📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 ওয়াসওয়াসার রোগের ব্যাপারে সাবধান!

📄 ওয়াসওয়াসার রোগের ব্যাপারে সাবধান!


খুব সাবধান থাকা চাই যেন কোনোভাবেই ওয়াছওয়াছার রোগ দাঁড়াতে না পারে। ওয়াছওয়াছার রোগ দাঁড়িয়ে গেলে ইবাদত-বন্দেগী করা ও শরীয়তের উপর চলা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। একবার ওয়াছওয়াছার রোগ দাঁড়িয়ে গেলে ইবাদত-বন্দেগী করা ও শরীয়তের উপর চলা কত কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তার কিছু বিবরণ পূর্বে প্রদান করা হয়েছে। আরও একটু বিবরণ শুনুন। তিনটা ঘটনা বলি। সবগুলোই বাস্তব ঘটনা।

ঘটনা নং এক. আমি তখন মালিবাগ জামেয়ার ছাত্র। জামেয়ার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির ছিল ওয়াছওয়াছার রোগ। তিনি উযূ করার সময় হাত ধুতে যেয়ে হাতে এত বেশি মর্দন করতেন এবং এত জোরে জোরে মর্দন করতেন যেন রীতিমত হাতের সাথে ধস্তাধস্তি করছেন। দুই হাতের কনুই পর্যন্ত লোমের কোন নিশানাও বাকি ছিল না। আর মাথায় মাসেহ করার সিস্টেম তো ছিল ঐতিহাসিক। ভিজানো হাত মাথায় ফিরালে যদি চুলে সে ভিজা না লাগে, তাই প্রথমে কিছুদিন দুই হাতের কোষ ভরে পানি তুলে সেই পানি মাথার উপর ছেড়ে দিতেন, পাছে আবার মাথার কোথাও শুকনো থেকে না যায়। তারপর সন্দেহ আরও আগে বেড়ে এ পর্যায়ে দাঁড়িয়েছিল যে, হাতের কোষ ভরে পানি মাথার উপর ছাড়লেও সন্দেহ যাচ্ছে না। তখন উযূর সময় হাউজের পাড়ে যখন যেতেন সঙ্গে নিতেন টিফিনক্যারিয়ারের একটা বাটি। মাথায় মাসেহের সময় এলে হাউজ থেকে বাটির পর বাটি ভরে মাথায় পানি ঢালতে থাকতেন। মাসেহ করা কাকে বলে, মাসেহ হবে না, মাসেহের বাপ হবে! এতকিছুর পরও মাঝে মধ্যে দেখা যেত জামাতে নামাযে দাঁড়িয়েছেন, হঠাৎ নামায ছেড়ে দিয়ে আবার হাউজের পাড়ে।

ঘটনা নং দুই. একজন আলেমের মুখে ঢাকার লালবাগ শাহী মসজিদের এক মুসল্লীর ঘটনা শুনেছি। সেই মুসল্লী নামাযে নিয়ত বাঁধার সময় খুব সুন্দর করে আল্লাহু আকবার বলার পরও তার ওয়াছওয়াছা থেকে যেত কি জানি ঠিকমত বলা হল কি না? তাকবীরে তাহরীমা তো ফরয, সেটাই যদি ঠিকমত না হয়, তাহলে নামাযের কী দশা হবে? আবার তিনি খুব জোরে জোরে টেনে টেনে আল্লাহু আকবার বলছেন, এভাবে কতবার যে আল্লাহু আকবার বলছেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই। ইতিমধ্যে হয়তো ইমাম সাহেব অনেক দূর এগিয়ে গেছেন আর লোকটা তাকবীরে উলার ফযীলত থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাকবীরে তাহরীমার আল্লাহু আকবার বলার আগেও তার সমস্যা ছিল। সে সমস্যা ছিল রীতিমত হাস্যকর। নিয়তের সময় "ইক্তাদাইতু বিহাযাল ইমাম" (অর্থাৎ, আমি এই ইমামের পেছনে এক্তেদা করছি।) জোরে জোরেই বলতেন, কিন্তু সন্দেহ হত “এই ইমাম" বলে যার দিকে ইশারা করছি, সেই ইশারা আবার অন্যদিকে চলে গেল কি না। তাই ইমামের পেছনে বরাবর দাঁড়াতেন আর "বিহাযাল ইমাম” (অর্থাৎ, এই ইমামের পেছনে) বলার সময় রীতিমত হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে আঙ্গুল দিয়ে ইমামের দিকে ইশারা করে তারপর হাত বাঁধতেন। এক সময় তাতেও সন্দেহ থেকে যেতে লাগল, হাতের ইশারা অন্য দিকে হয়ে যায় না তো? তাই সেই সন্দেহ দূর করার জন্য "বিহাযাল ইমাম" বলার সময় হাত দিয়ে ইমামের পিঠে একটা খোঁচা দিয়ে তারপর নিয়ত বাঁধতেন। ইশারা আবার অন্যদিকে যাবে?

