📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 কৌশল নং ১: ভাল কাজকে মন্দ ও মন্দ কাজকে ভাল করে দেখানো

📄 কৌশল নং ১: ভাল কাজকে মন্দ ও মন্দ কাজকে ভাল করে দেখানো


শয়তানের নিত্য কৌশলের মধ্যে সর্বপ্রথম কৌশল হল মানুষ যেন কোনো ভাল কাজ তথা নেক কাজের দিকে অগ্রসর হতে উদ্বুদ্ধই না হয় তাই ভাল কাজকে মন্দ করে দেখানো এবং মন্দ কাজকে ভাল করে দেখানো। অর্থাৎ, উল্টো বোঝানো। শয়তানের কাজ হচ্ছে উল্টো বোঝানো। আল্লাহ আল্লাহর রসূল যেমন বোঝান শয়তান বোঝায় তার উল্টো। যেমন: কয়েকটা উদাহরণ দেই। আল্লাহ্ তাআলা বোঝান যে, يَمْحَقُ اللهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ. অর্থাৎ, যদি যাকাত-ফেতরা দেয়া হয়, দান-সদকা করা হয়, তাহলে আল্লাহ্ সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন, সম্পদের বরকত বৃদ্ধি করে দেন। পক্ষান্তরে সূদী কারবার করলে সম্পদ এবং সম্পদের বরকত কমিয়ে দেন। (সূরা বাকারা: ২৭৬) বুঝা গেল যদি আল্লাহ্র রাস্তায় দান করা হয়, দ্বীনী কাজে ব্যয় করা হয়, তাহলে সম্পদ বাড়বে, কমবে না। বিশেষভাবে হজ্জ- ওমরার ব্যাপারে স্পষ্টতই হাদীছে বলা হয়েছে, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ قَالَ : قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم : تَابِعُوا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَ وَالذُّنُوبَ .» (رواه الترمذي) অর্থাৎ, বেশী বেশী করে একের পর এক হজ্জ ওমরা করতে থাক। তাহলে এই হজ্জ ওমরাহ্ গোনাহকেও দূর করবে, অভাবকেও দূর করবে। (তিরমিযী) আল্লাহ্, আল্লাহ্র রসূল বোঝাচ্ছেন এ-ই, আর শয়তান বোঝাচ্ছে কি? কুরআনে কারীমে এসেছে, الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ . অর্থাৎ, শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং যাকাত না দেয়ার নির্দেশ দেয়। (সূরা বাকারা: ২৬৮)

সে বোঝায় যে, দান-সদকা করলে টাকা-পয়সা কমে যাবে, হজ্জ-ওমরায় গেলে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়ে যাবে। শয়তান তো বোঝায় এমনই, কিন্তু যে আল্লাহ্ সম্পদ দেন, সে আল্লাহ্ বলেছেন, এগুলো করলে সম্পদ কমবে না বরং সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। আমাদের সামনে এমন অনেক লোক আছেন, যারা প্রতি বছর হজ্জ ওমরাহ্ করেন, কিন্তু তাদের সম্পদ কমে না। যাকাত হিসেব করেই ঠিক ঠিকমত আদায় করেন, কিন্তু সম্পদ কমে না। যদি কুরআন হাদীছের কথায় বিশ্বাস থাকে এবং মজবুত বিশ্বাস নিয়ে পূর্ণ ইল্লাছের সাথে আমরা এসব কাজে ব্যয় করতে থাকি, তাহলে সম্পদ কমবে না বরং বাড়বে। যদি পরিমাণে নাও বাড়ে, সম্পদের বরকত বেড়ে যাবে, সম্পদের কার্যকারিতা বেড়ে যাবে। দেখা যাবে পরিমাণে কম, কিন্তু কাজে লাগবে বেশী। একজন মানুষ লাখ লাখ টাকা উপার্জন করে, আবার লাখ লাখ টাকা তার বাজে খাতে ব্যয় হয়ে যায়; এমনকি অনেক সময় এসব বাজে কাজে সে ঋণীও হয়ে যায়। তাহলে দেখা গেল তার সম্পদ পরিমাণে বেশী হলেও তা কাজের কাজে লাগছে না, তার সম্পদে বরকত হচ্ছে না। তাহলে তো প্রকৃতপক্ষে সে অভাবী। সে যা আয় করে তার চেয়ে বেশী ব্যয় হয়ে যায়, এক লাইনে আয় করে, দশ লাইনে ব্যয় হয়ে যায়। এটা হচ্ছে আয়ে বে-বরকতির নমুনা। আর আয়ে বরকতের নমুনা হল একজন মানুষ আয় করে পরিমাণে কম, কিন্তু তার কোন বাজে খরচ সামনে আসেই না। কোন ফালতু ও বেহুদা খরচ তাকে করতে হয় না, বরং যা আয় করে খরচ হওয়ার পরও তার কিছু বাড়তি থেকে যায়, তাহলে এ ব্যক্তি ধনী। একেই বলে বরকত। অল্পের ভিতরে আল্লাহ্ পাক বেশী বরকত দিতে পারেন। যা হোক- যে আল্লাহ্ সম্পদ দান করেন সে আল্লাহই বলেছেন যে, দান-সদকা, যাকাত, হজ্জ, ওমরাহ্ ইত্যাদির কারণে সম্পদ কমবে না বরং সম্পদ বাড়বে। কিন্তু শয়তান আমাদেরকে বুঝায় দান-সদকা করলে, হজ্জ-ওমরাহ করলে, যাকাত-ফেত্রা দিলে সম্পদ কমে যাবে। দেখা গেল- আল্লাহ্ তাআলা যা বোঝাচ্ছেন, শয়তান তার বিপরীত বোঝাচ্ছে। সারকথা আল্লাহ ও তার রসূল সব ভালটিকে ভাল বোঝান, মন্দটাকে মন্দ বোঝান আর শয়তান ভালটিকে খারাপ আর খারাপটাকে ভাল বলে বোঝায়। এর ফলে মদ, নেশা, জুয়া, সিনেমা, বাইস্কোপ গান-বাদ্য ইত্যাদি যত রকম খারাপ কাজ রয়েছে, সেগুলো মানুষের কাছে ভাল লাগে। শয়তানের কুমন্ত্রণার ফলেই তা ভাল লাগে। সে মানুষকে বোঝাতে চায় যে, এগুলোতে কত মজা! নেশা করলে সব দুঃখ ভুলে যাওয়া যায়, গান-বাদ্য, সিনেমা-বাইস্কোপে জীবনটা স্বাদে/গন্ধে ভরে ওঠে, জীবনে কত রোমান্স পাওয়া যায় ইত্যাদি। শয়তান মানুষকে এ সব ভুয়া কল্পনার মধ্যে ঘুরাতে থাকে। এসব ভুয়া কল্পনার মধ্যে মানুষ তার সত্যিকার বিবেক হারিয়ে ফেলে। তখন সে ভাবে, জুয়া খেলতে হুজুররা নিষেধ করে, অথচ একবার যদি লেগে যায় তাহলে ব্যস কেল্লা ফতেহ্। গান-বাদ্য, সিনেমা ইত্যাদি হুজুররা নিষেধ করে, অথচ এগুলো যদি না করি তাহলে তো জীবনটা একেবারে নিরস হয়ে যায়, জীবনে কোন রস-কষ থাকে না, জীবনে কোন রোমান্স থাকে না। খাও দাও ফুর্তি কর, জীবনটাকে উপভোগ কর, জীবন/যৌবন স্বাদে/গন্ধে ভরে তোল! এসব যদি না করি, তাহলে জীবনের কী মূল্য থাকল? শয়তান এগুলো শেখায়। এভাবে শয়তান খারাপ জিনিসকে ভাল করে দেখায়। আবার নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, দাড়ি, টুপি, পর্দা ইত্যাদি শরীয়তের করণীয় বিষয়গুলোকে খারাপ করে দেখায়। এগুলো মনে ভাল লাগে না। শয়তানই মনের মধ্যে এরূপ প্রভাব ফেলে থাকে।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 কৌশল নং ২: আগামীর চক্করে ফেলে দেয়া

