📄 মানুষ কেন তার ব্রেন দিয়ে আল্লাহকে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম নয়?
আউযুবিল্লাহ পড়ার কারণে শয়তান ভেগে গেল। কিন্তু রয়ে গেল তার এজেন্ট নফস্। এবার নফস্ আর একটা প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে কিংবা কখনও সরাসরি শয়তানও মনের মধ্যে প্রশ্ন তুলতে পারে।
প্রশ্ন: মানুষ কেন তার ব্রেন দিয়ে আল্লাহকে বুঝতে পারবে না, মানুষের ব্রেন সসীম হতে যাবে কেন? এই মানুষ আজ কতকিছু বুঝে চলেছে! মহাজগতের কত রহস্য উদঘাটন করে চলেছে!! আজ মানুষ কতকিছু পারে!!!
খেয়াল করুন এবার নফস্ অন্য বিষয়ের দিকে মোড় নিল। এটাকেই বলে পয়েন্ট আউট করা। সব বাতেলেরই নিয়ম হল কোন বাহাছে হেরে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে উঠলে হেরে গেছে! হেরে গেছে!!— এমন আওয়াজ বুলন্দ হওয়ার ও করতালী বেজে ওঠার পূর্বেই সে চলমান প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বক্তব্য অন্য দিকে নিয়ে যায়। যাতে তার হেরে যাওয়ার শ্লোগান ও করতালী অন্তত তাকে শুনতে না হয় এবং তার হেরে যাওয়াটা অন্তত ভরা মজলিসে বাচনিক স্বীকৃতি পেতে না হয়। এমনতর অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারণেই নফস্ এখানে পয়েন্ট আউট করে অন্য দিকে সরে গেল। তবুও যে বিষয়টি সে উত্থাপন করেছে, সংক্ষেপে হলেও তার জবাব দিন।
জওয়াব: জবাব দিতে গিয়ে যা বলবেন তা উল্লেখ করার আগে মানুষের ব্রেনের দৌড় কতটুকু সে সম্বন্ধে একটু বলে নেয়া যাক। মনে করুন— যদি বলা হয় ১ কোটি নক্ষত্র, তাহলে এটা মানুষের মস্তিস্কের ধারণ ক্ষমতার মধ্যে আসবে এবং মানুষ তা বুঝবে। যদি বলা হয় ১ কোটি কোটি নক্ষত্র, তবুও তা মানুষের মস্তিস্কের ধারণ ক্ষমতার মধ্যে আসবে এবং মানুষ বুঝবে যে, ১ কোটি পরিমাণকে কোন এক স্থানে রাখলে এবং এভাবে ১ কোটি পরিমাণ করে ১ কোটি স্থানে রাখা হলে যে পরিমাণ হয় সেটাই হল ১ কোটি কোটি। অর্থাৎ, কোটি শব্দকে দু'বার উচ্চারণ করলে যে সংখ্যা হয় তা মানুষের মস্তিস্কের ধারণ ক্ষমতার মধ্যে আসবে এবং তা মানুষ বুঝতে সক্ষম হবে। যদি বলা হয় ১ কোটি কোটি কোটি নক্ষত্র, অর্থাৎ, “কোটি” শব্দকে তিনবার উচ্চারণ করা হয়, তাহলে মানুষের কাছে সংখ্যাটি অস্পষ্ট হয়ে উঠবে। যদিও বুঝবে যে, ১ কোটি কোটি সংখ্যক পরিমাণ নক্ষত্রকে এক কোটি স্থানে রাখলে যে পরিমাণ হয়, সেটাই হল ১ কোটি কোটি কোটি নক্ষত্র। তবে সংখ্যাটি কিন্তু পূর্বের ন্যায় অতটা স্পষ্ট হবে না বরং বেশ কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে আসবে। এরপর যদি কোটি শব্দটিকে চার বার উচ্চারণ করে বলা হয়, ১ কোটি কোটি কোটি কোটি নক্ষত্র, তাহলে কিন্তু কানে শুধু কয়েকটা "কোটি” শব্দই প্রবেশ করবে, সংখ্যার পরিধিটা ব্রেনে মোটেই ঢুকবে না। আর যদি ১০/১২ বার "কোটি” শব্দটি উচ্চারণ করা হয়, তাহলে তার পরিধি ব্রেনে আনতে হলে তো ব্রেনের দশ বারটা নয় তেরটা বাজবে! এ-ই হল মানুষের ব্রেন ও ব্রেনের চিন্তা শক্তির দৌড়।
ব্রেনের চিন্তা শক্তির দৌড় আরও একটু পরীক্ষা করে দেখুন। একটু চিন্তা করে দেখুন তো পৃথিবীর চতুর্পাশ্বে চাঁদ তার অক্ষ রেখায় নিজ স্থানে অনবরত ঘূর্ণন করে চলেছে, সাথে সাথে তার কক্ষপথে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ করছে। পৃথিবী তার অক্ষ রেখায় প্রতি ঘন্টায় ১০৩৭ মাইল বেগে আবর্তন করছে এবং তার উপগ্রহ চাঁদকেসহ নিজের ৫৮ কোটি মাইল দীর্ঘ কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রতি সেকেন্ডে ১৮২-১ মাইল গতি নিয়ে প্রচণ্ড বেগে পরিক্রমণ করছে। এভাবে বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো প্রভৃতি সূর্যের অন্যান্য গ্রহাদি নিজ নিজ উপগ্রহাদিসহ সূর্যকে কেন্দ্র করে তাদের মহাদীর্ঘ কক্ষপথে পরিক্রমণ করছে। সূর্য তার গ্রহ-উপগ্রহ (তথা গোটা এই সৌরজগত) নিয়ে তার ১ লক্ষ আলোকবর্ষ দীর্ঘ ছায়াপথের চতুর্দিকে পরিক্রমণ করছে— যে পরিক্রমণ ২০ কোটি বছরে একবার সম্পন্ন হয়— আবার এই মহা বিশাল ছায়াপথ সর্পিল ভংগিতে তার চেয়ে মহা বিশাল এরিয়া জুড়ে বেঁকে বেঁকে এন্ড্রোমিডা নামক আর একটি ছায়াপথের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এভাবে মহাজগতের সবকিছু আরও মহাকিছুকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ করছে। আপনি এই সবকিছুর গতি, ঘুর্ণন, আবর্তন ও পরিক্রমণকে এক সংগে আপনার চিন্তায় আনতে সক্ষম কি? নিশ্চয় না। একসাথে এতসব ঘুর্ণনের চিন্তা মস্তিষ্কে আনতে গেলে রীতিমত আপনার মস্তিষ্কেই ঘুর্ণন শুরু হবে। এ-ই হল মানুষের ব্রেন ও ব্রেনের চিন্তা শক্তির দৌড়। এতসব কিছু পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝা তো দূরের কথা, একটি লবণ কণায় যে পরিমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে তা সব ব্রেনে আনতে গেলে নাকি বড় মাথাওয়ালা বিজ্ঞানীদের মত হাজার হাজার মাথার প্রয়োজন। এ-ই হল মানুষের ব্রেনের অবস্থা।
তাই নফসের বক্তব্যের জওয়াবে যা বলবেন তাহল— এ-ই যেখানে ব্রেনের দৌড়, সেখানে যদি কেউ নিজেকে মহাজগতের সবকিছু তার ব্রেনের মধ্যে আনতে সক্ষম মনে করে, তাহলে নির্ঘাত এ বলা ছাড়া আর কোন কথা নেই যে, সে বোকার স্বর্গেই বাস করছে। আর মহাজগত তো সসীম, তা-ই যদি আয়ত্বে আনা ব্রেনের দৌড়ে না কুলোয়, তাহলে কেউ আল্লাহর অসীম সত্তার সবকিছু ব্রেনের মধ্যে পুরতে পারবে বলে মনে করলে তো সে মহা বোকার স্বর্গে বাস করছে। এমন মহা বোকা সাজার পথে যেন কেউ অগ্রসর হতে না যায়, এজন্যই বলা হয়েছে, আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে— এমন প্রশ্ন কারও মনে জাগ্রত হলে সে যেন এ সম্বন্ধে তার চিন্তাকে আর অগ্রসর করতে না যায়। সৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে স্রষ্টার সীমানায় প্রবেশের দুঃসাহস না করাই বুদ্ধিমত্তা। আদার ব্যাপারী জাহাজের খোঁজ নেয়ার দরকার নেই।
অতএব নফস্ ও শয়তানকে বলুন, মানুষ কি এই সসীম মহাজগতেরই সবকিছুর রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে? বৈজ্ঞানিক পরিচয়ের যে পণ্ডিত ব্যক্তিগণ মহাজগতের অনেক কিছুর রহস্য উদঘাটন করেছেন, তারাই তো বলছেন, "মহাসমুদ্রের বেলাভূমিতে যত বালুকণা রয়েছে, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক রয়েছে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র।” মানুষ এর কয়টির রহস্য আজ পর্যন্ত উদঘাটন করতে পেরেছে? যে কয়টির রহস্য উদঘাটিত হয়েছে, তাও কি পূর্ণাঙ্গ বা সবটুকু অকাট্য? তাহলে মানুষ মহাবিশ্বের কতটুকু বুঝতে সক্ষম হয়েছে? বৈজ্ঞানিকদেরই কথামতে মহাজগতের গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি দৃশ্যমান বস্তু হল মহাজগতের সবকিছুর ৫%, অবশিষ্ট সব হল অদৃশ্যমান, যা বৈজ্ঞানিকদের কাছে কৃষ্ণশক্তি (মহাজগতের ৭০%) বা কৃষ্ণবস্তু (মহাজগতের ২৫%) নামে অভিহিত। এই কৃষ্ণশক্তি ও কৃষ্ণবস্তু সম্বন্ধে তথা সৃষ্টির ৯৫% সম্বন্ধে কিছুই না জানার কথা তারা অকপটে স্বীকার করছেন। অতএব দেখা গেল বৈজ্ঞানিকদের জ্ঞান মহাজগতের ৫%-এর ছিটেফোটা অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তাহলে বৈজ্ঞানিকগণ মহাবিশ্বের কতটুকু বুঝতে সক্ষম হয়েছেন? সুতরাং মানুষ অনেক কিছু বোঝে— একথা বলাটা কি আদৌ বাস্তব সম্মত? যারা মহাজগত সম্বন্ধে ধারণা রাখে না, তারা বৈজ্ঞানিকদের বাচনিক মহাজগতের দু' চারটে ছিটে-ফোটা তথ্য শুনেই মনে করে বৈজ্ঞানিকগণ অনেক কিছু জানেন, অনেক কিছু পারেন। অথচ সেই বৈজ্ঞানিকগণ কিন্তু এরকম মনে করেন না বা তার দাবিও করেন না।
বহু মানুষ আছে যারা দু'চারটে কথা শিখতে পারাকেই মনে করে অনেক কিছু শেখা। তারা "অনেক”-এর পরিমাণকে খুব ছোট্ট করে ফেলেছে। এক বুড়ির ঘটনা শুনুন। বুড়িটির ধারণায় দারোগাই ছিল সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ মানুষ। বুড়িটি একদিন শুনল, পদ্মা নদী অনেক গভীর। কথাটি শুনে বুড়ি বলল, কত গভীর! দারোগাও কি তাতে ঠাই পাবে না? ভেবে দেখুন তো এই বুড়িটির কাছে "অনেক গভীর"-এর পরিধি কতটুকু! এই বুড়িকে পদ্মার প্রকৃত গভীরতা বোঝানোর কোনো উপায় আছে কি? তেমনি যারা একটু কিছু পারাকেই অনেক কিছু পারা বলে মনে করে, তাদের কাছেও "পারা”-এর পরিধি তেমনই ক্ষুদ্র। এ ব্যাপারে আর একটি ছোট্ট গল্প শোনাই। গল্পটি বলেছিলেন আমাদের উস্তাদ গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার সবছাত্রের কাছে প্রিয় এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব (রহ.)। "কলাখালী হুজুর" নামে তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি ক্লাসে খুব গল্প বলতেন। খুব শিক্ষ্যণীয় সব গল্প। একবার আমাদের এক ক্লাসে এই "পারা” সম্পর্কে তিনি একটি গল্প বলেছিলেন। বরিশাল অঞ্চলের এক গ্রাম্য ব্যক্তি অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে চক্ষু বিস্ফারিত করে টেনে টেনে বলছে, "মোগো বাড়ির বড় গ্যাদা কত কিছু পারে, গাল দিয়া বিড়ি খাইয়া। নাক দিয়া ধুমা ছাড়ে!"
প্রশ্ন: একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন— এর বিপরীত বক্তব্য যখন শয়তান গেলাতে না পারবে তখন মনের মধ্যে এই ওয়াছওয়াছাও এনে দিতে পারে যে, আসলে সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন বটে তবে সৃষ্টিকর্তা স্বতন্ত্র কোন সত্তা নয় বরং এই প্রকৃতিই হচ্ছে স্রষ্টা। প্রকৃতির দ্বারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
জওয়াব: প্রকৃতি বলতে বোঝায় এই মাটি, পানি, আলো বাতাস ইত্যাদিকে। এগুলোর তো কোন বোধশক্তি বা জ্ঞান নেই। এগুলো কীকরে স্রষ্টা হতে পারে? এই মহাবিশ্ব ও তার সবকিছুকে সৃষ্টি করতে এবং এ সবকিছু পরিচালনা করতে কোন বোধশক্তি বা জ্ঞানের প্রয়োজন নেই তা একমাত্র কোন বদ্ধ পাগলই বলতে পারে। নফস্ শয়তানকে বলে দিন, "আমি প্রকৃতিকে খোদা মেনে বদ্ধ পাগল প্রতিপন্ন হতে রাজি নই।"
নফস্ ও শয়তানকে এত কথা শোনানোর পর আপনি হয়তো মনে মনে ভাববেন আল্লাহ আছেন তার প্রমাণ প্রসঙ্গে যথেষ্ট বক্তব্য রাখতে পেরেছি। এরপর বোধ হয় নফস্ ও শয়তান এ ব্যাপারে অন্তত আর সামনে অগ্রসর হবে না। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্বন্ধে বোধ হয় সে আর আমাকে প্রতারিত করার চেষ্টা করবে না। কিন্তু শয়তান আপনার ভাবনার কথাটি বুঝে ফেলবে। শয়তান মানুষের মনের কথা ও মনের চিন্তা-চেতনা টের পায়। সেমতে আপনি যে-ই মনে মনে ভাববেন নফস্ ও শয়তানের সামনে আল্লাহ আছেন তার প্রমাণ প্রসঙ্গে যথেষ্ট বক্তব্য রাখতে পেরেছি, শয়তান আপনার এ ভাবনার কথাটিও বুঝে ফেলবে। তাই আবার শয়তান মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। প্রশ্ন তুলবে—
প্রশ্ন: আল্লাহ আছেন তা কী করে বিশ্বাস করা যায়? কেউ কি আল্লাহকে দেখেছেন? না দেখে বিশ্বাস করা কি অন্ধ বিশ্বাস নয়?
