📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 ইমাম ও খতীবদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়

📄 ইমাম ও খতীবদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়


ইমাম ও খতীব সাহেবগণ জুমুআর দিন, ঈদের দুই দিন, শবে বরাত, শবে কদর ইত্যাদি উপলক্ষে ওয়াজ বা বয়ান করে থাকেন। তাই ওয়াজের ব্যাপারে ওয়ায়েজদের যে জাতীয় ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে ইমাম ও খতীবদেরও সে জাতীয় ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে। যার বিবরণ ইতিপূর্বে দেয়া হয়েছে। সেগুলো ছাড়াও ইমাম ও খতীব হিসেবে তাদের কিছু খাস ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে। যেমন:

• মসজিদ কমিটির লোকজনকে স্যার স্যার করে চলতে হবে, তাতে আলেম হিসেবে যে গায়রত তথা আত্মমর্যাদা রক্ষা করে চলা উচিত ছিল তা বিসর্জিত হলেও। মনে করে চাকরি ঠিক রেখে সবকিছু!
• কোন তিক্ত সত্য বা কারও গায়ে লাগে এমন মাসআলা বলার প্রয়োজন থাকলেও তা বিশেষ বিশেষ লোকের চেহারার দিকে তাকিয়ে না বলা, পাছে যদি তারা আবার অসন্তুষ্ট হয়ে যান আর চাকরিতে আঘাত আসে!
• চাকরি রক্ষার জন্য এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মা বৌদের সঙ্গে খাতির রেখে চলা এবং খালাম্মা কেমন আছেন? ভাবি ভাল আছেন তো?—সবই শয়তানের ওয়াছওয়াছা।
• বিশিষ্ট ব্যক্তিদের খুশি রাখার জন্য ঠেকায় বে-ঠেকায় খুব আবেগের সাথে তাদের নাম নিয়ে নিয়ে দুআ করা।
• যা বেতন পাওয়া যায় তা দিয়ে সংসার চলে না— এই অজুহাতে, কিংবা বাড়তি সঞ্চয়ের চিন্তায় প্রচলিত মীলাদ, কুলখানী, চল্লিশা, মৃত্যুবার্ষিকী ইত্যাদি বেদআত জানা সত্ত্বেও করা। জায়েয পন্থায় যতটুকু উপার্জন হয় তাতে তুষ্ট না থাকা। ইত্যাদি।

এগুলো সবই শয়তানের ওয়াছওয়াছা। সঠিক পন্থায় থেকে নিজের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার পরও যদি চাকরি চলে যায়, তাহলে সেই চাকরির পরওয়া না করা চাই। আল্লাহর উপর ভরসা করা চাই। এটাই তো হল তাওয়াক্কুল। আর হালাল পন্থায় যা উপার্জন হয় তাতেই তুষ্ট থাকা চাই। একেই বলে কানাআত। রিযা বিল কাযা তথা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি থাকলে, তাকদীরে যথাযথ বিশ্বাস থাকলে হালাল পন্থায় সীমাবদ্ধ না থেকে হারাম পন্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেতনা জাগ্রত হতে পারে না। এসব চেতনা শয়তানের ওয়াছওয়াছা থেকেই সৃষ্টি হয়ে থাকে। অতএব কোনো রূপ তাবীল বা অপব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে এগুলোকে শয়তানের ওয়াছওয়াছাই গণ্য করা চাই।

এ কথা সত্য যে, হালাল পন্থার চাকরিকে নিজের হেলায় নষ্ট করা ঠিক নয়। হালাল পন্থায় উপার্জনের সুযোগ আল্লাহর এক নেয়ামতও বটে। আর আল্লাহর কোন নেয়ামতকে অবমূল্যায়ন করা ঠিক নয়। এরূপ চাকরি রক্ষার জন্য বৈধ পন্থায় হেকমত অবলম্বন করে চলাও নিষেধ নয় বরং তা কাম্য। কিন্তু বুঝতে হবে আলেম হিসেবে যে আত্মমর্যাদা রক্ষা করে চলা উচিত তা বিসর্জন দেয়ার নাম হেকমত নয়। কারও চাটুকারিতার নাম হেকমত নয়। চাকরি রক্ষার জন্য শরীয়ত লঙ্ঘনের নামও হেকমত নয়। প্রয়োজনের মুহূর্তে সঠিক মাসআলা—এমনকি কারও বিরুদ্ধে গেলেও তা— বলা কর্তব্য। অবশ্য তা কৌশলে এবং হেকমতের সাথেই বলা কাম্য। কিন্তু কোন অবস্থাতেই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়া হেকমত নয়।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 পীর সাহেবদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়

📄 পীর সাহেবদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়


পীর সাহেবরা মানুষকে শয়তানের ওয়াছওয়াছার ব্যাপারে সতর্ক করেন, ওয়াছওয়াছা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেন, কিন্তু স্বয়ং পীর সাহেবরাও ওয়াছওয়াছা থেকে মুক্তি পান না। তাদেরকেও নফছ ও শয়তান নানান রকম ওয়াছওয়াছা দিয়ে থাকে এবং শয়তান তাদের প্রতি বেশি ক্ষুব্ধ থাকার কারণে তাদেরকে একটু বেশি কঠিন ওয়াছওয়াছাই দিয়ে থাকে। পীর সাহেবদের ব্যক্তিত্ব এবং পজিশন ভেদে মোটামুটি তাদের যেসব ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে, তার মধ্যে রয়েছে—
• আমার কাছে বড় বড় মালদাররা মুরীদ হলে হাদিয়া-তোহফা বেশি পাওয়া যেত।
• সমাজ ও রাষ্ট্রের বড় বড় পদের লোকেরা যদি আমার মুরীদ হত তাহলে আমার দাপট বৃদ্ধি পেত, তাদের দ্বারা অনেক কাজ নিতে পারতাম। লোকেরা বুঝত হুজুরের অনেক ক্ষমতা।
• বড় বড় আলেমরা যদি আমার মুরীদ হত তাহলে লোকেরা বুঝত হুজুর অনেক বড় আলেম ও কামেল লোক, নইলে কি এত বড় বড় আলেম হুজুরের মুরীদ হত।
• মনে মনে এই কামনা জাগা যে, মুরীদরা যদি আমাকে ওলিয়ে কামেল, গাওছ, কুতুব ইত্যাদি বড় বড় খেতাব প্রদান করত! কোন দুআ কবুল হলে বা তাবীজ ঝাড়-ফুঁকে কাজ হলে কিংবা ঘটনাচক্রেও ভবিষ্যত বিষয়ক কোন কথা অনুযায়ী কিছু ঘটলে মনে এই কামনা জাগা যে, মুরীদরা যদি এটাকে আমার কামালিয়াত বা কারামত হিসেবে মূল্যায়ন করত!
• আমার মুরীদের সংখ্যা যদি সবার চেয়ে বেশি হত। সারা দেশের মানুষ বলত, অমুকের মুরীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
• শুধু দেশে নয় বিদেশেও যদি কিছু মুরীদ থাকত, তাহলে বিদেশেও প্রোগাম হত, তাহলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পীর আখ্যায়িত হতাম। লোকেরা বুঝত এবং বলাবলি করত, সারা পৃথিবীতে হুজুরের ভক্ত মুরদান ছড়িয়ে আছে।
• যেখানেই যাই দলে দলে ভক্ত মুরীদরা যদি আমার আশে পাশে থাকত, তারা বিনয়ের সাথে কেউ জুতো সোজা করত, কেউ লাঠি নিয়ে আগাত, কেউ ফাই-ফরমায়েশ খাটত ইত্যাদি, তাহলে আমার পীরালির বড়ত্ব ফুটে উঠত।
• কথায় কথায় কেঁদে ফেলা চাই, মুনাজাতে কান্দা চাই, মানুষকে কান্দানো চাই, মাঝে মধ্যে সজোরে "আল্লাহ" বলে খোদাভীতি প্রকাশ করা চাই যাতে মুরীদরা আমাকে খোদাভীতি তাড়িত, সর্বক্ষণ আখেরাতের ফিকিরওয়ালা বুযুর্গ মনে করে।
• এগুলো ছাড়াও ওয়াজ-নসীহত করার সময় ওয়ায়েজদের মনে যেসব ওয়াছওয়াছা হয়, পীর সাহেবদের মনেও ওয়াজ-নসীহত করার সময় সেসব ওয়াছওয়াছা হতে পারে, হয়ে থাকে।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 মুসান্নিফ বা লেখকদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়

📄 মুসান্নিফ বা লেখকদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়


মুসান্নিফ বা লেখকদের মনে যেসব ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে তার কিছু বিবরণ শুনুন।

• লেখার শুরুতেই মনে হয় আমার এই বইটি বাজারে ভাল চললে আমার প্রচুর উপার্জন হবে। কিংবা আমার এই লেখাটি বা আমার এই বইটি পাঠক মহলে সমাদৃত হলে লেখক হিসেবে আমার সুনাম হবে। শয়তান শুরুতেই এরূপ ওয়াছওয়াছা দিয়ে লেখার সহীহ নিয়ত থেকে তথা মানুষের হেদায়েতের নিয়ত থেকে সরিয়ে দেয়। তবে উল্লেখ্য যে, কেউ লেখার পরিকল্পনা করেছে মানুষের হেদায়েতের উদ্দেশ্যে, কিন্তু পরে চিন্তায় এল যে, ভাল লিখলে প্রশংসাও পাওয়া যাবে, বই ভাল চললে টাকা-পয়সাও আসবে—এ চিন্তা ইখলাসের পরিপন্থী নয়। এটা স্বভাবগত বিষয় যে, ভাল কিছুর বিনিময়ে প্রশংসা অর্জিত হবে, প্রশংসা হলে ভাল লাগবে, নিন্দা হলে খারাপ লাগবে। টাকা-পয়সার চাহিদাও স্বভাবগত চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। তাই এরূপ চিন্তা ইখলাসের পরিপন্থী নয়। ইখলাসের পরিপন্থী হবে তখন যখন লেখার পরিকল্পনাই নেয়া হবে প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বা টাকা-পয়সা অর্জনের উদ্দেশ্যে।

• ছোটখাট বই বা তেমন খ্যাতিমান নয় এমন লেখকের বই-পুস্তক থেকে কোন তথ্য নিলে তার বরাত না দেয়া এই ভেবে যে, এ বইয়ের বরাত দিলে আমি ছোট হয়ে যাব। এর বরাত না দিলেই বরং পাঠকরা মনে করবে আমি বিশাল বই-পুস্তক পড়াশোনা করে বা অনেক ঘাটাঘাটি করে তবে লিখেছি। অথচ এই খেয়াল করা হয় না যে, এভাবে বরাত না দিলে তো ইল্ম্মী খেয়ানতের গোনাহ হয়ে যায়। এটা তো গোনাহের চেতনা।

