📄 শয়তানের মনের কথা বোঝে কী করে?
একবার আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তো গায়েব জানে না। তাহলে শয়তান মানুষের মনের কথা টের পায় কীকরে? মানুষের মনের গোপন চিন্তা তো গায়েবের বিষয়ের মতই। আর শয়তান মানুষের মনের মধ্যে জাগ্রত গোপন চিন্তাও বুঝতে পারে। তাহলে কি বলতে হবে শয়তানও গায়েব জানে? প্রশ্নটির সম্ভাব্য উত্তর আমি খুঁজে পেয়েছিলাম।
মানুষের মনের সব চিন্তা-চেতনা পরিচালিত ও সঞ্চিত হয়ে থাকে মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্রে। আর স্মৃতিকেন্দ্র হল কতগুলো স্নায়ু নিয়ে গঠিত। এই স্নায়ুগুলোর মধ্য দিয়ে সব চিন্তা-চেতনা পরিচালিত হয়, এগুলোর মধ্যেই সব চিন্তা-চেতনা সঞ্চিত থাকে। শয়তান যেসব শিরা-উপশিরার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে সক্ষম, সে শিরা-উপশিরার মধ্যে এসব স্নায়ুও অন্তর্ভুক্ত। আরও উল্লেখ্য যে, প্রত্যেকটা শব্দ ও আলোকের যেমন প্রবাহ/ তরঙ্গ থাকে, তেমনি সব চিন্তা-চেতনারও একটা প্রবাহ/তরঙ্গ থাকার কথা। চিন্তা-চেতনার যখন গতি আছে তখন তার প্রবাহ/তরঙ্গ আছেই মানতে হয়। সেমতে হতে পারে স্নায়ুর মধ্য দিয়ে চলাচল কালে চিন্তা-চেতনার যে প্রবাহ/তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, তা দেখেই শয়তান বুঝতে পারে তার মর্ম কি। এভাবেই হয়তো শয়তান মনের চিন্তা-চেতনা ও মনের কথা টের পায়। এটাকে গায়েব জানা বলা হবে না। এটা হল অনেকটা আবহাওয়া নির্দেশক যন্ত্র- হাইড্রমিটার, স্যাটেলাইট রিসিভার বা ওয়েদার র্যাডার প্রভৃতিতে বায়ুর প্রবাহ/তরঙ্গ দেখে আবহাওয়ার অবস্থা টের পাওয়ার মত, অথবা সিজমোগ্রাফ মেশিনের প্রবাহ/তরঙ্গ দেখে দূরবর্তী ভূমিকম্পের অবস্থা টের পাওয়ার মত, কিংবা ইসিজির রিপোর্টে হার্টের প্রবাহ/তরঙ্গ রেখা দেখে হার্টের অবস্থা টের পাওয়ার মত। এরূপ হলে সেটাকে গায়েব জানা বলা হবে না, বরং সেটা হবে একটা ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।
শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে সক্ষম- এ কথা সহীহ হাদীছে বর্ণিত আছে। এক দীর্ঘ হাদীছের একাংশে এসেছে- রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, «إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ. الحديث.» (رواه البخاري برقم ২০৩৮ ও মুসলিম برقم ২১৭৫) অর্থাৎ, শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরার মধ্য দিয়ে চলে থাকে। (বোখারী ও মুসলিম)