জওয়াব: হাঁ দেখেছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখেছেন। মেরাজের রাতে তিনি স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছেন। শুধু আল্লাহকে নয়, জান্নাত জাহান্নাম ইত্যাদি যা কিছু আমরা না দেখে বিশ্বাস করি সেসব কিছু তিনি স্বচোখে দেখে এসেছেন। এই সবকিছু তাঁকে দেখানো হয়েছিল, যাতে কেউ বলতে না পারে এবং সন্দেহ করতে না পারে যে, ঈমানের কথা যা কিছু আমরা শুনি যেমন: আল্লাহ্ আছেন, জান্নাত আছে, জাহান্নাম আছে ইত্যাদি, এসব কিছু প্রকৃতপক্ষে আছে কি না? কেউ তো কোন দিন দেখেনি! এখন আর এরকম সন্দেহ করার অবকাশ নেই। কারণ, এগুলো আছে তা এমন একজন দেখে এসে বলেছেন, যাকে দুনিয়ার কেউ মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি। ঘোর শত্রু পর্যন্ত যাকে মিথ্যুক বলতে পারেনি। আমাদের মত লক্ষ মানুষকে যদি দেখানো হত, আর আমরা দেখে এসে বলতাম, তবুও মানুষ অস্বীকার করতে পারত যে, হয়তো পরিকল্পিতভাবে আমরা মিথ্যা বলছি। কিন্তু এমন একজনকে দেখানো হয়েছে, যাকে কেউ মিথ্যুক বলতে পারেনি এবং পারবেও না। আমাদের মত লক্ষ কোটি মানুষের দেখার চেয়ে তাঁর একার দেখার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি। তিনি দেখে এসে বলেছেন, অতএব এটাতে বিশ্বাস স্থাপন করা অন্ধ বিশ্বাস হতে পারে না। আমাদেরই মধ্যকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু দেখার পর সেটাতে বিশ্বাস করাকে আদৌ অন্ধ বিশ্বাস বলা যেতে পারে না।
এ বক্তব্য পেশ করার পর এ প্রসঙ্গে আর কোন ওয়াছওয়াছা না আসারই কথা। কিন্তু তবুও আসতে পারে। যেমন, আপনার মনের মধ্যে এল—
প্রশ্ন: সরাসরি নিজে না দেখলে তো মনের মধ্যে কিছু খটকা বা খুঁতখুঁতানি থেকেই যায়, অন্য যে কেউ যতই দেখুক না কেন।
জওয়াব: এরূপ প্রশ্ন বা ওয়াছওয়াছা আসলে বলুন, এটা ভুল কথা। নিজে না দেখলেই খটকা থাকবে— এমন না-ও হতে পারে। আমরা পৃথিবীর অনেক দেশ, অনেক কিছু নিজেরা দেখিনি, কিন্তু নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের থেকে শুনে বিশ্বাস করি, তাতে তো কোন খটকা বোধ করি না। আমাদের মধ্যে বহু মানুষ রয়েছে যারা জীবনে কোন দিন মক্কা, মদীনা, লন্ডন, আমেরিকা, চীন, জাপান, ইরান, তুরান— কতসব দেশ বা শহর দেখেনি। মানুষে দেখে বলে তারা তাই শুনে বিশ্বাস করে। এতে তো কোন খটকা বোধ করে না? অতএব নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত সর্বজন স্বীকৃত বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্বের ঈমান সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি স্বচক্ষে দেখে এসে বলার পরও যদি কারও মনে সেসব সম্বন্ধে কোন খুঁতখুঁতানি থাকে, তাহলে সেটা তার চিন্তার অপক্কতা বলেই বিবেচিত হবে। সে লোক বিষয়টাকে এভাবে চিন্তা করে দেখেনি বলেই তার মধ্যে খুঁতখুঁতানি থেকে যাচ্ছে। সে এটাও ভেবে দেখেনি যে, ঈমান সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে খুঁতখুঁতানি বোধ করা তার স্ববিরোধিতাও। কারণ, একদিকে সে নিজে না দেখা স্বত্ত্বেও অন্যের দেখার ভিত্তিতে হাজার লক্ষ বিষয়ে স্বাচ্ছন্দে বিশ্বাস পোষণ করে চলছে, অপর দিকে ঈমান-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে শুধু নিজে দেখেনি এর ভিত্তিতে সন্দেহ পোষণ করে যাচ্ছে। অতএব এরূপ স্ববিরোধপূর্ণ ও অপক্ক চিন্তা থেকে সৃষ্ট খুঁতখুঁতানি ধর্তব্যের পর্যায়ে আসতে পারে না।
বস্তুত বিশ্বাস করার জন্য নিজের দেখা বা অন্যের দেখা কোনটারই দরকার হয় না। নিজের মধ্যে "মন" আছে, এটা কে না বিশ্বাস করে? প্রত্যেকেই বিশ্বাস করে। কিন্তু মন কেমন তা কি সে নিজে দেখেছে না অন্য কেউই দেখেছে? মনের আকার- আকৃতি কেমন, মনের রং কেমন, সাইজ কি, কোন্ ধাতু দিয়ে গঠিত— এর কোনটা কি কেউ জানে বা দেখেছে? তবুও মানুষ তা বিশ্বাস করে শুধু এর ভিত্তিতে যে, মন আছে তা টের পাওয়া যায়। তদ্রূপ পৃথিবীর প্রত্যেকটা বস্তু, প্রত্যেকটা ছন্দ-পতন থেকে টের পাওয়া যায় যে, এর একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। এভাবে টের পাওয়ার পরও বিশ্বাসে কোন খুঁতখুঁতানি থাকলে তাতে কিছু আসে যায় না। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَفِي الْأَرْضِ ايَاتٌ لِلْمُوْقِنِينَ، وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ .
অর্থাৎ, যারা বিশ্বাস করতে চায় তাদের জন্য পৃথিবীতে বহু নিদর্শন রয়েছে। আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা দেখবে না? (সূরা যারিয়াত: ২০-২১)
এতকিছুর পর আল্লাহকে না দেখার কারণে কোনই খুঁতখুঁতানি থাকার কথা নয়। তবুও কারও মধ্যে যদি কিছু খুঁতখুঁতানি অনুভূত হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেটা শয়তানেরই প্রক্ষেপন। শয়তানই তাকে বলছে, তোর ভিতর তো খুঁতখুঁতানি রয়ে গেল, আর তাই সে মনে করছে আমার মধ্যে খুঁতখুঁতানি রয়েছে, যদিও বাস্তবে তার মধ্যে কোনই খুঁতখুঁতানি নেই। শয়তানের বলার কারণেই এমনটি মনে হচ্ছে। অন্যের বলার কারণেও যে নিজের মধ্যে সমস্যা আছে বলে বোধ হয়— এমন একটা গল্প মনে পড়ল। সরল গোছের একজন শিক্ষক ক্লাসে পড়াতে গিয়েছেন। দুষ্ট প্রকৃতির ছাত্ররা পূর্বেই পরিকল্পনা করে রেখেছে আজ তারা পড়বে না। পরিকল্পনা মোতাবেক উস্তাদজী ক্লাসে যেতেই একজন ছাত্র বলে উঠল, উস্তাদজী আপনি কি অসুস্থ? উস্তাদজী বললেন, না তো। আর একজন ছাত্র বলে উঠল, জি উস্তাদজী আপনার চেহারায় কেমন অসুস্থতার ভাব দেখা যাচ্ছে। আর একজন বলে উঠল, চোখটাও কেমন লালচে মনে হচ্ছে। এভাবে কয়েকজন একের পর এক উস্তাদজীর চেহারায় অসুস্থতার বিভিন্ন লক্ষণের কথা উল্লেখ করল। অবশেষে উস্তাদজী বললেন, হাঁ কয়েকদিন যাবতই শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।
অহেতুক তাড়াহুড়োর মনোভাব দূর করার উপায়— আপনি নামাযে দাঁড়িয়েছেন। মনের মধ্যে অহেতুক তাড়াহুড়োর মনোভাব জাগবে। মনে হবে কত কাজ রয়ে গেছে! নামায পড়ে এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে, এক কাপ চা না খেলে তো আর চলছেই না, দোকান, অফিস, জরুরী মুতালাআ, লেখার মত কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মাথার মধ্যে রয়েছে, এখনই লিখে নেয়া চাই, একটু হিসেব বাকি রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে এগুলো প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যস্ততাই নয়। এ বিষয়গুলো এমন যা পাঁচ দশ মিনিট পরে করলেও তেমন কোন অসুবিধে হয় না। মনকে বলুন, আচ্ছা! ধীরে সুস্থে নামাযটা আদায় করতে না হয় পাঁচ মিনিট বিলম্ব হবে, তাতে এমন কোনই ক্ষতি হবে না। এগুলো পাঁচ মিনিট পরে করলেও চলবে। মনকে আরও বলুন, প্রকৃতপক্ষে আমার কোনই ব্যস্ততা নেই, অহেতুকই আমি ব্যস্ততা অনুভব করছি। এরূপ চিন্তা করলে দেখবেন সত্যিই আপনার মন থেকে ব্যস্ততার অনুভূতি বিলীন হয়ে গেছে।
📄 তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ব প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা
আল্লাহ আছেন তার প্রমাণ প্রসঙ্গে এতকিছু বলার পরও যদি নফস্ ও শয়তানের পক্ষ থেকে আপনার মনে এরূপ প্রক্ষেপন হয় যে, তবুও আল্লাহকে যদি সকলেই স্বচক্ষে দেখতে পেত, এমনিভাবে ঈমান-সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ই যদি সকলেই স্বচক্ষে দেখতে পেত, তাহলে তো কারও মধ্যেই অস্পষ্টতা থাকত না। মু'মান বিহী (ঈমান-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, যেমন আল্লাহর সত্তা, জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব, পুলসিরাত, মীযান, হাউযে কাউছার ইত্যাদি।) গায়েব বা অদৃশ্য থাকার কারণেই তো মনের মধ্যে এতসব অস্পষ্টতা বিরাজ করে। যদি এসব গায়েব না হয়ে দৃশ্যমান হত, তাহলে তো কোনোই অস্পষ্টতা থাকত না। যদি আল্লাহর সত্তা গায়েব না হত, সকলেই তাঁকে এই চোখে দেখতে পেত, তাহলে একদিকে অস্পষ্টতা কেটে যেত, অপরদিকে দেখে ইবাদত করতে মনোনিবেশও ভাল হত। এখন না দেখে ইবাদত করা হয় বলে মনোযোগ অন্য দিকে চলে যায়। দেখলে দৃষ্টি তাঁর প্রতিই নিবদ্ধ থাকত, মনোযোগ অন্যত্র যেত না।
মনের মধ্যে এরূপ প্রক্ষেপন হলে প্রথমত বলুন, দেখলেই মনোযোগ অন্যদিকে যেত না— একথা বাস্তব নয়। এই কুরআন কিতাব কতকিছু দেখে দেখে পাঠ করতে থাকার সময়ও তো মনোযোগ অন্যত্র চলে যায়। ড্রাইভার খোলা চেখে সবকিছু দেখে দেখে গাড়ি চালানোর সময়ও তো মনোযোগ অন্যত্র যাওয়ায় এক্সিডেন্ট করে। বহু সময়ই তো এমন হয় যে, একজনের দিকে তাকিয়ে তার সাথে কথা বলছি, কিন্তু মন চলে গেছে অন্যত্র। অতএব আল্লাহকে দেখা গেলে মনোযোগ তাঁর প্রতিই নিবদ্ধ থাকত, অন্যত্র যেত না— একথাটা বাস্তব নয়। দ্বিতীয়ত বলুন, আল্লাহর সত্তা হল অসীম এবং আমাদের দৃষ্টিশক্তি হল সসীম। আর সসীম শক্তি দিয়ে অসীমকে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। অতএব দুনিয়ার এই চোখে আল্লাহ তাআলার সত্তাকে দেখা সম্ভব নয়। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে,
لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ .
অর্থাৎ, দৃষ্টি তাকে দেখতে সক্ষম নয়, তিনি সব দৃষ্টিকে দেখেন। তিনি তো সুক্ষ্ম, সর্বজান্তা। (সূরা আনআম: ১০৩)
যদি নফস্ ও শয়তান বলে, আল্লাহ্ তাআলা ইচ্ছে করলে তো তাঁকে দেখার মত ক্ষমতা মানুষের চোখে দিতেও পারতেন। তিনি তো সবকিছু করতে সক্ষম, তিনি পারেন না— এমন কোন বিষয় আছে কি?
তাহলে আপনি বলুন, আল্লাহ্ তাআলা সবকিছু পারেন, তবে পারেন বলেই সবকিছু করেন না। অযৌক্তিক কোন কিছু তিনি করেন না। আল্লাহর সত্তাসহ ঈমান-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি মানুষকে দেখানো হলে তো ঈমান বিল গায়েব তথা না দেখে বিশ্বাস করা থাকত না, তখন তো সেটা দেখা বিষয়ে ঈমান হত। তাতে তো বিশ্বাসের পরীক্ষা হত না। না দেখে বিশ্বাসের মধ্যেই বিশ্বাসের পরীক্ষা হয়। তিনি তো দুনিয়াতে মানুষকে পরীক্ষার জন্যই পাঠিয়েছেন। অতএব তাঁকে দেখার ক্ষমতা না দেয়ার মধ্যেই যৌক্তিকতা বিদ্যমান।
যদি নফস্ ও শয়তান বলে, তাহলে অন্তত আল্লাহর একটা প্রতিকৃতি বানিয়ে তাঁকে সামনে রেখে ইবাদত করার অনুমতি থাকলে কেমন হত? তাতে অন্তত ইবাদতে মনোযোগ নিবদ্ধ থাকার ফায়দাটা পাওয়া যেত। না-দেখা সত্তার ইবাদত করা হয় বলেই মনোযোগ বিচ্যুত হয়ে থাকে, দৃশ্যমান হলে মনোযোগ তার প্রতিই নিবদ্ধ থাকত।
