📄 ঐতিহাসিক মুজিযা
বিরোধীদের চ্যালেঞ্জের জবাবে মুমিনদেরকে সাহায্য করার জন্য কুরআন কারিম পূর্ববর্তী উম্মাহর ইতিহাস বর্ণনার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। এমন অনেক মানুষের জীবনী সম্পর্কে দলিলনির্ভর পদ্ধতিতে ও নিতান্ত সূক্ষ্মভাবে সংবাদ দিয়েছে, যারা হাজার হাজার বছর পূর্বে জীবনযাপন করেছে—ঐতিহাসিকরা বস্তুজাগতিক প্রমাণের মাধ্যমে যে পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবেন না। কুরআন কারিম পূর্ববর্তী উম্মাহর ইতিহাস উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে অভিনবত্বের পথ অবলম্বন করেছে। স্পষ্ট করে দিয়েছে—এসব কাহিনির বর্ণনার পেছনে কেবল সান্ত্বনা ও প্রশান্তি দান উদ্দেশ্য নয়, বরং মূল তাৎপর্য হচ্ছে দিকপ্লাবী প্রভাব সৃষ্টি করে ব্যাপ্তিশীল মর্মবাণী সম্পর্কে অবহিত করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةً لِّأُولِي الْأَلْبَابِ : مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَ لكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَ تَفْصِيلَ كُلَّ شَيْءٍ وَ هُدًى وَ رَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُوْنَ
তাদের কাহিনিতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়; এটি কোনো মনগড়া কথা নয়। কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, তাদের জন্য পূর্বেকার কালামের সমর্থন, প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ। [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১১১]
ইমাম সুয়ুতি রাহিমাহুল্লাহর আলোচনা অনুপাতে ঐতিহাসিক মুজিযা হলো-অতীত শতাব্দী, প্রাচীন জাতিসমূহ, ঘূর্ণনশীল সংবিধানসমূহ সম্বলিত হওয়া; যেসব ঘটনার ছিটেফোটা বিরল কিছু আহলে কিতাব পণ্ডিত ছাড়া কেউ জানত না, যারা এগুলো শিক্ষা করতে নিজেদের জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। এমন ঘটনাগুলোই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণরূপে বিশুদ্ধভাবে হুবহু বর্ণনা করতেন—অথচ তিনি ছিলেন উম্মি, পড়ালেখা জানতেন না।[১৭৪]
মানুষ তো মানুষই। শত শত শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে, একের পর এক বহু প্রজন্ম জন্ম নিয়েছে, কিন্তু তাদের স্বভাবের পরিবর্তন হয়নি, পাল্টেনি তাদের প্রকৃতি। এজন্য কুরআন কারিম অতীত জাতির সাথে তাদের কাছে প্রেরিত নবিদের আলোচনাও করেছে। বহু কাল অতীত হওয়ার পর মানুষের সামনে নতুনভাবে তাদেরকে তুলে ধরা হয়েছে, যেন এর দ্বারা অতীতের অনুরূপ সামাজিক ও আত্মিক রোগগুলোর চিকিৎসা করা যায়। সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বড় বড় রোগগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য অনেক ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, বহু প্রকার শিক্ষা ও নানা প্রকার ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সে রোগের জীবাণুগুলোর মূলোৎপাটন করা হয়েছে।[১৭৫]
উদাহরণস্বরূপ আমরা হজরত নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনাটি নিয়ে একটু ভেবে দেখব। নিজের জাতির হিদায়াতের জন্য তাঁর দাওয়াতের প্রারম্ভিক যুগ থেকে নিয়ে সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শ বছরের ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকেরা বড় বড় মিথ্যার যেসব পসরা সাজিয়েছিল, সেগুলোও বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে মুমিনদের সংখ্যাস্বল্পতা, জাহাজ নির্মাণ, মুমিনদের তাতে আরোহণ, মহাপ্লাবনের ঘটনা, নবির পুত্র ও স্ত্রীর ডুবে যাওয়ার ঘটনা; এরপর হজরত নুহ এবং তাঁর প্রতি ঈমান গ্রহণকারীদের সামনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়সহ-সবকিছু তুলে ধরা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিস্তারিত বিবরণ কীভাবে জানলেন, যার কিছু দিক মাত্র আহলে কিতাবদের গ্রন্থগুলোতে বিবৃত হয়েছে, আরও অজস্র দিক উল্লেখই হয়নি! অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো নিশ্চিতভাবে জানিয়েছেন। এজন্য আমাদের রব হজরত নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনাকে এভাবে শেষ করেছেন-
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ : مَا كُنْتَ تَعْلَمُهَا أَنْتَ وَ لَا قَوْمُكَ مِنْ قَبْلِ هَذَا ، فَاصْبِرْ إِنَّ الْعَاقِبَةَ لِلْمُتَّقِينَ .