শয়তান যদি মানুষের স্নায়ুর মধ্যে বিদ্যমান চিন্তা-চেতনা ও বিদ্যা-বুদ্ধি সম্বন্ধে অবগত হতে না পারবে, তাহলে মানুষকে ধোঁকা দিবে কীভাবে? আজকালকার মানুষের মস্তিস্কে রয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কত শাখার তথ্য আর রং-বেরংয়ের কত শাস্ত্রীয় কথাবার্তা। এগুলো প্রাচীনকালের মানুষের মস্তিষ্কে ছিল না। শয়তান অনেক জান্তা হলেও তার জানা তো প্রাচীন কালের কিছু বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা। আধুনিক এসব বিদ্যা-বুদ্ধি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্বন্ধে তো তার আনাড়ি থাকারই কথা। সে কি কোন মানুষের কাছে এসব বিদ্যা-বুদ্ধি শিখতে যাবে বলে মনে হয়? সারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার মত মহা চিন্তা চরিতার্থ করার পর এগুলো শেখার মত এত সময়ই বা তার কোথায়? তাছাড়া তার অহংকারও কি তাকে কারো শীষ্যত্ব বরণের অনুমতি দিবে? আসলে কারও কাছেই তাকে কিছু শিখতে যেতে হয় না। সে মনের মধ্যে চলাচলকারী সব চিন্তা-চেতনার মর্মই বুঝতে সক্ষম হয়। চাই তা সেসব চিন্তা-চেতনার প্রবাহ/তরঙ্গ দেখেই হোক বা অন্য কোনভাবে হোক। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্য, তর্কশাস্ত্রের মারপ্যাঁচ আর জটিল গাণিতিক প্যাঁচপোচ সবই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। তাই যে কেউ যে কোন শাস্ত্রের মার-প্যাঁচ দিয়েই বলুক না কেন, যে কেউ যে কোন ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আশ্রয়েই কথা বলুক না কেন, সবটারই সে মোকাবেলা করার চেষ্টা করতে পারে এবং করে থাকেও।
তাছাড়া মনের মুখ আছে, কান আছে, চোখ আছে। মনে মনে যখন কোন কথা বলা হয়, শয়তান সে কথা শুনতে পায়। এভাবেও সে মনের কথা টের পায়। মনের চোখ, মুখ, কান ইত্যাদি আছে বলেই আমরা বলে থাকি মনের মধ্যে কত কথা, মনের চোখ দিয়ে দেখ, মনের কান দিয়ে শোন ইত্যাদি। একথাগুলোকে রূপক অর্থে না নিয়ে প্রকৃত অর্থেও নিতে কোন বাধা নেই। হাদীছ দ্বারাও প্রমাণিত যে, মনের চোখ, কান, মুখ ইত্যাদি আছে। মুসলিম শরীফের এক হাদীছে আছে যে, শয়তান তোমাদের কারও কাছে এসে বলবে যে, অমুকটা কে সৃষ্টি করল, অমুকটা কে সৃষ্টি করল? (তুমি হয়তো তার জবাবে বলবে, আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। কারণ, একজন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কিছুই হতে পারে না।) অবশেষে এক পর্যায়ে সে বলবে যে, তাহলে তোমার প্রতিপালককে সৃষ্টি করল কে? এ পর্যায়ে উপনীত হলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম" পাঠ করবে অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে পানাহ কামনা করবে।) এ হাদীছে শয়তান "বলবে”- কথাটির প্রকৃত অর্থ নিতে কোন অসুবিধে নেই। অর্থাৎ, শয়তান মনের কাছে বলবে আর মনের কাছে বললে মন তা শুনতে এবং বুঝতেও পারবে। মন যদি শুনতে ও বুঝতে না পারবে, তাহলে তার প্রতিকার কীভাবে করবে? তাহলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম" বা "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পাঠ করবে কীভাবে? যাহোক বোঝা গেল এটা বলা যায় যে, মন শয়তানের কথা শুনতে পায় এবং শয়তানও মনের কথা শুনতে ও বুঝতে পারে।
📄 শয়তান এত ভাষা বোঝে কী করে?