তাহলে আপনি বলুন, একথার জবাব তো পূর্বেই দেয়া হল। তারপরও প্রতিকৃতি বানানোর কথা বলে কি তুমি আমাদেরকে মূর্তিপূজারীদের মত হতে বলছ। নাউযু বিল্লাহি মিন্ যালিক! মূর্তিপূজারীদেরও তো এই যুক্তি যে, আসল খোদা নিরাকার, তাকে দেখা যায় না, অতএব তার মূর্তি বা প্রতিমা বানিয়ে তাকে দেখে ইবাদত কর। কিন্তু তারা এটা বোঝে না যে, এতে তো মনোনিবেশ হয় মূর্তির প্রতি, আসলের প্রতি নয়। সামনে সাকার বা দৃশ্যমান কিছু না থাকলেই যেখানে অদৃশ্য সত্তার প্রতি মনোযোগ দেয়া কঠিন হয়, সেখানে সামনে সাকার কিছু থাকলে তো অদৃশ্য সত্তার প্রতি মনোযোগ যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, তখন তো সর্বতোভাবেই শুধু দৃশ্যমান সত্তার প্রতিই মনোযোগ নিবদ্ধ থাকবে। তাহলে দেখা যাবে আসলের উদ্দেশ্যে বানানো হল প্রতিকৃতি কিন্তু প্রতিকৃতিই শেষতক আসলের স্থান দখল করে নিল। সেই প্রতিকৃতি বা মূর্তিকে নিয়েই এমন ব্যস্ত থাকা হল যে, আসল খোদা মন থেকে হারিয়ে গেলেন লক্ষ যোজন দূরে।
এমন একটা উপলদ্ধি থেকেই হয়তো কবিগুরু রবি ঠাকুর বলেছিলেন,
মুগ্ধ ওহে স্বপ্নঘুরে, যদি প্রাণের আসন কোণে
ধুলায় গড়া দেবতারে, লুকিয়ে রাখিস সংগোপনে
চিরদিনের প্রভু তবে, তোদের মনে বিফল হবে
বাহিরে সে দাঁড়িয়ে রবে, কতনা যুগ যুগান্তরে
অতএব শত শত কোটি, হাজার হাজার কোটি ইবাদতকারী কোটি কোটি প্রতিকৃতি বানিয়ে নিলে তাওহীদ বা একত্বের দশা কি হবে তা তো বিবেচনার বিষয়! তদুপরি তাতে একমাত্র আসলকে নিয়ে চলার মত মজা থাকবে কোথায়? জনৈক উর্দু কবি সুন্দরই বলেছেন,
ایک سے جب دو ہوئی تو فرد یکتائی نہیں + اس لئے تصویر جاناں ہم نے کینچوائی نہیں
অর্থাৎ, এক থেকে যদি দুই হয়ে যায়, তাহলো তো এক-এর এক থাকার মজাই শেষ হয়ে যায়। তাই তো আমি প্রেমাষ্পদের ছবি বানাতে যাইনি।
আল্লাহ্ পাক এমনই প্রেমাষ্পদ যে, তাঁর স্থানে অন্য কেউ কোনোভাবে এসে যাক তা তিনি মোটেই বরদাশত করেন না। আল্লাহর প্রতিকৃতি বানানো হলে সেই প্রতিকৃতির প্রতি যতটুকু মনোনিবেশ নিবদ্ধ হবে, ততটুকু থেকেও আল্লাহ্ পাক বঞ্চিত হতে চান না। তিনি চান তাঁর প্রেমিকদের সব রকম নিবেদন সর্বতোভাবে শুধু তাঁরই জন্য হোক একান্ত। তিনি হতে চান তাঁর প্রেমিকদের একমাত্র ও একান্ত প্রেমাষ্পদ, যাতে কেউ কোনোভাবে থাকবে না শরীক। একেই তো বলে প্রেমাষ্পদ, একেই তো বলে প্রেমিক। প্রেমের স্বভাবই এ-ই। প্রেম কোনোভাবে কোনো শরীকানা সহ্য করে না। প্রেম চায় প্রেমিক একাত্ম হয়েই প্রেমাষ্পদের ধ্যান করুক, শুধু তাঁরই জন্য হোক তার সব কিছু নিবেদিত। এই একাত্মতাই হল তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ব। তাওহীদ বা একাত্মতা না হলে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা যায় না। যেমন প্রেমাষ্পদকে খুশি করা যায় না তার প্রতি একাত্ম হওয়া ব্যতীত। নানান ঘাটে গমনকারী প্রেমিককে কোন প্রেমাষ্পদ পছন্দ করে না। এভাবে প্রেমাষ্পদের মন পাওয়া যায় না। এ জন্যই কবি খুব সুন্দর করে বলেছেন,
دریں راہ حاصل جز یک دلے نیست + دو دل بودن بجز بے حاصلی نیست
অর্থাৎ, প্রেমের এ পথে এক মন হওয়া ব্যতীত কিছু অর্জন হয় না। দুই মন হলে বঞ্চনা বৈ কিছুই জোটে না।
📄 একাধিক খোদা থাকলে কী অসুবিধা?
এই তাওহীদের আলোচনা আসলেই নফস্ ও শয়তান বলতে পারে একাধিক খোদা থাকলে অসুবিধে কি? আপনি উল্টো জিজ্ঞেস করতে পারেন, সুবিধেটা কি? নিশ্চয় কোন সুবিধের দিক সে দেখাতে পারবে না। কারণ, দুনিয়াতে সকলেই স্বীকার করে যে, এক হাতে চললেই সবকিছু ভাল থাকে, ভাল চলে, ঠিকঠাক মত চলে। গাড়ি-ঘোড়া, মেশিনপত্র, যন্ত্রপাতি, বইপত্র, খাতা-কলম ইত্যাদি মালিকের এক হাতে চললেই ভাল থাকে, ভাল চলে। তাই একাধিক খোদা থাকলে সুবিধে কি হত তা শয়তান দেখাতে পারবে না। তারপরও শয়তান মনের মধ্যে প্রশ্ন তুলতেই থাকবে যে, একাধিক খোদা থাকলে অসুবিধে কি?
তাহলে তার জওয়াবে আপনি খুব সহজে বলতে পারেন, একাধিক খোদা থাকলে অসুবিধে কি হত তা বুঝতে খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার হয় না, এই আমাদের দেশের দুই নেত্রীর দিকে তাকালেই তা সহজে বুঝে আসে। উভয়জন ক্ষমতায় নেই, একজন ক্ষমতায় আর একজন ক্ষমতার বাইরে। একজন আরেকজন থেকে দূরে। এই দূরে থেকেই দু'জনের মধ্যে যে পরিমাণ ঢিলেঢিলি চলতে থাকে, তাতে দু'জনই যদি একসাথে ক্ষমতার মসনদে আসীন থাকত, তাহলে যে দস্তুরমত চুলোচুলি ও কিলাকিলি হত তা হলফ করেই বলা যায়। আর তেমন হলে দেশের বারটা কীভাবে বাজত তা বুঝতে কোন ব্যাখ্যার দরকার হয় না। একাধিক খোদা থাকলে দুনিয়ারও এরকম বারটা বাজত। এ বিষয়টাই কুরআনে কারীমে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে,
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا .
অর্থাৎ, যদি আসমান জমিনে এক আল্লাহ না হয়ে একাধিক ইলাহ হত, তাহলে আসমান জমিনের দশা খারাপ হয়ে যেত। (সূরা আম্বিয়া: ২২)
📄 ছবি, প্রতিকৃতি ও বিভিন্ন রকম স্মৃতিস্তম্ভ প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা
আমি একবার মনে মনে ভাবছিলাম— ছবি তোলা ও প্রতিকৃতি বানানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে যেসব কারণে, তার মধ্যে একটা বিশেষ কারণ কি এ-ও যে, ছবি তুললে বা প্রতিকৃতি বানালে সেই ছবি বা প্রতিকৃতির প্রতি কিছুটা হলেও মনোনিবেশ নিবদ্ধ হবে। এভাবে যতটুকু মনোনিবেশ ছবি বা প্রতিকৃতির প্রতি নিবদ্ধ হবে আসল ব্যক্তি (যার ছবি/প্রতিকৃতি) ততটুকু মনোনিবেশ থেকে বঞ্চিত হবে। আল্লাহর ছবি বা প্রতিকৃতি হলে তার প্রতি মনোযোগ প্রদান তো আল্লাহর প্রতি মনোযোগের ক্ষেত্রে শরীকানার শামিল হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে তো ছবি বা প্রতিকৃতি হয়ে দাঁড়াল শিরক অনুপ্রবেশের এক সুক্ষ্ম চোরা গলি। বোধ হয় এ জন্যই যারা ছবি কিংবা মূর্তি/প্রতিকৃতি বানায় কেয়ামতের দিন তাদেরকে সেই ছবি বা মূর্তি/প্রতিকৃতিতে জীবন সঞ্চারের জন্য বলা হবে যে, আমার সাথে শরীকানার মত কাজ করেছিলে, আমার শরীক তৈরি করেছিলে তোমরা, শরীকরা আমার ইবাদতে শরীক হয়েছে আর সেই শরীকদেরকে তৈরি করেছিলে তোমরা, সেমতে তোমরা হলে বড় শরীক, যেন শরীকদের স্রষ্টা। তাহলে এখন ওগুলোর মধ্যে জীবন সঞ্চার করে দেখাও কতটুকু তোমাদের ক্ষমতা, কেমন স্রষ্টা তোমরা! যদি এর ক্ষমতা না-ই থাকবে, তাহলে এমন কাজ করেছিলে কেন? হাদীছে এসেছে— রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذِّبُونَ وَيُقَالُ لَهُمْ أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمُ .»
