📄 অবতরণিকা
মানুষের ক্বলব তথা মন/অন্তর/হৃদয় অনেক কথা বলে। ক্বলব বা মনে জাগ্রত হয় অনেক ধরনের চিন্তা-ভাবনা। সেসব চিন্তা-ভাবনার মধ্যে ভাল-মন্দ সব ধরনের চিন্তা- ভাবনার সমাবেশ থাকে। ভাল চিন্তার পাশাপাশি জাগ্রত হয় মন্দ চিন্তা, আবার মন্দ চিন্তার পাশাপাশি জাগ্রত হয় ভাল চিন্তা। ভাল আর মন্দ— এ দুটোর মধ্যে বাঁধে সংঘর্ষ বা মোকাবেলা অর্থাৎ, বাহাছ-বিতর্ক। সেই মোকাবেলা তথা বাহাছ-বিতর্কে কখনও ভাল চিন্তার পক্ষ বিজয়ী হয় আবার কখনও বিজয়ী হয় মন্দ চিন্তার পক্ষ। যে পক্ষ তথা যে চিন্তা বিজয়ী হয় শেষ তক মানুষ সে চিন্তা অনুসারেই সংশ্লিষ্ট কর্ম সম্পাদনে অগ্রসর হয়। এই ধরুন মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করার মত একটা ভাল চিন্তা মনে জাগ্রত হল, অমনি না যাওয়ার চিন্তাও সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল। দু'পক্ষের মধ্যে শুরু হল যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে বাহাছ-বিতর্ক ও দলীল-প্রমাণ পেশ করার পালা। দু'পক্ষের তরফ থেকেই পেশ হতে থাকল যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণ। এক পক্ষ মসজিদে যাওয়ার গুরুত্ব, ফযীলত ইত্যাদি উপস্থাপন করে মসজিদে যাওয়ার অনুকূলে দলীল দাঁড় করাতে থাকল, অপর পক্ষ যাওয়ার প্রতিকূলে অর্থাৎ না যাওয়ার পক্ষে নানা রকম ওজর-আপত্তি ও অসুবিধার দিকগুলো তুলে ধরে মসজিদে না গিয়ে ঘরেই নামায সেরে নেওয়ার জন্য দলীল দাঁড় করাতে সচেষ্ট হল। অবশেষে এ বাহাছ-বিতর্কে তথা এই মোকাবেলায় যে পক্ষ বিজয়ী হল, সে অনুযায়ীই মসজিদে যাওয়া বা না যাওয়ার কর্মটি সম্পাদিত হল। মসজিদে যাওয়ার অনুকূল পক্ষ বিজয়ী হলে মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করা হয়ে উঠল, আর না যাওয়ার পক্ষ বিজয়ী হলে মসজিদে যাওয়া আর হয়ে উঠল না। এরূপ বাহাছ-বিতর্ক বা মোকাবেলা শুধু নামাযের জন্য মসজিদে যাওয়া বা না যাওয়ার এ একটা বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের ঈমানী চিন্তা-চেতনার থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি আমল এবং প্রত্যেকটা ভাল বা মন্দ চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রেই মনের মধ্যে চলে থাকে এরূপ বাহাছ-বিতর্ক তথা মোকাবেলার পালা। নফছের সাথে বাহাছ-মোকাবেলা চলে প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্ত। আমরা ভেবেও দেখি না প্রতিদিন কতবার কতভাবে মনের মধ্যে চলে থাকে এরূপ বাহাছ-বিতর্ক এবং কতবার কোন্ পক্ষ হয় বিজয়ী কিংবা পরাজিত।
মনের মধ্যে চলমান এরূপ বাহাছ ও মোকাবেলার মধ্যে নেতিবাচক পক্ষ নিয়ে থাকে নফছে আম্মারাহ তথা কু-প্রবৃত্তি। আর নফছে আম্মারাহ বা কু-প্রবৃত্তির সহযোগী হল শয়তান। শয়তানের পক্ষ থেকে সে পায় সমর্থন ও মদদ। আর ইতিবাচক পক্ষ নেয় ফিতরতে সালীমা তথা সু-স্বভাব বা সু-প্রবৃত্তি। আর ফিতরতে সালীমা বা সু-স্বভাবের সহযোগী হল ফেরেশতা। ফেরেশতার পক্ষ থেকে সে পায় সমর্থন ও মদদ। প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে রয়েছে এরূপ সমর্থনকারী ও মদদকারী শয়তান ও ফেরেশতা। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, «مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وَكُلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ وَقَرِينُهُ مِنَ الْمَلَائِكَةِ». (رواه أحمد برقم ٣٦٤٨ ومسلم برقم ٢٨١٤ واللفظ لأحمد) অর্থাৎ, তোমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে নিযুক্ত রাখা হয়েছে তার সহযোগী জিন (তথা শয়তান) ও সহযোগী ফেরেশতা। (মুসলিম ও মুসনাদে আহমদ)
যখনই মনের মধ্যকার আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, অনুমান ও সংবেদন ইত্যাদির কোনটা চিন্তা ও ইচ্ছায় রূপ নিয়ে কোন দিকে অগ্রসর হতে চায় এবং মনরূপ ইঞ্জিন তার গাড়ি নিয়ে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার মনস্থ করে, তখনই ফিতরতে সালীমা ও নফছ— এই দুই ড্রাইভারের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় কে তখন গাড়িকে চালিয়ে নিবে। শুরু হয় দুই ড্রাইভারের মধ্যে যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণ দিয়ে চালকের আসনে সমাসীন হওয়ার মত প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করার মোকাবেলা তথা বাহাছ বা বিতর্ক-প্রতিযোগিতা। যে ড্রাইভার সেই যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণে তথা সেই বাহাছে বিজয়ী হয়, সে-ই তখন এই গাড়ির ড্রাইভারের আসনে সমাসীন হয় এবং গাড়িকে নিয়ে চলে তার পছন্দের গন্তব্যের দিকে। আর জড়দেহ সেই ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার অনুসরণ করে চলে। তাই ভাল চিন্তা-চেতনাকে চূড়ান্ত ইতিবাচক গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে শয়তান বা নফছে আম্মারার সঙ্গে মোকাবেলা করে করে ফিতরতে সালীমা তথা সু-স্বভাবকে বিজয়ী হতে হয় প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্ত। সে জন্য জানতে হয় নফছে আম্মারার সঙ্গে মোকাবেলা করার পদ্ধতি অর্থাৎ, নফছে আম্মারাকে বাহাছে পরাস্ত করার মত যুক্তি-তর্ক ও কৌশলাদি। “নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা” শিরোনামে এরূপ প্রতীকী বাহাছসমূহের বিবরণ ও তাতে বিজয়ী হওয়ার মত কৌশলাদি নিয়েই আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। এটাই হল নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা।
তীর তলোয়ার দিয়ে নফছ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা হয় না, গোলা বারুদ ও বন্দুক কামান দিয়েও না। নফছ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হয় বাহাছ করে অর্থাৎ, নফছ ও শয়তানের উপস্থাপিত যুক্তিকে খণ্ডন করে এবং তার বিপরীত যুক্তিকে প্রবল করে দেখিয়ে। এ পুস্তকে নফছ ও শয়তানের উপস্থাপিত যুক্তিকে খণ্ডন এবং তার বিপরীত যুক্তিকে প্রবল করে দেখানোর মত তথ্য, উপাত্ত ও কৌশলাদি সন্নিবেশিত করার চেষ্টা গৃহীত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা করে বিজয়ী হওয়ার তাওফীক দান করুন। মনের মধ্যে নেক কাজের প্রতিকূলে আর পাপ কাজের অনুকূলে জেগে ওঠা সমুদয় ওয়াছওয়াছা মোকাবেলা করে দ্বীনের সঠিক অবস্থানে টিকে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন!
"নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা"— এ শিরোনামে অদ্যাবধি কেউ কিছু লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। তবে এর কাছাকাছি শিরোনামে অনেকের অনেক লেখা রয়েছে। সুফিয়ায়ে কেরামের লেখায়ও এ সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত এসেছে পর্যাপ্ত। নফছের বিভিন্ন মন্দ চিন্তা ও নেতিবাচক ইচ্ছাকে প্রতিহত করার কৌশলাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন তাঁরা। এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দিক-নির্দেশনা পেশ করেছেন তাঁরা। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সুফিয়ায়ে কেরাম প্রদত্ত সেসব দিক-নির্দেশনা, বিভিন্ন মনীষীর ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা ও আমার নিজের কিঞ্চিত বাস্তব চিন্তা-ভাবনার বর্ণনাকে ভিত্তি বানিয়ে তার উপর দাঁড় করানো হয়েছে "নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা" শীর্ষক এ লেখা। আলোচনা তাত্ত্বিকভংগিতে নয় বরং গল্পের ভংগিতে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে পাঠকবর্গ গল্পের আমেজে আত্মিক বিষয়াদির তাত্ত্বিক জটিলতাকে উত্তরণ করতে সক্ষম হন।
বিনীত
মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন
১৪/১/২০১০
মানুষের ক্বলব তথা মন/অন্তর/হৃদয় অনেক কথা বলে। ক্বলব বা মনে জাগ্রত হয় অনেক ধরনের চিন্তা-ভাবনা। সেসব চিন্তা-ভাবনার মধ্যে ভাল-মন্দ সব ধরনের চিন্তা- ভাবনার সমাবেশ থাকে। ভাল চিন্তার পাশাপাশি জাগ্রত হয় মন্দ চিন্তা, আবার মন্দ চিন্তার পাশাপাশি জাগ্রত হয় ভাল চিন্তা। ভাল আর মন্দ— এ দুটোর মধ্যে বাঁধে সংঘর্ষ বা মোকাবেলা অর্থাৎ, বাহাছ-বিতর্ক। সেই মোকাবেলা তথা বাহাছ-বিতর্কে কখনও ভাল চিন্তার পক্ষ বিজয়ী হয় আবার কখনও বিজয়ী হয় মন্দ চিন্তার পক্ষ। যে পক্ষ তথা যে চিন্তা বিজয়ী হয় শেষ তক মানুষ সে চিন্তা অনুসারেই সংশ্লিষ্ট কর্ম সম্পাদনে অগ্রসর হয়। এই ধরুন মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করার মত একটা ভাল চিন্তা মনে জাগ্রত হল, অমনি না যাওয়ার চিন্তাও সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল। দু'পক্ষের মধ্যে শুরু হল যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে বাহাছ-বিতর্ক ও দলীল-প্রমাণ পেশ করার পালা। দু'পক্ষের তরফ থেকেই পেশ হতে থাকল যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণ। এক পক্ষ মসজিদে যাওয়ার গুরুত্ব, ফযীলত ইত্যাদি উপস্থাপন করে মসজিদে যাওয়ার অনুকূলে দলীল দাঁড় করাতে থাকল, অপর পক্ষ যাওয়ার প্রতিকূলে অর্থাৎ না যাওয়ার পক্ষে নানা রকম ওজর-আপত্তি ও অসুবিধার দিকগুলো তুলে ধরে মসজিদে না গিয়ে ঘরেই নামায সেরে নেওয়ার জন্য দলীল দাঁড় করাতে সচেষ্ট হল। অবশেষে এ বাহাছ-বিতর্কে তথা এই মোকাবেলায় যে পক্ষ বিজয়ী হল, সে অনুযায়ীই মসজিদে যাওয়া বা না যাওয়ার কর্মটি সম্পাদিত হল। মসজিদে যাওয়ার অনুকূল পক্ষ বিজয়ী হলে মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করা হয়ে উঠল, আর না যাওয়ার পক্ষ বিজয়ী হলে মসজিদে যাওয়া আর হয়ে উঠল না। এরূপ বাহাছ-বিতর্ক বা মোকাবেলা শুধু নামাযের জন্য মসজিদে যাওয়া বা না যাওয়ার এ একটা বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের ঈমানী চিন্তা-চেতনার থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি আমল এবং প্রত্যেকটা ভাল বা মন্দ চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রেই মনের মধ্যে চলে থাকে এরূপ বাহাছ-বিতর্ক তথা মোকাবেলার পালা। নফছের সাথে বাহাছ-মোকাবেলা চলে প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্ত। আমরা ভেবেও দেখি না প্রতিদিন কতবার কতভাবে মনের মধ্যে চলে থাকে এরূপ বাহাছ-বিতর্ক এবং কতবার কোন্ পক্ষ হয় বিজয়ী কিংবা পরাজিত।
মনের মধ্যে চলমান এরূপ বাহাছ ও মোকাবেলার মধ্যে নেতিবাচক পক্ষ নিয়ে থাকে নফছে আম্মারাহ তথা কু-প্রবৃত্তি। আর নফছে আম্মারাহ বা কু-প্রবৃত্তির সহযোগী হল শয়তান। শয়তানের পক্ষ থেকে সে পায় সমর্থন ও মদদ। আর ইতিবাচক পক্ষ নেয় ফিতরতে সালীমা তথা সু-স্বভাব বা সু-প্রবৃত্তি। আর ফিতরতে সালীমা বা সু-স্বভাবের সহযোগী হল ফেরেশতা। ফেরেশতার পক্ষ থেকে সে পায় সমর্থন ও মদদ। প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে রয়েছে এরূপ সমর্থনকারী ও মদদকারী শয়তান ও ফেরেশতা। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, «مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وَكُلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ وَقَرِينُهُ مِنَ الْمَلَائِكَةِ». (رواه أحمد برقم ٣٦٤٨ ومسلم برقم ٢٨١٤ واللفظ لأحمد) অর্থাৎ, তোমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে নিযুক্ত রাখা হয়েছে তার সহযোগী জিন (তথা শয়তান) ও সহযোগী ফেরেশতা। (মুসলিম ও মুসনাদে আহমদ)
যখনই মনের মধ্যকার আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, অনুমান ও সংবেদন ইত্যাদির কোনটা চিন্তা ও ইচ্ছায় রূপ নিয়ে কোন দিকে অগ্রসর হতে চায় এবং মনরূপ ইঞ্জিন তার গাড়ি নিয়ে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার মনস্থ করে, তখনই ফিতরতে সালীমা ও নফছ— এই দুই ড্রাইভারের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় কে তখন গাড়িকে চালিয়ে নিবে। শুরু হয় দুই ড্রাইভারের মধ্যে যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণ দিয়ে চালকের আসনে সমাসীন হওয়ার মত প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করার মোকাবেলা তথা বাহাছ বা বিতর্ক-প্রতিযোগিতা। যে ড্রাইভার সেই যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণে তথা সেই বাহাছে বিজয়ী হয়, সে-ই তখন এই গাড়ির ড্রাইভারের আসনে সমাসীন হয় এবং গাড়িকে নিয়ে চলে তার পছন্দের গন্তব্যের দিকে। আর জড়দেহ সেই ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার অনুসরণ করে চলে। তাই ভাল চিন্তা-চেতনাকে চূড়ান্ত ইতিবাচক গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে শয়তান বা নফছে আম্মারার সঙ্গে মোকাবেলা করে করে ফিতরতে সালীমা তথা সু-স্বভাবকে বিজয়ী হতে হয় প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্ত। সে জন্য জানতে হয় নফছে আম্মারার সঙ্গে মোকাবেলা করার পদ্ধতি অর্থাৎ, নফছে আম্মারাকে বাহাছে পরাস্ত করার মত যুক্তি-তর্ক ও কৌশলাদি। “নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা” শিরোনামে এরূপ প্রতীকী বাহাছসমূহের বিবরণ ও তাতে বিজয়ী হওয়ার মত কৌশলাদি নিয়েই আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। এটাই হল নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা।
তীর তলোয়ার দিয়ে নফছ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা হয় না, গোলা বারুদ ও বন্দুক কামান দিয়েও না। নফছ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হয় বাহাছ করে অর্থাৎ, নফছ ও শয়তানের উপস্থাপিত যুক্তিকে খণ্ডন করে এবং তার বিপরীত যুক্তিকে প্রবল করে দেখিয়ে। এ পুস্তকে নফছ ও শয়তানের উপস্থাপিত যুক্তিকে খণ্ডন এবং তার বিপরীত যুক্তিকে প্রবল করে দেখানোর মত তথ্য, উপাত্ত ও কৌশলাদি সন্নিবেশিত করার চেষ্টা গৃহীত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা করে বিজয়ী হওয়ার তাওফীক দান করুন। মনের মধ্যে নেক কাজের প্রতিকূলে আর পাপ কাজের অনুকূলে জেগে ওঠা সমুদয় ওয়াছওয়াছা মোকাবেলা করে দ্বীনের সঠিক অবস্থানে টিকে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন!
"নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা"— এ শিরোনামে অদ্যাবধি কেউ কিছু লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। তবে এর কাছাকাছি শিরোনামে অনেকের অনেক লেখা রয়েছে। সুফিয়ায়ে কেরামের লেখায়ও এ সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত এসেছে পর্যাপ্ত। নফছের বিভিন্ন মন্দ চিন্তা ও নেতিবাচক ইচ্ছাকে প্রতিহত করার কৌশলাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন তাঁরা। এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দিক-নির্দেশনা পেশ করেছেন তাঁরা। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সুফিয়ায়ে কেরাম প্রদত্ত সেসব দিক-নির্দেশনা, বিভিন্ন মনীষীর ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা ও আমার নিজের কিঞ্চিত বাস্তব চিন্তা-ভাবনার বর্ণনাকে ভিত্তি বানিয়ে তার উপর দাঁড় করানো হয়েছে "নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা" শীর্ষক এ লেখা। আলোচনা তাত্ত্বিকভংগিতে নয় বরং গল্পের ভংগিতে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে পাঠকবর্গ গল্পের আমেজে আত্মিক বিষয়াদির তাত্ত্বিক জটিলতাকে উত্তরণ করতে সক্ষম হন।
বিনীত
মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন
১৪/১/২০১০
মানুষের ক্বলব তথা মন/অন্তর/হৃদয় অনেক কথা বলে। ক্বলব বা মনে জাগ্রত হয় অনেক ধরনের চিন্তা-ভাবনা। সেসব চিন্তা-ভাবনার মধ্যে ভাল-মন্দ সব ধরনের চিন্তা- ভাবনার সমাবেশ থাকে। ভাল চিন্তার পাশাপাশি জাগ্রত হয় মন্দ চিন্তা, আবার মন্দ চিন্তার পাশাপাশি জাগ্রত হয় ভাল চিন্তা। ভাল আর মন্দ— এ দুটোর মধ্যে বাঁধে সংঘর্ষ বা মোকাবেলা অর্থাৎ, বাহাছ-বিতর্ক। সেই মোকাবেলা তথা বাহাছ-বিতর্কে কখনও ভাল চিন্তার পক্ষ বিজয়ী হয় আবার কখনও বিজয়ী হয় মন্দ চিন্তার পক্ষ। যে পক্ষ তথা যে চিন্তা বিজয়ী হয় শেষ তক মানুষ সে চিন্তা অনুসারেই সংশ্লিষ্ট কর্ম সম্পাদনে অগ্রসর হয়। এই ধরুন মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করার মত একটা ভাল চিন্তা মনে জাগ্রত হল, অমনি না যাওয়ার চিন্তাও সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল। দু'পক্ষের মধ্যে শুরু হল যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে বাহাছ-বিতর্ক ও দলীল-প্রমাণ পেশ করার পালা। দু'পক্ষের তরফ থেকেই পেশ হতে থাকল যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণ। এক পক্ষ মসজিদে যাওয়ার গুরুত্ব, ফযীলত ইত্যাদি উপস্থাপন করে মসজিদে যাওয়ার অনুকূলে দলীল দাঁড় করাতে থাকল, অপর পক্ষ যাওয়ার প্রতিকূলে অর্থাৎ না যাওয়ার পক্ষে নানা রকম ওজর-আপত্তি ও অসুবিধার দিকগুলো তুলে ধরে মসজিদে না গিয়ে ঘরেই নামায সেরে নেওয়ার জন্য দলীল দাঁড় করাতে সচেষ্ট হল। অবশেষে এ বাহাছ-বিতর্কে তথা এই মোকাবেলায় যে পক্ষ বিজয়ী হল, সে অনুযায়ীই মসজিদে যাওয়া বা না যাওয়ার কর্মটি সম্পাদিত হল। মসজিদে যাওয়ার অনুকূল পক্ষ বিজয়ী হলে মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করা হয়ে উঠল, আর না যাওয়ার পক্ষ বিজয়ী হলে মসজিদে যাওয়া আর হয়ে উঠল না। এরূপ বাহাছ-বিতর্ক বা মোকাবেলা শুধু নামাযের জন্য মসজিদে যাওয়া বা না যাওয়ার এ একটা বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের ঈমানী চিন্তা-চেতনার থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি আমল এবং প্রত্যেকটা ভাল বা মন্দ চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রেই মনের মধ্যে চলে থাকে এরূপ বাহাছ-বিতর্ক তথা মোকাবেলার পালা। নফছের সাথে বাহাছ-মোকাবেলা চলে প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্ত। আমরা ভেবেও দেখি না প্রতিদিন কতবার কতভাবে মনের মধ্যে চলে থাকে এরূপ বাহাছ-বিতর্ক এবং কতবার কোন্ পক্ষ হয় বিজয়ী কিংবা পরাজিত।
মনের মধ্যে চলমান এরূপ বাহাছ ও মোকাবেলার মধ্যে নেতিবাচক পক্ষ নিয়ে থাকে নফছে আম্মারাহ তথা কু-প্রবৃত্তি। আর নফছে আম্মারাহ বা কু-প্রবৃত্তির সহযোগী হল শয়তান। শয়তানের পক্ষ থেকে সে পায় সমর্থন ও মদদ। আর ইতিবাচক পক্ষ নেয় ফিতরতে সালীমা তথা সু-স্বভাব বা সু-প্রবৃত্তি। আর ফিতরতে সালীমা বা সু-স্বভাবের সহযোগী হল ফেরেশতা। ফেরেশতার পক্ষ থেকে সে পায় সমর্থন ও মদদ। প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে রয়েছে এরূপ সমর্থনকারী ও মদদকারী শয়তান ও ফেরেশতা। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, «مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وَكُلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ وَقَرِينُهُ مِنَ الْمَلَائِكَةِ». (رواه أحمد برقم ٣٦٤٨ ومسلم برقم ٢٨١٤ واللفظ لأحمد) অর্থাৎ, তোমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে নিযুক্ত রাখা হয়েছে তার সহযোগী জিন (তথা শয়তান) ও সহযোগী ফেরেশতা। (মুসলিম ও মুসনাদে আহমদ)
যখনই মনের মধ্যকার আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, অনুমান ও সংবেদন ইত্যাদির কোনটা চিন্তা ও ইচ্ছায় রূপ নিয়ে কোন দিকে অগ্রসর হতে চায় এবং মনরূপ ইঞ্জিন তার গাড়ি নিয়ে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার মনস্থ করে, তখনই ফিতরতে সালীমা ও নফছ— এই দুই ড্রাইভারের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় কে তখন গাড়িকে চালিয়ে নিবে। শুরু হয় দুই ড্রাইভারের মধ্যে যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণ দিয়ে চালকের আসনে সমাসীন হওয়ার মত প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করার মোকাবেলা