এটি গায়েবের খবর; আমি আপনার প্রতি ওহি প্রেরণ করছি। ইতিপূর্বে এটা আপনার ও আপনার জাতির জানা ছিল না। আপনি ধৈর্যধারণ করুন। যারা ভয় করে চলে, সুপরিণাম তাদেরই জন্য। [সুরা হুদ, আয়াত: ৪৯]
এই চিরসত্য ঘটনাটি কুরআন কারিমের অনেকগুলো ঘটনার একটি। যা প্রমাণ করে, কুরআন কারিম এর ঐতিহাসিক প্রামাণ্যে মুজিযা। এর ওপর ভিত্তি করে অনেক মানুষের সভ্যতা ও বিভিন্ন জাতির রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
কুরআন কারিমের ঐতিহাসিক মুজিযাগুলোর স্পষ্ট আরেকটি উদাহরণ হলো— ফেরাউনের নামের সাথেই তার নৈকট্যপ্রাপ্ত হামানের মতো লোকের নাম উল্লেখ করা। আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের ভাষায় বলেছেন-
وَ قَالَ فِرْعَوْنُ يَأَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِّنْ إِلٰهِ غَيْرِي : فَأَوْقِدْ لِي يُهَامُنُ عَلَى الطَّيْنِ فَاجْعَلْ لِّي صَرْحًا لَّعَلَّى أَطَّلِعُ إِلَى إِلٰهِ مُوسَى : وَ إِنِّي لَأَظُنُّه مِنَ الْكَذِبِينَ.
ফেরাউন বলল, হে পারিষদবর্গ, আমি জানি না, আমি ব্যতীত তোমাদের কোনো উপাস্য আছে! হে হামান, তুমি ইট পোড়াও; অতঃপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ করো, যাতে আমি মুসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আমার তো ধারণা হচ্ছে, সে একজন মিথ্যাবাদী। [সুরা কাসাস, আয়াত: ৩৮]
ওল্ড টেস্টামেন্টের [১৭৬] একটি গ্রন্থে হামানের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, কুরআন কারিম ঠিক তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। সে ইরাকের ব্যবিলিয়ন শহরের বাদশার সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং ইসরাইলিদের অনেক বড় ক্ষতি করেছে। অথচ এটি সংঘটিত হয়েছে হজরত মুসা আলাইহিস সালামের প্রায় এগারোশ বছর পরে। ফেরাউন- কেন্দ্রিক গবেষণা কুরআন কারিমের বর্ণনাকে বিশুদ্ধ প্রমাণ করেছে। বিভিন্ন গ্রন্থ ও হায়রোগ্লিফ চিত্রলিপি থেকে হামানের গুরুত্বপূর্ণ ও পূর্ণ পরিচয় উদ্ধার হয়েছে; তা হলো-মিশরের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে হামানের নাম সরাসরি উল্লেখ আছে। বর্তমানে ভিয়েনার একটি জাদুঘরে পাথরের ওপরও তার নামটি পাওয়া যায়। এমনিভাবে মুজামু আসমায়িল আশখাসি ফিল ইমবারাতুরিয়্যাহ-dictionary of personal names of the new empire-নতুন সাম্রাজ্যের ব্যক্তিদের নামের অভিধান গ্রন্থেও তার নামটি এসেছে। মিশরীয় সমস্ত শিলালিপি ও কাষ্ঠলিপির ওপর ভিত্তি করে এই গ্রন্থটির রচনা শেষ হয়েছে। এ গ্রন্থে হামানের পদের কথা উল্লেখ রয়েছে; সে পাথরকাটা শ্রমিকদের দায়িত্বশীল ছিল।[১৭৭]
কুরআন কারিমের আরেকটি ঐতিহাসিক মুজিযা হলো-হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের যুগের মিশরের শাসকের জন্য 'মালিক-বাদশা' উপাধিটি ব্যবহার করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
وَ قَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَ سَبْعَ سُن بُلْتٍ خُضْرٍ وَ أُخَرَ يُبِسْةٍ : يَأَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِنْ كُنْتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُوْنَ .
বাদশা বলল-আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভি, এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভি খেয়ে যাচ্ছে; সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে পরিষদবর্গ, তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলো, যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাকো। [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৪৩]
অথচ তাওরাত মিশরের শাসকের জন্য 'ফেরাউন' উপাধিটি ব্যবহার করেছে। কুরআন কারিম ইউসুফ আলাইহিস সালামের যুগের শাসকের ক্ষেত্রে 'ফেরাউন' উপাধিটির ব্যবহার পরিত্যাগের কারণ হলো, সে যুগে মিশরের শাসকের জন্য 'ফেরাউন' উপাধিটির মূল 'বারউ' ব্যবহার করা হতো না, বরং তা 'রাজাপ্রাসাদ ও বাদশা' অর্থে ব্যবহৃত হতো। মিশরের শাসকের জন্য 'ফেরাউন' উপাধিটির ব্যবহার আরম্ভ হয় হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের তিরোধানের দুইশ বছর পর থেকে। [১৭৮] হজরত মুসা আলাইহিস সালামের যুগে মিশরের শাসকদের উপাধি ছিল 'ফেরাউন'। এখান থেকেই কুরআন কারিমের ঐতিহাসিক মুজিযা প্রতিভাত হয়ে ওঠে। বিষয়টি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম! কেবল হজরত মুসা আলাইহিস সালামের সময়েই মিশরের শাসকের জন্য 'ফেরাউন' উপাধিটি ব্যবহার করেছে কুরআন কারিম, অথচ তাওরাতে হজরত ইবরাহিম, ইউসুফ এবং মুসা আলাইহিমুস সালামের সবার যুগের জন্যই মিশরের শাসকের ক্ষেত্রে ‘ফেরাউন’ উপাধিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে; কিন্তু মিশরীয়রা হজরত ইবরাহিম ও ইউসুফ আলাইহিমাস সালামের যুগে মিশরের শাসকের জন্য ‘ফেরাউন’ উপাধিটি ব্যবহার করত না। [১৭৯]
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রাহিমাহুল্লাহর দারুণ একটি উক্তি উল্লেখ করে শিরোনামটির ইতি টানব। তিনি বলেছেন-এই ঘটনাগুলো মুহাম্মদ আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের নবুওয়্যাতের প্রমাণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উম্মি-নিরক্ষর। কোনো গ্রন্থ অধ্যয়ন করেননি, কোনো শিক্ষকের হাতে শিষ্যত্বও গ্রহণ করেননি! এমন মানুষ যখন এসব বাস্তব ঘটনা কোনো প্রকার বিকৃতি ছাড়া নির্ভুলভাবে বর্ণনা করেন, প্রমাণিত হয়, তিনি এসব ওহির মাধ্যমেই জানতে পেরেছেন-যা তাঁর নবুওয়্যাতের বিশুদ্ধতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।[১৮০]
টিকাঃ
[১৭৪] আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন, জালালুদ্দিন সুযুতি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা: ৩২৩。
[১৭৫] নাজরাতুন ফিল কুরআন, মুহাম্মদ আল-গাজালি, পৃষ্ঠা : ৯৫-৯৮。
[১৭৬] ইহুদিদের কুতুবুল মুকাদ্দাস-পবিত্র গ্রন্থসমূহ
[১৭৭] মুজিযাতুল কুরআনিয়্যাহ, হারুন ইয়াহইয়া, পৃষ্ঠা: ৭১-৭২。
[১৭৮] উইকিপিডিয়া ব্রিটানিকা বলেছে-'মালিক' উপাধিটি মিশরের সে সকল শাসকের জন্য ব্যবহার করা হতো, যারা খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৪০-১৬৪৮ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত শাসনক্ষমতায় আরোহণ করেছে। অর্থাৎ মিশরে হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের আগমনের প্রাক্কালে।-মুকিউ মাওসুআতুল ইজাজিল ইলমিয়্যি ফিল কুরআনি ওয়াস সুন্নাহ, www. ৫৫a.net/firas/arabic
[১৭৯] আল-মুজিযাতুল কুরআনিয়্যাহ, হারুন ইয়াহইয়া, পৃষ্ঠা: ৭৪-৭৫。
[১৮০] মাফাতিহুল গাইব, ইমাম রাজি, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১১৯১。
📄 মদিনার সংখ্যালঘু অমুসলিমদের সঙ্গে নবিজির আচরণ
মদিনায় হিজরত করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানকার নেতায় পরিণত হন। মদিনার অভ্যন্তরীণ মুশরিক ও ইহুদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাঁর সাথেই বসবাস করত। যখন ইসলামি রাজত্বের বিস্তৃতি ঘটে, তখন কোনো কোনো অঞ্চলে আগ থেকেই খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের অবস্থান ছিল। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল এবং সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় রীতিনীতির চর্চা স্বাধীনভাবেই পালন করত।