📘 নফসের গোলামী ও মুক্তির উপায় > 📄 বিস্তারিতভাবে

📄 বিস্তারিতভাবে


আল্লাহর সাহায্য ও তওফিকে নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখলে কুপ্রবৃত্তির গোলামী থেকে নাজাত পাওয়া সম্ভব।
১. স্বাধীন দৃঢ়তা: ইহা নফসের পক্ষে ও বিপক্ষের সব ব্যাপারে ঈর্ষাবান ও আত্মসম্মানের প্রতি খেয়াল রাখতে পারে।
২. ধর্যৈর ডোজ: ইহা নফসকে তার তিক্ততার প্রতি সবর করার ব্যাপারে ঘড়ির কাজ করে।
৩. আত্মিক শক্তি: যা ঐ ধৈর্যের ডোজগ্রহণ করতে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া বাহাদুরীও একটি ধৈর্যের ঘড়ি ও উত্তম জিন্দেগি, যা মানুষ একমাত্র সবরের দ্বারাই হাসিল করতে পারে।
৪. পরিণামের প্রতি দৃষ্টি রাখা: ঐ ডোজের মাধ্যমে পরিণাম ভাল ও আরোগ্য লাভের প্রতি নজর রাখা।
৫. মজা ও ব্যথার মাঝের পরিমাপ করা: এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, প্রবৃত্তির গোলামীর পরিণতির ব্যথার চাইতে তার প্রতি ধৈর্যধারণ কি বেশি কঠিন!?
৬. নিজের মর্যাদা ও অবস্থানের প্রতি খেয়াল রাখা: আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর বান্দাদের অন্তরে তার মর্যাদা ও অবস্থা বাকি রাখার জন্য চেষ্টা করা। কারণ ইহা প্রবৃত্তির গোলামীর চাইতে তার জন্য কল্যাণকর ও উত্তম।
৭. নিজের সচ্চত্রিতার সুখ্যাতিকে অগ্রাধিকার দেয়া: পাপের মজার উপরে নিজের মান-সম্মান, পবিত্রতা, সচ্চত্রিতা ও তার মজাকে অগ্রাধিকার দেয়া।
৮. শত্রু শয়তানের উপর বিজয়ের আনন্দ: নিজের শত্রু শয়তানের প্রতি বিজয়ী হওয়ার আনন্দ করা এবং শয়তানকে তার দুশ্চিন্তা ও টেনশনসহ অপদস্ত করে পরাজিত করা। যার ফলে সে তার থেকে উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে না। আর আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর বান্দার থেকে পছন্দ করেন যে, সে যেন তার শত্রুকে নারাজ ও রাগান্বিত করে। যেমন আল্লাহ তা'য়ালা বলেন:
(ক) rqpon mIkj[ 1{ أَجْر}yxwv uts المُحْسِنِينَ ( التوبة: ١٢٠
“এবং তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফেরদের মনে ক্রোধের কারণ হয় আর শত্রুদের পক্ষ থেকে তারা যাকিছু প্রাপ্ত হয়-তার প্রত্যেকটির পরিবর্তে তাদের জন্য লিখিত হয় নেক আমল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সৎকর্মশীল লোকদের হক নষ্ট করবেন না।” [সূরা তাওবা: ১২০]
(খ) ۲۹ الفتح Q PO]
“যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফেরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন।” [সূরা ফাত্‌হ: ২৯]
(গ) Ζοπμ وَمَن يُهَاجِرُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يَجِدُ فِي الْأَرْضِ النساء : ١٠٠
“যে কেউ আল্লাহর পথে দেশত্যাগ করে, সে এর বিনিময়ে অনেক স্থান ও সচ্ছলতা প্রাপ্ত হবে।" [সূরা নিসা: ১০০]
অর্থাৎ: এমন জায়গা যেখানে আল্লাহর দুশমনদেরকে নারাজ করা যায়।
স্মরণ রাখতে হবে যে, আল্লাহর সত্য ভালবাসার আলামত হলো: তাঁর শত্রুদেরকে রাগান্বিত এবং নারাজ করা।
৯. সৃষ্টির রহস্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করা: চিন্তা করা যে তাকে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি; বরং তাকে তৈরী করা হয়েছে বড় একটি জিনিসের জন্য যা হাসিল করতে হলে অবশ্যই প্রবৃত্তির নাফরমানি ছাড়া সম্ভব না।
১০. লাভ ও লোকসানের মাঝে পার্থক্য করা: নিজের আত্মার জন্য এমন কিছু নির্বাচন না করা যার ফলে জীবজন্তু তার চেয়ে উত্তম হয়; কারণ একটি জন্তুও তার লাভ ও লোকসানের স্থানের মাঝে স্বভাবগতভাবে পার্থক্য করতে সক্ষম। তাই সে ক্ষতির উপরে লাভকে অগ্রাধিকার দেয়। আর মানুষকে এ জন্যই তো বিবেক দান করা হয়েছে। অতএব, সে যখন তার ভাল-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না অথবা জানার পরেও যা ক্ষতিকর তাকে প্রাধান্য দেয় তখন তার চেয়ে একটি জন্তুর অবস্থা অনেক ভাল প্রমাণ করে।
১১. পরিণতির প্রতি চিন্তা-ভাবনা করা: প্রবৃত্তির গোলামীর পরিণাম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যে, পাপ ও নাফরমানি তার কতো মান-সম্মান নষ্ট করেছে। কতোবার তাকে লাঞ্ছিত করেছে। একটি লোকমা কতো লোকমা হতে মাহরুম করেছে। একটি মজা বহু মজাকে হারিয়েছে। একটি কামনা-বাসনা মান-সম্মানকে টুকরা টুকরা এবং মাথা নিচু করে দিয়েছে। এ ছাড়া সুনামের বদলে বদনামী ছড়িয়েছে এবং এমন দুর্নাম ও ভর্ৎসনার উত্তরাধিকার বানিয়েছে, যা পানি দ্বারা ধৌত করা সম্ভব না। কিন্তু কি করা যাবে প্রবৃত্তির গোলামের চোখ অন্ধ হয়ে যায়!