এখানে কারও মনে কৌতুহল জাগতে পারে যে, মানুষ মনে মনে যে কথা বলে সেটা কোন্ ভাষায় হয়ে থাকে? এর জবাব হল- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যে ভাষা, মনের কথাগুলোও সে ভাষাতে হওয়াটাই স্বাভাবিক। অতএব প্রশ্ন হল- পৃথিবীতে রয়েছে ৫ হাজারের বেশি ভাষা। শয়তান এত ভাষা বোঝে কীকরে? একজনের পক্ষে কি এত ভাষা শিক্ষা করা সম্ভব? এক চীনা ভাষা পড়া শিখতে গেলেই নাকি ৭০ হাজার চিহ্ন/প্রতীক শিখতে হয়, বলতে এবং বুঝতে গেলেও অতগুলো চিহ্ন/প্রতীকের উচ্চারণ ও অর্থ শিখতে হয়। অন্যান্য ভাষা এতটা কঠিন না হোক এর কাছাকাছি কঠিন আরও অনেক ভাষা রয়েছে। তাহলে এক শয়তানের পক্ষে এতসব ভাষা শেখা কি সম্ভব? এ প্রশ্নের তিনটি জবাব দেয়া যায়।
এক. আল্লাহ পাকই তাকে সব ভাষা বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন। এমন ক্ষমতা না দিলে সে মানুষকে ধোঁকা দিবে কীভাবে? আর ধোঁকা দিতে না পারলে দুনিয়া পরীক্ষার স্থান হবে কীরূপে? অতএব সব ভাষাই তাকে শেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, সব ভাষার জ্ঞানই তাকে দেয়া হয়েছে। কষ্ট করে শেখা ছাড়াও তো জ্ঞান দিয়ে দেয়া যেতে পারে। আজকাল যেমন কম্পিউটারে লিখিত কোন ডাটা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা এক ফাইল থেকে অন্য ফাইলে কপি (copy) করে পেষ্ট (paste) করে দেয়া যায়। হয়তো এক সময় এমন আসবে যখন লিখিত ডাটা নয় বরং একজনের মস্তিষ্কে সঞ্চিত ডাটাও কপি করে আর একজনের মস্তিষ্কে পেষ্ট করে দেয়া সম্ভব হবে। হয়তো এমন কোন পদ্ধতিতে আল্লাহ পাক শয়তানের মাথায় সব ভাষার জ্ঞান দিয়ে থাকবেন। অনেকটা যেমন ইলহাম ও ইল্মে লাদুন্নির বেলায় ঘটে থাকে। শেখার জন্য কোন মেহনত ছাড়াই তখন মস্তিস্কে বিভিন্ন ডাটা সংরক্ষিত হয়ে যায়। এ পদ্ধতিতে আল্লাহ পাক কারও কারও মস্তিষ্কে ডাটা পেষ্ট করে দিয়ে থাকেন। এক ধরনের ওহীও এমন ছিল, যাতে জিব্রাঈলের মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ হতে অন্তরে বিভিন্ন ডাটা সঞ্চিত হয়ে যেত। যাহোক আল্লাহ পাক অন্তরে ডাটা পেষ্ট করে দিতেও পারেন আবার ডিলীট/কাট (delete/cut) করে দিতেও পারেন। প্রখ্যাত বুযুর্গ হাফিজ, মুহাদ্দিছ আবূ আব্দিল্লাহ উন্দলুসীর ঘটনা প্রসিদ্ধ। তিনি এক খৃষ্টান নারীর মোহে পড়লে আল্লাহ পাক একটি আয়াত ও একটি হাদীছ ব্যতীত কুরআন হাদীছের বাকি সব ডাটা তার অন্তর থেকে কাট (cut) করে নিয়ে যান। অবশ্য পরে এক সময় তওবার তাওফীক হলে আল্লাহ পাক পুনরায় সেই কাট করে নেয়া ডাটাগুলো আন্ডু কাট (undo cut) করে তার মনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে দেন। শুনেছি কিছু গবেষক নাকি মস্তিষ্কের ডাটাগুলো এরূপ কাট, কপি, পেষ্ট করার যান্ত্রিক পদ্ধতি আবিষ্কারের চিন্তায় রয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ পাক এগুলো করেন কোন বিড়ম্বনা ছাড়াই। মানুষ এমন করতে গেলে কি বিড়ম্বনা ছাড়া তা করতে পারবে? তাহলে শেখার জন্য কোন মেহনত ছাড়াই সব বিদ্যে-বুদ্ধি অর্জিত হয়ে যাবে। তখন আল্লামা হওয়া বা বিজ্ঞানী হওয়া কিংবা ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার অমুক তমুক হওয়া একেবারেই সহজ হয়ে দাঁড়াবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার, টিউটোরিয়েল