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ওহি অবতরণের শুরুর দিকেই ইসলাম এই স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়েছে—যেন এর মাধ্যমে মনুষ্যত্ব সমুন্নত হতে পারে ও মানুষজন এর ছায়া অবলম্বন করে যেন সুখ অনুভব করতে পারে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন-চরিতই অমুসলিম সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে উত্তম সাক্ষী। ইসলামের শুরুর যুগে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের ওপর মক্কাবাসীদের নির্যাতন দেখে, তিনি নিজেও মক্কাবাসীদের নির্যাতন ও নিপীড়নে দগ্ধ হয়ে এবং তাদের নিষ্ঠুরতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও তিনি কাফির মুশরিকদের সাথে তাদের অনুরূপ নীতি অবলম্বন করেননি। এমনকি যখন আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও অনুগ্রহে বিজয় লাভ করেন, তখনো তিনি কুরআনের নির্দেশনা মেনে তাদের সাথে এমন আচরণ করেননি এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ
তুমি কি ঈমান আনার জন্য মানুষের সাথে জবরদস্তি করবে? [সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯৯]
উক্ত আয়াতে বর্ণিত নীতিকেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তবায়ন করেছেন এবং মানুষকে তার ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সকল মুসলমানের জন্য এ আয়াতকেই সংবিধান বানিয়েছেন। নিন্মোক্ত আয়াতের শানে নুজুল থেকে এর মর্মার্থ আরও জোরালোভাবে প্রতীয়মান হয়।
আল্লাহ তাআলার বাণী-
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ
দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হিদায়াত গোমরাহি থেকে পৃথক হয়ে গেছে। [সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬]
বর্ণিত আছে—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্ব থেকেই বনু সালিম ইবনু আউফ গোত্রের একজন আনসারি সাহাবির দুজন খ্রিষ্টান ছেলে ছিল। অতঃপর তারা দুজন খ্রিষ্টানদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে তেল নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদিনায় আসেন। বাবা তার দু ছেলেকে দেখে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে বলতে থাকে—তোমরা মুসলিম না হলে আমি তোমাদেরকে ছাড়ব না। তারা উভয়ে মুসলিম হতে অস্বীকার করে এবং তাদের মাঝে তর্কবিতর্কও শুরু হয়ে যায়। তাদের এ বিবাদের কথা রাসুলের কাছে পৌঁছে যায়। পিতা বলেন-ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার দেহের একটি অংশ [আমার ছেলে] জাহান্নামে যাবে; আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব, এটা কেমন করে হয়! এমন সময় আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন-
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই।
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পরে তাদের দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। [১৮১]
দেখতে পেলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই খ্রিষ্টান সন্তানের বাবাকে নির্দেশ দিলেন তাদেরকে নিজ আকিদা-বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেওয়ার জন্য, অথচ বাবার অধিকার ছিল সঠিক পথ অবলম্বন করানোর জন্য তাদেরকে চাপ প্রয়োগ করা। তবুও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তাদের নিজ আকিদা-বিশ্বাস এবং ইবাদতের স্বাধীনতায় ছেড়ে দিতে বলেছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার প্রথম সংবিধানেই প্রত্যেক ধর্মের স্বাধীনতার বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন। এর প্রমাণ হচ্ছে—তিনি মদিনার ইহুদিদের জন্য মুসলিমদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র একটি জাতি এবং সমাজব্যবস্থা গঠনের অনুমতি প্রদান করেছিলেন।[১৮২]
এমনিভাবে তিনি অমুসলিমদের সাথে ন্যায়সংগত ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করেছেন। এর একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে-আবদুর রহমান ইবনু আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন-কোনো এক সফরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আমরা একশ ত্রিশজন ছিলাম। একসময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন-
هَلْ مَعَ أَحَدٍ مِنْكُمْ طَعَامٌ؟
তোমাদের কারও সঙ্গে কি খাবার রয়েছে?
