📄 নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নারীর অধিকার
ইসলাম নারীকে যত্ন ও অনুগ্রহের বেষ্টনীতে ঘিরে রেখেছে; তাকে উঁচু করেছে, তাকে সম্মানিত করেছে। কন্যা ও স্ত্রী হিসেবে, বোন ও মা হিসেবে ইসলাম নারীকে বিশেষ মর্যাদা ও সদাচরণের অধিকারী করেছে। ইসলামই প্রথম এই সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে- নারী ও পুরুষের সৃষ্টিমূল একই। সংগত কারণেই মানবিক অধিকারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
يأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَ خَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءٌ ةَ وَ اتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ هُ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا .
হে মানবসমাজ, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাঞ্চা করে থাকো এবং আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। [সুরা নিসা, আয়াত: ১]
এ বিষয়ে আরও অনেক আয়াত রয়েছে, যেগুলো নারী-পুরুষের সমন্বিত মানবতার মধ্যকার উদ্ভূত বৈষম্যকে তিরোহিত করে ইসলামের ফয়সালা বর্ণনা করেছে। ইসলামের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে, বর্বর যুগের নীতিমালা ও পূর্ববর্তী জাতিগুলোর কৃষ্টিকে অস্বীকার করে—যেগুলোতে নারীদেরকে নিচু করে উপস্থাপন করা হয়েছে-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর অধিকার রক্ষার জন্য দাঁড়িয়েছেন এবং নারীর জন্য এমন নির্ঝঞ্ঝাট অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যেখানে অতীতের দর্শনগুলো পৌঁছুতে পারেনি; এমনকি ভবিষ্যতেও কোনো জাতি সে পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে না। ইসলাম নারীর জন্য মা, বোন, বিবি এবং কন্যার মতো আদর, স্নেহ ও ভালোবাসাময় অধিকার নির্ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত চৌদ্দ শতাব্দী যাবৎ পশ্চিমা নারীরা তাদের অধিকার আদায় করার জন্য আন্দোলন করেই যাচ্ছে; কিন্তু হায়, এখনো তা সম্ভব হয়নি!
মৌলিকভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বপূর্ণ নীতির জন্য উঁচু স্তরের মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন। সেটা হলো-মর্যাদা ও অবস্থানগতভাবে নারীরা পুরুষের সমান। কেবল নারী হওয়ার কারণে তাদের মর্যাদা ও অবস্থান কখনো নিচু হবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ النِّسَاءَ شَقَائِقُ الرِّجَالِ
নিশ্চয় নারীরা পুরুষের অংশ-বোন।[140]
অর্থাৎ নারীরা পুরুষের সাথে পূর্ণরূপে সাদৃশ্যপূর্ণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রমাণিত-তিনি সর্বদা নারীদের জন্য অসিয়ত করতেন এবং সাহাবা কিরামকে বলতেন-
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا
নারীদের জন্য কল্যাণের অসিয়ত গ্রহণ করো।[১৪১]
বিদায় হজের ভাষণের প্রাক্কালে লক্ষ লক্ষ উম্মতের সামনে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নসিহতগুলো বারংবার উল্লেখ করেছেন।
আমরা যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-প্রদত্ত নারীর উচ্চতা ও মর্যাদা- বিষয়ক প্রবর্তিত বিষয়গুলো বর্ণনা করতে চাই, তখন আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-নারীদের প্রাচীন ও আধুনিক বর্বরতার পাল্লায় রাখা, যেন আমরা প্রকৃত অন্ধকারের স্বরূপ এবং এর চলমান অবস্থা অবলোকন করতে পারি; যাতে করে আমাদের সামনে ইসলামের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার ছায়ায় নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়।
জাহালাতের যুগে আরবের প্রথা ছিল-কন্যা-সন্তানকে জীবিত প্রোথিত করা। পক্ষান্তরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজকে মহা অপরাধ ও হারাম ঘোষণা করেছেন; জাহেলি যুগের বর্বর মানুষরূপী পশুগুলো কন্যা-সন্তানকে জীবিত প্রোথিত করা ও এ নির্মম অপরাধকে তুচ্ছ মনে করার ব্যাপারে যে কুরআন কারিমের তিরস্কার ঘোষিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর ভিত্তি করেই একে মহা অপরাধ ও হারাম সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَإِذَا الْمَوْءُ ودَةُ سُئِلَتْ، بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ
(স্মরণ করো সে-সময়কে) যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যা-সন্তানকে জিজ্ঞেস করা হবে-তাকে কোন অপরাধে হত্যা করা হয়েছে? [সুরা তাকবির, আয়াত: ৮-৯]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অপরাধকে অন্যতম বড় অপরাধ বলে গণ্য করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ قَالَ أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ قُلْتُ إِنَّ ذَلِكَ لَعَظِيمُ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ وَأَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ تَخَافُ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ أَنْ تُزَانِيَ حَلِيلَةَ جَارِكَ .
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম-আল্লাহর কাছে কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়? নবিজি বললেন—আল্লাহর সাথে শরিক করা, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম-অবশ্যই এটা বড় গুনাহ। তারপর কোন গুনাহটি বড়? নবিজি বললেন-তোমার সাথে আহার করবে-এই ভয়ে নিজ সন্তানকে হত্যা করা। আমি আবার জানতে চাইলাম-তারপর কোন গুনাহটি সবচেয়ে বড়? নবিজি বললেন—প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা। [১৪২]
নারীর অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিশু-কন্যাদের প্রতি অনুগ্রহের প্রতিও উৎসাহিত করেছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَنْ يَلِي مِنْ هَذِهِ الْبَنَاتِ شَيْئًا فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ
যে ব্যক্তি কন্যা-শিশুর (লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা ও বিয়ের) ঝামেলায় পতিত হয় এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করে, এই কন্যা শিশুরাই তার ও জাহান্নামের মাঝে অন্তরায় হবে।[১৪৩]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা-শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারে নির্দেশ প্রদানপূর্বক ইরশাদ করেছেন—
أَيُّمَا رَجُلٍ كَانَتْ عِنْدَهُ وَلِيدَةً فَعَلَّمَهَا فَأَحْسَنَ تَعْلِيمَهَا وَأَدَّبَهَا فَأَحْسَنَ تَأْدِيبَهَا ثُمَّ أَعْتَقَهَا وَتَزَوَّجَهَا فَلَهُ أَجْرَانِ .
যার একটি কন্যা-সন্তান আছে আর সে ব্যক্তি কন্যাটির সুন্দর শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করল, অতঃপর তাকে স্বাধীন করল ও বিয়ের ব্যবস্থা করল, সে দ্বিগুন নেকি পাবে।[১৪৪]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের প্রতি ওয়াজ-নসিহত করার জন্য একটি দিন বরাদ্দ রেখেছিলেন—সেখানে তাদের আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের প্রতি তিনি নির্দেশ প্রদান করতেন।
যখন কন্যা যৌবনে পদার্পণ করে, পরিণত যুবতী হয়ে যায়, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ ও বর্জন করার অধিকার প্রদান করেন। তার ইচ্ছার বাইরে কোনো পুরুষের সাথে বিয়ের ব্যাপারে তাকে জবরদস্তি করাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জায়েজ বলেননি। এ ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا وَالْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ فِي نَفْسِهَا وَإِذْنُهَا صُمَاتُهَا
প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজের বিয়ের ব্যাপারে নিজ অভিভাবকের চেয়ে বেশি হকদার। কুমারী নারীর কাছ থেকে তার নিজের ব্যাপারে অনুমতি গ্রহণ করা হবে, আর চুপ থাকা তার স্বীকৃতি বলে স্বীকৃত।[১৪৫]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেছেন-
لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
প্রাপ্তবয়স্কা নারীর নির্দেশ ছাড়া এবং কুমারী নারীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।
সাহাবা কিরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, কুমারীর অনুমতি কী? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
أَنْ تَسْكُتَ
চুপ থাকা।[১৪৬]
আর যখন সে কন্যা কারও স্ত্রীরূপে সংসারে প্রবেশ করবে, তার সাথে সদাচরণ ও সুসম্পর্ক গড়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অনুপ্রেরণা রয়েছে। তিনি এ কথা পরিষ্কারভাবে বলতেন-স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করা পুরুষের ব্যক্তিগত আভিজাত্য ও স্বভাবগত সভ্যতার প্রমাণ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করে বলেছেন-
إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا سَقَى امْرَأَتَهُ مِنْ الْمَاءِ أُجِرَ
পুরুষ যখন স্ত্রীকে পানি পান করায়, তাকে প্রতিদান প্রদান করা হয়।[১৪৭]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أُحَرِّجُ حَقَّ الضَّعِيفَيْنِ الْيَتِيمِ وَالْمَرْأَةِ
হে আল্লাহ, আমি দুজন দুর্বলের অধিকারের ব্যাপারে কষ্ট করি-এতিম এবং নারী।[১৪৮]
স্ত্রী যখন স্বামীকে অপছন্দ করতে আরম্ভ করে, তার সাথে সংসার করাকে সহ্য করতে পারে না, তার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ-বিচ্ছেদের বিধান রেখেছেন। এর পদ্ধতি হবে-খোলা।[১৪৯]
হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- সাবিত ইবনু কাইসের স্ত্রী নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বললেন-হে আল্লাহর রাসুল, আমি সাবিতের ধর্ম ও চরিত্র কোনোটির ওপরই বীতশ্রদ্ধ নই; তবে তার সাথে সংসার করলে আমি কুফরির ভয় করছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
فَتَرُدِّينَ عَلَيْهِ حَدِيقَتَهُ
তুমি কি তার বাগানটা (মোহর হিসেবে প্রাপ্ত) তাকে ফিরিয়ে দেবে? সে বলল-হ্যাঁ। সে স্বামীকে তার বাগানটা ফিরিয়ে দিলো। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়ে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ করে দিলেন। [১৫০]
যেহেতু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর জন্য পুরুষের মতো স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক অধিকার প্রমাণ করেছেন, সুতরাং তাদের জন্য ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া দেওয়া- নেওয়া, উকিল নিয়োগ করা এবং উপহার-উপঢৌকন দেওয়াসহ সবকিছুর অধিকার সাব্যস্ত রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো নারী বুদ্ধিমতী ও বোধসম্পন্ন থাকবে, তার এসব অধিকারে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
فَإِنْ أَنَسْتُمْ مِّنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوْا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
অতঃপর যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনার উন্মেষ আঁচ করতে পার, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পণ করো। [সুরা নিসা, আয়াত : ৬]
হজরত উম্মে হানি বিনতে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন দুজন মুশরিককে আশ্রয় দিলেন, তার ভাই হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে হত্যা করতে চাইলেন। এই ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালা ছিল এমন-
قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أُمَّ هَانِي
হে উম্মে হানি, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমরাও তাকে আশ্রয় দিয়েছি। [১৫১]
এ ফয়সালার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যুদ্ধকালীন ও স্বাভাবিক সময়ে অমুসলিমদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার ও প্রতিবেশী বানানোর অধিকার প্রদান করেছেন।
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার ছায়ায় মুসলিম নারী সম্মানজনক, আভিজাত্যপূর্ণ, অভিভাবকসুলভ জীবনযাপন করত।
টিকাঃ
[১৪০] সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ১১৩; সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ২৩৬; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ২৬২৩৮。
[১৪১] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৩৩৩১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৮。
[১৪২] সহিহুল বুখারি, হাদিস : ২০০১; সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ৩১৮২; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ৪১৩১。
[১৪৩] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৯。
[১৪৪] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৪৭৯৫。
[১৪৫] সহিহু মুসলিম, হাদিস: ১৪২১。
[১৪৬] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৫১৩৬。
[১৪৭] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৭১৯৫。
[১৪৮] সুনানু ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩৬৭৮; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ৯৬৬৪。
[১৪৯] অর্থাৎ স্ত্রী কোনোভাবে স্বামীকে রাজি করিয়ে তার কাছ থেকে তালাক নিয়ে নেবে। -অনুবাদক
[১৫০] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৫২৭৬。
[১৫১] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৩১৭০; সহিহু মুসলিম, হাদিস: ২৩৬।
📄 বৈজ্ঞানিক মুজিযা
কুরআন কারিম আরেক প্রকার মুজিযা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে; সেটি হলো-বৈজ্ঞানিক মুজিযা। এই মুজিযাটির ব্যাপারে প্রাচীন মুসলিম আলেমগণ আলোচনা করেননি। তাদের কাছে কুরআন কারিমের গুরুত্বপূর্ণ মুজিয়ার দিকগুলো ছিল-কুরআনের বালাগাত- অলংকার, নজম-শব্দের বুনন, কুরআনের ইতিহাস, কুরআনের ভাষা ইত্যাদি; তারা কুরআন কারিমের ইলমি-বৈজ্ঞানিক মুজিযা নিয়ে আলোচনার পথে হাঁটেননি। এই শিরোনামে আমার আলোচনার উদ্দেশ্য হলো-কুরআন কারিমের এমন অনুকরণময় বৈজ্ঞানিক মূলনীতিগুলোর নানা রঙ আলোচনা করা, যেগুলোর বিদ্যমানতা ও উদঘাটনে অনেক ওলামা কিরাম বিস্মিত হয়েছেন।
কুরআন কারিম এমন অনেক বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতসমৃদ্ধ গ্রন্থ, যে ইঙ্গিতসমূহ হিদায়াতপ্রাপ্তির উপলক্ষ্য হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা, কুরআন শুধুই বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ নয়।
বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতের উপমা হলো—কুরআন কারিম উদ্ভিদের কলম করা নিয়ে আলোচনা করেছে। তবে সেখানে কলম করার আলোচনা হয়েছে এক উদ্ভিদ থেকে অন্য উদ্ভিদে স্থানান্তর করার মাধ্যমে; এর মাধ্যমগুলোর একটি হলো বাতাস। কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَ أَرْسَلْنَا الرِّيحَ لَوَاقِحَ
আমি বৃষ্টি-গর্ভ বায়ু প্রেরণ করি। [সুরা হিজর, আয়াত : ২২]
কুরআন কারিমে উল্লিখিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক উদাহরণ হলো-মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ তত্ত্ব; এর বিশুদ্ধতা বর্তমান বিজ্ঞান পরীক্ষামূলক প্রমাণ দিয়ে সাব্যস্ত করেছে। চৌদ্দশ বছর পূর্বে কুরআন মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের তত্ত্ব দিয়েছে, অথচ তখন জ্যোতির্বিদ্যা মাত্র তার প্রাথমিক স্তর পাড়ি দিচ্ছিল। কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوْسِعُوْنَ
আর আমি আসমান নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি নিশ্চয়ই মহাসম্প্রসারণকারী। [সুরা যারিয়াত, আয়াত : ৪৭]
আয়াতে ' السَّمَاءُ ' শব্দটি কুরআন কারিমের বিভিন্ন জায়গায় 'মহাবিশ্ব' ও 'মহাকাশ' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনের এই আয়াত মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের তত্ত্ব উন্মোচন করেছে- যে তত্ত্বের সন্ধান বিজ্ঞান পেয়েছে আমাদের যুগে এসে; এমনকি বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন পর্যন্ত একটিই বৈজ্ঞানিক দর্শন প্রচলিত ছিল; সেটি হলো—মহাবিশ্বের প্রকৃতি হলো স্থির, তা অনন্তকাল থেকে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আলোচনা-পর্যালোচনা, গবেষণা ও হিসাব-নিকাশ করে বোঝা গেছে, এই মহাবিশ্বের একটি শুরু আছে এবং তা সুশৃঙ্খলভাবে প্রলম্বিত হচ্ছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বেলজিয়ামের পদার্থ ও জ্যোতির্বিদ জর্জ লুমিটার দর্শনের ভিত্তিতে প্রমাণ করেছেন-মহাবিশ্ব সর্বদা সঞ্চালিত হয়, প্রলম্বিত হয়। এই বাস্তবতাকে সমর্থন করেছেন মার্কিন জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল; মৃত্যু ১৯৫৩ ইং।[১৫২] তিনি প্রমাণ করেছেন-তারকারাজি ও গ্যালাক্সি বা ছায়াপথসমূহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সর্বদা সঞ্চালিত হতে থাকে। সঞ্চালিত হওয়ার এই পদ্ধতিটি সর্বদা প্রলম্বনশীল একটি রূপ। [১৫৩]
কুরআন কারিমের মুজিযামূলক কয়েকটি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে—
وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٌّ لَّهَا هُ ذُلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ هُ
সূর্য নিজ নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ। [সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৩৮]
নির্ধারিত কক্ষপথে চলতে থাকা একটি বিশাল মুজিযা। এটা সূর্যের বাহ্যিক চলা বোঝায় না, যেমনটা মানুষ উদয়কালে দেখতে পারে; বরং এটা প্রকৃত নড়াচড়াই বোঝায়; আবহাওয়াবিদরা বিষয়টি প্রমাণ করেছে। সৌর ইনসাইক্লোপিডিয়া বলছে-সূর্য তার কক্ষপথের চারদিকে প্রত্যেক পঁচিশ দিনে একবার ঘোরে। [১৫৪]
তেমনিভাবে গতি নির্ধারিত রয়েছে পৃথিবীর ছায়াপথের—যার অধীন সূর্যও আছে। আমাদের ছায়াপথ মহাশূন্যের অন্যান্য ছায়াপথ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৯৮০ কিলোমিটার দূরে সরে যায়।[১৫৫]
আরেকটি মুজিযা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيْنِ بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِينِ
তিনি পাশাপাশি দুটি সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরাল, যা তারা অতিক্রম করে না। [সুরা আর-রহমান, আয়াত : ১৯- ২০]
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে—ভূমধ্য সাগর যখন জিব্রালটার পাহাড়ের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে মিলিত হয়, তখন উভয়ের মাঝে একটি অন্তরায় থাকে। দুটি সাগরের পানির রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে জানা গেছে—ভূমধ্যসাগরের লবণাক্ততা ও উষ্ণতা আটলান্টিকের চেয়ে বেশি; উভয়টিতে অবস্থিত প্রাণীদের মধ্যেও বেশকম আছে।[১৫৬]