হোম, মক্তব, মাদ্রাসা, বই-পত্র ছাপার প্রেস বাঁধাইখানা সবই প্রয়োজন না থাকায় বন্ধ হয়ে যাবে। এমনকি তখন বিদ্যে-বুদ্ধিরও কোনই দাম থাকবে না। দোকানে গিয়ে দশ টাকা দিয়ে তাবৎ বিদ্যে-বুদ্ধির ডাটা মাথায় আপলোড করে নিয়ে আসলেই হবে। এমন সস্তা উপায়ে অর্জিত হলে সেই বিদ্যে-বুদ্ধির দাম থাকতে যাবে কেন? আর দাম না থাকলে কেউ কিছু শিখতেও যাবে না। তখন এক মস্তিষ্ক থেকে কিছু কপি করতে গেলে দেখা যাবে তাতে গোবর ছাড়া দামী বিদ্যে-বুদ্ধি কিছুই নেই! হয়তো কেউ ভাববে আর নতুন করে কারও ব্রেন থেকে কিছু কপি করার দরকার হবে না, পূরনোগুলোই কপি পেষ্ট করে করে চালানো হবে। কিন্তু যদি তাতে ভাইরাস ঢুকে কোন সর্বনাশ ঘটায় তখন কী হবে? সেই নতুন ভাইরাস ক্লিন করার জন্য এন্টি ভাইরাস তৈরি করার মত জ্ঞান তখন কোথায় পাওয়া যাবে? আর কোন দুষ্ট লোক যদি পথে-ঘাটে কারও মাথা থেকে সব ডাটা ডিলীট্ করে দেয়, তাহলে তার বাসায় ফিরে আসার কী উপায় হবে? এর চেয়ে আরও বেশি ভ্যাজাল লাগবে যদি অন্য কোন মাথার ডাটা তার মাথায় পেষ্ট করে দেয়া হয় আর সে লোক সেই অন্য লোকের বাসায় গিয়ে ঠেলে ওঠে এবং তার মা বাবাকে নিজের মা বাবা এবং তার স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী ভেবে অগ্রসর হতে যায়। আল্লাহই মালুম। তাই গবেষকগণ ভেবে-চিন্তে অগ্রসর হোন। যাহোক এ গেল এক নং জবাব।
দুই. মানুষ যা কিছু বলে মনের মধ্যে তার চিন্তাও এসে থাকে এবং চিন্তা আসে বলার আগে। আর চিন্তা এসে গেলেই সেই চিন্তার প্রবাহ/তরঙ্গ দেখে শয়তান বুঝে নেয় তার মর্ম কি। এর অর্থ হল বলার পূর্বেই শয়তান কথাটি বুঝে নেয়। এমনটি হলে তো শয়তানের কোন ভাষা শেখার বা বুঝার প্রয়োজনই হয় না। তবে শয়তান পৃথিবীর সব ভাষাই জানে বলে মনে হয়। কারণ, পৃথিবীর বহু দেশের বহু ভাষাভাষী মানুষের সাথে শয়তানের সাক্ষাতের ইতিহাস পাওয়া যায়। অতএব সব ভাষাই সে জানে বলে মনে হয়। সুতরাং সব ভাষা সে কীভাবে আয়ত্ব করে তার ব্যাখ্যা থাকলেই সুন্দর লাগবে। এ ব্যাখ্যার জন্যই তৃতীয় জবাব-
তিন. আজকাল তো যে কোন ভাষার কথা সংশ্লিষ্ট শ্রোতার ভাষায় অনূদিত হয়ে কানে আসার মত মেশিন আবিষ্কার হয়ে গেছে। তাহলে এ প্রশ্ন আর জটিল রইল কোথায়? শয়তান হয়তো এভাবেই দুনিয়ার যে কোন ভাষাভাষী মানুষের শুধু মনের কথাই নয়, জড়দেহের মুখের কথাও নিজস্ব ভাষায় শুনতে পায়। আবার সে যখন কোন মানুষের সাথে কথা বলে (চাই মনের মধ্যে কথা হোক বা বাহ্যিক সাক্ষাৎকারেই হোক), সে মানুষটির মনও তার কথা সেভাবেই বুঝতে পারে। শয়তানের নিজস্ব কোন ভাষা আছে কি না-যে ভাষায় সে সকলের সাথে কথা বলে- থাকলে সে ভাষাটি কি তা-ই বা কে জানে? সে এক সময় উর্দ্ধজগতে ফেরেশতাদের সাথে ছিল বলেই তার নিজস্ব ভাষা আরবী বা ফেরেশতাদের অন্য কোন ভাষা হয়ে থাকলে তা হবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ, সে দুনিয়াতেও দীর্ঘকাল ছিল বলে জানা যায়। তখন তার ভাষা কি ছিল তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সে জমানার তথ্য ও ইতিহাস জিন ও ইনসানের মধ্যে একমাত্র শয়তানই কিছু বললে বলতে পারে, কিন্তু সেরকম কিছু তথ্য যদি শয়তান কাউকে জানায়ও, তবুও কি তাতে বিশ্বাস স্থাপন করা যাবে?