• জামাতের নামাযের সময় জামাত থেকে দূরে রাখার জন্য শয়তান খুব সুন্দর মাজমূন (লেখার বিষয়বস্তু) মনে এনে দিতে পারে। আর লেখকের মনে হতে পারে সুন্দর মাজমূন (লেখার বিষয়বস্তু) যেহেনে আসছে, সব সময় তো এমন মজমূন যেহেনে আসে না। তাই এখন জামাতে না গেলে কি নয়? কিংবা লেখক যদি উস্তাদ হয় তাহলে মনে করা যে, এখন দরসের মুতালা বাদ দিয়েই লেখাটা চালিয়ে যাওয়া দরকার। দরসের মুতালাআ তো পরেও করা যাবে, এরকম মাজমূন পরে যেহেনে না-ও আসতে পারে। এভাবে শয়তান জামাতে নামায পড়ার মত গুরুত্বপূর্ণ আমল থেকে এবং মুদাররিছ হিসেবে দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করতে হলে যে মুতালাআর জরুরত তা থেকে লেখককে ফিরিয়ে দেয়। এটা ওয়াছওয়াছা এ কারণে যে, এখনই লেখা জরুরি নয় পরেও লেখা যাবে, অথচ এখনই জামাতে শরীক হওয়া জরুরি, এখনই মুতালাআ সেরে নেয়া জরুরি। আর যেহেনে মজমূন হাজির হওয়ার যে বিষয়টা তা মজমূনের দুই একটা শব্দ লিখে রাখলেও পরে তা দেখে আবার মজমূনের আগের চিন্তায় ফিরে আসা যায়। যারা জাত লেখক তারা এটা সহজেই বোঝেন। তা ছাড়া আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজের দায়িত্ব পালন করলে এর ওছিলায় আল্লাহ তার চেয়ে আরও সুন্দর মাজমুনও তো যেহেনে এনে দিতে পারেন।

• লেখার সময় মাঝে মধ্যে মনে হয় এমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও সাহিত্য-সমৃদ্ধ ভাষা হওয়া চাই যাতে পাঠকরা মনে করে লেখকের ভাষা-জ্ঞান ও সাহিত্যের পাণ্ডিত্ব সাংঘাতিক! শিক্ষিত সমাজ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর উদ্দেশ্যে যে লেখা তা অবশ্যই শুদ্ধ না হলে শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী সমাজ সেই লেখকের লেখায় আপ্লুত হবে না, তার লেখাকে তেমন মূল্য দিবে না, যা ঐই লেখা থেকে তাদের হেদায়েত গ্রহণ না করার কারণ হতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে ভাষার শুদ্ধতা ও চমকারিত্বের প্রতি খেয়াল রাখা কাম্য। এতটুকু চিন্তা শয়তানের ওয়াছওয়াছা নয়। কিন্তু এর চেয়ে অতিরিক্ত ভাষা-জ্ঞান ও সাহিত্যে পাণ্ডিত্যের জন্য প্রশংসিত হওয়ার খাহেশ শয়তানের ওয়াছওয়াছা প্রসূত বলেই মনে হয়।

• অনেক লেখকের মনে তো শত-গ্রন্থ-প্রণেতা হওয়ার খাহেশ জাগে। ফলে যেনতেন করে লিখে তারা রাউন্ড ফিগার পূর্ণ করতে লেগে যান। এরূপ চিন্তায় আক্রান্ত লেখকরা যেমন তড়িঘড়ি করে লেখেন ফলে ভুল লেখেন, তেমনি বইয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোর জন্য অপূর্ণাঙ্গভাবেই অনেক বই শেষ করে ফেলেন। ভাল, উপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ লেখা থেকে বঞ্চিত করার জন্য এ-ও শয়তানের এক ওয়াছওয়াছা বৈ কি?