স্যার জন এমেরি মিশর বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশনের সাথে মিলে আকাবা উপসাগরের পানি সম্পর্কে কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন; যাতে প্রমাণিত হয়েছিল, রাসায়নিক এবং স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য ও গঠনগত দিক থেকে এটি লোহিত সাগরের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। [১৫৭]
মুজিযাপূর্ণ আরও আয়াত হলো—
وَ الْجِبَالَ أَوْتَادًا
এবং (আমি কি) পর্বতমালাকে পেরেক (বানাইনি)? [সুরা নাবা, আয়াত : ৭]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ
আর তিনি পৃথিবীর ওপর বোঝা রেখেছেন, যেন কখনো তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে-দুলে না পড়ে। [সুরা নাহল, আয়াত: ১৫]
আধুনিক যুগের ভূতাত্ত্বিকগণ গবেষণা করে জানতে পেরেছেন, পাহাড়ের নিচে এক প্রকারের সম্প্রসারিত শিকড় রয়েছে-যা এমন আঠালো স্তরে প্রোথিত, যেটির ওপর রয়েছে শিলার স্তর। আল্লাহ তাআলা এই সম্প্রসারিত শিকড় বানিয়েছেন মহাদেশগুলোকে ধারণ করে রাখার জন্য, যেন পৃথিবী ঘূর্ণনকালে সেগুলো নড়াচড়া না করে। এ বাস্তবতা সম্পর্কে গবেষকগণ নিশ্চিত হয়েছে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এসে।[১৫৮]
গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে, প্রত্যেক মহাদেশের ভিন্ন ভিন্ন পাহাড় রয়েছে, যেগুলো মহাদেশগুলোকে ধারণ করে রেখেছে। ভূখণ্ডের যে অংশে পাহাড় অবস্থিত, যেসব প্রস্তরের সমন্বয়ে তা গঠিত এবং তার আশপাশে অবস্থিত জমিনের প্রকৃতি প্রত্যেকটির সাথে পাহাড়ের উচ্চতার সাযুজ্য থাকে। ভূতাত্ত্বিকগণ গবেষণা করে পেয়েছেন, ভূখণ্ডে পাহাড় এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন এর দ্বারা জমিনকে হেলে-দুলে পড়া থেকে হেফাজত করা যায়।[১৫৯] কুরআন কারিম আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বেই এই সত্য বর্ণনা করেছে। আল্লাহ তাআলা এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই বলেছেন।
আল্লাহ তাআলার এই কথাটি নিয়ে একটু ভাবি। তিনি ইরশাদ করেছেন—
وَ الْبَحْرِ الْمَسْجُوْرِ
এবং (শপথ) উত্তাল সমুদ্রের। [সুরা তুর, আয়াত : ৬]
আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলার কসম বিবৃত হয়েছে। তিনি সমুদ্রকে বলেছেন—'তা উত্তাল'। কসম ব্যবহার করা হয় গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। অথচ আল্লাহর কালামে গুরুত্ব বোঝানোর কোনো প্রয়োজন নেই, তা এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَ مَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا
আল্লাহর চেয়ে বড় সত্যবাদী আর কে হতে পারে? [সুরা নিসা, আয়াত : ২২]
তারপরও কেন আল্লাহ তাআলা কসম খেয়েছেন? গাফিলদেরকে সতর্ক করার জন্য, অনুগতদেরকে পথ দেখানোর জন্য, কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
সমুদ্র উত্তাল হওয়ার মর্ম হলো-আগুন প্রজ্বলিত হওয়া উত্তপ্ত হওয়া। আল্লাহ তাআলার কসম খাওয়ার কারণ হলো-পরিষ্কারভাবে এ কথা প্রমাণ করা, সমুদ্রগুলোকে আগুন দ্বারা উত্তপ্ত করা হয়। এখানে উত্তাল সমুদ্র দ্বারা দুনিয়ার সমুদ্র উদ্দেশ্য, পরকালের সমুদ্র নয়। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ছিল বিজ্ঞানের যুগে কুরআনের এই হাকিকতকে উন্মুক্ত করা। সমুদ্রজ্ঞানীরাও যেন অনুধাবন করতে পারেন, ভূগর্ভে উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি মজুদ রয়েছে।[১৫৮]
ডক্টর জামালুদ্দিন আল-ফিন্দি তদীয় গ্রন্থ তাবিয়াতুল বাহরি ওয়া জাওয়াহিরুহু-তে বলেছেন—গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সমুদ্রের তলদেশে আবরণের মাঝে কিছু ফাঁকা ও গভীর গর্ত রয়েছে। এর কারণ হলো, সমস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যে আবরণের মাঝে বিভিন্ন সংকোচন ঘটলে তাতে কিছু ফাটল সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ফাটল সৃষ্টি হয় তাপমাত্রার ব্যবধানের ফলে তাপজনিত সম্প্রসারণ ও ঠান্ডাজনিত সংকোচনের প্রতিক্রিয়ায়। এ ধরনের দুর্বল সম্প্রসারিত স্থানগুলোর দৈর্ঘ্য অনুসারে জমিনের তলদেশের আবরণের ভেতর থেকে গলিত আগ্নেয়গিরির লাভা ছুটে আসে। এরপর প্রবলবেগে তা সমুদ্রের ওপর আছড়ে পড়ে; কিন্তু তা সমুদ্রের পানির ভারত্বের কারণে বাধার সম্মুখীন হয়; এমনকি সমুদ্রের নিজস্ব আগ্নেয়গিরি এর লাভাকে ওপরের দিকে ছুঁড়ে মারে। ক্রমাগত গলিত লাভার আঘাতের কারণে ওপরের দিকে শঙ্কুসদৃশ একটি মুখ তৈরি হয়। এই মুখ দিয়ে আসা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের কারণে অনেক দ্বীপপুঞ্জ বিস্ফোরণ ঘটে অদৃশ্য হয়ে যায়। যেমন: ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব হিন্দুস্থানের দ্বীপপুঞ্জের মাঝ থেকে কারাকাতো দ্বীপের বিস্ফোরণ ঘটে। ক্রমাগত দুই দিন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলে ভূখণ্ডের ১৪০০ ফিট ওপরে থাকা দ্বীপটি সমুদ্রে তলিয়ে যায়। কেবল এর মৌলিক চূড়ার একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া কিছুই টিকে ছিল না।[১৬০]
জর্জ গামো তদীয় গ্রন্থ কাওকাবুন ইসমুহুল আরদ-এ একটি পরিচ্ছেদ এনেছেন, যার শিরোনাম হলো—'জাহান্নাম আমাদের পায়ের নিচে'। তিনি সেখানে কথা বলেছেন সমুদ্রের তলদেশের উত্তপ্ততা নিয়ে, আগুন নিয়ে এবং আগ্নেয়গিরির তরঙ্গ নিয়ে। আলোচনার প্রারম্ভেই বলেছেন—গভীরতার সাথে সাথে তাপমাত্রার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। উত্তাল আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে বিচ্ছুরিত কালো ধোঁয়ার উত্তোলন, এর আশপাশে ছড়িয়ে-পড়া অস্থির উদ্দীপ্ত লাভা, উত্তপ্ত পানির ঝরনা—এসবই এ বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করছে, জ্বলন্ত আগুনের এমন অস্তিত্বের প্রমাণের প্রতি, যেগুলো দূরে নয়— বরং আমাদের সন্নিকটে, যা তৈরি করা হয়েছে অপরাধীদের জন্য।[১৬১]
এখানে নিশ্চিতভাবে মুজিযার বিষয়টি পরিষ্কার। আল্লাহ তাআলার কিতাব সাব্যস্ত করেছে, সমুদ্রের তলদেশ আগুন দ্বারা উত্তপ্ত। ইতিপূর্বে এমনকি কুরআন অবতীর্ণকালেও বিশাল এই হাকিকত সম্পর্কে জানা যায়নি। বিংশ শতাব্দীতে এসে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা ‘وَ البَحْرِ المَسْجُجور -'এবং (শপথ) উত্তাল সমুদ্রের।' [সুরা তুর, আয়াত : ৬]-আয়াতটি পড়ে বিস্মিত হয়ে বলছে-কে সেই সত্তা, যিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়েছেন, সমুদ্রের তলদেশ উত্তপ্ত-সেখানে এমন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটে, যা অগ্নিলাভা ছুড়ে মারে! [১৬২]
***
আমরা যখন আল্লাহ তাআলার এই বাণীটি-
وَ السَّمَاءَ بَنَيْنَهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوْسِعُوْنَ
আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমি অবশ্যই ব্যাপক ক্ষমতাশালী। [সুরা জারিয়াত, আয়াত : ৪৭]-
