📄 ওয়ায়েজদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়
আমার ঘনিষ্ট এক ওয়ায়েজকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওয়াজের ব্যাপারে নফস্ ও শয়তান আপনাদেরকে কী বলে ধোঁকা দিয়ে থাকে? তিনি বেশ সরল মানুষ। বলে ফেললেন, আমার একটা বিশেষ ধোঁকা এই হয়, এমনভাবে ওয়াজ করতে হবে যেন শ্রোতারা নারায়ে তাকবীর দিয়ে ওঠে, শ্লোগান দিয়ে ওঠে। আর এক ওয়ায়েজ তো একদিন কথা প্রসঙ্গে অকপটে বলেই ফেললেন, কোন্ ধরনের কি কি কথা বললে শ্রোতারা নারায়ে তাকবীর দিয়ে উঠবে তা আমার রপ্ত হয়ে গেছে। এ তো গেল ওয়ায়েজদের বিশেষ একটা ওয়াছওয়াছার কথা। এছাড়া কিছু কমন ওয়াছওয়াছা যা ওয়ায়েজদের সাধারণত হয়েই থাকে, তার মধ্যে রয়েছে—
• ওয়াজের মধ্যে আন-কমন কিছু অর্থাৎ নতুন কিছু বলা চাই যা অন্যরা বলে না, হোক না তা ভিত্তিহীন বা মওজু রেওয়ায়েত। এই নতুনত্বের খাহেশে বাজারী ওয়ায়েজরা যে কতসব ভিত্তিহীন কথাবার্তা বা মওজু রেওয়ায়েত বয়ান করে থাকেন তার কোন ইয়ত্তা নেই। বিজ্ঞ আলেমগণ তা শুনে শুধু হতবাকই হয়ে থাকেন। চোখ মোটা করে মনে মনে শুধু বলেন, ব্যাটারা বলে কি!
এই ওয়াছওয়াছা থেকে বাঁচার জন্য ওয়ায়েজদের মনে রাখতে হবে মওজু হাদীছ বয়ান করা কঠিন গোনাহ। প্রসিদ্ধ হাদীছ রয়েছে— রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, «مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأُ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.» (متفق عليه) অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা সম্পৃক্ত করবে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা নির্ধারণ করে রাখে। (বোখারী ও মুসলিম)
• ওয়ায়েজদের আর একটা কমন ওয়াছওয়াছা এই হয়ে থাকে— মানুষকে হাসাতেও হবে কাঁদাতেও হবে, তাহলে তার ওয়াজের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়বে। ওয়ায়েজগণ মনে করতে পারেন এটা কোন ওয়াছওয়াছা নয়, পাবলিকই তো চায় এমন ওয়াজ হোক যাতে আনন্দ লাগবে আবার মন গলে কান্নাও আসবে। এভাবে মনে আছর ভাল হবে। পাবলিক এটা চায় আর তাদের চাহিদা পূরণ করার জন্য ওয়ায়েজদের মনে আল্লাহই এরূপ ঢেলে দেন, এটা কোন ওয়াছওয়াছা নয়। কিন্তু এভাবে যখন নিজের ওয়াজের আকর্ষণ বাড়ার চিন্তা মনে জাগে তখন সেটা ওয়াছওয়াছা বৈ কি? যাহোক ওয়ায়েজদের কমন ওয়াছওয়াছার বিষয়গুলো বলছিলাম।