১২. কি পেল আর কি হারাল: প্রবৃত্তির গোলাম তার উদ্দেশ্য পুরা করার পরের কথা ভাবা প্রয়োজন যে, সে কি পেল আর কি হারাল? কারণ উত্তম মানুষ পরিণাম যাচাই-বাছাই ছাড়া কোন কর্ম সম্পাদন করেন না।
১৩. নিজেকে অন্যের স্থানে রেখে ভাবা: প্রবৃত্তির গোলামীকে পূর্ণভাবে অন্যের ব্যাপারে ভাবার পর নিজেকে সে স্থানে রেখে চিন্তা করে দেখা; কারণ একটি জিনিসের হুকুম তার অনুরূপ জিনিসের মতই।
১৪. বিবেক ও দ্বীনের কাছে জিজ্ঞাসা করা: প্রবৃত্তির চাহিদার প্রতি চিন্তা করে দেখা। অত:পর সে ব্যাপারে তার বিবেক ও দ্বীনকে জিজ্ঞাসা করলে তাকে উত্তর দেবে যে, ইহা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় না। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ [রাঃ] বলেন: “যদি তোমাদের কারো কোন নারীকে ভাল লাগে, তাহলে তার পচা ও দুর্গন্ধময় স্থানসমূহ যেন স্মরণ করে। এতে করে সে তার ফেতনা হতে হেফাজতে থাকবে।
১৫. প্রবৃত্তির গোলামীর লাঞ্ছনাকে ঘৃণা করা: কারণ মনের কামনা-বাসনার যেই আনুগত্য করেছে সেই লাঞ্ছিত হয়েছে। আর প্রবৃত্তির গোলামদের শক্তি ও বড়াই দেখে ধোঁকায় পড়বেন না; কারণ তাদের ভিতর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ। কেননা অহঙ্কার ও লাঞ্ছনা তাদের মাঝে একত্রিত হয়েছে।
১৬. কল্যাণ ও অকল্যাণের তুলনা করা: এক দিক থেকে দ্বীন, ইজ্জত-সম্মান ও ধন-সম্পদের নিরাপত্তা এবং অন্যদিকে কাম্য ভোগের হাসিল দুইটির মাঝে তুলনা করা দরকার। নিশ্চয় দু'টির মাঝে কোন প্রকার আনুপাতিক হার খোঁজ করে পাবে না। অতএব, জেনে রাখুন যে, তার এটির দ্বারা অপরটির ব্যবসা সবচেয়ে আহমক লোকের কাজ।
১৭. উঁচু অভিপ্রায়: নিজেকে তার শত্রুর শক্তির অধীন হওয়াকে ঘৃণা করা; কারণ শয়তান যখন কোন ব্যক্তির মধ্যে ক্ষীণ মনবল ও দুর্বল অভিপ্রায় এবং প্রবৃত্তির প্রতি ঝোঁক দেখে তখন তার ব্যাপারে লোভ করে। এ ছাড়া তাকে ধরাশয় করে প্রবৃত্তির গোলামীর লাগাম পরিয়ে দেয় এবং যথা ইচ্ছা যেখানে-সেখানে চালাতে থাকে। আর যখন তার থেকে শক্ত মনবল ও আত্ম মর্যাদা এবং উচ্চাভিলাষ অনুভব করে তখন তার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু মাঝে মধ্যে অপহরণ ও চুরি করে থাকে।
১৮. প্রবৃত্তির গোলামীর ক্ষতি-লোকসান:
এ কথা জানা উচিত যে, প্রবৃত্তির আনুগত্য যে কোন জিনিসে মিশেছে তার বিপর্যয় ঘটেছে। যদি জ্ঞানের মাঝে মিশে তাহলে বিদাত ও ভ্রষ্টতার জন্ম নেই এবং তার জন্মদাতা প্রবৃত্তি পূজারি হয়ে যায়। আর যদি জুহুদে (আল্লাহমুখীতে) মিশে তাহলে তার সাথীকে রিয়া-সুম'য়া (লোক দেখানো ও শুনানো) ও সুন্নতের বিপরীতের দিকে ঠেলে দেয়। আর যদি বিচারে মিশে যায় তবে তার সঙ্গীকে জুলুম করতে ও সত্য হতে বিরত রাখে। আর যদি সম্পদ বণ্টনে মিশে তাহলে ইনসাফ থেকে জুলুমে নিয়ে যায়। আর যদি দায়িত্ব অর্পণ ও অপসারণে মিশে তাহলে আল্লাহ ও মুসলমানদের সাথে খেয়ানতে পতিত করে। তাই প্রবৃত্তির খাহেশ মোতাবেক যাকে ইচ্ছা তাকে পদ দেয় এবং যাকে ইচ্ছা তাকে অপসারণ করে। আর যদি এবাদতে মিশ্রণ ঘটে তাহলে আনুগত্য ও সান্নিধ্য হতে বের করে দেয়। মোট কথা যে কোন জিনিসে মিশে তা বিনষ্ট করে ফেলে।
১৯. শয়তানের চুরির দরজা: এ কথা জেনে রাখা উচিত যে, বনি আদমের নফসের পূজাই শয়তানের একমাত্র চুরির দরজা। এ পথ ধরেই সে ঢুকে তার অন্তর ও আমল বরবাদ করে ফেলে। সে এ প্রবৃত্তির গোলামী ছাড়া অন্য কোন দরজা পায় না। বিষ যেমন শরীরের প্রতিটি অংশে দ্রুত সংক্রম করে সেরূপ প্রবৃত্তির বিষক্রিয়া সবকিছুতে দ্রুত সংক্রমণ করে।
২০. শরিয়তের পরিপন্থী: আল্লাহ তা'য়ালা প্রবৃত্তির গোলামীকে তাঁর রসূলের প্রতি যা নাজিল করেছেন তার বিপরীত করেছেন। আর নফসের আনুগত্যকে রসূলগণের আনুগত্যের বিপরীত করেছেন। তাই আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন: ওহীর অনুসারী ও প্রবৃত্তির অনুসারী। ইহা কুরআনে অধিকবার উল্লেখ হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'য়ালার বাণী:
(১) ۞ فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَأَعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَتَهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ القصص: ٥٠
“অত:পর তারা যদি আপনার কথায় সাড়া না দেয়, তাহলে জানবেন, তারা শুধু নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। আল্লাহর হেদায়েতর পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে পথ দেখান না।” [সূরা কাসাস: ৫০]
(২) @?>=<;98765432[ Z C B A البقرة: ١٢٠
“যদি আপনি তাদের প্রবৃত্তিসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে আল্লাহর তরফ থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী নেই।” [সূরা বাকারা: ১২০]
২১. জীবজন্তুর সাথে সাদৃশ্য: আল্লাহ তা'য়ালা প্রবৃত্তি পূজারিদেরকে জঘন্য পশুর সাথে আকৃতি ও অর্থের দিক থেকে তুলানা ও সাদৃশ্য দিয়েছেন। কখনো কুকুরের সাথে যেমন তাঁর বাণী:
إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَلَهُ - {|}}zy] فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ الْكَلْبِ إِن عَلَيْهِ يَلْهَثْ أَوْ تَتْرُكْهُ يَلْهَثْ ذَلِكَ مَثَلُ الْقَوْمِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ ( الأعراف: ١٧٦ فَاقْصُصِ الْقَصَصَ
“অবশ্য আমি ইচ্ছা করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতাম সে সকল নিদর্শনসমূহের দৌলতে। কিন্তু সে যে অধঃপতিত এবং নিজের প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ে রইল। সুতরাং তার অবস্থা হল কুকুরের মত; যদি তাকে তাড়া কর তবুও হাঁপাবে আর যদি ছেড়ে দাও তবুও হাঁপাবে। এ হল সেসব লোকের উদাহরণ; যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে আমার নিদর্শনসমূহকে। অতএব, আপনি বিবৃত করুন এসব কাহিনী, যাতে তারা চিন্তা- ভাবনা করে।” [সূরা আ'রাফ: ১৭৬]
আবার কখনো গাধার সাথে সদৃশ দিয়েছেন যেমন আল্লাহর বাণী:
- المدثر: ٥٠/Z3210/ - - ,[ 01
“যেন তারা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গর্দভ। হট্টগোলের কারণে পলায়নপর।” [সূরা মুদ্দাসসির: ৫০-৫১]
আবার কখনো তাদের আকৃতিকে পরিবর্তন করে বানর ও শূকর করে দিয়েছেন। যেমন আল্লাহর বাণী:
RQPONILKJIHGFED[ ^]\\[ZXWVUTS Za المائدة: ٦٠
“বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি: তাদের মধ্যে কার মন্দ প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছেন, যাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন এবং যারা শয়তানের এবাদত করেছে, তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকেও অনেক দূরে।” [মায়েদা: ৬০]
২২. অযোগ্য ও অনুপযুক্ত: প্রবৃত্তির গোলামরা পরিচালনা, সরদারী, ইমামতি ও নেতা হওয়ার অযোগ্য। আল্লাহ তা'য়ালা তাদেরকে নেতৃত্ব থেকে অপসারণ করেছেন এবং তাদের আনুগত্য করা হতে নিষেধ করেছেন। অপসারণ সম্পর্কে আল্লাহ তাঁর খালীল ইবরাহীমকে বলেন:
} لِلنَّاسِ إِمَامًا قَالَ وَمِن ذُرِّيَّتِي قَالَ لَا عَهْدِي الظَّالِمِينَ البقرة: ١٢٤
"আমি তোমাকে মানবজাতির ইমাম করব। তিনি (ইবরাহীম) বললেন, আমার বংশধর থেকেও! তিনি (আল্লাহ) বললেন, আমার অঙ্গীকার অত্যাচারীদের পর্যন্ত পৌঁছবে না।” [সূরা বাকারা: ১২৪]
অর্থাৎ: জালেমরা আমার অঙ্গিকারভুক্ত নেতৃত্ব পাবে না। আর প্রতিটি প্রবৃত্তির গোলাম জালেম। যেমন আল্লাহর বাণী:
الرومutsrap]
"বরং যারা জালেম, তারা অজ্ঞতাবশতঃ তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে থাকে।” [সূরা রুম: ২৯]
আর আল্লাহ তাদের আনুগত্য থেকে নিষেধ করে বলেন:
@ ? > = < ; : 9876 5 [ ZA الكهف: ۲۸
“যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।” [সূরা কাহফ: ২৮]
২৩. মূর্তি পূজা:
আল্লাহ তা'য়ালা প্রবৃত্তির গোলামকে মূর্তি পূজারীর স্থানে রেখেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কিতাবের দুই স্থানে বলেন:
]! "#$ هَوَيْه : Z الفرقان: ٤٣ والجاثية: ٢٣
"আপনি কি তাকে দেখন না, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে।” [সূরা ফুরকান: ৪৩ ও সূর জাসিয়াহ: ২৩]
হাসান বাসরী (রহ:) বলেন: সে হলো ঐ মুনাফেক, যে কোন জিনিসের কামনা-বাসনা করে তারই উপর আরোহণ করে। তিনি আরো বলেন: মুনাফেক তার প্রবৃত্তির বান্দা; সে যে কোন জিনিসের ইচ্ছা করে তাই করে। এরূপ তাফসীর ইবনে আব্বাস [৯] থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
২৪. দোযখের খোঁয়াড়: নফসের কামনা-বাসনাই দোযখের খোঁয়াড়। এ দ্বারাই দোযখ বেষ্টিত। এতএব, যে এতে পতিত হবে সে দোযখে পতিত হবে। যেমনটি নবী []-এর হাদীস:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: « حُفَّتْ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ وَحُفَّتْ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ».
আনাস ইবনে মালেক [৯] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রসূলুল্লাহ [] বলেছেন: “জান্নাতকে অপছন্দনীয় জিনিস দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে। আর জাহান্নামকে নফসের কামনা-বাসনা দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে।”
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: « لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْجَنَّةَ وَالنَّارَ أَرْسَلَ جِبْرِيلَ إِلَى الْجَنَّةِ فَقَالَ انْظُرْ إِلَيْهَا وَإِلَى مَا أَعْدَدْتُ لِأَهْلِهَا فِيهَا قَالَ فَجَاءَهَا وَنَظَرَ إِلَيْهَا وَإِلَى مَا أَعَدَّ اللَّهُ لِأَهْلِهَا فِيهَا قَالَ فَرَجَعَ إِلَيْهِ قَالَ فَوَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا فَأَمَرَ بِهَا فَحُفَّتْ بِالْمَكَارِهِ فَقَالَ ارْجِعْ إِلَيْهَا فَانْظُرْ إِلَى مَا أَعْدَدْتُ لِأَهْلِهَا فِيهَا قَالَ فَرَجَعَ إِلَيْهَا فَإِذَا هِيَ قَدْ حُفَّتْ بِالْمَكَارِهِ فَرَجَعَ إِلَيْهِ فَقَالَ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خِفْتُ أَنْ لَا يَدْخُلَهَا أَحَدٌ، قَالَ اذْهَبْ إِلَى النَّارِ فَانْظُرْ إِلَيْهَا وَإِلَى مَا أَعْدَدْتُ لَأَهْلِهَا فِيهَا فَإِذَا هِيَ يَرْكَبُ بَعْضُهَا بَعْضًا فَرَجَعَ إِلَيْهِ فَقَالَ وَعَزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ فَيَدْخُلَهَا فَأَمَرَ بِهَا فَحُفَّتْ بِالشَّهَوَاتِ فَقَالَ ارْجِعْ إِلَيْهَا فَرَجَعَ إِلَيْهَا فَقَالَ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَنْجُوَ مِنْهَا أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا ». قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ.
আবু হুরাইরা [] থেকে বর্ণিত, তিনি রসূলুল্লাহ [] হতে বর্ণনা করেন। তিনি [] বলেন: আল্লাহ তা'য়ালা জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করে জিবরীলকে জান্নাত দেখার জন্য প্রেরণ করেন। আল্লাহ বলেন: জান্নাত ও তার অধিবাসীদের জন্য সেখানে যা তৈরী করেছি তা দেখ আস। নবী [] বলেন: জিবরীল জান্নাত ও তার অধিবাসীদের জন্য আল্লাহ সেখানে যা তৈরী করেছেন তা দেখে এসে বললেন: আল্লাহ তোমার ইজ্জতের কসম! যে কেউ তার কথা শুনবে সে তাতে প্রবেশ করবে। অত:পর আল্লাহ তা'য়ালা জান্নাতকে অপছন্দনীয় জিনিস দ্বারা বেষ্টন করার নির্দেশ করলেন। এরপর আবার আল্লাহ জিবরীলকে জান্নাত ও তার অধিবাসীদের জন্য সেখানে যা তৈরী করেছেন তা দেখার জন্য নির্দেশ করলেন। নবী [] বলেন: জিবরীল ফিরে গিয়ে দেখল জান্নাতকে কষ্টকর জিনিস দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে। ফিরে এসে জিবরীল বললেন: আল্লাহ তোমার ইজ্জতের কসম! আমার ভয় হচ্ছে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
এরপর আল্লাহ তা'য়ালা জিবরীলকে বললেন: জাহান্নাম ও তার অধিবাসীদের জন্য সেখানে যা তৈরী করেছি তা দেখে এসো। সেখানে দেখলেন: জাহান্নামের একাংশ অন্যাংশের উপর সওয়ার হয়ে আছে। এসে বললেন: আল্লাহ তোমার ইজ্জতের কসম! কেউ জাহান্নামের কথা শুনে তাতে প্রবেশ করবে না। এরপর আল্লাহ জাহান্নামকে শাহওয়াত (কামনা-বাসনা) দ্বারা বেষ্টন করার নির্দেশ দিলেন। অত:পর জিবরীলকে আবার ফিরে যাওয়ার জন্য বললেন। জিবরীল দেখে এসে বললেন: আল্লাহ তোমার ইজ্জতের কসম! আমার ভয় হয় কেউ তা হতে নাজাত পাবে না।”
২৫. কুফরির ভয়: প্রবৃত্তির অনুসারীর অজান্তে ইসলাম থেকে তার খারিজ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নবী []-এর হাদীস:
عن عبد الله بن عمرو ، قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: « لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبْعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ » رواه في شرح السنة.
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর [] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রসূলুল্লাহ [] বলেছেন: "তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ তার প্রবৃত্তি আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুগত না হবে।”
عَنْ أَبِي بَرْزَةَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: « إِنَّ مِمَّا أَخْشَى عَلَيْكُمْ شَهَوَاتِ الْغَيِّ فِي بُطُونِكُمْ وَفُرُوجِكُمْ وَمُضِلَّاتِ الْهَوَى». أحمد والطبراني.
আবু বারজা [রাঃ] হতে বর্ণিত, তিনি নবী [ﷺ] থেকে বর্ণনা করেন। তিনি [ﷺ] বলেছেন: “যা হতে তোমার প্রতি ভয় করি তা হলো: তোমাদের পেট ও লজ্জাস্থানের বিভ্রান্তি ও প্রবৃত্তির ভ্রষ্টতা।”
২৬. ধ্বংসের কারণ: প্রবৃত্তির গোলামী ধ্বংসকারী বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। নবী [ﷺ]-এর বাণী:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ : « ثَلاث مُنْجِيَاتٌ ، وَثَلاثُ مُهْلِكَاتٌ ، فَأَمَّا الْمُنْجِيَاتُ : فَتَقْوَى اللَّهِ فِي السِّرِ وَالْعَلَانِيَّةِ، وَالْقَوْلُ بِالْحَقِّ فِي الرَضَا وَالسَّخَطِ، وَالْقَصْدِ فِي الْغَنَى وَالْفَقْرِ، وَأَمَّا الْمُهْلكَاتُ : فَهَوَى مُتَبَعٌ، وَشُحٌ مُطَاعٌ، وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بنَفْسِهِ، وَهِيَ أَشَدُّهُنَّ ». رواه البيهقي في شعب الإيمان، قال الألباني في " السلسلة الصحيحة " ٤ : ٤١٣ فهو بمجموعها حسن إن شاء الله تعالى
আবু হুরাইরা [] থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ [] বলেন: “তিনটি জিনিস নাজাতদানকারী এবং তিনটি জিনিস ধ্বংসকারী। নাজাতদানকারী হলো: প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহভীরুতা, রাজি ও নারাজ সর্বাবস্থায় সত্য বলা এবং স্বচ্ছল ও অস্বচ্ছলে মিতব্যয়িতা। আর ধ্বংসকারী হলো: অনুসরণীয় প্রবৃত্তি, মান্য কৃপণ্যতা এবং আত্মগর্ব। শেষেরটি হলো সব চাইতে মারাত্মক।”
২৭. বিজয়ের কারণ:
নিশ্চয় প্রবৃত্তির বিপরীত বান্দার শরীরে, অন্তরে ও জবানে শক্তি সৃষ্টি করে। কোন একজন সালাফে সালেহীন বলেছেন: নিজের প্রবৃত্তির উপর জয়ী ব্যক্তি একাই একটি শহর বিজয়কারী ব্যক্তির চাইতেও বেশি শক্তিশালী। আর বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَب». متفق عليه.
আবু হুরাইরা [ ] থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ [ ] বলেছেন: “ধরাশায়কারী তো শক্তিশালী নয় বরং প্রকৃত সবল হলো: যে রাগের সময় নিজেকে আয়ত্ব রাখতে পারে।”
অতএব, বান্দা যখন তার প্রবৃত্তির বিপরীত করবে তখন সে তার শক্তির সাথে আরো শক্তি অর্জন করতে পারবে।
২৮. মানবিকতা ও চক্ষুলজ্জতা: নিজের প্রবৃত্তির বিপরীতকারী সব চাইতে বেশি মানবিক ব্যক্তি। মু'আবিয়া [ ] বলেন: মানবিকতা হলো: মনের কামনা-বাসনা ত্যাগ করা এবং প্রবৃত্তির নাফরমানি করা; কারণ প্রবৃত্তির অনুসরণ মানবিকতাকে অসুস্থ বানিয়ে দেয় এবং তার বিপরীত করা মানবিকতাকে সুস্থ রাখে।
২৯. বিবেক ও প্রবৃত্তির লড়াই: প্রতিদিন প্রবৃত্তি ও বিবেকের মাঝে তাদের সাথীকে নিয়ে লড়াই হয়। অতঃপর যে তার সাথীর উপর বেশি শক্তিশালী হয় সে অপরকে ভাগিয়ে দিয়ে নিজের কর্তৃত্ব চালাই। আবুদ্দারদা [রা.] বলেন: যখন মানুষ প্রভাত করে তখন তার প্রবৃত্তি ও আমল একত্রিত হয়। অত:পর যদি তার আমল প্রবৃত্তির অনুগত হয়, তাহলে তার সে দিনটি হবে জঘন্য দিন। আর যদি তার প্রবৃত্তি আমলের অনুগত হয়, তাহলে তার সে দিন হবে উত্তম দিন।
৩০. ভুল হওয়ার সম্ভবনা: আল্লাহ তা'য়ালা ভুল ও প্রবৃত্তির আনুগত্যকে সঙ্গী বানিয়েছেন অনুরূপ সঠিক ও প্রবৃত্তির বিপরীত করাকেও সঙ্গী বানিয়েছেন। যেমন কোন একজন সালাফে সালেহীন বলেছেন: যদি তোমার প্রতি দু'টি জিনসের মাঝে সমস্যা হয় যে, কোনটি সুপথ ও সঠিক তাহলে তোমার প্রবৃত্তির যেটি নিকটতম সেটির বিপরীত কর। কারণ ভুলের নিকটম হল প্রবৃত্তির আনুগত্যে।
৩১. রোগ ও চিকিৎসা: প্রবৃত্তি রোগ এবং তার চিকিৎসা হলো তার বিপরীত করা। কোন এক বিজ্ঞজন বলেছেন: তুমি যদি চাও তাহলে তোমার রোগের খবর দেব। আর যদি সে রোগের ঔষধ সম্পর্কে জানতে চাও তাহলে তারও খবর দেব। রোগ হলো তোমার প্রবৃত্তি এবং তার ঔষধ হলো প্রবৃত্তির বিপরীত করা।
৩২. জিহাদ: প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ যদি কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদের চাইতে বড় না হয়, তবে তার চেয়ে কম না। একজন মানুষ হাসান বাসরী (রহ:) কে বললেন: হে আবু সাঈদ! সবচেয়ে উত্তম জিহাদ কি? তিনি বললেন: তোমার প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ:) বলেন: নফস ও প্রবৃত্তির জিহাদ কাফের ও মুনাফেকদের সাথে জিহাদের মূল; কারণ তাদের সাথে জিহাদ করতে ততক্ষণ পারবে না যতক্ষণ নিজের নফস ও প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করে তাদের পর্যন্ত না বের হবে।
৩৩. রোগ বৃদ্ধি হতেই থাকে:
প্রবৃত্তি রোগকে বৃদ্ধিকারী এবং তার বিপরীত হলো রক্ষাকারী। যে ব্যক্তি তার রোগ বৃদ্ধিকারী জিনিস ব্যবহার করে এবং রক্ষাকারী জিনিস হতে দূরে থাকে তাকে তার রোগ ধরাশায়ী করেই ছাড়ে। আব্দুল মালেক ইবনে কারীব বলেন: আমি একজন বেদুঈনের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় দেখলাম, সে কঠিন চক্ষুপ্রদাহে আক্রান্ত এবং তার চোখ থেকে গাল বয়ে অশ্রু ঝড়ছে। আমি তাকে বললাম: তোমার চক্ষুদ্বয় কেন মুছছো না? সে বলল: ডাক্তার আমাকে মুছতে বারণ করেছেন। আর ওর মাঝে কোন কল্যাণ নেই যে অন্যকে বারণ করে কিন্তু নিজে বিরত থাকে না। আর যখন নির্দেশ করে নিজে উপদেশ গ্রহণ করে না। বললাম: তুমি কিছু চাও? সে বলল: হ্যাঁ, কিন্তু আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি। নিশ্চয়ই দোযখবাসীদের রক্ষাকারী জিনিসের উপরে তাদের প্রবৃত্তির কামানা-বাসনা জয়ী হয়েছে। যার ফলে তাদেরকে ধ্বংস করেছে।
৩৪. মাহরুম ও তওফিকপ্রাপ্ত না হওয়া: প্রবৃত্তির গোলামী বান্দার তওফিকের দরজাসূমহ বন্ধ করে দেয় এবং অপদস্ত ও ভর্ৎসনার দরজাসমূহ খুলে দেয়। তাই তাকে দেখবে সে নিবেদিত মনে বলতে থাকে: যদি আল্লাহ তাকে তওফিক দিত তাহলে এমন এমন হত বা করত। অথচ সে প্রবৃত্তির গোলামীর দ্বারা নিজে তার তওফিকের দরজাসমূহ বন্ধ করে দিয়েছে। ফুযাইল ইবনে ইয়ায বলেন: যার উপরে তার প্রবৃত্তি ও মনের কামনা-বাসনা জয়ী হয়েছে তার থেকে তওফিকের সবউৎস বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
কোন একজন বিজ্ঞজন বলেছেন: কুফরি চারটি জিনেসে: রাগ, শাহওয়াত (প্রবৃত্তির কামানা-বাসনা), আশা ও ভয়ে। অত:পর বলেন: এর মধ্যে দু'টি দেখেছি। একজন রাগ হয়ে নিজের মাকে হত্যা করেছে এবং অপরজন প্রেমে পড়ে খ্রীষ্টান হয়ে গেছে। কোন একজন ব্যক্তি বায়তুল্লাহর তওয়াফ করা অবস্থায় এক সুন্দরী নারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে। নারীর নিকটে পৌঁছে বলে: দ্বীনের ভালবাসা কামনা করছি কিন্তু প্রবৃত্তির গোলামী আমাকে আশ্চর্য করতেছে। তাই আমার প্রবৃত্তির কামনা ও দ্বীনের ভালবাসা নিয়ে কি করব? মহিলাটি বলল: দু'টির একটি ছেড়ে দাও দ্বিতীয়টি হাসিল হয়ে যাবে।
৩৫. বিবেকের বিপর্যয়: যে ব্যত্তি তার প্রবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দেবে তার বিবেক ও চিন্তাধারার বিপর্যয় ঘটবে; কারণ সে তার বিবেকের ব্যাপারে আল্লাহর সাথে খেয়ানত করেছে তাই তিনি তার বিবেকে বিপর্যয় ঘটিয়েছেন। আর এই হলো আল্লাহর তা'য়ালার নিয়ম: যেই তাঁর কোন বিষয়ে খেয়ানত করে তার ভাগ্যে বিপর্যয় মিলে। মু'তাসিম একদিন তাঁর এক সাথীকে বলেন: হে অমুক! যখন প্রবৃত্তির সাহায্য হয় তখন চিন্তাধারা বিদায় নেয়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ)-কে একজন বলে: যখন কোন ব্যক্তি দিরহাম সমীক্ষায় খেয়ানত করে তখন আল্লাহ তা'য়ালা তার সমীক্ষা শক্তি ছিনিয়ে নেন অথবা বলে, ভুলিয়ে দেন। উত্তরে শাইখ বলেন: অনুরূপ প্রযোজ্য ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের খেয়ানত করে ইলমী মাসায়েলে তথা জ্ঞানের বিধানসমূহে।
৩৬. কবর ও আখেরাতে সঙ্কির্ণতা: যে ব্যত্তি স্বীয় প্রবৃত্তির আনুগত্যকে প্রশস্ত করে দেবে তার প্রতি কবরে ও রোজ কিয়ামতে সঙ্কির্ণ করা হবে। আর যে প্রবৃত্তির বিপরীত করে তার উপর সঙ্কির্ণ করবে কবরে ও কিয়ামতে প্রশস্ত করা হবে। আল্লাহ তা'য়ালা বিষটির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তার এ বাণীতে:
۱۲ :الإنسان ZZYXWVU ]
"এবং তাদের সবরের প্রতিদানে তাদেরকে দিবেন জান্নাত ও রেশমী পোশাক।” [সূরা দাহার: ১২]
যখন ধৈর্যে রয়েছে প্রবৃত্তির গোলামী থেকে বন্দী রাখায় কঠোরতা ও সঙ্কির্ণতা তখন তাদেরকে এর বিনিময়ে আল্লাহ প্রতিদান দিয়েছেন রেশমী কাপড়ের কোমলতা ও জান্নাতের প্রশস্তা।
আবু সুলাইমান দারানী বলেন: এ আয়াতে আল্লাহর প্রতিদান তাদেরকে নফসের কামনা-বাসনা থেকে ধৈর্যধারণের জন্যে।
৩৭. বাধা সৃষ্টি: প্রবৃত্তির গোলামকে রোজ কিয়ামতে নাজাতপ্রাপ্তদের সাথে দাঁড়িয়ে দৌড়াতে বাধা সৃষ্টি করানো হবে, যেমন সে দুনিয়াতে তার অন্তরকে তাঁদের সঙ্গী হওয়া থেকে বাধা দিয়েছিল।
মুহাম্মদ ইবনে আবুল ওয়ারদ বলেন: আল্লাহ তা'য়ালা এমন একটি দিন বানিয়েছেন, যে দিন প্রবৃত্তির গোলামরা তার মসিবত হতে নাজাত পাবে না। আর কিয়ামতের দিন সবচেয়ে দেরীতে যারা উঠবে তারা হলো প্রবৃত্তির গোলামরা। আর বিবেক যখন তালাশের ময়দানে দৌড়াই তখন সবচেয়ে অধিক হাসিলকারী হয় সবরকারী। বিবেক হলো খনি এবং তা হতে খনিজপদার্থ বের করার মেশিন হলো চিন্তা-ভাবনা।
৩৮. দৃঢ়তার বন্ধন খুলে যায়: প্রবৃত্তির গোলামী দৃঢ়তার বন্ধনকে খুলে ও দুর্বল করে দেয় এবং তার বিপরীত দৃঢ়তাকে মজবুত ও শক্ত করে দেয়। আর দৃঢ়তা এমন এক বাহন যাতে আরোহণ করে বান্দা আল্লাহ ও আখেরাতের দিকে সফর করতে পারে। তাই যদি বাহন বিকল হয়ে পড়ে তাহলে মুসাফিরের যাত্রা ব্যাহত হয় এবং উদ্দেশ্য মঞ্জিল অনেক দূরের হয়ে যায়।
ইয়াহয়া ইবনে মু'আযকে দৃঢ়তার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি সঠিক ব্যক্তি কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন: নিজের প্রবৃত্তির উপর জয়ী ব্যক্তি।
একদিন খালাফ ইবনে খালীফা আমীর সুলাইমান ইবনে হাবীব ইবনে মাহলাবের নিকট প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁর নিকট ছিল সবচেয়ে সুন্দরী বাদ্র (পূর্ণিমার চাঁদ) নামের দাসী। আমীর সুলাইমান খালাফকে জিজ্ঞাসা করলেন: এ দাসীসিটিকে কেমন দেখছেন? তিনি বললেন: আল্লাহ আমীরকে ভাল রাখুন! তাঁর দু'চোখ কখনো এর চাইতে সুন্দর আর কিছু দেখেনি। উত্তরে আমীর বললেন: তাহলে তার হাত ধরে নিয়ে যান। উত্তরে খালাফ বললেন: আমি আমীর সাহেবকে এর বিষয়ে কষ্ট দিতে চাইনা; কারণ এর ব্যাপারে তাঁর পছন্দ ও বিস্ময় দেখেছি। আমীর বললেন: আপনার অমঙ্গল হোক! তার ব্যাপারে আমার পছন্দ ও আশ্চর্যের পরেও তাকে নিয়ে যান; কারণ এতে করে আমার প্রবৃত্তি জানতে পারবে যে, আমি তার উপরে বিজয়ী।
৩৯. খুবই জঘন্য সোয়ারী: প্রবৃত্তি পূজারী ঐ অশ্বরোহীর মত যার ঘোড়া দ্রুতগামী, লাগামহীন, দৌড়ানোর সময় তার আরোহীকে আছাড় দেয় অথবা বিপজ্জনক স্থানে নিয়ে পৌঁছে দেয়।
এক বিজ্ঞজন বলেছেন: জান্নাতের দিকে সবচেয়ে দ্রুতগামী বাহন হচ্ছে দুনিয়ায় আল্লাহমুখী হওয়া। আর জাহান্নামের দিকে দ্রুতগামী বাহন হচ্ছে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার ভালবাসা। আর যে তার প্রবৃত্তির সোয়ারীতে আরোহণ করে তাকে দ্রুত ধ্বংসের উপত্যকায় নিয়ে ছাড়ে।
অন্য এক বিজ্ঞজন বলেছেন: সবচেয়ে সম্মানিত আলেম হলেন, যে তার দ্বীনের হেফাজতের জন্যে দুনিয়া হতে ভাগে এবং প্রবৃত্তির পিছনে চলা তার প্রতি বড় কঠিন হয়।
আতা (রহ:) বলেন: যার প্রবৃত্তি বিবেকের উপরে বিজয়ী এবং তার ধৈর্য তাকে অস্থির ও উৎকণ্ঠিত করে সে লাঞ্ছিত হয়।
৪০. তাওহীদের বিপরীত: তাওহীদ ও প্রবৃত্তির গোলামী একটি অপরটির বিপরীত; কারণ প্রবৃত্তি হলো একটি মূর্তি। প্রতিটি বান্দার অন্তরে তার প্রবৃত্তি অনুসারে একটি করে মূর্তি রয়েছে। আর আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রসূলগণকে সকল মূর্তি ভাঙ্গা ও কোন শরীক ছাড়া একমাত্র আল্লাহর এবাদত করার জন্য প্রেরণ করেছেন। আল্লাহর এ উদ্দেশ্য নয় যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা আর অন্তরের মূর্তিগুলো রেখে দেয়া। বরং উদ্দেশ্য প্রথমে অন্তরের মূর্তিগুলো ভাঙ্গা।
হাসান ইবনে আলী আল-মুতাওয়ী বলেন: প্রতিটি মানুষের মূতি হলো তার প্রবৃত্তি। এতএব, যে তার বিপরীত করে তা ভেঙ্গে ফেলবে তাকেই তো যুবক বলা যাবে। আর ইবরাহীম খালীল [ﷺ] তাঁর জাতিকে যে কথা বলেন তা একবার চিন্তা করে দেখুন।
أَنتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ 2 I{ZyxW[ الأنبياء: ৫২
“যখন তিনি (ইবরাহীম) তাঁর পিতা ও তাঁর জাতিকে বললেন: এই মূর্তিগুলো কী, যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছ?।” [সূরা আম্বিয়া: ৫২]
ইহা ঐ মূর্তিগুলোর অনুরূপ যা অন্তরে পতিত হয়, সেগুলোর পূজা এবং আল্লাহ ছাড়া সেগুলোর এবাদত করে। আল্লাহ তা'য়ালার বাণী:
أَرَوَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا ) +*) &%$#! / 2210 الفرقان: ৪৩ - ৪৪
"আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বুঝে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং আরও পথভ্রান্ত।" [সূরা ফুরকান: ৪৩-৪৪]
৪১. সমস্ত রোগের মূল: নিশ্চয় প্রবৃত্তির বিপরীত করাই হচ্ছে অন্তর ও শরীরের রোগের নির্মূলকরণ এবং তার অনুসরণ হচ্ছে অন্তর ও শরীরের রোগসমূহের আমন্ত্রণ। আর সমস্ত অন্তরের ব্যাধির উৎপত্তি হলো প্রবৃত্তির গোলামী থেকে। যদি শরীরের রোগসমূহকে পরীক্ষা করে দেখেন তাহলে অধিকাংশ পাবেন, যা ত্যাগ করা উচিত ছিল সেগুলোর উপরে প্রবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
৪২. দুশমনি ও হিংসার বুনিয়াদ: মানুষের মাঝে সংঘটিত সকল শত্রুতা, অনিষ্ট ও হিংসার মূল ও বুনিয়াদ হচ্ছে প্রবৃত্তির গোলামী। অতএব, যে তার প্রবৃত্তির বিপরীত করবে সে তার অন্তর ও শরীর এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আরাম দিয়ে নিজেকে ও অন্যান্যকে আরাম দিল।
আবু বকর ওয়াররাক বলেন: যখন প্রবৃত্তি জয়ী হয় তখন অন্তরের প্রতি জুলুম করে আর যখন জুলুম করে তখন বুকটা সঙ্কির্ণ হয়ে পড়ে। আর বুকটা যখন সঙ্কির্ণ হয়ে যায় তখন চরিত্র নোংরা হয়ে যায় এবং যখন চরিত্র নোংরা হয় তখন মানুষ তাকে ঘৃণা করে এবং সেও মানুষকে ঘৃণা করে। দেখুন! প্রবৃত্তির গোলামী পরস্পর ঘৃণা, অনিষ্ট, দুশমনি ও অধিকার হতে মাহরুম ইত্যাদির কিভাবে জন্ম দেয়।
৪৩. বিজয়ী একজন:
আল্লাহ তা'য়ালা বান্দার মাঝে প্রবৃত্তি ও বিবেক সৃষ্টি করেছেন। দু'টির মধ্যে যেটি শক্তিশালী হয় সেটির বিজয় হয় এবং অপরটি ঢাকা পড়ে যায়। যেমন আবু আলী সাকাফী বলেন: যার প্রবৃত্তি জয়ী হয় তার বিবেক ঢাকা পড়ে যায়। অতএব, দেখুন যার বিবেক ঢাকা পড়ে এবং তার বিপরীত প্রকাশ পায় তার পরিণতি কি হয়।
আলী ইবনে সাহল (রহ:) বলেন: বিবেক ও প্রবৃত্তি সর্বদা ঝগড়া করে। অত:পর তওফিক হয় বিবেকের সঙ্গী আর অপদস্ত হয় প্রবৃত্তির সঙ্গী। আর নফস দুইজনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে যার বিজয় হয় তার সঙ্গী হয়ে যায়।
৪৪. শয়তানের হাতিয়ার: আল্লাহ তা'য়ালা অন্তরকে শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাদশাহ বানিয়েছেন এবং তাঁর পরিচয় জানার এবং তাঁকে মহব্বত ও এবাদত করার খনি করেছেন। আর অন্তরকে দু'টি বাদশাহ, দু'টি সেনাবাহিনী, দু'টি সাহায্যকারী এবং দু'টি হাতিয়ার দ্বারা পরীক্ষায় ফেলেছেন। সত্য, আল্লাহমুখী ও হেদায়েত হলো একটি বাদশাহ যার সাহায্যকারী হলো ফেরেশতাগণ এবং সেনাবাহিনী হলো সততা ও এখলাস এবং প্রবৃত্তির বিপরীত চলা।
আর বাতিল হলো দ্বিতীয় বাদশাহ যার সাহায্যকারী হলো শয়তানরা, সেনাদল হলো তার সৈন্যরা এবং হাতিয়ার হলো প্রবৃত্তির গোলামী। আর নফস দুই সেনাদলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে। বাতিলের সেনাবাহিনী অন্তরে প্রবেশ করে নফসের ছিদ্র ও তার পাশ দিয়ে। নফস হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে তার বিপরীত শত্রুর সাথে যোগ দেয়; যার ফলে অন্তরের প্রতি বিপদ এসে পড়ে। নফসেই তার পক্ষ থেকে অন্তরের দুশমনকে অস্ত্র সর্বারহ করে ও তার জন্যে শহরের দরজা খুলে দেয়। অতঃপর শত্রু কেল্লায় প্রবেশ করে বাতিলের বিজয় ডঙ্কা বাজিয়ে অন্তরের উপরে অপদস্ত ও লাঞ্ছনার কলঙ্ক লাগায়।
৪৫. সবচেয়ে বড় দুশমন: মানুষের বড় দুশমন হলো তার শয়তান ও প্রবৃত্তি এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু হলো তার বিবেক এবং কল্যাণকামী ফেরেশতা। অতএব, যখন সে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে ও তার ফাঁদে পড়ে কয়েদী হয় এবং দুশমনকে খুশী হওয়ার সুযোগ করে দেয়, তখন তার বন্ধু ও প্রিয়জন নারাজ হয়ে যায়। ইহা এমন জিনিস যা থেকে নবী [ﷺ] সর্বদা আশ্রয় প্রার্থনা করতেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: « يَتَعَوَّذُ مِنْ جَهْدَ الْبَلَاءِ وَدَرَكَ الشَّقَاءِ وَسُوءِ الْقَضَاءِ وَشَمَاتَةِ الْأَعْدَاء». متفق عليه.
আবু হুরাইরা [রাঃ] থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ [সাঃ] আশ্রয় প্রার্থনা করতেন: কঠিন বিপদ, দুর্ভাগ্য, অনিষ্টকর ফয়সালা ও দুশমনদের আন্দন করা হতে।”
৪৬. শেষ পরিণতি লাঞ্ছনা-গঞ্জনা: প্রতিটি বান্দার শুরু ও শেষ রয়েছে। অতএব, যার শুরু প্রবৃত্তির গোলামী তার শেষ অপদস্ত, লাঞ্ছনা, বঞ্চিত, বালা-মসিবত প্রবৃত্তির আনুগত্য অনুপাতে। বরং প্রবৃত্তির কারণে তার শেষ এমন শাস্তি হয়ে দাঁড়াই যার দ্বারা তার অন্তরে কঠিন ব্যথা অনুভব করতে থাকে। যদি প্রত্যেক ভীষণ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের অবস্থার প্রতি ধেয়ান করেন, তবে দেখবেন তার শুরুটা প্রবৃত্তির অনুসরণ ও বিবেকের উপর অগ্রাধিকার দেয়া। আর যার শুরুটা প্রবৃত্তির বিপরীত দ্বারা এবং তার বুদ্ধির আনুগত্য তার পরিণতি সম্মান, অমুখাপেক্ষী এবং আল্লাহ ও মানুষের নিকট ইজ্জত।
আবু আলী দাক্কাক বলেন: যে ব্যক্তি তার শাহওয়াত তথা প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার প্রতি যৌবনে মালিক হয় তাকে আল্লাহ তা'য়ালা তার পরিণতবয়সে সম্মানিত করেন।
মুহাল্লাব ইবনে আবী সুফরাকে জিজ্ঞাসা করা হয়: এ পর্যন্ত কি দ্বারা পৌঁছছেন? উত্তরে বলেন: দৃঢ়তার আনুগত্য এবং প্রবৃত্তির নাফরমানি দ্বারা। ইহাই হচ্ছে দুনিয়ার শুরু ও শেষ। আর আখেরাতের শেষ আল্লাহ তা'য়ালা প্রবৃত্তির বিপরীতকারীর জন্যে জান্নাত এবং প্রবৃত্তির অনুসারীর জন্যে জাহান্নাম রেখেছেন।
৪৭. পায়ের বেড়ি ও গলার ফাঁস: নফসের কামনা-বাসনা অন্তরের গোলামী, গলার ফাঁস ও পায়ের বেড়ি এবং তার অনুসরণ প্রতিটি মন্দের কয়েদী। অতএব, যে প্রবৃত্তির বিপরীত করে সে তার গোলামী থেকে আজাদ হয় এবং গলার ফাঁস ও পায়ের বেড়ি খুলে ফেলে ঐ ব্যক্তির স্থানে হয়, যার উপর পরস্পর বিরোধী কয়জন মালিক ছিল।
অনেক আবৃত ব্যক্তিকে তার প্রবৃত্তি কয়েদী করে পর্দা ফাঁস করে উলঙ্গ করে ছাড়ে। মন পূজরী ব্যক্তি একজন দাস যখন সে প্রবৃত্তির উপর জয়ী হয় তখন সে ফেরেশতা স্বরূপ হয়ে যায়।
আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক বলেন: মসিবত ও তার কিছু লক্ষণ রয়েছে। আর তা হলো: প্রবৃত্তি হতে তোমার মুক্ত হওয়া না দেখা। বান্দা নফসের কামনা-বাসনার গোলাম এবং আজাদ ব্যক্তি একবার পরিতৃপ্তি হলে দ্বিতীবার ক্ষুধার্ত হয়।
৪৮. সুখী জিন্দেগী হারায়: প্রবৃত্তির বিপরীত করা বান্দাকে এমন মর্যাদায় পৌঁছায় যে, যদি সে আল্লাহর উপর কসম করে তাহলে তিনি তা পূর্ণ করেন। আর প্রবৃত্তির কারণে যা হারিয়েছে তার বদলায় বহুগুণ প্রয়োজন পূরণ করে দেন। সে ঐ ব্যক্তির মত, যে পশুমল হতে বিমুখ হওয়ার বদলায় মণি-মুক্তা পায়। আর প্রবৃত্তির অনুসারী দুনিয়া ও আখেরাতের এমন সবমঙ্গল ও সুখী জিন্দেগী হারায় যার কখনো তুলনা হয় না প্রবত্তির উপর জয়ী হলে। ইউসুফ [عليه السلام]-এর হারাম হতে নিজের নফসকে বিরত রাখার ফলে জেলখানা থেকে বের হওয়ার পর তাঁর হাত, জবান, পা ও নফসের প্রশস্তা কতটুকু হয়েছিল সে ব্যাপারে একবার চিন্তা-ভাবনা করে দেখুন।
আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী বলেন: আমি সুফিয়ান ছাওরী (রহ:) কে স্বপ্নে দেখে তাঁকে বলি আল্লাহ তা'য়ালা আপনার সাথে কি ব্যবহার করেছেন? উত্তরে বলেন: আমাকে কবরে রাখার পর পরই আল্লাহ তা'য়ালার সামনে দাঁড়াই। তিনি আমার খুবই সহজ হিসাব নেন। অত:পর আমাকে জান্নাতে নেয়ার জন্য নির্দেশ করেন। আমি এখন জান্নাতের বৃক্ষরাজি ও নদীসমূহের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখানে না কোন শব্দ শুনি আর না কোন নড়াচড়া। হঠাৎ করে শুনতে পেলাম একজন বলতেছে: সুফিয়ান ইবনে সা'দ! বললাম: সুফিয়ান ইবনে সা'দ! সে বলল: তোমার কি মনে পড়ে যে, একদিন আল্লাহ তা'য়ালাকে তোমার প্রবৃত্তির গোলামীর উপরে প্রাধান্য দিয়েছিলে? বললাম: জি হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! অত:পর চতুষ্পার্শ্ব হতে আমার উপর ফুল বর্ষিতে লাগল।
৪৯. কিয়ামতে সম্মান ও মর্যাদা:
নিশ্চয় প্রবৃত্তির বিপরীত চলাতে রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মান ও মর্যাদা। এ ছাড়া রয়েছে প্রকাশ্যে ও গোপনের ইজ্জত। আর প্রবৃত্তির আনুগত্যে রয়েছে বান্দার জন্যে দুনিয়া ও আখেরাতে অপদস্ত এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে লাঞ্ছনা। যখন আল্লাহ তা'য়ালা কিয়ামতের ময়দানে সকলকে জমায়েত করবেন তখন একজন আহ্বানকারী ডেকে বলবে: আজ সম্মানিত ব্যক্তি কারা সবাই জানতে পারবে, মুত্তাকীগণ দাঁড়িয়ে যান। অতঃপর তারা ইজ্জতের স্থানের দিকে চলে যাবেন। আর প্রবৃত্তির গোলামরা হাশরের ময়দানে মাথা নিচু করে প্রবৃত্তির তাপে, ঘামে ও ব্যথায় দাঁড়িয়ে থাকবে যখন মুত্তাকীরা আল্লাহর আরশের নিচে অবস্থান করবে।
৫০. আল্লাহর আরশের নিচে ছায়ালাভ:
যদি আপনি যে সাত প্রকার মানুষকে আল্লাহ রোজ কিয়ামতে তাঁর আরশের নিচে ছায়াস্ত করবেন যেদিন আর কোন ছায়া থাকবে না তাঁদের ব্যাপারে চিন্তা করেন তাহলে পাবেন যে, তাঁরা এ ছায়া শুধুমাত্র প্রবৃত্তির বিপরীত চলার জন্যে পাবে; কারণ একজন শক্তিশালী রাষ্ট্রপতি ততক্ষণ ইনসাফ করতে পারেন না যতক্ষণ তিনি তাঁর প্রবৃত্তির বিপরীত না করেন। একজন যুবক যৌবনের চাহিদার উপরে আল্লাহর এবাদতকে প্রাধান্য ততক্ষণ দিতে পারেন যতক্ষণ প্রবৃত্তির বিপরীত করতে সক্ষম না হয়। আর যে ব্যক্তির অন্তর মসজিদসমূহের সাথে ঝুলন্ত তাকে একাজে উৎসাতি করতে পারে শুধুমাত্র প্রবৃত্তির বিপরীত, যে তাকে কামনা-বাসনার স্থানসমূহের দিকে ডাকে।
আর গোপনে দান-সাদাকাকারী এমনকি তার বাম হাতও জানতে পারে না। যদি তার প্রবৃত্তিকে দমন না করত তাহলে একাজ করতে সক্ষম হত না।
আর যাকে বংশীয় সুন্দরী নারী অপকর্মে ডেকেছিল সেও বেঁচেছিল আল্লাহকে ভয় ও প্রবৃত্তির বিপরীত করে।
আর যে একাকী নির্জনে আল্লাহর জিকির করে তাঁর ভয়ে দু'চোখের অশ্রু ঝড়াই তাকেও এ পর্যন্ত পৌঁছেছে প্রবৃত্তির বিপরীত চলা।
এঁদের প্রতি হাশরের ময়দানের তাপ, ঘাম ও কষ্টের কোন কিছুই পৌঁছবে না।
আর প্রবৃত্তির গোলামদেরকে কিয়ামতের দিনের তাপ, ঘাম ও কষ্ট পূর্ণভাবে গ্রাস করবে। এ ছাড়া তারা অপেক্ষা করবে এরপরে প্রবৃত্তির জেলে তথা জাহান্নামে প্রবেশের। আল্লাহ তা'য়ালাই একমাত্র আমাদের নফসে আম্মারা তথা কুপ্রবৃত্তির গোলামী থেকে রেহাই দেয়ার মালিক।
হে আল্লাহ! তুমি আমাদের কুপ্রবৃত্তিকে যার মাঝে তোমার সন্তুষ্টি ও ভালবাসা রয়েছে তার অনুগত করে দাও। নিশ্চয় তুমি সবকিছুর প্রতি ক্ষমতাশালী এবং কবুলকারী।

টিকাঃ
১. রাওযাতুল মুহিব্বীন ও নুজহাতুল মুশতাকীন: ইমাম ইবনুল কায়্যেম (রহঃ)-এর কিতাব থেকে গ্রহণ করা হয়েছে: ৪৬৯ হতে ৪৮৬ পৃ দেখুন।
১. বুখারী ও মুসলিম
১. তিরমিযী, তিনি হাদীসটিকে হাসান-সহীহ বলেছেন।
১. শারহুস সুন্নাহ-ইমান নববী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আর শাইখ আলবানী য'ঈফ বলেছেন।
২. আহমাদ ও তবারানী
১. বাইহাকী-শু'আবুল ঈমানে, শাইখ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন, সিলসিলা সহীহা:৪/৪১৩
১. বুখারী ও মুসলিম
১. বুখারী ও মুসলিম

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00