ এতদূরে যে, আলোর গতিতে (প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল তথা প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার গতিতে) কোন যানবাহন যদি দুনিয়া থেকে চলা শুরু করে, তাহলে সেই নক্ষত্র পর্যন্ত পৌঁছতে সময় লাগবে এক হাজার কোটি বছর। আরও মনে রাখুন কুরআনে কারীমের ভাষ্যমতে প্রথম আসমানকে গ্রহ-নক্ষত্র দ্বারা সাজানো হয়েছে। তাহলে এই কোয়াসার নামক নক্ষত্রও প্রথম আসমানের নিচে। তার কত উপরে প্রথম আসমান তা-ও আমাদের জানা নেই। তারপর দ্বিতীয় আসমান, তারপর তৃতীয় আসমান, এভাবে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমান। সপ্তম আসমানের উপরে জান্নাত। তাহলে জান্নাতের এরিয়া যে কত বিশাল বিস্তীর্ণ তা আমাদের কল্পনায়ও আনা সম্ভব নয়। এভাবে চিন্তা করলে মনে হয় সর্বনিম্ন জান্নাতীকে দশ দুনিয়া কেন দশ লক্ষ দুনিয়া পরিমাণ এবং অন্যদেরকে তাদের মর্যাদা অনুপাতে আরও বেশি পরিমাণ দিলেও হয়তো জান্নাতের জায়গা ফুরাবে না। সুবহানাল্লাহ!

ফন্ট সাইজ
15px
17px