• ওয়ায়েজদের কমন ওয়াছওয়াছার মধ্যে আরও রয়েছে ওয়াজের মেইন সময়ে অর্থাৎ, যখন শ্রোতাদের সমাগম বেশি হয় তখন সময় না দেয়া হলে অবমূল্যায়ন হচ্ছে ভেবে মন মুষড়ে যাওয়া। এই ওয়াছওয়াছা থেকে বাঁচার জন্য ওয়ায়েজদেরকে ইখলাসের চেতনা জাগ্রত করতে হবে। বরং নফসের সাথে বিরোধিতা করার নিয়তে মাঝে মধ্যে লোক সমাগম যখন কম হয় ইচ্ছাকৃতভাবে সে সময় বয়ান করে নফ্সকে শিক্ষা দিতে হবে।
• ওয়ায়েজদের কমন ওয়াছওয়াছার মধ্যে আরও রয়েছে প্রচারপত্রে বা ঘোষণায় তার নামের শুরুতে প্রধান অতিথি বা প্রধান আকর্ষণ ইত্যাদি লেখা বা বলা না হলে মন খারাপ হয়ে যাওয়া। অনেক সময় এ কারণে সেই প্রোগামে যাওয়া থেকে বিরত থাকা হয়। এ কারণে ওয়াজের আয়োজকগণ—যারা ওয়ায়েজদের দাওয়াত দেন, ব্যবস্থাপনা করেন তারা—ও কম বিপাকে পড়েন না। প্রত্যেক ওয়ায়েজই যখন চান তার নামের শুরুতে প্রধান অতিথি বা এরকম কিছু লেখা হোক, তখন আয়োজকরা কয়জনের নামের শুরুতে একই উপাধি লাগাবেন? তাই তারা গবেষণা করে অনেকগুলো উপাধি বের করে সেমতে কারও নামের শুরুতে প্রধান অতিথি, কারও নামের শুরুতে বিশেষ অতিথি, কারও নামের শুরুতে প্রধান বক্তা, কারও নামের শুরুতে বিশেষ বক্তা, কারও নামের শুরুতে প্রধান আকর্ষণ, কারও নামের শুরুতে বিশেষ আকর্ষণ, কারও নামের শুরুতে প্রধান আলোচক, কারও নামের শুরুতে বিশেষ আলোচক ইত্যাদি লাগানো শুরু করেছেন। মানে অতিথি শব্দের সাথে কখনও প্রধান লাগানো কখনও বিশেষ লাগানো। কিংবা বক্তা শব্দের সাথে কখনও প্রধান কখনও বিশেষ লাগানো। অথবা আকর্ষণ শব্দের সাথে কখনও প্রধান কখনও বিশেষ লাগানো। কিংবা আলোচক শব্দের কখনও প্রধান কখনও বিশেষ লাগানো। এভাবে আটজন বক্তাকে সন্তুষ্ট করার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ১. প্রধান অতিথি, ২. বিশেষ অতিথি, ৩. প্রধান বক্তা, ৪. বিশেষ বক্তা, ৫. প্রধান আকর্ষণ, ৬. বিশেষ আকর্ষণ, ৭. প্রধান আলোচক, ৮. বিশেষ আলোচক। যদিও এই অতিথি, বক্তা ও আলোচক এবং প্রধান ও বিশেষ—এর মধ্যে ঠিক কতটুকু তফাৎ তার মাথামুণ্ডু হয়তো আজও কারও ভাল করে বুঝে আসেনি। তবুও বলা যায় আয়োজকরা এগুলো করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন অন্তত ওয়ায়েজগণ যাতে না-খোশ না হন। তারা না-খোশ হলে যে আবার ওয়াজ জমবে না, তাহলে ব্যবস্থাপকদের সুনাম হবে কীকরে? মানুষ বলবে, কী ওয়ায়েজ এনেছে, ওয়াজ জমেনি! এটা আয়োজকদের অদক্ষতা। কিংবা ওয়াজ না জমলে তাতে ব্যবস্থাপকদের কালেকশনের টার্গেট যদি পূরো না হয়! তাই ওয়াজ জমানোর চিন্তায় আয়োজকরাই এমন হাসানো কাঁদানো ওয়ায়েজদের সন্ধান করে থাকেন। এ চিন্তা থেকেই ওয়ায়েজদের খুশি করার জন্য তারা তৎপর থাকেন। সবার উদ্দেশ্যেই থাকতে পারে ঘুণ। ওয়াছওয়াছামুক্ত নয় কেউই। ওয়ায়েজগণ উলামায়ে কেরামের জামাআতভুক্তই হয়ে থাকবেন, তাই তারা এসব ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা কীভাবে করবেন, তা তাদের জানা থাকারই কথা। সহজ উপায় হল—মাঝে মধ্যে আয়োজকদের বলে দিবেন, আমার নামের সাথে এসব কিছু লেখা বা বলা যাবে না।