দেখা গেল, এক ব্যক্তির সঙ্গে এক সা কিংবা তার কমবেশি পরিমাণ খাদ্য রয়েছে। সেটা দিয়ে আটা গোলানো হলো। অতঃপর দীর্ঘদেহী এলোমেলো চুলবিশিষ্ট এক মুশরিক একটি বকরির পাল হাঁকিয়ে নিয়ে এলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—
بَيْعًا أَمْ عَطِيَّةً، أَوْ قَالَ: أَمْ هِبَةٌ؟
বিক্রি করবে, না উপহার দেবে?[১৮৩]
সে বলল—না, বিক্রি করব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে একটা বকরি কিনে নিলেন। সেটি জবেহ করা হলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরির কলিজা ভুনা করার আদেশ দিলেন। আল্লাহর কসম, একশ ত্রিশজনের প্রত্যেককে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কলিজা অল্প অল্প করে সবার হাতে দিলেন; যারা অনুপস্থিত ছিল, তাদের জন্য তুলে রাখলেন। অতঃপর দুটি পাত্রে তিনি গোশত ভাগ করে রাখলেন। সবাই পরিতৃপ্ত হয়ে খেল। আর উভয় পাত্রে কিছু উদ্বৃত্ত রয়ে গেল। সেগুলো আমরা উটের পিঠে উঠিয়ে নিলাম।[১৮৪]
এই হলো-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণ ইনসাফ। যখন একশ ত্রিশজনের একটি দল প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত, তখন একজন মুশরিক বকরি নিয়ে যাওয়া অবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটি ন্যায্য মূল্য দিয়ে ক্রয় করলেন। তাঁর সাথে ছিল পর্যাপ্ত শক্তি এবং প্রয়োজনও ছিল খুব তীব্র। এদিকে লোকটিও ছিল কাফির এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসী। চাইলেই তিনি বিনা মূল্যে জোর করে নিতে পারতেন; তবে তিনি এমনটি করেননি। নিশ্চয়ই এটি ছিল ন্যায়পরায়ণতার সমুন্নত দৃষ্টান্ত।
তিনি তাঁর নিকটতম অমুসলিমদের সাথেও নিজ পরিবারের সদস্যদের ন্যায় আচরণ করতেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—এক ইহুদি বালক নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত করত, সে একবার অসুস্থ হলে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখার জন্য গেলেন। তিনি বালকটির মাথার নিকট বসে বলেন-
أَسْلِمْ
তুমি মুসলিম হয়ে যাও।
বালকটি তার পিতার দিকে তাকাল। পিতা তার ছেলেকে বলল—তুমি আবুল কাসিমের [১৮৫] কথা মেনে নাও। অতঃপর সে ইসলাম গ্রহণ করল। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় বললেন-
الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন।[১৮৬]
এমনকি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তাঁর অমুসলিম মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছিলেন। (পরবর্তীতে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার মা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন)
আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন—যখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কুরাইশবাসী চুক্তি করেছিল, তখন আমার মা [১৮৭]—তিনি তখন মুশরিক ছিলেন—তার পিতার সঙ্গে আমার নিকট আসেন। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা [১৮৮] রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন—হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা আমার কাছে এসেছেন; তিনি ইসলামের প্রতি আসক্ত নন। আমি কি তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব? জবাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
نَعَمْ صِلِيهَا
হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। [১৮৯]
এক ইহুদির জানাজা অতিক্রমকালে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দেখিয়েছিলেন মানবতার মুগ্ধকর এবং উত্তম দৃষ্টান্ত। আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলা রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত— সাহল ইবনু হুনাইফ [১৯০] ও কায়স ইবনু সাদ [১৯১] রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কাদিসিয়াতে উপবিষ্ট ছিলেন; তখন লোকেরা তাদের সামনে দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাচ্ছিল। জানাজাটি দেখে তারা দাঁড়িয়ে গেলেন। তাদেরকে বলা হলো—এ তো এ দেশীয় জিম্মি [অমুসলিম] ব্যক্তির জানাজা। তখন তারা বললেন—একদা নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তাকে বলা হলো—এটা তো এক ইহুদির জানাজা! তখন তিনি বললেন—
أَلَيْسَتْ نَفْسًا
সে কি মানুষ নয়? [১৯২]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই তাঁর উম্মতকে অমুসলিমদের সম্মান করা শিখিয়েছেন। এমনকি তাদের মৃতদেরকেও সম্মান করতে বলেছেন।
মোটামুটি সংক্ষিপ্তভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম আদর্শের কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সামনে আরেকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেই সমাপ্তি টানব, ইনশাআল্লাহ!
