📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 ক্বলব, নফছ ও রূহ সম্বন্ধে কিছু কথা

📄 ক্বলব, নফছ ও রূহ সম্বন্ধে কিছু কথা


ক্বলব শব্দের এক অর্থ হচ্ছে হৃৎপিণ্ড। এর আর এক অর্থ হচ্ছে মন/অন্তর/হৃদয়। এই অর্থে ক্বলব হল সব রকম ভাবনা-চেতনার আকর। মনের মধ্যে আছে একটি স্মৃতি ভাণ্ডার। সেই স্মৃতিভাণ্ডারে সঞ্চারিত হয় ও সঞ্চিত থাকে সব রকমের আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, অনুমান, সংবেদন ইত্যাদি। এই আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, অনুমান ও সংবেদন ইত্যাদির কোনোটি যখন চিন্তা ও ইচ্ছায় রূপ নিয়ে কোন লক্ষ্যে অগ্রসর হতে চায়, তখন মন তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। এ হিসাবে মনকে তুলনা করা যায় একটা ইঞ্জিনের সঙ্গে। আর ঐ চিন্তা বা ইচ্ছাকে তুলনা করা যায় একজন আরোহীর সঙ্গে। আমাদের জড়দেহ হল সেই গাড়ির বডি সমতুল্য। আর রূহ তথা আত্মা/প্রাণ হল ইঞ্জিনের শক্তি সমতুল্য। আত্মার শক্তিতে মনরূপ ইঞ্জিন তার গাড়ির বডি তথা এই জড়দেহ নিয়ে অগ্রসর হয় গন্তব্যের দিকে। অবশ্য এই জড়দেহ ছাড়াও রূহ (আত্মা/প্রাণ) ও ক্বলবের আরও একটা অজড় দেহ রয়েছে, যাকে বলে "জিমে মিছালী” তথা প্রতীকী দেহ বা রূপক দেহ। নিদ্রাবস্থায় এই জিমে মিছালী নিয়েই আত্মা ও ক্বলব বিচরণ করে থাকে। উল্লেখ্য, নিদ্রার সময় পরমাত্মা¹ বিচরণে বের হয়। জীবাত্মা² তখনও জড়দেহে বিদ্যমান থাকে, ফলে জড়দেহ বেঁচে থাকে।

ক্বলব তথা ইঞ্জিন যেদিকে চলে, জড়দেহরূপ গাড়ির বডিও সেদিকেই চলে। রূহ, ক্বলব ও জড়দেহ- এই তিনটি মিলেই হল একটি গাড়ি। এই গাড়ির ড্রাইভার হয়ে থাকে ফিতরতে সালীমা (সুস্থ স্বভাব বা সু-প্রবৃত্তি) কিংবা নফস্ (কু-প্রবৃত্তি)। "ফিতরতে সালীমা" হল মানুষের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত জন্মগত একটি সুস্থ স্বভাব, যা মানুষকে ইতিবাচক পথের দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে। কুরআনে কারীমের একটি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে— فَطْرَةَ اللَّهِ الَّذِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ . অর্থাৎ, আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত স্বভাব-প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানবকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর এই সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সঠিক দ্বীন। (সূরা রূম: ৩০) এ আয়াতে "ফিতরত" বলে এই ফিতরতে সালীমা তথা সুস্থ স্বভাবকেই বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে দ্বীনসম্মত ইতিবাচক পথের দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে। প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবে এ স্বভাব প্রদত্ত হয়ে থাকে। এ সম্বন্ধে হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, كُلُّ مَوْلُودِ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ كَمَثَلِ الْبَهِيمَةِ تُنْتِجُ الْبَهِিমَةَ هَلْ تَرَى فِيهَا جَدْعَاءَ.» (رواه البخاري برقم ١٣٨٥) অর্থাৎ, প্রত্যেক সন্তান ফিতরতে সালীমার উপর জন্মগহণ করে, তারপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহূদী বানায় বা নাসারা (খৃষ্টান) বানায় কিংবা মাজুসী (অগ্নিপূজক) বানায়। যেমন একটা অবলা প্রাণী একটি সুস্থ বাচ্চা জন্ম দেয়, তারপর তোমরা সেই বাচ্চাদের মধ্যে নাক-কান কর্তিত কোনো শাবক দেখতে পাও কি? (বোখারী)

