📄 কৌশল নং ৯: বারংবার একই বিষয়ে ওয়াসওয়াসা দেয়া
শয়তানের নিত্য কৌশলের আর একটা হল— বারংবার একই বিষয়ে ওয়াছওয়াছা দেয়া। যেমন পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে, শয়তান ঈমান-সম্পর্কিত বিষয়ে বারবার ওয়াছওয়াছা দিয়ে থাকে। বলে থাকে, আসলেই আল্লাহ আছেন কি? আসলেই কবরের আযাব বলে কিছু আছে কি? আসলেই জান্নাত জাহান্নাম আছে কি? ইত্যাদি। এরূপ ক্ষেত্রে শয়তানের মোকাবেলা করার পদ্ধতিও পূর্বে বলা হয়েছে যে, একবার এসব ওয়াছওয়াছার জবাব দিয়ে দিন। এসব ওয়াছওয়াছার জবাব কি তা পূর্বে বলা হয়েছে। সেভাবে একবার জবাব দিন, তারপর পুনরায় যখনই এবং যতবারই এসব বিষয়ে ওয়াছওয়াছা হবে তখন শুধু মনকে লক্ষ্য করে বলবেন, এর জবাব তো পূর্বে দিয়েছি, আবার জবাব দিতে গিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ হয় না। "আমানু বিল্লাহ (এসব ব্যাপারে আমি যথাযথ ঈমান রাখি)। ব্যস এই বলেই অন্য কোন কাজে বা অন্য কোন চিন্তায় লিপ্ত হবেন। নফস্ ও শয়তান যতই আপনার পা চাটুক, যতই ঘ্যানর ঘ্যানর করুক আর কখনও এগুলোর জবাব দিতে প্রবৃত্ত হবেন না। এমনিভাবে যত ধরনের নেক আমল রয়েছে তা না করার জন্য এবং বিভিন্ন রকম পাপ কাজ করার জন্য শয়তান বারংবার ওয়াছওয়াছা দিয়ে থাকে। এমন হয় না যে, একবার ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা করে কোন নেক কাজ সম্পন্ন করলে কিংবা একবার ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা করে কোন পাপ থেকে বিরত থাকলে ভবিষ্যতে সে ব্যাপারে শয়তান আর ওয়াছওয়াছা দিবে না। শয়তানের ওয়াছওয়াছা উপেক্ষা করা হল, এতে তার শরম লাগার কথা ছিল, কিন্তু শয়তানের হায়া-শরম নেই। সবচেয়ে বড় মুহছিন তথা অনুগ্রহকারী আল্লাহর মুখের সামনে তাঁর নির্দেশ অমান্য করতে যার শরম লাগেনি, মানুষের বেলায় তার আবার শরম কিসের? তাই তার ওয়াছওয়াছা উপেক্ষিত হলেও সে ওয়াছওয়াছা অব্যাহত রাখে। সুতরাং এসব ওয়াছওয়াছা কখনও বন্ধ বা নির্মূল করা যাবে না। নির্মূল করার চিন্তার দরকারও নেই। বরং সর্বদাই শয়তান এসব ওয়াছওয়াছা দিতে থাকুক আর আপনি সেই ওয়াছওয়াছা উপেক্ষা করে যথাযথভাবে নেক আমলগুলো সম্পাদন করে যেতে থাকুন আর পাপ কাজগুলো থেকে বিরত রইতে থাকুন। এভাবে নেক আমল করার সাথে সাথে নফস্ ও শয়তানের সাথে মুজাহাদা করার ছওয়াবও হাছেল করতে থাকুন। নফস্ ও শয়তান যদি এসব ওয়াছওয়াছা বন্ধ করে দেয় তাতে বরং আপনি মুজাহাদা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন, মুজাহাদার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই এসব বিষয়ে ওয়াছওয়াছা হলেই মনকে বলুন, এই তো নফস্ ও শয়তানের সাথে মুজাহাদা করার সুযোগ এসে গেছে, এবার আমি নফস্ ও শয়তানের সাথে মুজাহাদা করে মুজাহাদার ফায়দা হাসেল করতে চাই। এই বলে সংশ্লিষ্ট বিষয় করণীয় নেক আমল হলে সেগুলো সুন্দরভাবে সুসম্পন্ন করুন, আর পাপ বিষয় হলে তা থেকে বিরত থাকুন। তাতে সংশ্লিষ্ট নেক আমলের ছওয়াবের সাথে সাথে নফসের সাথে মুজাহাদার ছওয়াব ও অর্জিত হবে।