খায়বারের ইহুদিদের সাথে নবিজির উত্তম আচরণ
খায়বারের যুদ্ধে মুসলিমদের সাথে ইহুদিদের পরাজয়ের পর যখন তারা সন্ধি মেনে নেয়, তখন তারা ছিল দুর্বল অবস্থানে আর মুসলিমরা ছিল শক্তিশালী অবস্থানে। এ পরিস্থিতিতে মুসলিমরা চাইলেই পারত তাদের ওপর কোনো বিষয় চাপিয়ে দিতে। কিন্তু নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ক্ষেত্রে ভিন্নপন্থা অবলম্বন করে তাদের সাথে সদাচরণ করেছেন এবং উত্তম ব্যবহারের পরিচয় দিয়েছেন।
সাহল ইবনু আবু হাসমা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—তার গোত্রের কিছু লোক খায়বারে গিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তাদের একজনকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। যে অধিবাসীদের নিকটে লাশ পাওয়া যায়, তাদেরকে তারা বলল, তোমরা আমাদের সাথিকে হত্যা করেছ। তারা বলল, আমরা তাকে হত্যা করিনি, আর হত্যাকারী কে, তাও জানি না। এরপর তারা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা খায়বার গিয়েছিলাম আর আমাদের একজনকে সেখানে নিহত অবস্থায় পেয়েছি। তখন তিনি বললেন-
الكُبْرَ الكُبر
বড়দেরকে বলতে দাও, বড়দেরকে বলতে দাও।
তারপর তিনি তাদেরকে বললেন-
تَأْتُونَ بِالْبَيِّنَةِ عَلَى مَنْ قَتَلَهُ قَالُوا: مَا لَنَا بَيِّنَةٌ، قَالَ فَيَحْلِفُونَ قَالُوا: لَاَ نَرْضَى بِأَيْمَانِ اليَهُودِ، فَكَرِهَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُبْطِلَ دَمَهُ، فَوَدَاهُ مِائَةٌ مِنْ إِبِلِ الصَّدَقَةِ .