📄 কৌশল নং ২: আগামীর চক্করে ফেলে দেয়া


শয়তানের নিত্য কৌশলের একটা হল— কেউ যখন নেক কাজ করতে ইচ্ছাই করে নেয় তখন তাকে আগামীর চক্করে ফেলে দেয়া। অর্থাৎ, আগামীতে করব এই চক্করে ফেলে দেয়া। যেমন: আমরা অনেক সময় চিন্তা করি আমল করা দরকার, আমল করতেই হবে, আমাকে তো মরতেই হবে, আল্লাহ্র কাছে হিসাব দিতে হবে, অতএব আমল করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তবে এখন তো একটু অসুবিধার মধ্যে আছি, এখন নানান ঝামেলায় আছি, আচ্ছা ক'দিন পরেই শুরু করা যাবে, সামনে ঠিকমত সব আমল শুরু করে দিব। এ বছরটা একটু ঝামেলায় আছি, হজ্জটা করতে পারলাম না, যাক আগামীতে করব। সব সময় তো আর ঝামেলা থাকবে না। এভাবে সব আমলের ক্ষেত্রেই আগামীর চক্করে পড়ে যাই। শয়তানই আমাদেরকে আগামীর চক্করে ফেলে দেয়। আমরা ভাবি এখন টাকা-পয়সার অভাব আছে একটু দান-সদকা কম করলাম, সামনে খুব দান-সদকা করব। ইদানিং শরীরটা একটু খারাপ, ক'দিন পর সুস্থ হয়ে যাব, তখন ঠিকমত আমল করব। এভাবে সব ব্যাপারেই শয়তান আমাদেরকে আগামীর চক্করে ফেলে দেয়।

এই ওয়াছওয়াছার মোকাবেলা হল— এখনই যথাসাধ্য আমল শুরু করে দেয়া এবং একথা চিন্তা করা যে, সামনে ঝামেলা কমবে, সামনে অভাব কমবে, সামনে সুস্থতা বাড়বে— এগুলোর কোনো নিশ্চয়তা নেই বরং বাস্তবে দেখা যায় যত দিন যায় ততই ঝামেলা বাড়ে, যত দিন যায় ততই টাকা-পয়সার প্রয়োজন বাড়ে, যত দিন যায় ততই রোগ-ব্যাধি বাড়ে। এক হাদীছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আগামীর চক্করে না পড়ার কথা খুব সুন্দর করে বলেছেন,
«اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ : شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ، وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ، وَعِنَاكَ قَبْلَ ফَقْرِكَ ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ.» (রওয়াহুল হাকেম...)
অর্থাৎ, পাঁচটা জিনিস আসার পূর্বে পাঁচটা জিনিসকে কাজে লাগাও, পাঁচটা অবস্থা আসার পূর্বে পাঁচটা অবস্থার মূল্যায়ন কর। এক. তোমার যৌবনকে কাজে লাগাও বার্ধক্য আসার পূর্বে। দুই. অসুস্থতা আসার পূর্বে সুস্থতাকে কাজে লাগাও। তিন. তোমার সচ্ছলতাকে কাজে লাগাও অভাব আসার পূর্বে। চার. তোমার অবসরকে কাজে লাগাও ব্যস্ততা আসার পূর্বে। পাঁচ. জীবনকে কাজে লাগাও মৃত্যু আসার পূর্বে। (মুস্তাদরকে হাকিম)

এ হাদীছে বোঝানো হয়েছে আগামীতে করব, সামনে করব— এই চক্করে পড়ো না বরং এখনই কাজ শুরু করে দাও। সামনে নয় বরং যা করার এই মুহূর্তে শুরু করে দাও। অতএব শয়তান যদি আগামীর চক্করে ফেলার ওয়াছওয়াছা দেয়, তাহলে তার মোকাবেলার পদ্ধতি হল এখনি শুরু করে দেয়া।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 কৌশল নং ৫: ধীরে ধীরে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া