এ তো গেল প্রধান শয়তান সব ভাষা কীকরে বোঝে সে প্রসঙ্গে কথা। তাছাড়া প্রত্যেক এলাকা ভিত্তিক শয়তান থাকতে পারে, তদুপরি হাদীছের ভাষ্য অনুযায়ী প্রত্যেকের সাথে থাকে এক একজন শয়তান। অতএব এলাকা ভিত্তিক নিযুক্ত শয়তানরা সংশ্লিষ্ট এলাকার ভাষা কিংবা প্রত্যেকের সাথে নিযুক্ত শয়তান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষা শিখে নিতে পারে এটা এমন জটিল কিছু তো নয়। এতে তাদের দুনিয়ার তাবত ভাষা শেখার প্রয়োজন দেখা দেয় না।
📄 শয়তান মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে কীভাবে কেটে পড়ে?
শয়তান মানুষের চিরশত্রু। বিভিন্ন রকম ওয়াছওয়াছা দিয়ে মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। কখনও সেই বিপদ থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে আসে না এই মায়াবোধ থেকে যে, আমার ওয়াছওয়াছায়ই তো বেচারারা এই বিপদে পড়েছে। মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে সে কেটে পড়ে।
শয়তান মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে কীভাবে কেটে পড়ে তার একটা ঘটনা শুনুন। বদর যুদ্ধে মক্কার কুরায়শ বাহিনী যখন মুসলমানদের সাথে মুকাবেলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়, তখন তাদের মনে এ আশংকা চেপে বসেছিল যে, আমাদের প্রতিবেশী বনূ বকর গোত্রও আমাদের শত্রু। আমরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে চলে গেলে সে সুযোগে এই শত্রু গোত্র না আবার আমাদের বাড়ী-ঘর, নারী ও শিশুদের উপর হামলা করে বসে। এমনি সময় শয়তান কেনানা গোত্রের বড় সর্দার সুরাকা ইবনে মালেকের রূপ ধরে তার এক বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হল এবং এগিয়ে গিয়ে কুরায়শ জওয়ানদের উদ্দেশে এক ভাষণ দিল এবং দুইভাবে তাদেরকে প্রতারিত করল। প্রথমত সে বলল, আজকের দিনে এমন কেউ নেই যে, তোমাদের উপর জয়ী হবে। দ্বিতীয়ত বনু বকরের ব্যাপারে যদি তোমাদের আশংকা হয়ে থকে তবে তার দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। আমি তোমাদের সমর্থক ও সহায়ক রয়েছি। এই দ্বিবিধ প্রতারণার মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে তাদের বধ্যভূমির দিকে হাঁকিয়ে দিল। কিন্তু যখন বদর প্রান্তরে ভিষণ যুদ্ধ শুরু হল, তখন শয়তান হযরত জিবরাঈল (আ.) সহ ফেরেশতাদের বাহিনী দেখে আতংকিত হয়ে পড়ল। সে সময় তার হাত এক কুরায়শ যুবক হারিছ ইবনে হিশামের হাতে ধরা ছিল। শয়তান সংগে সংগে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পালাতে চাইল। হারিছ তিরস্কার করে বলল, এ কী করছ? তখন সে হারিছের বুকের উপর এক প্রবল ঘা মেরে তাকে ফেলে দিল এবং নিজের বাহিনী নিয়ে সটকে পড়ল। হারিছ তখন সুরাকা মনে করে শয়তানকে বলল, হে আরব সর্দার! তুমি না বলেছিলে, আমাদের সমর্থনে থাকবে? অথচ ঠিক যুদ্ধের ময়দানে এমন আচরণ করছ! তখন শয়তান সুরাকার বেশেই উত্তর দিল, আমি তোমাদের সাথে নেই। কারণ, আমি দেখছি তোমরা যা দেখছ না। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে এঘটনাটা সংক্ষেপে বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَكُمْ فَلَمَّا تَرَاءَتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَى عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِنْكُمْ إِنِّي أَرى مَا لَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ . অর্থাৎ, আর (স্মরণ কর,) যখন শয়তান সুশোভন করেছিল তাদের দৃষ্টিতে তাদের কাজসমূহ এবং বলেছিল, আজ কোনো মানুষই তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না, আর আমি তোমাদের সহায়ক আছি। অতঃপর যখন উভয়দল সামনাসামনি হল, তখন সে পশ্চাৎপদ হয়ে পলায়ন করল এবং বলল, নিশ্চিতই তোমাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি অবশ্যই দেখছি যা তোমরা দেখছ না; আমি তো আল্লাহকে ভয় করছি। আর আল্লাহ কঠোর শাস্তি দানকারী। (সূরা আনফাল: ৪৮)
📄 শয়তানের কমন ওয়াসওয়াসা ও তা থেকে বাঁচার উপায়
নফস্ ও শয়তান কত বিষয়ে ওয়াছওয়াছা দেয় তার কোন ইয়ত্তা নেই। কত বিষয়ে, কত রংয়ে, কত ঢংয়ে যে নফস্ ও শয়তান ওয়াছওয়াছা দিতে পারে এবং দিয়ে থাকে তার হদ্দ ও হিসাব পুরোপুরি জানা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কতগুলো বিষয় আছে কমন, যেসব বিষয়ে প্রায়শই ওয়াছওয়াছা হয়ে থাকে। যেমন:
• ঈমান-সম্পর্কিত বিষয়ে ওয়াছওয়াছা হয়— আসলেই আল্লাহ আছেন কি? আসলেই কবরের আযাব বলে কিছু আছে কি? আসলেই জান্নাত জাহান্নাম আছে কি? এই ওয়াছওয়াছাগুলো হচ্ছে নফস্ ও শয়তানের কমন ওয়াছওয়াছা। আপনি যতই এসব ওয়াছওয়াছার জবাব দিতে থাকুন না কেন এসব বিষয়ে ওয়াছওয়াছা হতেই থাকবে। সদা সর্বদাই হতে থাকবে। এসব ব্যাপারে শয়তান যেন পা চাটা প্রকৃতির, যতক্ষণ সে তার চাহিদা মোতাবেক আপনাকে এসব বিষয়ে সন্দিহান করে তুলতে না পারবে ততক্ষণ সে এসব বিষয়ে ওয়াছওয়াছা দিয়েই যেতে থাকবে, আপনার পা চাটতেই থাকবে, এই আশায় যে, যদি কখনও আপনার থেকে তার চাহিদা পূরণ করিয়ে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপনার বাঁচার একটা পথ রয়েছে। তাহল- একবার এসব ওয়াছওয়াছার যেসব জবাব পূর্বে দেয়া হয়েছে তা দিন, তারপর পুনরায় যখনই এবং যতবারই এসব বিষয়ে ওয়াছওয়াছা হবে তখন শুধু বলবেন, এর জবাব তো পূর্বে দিয়েছি, আবার জবাব দিতে গিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ হয় না। "আমান্নু বিল্লাহ (এসব ব্যাপারে আমি যথাযথ ঈমান রাখি)। ব্যস এই বলেই অন্য কোন কাজে বা অন্য কোন চিন্তায় লিপ্ত হবেন। যতই আপনার পা চাটুক, যতই ঘ্যানর ঘ্যানর করুক আর কখনও এগুলোর জবাব দিতে প্রবৃত্ত হবেন না।
• কমন ওয়াছওয়াছার আরও কিছু বিষয় হল- নামায না পড়ার ওয়াছওয়াছা। কোনোক্রমেই নামায থেকে বিরত না হলে অন্তত সুন্নাত ছেড়ে দিয়ে শুধু ফরযের উপর ক্ষান্ত করার ওয়াছওয়াছা। ভালমতো উযু না করা, বরং উযুর সুন্নাত মুস্তাহাব, আদব ইত্যাদি ছেড়ে দিয়ে কোনো রকমে উযুর ফরয আদায়ের উপর ক্ষান্ত করার ওয়াছওয়াছা। এভাবে যেকোনে নেক আমল ছেড়ে দেয়ার ওয়াছওয়াছা। এসব ওয়াছওয়াছা কখনও বন্ধ বা নির্মূল করা যাবে না। নির্মূল করার চিন্তার