• কোন কোন ওয়ায়েজ বা উপদেশদাতার এই ওয়াছওয়াছা হয় যে, ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশে লাভ কী? ওয়াজ-নসীহতে তো কাজ হয় না, মানুষ তো মানে না। এই ওয়াছওয়াছার প্রতিকার হল এই চিন্তা করা যে, ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশে কাজ হয় না— এ কথা সঠিক নয়। মানুষ যা কিছু ধর্ম-কর্ম করছে তা তো ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশ শুনেই করছে। ছোট্ট থাকতে পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, বড় ভাই-বোন ও মুরব্বীগণ নসীহত উপদেশ করেছেন, ভাল হতে বলেছেন, গুরুজনকে মান্য করতে বলেছেন, নামায পড়তে বলেছেন, লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে বলেছেন ইত্যাদি। এসব নসীহত উপদেশ শুনেই তো আমরা যতটুকু পেরেছি তদনুযায়ী আমল করেছি এবং ভাল পথে অগ্রসর হয়েছি। এসব উপদেশ-নসীহত না শুনলে হয়তো এই ভাল পথে এতটুকু অগ্রসর হওয়া আদৌ সম্ভব হত না। মানুষ যতটুকু দ্বীনের পথে অগ্রসর হয় তার পশ্চাতে কোন না কোন আলেম বা দ্বীনদার ব্যক্তির নসীহত-উপদেশের ভূমিকা থাকে। অতএব ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশে লাভ কী— এ বক্তব্য সঠিক নয়।
• আল্লামা ইবনুল জাওযী "তালবীছে ইবলীছ" কিতাবে বলেছেন, কতক ওয়ায়েজের ওয়াছওয়াছা হয় তারা কৃত্রিমভাবে কাঁদে। মানুষকে দেখায় যে, তাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে বিগলিত, অথচ তাদের অন্তর পাথরের মত শক্ত। (এই ওয়াছওয়াছা থেকে পরিত্রাণের জন্য তাকে মনে রাখতে হবে) এরূপ কৃত্রিমতার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।
• আল্লামা ইবনুল জাওযী "তালবীছে ইবলীছ" কিতাবে আরও বলেছেন, কতক ওয়ায়েজ ওয়াজের মজলিসে ইলমে মারেফাতের সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বিষয় ও ইঙ্কে ইলাহীর বয়ান শুরু করে দেয় আর শয়তানের ওয়াছওয়াছায় মনে মনে ভাবে আমি তো বহু উপরের মাকামে পৌঁছে গেছি। নতুবা এমনসব কথা আমার মুখ থেকে কীভাবে বের হচ্ছে! তাদেরকে মনে রাখতে হবে মুখে বলা আর প্রকৃতপক্ষে মাকামে পৌঁছা এক নয়। এটা শয়তানের ধোঁকা।