📄 কৌশল নং ৫: ধীরে ধীরে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া


শয়তানের নিত্য কৌশলের একটা হল ধীরে ধীরে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া। যেমন ধরুন একজন নিয়মিত নামাযী মানুষ, যিনি নিয়মিত মসজিদে গিয়ে জামাআতের সঙ্গে নামায আদায় করেন। এরূপ লোককে যদি শয়তান হুট করে প্রথমেই নামায ছেড়ে দেয়ার ওয়াছওয়াছা দেয় তাহলে লোকটিকে তা কোনোক্রমেই মানাতে পারবে না। তাই শয়তান এরূপ লোকের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে এবং পর্যায়ক্রমে পেছনের দিকে নেয়ার কৌশল গ্রহণ করে। যেমন: সে প্রথমে একদিন লোকটিকে ওয়াছওয়াছা দেয় যে, আজ শরীরটা তেমন ভাল লাগছে না। আজ না হয় ঘরেই নামায আদায় করে নেই। এভাবে একদিন দু'দিন ঘরে নামায পড়াতে পারলে তারপর মনে এনে দেয় আমি তো আর নিয়মিত জামাতে নামায পড়ি না। ঘরেও তো মাঝে মধ্যে নামায পড়ি। তা নামায ঘরে পড়লেও তো হয়ে যায়। এভাবে তার মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামায পড়ার পালা বাড়তে থাকে। ঘরে নামায পড়তে গিয়ে মুস্তাহাব ওয়াক্তে নামায আদায় ছুটতে শুরু করে। মনে হয় আচ্ছা ঘরেই তো নামায পড়ব তা একটু বিলম্বে পড়লেও তো চলে। এভাবে মুস্তাহাব ওয়াক্তে নামায পড়া বাদ যায়।

তারপর বিলম্বে পড়তে গিয়ে মাঝে মধ্যে মাকরূহ ওয়াক্তেও চলে যায়। তারপর পড়ি পড়ি করতে করতে কোন একদিন হয়তো কাজা হয়ে গেল। কাজাও পড়ে নিল। এভাবে কাযার পরিমাণ বেড়ে গেলে মনে আসতে শুরু করে আচ্ছা পরে কাযা করে নিব। এভাবে নামায ছোটা বাড়তে থাকে এবং কাযার স্তূপ হতে থাকে। তারপর একসময় মনে আসতে শুরু করে আমি তো নিয়মিত নামাযী নই। আচ্ছা ভবিষ্যতে নিয়মিত হওয়া যাবে। এই ভেবে এক সময় পূরো বে-নামাযী হয়ে যায়। এমনকি নাউযু বিল্লাহ এভাবে পেছনে সরতে সরতে বে-ঈমান কাফের পর্যন্ত হয়ে যায়।

শুধু নামাযীর ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে অগ্রসর ব্যক্তিদেরকেও শয়তান এভাবে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে নিয়ে থাকে। তাই সর্বদা সচেতন থাকতে হয় শয়তান আমার গতি যেন পেছন দিকে নিতে না পারে। একবার গতি পেছনের দিকে হয়ে গেলে চূড়ান্ত পতন না হওয়া পর্যন্ত পেছনে যেতেই থাকবে। যেমন মনে করুন একটা গাড়ি যদি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতে চায় তাহলে তার গতি কখনও কমানোর অবকাশ নেই, বরং সর্বদাই গতি বাড়ানো এবং গতিকে শক্তিশালী করে যেতে হবে। যদি একবার গাড়ি পেছনের দিকে যেতে শুরু করে, তাহলে সর্বনিম্ন স্তরে খাদে পড়ে ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত হয়তো গাড়ি আর থামবে না। ঠিক তেমনি জীবনে উন্নতির শিখরে আরোহণ করার জন্য গতি যখন সামনের দিকে বাড়তে শুরু করবে, তখন পেছনের দিকে গেলে হতে পারে জীবন নামক এই গাড়ি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আর ক্ষান্ত হবে না। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমীন!

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 কৌশল নং ৭: ভাল হওয়া সম্ভব নয়— এই ধারণা দেয়া

