📄 আল্লাহ আছেন তার প্রমাণ প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা
নফস্ ও শয়তানের পক্ষ থেকে বহু ব্যাপারেই বহু রকম ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে ওয়াছওয়াছা হয় তা হচ্ছে আল্লাহ আছেন কি— এই ওয়াছওয়াছা। আপনি নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, দান-সদকা, পরোপকার, দয়া-দাক্ষিণ্য ইত্যাদি যেকোনো ভাল কাজ করতে গেলে সেই ভাল কাজ সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট ওয়াছওয়াছা তো হবেই, এক ফাঁকে এই ওয়াছওয়াছাও হবে যে, যার আযাবের ভয়ে আমি এটা করতে যাচ্ছি কিংবা যার থেকে পুরস্কার পাওয়ার নিয়তে এটা করতে যাচ্ছি সেই আল্লাহ আদৌ আছেন কি? (নাউযু বিল্লাহ!) যেকোনো ভাল কাজের ইরাদা করলেই এক ফাঁকে এই ওয়াছওয়াছা হবে। মনে করুন "নফস্ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা” বিষয়ক এই বইটি পড়ার ইচ্ছা করেছেন, আপনার মনের মধ্যে প্রশ্ন উচ্চারিত হবে "নফস্ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা" নামের বইটি পড়ে তুমি নফস্ ও শয়তানের সাথে বাহাছে বিজয়ী হওয়ার মত যুক্তি-তর্ক ও কৌশলাদি শিখতে চাচ্ছ। শয়তানের সঙ্গে জিততে চাচ্ছ, কিন্তু তা কি তুমি পারবে? দ্বীন-ধর্মের সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হল আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর তাওহীদের বিষয়। এই আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাওহীদ প্রমাণ করার ব্যাপারেই কি যুক্তি-তর্কে তুমি শয়তানের সাথে জিততে পারবে?
এ প্রশ্নের জবাবে আপনি নফস্ ও শয়তানকে হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ ঘটনাটি শুনিয়ে দিন, হয়তো নফস্ ও শয়তান লা-জওয়াব হয়ে যাবে। হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ঘটনাটি প্রসিদ্ধ। একবার কতিপয় নাস্তিক গোছের লোক হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ.) কে আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তোমরা আমাকে একটা বিষয়ে একটু ভাবতে দাও। কতিপয় লোক আমাকে এই মর্মে একটা সংবাদ দিল যে, একটা সমুদ্রে ব্যবসার মালামাল বোঝাই একটা নৌকা কোন মাঝি ছাড়াই আপনা আপনি চলছে, সমুদ্রের ঢেউ চিরে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে। কারও কোনোরূপ পরিচালনা ছাড়াই ইচ্ছামত সেটি তার গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। একথা শুনে তারা ইমাম আবু হানীফা (রহ.) কে বলল, কোন বদ্ধ পাগল ছাড়া এমন কথা কেউ বলতে পারে না। তখন ইমামে আযম হযরত আবূ হানীফা (রহ.) বললেন, তাহলে এই মহা ঊর্ধ্বজগত ও অধঃজগত এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী এই বিশাল সৃষ্টিরাজির কোনো সৃষ্টিকর্তা থাকবে না তা কীকরে হয়? তখন লোকগুলো লা- জওয়াব হয়ে যায়। (ফাতহুল মুলহিম, ১ম খণ্ড)
এই ঘটনাটি শোনানোর পরও শয়তান লা-জওয়াব না-ও হতে পারে। এ ব্যাপারে আরও অনেক প্রশ্ন তুলতে পারে। সম্ভাব্য সেরকম কয়েকটা প্রশ্ন ও তার জওয়াব উল্লেখ করছি। শয়তান বা শয়তানের দোসরদের পক্ষ থেকে আপনার সামনে সেসব প্রশ্ন এলে আপনি সেভাবে জওয়াব দিতে পারেন।
প্রশ্ন: ইমাম আবূ হানীফার বক্তব্যেও বিষয়টির খোলাসা হবে না। কারণ, ইমাম আবু হানীফার বক্তব্যের সারকথা হল— কোনোকিছুই যখন নির্মাণকারী ব্যতীত হতে পারে না, সবকিছুর যখন নির্মাতা থাকে, তখন এই বিশাল সৃষ্টিজগতেরও একজন নির্মাতা তথা সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই থাকতে হবে। অতএব অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। কিন্তু এই বক্তব্যেও বিষয়টির খোলাসা হবে না এ কারণে যে, কোনোকিছুই যখন একজন সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত হতে পারে না তাহলে তো বলতে হবে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহও একজন সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত হতে পারেননি, তারও একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। তাহলে তো সৃষ্টিকর্তা একজন রইলেন না। এটাই তো যুক্তিতে বলে।
জওয়াব: এ বক্তব্য যুক্তিযুক্ত নয় বরং তা দু'ভাবে অযৌক্তিক।
এক. আল্লাহকে যখন সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা মানা হল, তখন তাঁর সৃষ্টিকর্তা খোঁজার কোন অবকাশ নেই। কারণ, তাঁর সৃষ্টিকর্তা থাকলে তো তিনি আর সৃষ্টিকর্তা থাকলেন না বরং তিনি তখন সাব্যস্ত হবেন সৃষ্ট। আর সৃষ্ট কখনও সৃষ্টিকর্তা হতে পারে না। অতএব তাঁকে যখন একবার সৃষ্টিকর্তাই মানা হল, তখন আর তাঁর সৃষ্টিকর্তা দেখার বা থাকার কোন অবকাশ নেই। তাঁকে সৃষ্টিকর্তা মানার অর্থই হল তাঁর আর কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। সৃষ্টের সৃষ্টিকর্তা থাকে, সৃষ্টিকর্তার কোন সৃষ্টিকর্তা থাকে না। এটাই যুক্তির কথা। অতএব সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা খোঁজা অযৌক্তিক। তোমার বক্তব্যে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা খোঁজা হচ্ছে, অতএব তোমার বক্তব্য অযৌক্তিক।
দুই. এ বক্তব্য অযৌক্তিক এ কারণেও যে, কাউকে এই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা মানলে সেই সৃষ্টিকর্তারও একজন সৃষ্টিকর্তা মানতে হবে। সেই সৃষ্টিকর্তারও একজন সৃষ্টিকর্তা মানতে হবে। সেই সৃষ্টিকর্তারও একজন সৃষ্টিকর্তা মানতে হবে। এভাবে অনন্তকাল পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা মানতে থাকার ধারা অব্যাহত থাকবে, কোনোদিন মূল সৃষ্টিকর্তায় উপনীত হওয়া সম্ভব হবে না। কোন বিষয়ে এরূপ অনন্ত ধারার পেছনে পড়া অযৌক্তিক। কেননা, যুক্তি হয়ে থাকে সমাধানে উপনীত হওয়ার জন্য, আর এরূপ অনন্ত ধারা কোন সমাধানে উপনীত করে না বরং অসমাধানের দিকেই নিয়ে যেতে থাকে। অতএব সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা খোঁজার মত অনন্ত ধারার পশ্চাতে পড়া যৌক্তিক নয় বরং অযৌক্তিক।
প্রশ্ন: এ বক্তব্যের পরও একটু খটকা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে যে, তাহল—আল্লাহ হলেন কী করে?