• আগের যুগের লেখকরা কমার্শিয়াল ছিলেন না। অর্থাৎ, তারা টাকা-পয়সা উপার্জনের উদ্দেশ্যে লিখতেন না। তাদের মধ্যে লেখার ক্ষেত্রে লিল্লাহিয়াত বেশি ছিল। ফলে তাদের মধ্যে অন্যের লেখা হুবহু নকল করার ইতিহাস তেমন দেখা যায় না। কিন্তু ইদানিং অনেক লেখক অতিমাত্রায় কমার্শিয়াল হয়ে ওঠায় যত বেশি লেখা হবে তত বেশি উপার্জন হবে—এই মনোভাব তাদের মধ্যে এসে গিয়েছে। ফলে এখন তারা অন্যের লেখা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা নকল করে যায়। আর ধরা পড়লে যেন গা বাঁচাতে পারে তার জন্য দুই একটা শব্দ মাঝে মধ্যে পাল্টে দিয়ে এই নকলগিরী চালিয়ে যায়। একজন রসিক মন্তব্য করেছিলেন, অনেক লেখক এখন আল্লাহকে খোদা বানিয়ে আর নবীকে রসূল বানিয়ে অন্যের লেখাকে নিজের লেখা বানিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন অন্যের লেখার মধ্যে সামান্য কিছু পরিবর্তন করে সেটাকে নিজের লেখা বানিয়ে ফেলা হয়। যেমন: সহজ পরিবর্তন হল আল্লাহ শব্দকে খোদা শব্দে আর নবী শব্দকে রসূল শব্দে রূপান্তর। শুনেছি অনেক লেখক অন্যের বই হুবহু কাউকে দিয়ে বা নিজেই কম্পোজ করে সেই কম্পোজকৃত কপির মধ্যে প্রুফ দেখার সময় এরকম দু' চারটে শব্দ পাল্টে দেন। ব্যস এরপরই সে বইটিকে অন্য একটা নাম দিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দেন। এমন নজিরও আমাদের সামনে রয়েছে—অন্যের বইয়ে দু' একটা শব্দ না পাল্টেও হুবহু পূর্ববৎ রেখেই শুধু বইটির ভিন্ন একটা নাম দিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আগের যুগের লেখকরাও চুরি করত বলে ইতিহাসে কম-বেশ তথ্য পাওয়া যায় কিন্তু তা এখনকার মত এমন পুকুরচুরি ছিল না মোটেই। এখনকার লেখকরা যে আরও কত রকম জালিয়াতি করে তার বর্ণনা শেষ করাও কঠিন। শুধু আর একটা ঘটনা উল্লেখ করেই এ বিষয়টা শেষ করছি। একবার একজন প্রকাশক তার প্রকাশিত একটা বইয়ের সম্পাদনার জন্য আমাকে বারবার অনুরোধ করায় সেটি সম্পাদনার কাজ শুরু করলাম। বইটি ছিল অনুবাদ। মূল আরবী গ্রন্থের সাথে মিলিয়ে দেখে সম্পাদনা করতে গিয়ে যা পেলাম তা হচ্ছে মূলের সঙ্গে অর্থের মিল তো দূরের কথা বহু নামের মধ্যে পর্যন্ত মিল নেই। তার চেয়ে আরও আশ্চর্য হলাম মূল বইয়ে যে লেখার কোনো পাত্তা পর্যন্ত নেই এমন বহু পৃষ্ঠা লেখা ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক চিন্তা করে বের করলাম এর রহস্যটা কি। রহস্য হল ফাঁকে ফাঁকে অনুবাদক নিজের অন্য লেখা ঢুকিয়ে দিয়ে বইটির কলেবর বৃদ্ধি করেছে। এই বৃদ্ধি করার মধ্যেই তার বৈষয়িক লাভ। বইয়ের ফর্মা যত বাড়বে তার বিলের পরিমাণও তো তত বাড়বে। কী আশ্চর্য! এমনতর জালিয়াতিও হয়? যাহোক শয়তান এখনকার লেখকদের এভাবে খেয়ানত ও চুরির ওয়াছয়াছা দিতে সাহস পাচ্ছে যে সাহস সে পূর্ববর্তী লেখকদের বেলায় পেত না—কারণ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এখনকার লেখকদের মধ্যে লেখার ক্ষেত্রে পূর্ববতীদের ন্যায় লিল্লাহিয়াত বিদ্যমান নেই। আল্লাহ তাআলা আমাকেসহ সকল লেখককে ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত দান করুন। আমীন!

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 “নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা” বইটি লেখার সময় ওয়াসওয়াসা

📄 “নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা” বইটি লেখার সময় ওয়াসওয়াসা


লেখকদের কী ধরনের ওয়াছওয়াছা হয়, তার কিছু বিবরণ এতক্ষণ প্রদান করা হল। এ ব্যাপারে আমি আমার “নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা” নামক এই বইটি লেখার সময় কি কি ওয়াছওয়াছার সম্মুখীন হয়েছিলাম তার কিছু বর্ণনা পেশ করছি, তাহলে লেখকদের কী কী ধরনের ওয়াছওয়াছা হয় তা আরও স্পষ্ট হবে। আমি যখন “নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা” বিষয়ে লেখা নিয়ে ভাবছিলাম। এ বিষয়ে কেন লিখব, কি কি প্রসঙ্গ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে, লেখার আংগিক কি হবে, উপস্থাপনভংগী কি হবে, কোন্ প্রসঙ্গ দিয়ে লেখার সূচনা করব—এসব নিয়ে ভাবছিলাম। ব্যস ভাবনা শুরু করতেই নফছ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

নফছ: এতসব লেখালেখি করে লাভ কী?
আমি: লাভ আছে। এ বিষয়ে লিখলে আশা করা যায় বহু মানুষ নফছ ও শয়তানের প্রতারণা কৌশল এবং নফছ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা করার পদ্ধতি সম্বন্ধে অবগত হতে পারবে। নফছ ও শয়তানের প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়ার পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারবে। নফছ ও শয়তানের প্রতারণা থেকে মুক্ত হয়ে ইবাদত-বন্দেগী ও ধর্ম-কর্মে বেশি অগ্রসর হতে পারবে।

নফছ: পূর্বেও তো এ শিরোনামে না হোক এর কাছাকাছি শিরোনামে অন্য অনেকে এ জাতীয় বিষয়ে লিখেছেন। তাতে কি নফছ ও শয়তানের প্রতারণা থেকে মানুষ রক্ষা পেয়েছে। আল্লামা ইবনুল জাওযী লিখেছেন "তাল্বীসে ইবলীস”, লিখেছেন "সাইদুল খাতির"। লেখা হয়েছে শয়তানের ডায়েরী, আরও কত কিছু। তাতে কি আগের চেয়ে ইবাদত-বন্দেগী ও ধর্ম-কর্মে মানুষ বেশি অগ্রসর হতে পেরেছে? নফছ ও শয়তান দ্বারা প্রতারিত হওয়ার পরিমাণ বা সংখ্যা কি আগের চেয়ে হ্রাস পেয়েছে?