📄 কৌশল নং ৭: ভাল হওয়া সম্ভব নয়— এই ধারণা দেয়া


শয়তানের নিত্য কৌশলের আর একটা হল— ভাল হওয়া সম্ভব নয়— এই ধারণা দেয়া। শয়তানের এরূপ ওয়াছওয়াছার ফলেই অনেকের মনে হয় আমি এত অন্যায় করেছি, জীবনে এতসব জঘন্য কাজ করেছি, না, আমার পক্ষে আর ভাল হওয়া সম্ভব নয়! এভাবে সে ভাল হওয়ার চিন্তা থেকে বহু পিছনে হটে যায়। অথচ হাজার খারাপ হওয়ার পরও যে ভাল হওয়া সম্ভব তার প্রমাণও রয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবন। তার মধ্যে একটা প্রসিদ্ধ ঘটনা হচ্ছে প্রসিদ্ধ বুযুর্গ হযরত ফুযায়েল ইবনে ইয়াজ (রহ.)-এর ঘটনা। তিনি ছিলেন ডাকাতের সর্দার। একবার গভীর রাতে ডাকাতি করার জন্য দলবল নিয়ে কোথাও যাচ্ছেন। পথিমধ্যে এক জীর্ণ কুঠিরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনলেন তার মধ্যে একজন তাহাজ্জুদের নামাযে তেলাওয়াত করছেন, أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَতَالَ بِهِ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ. (এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে— জীবনের এত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও, এত দলীল-প্রমাণ থাকার পরও কি মুমিনদের সময় হয়নি যে, আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য তাদের দিল নরম হবে? এরপরও আহলে কিতাবদের দিল যেমন শক্ত রয়ে গেছে তেমনই দিল শক্ত রয়ে যাবে? তাদের মত অবাধ্য রয়ে যাবে? তাদের অধিকাংশই তো অবাধ্য। তাদের পথ পরিহার করার সময় কি হয়নি?) হযরত ফুযায়েল ইবনে ইয়াজ (রহ.) আয়াতের তেলাওয়াত শুনে এবং তার মর্মার্থ অনুধাবন করে কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন। বললেন, হাঁ আমার সময় হয়েছে! হাঁ আমার দিল নরম হওয়ার মুহূর্ত এসে গেছে! তারপর সঙ্গীদেরকে বললেন, তোমরা যা ইচ্ছে করতে পার, আমি এখন থেকে আর ডাকাতির কাজে যাব না। তিনি ভাল হওয়ার পথ সন্ধান করতে করতে বিখ্যাত বুযুর্গ হযরত খাজা আব্দুল ওয়াহেদ (রহ.)-এর সন্ধান লাভ করে তাঁর সান্ধিধ্যে থেকে আল্লাহকে পাওয়ার সাধনায় নিমগ্ন হলেন এবং বিখ্যাত বুযুর্গে পরিণত হলেন।