জওয়াব: প্রশ্নই শুদ্ধ নয়। "আল্লাহ হলেন কীকরে" কথাটিই ঠিক নয়। আল্লাহ হননি বরং আছেন, সদাসর্বদা আছেন এবং সদা সর্বদা থাকবেন। "হলেন” কথাটি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যিনি আগে ছিলেন না, পরে হয়েছেন। যিনি সদা সর্বদাই আছেন, যিনি কাদীম (নিত্য) সত্তা, তার ক্ষেত্রে "হলেন" কথাটা প্রযোজ্য নয়। অতএব আল্লাহ হলেন কী করে কথাটাই শুদ্ধ নয়। প্রশ্ন ভুল।
প্রশ্ন: এটা কথার মারপ্যাঁচ দিয়ে এক রকম জওয়াব হয় বটে, মনের খটকা কিন্তু তাতে দূর হয় না। খটকা তবুও থেকেই যায়।
জওয়াব: এ খটকা দূর করার মত ব্রেন কোন মাখলুক তথা সৃষ্টিকে দেয়া হয়নি, মানুষকেও দেয়া হয়নি। আর তা দেয়া সম্ভবও নয়। কারণ, কোন সসীমের মধ্যে কোন অসীমকে ঢোকানো যায় না। মাখলুকের ব্রেন সসীম, মানুষের ব্রেনও সসীম। আর আল্লাহর সত্তা অসীম। অতএব মানুষ বা অন্য কোন মাখলুকের সসীম ব্রেনের মধ্যে আল্লাহর অসীম সত্তার আদ্যোপান্ত সবকিছু ঢোকানো সম্ভব নয়। এই সসীম ব্রেন দিয়ে আল্লাহর অসীম সত্তার সবকিছু পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝা সম্ভব নয়। এটা এমনই একটা মোটা বিষয়, যেমন মোটা বিষয় হল হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ছোট্ট একটি শিশির মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের অথৈ পানিরাশি ঢোকানো সম্ভব নয়। আল্লাহর সত্তাকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝা সম্ভব নয় বলেই মানুষকে আল্লাহর সত্তা নিয়ে এমনভাবে চিন্তায় মগ্ন হতে নিষেধ করা হয়েছে। এক রেওয়ায়েতে এসেছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন,
تَفَكَّرُوا فِي كُلِّ شَيْءٍ وَلَا تَفَكَّرُوا فِي ذَاتِ اللهِ «.
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর সৃষ্টির সবকিছু নিয়ে চিন্তা- ভাবনা কর, আল্লাহর সত্তা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ চিন্তায় মগ্ন হয়ো না। কাজেই আল্লাহ কীভাবে হলেন— এর সমাধান বুঝার মত ক্ষমতাই মানুষের নেই, এ জন্যই সে চিন্তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আপনি আপনার মনকে বোঝান মানব মস্তিস্কের পক্ষে আল্লাহর সত্তাকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝা সম্ভব হবে না, অতএব এই খটকাও দূর হবে না এজন্যই আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন?— এ রকম ওয়াছওয়াছা মনে এলেই হাদীছে তিনটি আমল শিক্ষা দেয়া হয়েছে। মুসলিম শরীফের রেওয়ায়েতে এসেছে— হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) বয়ান করেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ مَنْ خَلَقَ كَذَا وَكَذَا حَتَّى يَقُولَ لَهُ مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ فَإِذَا بَلَغَ ذَلِكَ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ».
অর্থাৎ, শয়তান তোমাদের কারও কাছে এসে বলবে (অর্থাৎ, এ চেতনা উদ্রেক করবে) যে, অমুকটা কে সৃষ্টি করল, অমুকটা কে সৃষ্টি করল? (তুমি হয়তো তার জবাবে বলবে, আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। কারণ, একজন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কিছুই হতে পারে না।) অবশেষে এক পর্যায়ে সে বলবে (অর্থাৎ, চেতনা উদ্রেক করে দিবে), তাহলে তোমার প্রতিপালককে সৃষ্টি করল কে? এ পর্যায়ে উপনীত হলে "আউযু বিল্লাহ... পাঠ করবে (অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে পানাহ কামনা করবে।) এবং (ঐ চিন্তা থেকে) বিরত হবে। আর এক রেওয়ায়েতে এসেছে তখন "আমানতু বিল্লাহ” (আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনলাম) পাঠ করে নিবে। (অর্থাৎ, ঈমানকে নবায়ন করে নিবে।) [সহীহ মুসলিম]
এসব রেওয়ায়েতে এ ধরনের ওয়াছওয়াছার সময় সর্বমোট ৩টি আমলের শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
১. আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম পড়ে নেয়া।
২. আমানতু বিল্লাহ (অর্থাৎ, আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনলাম) পড়ে নেয়া।
৩. উক্ত চিন্তা থেকে বিরত হয়ে অন্য কোন চিন্তা বা কাজে লিপ্ত হওয়া।
সেমতে তিনটি আমলই আপনি সম্পন্ন করুন, শয়তান ভেগে যাবে।
📄 মানুষ কেন তার ব্রেন দিয়ে আল্লাহকে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম নয়?