অর্থাৎ, এই ছবি/প্রতিকৃতি নির্মাতাদেরকে শাস্তি প্রদান করা হবে এবং তাদেরকে বলা হবে তোমরা এই যা তৈরি করেছিলে তাতে জীবন সঞ্চার কর। (মুসলিম: হাদীছ নং ২১০৭)
ছবি, মূর্তি/প্রতিকৃতিতে ভক্তি নিবেদন তো কিছু ধূলোবালি একত্র করে তার প্রতি ভক্তি নিবেদন বৈ কিছু নয়। একটা ঘটনা শুনুন। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ২১ তারিখ অন্যান্য ২১ ফেব্রুয়ারীর মতই ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হল। যারা ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনারে সরাসরি ফুল মাল্য যা কিছু নিবেদন করার তা করল। পরের দিন একটা বহুল প্রচলিত দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় শেরপুর থেকে তোলা একটা ছবি দেখলাম। ছবিতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন বালক বালিকা রাস্তার পাশে কয়েকটা ইটের টুকরো দাঁড় করিয়ে তাতে মনের আবেগ মিশ্রিত করে ফুল মাল্য প্রদান করছে। সাংবাদিক সাহেব এটাকে খুব প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে মূল্যায়ন করে রিপোর্ট করেছেন। আমার মনে হল জাহিলী যুগের মানুষদের সম্বন্ধে শুনেছি তারা পথে ঘাটে মনে চাইলে কিছু ধূলোবালি একত্র করে তাতেই পূজা নিবেদন আরম্ভ করে দিত। এমনসব কাণ্ডকারখানার কারণেই তাদেরকে অন্ধ যুগের মানুষ বলে গালি দেয়া হয়। কিন্তু শেরপুরের এই চিত্রে তার চেয়ে খুব একটা ব্যতিক্রম কী পাওয়া গেল?
যাহোক বলা হচ্ছিল, আল্লাহর ছবি বা প্রতিকৃতি বানালে আল্লাহর প্রতি মনোযোগিতায় আল্লাহর শরীকানা হয়ে যায়। এটা সূক্ষ্মভাবে শিরকের সূচনা করে। এভাবে আল্লাহকে তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিতও করা হয়। এমনিভাবে গুরুজনের ছবি বা প্রতিকৃতি হলে যতটুকু ভক্তি তাদের ছবি বা প্রতিকৃতির প্রতি নিবেদিত হয় গুরুজন ততটুকু ভক্তি থেকে বঞ্চিত হন, অথচ অনুসারী ও ভক্তবৃন্দের ভক্তির পূরোটা পাওয়াই ছিল তাদের প্রাপ্য অধিকার। স্নেহাস্পদের ছবি বা মূর্তি হলে যতটুকু স্নেহ তার ছবি/প্রতিকৃতির প্রতি নিবেদিত হয়, সেই স্নেহাস্পদ ততটুকু স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, অথচ মুরব্বী ও গুরুজনদের স্নেহের পূরোটা পাওয়াই ছিল তাদের প্রাপ্য অধিকার। প্রেমাষ্পদের ছবি বা প্রতিকৃতি হলে যতটুকু প্রেম সেই ছবি বা প্রতিকৃতির প্রতি নিবেদিত হয় প্রেমাষ্পদ ততটুকু প্রেম থেকে বঞ্চিত হয়, অথচ প্রেমিকদের অখণ্ড প্রেম পাওয়াই ছিল তাদের প্রাপ্য অধিকার। এভাবে ছবি বা প্রতিকৃতি গুরুজন, স্নেহাস্পদ ও প্রেমাষ্পদ সকলের অধিকার কিছুটা হলেও কেড়ে নেয়। ছবি বা প্রতিকৃতিই তখন গুরুজনের ভক্তিতে, স্নেহাস্পদের স্নেহে এবং প্রেমাষ্পদের প্রেমে শরীক হয়ে দাঁড়ায়। আর যদি ছবি/প্রতিকৃতিকে নিয়েই এমন ব্যস্ত থাকা হল যে, আসল ব্যক্তি মন থেকে সম্পূর্ণই হারিয়ে গেল, যেমনটা মূর্তিপূজারী অংশীবাদীদের বেলায় দেখা যায়, তাহলে তো ছবি/প্রতিকৃতিই হল তাদের সব বঞ্চনার উৎস। অতএব সারকথা বলা যায়— ছবি বা প্রতিকৃতি দ্বারা কোন কোন ক্ষেত্রে শিরকের সূচনা হয় আর কোন কোন ক্ষেত্রে তা দ্বারা অধিকার লংঘিত হয়। এ দৃষ্টিভংগীতে বিচার করলে ছবি বা প্রতিকৃতি একাধারে খোদার অধিকার ও মানুষের অধিকার উভয়টি লংঘিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিধায় নিষিদ্ধ হওয়াই যুক্তিসংগত।
যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে, ছবি বা প্রতিকৃতির মধ্যে ভাল দিকও তো রয়েছে। মৃত গুরুজন ও মৃত আপনজনদের ছবি বা প্রতিকৃতি দেখলে তো তাদের কথা স্মরণ হয়, তাদের জন্য কিছু করার চেতনা জাগ্রত হয়।
তাহলে আপনি বলতে পারেন, ছবি বা প্রতিকৃতির মধ্যে খারাবের যে দিকগুলো রয়েছে তার ভিত্তিতেই তা খারাপ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কোন জিনিসে ভাল ও মন্দ দুটো দিক থাকলে সেই খারাবের পরিমাণ যদি বেশি বা মারাত্মক হয়, তাহলে সেটা গর্হিত বিবেচিত হতে আর অন্য কিছু চিন্তায় আনার দরকার হয় না। তদুপরি কথিত ভাল দিকটার বাস্তবতা যদি প্রকৃতপক্ষেই শূন্যের কোটায় থাকে, তাহলে তো সেদিকটার ভিত্তিতে বিবেচনার প্রয়োজনই অবশিষ্ট থাকে না। ছবি বা প্রতিকৃতি দেখলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বেশি কিছু করা হয়— কথিত এ দিকটার কোন বাস্তবতা নেই, এটা বাস্তবতা-বিরোধী কথা। পূর্বসূরীরা মুরব্বীদের জন্য বেশি করত না কি ছবি/প্রতিকৃতি দেখে এই যুগের লোকেরা বেশি করে? এই যুগে যারা নিষ্ঠার সাথে ছবি/প্রতিকৃতি সংস্কৃতির চর্চা করে, তারা ছবি দেখে মৃত আপনজনদের স্মরণ করে সত্য, কিন্তু তাদের জন্য করার মত কিছুই করে না। যা-ও বা করে তা কোন কাজের কিছু নয়। কেউ তো ছবি/প্রতিকৃতির সামনে হাত জোড় করে মাথা নত করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে, যাতে মৃত ব্যক্তির তো কোন উপকার হয়ই না, উপরন্তু তা দ্বারা সে নিজে শিরকের পর্যায়ভুক্ত কর্মে লিপ্ত হয়। কেউ তো ছবি/প্রতিকৃতির গলায় ফুলের মালা দেয়, কিন্তু এতে কি মৃতের কোন উপকার হয়? আমাদের তো এমন কিছু করা উচিত, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আত্মার উপকার সাধিত হয়। কিন্তু ছবি/প্রতিকৃতির গলায় মালা ঝোলানো দ্বারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আত্মার কী উপকার সাধিত হয়ে থাকে? কিছুই না। যদি তা-ই হয়, এতে তাদের কোনো উপকার সাধিত না হয়, তাহলে তাদের উদ্দেশে কিছু করার নামে নিস্ফল ও অবান্তর কিছু করা দ্বারা কি তাদের মূল্যায়ন হল, না তাদের সাথে উপহাস হল? তাই বলছিলাম, যারা ছবি বা প্রতিকৃতি রাখে তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বেশি কিছু করে— এ কথা আদৌ বাস্তবসম্মত নয়। বরং যেসব দ্বীনদার ব্যক্তি ওসব ছবি বা প্রতিকৃতি না রাখে তারাই বেশি কিছু করে থাকে। তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর পিতা-মাতা ও গুরুজনদের জন্য দুআ করে থাকে, সবসময় তাদের জন্য দান-খয়রাত ও ঈসালে ছওয়াব করে থাকে। ছবি বা প্রতিকৃতি রাখে এ গোছের লোকেরা মৃত আপনজনদের জন্য খুব বেশি কিছু করলেও সেটা হল বৎসরান্তে একটা মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে ক্ষান্ত হওয়া। অথচ বিশুদ্ধ মতানুসারে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করলে ছওয়াব তো নয়ই বরং উল্টো গোনাহ হয়। যেহেতু মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা বেদআত, আর বেদআত হল গোমরাহী। অতএব বেদআত চর্চা করা গোনাহে কবীরা। একটা দীর্ঘ হাদীছের একাংশে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
«فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ».
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই প্রত্যেকটা নতুনসৃষ্ট বিষয় হল বিদ'আত। আর সব বিদ'আত হল গোমরাহী। (আবু দাউদ ও মুসলিম)
সুতারাং মৃত আপনজনের ছবি বা প্রতিকৃতি রাখলে তা দেখে তাদের কথা স্মরণ হবে, ফলে তাদের জন্য বেশি কিছু করা হবে— এ যুক্তি আদৌ বাস্তবসম্মত নয়।
যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে, যারা বিদেশ বিভুইয়ে বসবাস করে, তারা আপনজনের ছবি দেখে মনের তৃষ্ণা নিবারণ করে থাকে, ছবি তাদের আপনজনের সাক্ষাত বঞ্চিত অন্তরে শান্ত্বনার এক বিরাট উপকরণ। তাদের জন্য ছবি নিষিদ্ধ হওয়া তো তাদের আত্মাকে বঞ্চিত করার মত একটা পাষণ্ডতা!
তাহলে আপনি বলতে পারেন, ছবি দেখে মনের তৃষ্ণা নিবারণ না করলে তো যোগাযোগ করে সেই তৃষ্ণা নিবারণ করত। এখন ছবি দেখে তৃষ্ণা নিবারণ হওয়ায় যোগাযোগ রাখার স্পৃহায় কিছুটা হলেও ভাটা পড়ে, ফলে আপনজন সেই পরিমাণ যোগাযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। আর খোদা না করুক যদি সেই বিদেশ বিভুইয়ে বসে কোন গায়র মাহরাম নারীর ছবি দেখে আর সেই ছবি দেখার ফলে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে যায় (বিবির ছবি দেখলেও অনুরূপ হতে পারে) তাহলে তো সেই চাপ সরাতে অবৈধ পথে অগ্রসর হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। তাহলে তো বিবির আরও বঞ্চনা। তাইতো বলছিলাম, ছবি বা প্রতিকৃতি মানুষের অধিকার বঞ্চনার উৎস। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হবে।
আর ছবি দেখে অশান্ত মনে শান্ত্বনা লাভের প্রসঙ্গে কথা হল— বিদেশ বিভুইয়ে বসে আপনজনের ছবি দেখলে কি মনের শান্ত্বনা লাভ হয় না মনের অশান্তি আরও বেড়ে যায়? প্রথমত একটু শান্তনা লাভ হলেও পরে কিন্তু মনের অস্থিরতাই বৃদ্ধি পায়। ওরকম ছবি দেখতে দেখতে তো মন তাদের সান্নিধ্য লাভ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এরকম ব্যাকুল হওয়া অনেককে তখন ভিটে মাটি বিক্রি করে সংগ্রহ করা বিদেশে যাওয়ার অর্থটুকু উপার্জন হওয়ার পূর্বেই দেশে রিটার্ন ব্যাক করতে দেখা যায়। তাহলে ছবি দেখে লাভ হল না লোকসান হল? সামান্য ঐটুকু শান্ত্বনা কি তাদের বিরাট স্থায়ী অশান্ত্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াল না?
যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে যে, অনেক মানুষ বৈবাহিক জীবনের প্রথম পর্যায়ের অনেক স্মৃতি অডিও/ভিডিও-এর মাধ্যমে স্থির চিত্রে বা চলচ্চিত্রে ধারণ করে রাখে, পরবর্তী জীবনে সেগুলো দেখে মনে আনন্দ লাভ করে থাকে। তাদের জন্য তো ছবি হারানো জীবনের আনন্দ পুনরুদ্ধারের একটা উপায়। এজন্যই তো এখন প্রগতিশীল সমাজ অডিও ভিডিও সবকিছুর মাধ্যমে পুরাতন স্মৃতি ধরে রাখে।
তাহলে আপনি বলতে পারেন, পুরনো জীবনের চিত্র দেখার মধ্যে ক্ষতিও আছে। পুরণো চিত্রে বিবির টানাটানা চেহারা ও যৌবনকালের নিটোল নিডৌল দেহ-বল্লরী দেখার পর বর্তমান অবস্থার লোলচর্ম দেখলে হাল অবস্থার প্রতি অস্পৃহভাব জাগতে পারে। আর একবার যদি কোনভাবে স্ত্রীর হাল অবস্থার প্রতি অস্পৃহভাব মনে এসে যায়, তাহলে তো বিবি এই শেষ বয়সে ছিটেফোটা যতটুকু আদর-আহ্লাদ পাচ্ছিল তা থেকেও বঞ্চিত হয়ে যাবে। তাই আবার পূর্বের কথার পুনরাবৃত্তি করতে হয় যে, ছবি বা প্রতিকৃতি হল মানুষের অধিকার বঞ্চনার উৎস। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হবে। এভাবে হারানো জীবনের আনন্দ পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে এখনকার আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হওয়ার আশংকা রয়েছে। আর যদি আগের চিত্র দেখে ওরকম আর একটা নিটোল নিডৌল সংগিনী লাভের চিন্তা মনের মধ্যে ঘুরঘুর করতে আরম্ভ করে, আর সেই চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটেই যায়, তাহলে তো পুরণো বিবির আনন্দের সীমা থাকবে না, সতীনের সাথে মহানন্দে (?) যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে! রয়ে গেল প্রগতিশীলদের পুরাতন স্মৃতি ধরে রাখার কালচার প্রসঙ্গ। এ ব্যাপারে কথা হল— যারা নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবী করে, তাদের পক্ষে তো পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করাই অসংগতিপূর্ণ। তারা কি ভেবে দেখে না যে, পেছনের দিকে ফিরে তাকানো প্রগতিশীলতার পরিপন্থী! প্রগতিশীল হতে গেলে নাকি পেছনের সবকিছুকে গলা ছেড়ে গালি দিতে হয়, পুরণো সবকিছুকে জীবনের অঙ্গন থেকে ঝেড়ে মুছে ওয়াশিং পাউডার দিয়ে ক্লিন করে নিতে হয়? নইলে তো প্রগতিশীল হওয়া হল না, সেকেলেই থেকে যাওয়া হল! তাহলে প্রগতিশীলদের কাছে একটা প্রশ্ন রাখা কি অসংগত হবে যে, নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবী করার পর পুরণো স্মৃতি ধরে রাখার এই স্ববিরোধিতা কেন?
যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে যে, ছবি বা প্রতিকৃতির মধ্যে কি কোনোই ইতিবাচক দিক নেই? আজকাল জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্মরণে অনেক রকম প্রতিকৃতি বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে রাখা হয়, সেসব প্রতিকৃতি বা স্মৃতিস্তম্ভ দেখে সকলের মধ্যে ওরকম জাতীয় পর্যায়ের অবদান রাখার চেতনা উজ্জীবিত হয়। জাতি সেসব প্রতিকৃতি বা স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পন করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে। ঐসব ঐতিহাসিক দিবস আসলে জাতির মধ্যে জাগরণের সাড়া পড়ে যায়। এগুলো কি কোনোই ফায়দা নয়?
তাহলে আপনি বলতে পারেন, হে শয়তান! তুমি কিছু লোককে এরকম বুঝাতে পেরেছ বলেই তো আজ এমনটা হচ্ছে। তাদেরকে তো এভাবে ভেবে দেখারই সুযোগ দিচ্ছ না যে, প্রতিকৃতি বা স্মৃতিস্তম্ভে ফুল অর্পন করা দ্বারা কি আসলেই ঘটনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন হয়ে থাকে। শ্রদ্ধা পাওয়ার ব্যক্তি রইল কোথায় আর ফুল দেয়া হল কোথায়? ব্যক্তি রইল একখানে, আর অন্যত্র ফুলের তোড়া অর্পন করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মহড়া দেয়া হল— এটা অসংগতিমূলক ও হাস্যকর হয়ে যায় কি না তা কি একবারও ভেবে দেখার সুযোগ তাদেরকে দিয়েছো? তাদের কবরের কাছে গিয়ে ফুল অর্পন করলেও অন্তত এই অসংগতির দায় কিছুটা হলেও হয়তো এড়ানো যেত। তবে পুরোপুরি এড়ানো যেত না এ কারণে যে, কবর একটা ভিন্ন জগত আর ফুল দেয়া হয় একটা ভিন্ন জগতে। কাজেই একান্তই যদি ফুল দিতেই হয়, তাহলে কবরের কাছে ফুল না দিয়ে এই জগতের অন্য যে কোন স্থানে ফুল দিলেও চলত এবং তা একই কথাই হত। তা যখন করা হয় না, তখন ফুল প্রদানের এই মহড়াই সমূলে বাদ দিলে হয়। যদি কেউ বলতে চান যে, যেখানে ফুল অর্পন করা হয় সেখানে তাদের আত্মার উপস্থিতি কল্পনা করে ফুল অর্পন করা হয়ে থাকে, তাহলে বলা যেতে পারে, প্রত্যেকে যার যার ঘরে তাদের আত্মার উপস্থিতি কল্পনা করে নিজ নিজ ঘরেই ফুলের মাল্য ঝুলিয়ে রাখতে পারেন, তাতে উদ্দেশ্যও সিদ্ধি হবে, নিজের ঘরের শোভা বর্দ্ধনও ঘটবে, আবার এত মূল্যবান ফুলের তোড়াগুলো অরণ্যে নিবেদন হওয়া থেকেও রক্ষা পাবে। আর রইল এসবের মাধ্যমে জাতির মধ্যে ওরকম অবদান রাখার চেতনা জাগ্রত করার দিক, সেটা অন্যভাবেও হতে পারে। তাদের সংশ্লিষ্ট ইতিহাস ব্যাপকভাবে আলোচনার দ্বারা সেটা হতে পারে, তাদের অধস্তনদের জাতীয়ভাবে মূল্যায়ন করা দ্বারাও সেটা হতে পারে। যুক্তিসংগত আরও কত পন্থায় তা হতে পারে। কিন্তু সে পন্থাগুলো কি আদৌ গ্রহণ করা হয়। এমনও দেখা যায় যারা জাতির জন্য অবদান রাখে, তাদের স্মৃতিস্তম্ভে দেয়া হয় ফুলের ডালি অথচ তাদের অধস্তনদের হাতে থাকে ভিক্ষার ঝুলি।
যদি নফস্ ও শয়তান আপনাকে বলে যে, তাহলে এসব স্মৃতিস্তম্ভের বিরুদ্ধে আপনাদের আলেম সমাজ সোচ্চার হন না কেন? যেমন ফটো ছবি ও মূর্তির বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার? এ অন্যায়ের ব্যাপারে তারা নীরব কেন? অন্যায়ের ব্যাপারে নীরব থাকাও তো পাপ। তারাই তো বলেন,
السَّاكِتُ عَنِ الْحَقِّ شَيْطَانٌ أَخْرَسُ
অর্থাৎ, ন্যায় কথা বলা থেকে যে নীরব থাকে, সে হল বোবা শয়তান।
তাহলে আপনি বলতে পারেন, এবার কি তাহলে আলেম সমাজকে পুলিশের ঠেঙ্গানী খাওয়ার দিকে ঠেলে দিতে চাচ্ছ? যেকোনোভাবে বনী আদমকে কষ্টের দিকে ঠেলে দিতে পারলেই তো তুমি আনন্দে বগল বাজাতে পার। মস্তান সন্ত্রাসীদেরকে উস্কানী দিয়ে অপরাধের দিকে অগ্রসর কর, তারপর যখন তারা পুলিশের গুতানী খায়, রিমান্ডের বর্বর নির্যাতনে ক্লিষ্ট হতে থাকে, তখন তোমার কোন পাত্তা থাকে না, তুমি তখন চুপিসারে কেটে পড়। তখন তো তুমি পুলিশের লোকজনকে নির্যাতন না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে আস না এই ভেবে যে, এ বেচারারা তো আমার কথািতে এ পথে এসেছিল। কাজেই তাদের উপর আপতিত এই বিপদ সাধ্যমত কিছুটা হলেও প্রতিহত করার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা যথার্থই বলেছেন,
كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنْسَانِ اكْفُرُ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِييٌ مِْنكَ.
অর্থাৎ, (মুনাফেকরা) শয়তানের মত। শয়তান বলে তোমরা কুফরী কর, তারপর যখন তারা কুফরী করে তখন এই বলে কেটে পড়ে যে, তোমার এ ব্যাপারে আমার কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। (সূরা হাশর: ১৬)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُبِينٌ . অর্থাৎ, অবশ্যই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা ইউসুফ: ৫) আর শত্রুর কাজ তো যেকোনো উপায়ে শত্রুতা চরিতার্থ করা। শত্রুর প্রতি কেউ দয়া করে না, শয়তানও তাই তার শত্রু বনী আদমের প্রতি কখনও দয়া করবে তা হতে পারে না।
আর শয়তান যে এখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও তাতে ফুলের ডালি দেয়ার অন্যায়ের প্রতিবাদে আলেমদের সোচ্চার না হওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছিল, সে ব্যাপারে বলতে পারেন, তাহলে কি তুমি বোঝাতে চাচ্ছ যেহেতু আলেম সমাজ এ ব্যাপারে সোচ্চার নন তাই এটা অন্যায় নয়? তা অন্যায়ের ব্যাপারে নীরব থাকা কখন পাপ কখন পাপ না, কোন্ পরিস্থিতিতে কতটুকু নীরব থাকার অবকাশ আছে, কোন্ পরিস্থিতিতে সোচ্চার হওয়া দরকার, কখন নীরব থাকতে হয়— এসবের নিয়ম-কানুন, মাসলা-মাসায়েল আলেম সমাজ ভাল করেই জানেন, তাদেরকে তা শেখানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। নিশ্চয়ই আলেম সমাজকে একটা উৎকট ঝামেলায় ফেলানোর মতলবে তুমি এ কথা বলছ। আলেম সমাজের সাথে তোমার শত্রুতার মাত্রা বেশি তা এ কথা থেকেও বুঝা যাচ্ছে।