📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 উলামায়ে কেরাম সম্বন্ধে কিছু লোকের অভিযোগ

📄 উলামায়ে কেরাম সম্বন্ধে কিছু লোকের অভিযোগ


কুরআন হাদীছের ইলম থেকে মানুষকে সরানোর জন্য এই ইলম ও তার ধারক-বাহক আলেম সমাজ সম্বন্ধে প্রধানত চারটা অভিযোগ তোলা হয়। ১. এই বিদ্যা ভিক্ষা-বিদ্যা। ২. এই বিদ্যা দুনিয়ার কোন কাজে লাগে না। ৩. আলেম সমাজ পরজীবী। ৪. আলেমরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। নিম্নে ধারাবাহিকভাবে এ অভিযোগগুলোর উত্তর শুনে নিন। শয়তান ও তার দোসরদের উত্তরগুলো শোনান এবং তাদেরকে পরাস্ত করুন।

প্রথম অভিযোগের উত্তর: কুরআন-হাদীছের ইলম সম্বন্ধে বলা হচ্ছে এটা ভিক্ষাবিদ্যা। অথচ কেউ কুরআন-হাদীছের ইলম শিক্ষা করলে আল্লাহ তাআলা তার দ্বারা কখনও ভিক্ষাবৃত্তি করান না। আলেম সমাজ ভিক্ষা করে খান না। তারা আয়- উপার্জন করেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কোন আলেম যদি মসজিদ মাদ্রাসার কাজের জন্য কাউকে দান-সদকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন তখন তারা উদ্বুদ্ধ হয়েই দান-সদকা করেন। কারও উপর চাপ সৃষ্টি করে নেয়া হয় না। এটাকে ভিক্ষাবৃত্তি বলা জেনেবুঝে মিথ্যাচার। উলামায়ে কেরামকে কেউ হাদিয়া-তোহফা দিলে তাও মানুষ খুশি মনেই দিয়ে থাকে। ভক্তি আবেগ নিয়েই দিয়ে থাকে। অথচ বহু স্কুল কলেজের জন্য যখন চাঁদা আদায় করা হয় তখন তা চাপের মুখেই আদায় করা হয়। বলা যায় একরকম ছুরি দেখিয়েই তা করা হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগের উত্তর: কুরআন হাদীছের ইলম সম্বন্ধে বলা হচ্ছে, এই বিদ্যা দুনিয়ার কোন কাজে আসে না। এই বিদ্যা কোন কাজে আসে কি না সে সম্বন্ধে শুনুন। এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে ন্যায়নীতি, সততা, পরোপকার, দায়িত্ব-সচেতনতা ইত্যাদি যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, তা এই বিদ্যার এবং এই বিদ্যার ধারক বাহকদেরই অবদান। আর এই ন্যায়নীতি, সততা ও দায়িত্ব সচেতনতাই উন্নতির মূলকথা। ন্যায়নীতি, সততা ও দায়িত্ব সচেতনতা ছাড়া কোন দেশের, কোন জাতির পক্ষে উন্নতি করা সম্ভব নয়। আর এই ন্যায়নীতি, সততা ও দায়িত্ব সচেতনতার কথাগুলো এই ইলমের ধারক-বাহকরাই শেখান। অতএব এই ইলমের ধারক-বাহকদের শিক্ষাই উন্নতির মূলে কাজ করছে। এই আমাদের দেশেই লক্ষ করুন লাখো মসজিদের মিনার থেকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনি ভেসে ওঠে, এটা এই বিদ্যারই অবদান। পথে ঘাটে বের হন লক্ষ কোটি মানুষ একে অপরকে সালাম দিচ্ছে, মুসাফাহা করছে, মুআনাকা করছে— এগুলো এই বিদ্যারই অবদান। লাখো মানুষের মুখে দাড়ি, গায়ে দ্বীনী লেবাস, হেজাব, বোরকা— এগুলোও এই বিদ্যারই অবদান। এখনও সমাজে বাকি বকেয়া যতটুকু গুরুজন-মান্যতা ও আদব-কায়দা রয়েছে, তা-ও এই বিদ্যারই অবদান। সমাজে এখনও যতটুকু হায়া-লজ্জা রয়েছে তাও এই বিদ্যারই অবদান। মানুষের নৈতিক চরিত্র বলতে যা বোঝায়, তা যতটুকুই সমাজে বিদ্যমান রয়েছে এই বিদ্যারই অবদান। স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারা তো স্পষ্টতই বলে থাকেন নৈতিক চরিত্র শিক্ষা দেয়া তাদের দায়িত্ব নয়। তাহলে সমাজে নৈতিক চরিত্রের এ চর্চা কোন্ বিদ্যার অবদানে এসেছে? নিশ্চয় তা এই বিদ্যারই অবদান।