আউযুবিল্লাহ পড়ার কারণে শয়তান ভেগে গেল। কিন্তু রয়ে গেল তার এজেন্ট নফস্। এবার নফস্ আর একটা প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে কিংবা কখনও সরাসরি শয়তানও মনের মধ্যে প্রশ্ন তুলতে পারে।
প্রশ্ন: মানুষ কেন তার ব্রেন দিয়ে আল্লাহকে বুঝতে পারবে না, মানুষের ব্রেন সসীম হতে যাবে কেন? এই মানুষ আজ কতকিছু বুঝে চলেছে! মহাজগতের কত রহস্য উদঘাটন করে চলেছে!! আজ মানুষ কতকিছু পারে!!!
খেয়াল করুন এবার নফস্ অন্য বিষয়ের দিকে মোড় নিল। এটাকেই বলে পয়েন্ট আউট করা। সব বাতেলেরই নিয়ম হল কোন বাহাছে হেরে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে উঠলে হেরে গেছে! হেরে গেছে!!— এমন আওয়াজ বুলন্দ হওয়ার ও করতালী বেজে ওঠার পূর্বেই সে চলমান প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বক্তব্য অন্য দিকে নিয়ে যায়। যাতে তার হেরে যাওয়ার শ্লোগান ও করতালী অন্তত তাকে শুনতে না হয় এবং তার হেরে যাওয়াটা অন্তত ভরা মজলিসে বাচনিক স্বীকৃতি পেতে না হয়। এমনতর অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারণেই নফস্ এখানে পয়েন্ট আউট করে অন্য দিকে সরে গেল। তবুও যে বিষয়টি সে উত্থাপন করেছে, সংক্ষেপে হলেও তার জবাব দিন।
জওয়াব: জবাব দিতে গিয়ে যা বলবেন তা উল্লেখ করার আগে মানুষের ব্রেনের দৌড় কতটুকু সে সম্বন্ধে একটু বলে নেয়া যাক। মনে করুন— যদি বলা হয় ১ কোটি নক্ষত্র, তাহলে এটা মানুষের মস্তিস্কের ধারণ ক্ষমতার মধ্যে আসবে এবং মানুষ তা বুঝবে। যদি বলা হয় ১ কোটি কোটি নক্ষত্র, তবুও তা মানুষের মস্তিস্কের ধারণ ক্ষমতার মধ্যে আসবে এবং মানুষ বুঝবে যে, ১ কোটি পরিমাণকে কোন এক স্থানে রাখলে এবং এভাবে ১ কোটি পরিমাণ করে ১ কোটি স্থানে রাখা হলে যে পরিমাণ হয় সেটাই হল ১ কোটি কোটি। অর্থাৎ, কোটি শব্দকে দু'বার উচ্চারণ করলে যে সংখ্যা হয় তা মানুষের মস্তিস্কের ধারণ ক্ষমতার মধ্যে আসবে এবং তা মানুষ বুঝতে সক্ষম হবে। যদি বলা হয় ১ কোটি কোটি কোটি নক্ষত্র, অর্থাৎ, “কোটি” শব্দকে তিনবার উচ্চারণ করা হয়, তাহলে মানুষের কাছে সংখ্যাটি অস্পষ্ট হয়ে উঠবে। যদিও বুঝবে যে, ১ কোটি কোটি সংখ্যক পরিমাণ নক্ষত্রকে এক কোটি স্থানে রাখলে যে পরিমাণ হয়, সেটাই হল ১ কোটি কোটি কোটি নক্ষত্র। তবে সংখ্যাটি কিন্তু পূর্বের ন্যায় অতটা স্পষ্ট হবে না বরং বেশ কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে আসবে। এরপর যদি কোটি শব্দটিকে চার বার উচ্চারণ করে বলা হয়, ১ কোটি কোটি কোটি কোটি নক্ষত্র, তাহলে কিন্তু কানে শুধু কয়েকটা "কোটি” শব্দই প্রবেশ করবে, সংখ্যার পরিধিটা ব্রেনে মোটেই ঢুকবে না। আর যদি ১০/১২ বার "কোটি” শব্দটি উচ্চারণ করা হয়, তাহলে তার পরিধি ব্রেনে আনতে হলে তো ব্রেনের দশ বারটা নয় তেরটা বাজবে! এ-ই হল মানুষের ব্রেন ও ব্রেনের চিন্তা শক্তির দৌড়।
ব্রেনের চিন্তা শক্তির দৌড় আরও একটু পরীক্ষা করে দেখুন। একটু চিন্তা করে দেখুন তো পৃথিবীর চতুর্পাশ্বে চাঁদ তার অক্ষ রেখায় নিজ স্থানে অনবরত ঘূর্ণন করে চলেছে, সাথে সাথে তার কক্ষপথে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ করছে। পৃথিবী তার অক্ষ রেখায় প্রতি ঘন্টায় ১০৩৭ মাইল বেগে আবর্তন করছে এবং তার উপগ্রহ চাঁদকেসহ নিজের ৫৮ কোটি মাইল দীর্ঘ কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রতি সেকেন্ডে ১৮২-১ মাইল গতি নিয়ে প্রচণ্ড বেগে পরিক্রমণ করছে। এভাবে বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো প্রভৃতি সূর্যের অন্যান্য গ্রহাদি নিজ নিজ উপগ্রহাদিসহ সূর্যকে কেন্দ্র করে তাদের মহাদীর্ঘ কক্ষপথে পরিক্রমণ করছে। সূর্য তার গ্রহ-উপগ্রহ (তথা গোটা এই সৌরজগত) নিয়ে তার ১ লক্ষ আলোকবর্ষ দীর্ঘ ছায়াপথের চতুর্দিকে পরিক্রমণ করছে— যে পরিক্রমণ ২০ কোটি বছরে একবার সম্পন্ন হয়— আবার এই মহা বিশাল ছায়াপথ সর্পিল ভংগিতে তার চেয়ে মহা বিশাল এরিয়া জুড়ে বেঁকে বেঁকে এন্ড্রোমিডা নামক আর একটি ছায়াপথের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এভাবে মহাজগতের সবকিছু আরও মহাকিছুকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ করছে। আপনি এই সবকিছুর গতি, ঘুর্ণন, আবর্তন ও পরিক্রমণকে এক সংগে আপনার চিন্তায় আনতে সক্ষম কি? নিশ্চয় না। একসাথে এতসব ঘুর্ণনের চিন্তা মস্তিষ্কে আনতে গেলে রীতিমত আপনার মস্তিষ্কেই ঘুর্ণন শুরু হবে। এ-ই হল মানুষের ব্রেন ও ব্রেনের চিন্তা শক্তির দৌড়। এতসব কিছু পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝা তো দূরের কথা, একটি লবণ কণায় যে পরিমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে তা সব ব্রেনে আনতে গেলে নাকি বড় মাথাওয়ালা বিজ্ঞানীদের মত হাজার হাজার মাথার প্রয়োজন। এ-ই হল মানুষের ব্রেনের অবস্থা।