দরকারও নেই। বরং সর্বদাই শয়তান এসব ওয়াছওয়াছা দিতে থাকুক আর আপনি সেই ওয়াছওয়াছা উপেক্ষা করে যথাযথভাবে এসব আমল করে যেতে থাকুন এবং নফস্ ও শয়তানের সাথে মুজাহাদা করার ছওয়াব হাছেল করতে থাকুন। নফস্ ও শয়তান যদি এসব ওয়াছওয়াছা বন্ধ করে দেয় তাতে বরং আপনি মুজাহাদা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন, মুজাহাদার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই এসব বিষয়ে ওয়াছওয়াছা হলেই মনে মনে বলুন, এই তো নফস্ ও শয়তানের সাথে মুজাহাদা করার সুযোগ এসে গেছে, এবার আমি নফস্ ও শয়তানের সাথে মুজাহাদা করে মুজাহাদার ফায়দা হাসেল করতে চাই। এই বলে সংশ্লিষ্ট আমলগুলো সুন্দরভাবে সুসম্পন্ন করুন। তাতে সেই আমলের ছওয়াবের সাথে সাথে নফসের সাথে মুজাহাদার ছওয়াবও অর্জিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাকে আপনাকে সকলকে সেই তাওফীক দান করুন।
• নামাযে যেসব ওয়াছওয়াছা হয় তার মধ্যে আর একটা হল নামাযে তাড়াহুড়ো করার ওয়াছওয়াছা। যেমন: অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে নামায থেকে ফারেগ হয়ে যেতে মন চায়। মনে চিন্তা জাগে কত রকম কাজ রয়ে গেছে, এই ঝামেলা রয়েছে, ঐ ঝামেলা রয়েছে ইত্যাদি। এটাও শয়তানের এক ধরনের ওয়াছওয়াছা। এরকম ওয়াছওয়াছা থেকে যদি কেউ মুক্তি পেতে চান তাহলে তাকে ধীরে সুস্থে নামায সারতে হবে এবং মনে করতে হবে যে, আমি ধীরে সুস্থেই নামায পড়ব, আমি কোনো রকম তাড়াহুড়ো করব না, এটা শয়তানের ওয়াছওয়াছা। আর যেসব কাজের কথা চিন্তায় আসবে সে ব্যাপারে মনকে বোঝাতে হবে যে, ঐ কাজটা একটু পরে করলেও তেমন কোন অসুবিধা হবে না। মনকে এরূপ বোঝালে তাড়াহুড়োর মনোভাব দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
• শয়তানের কমন ওয়াছওয়াছার আর একটা বিশেষ বিষয় হল তাকদীরের বিষয়। পদে পদে মনের মধ্যে তাকদীর সম্বন্ধে ওয়াছওয়াছা এসে থাকে।
জরুরী কাজের মুহূর্তে নফস্ ও শয়তানের সাথে বাহাছ করতে নেই
মনে রাখা চাই নামায, যিকির, তেলাওয়াত, মুতালাআ ইত্যাদি জরুরী কাজে মগ্ন থাকার মুহূর্তে নফস্ ও শয়তানের সাথে বাহাছ করতে নেই। কারণ, তখন এসব ছওয়াল জবাবে মশগুল হলে আপনি সেসব জরুরী কাজের মগ্নতা হারিয়ে ফেলবেন। তাহলে নফস্ ও শয়তান এভাবে কামিয়াব হয়ে যাবে যে, জরূরী কাজের মগ্নতা থেকে আপনাকে বঞ্চিত করে দিতে সক্ষম হল। যেসব কাজে মগ্নতা আবশ্যক, সেসব কাজের মুহূর্তে এসব চিন্তা মনে এলে সেদিকে কোনক্রমেই মনোযোগ না দেয়া চাই। যেসব কাজে মগ্নতা আবশ্যক তখন নফস্ ও শয়তানের পক্ষ থেকে বারবার এসব প্রশ্নের দিকে পুশিং হতে থাকবে, এসব চিন্তার দিকে ধাবিত করার জন্য পুনঃপুনঃ উস্কানী আসতে থাকবে, কিন্তু তখন অনড় থাকতে হবে ঐসব কাজের মগ্নতায়। তখন কোনক্রমেই ঐসব প্রশ্নের দিকে মনোযোগ দেয়া সমীচীন হবে না। হাঁ অবসর কোন সময়ে -যখন কোন জরুরী কাজের মগ্নতায় ব্যাঘাত না ঘটে তখন- নফস্কে বাগে আনার জন্য এবং নফস্কে ভাল চিন্তায় অভ্যস্ত করানোর উদ্দেশ্যে এসব ছওয়াল জওয়াবে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।