• আল্লামা ইবনুল জাওযী "তালবীছে ইবলীছ" কিতাবে আরও বলেছেন, কতক ওয়ায়েজ মর্যাদা মোহের শিকার হয়ে পড়ে। এর আলামত হল তার পরিবর্তে যদি অন্য কেউ ওয়াজ করতে চায় তাহলে সে তা অপছন্দ করে। (এই ওয়াছওয়াছা দূর করার জন্য তাকে ভাবতে হবে তার মধ্যে ইখলাসের অভাব রয়েছে।) সে যদি মুখলেস হত এবং মানুষের ইসলাহ ও সংশোধনই তার উদ্দেশ্য হত, তাহলে যে কেউ এ কাজ করুক তাতে সে সন্তুষ্ট থাকত।
📄 ইমাম ও খতীবদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়
ইমাম ও খতীব সাহেবগণ জুমুআর দিন, ঈদের দুই দিন, শবে বরাত, শবে কদর ইত্যাদি উপলক্ষে ওয়াজ বা বয়ান করে থাকেন। তাই ওয়াজের ব্যাপারে ওয়ায়েজদের যে জাতীয় ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে ইমাম ও খতীবদেরও সে জাতীয় ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে। যার বিবরণ ইতিপূর্বে দেয়া হয়েছে। সেগুলো ছাড়াও ইমাম ও খতীব হিসেবে তাদের কিছু খাস ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে। যেমন:
• মসজিদ কমিটির লোকজনকে স্যার স্যার করে চলতে হবে, তাতে আলেম হিসেবে যে গায়রত তথা আত্মমর্যাদা রক্ষা করে চলা উচিত ছিল তা বিসর্জিত হলেও। মনে করে চাকরি ঠিক রেখে সবকিছু!
• কোন তিক্ত সত্য বা কারও গায়ে লাগে এমন মাসআলা বলার প্রয়োজন থাকলেও তা বিশেষ বিশেষ লোকের চেহারার দিকে তাকিয়ে না বলা, পাছে যদি তারা আবার অসন্তুষ্ট হয়ে যান আর চাকরিতে আঘাত আসে!
• চাকরি রক্ষার জন্য এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মা বৌদের সঙ্গে খাতির রেখে চলা এবং খালাম্মা কেমন আছেন? ভাবি ভাল আছেন তো?—সবই শয়তানের ওয়াছওয়াছা।
• বিশিষ্ট ব্যক্তিদের খুশি রাখার জন্য ঠেকায় বে-ঠেকায় খুব আবেগের সাথে তাদের নাম নিয়ে নিয়ে দুআ করা।
• যা বেতন পাওয়া যায় তা দিয়ে সংসার চলে না— এই অজুহাতে, কিংবা বাড়তি সঞ্চয়ের চিন্তায় প্রচলিত মীলাদ, কুলখানী, চল্লিশা, মৃত্যুবার্ষিকী ইত্যাদি বেদআত জানা সত্ত্বেও করা। জায়েয পন্থায় যতটুকু উপার্জন হয় তাতে তুষ্ট না থাকা। ইত্যাদি।
এগুলো সবই শয়তানের ওয়াছওয়াছা। সঠিক পন্থায় থেকে নিজের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার পরও যদি চাকরি চলে যায়, তাহলে সেই চাকরির পরওয়া না করা চাই। আল্লাহর উপর ভরসা করা চাই। এটাই তো হল তাওয়াক্কুল। আর হালাল পন্থায় যা উপার্জন হয় তাতেই তুষ্ট থাকা চাই। একেই বলে কানাআত। রিযা বিল কাযা তথা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি থাকলে, তাকদীরে যথাযথ বিশ্বাস থাকলে হালাল পন্থায় সীমাবদ্ধ না থেকে হারাম পন্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেতনা জাগ্রত হতে পারে না। এসব চেতনা শয়তানের ওয়াছওয়াছা থেকেই সৃষ্টি হয়ে থাকে। অতএব কোনো রূপ তাবীল বা অপব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে এগুলোকে শয়তানের ওয়াছওয়াছাই গণ্য করা চাই।
এ কথা সত্য যে, হালাল পন্থার চাকরিকে নিজের হেলায় নষ্ট করা ঠিক নয়। হালাল পন্থায় উপার্জনের সুযোগ আল্লাহর এক নেয়ামতও বটে। আর আল্লাহর কোন নেয়ামতকে অবমূল্যায়ন করা ঠিক নয়। এরূপ চাকরি রক্ষার জন্য বৈধ পন্থায় হেকমত অবলম্বন করে চলাও নিষেধ নয় বরং তা কাম্য। কিন্তু বুঝতে হবে আলেম হিসেবে যে আত্মমর্যাদা রক্ষা করে চলা উচিত তা বিসর্জন দেয়ার নাম হেকমত নয়। কারও চাটুকারিতার নাম হেকমত নয়। চাকরি রক্ষার জন্য শরীয়ত লঙ্ঘনের নামও হেকমত নয়। প্রয়োজনের মুহূর্তে সঠিক মাসআলা—এমনকি কারও বিরুদ্ধে গেলেও তা— বলা কর্তব্য। অবশ্য তা কৌশলে এবং হেকমতের সাথেই বলা কাম্য। কিন্তু কোন অবস্থাতেই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়া হেকমত নয়।
📄 পীর সাহেবদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়
পীর সাহেবরা মানুষকে শয়তানের ওয়াছওয়াছার ব্যাপারে সতর্ক করেন, ওয়াছওয়াছা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেন, কিন্তু স্বয়ং পীর সাহেবরাও ওয়াছওয়াছা থেকে মুক্তি পান না। তাদেরকেও নফছ ও শয়তান নানান রকম ওয়াছওয়াছা দিয়ে থাকে এবং শয়তান তাদের প্রতি বেশি ক্ষুব্ধ থাকার কারণে তাদেরকে একটু বেশি কঠিন ওয়াছওয়াছাই দিয়ে থাকে। পীর সাহেবদের ব্যক্তিত্ব এবং পজিশন ভেদে মোটামুটি তাদের যেসব ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে, তার মধ্যে রয়েছে—
• আমার কাছে বড় বড় মালদাররা মুরীদ হলে হাদিয়া-তোহফা বেশি পাওয়া যেত।
• সমাজ ও রাষ্ট্রের বড় বড় পদের লোকেরা যদি আমার মুরীদ হত তাহলে আমার দাপট বৃদ্ধি পেত, তাদের দ্বারা অনেক কাজ নিতে পারতাম। লোকেরা বুঝত হুজুরের অনেক ক্ষমতা।
• বড় বড় আলেমরা যদি আমার মুরীদ হত তাহলে লোকেরা বুঝত হুজুর অনেক বড় আলেম ও কামেল লোক, নইলে কি এত বড় বড় আলেম হুজুরের মুরীদ হত।
• মনে মনে এই কামনা জাগা যে, মুরীদরা যদি আমাকে ওলিয়ে কামেল, গাওছ, কুতুব ইত্যাদি বড় বড় খেতাব প্রদান করত! কোন দুআ কবুল হলে বা তাবীজ ঝাড়-ফুঁকে কাজ হলে কিংবা ঘটনাচক্রেও ভবিষ্যত বিষয়ক কোন কথা অনুযায়ী কিছু ঘটলে মনে এই কামনা জাগা যে, মুরীদরা যদি এটাকে আমার কামালিয়াত বা কারামত হিসেবে মূল্যায়ন করত!