তাই নফসের বক্তব্যের জওয়াবে যা বলবেন তাহল— এ-ই যেখানে ব্রেনের দৌড়, সেখানে যদি কেউ নিজেকে মহাজগতের সবকিছু তার ব্রেনের মধ্যে আনতে সক্ষম মনে করে, তাহলে নির্ঘাত এ বলা ছাড়া আর কোন কথা নেই যে, সে বোকার স্বর্গেই বাস করছে। আর মহাজগত তো সসীম, তা-ই যদি আয়ত্বে আনা ব্রেনের দৌড়ে না কুলোয়, তাহলে কেউ আল্লাহর অসীম সত্তার সবকিছু ব্রেনের মধ্যে পুরতে পারবে বলে মনে করলে তো সে মহা বোকার স্বর্গে বাস করছে। এমন মহা বোকা সাজার পথে যেন কেউ অগ্রসর হতে না যায়, এজন্যই বলা হয়েছে, আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে— এমন প্রশ্ন কারও মনে জাগ্রত হলে সে যেন এ সম্বন্ধে তার চিন্তাকে আর অগ্রসর করতে না যায়। সৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে স্রষ্টার সীমানায় প্রবেশের দুঃসাহস না করাই বুদ্ধিমত্তা। আদার ব্যাপারী জাহাজের খোঁজ নেয়ার দরকার নেই।
অতএব নফস্ ও শয়তানকে বলুন, মানুষ কি এই সসীম মহাজগতেরই সবকিছুর রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে? বৈজ্ঞানিক পরিচয়ের যে পণ্ডিত ব্যক্তিগণ মহাজগতের অনেক কিছুর রহস্য উদঘাটন করেছেন, তারাই তো বলছেন, "মহাসমুদ্রের বেলাভূমিতে যত বালুকণা রয়েছে, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক রয়েছে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র।” মানুষ এর কয়টির রহস্য আজ পর্যন্ত উদঘাটন করতে পেরেছে? যে কয়টির রহস্য উদঘাটিত হয়েছে, তাও কি পূর্ণাঙ্গ বা সবটুকু অকাট্য? তাহলে মানুষ মহাবিশ্বের কতটুকু বুঝতে সক্ষম হয়েছে? বৈজ্ঞানিকদেরই কথামতে মহাজগতের গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি দৃশ্যমান বস্তু হল মহাজগতের সবকিছুর ৫%, অবশিষ্ট সব হল অদৃশ্যমান, যা বৈজ্ঞানিকদের কাছে কৃষ্ণশক্তি (মহাজগতের ৭০%) বা কৃষ্ণবস্তু (মহাজগতের ২৫%) নামে অভিহিত। এই কৃষ্ণশক্তি ও কৃষ্ণবস্তু সম্বন্ধে তথা সৃষ্টির ৯৫% সম্বন্ধে কিছুই না জানার কথা তারা অকপটে স্বীকার করছেন। অতএব দেখা গেল বৈজ্ঞানিকদের জ্ঞান মহাজগতের ৫%-এর ছিটেফোটা অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তাহলে বৈজ্ঞানিকগণ মহাবিশ্বের কতটুকু বুঝতে সক্ষম হয়েছেন? সুতরাং মানুষ অনেক কিছু বোঝে— একথা বলাটা কি আদৌ বাস্তব সম্মত? যারা মহাজগত সম্বন্ধে ধারণা রাখে না, তারা বৈজ্ঞানিকদের বাচনিক মহাজগতের দু' চারটে ছিটে-ফোটা তথ্য শুনেই মনে করে বৈজ্ঞানিকগণ অনেক কিছু জানেন, অনেক কিছু পারেন। অথচ সেই বৈজ্ঞানিকগণ কিন্তু এরকম মনে করেন না বা তার দাবিও করেন না।
বহু মানুষ আছে যারা দু'চারটে কথা শিখতে পারাকেই মনে করে অনেক কিছু শেখা। তারা "অনেক”-এর পরিমাণকে খুব ছোট্ট করে ফেলেছে। এক বুড়ির ঘটনা শুনুন। বুড়িটির ধারণায় দারোগাই ছিল সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ মানুষ। বুড়িটি একদিন শুনল, পদ্মা নদী অনেক গভীর। কথাটি শুনে বুড়ি বলল, কত গভীর! দারোগাও কি তাতে ঠাই পাবে না? ভেবে দেখুন তো এই বুড়িটির কাছে "অনেক গভীর"-এর পরিধি কতটুকু! এই বুড়িকে পদ্মার প্রকৃত গভীরতা বোঝানোর কোনো উপায় আছে কি? তেমনি যারা একটু কিছু পারাকেই অনেক কিছু পারা বলে মনে করে, তাদের কাছেও "পারা”-এর পরিধি তেমনই ক্ষুদ্র। এ ব্যাপারে আর একটি ছোট্ট গল্প শোনাই। গল্পটি বলেছিলেন আমাদের উস্তাদ গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার সবছাত্রের কাছে প্রিয় এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব (রহ.)। "কলাখালী হুজুর" নামে তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি ক্লাসে খুব গল্প বলতেন। খুব শিক্ষ্যণীয় সব গল্প। একবার আমাদের এক ক্লাসে এই "পারা” সম্পর্কে তিনি একটি গল্প বলেছিলেন। বরিশাল অঞ্চলের এক গ্রাম্য ব্যক্তি অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে চক্ষু বিস্ফারিত করে টেনে টেনে বলছে, "মোগো বাড়ির বড় গ্যাদা কত কিছু পারে, গাল দিয়া বিড়ি খাইয়া। নাক দিয়া ধুমা ছাড়ে!"
প্রশ্ন: একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন— এর বিপরীত বক্তব্য যখন শয়তান গেলাতে না পারবে তখন মনের মধ্যে এই ওয়াছওয়াছাও এনে দিতে পারে যে, আসলে সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন বটে তবে সৃষ্টিকর্তা স্বতন্ত্র কোন সত্তা নয় বরং এই প্রকৃতিই হচ্ছে স্রষ্টা। প্রকৃতির দ্বারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
জওয়াব: প্রকৃতি বলতে বোঝায় এই মাটি, পানি, আলো বাতাস ইত্যাদিকে। এগুলোর তো কোন বোধশক্তি বা জ্ঞান নেই। এগুলো কীকরে স্রষ্টা হতে পারে? এই মহাবিশ্ব ও তার সবকিছুকে সৃষ্টি করতে এবং এ সবকিছু পরিচালনা করতে কোন বোধশক্তি বা জ্ঞানের প্রয়োজন নেই তা একমাত্র কোন বদ্ধ পাগলই বলতে পারে। নফস্ শয়তানকে বলে দিন, "আমি প্রকৃতিকে খোদা মেনে বদ্ধ পাগল প্রতিপন্ন হতে রাজি নই।"
নফস্ ও শয়তানকে এত কথা শোনানোর পর আপনি হয়তো মনে মনে ভাববেন আল্লাহ আছেন তার প্রমাণ প্রসঙ্গে যথেষ্ট বক্তব্য রাখতে পেরেছি। এরপর বোধ হয় নফস্ ও শয়তান এ ব্যাপারে অন্তত আর সামনে অগ্রসর হবে না। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্বন্ধে বোধ হয় সে আর আমাকে প্রতারিত করার চেষ্টা করবে না। কিন্তু শয়তান আপনার ভাবনার কথাটি বুঝে ফেলবে। শয়তান মানুষের মনের কথা ও মনের চিন্তা-চেতনা টের পায়। সেমতে আপনি যে-ই মনে মনে ভাববেন নফস্ ও শয়তানের সামনে আল্লাহ আছেন তার প্রমাণ প্রসঙ্গে যথেষ্ট বক্তব্য রাখতে পেরেছি, শয়তান আপনার এ ভাবনার কথাটিও বুঝে ফেলবে। তাই আবার শয়তান মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। প্রশ্ন তুলবে—
প্রশ্ন: আল্লাহ আছেন তা কী করে বিশ্বাস করা যায়? কেউ কি আল্লাহকে দেখেছেন? না দেখে বিশ্বাস করা কি অন্ধ বিশ্বাস নয়?
জওয়াব: হাঁ দেখেছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখেছেন। মেরাজের রাতে তিনি স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছেন। শুধু আল্লাহকে নয়, জান্নাত জাহান্নাম ইত্যাদি যা কিছু আমরা না দেখে বিশ্বাস করি সেসব কিছু তিনি স্বচোখে দেখে এসেছেন। এই সবকিছু তাঁকে দেখানো হয়েছিল, যাতে কেউ বলতে না পারে এবং সন্দেহ করতে না পারে যে, ঈমানের কথা যা কিছু আমরা শুনি যেমন: আল্লাহ্ আছেন, জান্নাত আছে, জাহান্নাম আছে ইত্যাদি, এসব কিছু প্রকৃতপক্ষে আছে কি না? কেউ তো কোন দিন দেখেনি! এখন আর এরকম সন্দেহ করার অবকাশ নেই। কারণ, এগুলো আছে তা এমন একজন দেখে এসে বলেছেন, যাকে দুনিয়ার কেউ মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি। ঘোর শত্রু পর্যন্ত যাকে মিথ্যুক বলতে পারেনি। আমাদের মত লক্ষ মানুষকে যদি দেখানো হত, আর আমরা দেখে এসে বলতাম, তবুও মানুষ অস্বীকার করতে পারত যে, হয়তো পরিকল্পিতভাবে আমরা মিথ্যা বলছি। কিন্তু এমন একজনকে দেখানো হয়েছে, যাকে কেউ মিথ্যুক বলতে পারেনি এবং পারবেও না। আমাদের মত লক্ষ কোটি মানুষের দেখার চেয়ে তাঁর একার দেখার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি। তিনি দেখে এসে বলেছেন, অতএব এটাতে বিশ্বাস স্থাপন করা অন্ধ বিশ্বাস হতে পারে না। আমাদেরই মধ্যকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু দেখার পর সেটাতে বিশ্বাস করাকে আদৌ অন্ধ বিশ্বাস বলা যেতে পারে না।
এ বক্তব্য পেশ করার পর এ প্রসঙ্গে আর কোন ওয়াছওয়াছা না আসারই কথা। কিন্তু তবুও আসতে পারে। যেমন, আপনার মনের মধ্যে এল—
প্রশ্ন: সরাসরি নিজে না দেখলে তো মনের মধ্যে কিছু খটকা বা খুঁতখুঁতানি থেকেই যায়, অন্য যে কেউ যতই দেখুক না কেন।
জওয়াব: এরূপ প্রশ্ন বা ওয়াছওয়াছা আসলে বলুন, এটা ভুল কথা। নিজে না দেখলেই খটকা থাকবে— এমন না-ও হতে পারে। আমরা পৃথিবীর অনেক দেশ, অনেক কিছু নিজেরা দেখিনি, কিন্তু নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের থেকে শুনে বিশ্বাস করি, তাতে তো কোন খটকা বোধ করি না। আমাদের মধ্যে বহু মানুষ রয়েছে যারা জীবনে কোন দিন মক্কা, মদীনা, লন্ডন, আমেরিকা, চীন, জাপান, ইরান, তুরান— কতসব দেশ বা শহর দেখেনি। মানুষে দেখে বলে তারা তাই শুনে বিশ্বাস করে। এতে তো কোন খটকা বোধ করে না? অতএব নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত সর্বজন স্বীকৃত বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্বের ঈমান সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি স্বচক্ষে দেখে এসে বলার পরও যদি কারও মনে সেসব সম্বন্ধে কোন খুঁতখুঁতানি থাকে, তাহলে সেটা তার চিন্তার অপক্কতা বলেই বিবেচিত হবে। সে লোক বিষয়টাকে এভাবে চিন্তা করে দেখেনি বলেই তার মধ্যে খুঁতখুঁতানি থেকে যাচ্ছে। সে এটাও ভেবে দেখেনি যে, ঈমান সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে খুঁতখুঁতানি বোধ করা তার স্ববিরোধিতাও। কারণ, একদিকে সে নিজে না দেখা স্বত্ত্বেও অন্যের দেখার ভিত্তিতে হাজার লক্ষ বিষয়ে স্বাচ্ছন্দে বিশ্বাস পোষণ করে চলছে, অপর দিকে ঈমান-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে শুধু নিজে দেখেনি এর ভিত্তিতে সন্দেহ পোষণ করে যাচ্ছে। অতএব এরূপ স্ববিরোধপূর্ণ ও অপক্ক চিন্তা থেকে সৃষ্ট খুঁতখুঁতানি ধর্তব্যের পর্যায়ে আসতে পারে না।
বস্তুত বিশ্বাস করার জন্য নিজের দেখা বা অন্যের দেখা কোনটারই দরকার হয় না। নিজের মধ্যে "মন" আছে, এটা কে না বিশ্বাস করে? প্রত্যেকেই বিশ্বাস করে। কিন্তু মন কেমন তা কি সে নিজে দেখেছে না অন্য কেউই দেখেছে? মনের আকার- আকৃতি কেমন, মনের রং কেমন, সাইজ কি, কোন্ ধাতু দিয়ে গঠিত— এর কোনটা কি কেউ জানে বা দেখেছে? তবুও মানুষ তা বিশ্বাস করে শুধু এর ভিত্তিতে যে, মন আছে তা টের পাওয়া যায়। তদ্রূপ পৃথিবীর প্রত্যেকটা বস্তু, প্রত্যেকটা ছন্দ-পতন থেকে টের পাওয়া যায় যে, এর একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। এভাবে টের পাওয়ার পরও বিশ্বাসে কোন খুঁতখুঁতানি থাকলে তাতে কিছু আসে যায় না। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَفِي الْأَرْضِ ايَاتٌ لِلْمُوْقِنِينَ، وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ .
অর্থাৎ, যারা বিশ্বাস করতে চায় তাদের জন্য পৃথিবীতে বহু নিদর্শন রয়েছে। আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা দেখবে না? (সূরা যারিয়াত: ২০-২১)
এতকিছুর পর আল্লাহকে না দেখার কারণে কোনই খুঁতখুঁতানি থাকার কথা নয়। তবুও কারও মধ্যে যদি কিছু খুঁতখুঁতানি অনুভূত হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেটা শয়তানেরই প্রক্ষেপন। শয়তানই তাকে বলছে, তোর ভিতর তো খুঁতখুঁতানি রয়ে গেল, আর তাই সে মনে করছে আমার মধ্যে খুঁতখুঁতানি রয়েছে, যদিও বাস্তবে তার মধ্যে কোনই খুঁতখুঁতানি নেই। শয়তানের বলার কারণেই এমনটি মনে হচ্ছে। অন্যের বলার কারণেও যে নিজের মধ্যে সমস্যা আছে বলে বোধ হয়— এমন একটা গল্প মনে পড়ল। সরল গোছের একজন শিক্ষক ক্লাসে পড়াতে গিয়েছেন। দুষ্ট প্রকৃতির ছাত্ররা পূর্বেই পরিকল্পনা করে রেখেছে আজ তারা পড়বে না। পরিকল্পনা মোতাবেক উস্তাদজী ক্লাসে যেতেই একজন ছাত্র বলে উঠল, উস্তাদজী আপনি কি অসুস্থ? উস্তাদজী বললেন, না তো। আর একজন ছাত্র বলে উঠল, জি উস্তাদজী আপনার চেহারায় কেমন অসুস্থতার ভাব দেখা যাচ্ছে। আর একজন বলে উঠল, চোখটাও কেমন লালচে মনে হচ্ছে। এভাবে কয়েকজন একের পর এক উস্তাদজীর চেহারায় অসুস্থতার বিভিন্ন লক্ষণের কথা উল্লেখ করল। অবশেষে উস্তাদজী বললেন, হাঁ কয়েকদিন যাবতই শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।
অহেতুক তাড়াহুড়োর মনোভাব দূর করার উপায়— আপনি নামাযে দাঁড়িয়েছেন। মনের মধ্যে অহেতুক তাড়াহুড়োর মনোভাব জাগবে। মনে হবে কত কাজ রয়ে গেছে! নামায পড়ে এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে, এক কাপ চা না খেলে তো আর চলছেই না, দোকান, অফিস, জরুরী মুতালাআ, লেখার মত কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মাথার মধ্যে রয়েছে, এখনই লিখে নেয়া চাই, একটু হিসেব বাকি রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে এগুলো প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যস্ততাই নয়। এ বিষয়গুলো এমন যা পাঁচ দশ মিনিট পরে করলেও তেমন কোন অসুবিধে হয় না। মনকে বলুন, আচ্ছা! ধীরে সুস্থে নামাযটা আদায় করতে না হয় পাঁচ মিনিট বিলম্ব হবে, তাতে এমন কোনই ক্ষতি হবে না। এগুলো পাঁচ মিনিট পরে করলেও চলবে। মনকে আরও বলুন, প্রকৃতপক্ষে আমার কোনই ব্যস্ততা নেই, অহেতুকই আমি ব্যস্ততা অনুভব করছি। এরূপ চিন্তা করলে দেখবেন সত্যিই আপনার মন থেকে ব্যস্ততার অনুভূতি বিলীন হয়ে গেছে।
📄 তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ব প্রসঙ্গে ওয়াসওয়াসা
আল্লাহ আছেন তার প্রমাণ প্রসঙ্গে এতকিছু বলার পরও যদি নফস্ ও শয়তানের পক্ষ থেকে আপনার মনে এরূপ প্রক্ষেপন হয় যে, তবুও আল্লাহকে যদি সকলেই স্বচক্ষে দেখতে পেত, এমনিভাবে ঈমান-সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ই যদি সকলেই স্বচক্ষে দেখতে পেত, তাহলে তো কারও মধ্যেই অস্পষ্টতা থাকত না। মু'মান বিহী (ঈমান-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, যেমন আল্লাহর সত্তা, জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব, পুলসিরাত, মীযান, হাউযে কাউছার ইত্যাদি।) গায়েব বা অদৃশ্য থাকার কারণেই তো মনের মধ্যে এতসব অস্পষ্টতা বিরাজ করে। যদি এসব গায়েব না হয়ে দৃশ্যমান হত, তাহলে তো কোনোই অস্পষ্টতা থাকত না। যদি আল্লাহর সত্তা গায়েব না হত, সকলেই তাঁকে এই চোখে দেখতে পেত, তাহলে একদিকে অস্পষ্টতা কেটে যেত, অপরদিকে দেখে ইবাদত করতে মনোনিবেশও ভাল হত। এখন না দেখে ইবাদত করা হয় বলে মনোযোগ অন্য দিকে চলে যায়। দেখলে দৃষ্টি তাঁর প্রতিই নিবদ্ধ থাকত, মনোযোগ অন্যত্র যেত না।
মনের মধ্যে এরূপ প্রক্ষেপন হলে প্রথমত বলুন, দেখলেই মনোযোগ অন্যদিকে যেত না— একথা বাস্তব নয়। এই কুরআন কিতাব কতকিছু দেখে দেখে পাঠ করতে থাকার সময়ও তো মনোযোগ অন্যত্র চলে যায়। ড্রাইভার খোলা চেখে সবকিছু দেখে দেখে গাড়ি চালানোর সময়ও তো মনোযোগ অন্যত্র যাওয়ায় এক্সিডেন্ট করে। বহু সময়ই তো এমন হয় যে, একজনের দিকে তাকিয়ে তার সাথে কথা বলছি, কিন্তু মন চলে গেছে অন্যত্র। অতএব আল্লাহকে দেখা গেলে মনোযোগ তাঁর প্রতিই নিবদ্ধ থাকত, অন্যত্র যেত না— একথাটা বাস্তব নয়। দ্বিতীয়ত বলুন, আল্লাহর সত্তা হল অসীম এবং আমাদের দৃষ্টিশক্তি হল সসীম। আর সসীম শক্তি দিয়ে অসীমকে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। অতএব দুনিয়ার এই চোখে আল্লাহ তাআলার সত্তাকে দেখা সম্ভব নয়। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে,
لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ .
অর্থাৎ, দৃষ্টি তাকে দেখতে সক্ষম নয়, তিনি সব দৃষ্টিকে দেখেন। তিনি তো সুক্ষ্ম, সর্বজান্তা। (সূরা আনআম: ১০৩)
যদি নফস্ ও শয়তান বলে, আল্লাহ্ তাআলা ইচ্ছে করলে তো তাঁকে দেখার মত ক্ষমতা মানুষের চোখে দিতেও পারতেন। তিনি তো সবকিছু করতে সক্ষম, তিনি পারেন না— এমন কোন বিষয় আছে কি?
তাহলে আপনি বলুন, আল্লাহ্ তাআলা সবকিছু পারেন, তবে পারেন বলেই সবকিছু করেন না। অযৌক্তিক কোন কিছু তিনি করেন না। আল্লাহর সত্তাসহ ঈমান-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি মানুষকে দেখানো হলে তো ঈমান বিল গায়েব তথা না দেখে বিশ্বাস করা থাকত না, তখন তো সেটা দেখা বিষয়ে ঈমান হত। তাতে তো বিশ্বাসের পরীক্ষা হত না। না দেখে বিশ্বাসের মধ্যেই বিশ্বাসের পরীক্ষা হয়। তিনি তো দুনিয়াতে মানুষকে পরীক্ষার জন্যই পাঠিয়েছেন। অতএব তাঁকে দেখার ক্ষমতা না দেয়ার মধ্যেই যৌক্তিকতা বিদ্যমান।
যদি নফস্ ও শয়তান বলে, তাহলে অন্তত আল্লাহর একটা প্রতিকৃতি বানিয়ে তাঁকে সামনে রেখে ইবাদত করার অনুমতি থাকলে কেমন হত? তাতে অন্তত ইবাদতে মনোযোগ নিবদ্ধ থাকার ফায়দাটা পাওয়া যেত। না-দেখা সত্তার ইবাদত করা হয় বলেই মনোযোগ বিচ্যুত হয়ে থাকে, দৃশ্যমান হলে মনোযোগ তার প্রতিই নিবদ্ধ থাকত।
তাহলে আপনি বলুন, একথার জবাব তো পূর্বেই দেয়া হল। তারপরও প্রতিকৃতি বানানোর কথা বলে কি তুমি আমাদেরকে মূর্তিপূজারীদের মত হতে বলছ। নাউযু বিল্লাহি মিন্ যালিক! মূর্তিপূজারীদেরও তো এই যুক্তি যে, আসল খোদা নিরাকার, তাকে দেখা যায় না, অতএব তার মূর্তি বা প্রতিমা বানিয়ে তাকে দেখে ইবাদত কর। কিন্তু তারা এটা বোঝে না যে, এতে তো মনোনিবেশ হয় মূর্তির প্রতি, আসলের প্রতি নয়। সামনে সাকার বা দৃশ্যমান কিছু না থাকলেই যেখানে অদৃশ্য সত্তার প্রতি মনোযোগ দেয়া কঠিন হয়, সেখানে সামনে সাকার কিছু থাকলে তো অদৃশ্য সত্তার প্রতি মনোযোগ যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, তখন তো সর্বতোভাবেই শুধু দৃশ্যমান সত্তার প্রতিই মনোযোগ নিবদ্ধ থাকবে। তাহলে দেখা যাবে আসলের উদ্দেশ্যে বানানো হল প্রতিকৃতি কিন্তু প্রতিকৃতিই শেষতক আসলের স্থান দখল করে নিল। সেই প্রতিকৃতি বা মূর্তিকে নিয়েই এমন ব্যস্ত থাকা হল যে, আসল খোদা মন থেকে হারিয়ে গেলেন লক্ষ যোজন দূরে।