তথা বাহাছ বা বিতর্ক-প্রতিযোগিতা। যে ড্রাইভার সেই যুক্তি-তর্ক ও দলীল-প্রমাণে তথা সেই বাহাছে বিজয়ী হয়, সে-ই তখন এই গাড়ির ড্রাইভারের আসনে সমাসীন হয় এবং গাড়িকে নিয়ে চলে তার পছন্দের গন্তব্যের দিকে। আর জড়দেহ সেই ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার অনুসরণ করে চলে। তাই ভাল চিন্তা-চেতনাকে চূড়ান্ত ইতিবাচক গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে শয়তান বা নফছে আম্মারার সঙ্গে মোকাবেলা করে করে ফিতরতে সালীমা তথা সু-স্বভাবকে বিজয়ী হতে হয় প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্ত। সে জন্য জানতে হয় নফছে আম্মারার সঙ্গে মোকাবেলা করার পদ্ধতি অর্থাৎ, নফছে আম্মারাকে বাহাছে পরাস্ত করার মত যুক্তি-তর্ক ও কৌশলাদি। “নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা” শিরোনামে এরূপ প্রতীকী বাহাছসমূহের বিবরণ ও তাতে বিজয়ী হওয়ার মত কৌশলাদি নিয়েই আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। এটাই হল নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা।
তীর তলোয়ার দিয়ে নফছ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা হয় না, গোলা বারুদ ও বন্দুক কামান দিয়েও না। নফছ ও শয়তানের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হয় বাহাছ করে অর্থাৎ, নফছ ও শয়তানের উপস্থাপিত যুক্তিকে খণ্ডন করে এবং তার বিপরীত যুক্তিকে প্রবল করে দেখিয়ে। এ পুস্তকে নফছ ও শয়তানের উপস্থাপিত যুক্তিকে খণ্ডন এবং তার বিপরীত যুক্তিকে প্রবল করে দেখানোর মত তথ্য, উপাত্ত ও কৌশলাদি সন্নিবেশিত করার চেষ্টা গৃহীত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা করে বিজয়ী হওয়ার তাওফীক দান করুন। মনের মধ্যে নেক কাজের প্রতিকূলে আর পাপ কাজের অনুকূলে জেগে ওঠা সমুদয় ওয়াছওয়াছা মোকাবেলা করে দ্বীনের সঠিক অবস্থানে টিকে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন!
"নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা"— এ শিরোনামে অদ্যাবধি কেউ কিছু লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। তবে এর কাছাকাছি শিরোনামে অনেকের অনেক লেখা রয়েছে। সুফিয়ায়ে কেরামের লেখায়ও এ সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত এসেছে পর্যাপ্ত। নফছের বিভিন্ন মন্দ চিন্তা ও নেতিবাচক ইচ্ছাকে প্রতিহত করার কৌশলাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন তাঁরা। এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দিক-নির্দেশনা পেশ করেছেন তাঁরা। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সুফিয়ায়ে কেরাম প্রদত্ত সেসব দিক-নির্দেশনা, বিভিন্ন মনীষীর ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা ও আমার নিজের কিঞ্চিত বাস্তব চিন্তা-ভাবনার বর্ণনাকে ভিত্তি বানিয়ে তার উপর দাঁড় করানো হয়েছে "নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা" শীর্ষক এ লেখা। আলোচনা তাত্ত্বিকভংগিতে নয় বরং গল্পের ভংগিতে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে পাঠকবর্গ গল্পের আমেজে আত্মিক বিষয়াদির তাত্ত্বিক জটিলতাকে উত্তরণ করতে সক্ষম হন।
বিনীত
মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন
১৪/১/২০১০