• আমার মুরীদের সংখ্যা যদি সবার চেয়ে বেশি হত। সারা দেশের মানুষ বলত, অমুকের মুরীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
• শুধু দেশে নয় বিদেশেও যদি কিছু মুরীদ থাকত, তাহলে বিদেশেও প্রোগাম হত, তাহলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পীর আখ্যায়িত হতাম। লোকেরা বুঝত এবং বলাবলি করত, সারা পৃথিবীতে হুজুরের ভক্ত মুরদান ছড়িয়ে আছে।
• যেখানেই যাই দলে দলে ভক্ত মুরীদরা যদি আমার আশে পাশে থাকত, তারা বিনয়ের সাথে কেউ জুতো সোজা করত, কেউ লাঠি নিয়ে আগাত, কেউ ফাই-ফরমায়েশ খাটত ইত্যাদি, তাহলে আমার পীরালির বড়ত্ব ফুটে উঠত।
• কথায় কথায় কেঁদে ফেলা চাই, মুনাজাতে কান্দা চাই, মানুষকে কান্দানো চাই, মাঝে মধ্যে সজোরে "আল্লাহ" বলে খোদাভীতি প্রকাশ করা চাই যাতে মুরীদরা আমাকে খোদাভীতি তাড়িত, সর্বক্ষণ আখেরাতের ফিকিরওয়ালা বুযুর্গ মনে করে।
• এগুলো ছাড়াও ওয়াজ-নসীহত করার সময় ওয়ায়েজদের মনে যেসব ওয়াছওয়াছা হয়, পীর সাহেবদের মনেও ওয়াজ-নসীহত করার সময় সেসব ওয়াছওয়াছা হতে পারে, হয়ে থাকে।
📄 মুসান্নিফ বা লেখকদের যেসব ওয়াসওয়াসা হয়
মুসান্নিফ বা লেখকদের মনে যেসব ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে তার কিছু বিবরণ শুনুন।
• লেখার শুরুতেই মনে হয় আমার এই বইটি বাজারে ভাল চললে আমার প্রচুর উপার্জন হবে। কিংবা আমার এই লেখাটি বা আমার এই বইটি পাঠক মহলে সমাদৃত হলে লেখক হিসেবে আমার সুনাম হবে। শয়তান শুরুতেই এরূপ ওয়াছওয়াছা দিয়ে লেখার সহীহ নিয়ত থেকে তথা মানুষের হেদায়েতের নিয়ত থেকে সরিয়ে দেয়। তবে উল্লেখ্য যে, কেউ লেখার পরিকল্পনা করেছে মানুষের হেদায়েতের উদ্দেশ্যে, কিন্তু পরে চিন্তায় এল যে, ভাল লিখলে প্রশংসাও পাওয়া যাবে, বই ভাল চললে টাকা-পয়সাও আসবে—এ চিন্তা ইখলাসের পরিপন্থী নয়। এটা স্বভাবগত বিষয় যে, ভাল কিছুর বিনিময়ে প্রশংসা অর্জিত হবে, প্রশংসা হলে ভাল লাগবে, নিন্দা হলে খারাপ লাগবে। টাকা-পয়সার চাহিদাও স্বভাবগত চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। তাই এরূপ চিন্তা ইখলাসের পরিপন্থী নয়। ইখলাসের পরিপন্থী হবে তখন যখন লেখার পরিকল্পনাই নেয়া হবে প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বা টাকা-পয়সা অর্জনের উদ্দেশ্যে।
• ছোটখাট বই বা তেমন খ্যাতিমান নয় এমন লেখকের বই-পুস্তক থেকে কোন তথ্য নিলে তার বরাত না দেয়া এই ভেবে যে, এ বইয়ের বরাত দিলে আমি ছোট হয়ে যাব। এর বরাত না দিলেই বরং পাঠকরা মনে করবে আমি বিশাল বই-পুস্তক পড়াশোনা করে বা অনেক ঘাটাঘাটি করে তবে লিখেছি। অথচ এই খেয়াল করা হয় না যে, এভাবে বরাত না দিলে তো ইল্ম্মী খেয়ানতের গোনাহ হয়ে যায়। এটা তো গোনাহের চেতনা।
• জামাতের নামাযের সময় জামাত থেকে দূরে রাখার জন্য শয়তান খুব সুন্দর মাজমূন (লেখার বিষয়বস্তু) মনে এনে দিতে পারে। আর লেখকের মনে হতে পারে সুন্দর মাজমূন (লেখার বিষয়বস্তু) যেহেনে আসছে, সব সময় তো এমন মজমূন যেহেনে আসে না। তাই এখন জামাতে না গেলে কি নয়? কিংবা লেখক যদি উস্তাদ হয় তাহলে মনে করা যে, এখন দরসের মুতালা বাদ দিয়েই লেখাটা চালিয়ে যাওয়া দরকার। দরসের মুতালাআ তো পরেও করা যাবে, এরকম মাজমূন পরে যেহেনে না-ও আসতে পারে। এভাবে শয়তান জামাতে নামায পড়ার মত গুরুত্বপূর্ণ আমল থেকে এবং মুদাররিছ হিসেবে দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করতে হলে যে মুতালাআর জরুরত তা থেকে লেখককে ফিরিয়ে দেয়। এটা ওয়াছওয়াছা এ কারণে যে, এখনই লেখা জরুরি নয় পরেও লেখা যাবে, অথচ এখনই জামাতে শরীক হওয়া জরুরি, এখনই মুতালাআ সেরে নেয়া জরুরি। আর যেহেনে মজমূন হাজির হওয়ার যে বিষয়টা তা মজমূনের দুই একটা শব্দ লিখে রাখলেও পরে তা দেখে আবার মজমূনের আগের চিন্তায় ফিরে আসা যায়। যারা জাত লেখক তারা এটা সহজেই বোঝেন। তা ছাড়া আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজের দায়িত্ব পালন করলে এর ওছিলায় আল্লাহ তার চেয়ে আরও সুন্দর মাজমুনও তো যেহেনে এনে দিতে পারেন।
• লেখার সময় মাঝে মধ্যে মনে হয় এমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও সাহিত্য-সমৃদ্ধ ভাষা হওয়া চাই যাতে পাঠকরা মনে করে লেখকের ভাষা-জ্ঞান ও সাহিত্যের পাণ্ডিত্ব সাংঘাতিক! শিক্ষিত সমাজ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর উদ্দেশ্যে যে লেখা তা অবশ্যই শুদ্ধ না হলে শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী সমাজ সেই লেখকের লেখায় আপ্লুত হবে না, তার লেখাকে তেমন মূল্য দিবে না, যা ঐই লেখা থেকে তাদের হেদায়েত গ্রহণ না করার কারণ হতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে ভাষার শুদ্ধতা ও চমকারিত্বের প্রতি খেয়াল রাখা কাম্য। এতটুকু চিন্তা শয়তানের ওয়াছওয়াছা নয়। কিন্তু এর চেয়ে অতিরিক্ত ভাষা-জ্ঞান ও সাহিত্যে পাণ্ডিত্যের জন্য প্রশংসিত হওয়ার খাহেশ শয়তানের ওয়াছওয়াছা প্রসূত বলেই মনে হয়।
• অনেক লেখকের মনে তো শত-গ্রন্থ-প্রণেতা হওয়ার খাহেশ জাগে। ফলে যেনতেন করে লিখে তারা রাউন্ড ফিগার পূর্ণ করতে লেগে যান। এরূপ চিন্তায় আক্রান্ত লেখকরা যেমন তড়িঘড়ি করে লেখেন ফলে ভুল লেখেন, তেমনি বইয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোর জন্য অপূর্ণাঙ্গভাবেই অনেক বই শেষ করে ফেলেন। ভাল, উপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ লেখা থেকে বঞ্চিত করার জন্য এ-ও শয়তানের এক ওয়াছওয়াছা বৈ কি?