এমন একটা উপলদ্ধি থেকেই হয়তো কবিগুরু রবি ঠাকুর বলেছিলেন,
মুগ্ধ ওহে স্বপ্নঘুরে, যদি প্রাণের আসন কোণে
ধুলায় গড়া দেবতারে, লুকিয়ে রাখিস সংগোপনে
চিরদিনের প্রভু তবে, তোদের মনে বিফল হবে
বাহিরে সে দাঁড়িয়ে রবে, কতনা যুগ যুগান্তরে
অতএব শত শত কোটি, হাজার হাজার কোটি ইবাদতকারী কোটি কোটি প্রতিকৃতি বানিয়ে নিলে তাওহীদ বা একত্বের দশা কি হবে তা তো বিবেচনার বিষয়! তদুপরি তাতে একমাত্র আসলকে নিয়ে চলার মত মজা থাকবে কোথায়? জনৈক উর্দু কবি সুন্দরই বলেছেন,
ایک سے جب دو ہوئی تو فرد یکتائی نہیں + اس لئے تصویر جاناں ہم نے کینچوائی نہیں
অর্থাৎ, এক থেকে যদি দুই হয়ে যায়, তাহলো তো এক-এর এক থাকার মজাই শেষ হয়ে যায়। তাই তো আমি প্রেমাষ্পদের ছবি বানাতে যাইনি।
আল্লাহ্ পাক এমনই প্রেমাষ্পদ যে, তাঁর স্থানে অন্য কেউ কোনোভাবে এসে যাক তা তিনি মোটেই বরদাশত করেন না। আল্লাহর প্রতিকৃতি বানানো হলে সেই প্রতিকৃতির প্রতি যতটুকু মনোনিবেশ নিবদ্ধ হবে, ততটুকু থেকেও আল্লাহ্ পাক বঞ্চিত হতে চান না। তিনি চান তাঁর প্রেমিকদের সব রকম নিবেদন সর্বতোভাবে শুধু তাঁরই জন্য হোক একান্ত। তিনি হতে চান তাঁর প্রেমিকদের একমাত্র ও একান্ত প্রেমাষ্পদ, যাতে কেউ কোনোভাবে থাকবে না শরীক। একেই তো বলে প্রেমাষ্পদ, একেই তো বলে প্রেমিক। প্রেমের স্বভাবই এ-ই। প্রেম কোনোভাবে কোনো শরীকানা সহ্য করে না। প্রেম চায় প্রেমিক একাত্ম হয়েই প্রেমাষ্পদের ধ্যান করুক, শুধু তাঁরই জন্য হোক তার সব কিছু নিবেদিত। এই একাত্মতাই হল তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ব। তাওহীদ বা একাত্মতা না হলে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা যায় না। যেমন প্রেমাষ্পদকে খুশি করা যায় না তার প্রতি একাত্ম হওয়া ব্যতীত। নানান ঘাটে গমনকারী প্রেমিককে কোন প্রেমাষ্পদ পছন্দ করে না। এভাবে প্রেমাষ্পদের মন পাওয়া যায় না। এ জন্যই কবি খুব সুন্দর করে বলেছেন,
دریں راہ حاصل جز یک دلے نیست + دو دل بودن بجز بے حاصلی نیست
অর্থাৎ, প্রেমের এ পথে এক মন হওয়া ব্যতীত কিছু অর্জন হয় না। দুই মন হলে বঞ্চনা বৈ কিছুই জোটে না।
📄 একাধিক খোদা থাকলে কী অসুবিধা?
এই তাওহীদের আলোচনা আসলেই নফস্ ও শয়তান বলতে পারে একাধিক খোদা থাকলে অসুবিধে কি? আপনি উল্টো জিজ্ঞেস করতে পারেন, সুবিধেটা কি? নিশ্চয় কোন সুবিধের দিক সে দেখাতে পারবে না। কারণ, দুনিয়াতে সকলেই স্বীকার করে যে, এক হাতে চললেই সবকিছু ভাল থাকে, ভাল চলে, ঠিকঠাক মত চলে। গাড়ি-ঘোড়া, মেশিনপত্র, যন্ত্রপাতি, বইপত্র, খাতা-কলম ইত্যাদি মালিকের এক হাতে চললেই ভাল থাকে, ভাল চলে। তাই একাধিক খোদা থাকলে সুবিধে কি হত তা শয়তান দেখাতে পারবে না। তারপরও শয়তান মনের মধ্যে প্রশ্ন তুলতেই থাকবে যে, একাধিক খোদা থাকলে অসুবিধে কি?
তাহলে তার জওয়াবে আপনি খুব সহজে বলতে পারেন, একাধিক খোদা থাকলে অসুবিধে কি হত তা বুঝতে খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার হয় না, এই আমাদের দেশের দুই নেত্রীর দিকে তাকালেই তা সহজে বুঝে আসে। উভয়জন ক্ষমতায় নেই, একজন ক্ষমতায় আর একজন ক্ষমতার বাইরে। একজন আরেকজন থেকে দূরে। এই দূরে থেকেই দু'জনের মধ্যে যে পরিমাণ ঢিলেঢিলি চলতে থাকে, তাতে দু'জনই যদি একসাথে ক্ষমতার মসনদে আসীন থাকত, তাহলে যে দস্তুরমত চুলোচুলি ও কিলাকিলি হত তা হলফ করেই বলা যায়। আর তেমন হলে দেশের বারটা কীভাবে বাজত তা বুঝতে কোন ব্যাখ্যার দরকার হয় না। একাধিক খোদা থাকলে দুনিয়ারও এরকম বারটা বাজত। এ বিষয়টাই কুরআনে কারীমে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে,
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا .
অর্থাৎ, যদি আসমান জমিনে এক আল্লাহ না হয়ে একাধিক ইলাহ হত, তাহলে আসমান জমিনের দশা খারাপ হয়ে যেত। (সূরা আম্বিয়া: ২২)