📄 কৌশল নং ১০: ইবাদত শুরু করলে তাড়াহুড়োর মনোভাব এনে দেয়া
শয়তানের নিত্য কৌশলের আর একটা হল— যেকোনো ইবাদত শুরু করলে তাড়াহুড়োর মনোভাব এনে দেয়া। যেমন: আপনি নামাযে দাঁড়িয়েছেন। মনের মধ্যে অহেতুক তাড়াহুড়োর মনোভাব জাগবে। মনে হবে কত কাজ রয়ে গেছে! নামায পড়ে এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে, এক কাপ চা না খেলে তো আর চলছেই না, একটা পান মুখে পুরতে না পারলে তো মস্তিষ্ক সজীবই হচ্ছে না, চুরোটে একটা টান দিতে না পারলে যে মাথাটাই খারাপ হয়ে গেল, দোকানে কত কাষ্টমার ভীড় করে আছে, অফিসে কত লোক কাজ নিয়ে বসে আছে, জরুরী মুতালাআ রয়েছে, লেখার মত কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মাথার মধ্যে রয়েছে, এখনই লিখে নেয়া চাই, একটু হিসেব বাকি রয়েছে, ওটা শেষ করতে পারলেই আজকের কাজের ঝামেলা মিটে যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। শুধু নামাযের ক্ষেত্রে নয়, তেলাওয়াত করতে বসেছেন, ওয়াজ-নসীহত শুনতে বসেছেন, ওজিফা আদায় করতে বসেছেন, ধর্মীয় বইপত্র পড়তে শুরু করেছেন— এসব ক্ষেত্রেও আপনার মধ্যে নানান অজুহাতে তাড়াহুড়োর মনোভাব জাগ্রত হবে। নানান ব্যস্ততার কথা মনে আসবে। আসলে এই যে চা পান চুরোটের চিন্তা, হিসেব নিকেশ ইত্যাদির চিন্তা— এগুলো প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যস্ততাই নয়। এ বিষয়গুলো এমন যা পাঁচ দশ মিনিট পরে করলেও তেমন কোন অসুবিধে হয় না। মনকে বলুন, আচ্ছা! ধীরে সুস্থে নামাযটা আদায় করতে না হয় পাঁচ মিনিট বিলম্ব হবে, তাতে এমন কোনই ক্ষতি হবে না। এগুলো পাঁচ মিনিট পরে করলেও চলবে। মনকে আরও বলুন, প্রকৃতপক্ষে আমার কোনই ব্যস্ততা নেই, অহেতুকই আমি ব্যস্ততা অনুভব করছি। এরূপ চিন্তা করলে দেখবেন সত্যিই আপনার মন থেকে ব্যস্ততার অনুভূতি বিলীন হয়ে গেছে।
📄 কৌশল নং ১১: যেকোনো মূল্যে ধন-সম্পদ বৃদ্ধির ওয়াসওয়াসা
শয়তানের নিত্য কৌশলের আর একটা হল— যেকোনো মূল্যে হোক ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করার ওয়াছওয়াছা দেয়া। অর্থাৎ, দুনিয়া ও মালের মহব্বত অন্তরে খুব আকর্ষণীয় করে তোলা। অন্তরে টাকা-পয়সার লোভকে বল্লাহীন করে দেয়া। অথচ টাকা-পয়সার লোভ এত বড় খারাপ জিনিস যে, একবার তা মনে ঢুকলে সেখানে আল্লাহ্ মহব্বত ও আল্লাহ্ স্মরণ থাকতে পারে না। এমনিভাবে ঘর-বাড়ি, বাগ-বাগিচা, আসবাব-পত্র, কাপড়-চোপড়, ইত্যাদির মহব্বত এক কথায় দুনিয়ার মহব্বত তথা আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য সবকিছুর মহব্বত এমন এক জঞ্জাল, যার মধ্যে আল্লাহ্র মহব্বত থাকতে পারে না। এই দুনিয়ার মহব্বতের কারণে মানুষ হক-নাহক, হারাম হালাল ও সত্য-মিথ্যার বিচার হারিয়ে ফেলে। এমনকি মৃত্যুর সময় আল্লাহ্র প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে ঈমানহারা অবস্থায়ও মৃত্যুবরণ করতে পারে। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা।
তবে উল্লেখ্য যে, ধন-সম্পদ, মাল-আসবাব ইত্যাদির প্রতি স্বভাবগতভাবে মানুষের কিছু আকর্ষণ থাকে। এটা শরীআতে নিন্দনীয় নয়। এমনিভাবে শরীআতসম্মত পদ্ধতিতে সম্পদ উপার্জন করাও নিন্দনীয় নয়, বরং নিন্দনীয় হল যদি কেউ সম্পদের প্রতি মনের আকর্ষণকে এতটা বল্লাহীন ছেড়ে দেয় বা এমনভাবে সম্পদ উপার্জনে মত্ত হয় যে, আল্লাহ্ হুকুম-আহকামের পরোয়া থাকে না এবং আল্লাহ ও আল্লাহ্ রসূলের আদর্শের চেয়ে সেটাকে প্রাধান্য দেয়া হয়। শয়তানই মনের মধ্যে ওয়াছওয়াছা দিয়ে টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ ও মাল-আসবাবের আকর্ষণকে মনের কাছে বল্লাহীন করে দেয়। এই ওয়াছওয়াছার প্রতিকার হল: ১. এ সবকিছু একদিন ছেড়ে যেতে হবে এবং মৃত্যুবরণ করতে হবে— একথা বেশি বেশি স্মরণ করা। ২. ব্যবসা-বাণিজ্য, জায়গা-জমি, আসবাবপত্র, মানুষের সঙ্গে দুস্তী-মহব্বত, আলাপ-পরিচয় জরূরতের চেয়ে বেশি না করা। ৩. অপব্যয় না করা। কেননা অপব্যয় থেকে আয় বৃদ্ধির লোভ জন্মে। ৪. সাধারণ খাওয়া-পরার অভ্যাস করা। ৫. দরিদ্রদের সংসর্গ গ্রহণ ও ধনীদের সংসর্গ বর্জন করা। 6. দুনিয়াত্যাগী বুযুর্গদের জীবনী পাঠ করা। ৭. যে জিনিসের প্রতি মন বেশি লেগে যায়, তা হয় কাউকে দিয়ে দেয়া (দান স্বরূপ দিতে মনে না চাইলে অন্তত যাকাত সদকা স্বরূপ হলেও দিয়ে দেয়া) কিংবা বিক্রি করে দেয়া।
📄 শয়তানের কিছু বিরল কৌশল
পূর্বের পরিচ্ছেদে ইবলীছ শয়তানের কমন ওয়াছয়াছার বিষয়ে অর্থাৎ, সাধারণত যেসব বিষয়ে সে ওয়াছওয়াছা দিয়ে থাকে তা নিয়ে অল্প-বিস্তর আলোচনা পেশ করা হল। এবার ইবলীছ শয়তানের দু' ধরনের কৌশল— অর্থাৎ, ওয়াছওয়াছার দু' ধরনের কৌশল— প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে যাচ্ছি। ১. নিত্য কৌশল, ২. বিরল কৌশল। নিত্য কৌশল বলতে বুঝাচ্ছি সেসব কৌশল যা সে সচরাচর গ্রহণ করে থাকে এবং সবার বেলায় গ্রহণ করে থাকে। আর বিরল কৌশল বলতে এমন কোন কৌশল যা নতুন, যা পূর্বে ছিল না কিংবা যা সবার বেলায় গ্রহণ করে না, বরং বিশেষ বিশেষ লোকের বেলায় এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে গ্রহণ করে থাকে। অনেকের বেলায় এমন সব কৌশলও অবলম্বন করে যা রীতিমত অভিনব। নিম্নে কয়েকটা বিরল ও অভিনব কৌশল সম্বন্ধে আলোচনা পেশ করা গেল।
• একবার আমাদের গ্রামের (খুলনা জেলার রূপসা থানার মৈশাগুনি গ্রামের) একজন লোক আমার কাছে এসে বলল, হুজুর! আমাদের গ্রামের একজন লোক স্বপ্নে দেখেছে কে যেন অদৃশ্যে থেকে তাকে বলছে, তুই মন্দিরে গিয়ে মনসাকে দুধ কলা দিয়ে আয়, নতুবা তোর ছেলে মারা যাবে। লোকটি আমাকে বলল, হুজুর! এই স্বপ্ন দেখার পর সে খুব দুশ্চিন্তায় আছে, তার একটি মাত্র ছেলে। এখন সে কী করতে পারে? আমি বললাম, এটা শয়তানের দেখানো স্বপ্ন। এভাবে শয়তান তাকে মূর্তি পূজায় লিপ্ত করে কাফের বানিয়ে তাকে চির জাহান্নামী করে দিতে চায়। মানুষকে মারার ক্ষমতা শয়তানের নেই। শয়তান জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত তাই সে জিনদের মত আছর করতে পারে মাত্র। লোকটা যদি মনসাকে দুধ কলা না দেয় তাহলে বেশির থেকে বেশি শয়তান তার ছেলের উপর আছর করে তাকে অসুস্থ বানিয়ে ফেলতে পারবে। আর দুধ কলা না দেয়ার পর যখনই সে তার ছেলেকে অসুস্থ হতে দেখবে তখন মনে করবে এই বুঝি আমার ছেলে মরতে যাচ্ছে, তখন সে অবশ্যই মনসাকে দুধ কলা দিয়ে মুশরিক কাফেরে পরিণত হবে। এই হল শয়তানের কৌশল। আমি লোকটিকে বললাম, আপনি গিয়ে আশপাশের কিছু লোক জড় করে তাদের সামনে প্রকাশ্যে আমার নাম নিয়ে বলবেন যে, মাওলানা হেমায়েত সাহেব বলেছেন, মনসাকে দুধ কলা দেয়া যাবে না, যদি তার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে মাওলানা হেমায়েত সাহেব তাকে জিন শয়তানের আছরের তাবীজ দিবেন, ইনশাআল্লাহ সে আছর-মুক্ত হয়ে সুস্থ হয়ে দাঁড়াবে। আমার চিন্তা ছিল লোকটা এভাবে জনসমক্ষে আমার নাম বললে শয়তানও জানবে বুঝবে যে, এবার এ ঘটনার পেছনে এক কড়া মৌলবী লেগেছে, আমি জিততে পারব না। তখন সে এই মিশন থেকে সরে দাঁড়াবে। শয়তানের চক্রান্ত অত মজবুত হয় না। কুরআনে কারীমের এক আয়াতে বলা হয়েছে, إِنَّ كَيْডَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا . অর্থাৎ, নিশ্চয় শয়তানের কৌশল দুর্বল হয়ে থাকে। (সূরা নিছা: ৭৬) যাহোক আমার কৌশলে কাজ হয়েছিল মনে হয়। কারণ সেই লোকের ছেলের অসুস্থ হওয়ার কোন সংবাদ আমার কাছে পৌঁছেনি।
• পূর্বের মতই আর একটা ঘটনা বলছি। তবে এ ঘটনায় একটু ভিন্নতা রয়েছে। বিগত ৪/৫/২০১৬ তারিখে একজন লোক আমাকে ফোন করেছিল যে, এক ব্যক্তি কয়েকটা সাপ মারার পর তার খুব জ্বর হয়েছিল। কোন ডাক্তার কবিরাজে কাজ হচ্ছিল না। তখন হঠাৎ একজন হিন্দু সাধুর সঙ্গে তার দেখা। সাধু তাকে বলল, তোর জ্বর কেন হয়েছে তা জানিস? মনসা দেবিকে মারার কারণে। তোর জ্বর ভাল হবে না। তুই মন্দিরে গিয়ে মনসা দেবির সামনে হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাহলে তোর জ্বর সারবে। এই কথার ভিত্তিতে লোকটা মন্দিরে গিয়ে মনসা দেবীর কাছে ক্ষমা চেয়েছে। ক্ষমা চাওয়ার পর তার জ্বর ভাল হয়ে গেছে। এখন ঐ লোকটার কী করণীয়? আর ব্যাপারটার রহস্যই বা কি একটু খুলে বলুন তো। আমি বললাম, কী করণীয় তা পরে বলছি। আগে শুনুন ঘটনার রহস্য। ঐ যে সাধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা, ও কোন মানুষ নয়। মানুষ গায়েব জানে না। সেই সাধু মানুষ হয়ে থাকলে সে জানল কী করে যে, সাপ মারার পর থেকে তার জ্বর হয়েছে। তাই ও সাধু কোন মানুষ নয়, ও ছিল আসলে জিন শয়তান। ঐ জিন শয়তানই আছর করার ফলে তার জ্বর হয়েছিল। তারপর যখন তার কথামত লোকটা মনসা দেবীর কাছে ক্ষমা চেয়েছে, তখন শয়তান তার আছর তুলে নিয়েছে। আর এভাবে শয়তান লোকটাকে শিরকে লিপ্ত করেছে। এটাই ছিল শয়তানের উদ্দেশ্য। তাকে শিরকে লিপ্ত করার জন্যই শয়তানের এই অভিনব কৌশল। তারপর বললাম, এবার শুনুন লোকটার করণীয় কি। সে শিরক থেকে তওবা করুক এবং ঈমানকে নবায়ন করে নিক।