ঘটনা নং তিন. আমাদের পরিচিত একজন আলেমের ঘটনা। তিনি তার মাদ্রাসা থেকে হাঁটা পথে তিন মিনিট দূরত্বে এক মসজিদে ইমামত করতেন। বর্ষার সময় এলে যদি রাস্তার পানি ছিটে পাজামায় লাগে, তাই মসজিদে গিয়ে পাজামা পরিবর্তন করে নামায পড়াতেন। যদিও মাসআলা অনুযায়ী এরূপ রাস্তার পানিতে নিশ্চিত নাপাকী দেখা না গেলে আর সে পানি শরীর বা কাপড়ে লাগলে তাতে শরীর বা কাপড় নাপাক হয়ে গেছে ধরা হয় না, তা পাল্টানোর কষ্ট সওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। শীতের সময় পায়ে চামড়ার মোজা থাকলে মাদ্রাসায় ফিরে এসে তিনি সে মোজা রীতিমত পানি দিয়ে ধুয়ে নিতেন। একদিন আমি তার হুশ ফিরানোর জন্য বললাম, হযরত! শুধু পানি দিয়ে মোজা ধুলে কি মোজা পাক হবে? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে কী করতে হবে? আমি বললাম, সাবান দিয়ে ভাল করে ধুতে হবে। তিনি মনে করলেন আমি বুঝি সত্যি সত্যিই বলছি। তখন আমি আবার বললাম, না শুধু সাবান দিয়ে ধুয়ে নিলেই পাক হবে না। কারণ নাপাক পানি যদি চামড়ার মোজার মধ্যে শোষিত হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে উপর দিয়ে ধুলে তা পাক হবে কীকরে? তাই সাবানের পানির মধ্যে মোজা দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখতে হবে, তারপর ভাল করে নিংড়িয়ে ফেলতে হবে। এভাবে তিনবার না করলে মোজা পাক হবে না, মোজার দশা যা-ই হোক না কেন। তখন তিনি বুঝলেন আমি তাকে ক্ষেপানোর জন্যই এমনটা বলছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম হযরত! নাপাক কাপড় তিনবার কীকরে ধোন? তিনি বললেন, একবার বালতিতে পানি নিয়ে কাপড় ধুয়ে সে পানি ফেলে দেই। আবার পানি নিয়ে দ্বিতীয়বার ধুই। এভাবে তিনবার ধুই। আমি বললাম, একবার যখন বালতিতে নাপাক কাপড় ধোয়া হয় তখন তো বালতির সেই পানিও নাপাক হয়ে যায়, আর সেই নাপাক পানি বালতির গায়ে লেগে যায়, তাই বালতির পানি ফেলে দিলেও তো বালতির গায়ে নাপাক পানি লাগা থেকে গেল। সেই অবস্থায় ঐ বালতিতে নতুন পানি নিলে সেই পানিও তো বালতির গায়ে লেগে থাকা নাপাক পানির সঙ্গে মিশে নাপাক হয়ে যাবে। তাহলে আপনি কীভাবে কাপড় পাক করবেন? তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারলেন না। আমি বললাম, হুজুর! শরীয়ত এত কঠিন নয়। বালতির পানি ফেলে দেয়ার পর তার গায়ে লেগে থাকা পানি যুক্তি অনুসারে নাপাক হলেও শরীয়তে তা মাফ। এমনিভাবে চামড়ার মোজার গায়ে নাপাকি লাগলে উপর থেকে মুছে নিলেও তা পাক হয়ে গেছে ধরা হবে, যদিও ভেতরে নাপাকী শোষিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেটা মাফ। শরীয়তকে অযথা কঠিন করতে নেই। তাহলে শরীয়তের উপর চলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আপনি কি এ হাদীছ পড়েননি? «عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ قَالَ : إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلَّا غَلَبَهُ الحديث.» (রওয়াহুল বুখারী...) অর্থাৎ, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, দ্বীন সহজ, কেউ দ্বীনকে কঠিন করলে সে অপারগ হয়ে পড়বে। (বোখারী: হাদীছ নং ৩৯) এ হাদীছে দ্বীনকে কঠিন করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, দ্বীনকে কঠিন করলে এক পর্যায়ে গিয়ে অপারগ হয়ে পড়তে হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية