📄 মুদাররিস বা শিক্ষকদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়
যারা মাদ্রাসার মুদাররিস তথা শিক্ষক তাদের তালীম তথা শিক্ষাদান হওয়া চাই দ্বীনী ইলমের প্রচার প্রসার পূর্বক আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন বিশেষ কোন কিতাব বা বড় কোন কিতাব পড়ানোর ওপর নির্ভরশীল নয়। বড় কিতাব বা বিশেষ কোন পড়ানোর মাধ্যমেও যেমন এই সন্তুষ্টি অর্জন হতে পারে, ছোট বা সাধারণ যেকোনো কিতাব পড়ানোর মাধ্যমেও তা হতে পারে। তাই কোন মুদাররিসের উপর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ থেকে ছোট বড় নির্বিশেষে যেকোনো কিতাব পড়ানোর দায়িত্ব আসুক খোলামনে তা পড়ানোই হচ্ছে এ ক্ষেত্রে ইখলাসের চেতনা। কিন্তু শয়তান মুদাররিসদের এই ইখলাসের চেতনা থেকে সরানোর জন্য তাদেরকে ওয়াছওয়াছা দেয় বড় কিতাব না পড়ালে ছাত্ররা বড় হুজুর হিসেবে মূল্যায়ন করবে না, অন্য উস্তাদদের কাছেও ছোট উস্তাদ হিসেবে গণ্য হতে হবে, বাইরের কেউ যখন জিজ্ঞাসা করবে আপনি কী কিতাব পড়ান তখন যদি বড় কিতাব বা বিশেষ কোন কিতাবের নাম বলতে না পারি তাহলে তো তাদের কাছে আমি ছোট হয়ে যাব। এই ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা করার জন্য দুটো কাজ করা চাই। যথা:
(১) এই চিন্তা করা চাই যে, বড় হিসেবে সম্মান পাওয়ার পদ্ধতি শুধু এই একটাই নয় যে, আমাকে বড় কিতাব পড়াতে হবে। আল্লাহ যদি আমাকে বড় হিসেবে সম্মান দিতে চান অন্য কোন পন্থায়ও তা দিতে পারেন। আর যদি না চান তাহলে কোনোভাবেই সম্মান আসবে না বরং সম্মান অর্জনের জন্য অসৎ পন্থা অবলম্বন করলে অসম্মানও আসতে পারে। কুরআনে কারীমের দুটো আয়াত সামনে রাখা চাই।
(১) ﴿وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . অর্থাৎ, তুমি যাকে চাও ইজ্জত দাও, যাকে চাও বে-ইজ্জত কর। তোমারই হাতে কল্যাণ। তুমি সর্ববিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান। (সূরা আলে ইমরান: ২৬)
(২) وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِم إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ . অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে অপমান দেন তাকে সম্মান দেয়ার কেউ নেই। অবশ্যই আল্লাহ যা চান তা-ই করেন। (সূরা হজ্জ: ১৮)
(২) এই চিন্তা করা যে, নিজেকে নিজে বড় মনে করা ঠিক নয়। তবে অন্যদের দৃষ্টিতে যেন বড় ও সম্মানী প্রতিপন্ন হওয়া যায় তার জন্য হাদীছে যে দুআ শিক্ষা দেয়া হয়েছে তা করা যায়। এক রেওয়াতে এসেছে—
عن عبد الله بن بريدة عن أبيه رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يقول : «اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي شَكُورًا وَاجْعَلْنِي صَبُورًا وَاجْعَلْنِي فِي عَيْنِي صَغِيرًا وَفِي أَعْيُنِ النَّاسِ كَبِيرًا.» (أخرجه البزار)
অর্থাৎ, হযরত বুরায়দা (রা.) বলেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, হে আল্লাহ! আমাকে (যা দিয়েছ তার ওপর) শোকরকারী বানাও। আমাকে সবরকারী বানাও। আমাকে নিজের দৃষ্টিতে ছোট আর অন্যের দৃষ্টিতে বড় বানাও। (মুসনাদে বায্যার: হাদীছ ৪৪৩৯)
উপরোক্ত ওয়াছওয়াছা ছাড়াও মুদাররিসদের আরও যেসব ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে তার মধ্যে রয়েছে:
• আমাকে কোন্ গ্রেডের উস্তাদ গণ্য করা হচ্ছে। অমুক উস্তাদ আমার চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সে অমুক গ্রেডের হতে পারলে আমাকে কেন তার চেয়ে নিচের গ্রেডের গণ্য করা হচ্ছে? আর নিচের গ্রেডের গণ্য হওয়ায় আমি বেতন- ভাতাও কম পাচ্ছি। এগুলো অন্যায়। এর প্রতিকার হতে হবে। এই চেতনা যে শয়তানের ওয়াছওয়াছা তার প্রমাণ হল— এই চেতনা থেকে প্রতিকারের নামে নিজের খাহেশ বাস্তবায়ন করতে যেয়ে মাদ্রাসায় ফেতনা লাগানো হয়। ফেতনা কীভাবে লাগানো হয় তার পদ্ধতি ও বিরবণ এরূপ— সেই উস্তাদকে ছোট প্রতিপন্ন করার জন্য তার দোষ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়, তার বিরুদ্ধে সমালোচনা চালানো হয়, তার বদনাম রটানো হয়, অন্যায়ভাবে হলেও তার অযোগ্যতা প্রমাণের অপচেষ্টা চালানো হয় ইত্যাদি। কিছুতেই কিছু করতে না পারলে অগত্যা তার নামে চারিত্রিক কেলেংকারি রটিয়ে দিয়ে হলেও তাকে বিদায় দেয়ার সূত্র বের করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। নাউযু বিল্লাহ! এই ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা করার জন্য তিনটা বিষয় চিন্তায় উজ্জীবিত করা চাই।
(১) আমাকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ উস্তাদদের গ্রেড নির্ধারণ ও তদনুযায়ী সবকিছু ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব দেয়নি। অতএব এখানে আমার মাথা ঢোকানো ঠিক নয়।
(২) নিজের ন্যায্য অধিকার বা নিজের উপযুক্ত প্রাপ্য অর্জিত না হলে সবর করা চাই আর আল্লাহর কাছে নিজের প্রাপ্যের জন্য দুআ করা চাই। যেমন এক হাদীছে এসেছে—
عَنْ ابْنِ مَسْعُودٍ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : «سَتَكُونُ أَثَرَةٌ وَأُمُورٌ تُنْكِرُونَهَا . قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ! فَمَا تَأْمُرُنَا ؟ قَالَ : تُؤَدُّونَ الْحَقَّ الَّذِي عَلَيْكُمْ وَتَسْأَلُونَ اللَّهَ الَّذِي لَكُمْ.» (রওয়াহুল বুখারী...)
অর্থাৎ, হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সামনে তোমরা দেখবে তোমাদের অধিকারের উপর অন্যের অধিকারকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। আরও অনেক অপছন্দনীয় জিনিস তোমরা দেখবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রসূলাল্লাহ! তখন আমাদের কী করতে বলেন? তিনি উত্তর দিলেন, তোমাদের যা করণীয় তা করবে, আর তোমাদের প্রাপ্যের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আবেদন জানাবে। (বোখারী)
(৩) অন্য কাউকে ছোট করার চেষ্টা করলে শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তাআলা আমাকে ছোট প্রতিপন্ন করতে পারেন। কারণ আল্লাহর নীতি হল তাঁর কোন বান্দার বেলায় আমি যা করব আল্লাহ আমার বেলায়ও তা করবেন। যেমন: এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে, ارْحَمُوا تُرْحَمُوا وَاغْفِرُوا يُغْفَرُ لَكُمْ. অর্থাৎ, অন্যের প্রতি দয়া কর তোমার প্রতি দয়া করা হবে। অন্যকে ক্ষমা কর তোমাকে ক্ষমা করা হবে। মَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ. অর্থাৎ, যে অন্যের প্রতি দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না। বুঝা গেল অন্যের প্রতি দয়া করলে আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন। আর এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে, মَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. অর্থাৎ, যে মুসলমানের দোষ গোপন করে আল্লাহও তার দোষ গোপন রাখেন। এ জাতীয় আরও অনেক হাদীছ রয়েছে। এসব হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয়— আল্লাহর নীতি হল কেউ তাঁর কোন বান্দার বেলায় যা করবে তিনিও তার বেলায়ও তা-ই করবেন।
• অমুক উস্তাদ আমার চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাকে অমুক পদ দেয়া হয়েছে, আমাকে কেন সে পদ দেয়া হয় না। এভাবে আমাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর প্রতিকার হওয়া চাই। এই চেতনা থেকে প্রতিকারের নামে নিজের খাহেশ বাস্তবায়ন করতে যেয়ে মাদ্রাসায় ফেতনা লাগানো হয়। ফেতনা কীভাবে লাগানো হয় পূর্বের অনুচ্ছেদে তার পদ্ধতি ও বিবরণ প্রদান করা হয়েছে। এবং এই ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা করার জন্য কি করণীয় তা-ও পূর্বের অনুচ্ছেদে বর্ণনা করা হয়েছে।
• শিক্ষকদের হাজিরা খাতায় আমার নাম অমুক অমুকের পরে লেখা হল কেন? এভাবে তাদেরকে বড় আর আমাকে ছোট প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এর প্রতিকার হওয়া চাই!
• অমুক উস্তাদকে অমুক বড় কিতাব দেয়া হয়েছে, আমি তার চেয়ে যোগ্য। অতএব আমার ঐ কিতাব পেতেই হবে, এর জন্য যা করার তা করতে হবে। এই চেতনা থেকে সেই উস্তাদের বিরুদ্ধে লাগা হয়। এই চেতনাও শয়তানেরই ওয়াছওয়াছা। এই ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা করার জন্য চিন্তা করা চাই আল্লাহ যদি আমার দ্বারা সেই কিতাব পড়ানো ভাল মনে করেন তাহলে তার ব্যবস্থা তিনিই করবেন। তা এ মাদ্রাসায়ও হতে পারে অন্য কোন মাদ্রাসায়ও হতে পারে। আল্লাহ তাআলা যখন কোন কিছু চান তার আনুষঙ্গিক সব উপকরণেরও সেভাবেই সমন্বয় ঘটান। .إذا أراد الله شيئا هيا له أسبابه
• দরসে পাঠদানের সময় বিশেষ বিশেষ তথ্যের হাওয়ালা এবং শরাহ শুরুহাতের নাম উল্লেখ না করাও শয়তানের ওয়াছওয়াছা থেকেই হয়ে থাকে। শয়তান মনে এই চিন্তা এনে দেয় যে, আমি যা কিছু বলছি তা কোন্ কোন্ কিতাব থেকে সংগ্রহ করেছি সেসবের বরাত যদি উল্লেখ করি তাহলে ছাত্ররা জেনেই নিল আমি কোন কোন কিতাব থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। তাহলে আমার কোন কৃতিত্ব থাকল না। তাহলে ছাত্ররা আর আমার তাকরীরের প্রতি আগ্রহী থাকবে না, বরং মনে করবে উস্তাদ যা বলেন তা আমরাও সংগ্রহ করে নিতে পারি। আর যদি বরাত উল্লেখ না করি তাহলে আমার তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে তারা কৌতুহলী থাকবে, আমার বক্তব্যের প্রতি তাদের আগ্রহ থাকবে যে, ছুটে গেলে আর পাওয়া যাবে না। বস্তুত এটা শয়তানেরই ওয়াছওয়াছা। উস্তাদ যদি ছাত্রদেরকে তথ্য ও তত্ত্বের বরাত উল্লেখ করেন, কোন্ বিষয় কোন্ কিতাবে ভাল লেখা হয়েছে তার বিবরণ প্রদান করেন, কোন্ শরাহর হাইছিয়াত কি তা খুলে বুঝিয়ে দেন, তাহলে কোন্ জাতীয় বিষয়ের তথ্য ও তত্ত্ব কোন্ কোন্ কিতাব থেকে সংগ্রহ করা যায়, কোন্ কিতাবের হাইছিয়াত কি, সে বিষয়ে ছাত্রদের ধারণা জন্মে। এই ধারণা ছাত্রদের মুতালাআ করার আগ্রহ জন্মায়, এতে কিতাবাদি সম্বন্ধে শুরু থেকেই তাদের বসীরত পয়দা হয় যা তাদের যোগ্য হওয়ার পথ খুলে দেয়। ছাত্রদের মধ্যে যেন এমন ধারণা জন্মাতে না পারে, তাদের যোগ্য হওয়ার পথ যেন না খোলে তাই শয়তান ওয়াছওয়াছা দিয়ে উস্তাদদেরকে এ সমস্ত বিবরণ প্রদান থেকে বিরত রাখে।
এই ওয়াছওয়াছার মোকাবেলার জন্য উস্তাদদের মনে রাখা চাই ছাত্ররা কখনই এরূপ মনে করে না যে, উস্তাদের কাছে আসমান থেকে ওহী নাযেল হয় আর তিনি আমাদেরকে তা শেখান। সব ছাত্রই বোঝে উস্তাদ কোন না কোন কিতাব দেখেই বলে থাকেন। অনেক সময় ছাত্রদের মধ্যে যারা অল্প-বিস্তর মুতালাআ করে তারা স্পষ্টতই টের পায় উস্তাদ কোন্ কিতাবের সহযোগিতা নিয়ে বলছেন, সেক্ষেত্রে উস্তাদ বরাত উল্লেখ না করলে ছাত্ররা বরং উস্তাদের লুকোচুরি দেখে তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়।