হাজার খারাপ হওয়ার পরও যে ভাল হওয়ার চেষ্টা করতে হয় এবং চেষ্টা করতে করতে ভাল হওয়ার আগে মরে গেলেও আল্লাহর কাছে ভাল প্রতিপন্ন হওয়া যায় তার একটা প্রমাণ হল মুসলিম শরীফ দ্বিতীয় খণ্ডে বর্ণিত একটি ঘটনা। স্বয়ং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘটনাটি বয়ান করেছেন। ঘটনাটি এরূপ— পূর্বের যুগে একজন লোক ৯৯টা খুন করেছিল, তারপর লোকটির মনে হল, আমি ভাল হতে চাই। তাই সে ঐ যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানীর সন্ধান করছিল। এক পর্যায়ে লোকেরা তাকে এক খৃষ্টান পণ্ডিতের সন্ধান দিল। সে উক্ত খৃষ্টান পণ্ডিতের কাছে গিয়ে নিজের অবস্থা জানিয়ে বলল, আমি ভাল হতে চাই, আমার ক্ষমা পাওয়ার কোন সুযোগ আছে কি না? পণ্ডিত বলল, সর্বনাশ তুমি ৯৯টা খুন করেছ! তোমার মত মানুষের ভাল হওয়ার আর কোনো পথ নেই, তোমার ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। লোকটি ভাবল যখন ভাল হওয়ার কোনোই পথ নেই, তখন খুনের সংখ্যা ১০০টা পুরো করে ফেলি। এই ভেবে সে উক্ত পণ্ডিতকেও খুন করল। এভাবে তার খুনের সংখ্যা ১০০টা পুরো হয়ে গেল। এরপর সে লোকজনের কাছে আবার জিজ্ঞেস করতে থাকল, সবচেয়ে বড় জ্ঞানী কে আছে? অবশেষে একজন বড় জ্ঞানীর সন্ধান পেয়ে তার কাছে সে গেল এবং সব ঘটনা খুলে বলল। জ্ঞানী লোকটি বলল, কে তোমার তওবার পথ বন্ধ করতে পারে? তুমি যে এলাকায় থেকে, যাদের সঙ্গে ওঠে-বসা করে খারাপ হয়েছ, সেই এলাকা ছেড়ে অমুক এলাকায় চলে যাও যেখানে নেককার-পরহেযগার লোকেরা বসবাস করে। লোকটি সেদিকে যাওয়া শুরু করল, মাঝপথে হযরত আজরাঈল (আ.) সামনে এসে পড়লেন। আজরাঈলকে দেখে সে মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু ভাবল আমি ভাল হওয়ার জন্য যেদিকে যাচ্ছি যতক্ষণ জীবন আছে আমি সে দিকে এগুতে থাকব। তখন বুক ঘষে ঘষে আরও কিছুটা অগ্রসর হল। ইতিমধ্যে তার ইন্তেকাল হয়ে গেল। ভাল লোকের ইন্তেকাল হলে খুবসুরত রহমতের ফেরেশতারা তার রূহ্ নিয়ে যান। আর খারাপ লোকের মৃত্যু হলে বদসুরত, কুৎসিত ভয়ংকর রূপের আযাবের ফেরেশতারা তার রূহ্ নিয়ে যান। এখন এই লোকটির রূহ্ কারা নিবে এ নিয়ে রহমতের ফেরেশতা আর আযাবের ফেরেশতার মধ্যে ঝগড়া শুরু হল। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, তার রূহ আমরা নিব। কারণ সে তওবার উদ্দেশ্যে এসেছিল। অতএব তাকে ভাল বলে গণ্য করতে হবে। আযাবের ফেরেশতারা বললেন, সে জীবনে কোনো নেক কাজ করেনি, অতএব তাকে খারাপই গণ্য করতে হবে, কাজেই আমরা তার রূহ্ নিব। তখন আল্লাহ্ তাআলা অন্য এক ফেরেশতা প্রেরণ করলেন। তিনি এসে ফয়সালা দিলেন, সে যে এলাকা থেকে এসেছে এবং যে এলাকায় যাচ্ছিল, উভয় এলাকার মধ্যে মাপ দেয়া হোক। লোকটি যে এলাকার নিকটবর্তী তাকে সে এলাকার গণ্য করা হবে। মাপ দেয়া হল এবং দেখা গেল যেদিকে সে যাচ্ছিল, সেদিকে সামান্য একটু অগ্রসর। ফলে রহমতের ফেরেশতারা তার রূহ্ নিয়ে গেলেন। সম্ভবত এই সামান্য পরিমাণ যেটুকু সে অগ্রসর ছিল, সেটা হল ঐ জায়গাটুকু যেটুকু সে বুক ঘষে অগ্রসর হয়েছিল।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ঘটনার মাধ্যমে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাহল- (১) জীবনে হাজার খারাপ করার পরও ভাল হওয়ার চেষ্টা বাদ দিতে নেই। (২) ভাল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। জানা নেই শেষ মুহূর্তের কোন একটা আমলও নাজাতের ওছীলা হতে পারে। হতে পারে ঐসময় সামান্যতম যা কিছু করা হবে সেটার কারণেই কল্যাণের ফয়সালা হয়ে যাবে। (৩) এ ঘটনার সব চেয়ে বড় শিক্ষা হল- ভাল হতে চাইলে ভাল লোকদের কাছে যেতে হবে। ভাল লোকদের কাছে গেলেই মানুষ ভাল হতে পারে। খারাপ লোকদের কাছে থেকে ভাল হওয়া বেশ কঠিন (৪) এ ঘটনার আর একটা বড় শিক্ষা হল মানুষ যত পাপই করুক না কেন তার জন্য তওবার দরজা খোলা থাকে। আল্লাহ্র নিকট তওবার দরজা তথা ক্ষমা পাওয়ার দরজা কখনও বন্ধ হয় না। ফার্সী কবিতায় বলা হয়েছে,
این درگاه ما درگاه نا امید نیست + صد بار اگر توبه شکستی باز آ باز آ
অর্থাৎ, আমার এই দরবার হতাশ হওয়ার দরবার নয়, শতবার যদি তওবা ভঙ্গ করে থাক তবুও ফিরে আস, তবুও ফিরে আস। এখানে শতবার বলে ঠিক একশত বার বোঝানো উদ্দেশ্য নয়, বরং বোঝানো উদ্দেশ্য যত বেশিবারই অপরাধ হয়ে যাক না কেন, তোমার জন্য তওবার দরজা বন্ধ নয়, বরং খোলা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px