আমি: হে শয়তান! দুআ করতে গেলেও তুমি এই যুক্তি দেখিয়ে থাক যে, এত দুআ করে লাভ কী? তুমি যা চাও তা তো পাও না! ওয়াজ-নসীহত করতে গেলেও তুমি এই যুক্তি দেখিয়ে থাক যে, এত ওয়াজ-নসীহত করে লাভ কী? মানুষ তো মানে না! তাই বলে কি তোমার যুক্তি মেনে আমরা আল্লাহর কাছে চাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি? ওয়াজ-নসীহত কি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে? কেউ কোন বিষয়ে বই-পত্র লেখার মনস্থ করলেও তুমি তার সামনে এই যুক্তি প্রদর্শন করে তাকে লেখা থেকে নিবৃত্ত করতে চাও, তার লেখা বন্ধ করে দেয়ার প্রয়াস চালাও যে, এত লেখালেখি করে লাভ কী? তাই বলে কি বই-পত্র লেখা বন্ধ রয়েছে? অতএব আমার এ লেখাও বন্ধ হবে না। তোমার বক্তব্য সঠিক নয়। দুআ করে লাভ কী— এ বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। আমি দুআতে যা চাই সবসময় হুবহু আমাকে তা প্রদান করা হয় না বলে কি দুআ করাটা একেবারেই বেকার? অনেক সময় তো যা চাওয়া হয় আল্লাহ তাআলা হুবহু তা-ই প্রদান করেন। আবার কখনও কখনও যা চাওয়া হয় সেটা দুআকারীর জন্য মঙ্গলজনক হবে না বিধায় যেটি তার জন্য মঙ্গলজনক হবে সেটিই আল্লাহ তাআলা প্রদান করে থাকেন। এতেই কি লাভ নয় যে, মঙ্গলজনকটিই পাওয়া গেল? আবার কখনও কখনও দুনিয়ার জন্য চাওয়া হলে আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়াতে না দিয়ে তার আখেরাতের জন্য সেটা রেখে দেন। এতেও তার জন্য মঙ্গল। কারণ, দুনিয়ারটা ক্ষণস্থায়ী, আখেরাতেরটি চিরস্থায়ী। এটাই তো বড় লাভ! অতএব যেভাবেই দুআ কবুল হোক না কেন সর্বাবস্থায়ই কল্যাণ। সুতরাং যেভাবে চাওয়া হয় সবসময় সেভাবে কবুল হয় না বলে দুআ করে কোন লাভ নেই— এ কথা বলা সর্বৈব ভ্রান্তিকর। ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশে কাজ হয় না— এ কথাও সঠিক নয়। মানুষ যা কিছু ধর্ম-কর্ম করছে তা তো ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশ শুনেই করছে। ছোট্ট থাকতে পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, বড় ভাই-বোন ও মুরব্বীগণ নসীহত উপদেশ করেছেন, ভাল হতে বলেছেন, গুরুজনকে মান্য করতে বলেছেন, নামায পড়তে বলেছেন, লেখা-পড়ায় মনোযোগ দিতে বলেছেন ইত্যাদি। এসব নসীহত-উপদেশ শুনেই তো আমরা যতটুকু পেরেছি তদনুযায়ী আমল করেছি এবং ভাল পথে অগ্রসর হয়েছি। এসব উপদেশ-নসীহত না শুনলে হয়তো এই ভাল পথে এতটুকু অগ্রসর হওয়া আদৌ সম্ভব হত না। মানুষ যতটুকু দ্বীনের পথে অগ্রসর হয় তার পশ্চাতে কোন না কোন আলেম বা দ্বীনদার ব্যক্তির নসীহত- উপদেশের ভূমিকা থাকে। অতএব ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশে লাভ কী— এ বক্তব্যও সঠিক নয়। বই-পত্র লেখা দ্বারাও ওয়াজ-নসীহতের ভূমিকা পালিত হয়ে থাকে। বই-পত্র লেখা দ্বারাও দাওয়াত ও তাবলীগের ভূমিকা পালিত হয়ে থাকে। আরবীতে প্রবাদ আছে القلم أحد اللسانين. অর্থাৎ, কলম হল দুই জবানের একটি। অতএব বই-পত্র লিখে লাভ কী— এ বক্তব্যও সঠিক নয়। "তাল্বীসে ইবলীস", "সাইদুল খাতির", "শয়তানের ডায়েরী” প্রভৃতি বইয়ের ওছীলায় নফছ ও শয়তান দ্বারা প্রতারিত হওয়ার পরিমাণ আগের চেয়ে হ্রাস পায়নি তা কীকরে নিশ্চিতভাবে বলা যায়? এগুলো লেখার পূর্বে ইসলামী বই-পত্র পাঠকদের মধ্যে যে হারে লোক নফছ ও শয়তান দ্বারা প্রতারিত হত এখন অন্তত তাদের মধ্যেও সে হার হ্রাস পায়নি তা কি কেউ জরিপ করে দেখেছে? এগুলো পাঠ করা দ্বারা যে কয়জন পাঠক নফছ ও শয়তানের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেয়েছে এগুলো লেখা না হলে সে কয়জন তো প্রতারিতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হত। এগুলো লেখা দ্বারা অন্তত তাদের সংখ্যা প্রতারিতদের তালিকা থেকে হ্রাস পেয়েছে। অতএব নিশ্চিতভাবে বলা যায় এগুলো লেখা দ্বারা লাভই হয়েছে। বস্তুত লেখালেখি কোন অবস্থাতেই বেকার নয়। লেখালেখি দ্বারা কিছু না কিছু লাভ হয়েই থাকে। সুতরাং আমি তোমার এ কথায় লেখা থেকে নিবৃত্ত হব না। আমি আমার এ কাংখিত লেখা সম্পন্ন করার চেষ্টা করেই যাব ইনশাআল্লাহ!