এ হাদীছে বোঝানো হয়েছে, প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবে যে স্বভাব প্রদত্ত হয় তা তাকে ইতিবাচক পথের দিক-নির্দেশনা দেয়, নেতিবাচক পথের দিক-নির্দেশনা দেয় না। বরং পরবর্তীতে পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে তার মধ্যে নেতিবাচক চিন্তা-চেতনার উদ্রেক হয়³। যেমন- একটি প্রাণীর বাচ্চা জন্মগতভাবেই নাক/কান কর্তিত অবস্থায় জন্মায় না, পরবর্তীতে মানুষ তার নাক/কান কেটে খুঁতযুক্ত করে দেয়। এভাবে মানুষ ফিতরতে সালীমা নিয়ে জন্মগ্রহণ করার পরও পরবর্তীতে পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে তার মধ্যে খুঁত দেখা দেয় অর্থাৎ, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে তার মধ্যে নেতিবাচ্যতা দেখা দেয়। সারকথা- মানুষের মধ্যে জন্মগত যে সুস্থ স্বভাব সেটিই হল ফিতরতে সালীমা। পক্ষান্তরে নফস্ বা প্রবৃত্তি হল মানুষের মধ্যে বাধা এমন একটা শক্তি যাতে ভাল ও মন্দ উভয় বৃত্তি থাকে। উভয় রকম প্রভাব গ্রহণের যোগ্যতাই আল্লাহ তার মধ্যে রেখেছেন। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে, وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا، فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا، قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا، وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا . অর্থাৎ, শপথ (মানুষের) নফসের এবং যিনি তাকে (সবদিক থেকে) সুসমঞ্জস করেছেন তার। অতঃপর তিনি তার (নফসের) মধ্যে ভাল ও মন্দের বৃত্তি দিয়ে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি নফসকে পবিত্র করে সে নিশ্চিত সফলকাম হয় আর যে তাকে কলুষিত করে সে ব্যর্থ মনোরথ হয়। (সূরা আশ-শামস্: ৭-১০)

এ আয়াতে বোঝানো হয়েছে যে, নফসের মধ্যে ভাল-মন্দ উভয় রকম প্রভাব গ্রহণের যোগ্যতা রাখা হয়েছে। যখন নফস্ শয়তানের কু-মন্ত্রণা কিংবা পারিপার্শ্বিকতার কু-প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয় এবং নেতিবাচক দিকটা তার মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে, তখন সে আখ্যায়িত হয় নফসে আম্মারাহ বা কু-প্রবৃত্তি বলে। আবার ক্রমাগত নফসের কথা অমান্য করতে থাকলে, মন্দটাকে বারবার তার সামনে মন্দ হিসাবে তুলে ধরতে থাকলে এবং অব্যাহত সু-দিক-নির্দেশনা প্রদান অব্যাহত রাখলে নফস্ও মন্দটাকে মন্দ বলতে শেখে এবং মন্দের পক্ষে উস্কানী বন্ধ করে দেয়। এ পর্যায়ে উপনীত হলে তখন নফসকে বলা হয় "নফসে লাওয়ামাহ" তথা মন্দকে তিরস্কার জানানো প্রবৃত্তি। তারপর এ অবস্থা আরও অব্যাহত থাকলে এক পর্যায়ে নফসের পক্ষ থেকে এতমীনান হওয়া যায় যে, সে আর মন্দের উস্কানী দিবে না। নফস্ এ পর্যায়ে উপনীত হলে তাকে বলা হয় "নফসে মুত্যুায়িন্না” অর্থাৎ, এমন নফস্ যার ব্যাপারে এতমীনান হওয়া যায় এবং যার থেকে আশংকা মুক্ত থাকা যায়। তবে স্বভাবগতভাবে নফসের মধ্যে কু-প্রভাব গ্রহণের বৃত্তি প্রবল থাকায় এবং শুরু থেকেই শয়তান কর্তৃক তাকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা জোরদার হওয়ায় নফস্ নফসে আম্মারাহ তথা মন্দের উস্কানীদাতাই হয়ে থাকে। তাই সাধারণভাবে নফস্ বলতে নফসে আম্মারাহ তথা কু-প্রবৃত্তিকেই বোঝানো হয়ে থাকে। যাহোক বলা হচ্ছিল, মনরূপ ইঞ্জিনের (গাড়ির) ড্রাইভার হয়ে থাকে এই ফিতরতে সালীমা কিংবা নফস্ তথা কু-প্রবৃত্তি।

টিকাঃ
১। এখানে "পরমাত্মা" বলে বোঝানো হয়েছে আত্মার যে অংশটুকুর ফলে মানুষের চিন্তা-চেতনা সক্রিয় থাকে। ঘুমের সময় মানুষের দেহের অভ্যন্তরে এই পরমাত্মা থাকে না বলেই তখন চিন্তা-চেতনা সক্রীয় থাকে না।
২। জীবাত্মা" বলে বোঝানো হয়েছে আত্মার যে অংশটুকুর ফলে মানুষ বেঁচে থাকে। ঘুমের সময় দেহের অভ্যন্তরে জীবাত্মা থাকে বলে মানুষ বেঁচে থাকে, কিন্তু পরমাত্মা না থাকায় চিন্তা-চেতনা সক্রীয় থাকে না।
৩। মানুষ পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় বিভ্রান্ত হলেও মানুষের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত জন্মগত যে সুস্থ স্বভাব তা কখনও নিঃশেষ হয়ে যায় না। এরই ফলে চরম বিভ্রান্ত লোকও যেকোনো সময় ভাল হয়ে উঠতে পারে।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 ইবলীছ শয়তানের পরিচয়

📄 ইবলীছ শয়তানের পরিচয়


“ইবলীছ” হচ্ছে শয়তানের উপাধী। প্রসিদ্ধ বর্ণনা মোতাবেক তার নাম ছিল আযাযীল।¹ ইবলীছ শব্দের অর্থ হতাশ। শয়তান হযরত আদম (আ.)কে সাজদা করার খোদায়ী নির্দেশ অমান্য করার ফলে যখন খোদার পক্ষ থেকে সে চির অভিশপ্ত ঘোষিত হয় এবং সে আল্লাহর রহমত পাওয়া থেকে হতাশ হয়ে পড়ে, তখন থেকে তার উপাধী হয়ে দাঁড়ায় ইবলীছ। আর “শয়তান” শব্দের অর্থ হচ্ছে দূরবর্তী তথা রহমত থেকে দূরবর্তী, রহমত থেকে বিতাড়িত। যে কারণে সে ইবলীছ তথা আল্লাহর রহমত পাওয়া থেকে হতাশ, একই কারণে সে শয়তান তথা আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত। তাফসীরে রূহুল মাআনীর একটা বর্ণনা মোতাবেক জিনদের মধ্যে যারা কাফের তারা সকলেই শয়তান বলে আখ্যায়িত হয়। শয়তান মূলত জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত। কেউ কেউ বলেছেন, সে মূলত ছিল ফেরেশতা। এ কথা ঠিক নয় চারটা কারণে। যথা:

এক. শয়তান যে জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত তা কুরআনে কারীমে স্পষ্টত উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ. অর্থাৎ, সে হচ্ছে জিনদের অন্তর্ভুক্ত। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশ পালনে অবাধ্যতা প্রদর্শন করেছিল। (সূরা কাহফ: ৫০)

দুই. ফেরেশতাদের সন্তানাদি নেই, পক্ষান্তরে ইবলীছ শয়তানের সন্তানাদি আছে। এ মর্মে পূর্বে উল্লেখিত আয়াতাংশের পরে উক্ত আয়াতেই ইরশাদ হয়েছে, افَتَتَّخِذُوْনَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ . অর্থাৎ, তোমরা কি আমাকে ছেড়ে তাকে (শয়তানকে) ও তার আওলাদকে বন্ধু বানাতে চাও, অথচ তারা তোমাদের শত্রু?

তিন. ফেরেশতারা আল্লাহর নাফরমানী করে না, পক্ষান্তরে ইবলীছ আল্লাহর নাফরমানী করেছে এবং এখনও করে চলছে। ফেরেশতাদের সম্বন্ধে কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে, لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَ يَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُوْনَ . অর্থাৎ, আল্লাহ তাদেরকে যে ব্যাপারে নির্দেশ দেন তারা আল্লাহর নাফরমানী করে না। বরং যা তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় তারা তা করে। (সূরা তাহরীম: ৬)

চার. ফেরেশতারা নূরের তৈরি অথচ শয়তান আগুনের তৈরি। আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.) কে সাজদা না করার কারণ জিজ্ঞাসা করলে শয়তান যা বলেছিল -যা কুরআনে এসেছে- লক্ষ করুন, قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ. অর্থাৎ, আল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন আমি তোমাকে সাজদা করার নির্দেশ দিলাম, তুমি কেন সাজদা করলে না? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমাকে তৈরি করেছ আগুন দিয়ে আর তাকে (আদমকে) তৈরি করেছ মাটি দিয়ে। (অতএব আগুনের স্বভাব যেহেতু উপরের দিকে যাওয়া তাই আমি নিচের দিকে ঝুকে সাজদা করতে পারি না।) (সূরা আ'রাফ: ১২)

যাহোক এসব দলীলের ভিত্তিতে স্পষ্ট যে, শয়তান ফেরেশতা নয় বরং সে হচ্ছে জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত। "আল-লুবাব ফী উলূমিল কিতাব"-এর বর্ণনা অনুযায়ী হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেছেন, হযরত আদম (আ.) যেমন মানব জাতির মূল, তেমনি ইবলীছ হচ্ছে জিন জাতির মূল। "আল-বাহরুল মাদীদ" সহ বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী মানব জাতির সৃষ্টির পূর্বেই এই জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারা পৃথিবীতে বসবাস করত। "আকামুল মারজান ফী আজাইবি ওয়া গরাইবিল জান" গ্রন্থের এক বর্ণনা অনুসারে পৃথিবীতে তারা দুই হাজার বছর বসবাস করে। ইতিমধ্যে তারা পৃথিবীতে ব্যাপক ফিতনা-ফাসাদ ঘটাতে শুরু করলে তাদেরকে ধ্বংশ করার জন্য ফেরেশতাদের পাঠানো হয়। তখন প্রচুর জিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভেগে গিয়ে নির্জন পাহাড়-পর্বতে আত্মগোপন করে। ইবলীছ বন্দী হয়ে আসমানে নীত হয়। সে আত্মসমর্পন করে এবং ফেরেশতাদের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত হয়। এভাবে ফেরেশতাদের সঙ্গে তার সহ অবস্থান চলতে থাকে। পরে হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার পর তাকে সাজদা করার নির্দেশ দিলে ইবলীছ তা মানতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। কুরআনে কারীমের বিভিন্ন আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করেন, আমি তোমাকে সাজদা করার নির্দেশ দিলাম কিসে তোমাকে সাজদা থেকে বিরত রাখল? সে জওয়াব দিল, আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। (অতএব আগুনের স্বভাব যেহেতু উপরের দিকে যাওয়া, তাই আমি নিচ হয়ে সাজদা করতে পারব না।) এভাবে অহংকারের কারণে আল্লাহর নির্দেশ মান্য করা থেকে সে বিরত থাকে। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। তুমি অভিশপ্ত। কেয়ামত পর্যন্ত তোমার উপর অভিশাপ। তখন ইবলীছ আবেদন করল, তাহলে কেয়ামত পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও (অর্থাৎ, হায়াত দাও) আল্লাহ তাআলা বললেন, যাও তোমাকে অবকাশ দেয়া হল। সে বলল, যেহেতু এই আদমের কারণে আমি অভিশপ্ত হলাম, তাই বনী আদমকে আমি দেখে ছাড়ব, বনী আদমকে বিভ্রান্ত করার জন্য আমি অবশ্যই তাদের পিছে লেগে থাকব। তাদের সামনের দিক থেকে, পেছনের দিক থেকে, ডান দিক থেকে, বাম দিক থেকে- চতুর্দিক থেকে তাদের উপর হামলা চালাব (ওয়াছওয়াছা দিব)। তখন থেকেই শুরু হল আদম ও বনী আদমের বিরুদ্ধে শয়তানের ওয়াছওয়াছা চালানোর যাত্রা।

টিকাঃ
১। কেউ কেউ বলেছেন, তার নাম ছিল হারেছ। (রূহুল মাআনী)

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 আউযু বিল্লাহ ইত্যাদি পড়লে শয়তান কীভাবে ভেগে যায়?

📄 আউযু বিল্লাহ ইত্যাদি পড়লে শয়তান কীভাবে ভেগে যায়?


শয়তান বনী আদমকে ওয়াছওয়াছা দিয়ে বিভ্রান্ত করার জন্য স্থায়ী মিশনে নেমেছে। আল্লাহ তাআলা এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও শয়তানকে তাড়ানোর বিভিন্ন পদ্ধতি বলে দিয়েছেন। নির্ভরযোগ্য হাদীছের ভাষ্য অনুযায়ী বিভিন্ন অবস্থায় শয়তান ভেগে যায়। "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম" পড়লে শয়তান ভেগে যায়। "লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পড়লে ভেগে যায়। আযান দিলেও ভেগে যায়, ইকামত হলেও ভেগে যায়। কীভাবে ভেগে যায় তার একটা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে নিম্নোক্ত হাদীছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ ضُرَاطٌ حَتَّى لا يَسْمَعُ التَّأْذِينَ.» (رواه البخاري برقم ٦٠৮ ومسلم برقم ٣৮৯ واللفظ للبخاري) অর্থাৎ, যখন নামাযের আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান পায়ু পথে বায়ু নির্গমন করতে করতে (পাদতে পাদতে) পেছনে সরে যায়। যাতে আযান শুনতে না পায়। (বোখারী ও মুসলিম)

এখানে "পাদতে পাদতে পেছনে সরে যায়" কথাটির ব্যাখ্যায় কোন কোন মুহাদ্দিছ রূপক অর্থ গ্রহণ করে বলেছেন, এর অর্থ হল আযানের শব্দ শোনা থেকে মনোযোগ হটিয়ে নেয়। যেমন বায়ু নির্গমনের শব্দ হলে অন্য শব্দ শোনা যায় না, অন্য শব্দ শোনা থেকে মনোযোগ হটে যায় তদ্রূপ। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল আযানের শব্দের প্রতি সে অবহেলা প্রদর্শন করে। কিন্তু "পাদ” কথাটিকে এখানে প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করতে কোন বাধা নেই। কেননা, শয়তান পানাহার করে থাকে তা হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। অতএব শয়তানের পানাহার যখন প্রমাণিত, তখন তার পাদ থাকাটাও স্বাভাবিক। আর কোন শব্দের প্রকৃত অর্থ যদি স্বাভাবিক হয় -অসম্ভব বা পরিত্যাক্ত না হয়- কিংবা প্রকৃত অর্থ গ্রহণ না করে রূপক অর্থ গ্রহণ করতে হবে এমন কোন লক্ষণও না থাকে, তাহলে প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করাই রীতিসিদ্ধ। তদুপরি মুসলিম শরীফের এক রেওয়ায়েতে حصاص (হুসাস) শব্দ বর্ণিত হয়েছে। এ শব্দের অর্থগুলোর মধ্যে "দ্রুত ভেগে যাওয়া” অর্থও রয়েছে, যা "পাদতে পাদতে পেছনে সরে যাওয়া" কথাটার প্রকৃত অর্থ গ্রহণের পক্ষে বিশেষ লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এজন্যই মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম এখানে প্রকৃত অর্থই গ্রহণ করেছেন। সেমতে মনের চোখ দিয়েই দেখতে হবে শয়তান কীভাবে ভেগে যায়। আমি সেরকম একটু দেখতে চাইলে আমার মনে হয় তার ভেগে যাওয়ার উপমা হল এক সময়কার সদরঘাট থেকে পোস্তগোলা ও নারায়ণগঞ্জগামী কিংবা রামপুরা থেকে সদরঘাটগামী লক্কড়ঝক্কড় সেই পুরনো স্টাইলের মুড়ির টিন (বাস)-এর মত¹, যা স্টার্ট দিলে পেছন থেকে কাল ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এবং ধাওয়া খাওয়া বুড়ো মানুষের মত কোঁকাতে কোঁকাতে দৌড় দিত। ছাত্র জীবনে মালিবাগ জামেয়ায় পড়াকালীন জামেয়ার কাছ থেকে বায়তুল মুকাররম বা গুলিস্তান যেতে রামপুরা থেকে ছেড়ে আসা সদরঘাটগামী সেই ঐতিহাসিক মুড়ির টিনে বহুবার চড়ার সৌভাগ্য (!) হয়েছিল। ফলে উপমার জন্য সহজেই এটি স্মরণে আসে।