তোমাদেরকে তার হত্যাকারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করতে হবে। তারা বলল-আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই। তিনি বললেন, তাহলে ওরা কসম করবে। তারা বলল, ইহুদিদের কসমে আমাদের বিশ্বাস নেই। এই নিহত ব্যক্তির রক্ত বৃথা হয়ে যাক, তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করলেন না। তাই সাদাকার একশ উট দিয়ে তার রক্তপণ আদায় করলেন। [১৯৩]
হত্যাকাণ্ডটি যেহেতু ইহুদিদের এলাকায় ঘটেছে, তাই হত্যাকারী তাদের মধ্য থেকেই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সবচেয়ে বেশি। তবুও যেহেতু এ ধারণার কোনো প্রমাণ নেই, আর স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম হচ্ছে, সন্দেহ ও অনুমানের ভিত্তিতে দাবি কখনো কার্যকর হতে পারে না-এজন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কোনোরূপ শাস্তিও প্রদান করেননি। তিনি শুধু এতটুকু বলেছেন-তাদেরকে শপথ করতে হবে এই বলে- আমরা এরূপ কাজ করিনি।
শুধু তা-ই নয়, তিনি মুসলিমদের কোষাগার থেকে নিহত ব্যক্তির রক্তপণও পরিশোধ করে দিয়েছেন-যেন আনসারদের ক্ষোভ প্রশমিত হয় এবং ইহুদিদের কোনো ক্ষতি ছাড়াই এই ফিতনা থেমে যায়।
এই ছিল মদিনার অমুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়নিষ্ঠ ও দয়া এবং অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ।
সমাপ্ত
টিকাঃ
[১৮১] আসবাবুন-নুজুল, ওয়াহিদি আন-নিশাপুরি: ৫৩; লুবাবুন নুজুল, সুয়ুতি: ৩৭
[১৮২] আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনু কাসির: ২/৩২১; আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনু হিশাম: ১/৫০১; আর-রওজুল উনুফ, সুহাইলি: ২/৩৪৫
[১৮৩] এতে বুঝে আসে তাদের সাথে লেনদেন এবং তাদের হাদিয়া গ্রহণ করা যাবে। -ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার আসকালানি: ৪/৪১০। তবে কিছু কিছু হাদিয়া গ্রহণের ব্যাপারে মতানৈক্য আছে।
[১৮৪] সহিহুল বুখারি: ২৬১৮, ৫৩৮২; সহিহ মুসলিম: ২০৫৬
[১৮৫] নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কুনিয়াত তথা উপনাম。
[১৮৬] সহিহুল বুখারি, ১৩৫৬; সুনানুত তিরমিজি, ২২৪৭
[১৮৭] তিনি হলেন বনি আমের ইবনু লুআই গোত্রের অধিবাসী কুতাইলা বিনতে সাদ। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী। তিনিই আসমা ও আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহুর মা। তিনি অনেক পরে মুসলিম হয়েছেন; হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মুশরিক অবস্থায় মদিনায় আগমন করেন। উসদুল গাবা, ইবনুল আসির: ২/২৪২
[১৮৮] তিনি আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর মেয়ে আসমা। জুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহর অধীনে ছিলেন। নবুওয়্যাতের শুরুর দিকেই তিনি মুসলিম হয়েছেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়েরকে গর্ভে ধারণ অবস্থায় মদিনায় হিজরত করেন। কুবাতে এসে তাঁর গর্ভপাত হয়। জুমাদিউল উলা মাসের ৭৩ হিজরিতে তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর নিহত হবার কিছুক্ষণ পরেই তিনি ইন্তিকাল করেন। উসদুল গাবা, ইবনুল আসির: ৬/১২
[১৮৯] সহিহুল বুখারি: ২৬২০; সহিহ মুসলিম: ১০০৩
[১৯০] সাহল ইবনু হুনাইফ ইবনু ওয়াহিব—তিনি বদর যুদ্ধে এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধেও তিনি দৃঢ়তার সাথে নিজ ভূমিকায় অটল ছিলেন। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বসরায় গমনকালে তাকে মদিনার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেছিলেন। সিফফিন যুদ্ধে তিনি আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ছিলেন এবং আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে পারস্যের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। ৮৮ হিজরিতে কুফায় তিনি ইন্তিকাল করেন।-আল-ইস্তিআব, ইবনু আব্দিল বার: ২/২২৩; উসদুল গাবা, ইবনুল আসির: ২/৩৩৫; আল-ইসাবা, ইবনু হাজর আসকালানি: ৫৩২৩ নং জীবনী。
[১৯১] কায়স ইবনু সাদ ইবনু উবাদা—তিনি আরবের একজন প্রভাবশালী বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ও সম্ভ্রান্ত লোক ছিলেন। ছিলেন একজন দক্ষ সমরকুশলী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তাঁর স্থান ছিল তেমন, যেমন থাকে একজন শাসকের কাছে পুলিশ প্রধানের স্থান। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর হাতেই পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। তিনি সেখানেই ৫৯ হিজরি অথবা ৬০ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন। আল- ইসাবা, ইবনু হাজার আসকালানি: ৭১৭৬ নং জীবনী; উসদুল গাবা, ইবনুল আসির: ২৭২; আল-ইস্তিআব, ইবনু আবদিল বার: ২/২২৩
[১৯২] সহিহুল বুখারি: ১৩১৩; সহিহ মুসলিম: ৯৬১
[১৯৩] সহিহুল বুখারি: ৬১৪২; সহিহু মুসলিম: ১৬৬৯