তৃতীয় অভিযোগের উত্তর: উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে বলা হচ্ছে এরা পরজীবী, অর্থাৎ, পরের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ ক্ষেত্রে কথা হল কিছুর উপর নির্ভর করা ছাড়া দুনিয়ায় কে টিকে থাকে? যারা জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত, তারাও তো চাকরি ছাড়া বাঁচে না, কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প ছাড়া বাঁচে না, এভাবে তারাও তো অন্য কিছু একটার উপর আশ্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাহলে তারাও তো পরজীবি। উলামায়ে কেরাম পরজীবী— এ কথার ব্যাখ্যা যদি এভাবে করা হয় যে, উলামায়ে কেরাম মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব ইত্যাদি যেসব প্রতিষ্ঠান চালান তা জনগণের অর্থের উপর নির্ভরশীল, এভাবে উলামায়ে কেরাম জনগণের উপর নির্ভরশীল, একেই বলে পরের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করা তথা পরজীবী হওয়া। তাহলে আমরা জিজ্ঞাসা করব স্কুল কলেজ চালানোর অর্থও তো জনগণ থেকেই আসে। তাহলে স্কুল-কলেজের শিক্ষক শিক্ষিকাদেরও পরজীবী বলুন। বরং সরকারী স্কুল-কলেজ হলে তো সেগুলো ট্যাক্সের টাকায় চলে, যে ট্যাক্স জনগণ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা হয়। জনগণ খুশিমনে ট্যাক্স দেয় না, সরকারকে অভিশাপ দেয় আর ট্যাক্স দেয়। সেই ট্যাক্সের টাকায় যারা চলে তাদেরকে তো অভিশপ্ত পরজীবী বলা চাই। পক্ষান্তরে মসজিদ মাদ্রাসার জন্য জনগণ যে অর্থ দেয় তা খুশি মনে দিয়ে থাকে। ভক্তি আবেগে, মহব্বত ভালবাসায় দিয়ে থাকে।

চতুর্থ অভিযোগের উত্তর: উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে বলা হচ্ছে, তারা সমাজ-বিচ্ছিন্ন। অথচ উলামায়ে কেরামই সমাজের লোকদের সবচেয়ে কাছের মানুষ। মানুষ আপনজন ও আত্মীয়-স্বজনের বাইরে যদি অন্য কোন শ্রেণীর মানুষকে অন্তর দিয়ে ভালবেসে থাকে, তাহলে তারা হলেন উলামায়ে কেরাম। মানুষ উলামায়ে কেরামকে যতটুকু ভালবাসে অন্তর দিয়ে ভালবাসে, নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসে। খাঁটি অন্তর দিয়ে মানুষ তাঁদেরকে ভক্তি করে। আর কোনো শ্রেণীর লোককে মানুষ এরকম খাঁটি অন্তরে ভালবাসে না, আর কোনো শ্রেণীর লোককে মানুষ এরকম নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসে না। যারা রাজনৈতিক নেতাদেরকে ভালবাসে, তাদের প্রতি ভক্তি দেখায়, তা শুধু স্বার্থের জন্য। তাই স্বার্থ উসূল না হলে তাদের দল ছেড়ে দিয়ে আরেক দলে চলে যায়। তাদের পেছনে যে মানুষগুলো ঘুরঘুর করে, তাদের মধ্যে কোনো আন্তরিকতা নেই। মানুষ আন্তরিকভাবে তাদেরকে ভালবাসে না। কিন্তু দ্বীনদার ও পরহেযগার মানুষ উলামায়ে কেরামকে যতটুকু ভালবাসে, অন্তর দিয়ে ভালবাসে। আলেম সমাজের সাথে মানুষের তাই আন্তরিক সম্পর্ক। আর কোন শ্রেণীর সাথে মানুষের এরকম আন্তরিক সম্পর্ক নেই। তাই উলামায়ে কেরাম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নন বরং তাঁরাই হচ্ছেন মানুষের অন্তরের মানুষ, মানুষের কাছের মানুষ। অন্য কোন শ্রেণীর মানুষকে লোকেরা এরকম বিশ্বাস করতে পারে না, এরকম আস্থাভাজন মনে করে না, উলামায়ে কেরামকে যতটা বিশ্বাস করে এবং তাঁদেরকে যতটা আস্থাভাজন মনে করে। অতএব উলামায়ে কেরাম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন— এটা সম্পূর্ণ উল্টো কথা। শয়তান কুরআন-হাদীছের শিক্ষার প্রতি মানুষের মনে অভক্তি সৃষ্টি করে দেয়, আর তা থেকেই কুরআন-হাদীছের ধারক-বাহক আলেম সমাজ সম্পর্কে কটুক্তি করা হয়। এটা হল কুরআন-হাদীছের ইল্ম থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার শয়তানী কৌশল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px