নফছ: ঠিক আছে লিখতে পারেন। তবে পূর্বের চেয়ে আপনার ব্যস্ততা এখন অনেক বেড়ে গেছে। একটা সুন্দর লেখা দাঁড় করানোর জন্য যে পরিমাণ সময় ও এনার্জি দিতে হয় তা কি এখন আপনি দিতে পারবেন? না পারলে যেনতেনভাবে লেখা সম্পন্ন করবেন, এতে লেখার জগতে আপনার গুডউইল নষ্ট হয়ে যাবে, পাঠক মহলে আপনার সুনাম হ্রাস পাবে। ভেবে দেখুন। ভেবে-চিন্তে পদক্ষেপ নেয়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ।

আমি: বুঝলাম এটাও শয়তানের একটা কৌশল। যখন কোন লোক কোন নেক কাজের ইচ্ছা করে, তখন শুরুতে শয়তানের প্রচেষ্টা থাকে সে কাজটি যেন লোকটা শুরুই করতে না পারে। অবশেষে যখন সে লোক কাজটি করারই সংকল্পে উপনীত হয়, তখন শয়তানের প্রচেষ্টা থাকে যেন সে কাজের মধ্যে রিয়া এসে যায়, ইখলাস আসতে না পারে। তাই আমি বুঝলাম আমার পূর্বের লেখা বই-পত্রের গুডউইলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং পাঠক মহলে আমার সুনামের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে একদিকে শয়তানের চেষ্টা হল আমার এই নতুন লেখাটিও যেন গুডউইল রক্ষার উদ্দেশ্যে ও সুনাম অর্জনের নিয়তে হয়ে যায় এবং এভাবে আমার এই নতুন রচনাকর্মে শুরু থেকেই রিয়া এসে যায়, কর্মটি ইখলাস-শূন্য হয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে পূর্বের রচনাকর্মের মধ্যে ইখলাস থেকে থাকলে সেই ইখলাসও যেন নষ্ট হয়ে রিয়া সে স্থান দখল করে নেয়। আর ব্যস্ততার যে দিকটা তুলে ধরা হয়েছে, তা এ কাজের প্রতিবন্ধক কোথায়? আমার ব্যস্ততার সিংহভাগ তো এই লেখালেখি ও রচনা নিয়েই।

নফছ: তাহলে আপনি ইখলাসের সঙ্গেই কাজ শুরু করুন। আল্লাহর শোকর আদায় করুন। আপনার মধ্যে ইখলাস এসে গেছে।

আমি: মনে মনে ভাবলাম আলহাম্দু লিল্লাহ! শয়তানের প্ররোচনা উপেক্ষা করে ইখলাসের সঙ্গেই কর্মটি শুরু করতে যাচ্ছি। কিন্তু এ-ও বুঝলাম শয়তান সম্পর্কে যা শুনেছি যথার্থই শুনেছি। বুযুর্গানে দ্বীনের বাচনিক আমরা শুনেছি, যখন কেউ কোন নেক কাজ শুরু না করার শয়তানী ওয়াছওয়াছা উপেক্ষা করে এবং রিয়ার চেতনাকে প্রতিহত করে কাজ শুরুই করে দেয়, তখন শয়তান তার মনে ইখলাস এসে যাওয়ার চিন্তা এনে দেয়। এভাবেও সে ইখলাস নষ্ট করে দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে থাকে। কেননা, প্রকৃত ইখলাস হল সম্পূর্ণ আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাজ করা। ইখলাস আসল কি আসল না— এই চিন্তাও না থাকা। কেননা, ইখলাস এসে গেছে অর্থাৎ, রিয়া দূর করতে পেরেছি, শয়তানী ওয়াছওয়াছাকে প্রতিহত করতে পেরেছি— এই চিন্তাও এক ধরনের গায়রুল্লাহর চিন্তা তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর চিন্তা। এটাও কিছুটা রিয়া বিজড়িত চিন্তা। তাই ইখলাস এসেছে কি না— এদিকেও খেয়াল না দেয়া চাই। খেয়াল থাকা চাই সর্বতোভাবেই আল্লাহর প্রতি, চিন্তা থাকা চাই পূর্ণটাই আল্লাহ কেন্দ্রিক। এটাই হল নির্ভেজাল ও নিরংকুশ ইখলাস। এ জন্যই জনৈক বুযুর্গ বলেছেন, “পূর্ণাঙ্গ ইখলাস হল ইখলাসের চিন্তাও না থাকা।” বুঝলাম আমার কর্মে ইখলাস এসে গেছে, অর্থাৎ, আমি মুখলিস তথা ইখলাসের অধিকারী হয়ে গেছি— এ চিন্তাও শয়তানের প্রক্ষিপ্ত একটা চিন্তা। এটাও শয়তানের শেখানো নফসের একটা কথা।

নফছ: ঠিক আছে নফসের সব কথাই আপনি উপেক্ষা করতে পারলেন। এখন লিখুন। আমার কথায় না হোক নিজের ইচ্ছায়ই লিখুন এবং ভালভাবেই লিখুন। আপনি ইচ্ছা করলে ভালভাবেই লিখতে পারবেন। ভাল করে লেখার যোগ্যতা আপনার মধ্যে আছে।

আমি: এটাও একটা শয়তানী কথা। আমার মধ্যে মোটেই কোন যোগ্যতা নেই, বাহ্যিক দৃষ্টিতে ছিটেফোটা কিছু আছে বলে মনে হলেও তাতে আমার কোন কৃতিত্ব নেই। আমার অল্প-বিস্তর কিছু লেখা কতক মানুষের কাছে ভাল বলে গৃহীত হয়ে থাকলেও তা আমার যোগ্যতায় হয়নি, আল্লাহর রহমতেই হয়েছে। এ সবকিছুর জন্য অহংকার বা গর্ববোধ নয় বরং আল্লাহর শোকর। বুঝলাম শয়তান আমার যোগ্যতার কথা তুলে ধরে আমাকে আত্মম্ভরী করে তোলার চেষ্টা করছে, এই নতুন রচনা কর্মে আল্লাহর উপর ভরসার কথা এবং আল্লাহ থেকে রহমত কামনা করার কথা বিস্মৃত হয়ে নিজের যোগ্যতার উপর ভর করে চলার মত বিকৃত মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ করছে। হে আল্লাহ! আমরা যেন আত্মম্ভরিতায় মাথা উঁচু করতে প্ররোচিত না হই, তাওয়াজু ও বিনয়ে মাথা অবনত করে তোমার দাসত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে যেন উদ্বুদ্ধ হই।

ভিতর থেকে একটা কথা এল— শয়তানের সব প্রক্ষেপন উপেক্ষা করে এ লেখাটির জন্য সংকল্পই করে নিলাম। তবে ভাবনা এল কি জানি এই সংকল্পের পেছনেও শয়তানের দখল রয়েছে কি না। কারণ, এ লেখাটি শুরু করলে ৫-৬ খণ্ডে সমাপ্ত করার পরিকল্পনায় যে "ইসলামী ইতিহাস" সংকলনের কাজে হাত দিয়েছি, সেই সঙ্গে শুরু করেছি "ইসলামী ভূগোল ও মানচিত্রাবলী”—এর কাজ। এ লেখার পেছনে সময় ব্যয় করলে সেই গুরুত্বপূর্ণ রচনা ও সংকলনের কাজ দুটো পিছিয়ে যাবে না তো? তাহলে এখন কোন্টাকে প্রাধান্য দিব? কোন্টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কোন্টার ফায়দা বেশি, কোন্টা আগে করা চাই, কোন্টা পরে করা চাই? নাকি সবগুলোই একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া চাই?

একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্নবোধক চিহ্ন! সিদ্ধান্ত গ্রহণে দিশেহারা হওয়ার মত অবস্থা। সবটাই যখন ভাল মনে হচ্ছে তখন কোন্টাকে প্রাধান্য দিব? সবটাই যখন গুরুত্বপূর্ণ ও ফায়দাজনক মনে হচ্ছে, তখন তুলনামূলক ভাবে কোন্টার গুরুত্ব বা ফায়দা বেশি তা নির্ণয় করা কি এত সহজ? এক এক প্রেক্ষিতে এক একটার গুরুত্ব ও ফায়দা কম বেশি বিবেচিত হয়ে থাকে। এই প্রেক্ষিতগুলোর মধ্যকার তারতম্য পরিমাপ করা কি গজ ফিতা দিয়ে পরিমাপ করার মত সহজ? এমতাবস্থায় কোন্ সিদ্ধান্তে উপনীত হব? মনে হল আমি এখন দিশেহারা পরিস্থিতির শিকার। সত্যিই নফছ ও শয়তানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অনেক সময়ই এরকম দিশেহারা হয়ে যেতে হয়। অনেক সময় একারণেও দিশেহারা হয়ে যেতে হয় যে, কোন্টা নফছ ও শয়তানের কথা আর কোন্টা বুদ্ধি-বিবেকের ফয়সালা তা পার্থক্য করা জটিল হয়ে পড়ে। বুযুর্গানে দ্বীন বলেন, এরূপ মুহূর্তে সচেতন দ্বীনী মুরব্বী থেকে মাশওয়ারা গ্রহণ পূর্বক আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে যে কোন একটা পদক্ষেপ নিয়ে অগ্রসর হতে হয় কিংবা সবটা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলে সবটাই চালিয়ে যেতে হয়। সেমতে আমি তাওয়াক্কুলান আলাল্লাহ (আল্লাহর উপর ভরসা করে) উভয় কাজই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বিশেষত এ লেখাটি শুরু করার ব্যাপারে মুরব্বীর মাশওয়ারা যেখানে রয়েছেই। বিগত (১৪৩০ হিজরী মুতাবেক ২০০৯ খৃষ্টাব্দ) হজ্জের সফরে মক্কার মসজিদে হারামের আন্ডারগ্রাউন্ডে বসে হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের সামনে এ লেখা সম্বন্ধে পরিকল্পনা পেশ করলে তিনি আশু এ লেখাটি শুরু করে দেয়ার ব্যাপারে আমাকে জোর মাশওয়ারা দিয়েছিলেন। আমি তাঁকে দ্বীনী ও ইল্মী বিষয়ে মুরব্বী পর্যায়েরই ব্যক্তিত্ব মনে করি। যাহোক এসব কিছুর প্রেক্ষিতে আমি অন্যান্য লেখা ও রচনার সঙ্গে সঙ্গে এ লেখাটিও চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম।

ভিতর থেকে আরও একটা কথা এল— আপনি খুবই সতর্ক মানুষ। শয়তানের সব ধোঁকাই বুঝতে পারেন এবং যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সতর্কতা না থাকলে আপনি এত সুক্ষ্ম ওয়াছওয়াছা বুঝতে পারতেন না, ওয়াছওয়াছার শিকার হয়ে পড়তেন, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম হতেন না। সতর্কতাই আপনাকে রক্ষা করেছে।

বুঝলাম এ-ও একটা শয়তানী কথা। সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে এবং শয়তানের প্রতারণার ব্যাপারে সদাসর্বদা সতর্ক থাকার হুকুমও রয়েছে, কিন্তু শুধু সতর্কতা দ্বারাাই রক্ষা পাওয়া যায় না, যদি না আল্লাহ তাআলা তাঁর খাস রহমতে আমাদেরকে রক্ষা করেন। অতএব সতর্কতা দ্বারাই রক্ষা পেয়ে গেছি— এটা শয়তানী কথা। মনে পড়ে গেল এক বুযুর্গের একটা ঘটনা। একবার সে বুযুর্গের কাছে শয়তান আসল। বুযুর্গ দেখলেন উপরে শূন্যে বিরাট এক আসনে এক মহা বুযুর্গের আকৃতি নিয়ে একজন বসে আছেন। তিনি সে বুযুর্গকে সম্বোধন করে বলছেন, আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেছি! তোমার আর ইবাদত করার প্রয়োজন নেই।” এ ছিল শয়তান। উক্ত বুযুর্গ সঙ্গে সঙ্গে পড়ে উঠলেন "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"। এবং বললেন, দুনিয়ার চোখে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। কাজেই তুমি শয়তান। তখন শয়তান বলল, তোমার ইল্ম তোমাকে রক্ষা করেছে। বুযুর্গ বললেন, এটাও শয়তানী কথা। ইলম রক্ষা করতে পারে না, রক্ষা করেন আল্লাহ তাআলা। কোন সাধারণ মানুষ হলে মনে করত স্বয়ং আল্লাহ তাআলা উপস্থিত হয়ে এরকম বলছেন, আমি তো কামেল হয়ে গেছি! এভাবে সে ধোঁকা খেত। কিন্তু উক্ত বুযুর্গ বুঝলেন এটা শয়তান। তাই তিনি "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পড়ে শয়তানকে তাড়িয়ে দিলেন।

আমারও মনে হল এখন "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বা শয়তানকে তাড়াবার প্রসিদ্ধ বাক্য— "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম" পড়ে নেই। তদুপরি লেখালেখির এ প্রসঙ্গটা নিয়ে দীর্ঘদিন নফছ ও শয়তানের সঙ্গে বাহাছ চলছে। আর কতদিন নফছ ও শয়তানের সঙ্গে বাহাছ করে কালক্ষেপন করব। নফছ ও শয়তান এভাবে কথা এবং চিন্তার আবর্তে ফেলেও কালক্ষেপন করিয়ে নেক কাজ শুরু করাতে বিলম্ব ঘটিয়ে থাকে। কাজেই কালক্ষেপন করে শয়তানের আনুকূল্য না করা চাই।

কেউ যখন সব রকম ওয়াছওয়াছা ঝেড়ে ফেলে কোন নেক কাজ শুরু করবে বলেই স্থির করে নেয়, তখন সেটা শুরু করাতে বিলম্ব ঘটাতে পারলে শয়তান কিছুটা শান্ত্বনা বোধ করে এই ভেবে যে, কিছুক্ষণের জন্য হলেও তো তাকে কাজটা থেকে বিরত রাখতে পারলাম! আমার এ ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে না তো? অতএব এই বাহাছের আবর্তে পড়ে আর কালক্ষেপন নয়। আমাকে এই কালক্ষেপনের চক্কর থেকে উঠে এসে কাজ শুরু করতে হলে এখনই শয়তানকে তাড়িয়ে দিয়ে কাজ আরম্ভ করে দিতে হবে। প্রয়োগ করলাম শয়তানকে তাড়াবার সেই প্রসিদ্ধ অস্ত্র। যে অস্ত্র ব্যবহারের শিক্ষা দেয়া হয়েছে কুরআনে কারীমের নিম্নোক্ত আয়াতে—
وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
অর্থাৎ, যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোন উস্কানী তোমাকে পেয়ে বসে, তাহলে আল্লাহর কাছে (শয়তান থেকে) পানাহ চাও। (যেমন— পাঠ কর আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম। তাহলে শয়তান ভেগে যাবে।) আল্লাহ সবই শোনেন সবই জানেন। (সূরা হা মীম আস-সাজদাহ: ৩৬)

পাঠ করলাম " আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম"। শয়তান ভেগে গেল। সহযোগীর আকস্মিক অন্তর্ধানে নফছও আপাতত ভ্যাবাচাকা খেয়ে থেমে গেল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px