টিকাঃ
১। উল্লেখ্য, ঐ সময় এক ধরনের বাসকে রসিকতা করে মুড়ির টিন বলা হত। কারণ মুড়ির টিনে মুড়ি ভরে ঝাকা দিলে যেমন মুড়িগুলো খেপে গিয়ে আরও মুড়ি ভরার জায়গা বের হয়, তদ্রূপ সেই বাসগুলোতেও লোক বোঝাইয়ের পর ড্রাইভার কৌশল করে বাসকে ঘনঘন দ্রুত আগপিছ করত, (মানে বাসকে মুড়ির টিনের মত ঝাকা দিত) যাতে আরও লোক খাপানোর সুযোগ বের হয়। ঐ বাসগুলোর আকৃতি ছিল পেছনের অংশ এখনকারই বাসের মত, আর সামনের অংশ অনেকটা জিপের মত নিচ।

📘 নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা 📄 শয়তানের মনের কথা বোঝে কী করে?

📄 শয়তানের মনের কথা বোঝে কী করে?


একবার আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তো গায়েব জানে না। তাহলে শয়তান মানুষের মনের কথা টের পায় কীকরে? মানুষের মনের গোপন চিন্তা তো গায়েবের বিষয়ের মতই। আর শয়তান মানুষের মনের মধ্যে জাগ্রত গোপন চিন্তাও বুঝতে পারে। তাহলে কি বলতে হবে শয়তানও গায়েব জানে? প্রশ্নটির সম্ভাব্য উত্তর আমি খুঁজে পেয়েছিলাম।

মানুষের মনের সব চিন্তা-চেতনা পরিচালিত ও সঞ্চিত হয়ে থাকে মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্রে। আর স্মৃতিকেন্দ্র হল কতগুলো স্নায়ু নিয়ে গঠিত। এই স্নায়ুগুলোর মধ্য দিয়ে সব চিন্তা-চেতনা পরিচালিত হয়, এগুলোর মধ্যেই সব চিন্তা-চেতনা সঞ্চিত থাকে। শয়তান যেসব শিরা-উপশিরার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে সক্ষম, সে শিরা-উপশিরার মধ্যে এসব স্নায়ুও অন্তর্ভুক্ত। আরও উল্লেখ্য যে, প্রত্যেকটা শব্দ ও আলোকের যেমন প্রবাহ/ তরঙ্গ থাকে, তেমনি সব চিন্তা-চেতনারও একটা প্রবাহ/তরঙ্গ থাকার কথা। চিন্তা-চেতনার যখন গতি আছে তখন তার প্রবাহ/তরঙ্গ আছেই মানতে হয়। সেমতে হতে পারে স্নায়ুর মধ্য দিয়ে চলাচল কালে চিন্তা-চেতনার যে প্রবাহ/তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, তা দেখেই শয়তান বুঝতে পারে তার মর্ম কি। এভাবেই হয়তো শয়তান মনের চিন্তা-চেতনা ও মনের কথা টের পায়। এটাকে গায়েব জানা বলা হবে না। এটা হল অনেকটা আবহাওয়া নির্দেশক যন্ত্র- হাইড্রমিটার, স্যাটেলাইট রিসিভার বা ওয়েদার র‍্যাডার প্রভৃতিতে বায়ুর প্রবাহ/তরঙ্গ দেখে আবহাওয়ার অবস্থা টের পাওয়ার মত, অথবা সিজমোগ্রাফ মেশিনের প্রবাহ/তরঙ্গ দেখে দূরবর্তী ভূমিকম্পের অবস্থা টের পাওয়ার মত, কিংবা ইসিজির রিপোর্টে হার্টের প্রবাহ/তরঙ্গ রেখা দেখে হার্টের অবস্থা টের পাওয়ার মত। এরূপ হলে সেটাকে গায়েব জানা বলা হবে না, বরং সেটা হবে একটা ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।

শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে সক্ষম- এ কথা সহীহ হাদীছে বর্ণিত আছে। এক দীর্ঘ হাদীছের একাংশে এসেছে- রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, «إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ. الحديث.» (رواه البخاري برقم ২০৩৮ ও মুসলিম برقم ২১৭৫) অর্থাৎ, শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরার মধ্য দিয়ে চলে থাকে। (বোখারী ও মুসলিম)

শয়তান যদি মানুষের স্নায়ুর মধ্যে বিদ্যমান চিন্তা-চেতনা ও বিদ্যা-বুদ্ধি সম্বন্ধে অবগত হতে না পারবে, তাহলে মানুষকে ধোঁকা দিবে কীভাবে? আজকালকার মানুষের মস্তিস্কে রয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কত শাখার তথ্য আর রং-বেরংয়ের কত শাস্ত্রীয় কথাবার্তা। এগুলো প্রাচীনকালের মানুষের মস্তিষ্কে ছিল না। শয়তান অনেক জান্তা হলেও তার জানা তো প্রাচীন কালের কিছু বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা। আধুনিক এসব বিদ্যা-বুদ্ধি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্বন্ধে তো তার আনাড়ি থাকারই কথা। সে কি কোন মানুষের কাছে এসব বিদ্যা-বুদ্ধি শিখতে যাবে বলে মনে হয়? সারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার মত মহা চিন্তা চরিতার্থ করার পর এগুলো শেখার মত এত সময়ই বা তার কোথায়? তাছাড়া তার অহংকারও কি তাকে কারো শীষ্যত্ব বরণের অনুমতি দিবে? আসলে কারও কাছেই তাকে কিছু শিখতে যেতে হয় না। সে মনের মধ্যে চলাচলকারী সব চিন্তা-চেতনার মর্মই বুঝতে সক্ষম হয়। চাই তা সেসব চিন্তা-চেতনার প্রবাহ/তরঙ্গ দেখেই হোক বা অন্য কোনভাবে হোক। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্য, তর্কশাস্ত্রের মারপ্যাঁচ আর জটিল গাণিতিক প্যাঁচপোচ সবই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। তাই যে কেউ যে কোন শাস্ত্রের মার-প্যাঁচ দিয়েই বলুক না কেন, যে কেউ যে কোন ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আশ্রয়েই কথা বলুক না কেন, সবটারই সে মোকাবেলা করার চেষ্টা করতে পারে এবং করে থাকেও।

তাছাড়া মনের মুখ আছে, কান আছে, চোখ আছে। মনে মনে যখন কোন কথা বলা হয়, শয়তান সে কথা শুনতে পায়। এভাবেও সে মনের কথা টের পায়। মনের চোখ, মুখ, কান ইত্যাদি আছে বলেই আমরা বলে থাকি মনের মধ্যে কত কথা, মনের চোখ দিয়ে দেখ, মনের কান দিয়ে শোন ইত্যাদি। একথাগুলোকে রূপক অর্থে না নিয়ে প্রকৃত অর্থেও নিতে কোন বাধা নেই। হাদীছ দ্বারাও প্রমাণিত যে, মনের চোখ, কান, মুখ ইত্যাদি আছে। মুসলিম শরীফের এক হাদীছে আছে যে, শয়তান তোমাদের কারও কাছে এসে বলবে যে, অমুকটা কে সৃষ্টি করল, অমুকটা কে সৃষ্টি করল? (তুমি হয়তো তার জবাবে বলবে, আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। কারণ, একজন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কিছুই হতে পারে না।) অবশেষে এক পর্যায়ে সে বলবে যে, তাহলে তোমার প্রতিপালককে সৃষ্টি করল কে? এ পর্যায়ে উপনীত হলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম" পাঠ করবে অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে পানাহ কামনা করবে।) এ হাদীছে শয়তান "বলবে”- কথাটির প্রকৃত অর্থ নিতে কোন অসুবিধে নেই। অর্থাৎ, শয়তান মনের কাছে বলবে আর মনের কাছে বললে মন তা শুনতে এবং বুঝতেও পারবে। মন যদি শুনতে ও বুঝতে না পারবে, তাহলে তার প্রতিকার কীভাবে করবে? তাহলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম" বা "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পাঠ করবে কীভাবে? যাহোক বোঝা গেল এটা বলা যায় যে, মন শয়তানের কথা শুনতে পায় এবং শয়তানও মনের কথা শুনতে ও বুঝতে পারে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px