• আগের যুগের লেখকরা কমার্শিয়াল ছিলেন না। অর্থাৎ, তারা টাকা-পয়সা উপার্জনের উদ্দেশ্যে লিখতেন না। তাদের মধ্যে লেখার ক্ষেত্রে লিল্লাহিয়াত বেশি ছিল। ফলে তাদের মধ্যে অন্যের লেখা হুবহু নকল করার ইতিহাস তেমন দেখা যায় না। কিন্তু ইদানিং অনেক লেখক অতিমাত্রায় কমার্শিয়াল হয়ে ওঠায় যত বেশি লেখা হবে তত বেশি উপার্জন হবে—এই মনোভাব তাদের মধ্যে এসে গিয়েছে। ফলে এখন তারা অন্যের লেখা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা নকল করে যায়। আর ধরা পড়লে যেন গা বাঁচাতে পারে তার জন্য দুই একটা শব্দ মাঝে মধ্যে পাল্টে দিয়ে এই নকলগিরী চালিয়ে যায়। একজন রসিক মন্তব্য করেছিলেন, অনেক লেখক এখন আল্লাহকে খোদা বানিয়ে আর নবীকে রসূল বানিয়ে অন্যের লেখাকে নিজের লেখা বানিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন অন্যের লেখার মধ্যে সামান্য কিছু পরিবর্তন করে সেটাকে নিজের লেখা বানিয়ে ফেলা হয়। যেমন: সহজ পরিবর্তন হল আল্লাহ শব্দকে খোদা শব্দে আর নবী শব্দকে রসূল শব্দে রূপান্তর। শুনেছি অনেক লেখক অন্যের বই হুবহু কাউকে দিয়ে বা নিজেই কম্পোজ করে সেই কম্পোজকৃত কপির মধ্যে প্রুফ দেখার সময় এরকম দু' চারটে শব্দ পাল্টে দেন। ব্যস এরপরই সে বইটিকে অন্য একটা নাম দিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দেন। এমন নজিরও আমাদের সামনে রয়েছে—অন্যের বইয়ে দু' একটা শব্দ না পাল্টেও হুবহু পূর্ববৎ রেখেই শুধু বইটির ভিন্ন একটা নাম দিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আগের যুগের লেখকরাও চুরি করত বলে ইতিহাসে কম-বেশ তথ্য পাওয়া যায় কিন্তু তা এখনকার মত এমন পুকুরচুরি ছিল না মোটেই। এখনকার লেখকরা যে আরও কত রকম জালিয়াতি করে তার বর্ণনা শেষ করাও কঠিন। শুধু আর একটা ঘটনা উল্লেখ করেই এ বিষয়টা শেষ করছি। একবার একজন প্রকাশক তার প্রকাশিত একটা বইয়ের সম্পাদনার জন্য আমাকে বারবার অনুরোধ করায় সেটি সম্পাদনার কাজ শুরু করলাম। বইটি ছিল অনুবাদ। মূল আরবী গ্রন্থের সাথে মিলিয়ে দেখে সম্পাদনা করতে গিয়ে যা পেলাম তা হচ্ছে মূলের সঙ্গে অর্থের মিল তো দূরের কথা বহু নামের মধ্যে পর্যন্ত মিল নেই। তার চেয়ে আরও আশ্চর্য হলাম মূল বইয়ে যে লেখার কোনো পাত্তা পর্যন্ত নেই এমন বহু পৃষ্ঠা লেখা ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক চিন্তা করে বের করলাম এর রহস্যটা কি। রহস্য হল ফাঁকে ফাঁকে অনুবাদক নিজের অন্য লেখা ঢুকিয়ে দিয়ে বইটির কলেবর বৃদ্ধি করেছে। এই বৃদ্ধি করার মধ্যেই তার বৈষয়িক লাভ। বইয়ের ফর্মা যত বাড়বে তার বিলের পরিমাণও তো তত বাড়বে। কী আশ্চর্য! এমনতর জালিয়াতিও হয়? যাহোক শয়তান এখনকার লেখকদের এভাবে খেয়ানত ও চুরির ওয়াছয়াছা দিতে সাহস পাচ্ছে যে সাহস সে পূর্ববর্তী লেখকদের বেলায় পেত না—কারণ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এখনকার লেখকদের মধ্যে লেখার ক্ষেত্রে পূর্ববতীদের ন্যায় লিল্লাহিয়াত বিদ্যমান নেই। আল্লাহ তাআলা আমাকেসহ সকল লেখককে ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত দান করুন। আমীন!