নিয়ে ভাবি, তখন বুঝতে পারি-কুরআন কারিমের যে আয়াতটি আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে, সেটি মহাবিশ্বের ক্রমাগত বিস্তৃতি নিয়ে কথা বলে (অর্থাৎ কুরআন কারিম বলে—পৃথিবী ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে।), জানিয়ে দিচ্ছে, তা স্থির নয়। যে হাকিকত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অবহিত করেছেন অনেক আগে; সে হাকিকত বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের প্রারম্ভে এসে জ্যোতির্বিদ ও মহাকাশবিজ্ঞানীরা উদ্ঘাটন করেছেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা মহাবিশ্বের স্থিতি ও অপরিবর্তনের পক্ষে স্লোগান দিত; উদ্দেশ্য ছিল-নতুন সৃষ্টি এবং স্রষ্টাকে অস্বীকার করা। কিন্তু আমাদের ছায়াপথের বাইরের ছায়াপথগুলো নিয়ে ডপলারের গবেষণার মাধ্যমে এর উল্টো প্রমাণিত হয়েছে।
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের বিখ্যাত গবেষক (C.doppler) সি. ডপলার দ্রুতগামী রেলগাড়ির অতিক্রমকালে এর হুইসিলের সাধারণ ভাব লক্ষ করেছেন। রেলগাড়ি-পর্যবেক্ষক এমন একটি আওয়াজ শুনতে পাবে, যা ক্রমাগত ও স্থির ধরনের। কিন্তু রেলগাড়িটি পর্যবেক্ষকের যতই কাছাকাছি হয়, আওয়াজের কম্পাঙ্ক বাড়তে থাকে। আবার যতটা দূরে চলে যায়, আওয়াজের কম্পাঙ্ক কমতে থাকে। বিষয়টি নিয়ে ডপলার গবেষণা করেছেন এবং এর একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন-রেলগাড়ির হুইসিল বাতাসের মধ্যে ক্রমাগত কিছু শব্দতরঙ্গ ছোড়ে। যখন শব্দের উৎস পর্যবেক্ষকের কাছাকাছি হয়, শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমতে থাকে এবং কম্পাঙ্ক বাড়তে থাকে। এর উল্টো যখন শব্দের উৎস পর্যবেক্ষক থেকে দূরে যেতে থাকে, তখন শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রলম্বিত হতে থাকে-এমনকি প্রলম্বিত হতে হতে সেটা পর্যবেক্ষকের কান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে, তখন শব্দের কম্পাঙ্ক কমে আসে।[১৬৩]
এমনিভাবে ডপলার ভেবে দেখেছেন, এই বিষয়টি রশ্মি-তরঙ্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পূর্ণ গতিশীল উৎস থেকে বিচ্ছুরিত আলো যখন পর্যবেক্ষকের চোখে পৌঁছে, সেই আলোর তরঙ্গে পরিবর্তন সূচিত হয়। আলোর উৎসস্থলটি যখন পর্যবেক্ষকের কাছে নড়াচড়া করে, তখন আলোর তরঙ্গ সংকুচিত হয়-অনুধাবিত আলো উঁচু কম্পাঙ্কের দিকে (নীল বর্ণের দিকে) সরে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় 'জাহজাহাতুজ-জারকা' তথা 'ব্লু শিফট বা নীল অপসারণ'। উৎসটি যখন পর্যবেক্ষকের কাছ থেকে দূরে নড়াচড়া করে, তখন রশ্মি-তরঙ্গ প্রলম্বিত হয়, অনুভবের রশ্মিটি নিচু কম্পাঙ্কের দিকে (লাল বর্ণের দিকে) সরে যায়-এই রূপটিকে রেড শিফট বা লাল অপসারণ বলা হয়। [১৬৪] জ্যোতির্বিদগণ যখন আমাদের ছায়াপথ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত নক্ষত্রপঞ্জি থেকে উৎসারিত রশ্মি নিয়ে গবেষণার জন্য বর্ণালিবীক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার আরম্ভ করছিল, তখন এই বিষয়টির গুরুত্ব প্রতিভাত হয়।
১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ স্লিফার আমাদের ছায়াপথ থেকে দূরে অবস্থিত অন্যান্য ছায়াপথের নক্ষত্রপঞ্জি থেকে উৎসারিত আলো নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে ডপলারের থিওরি প্রয়োগ করেন। তার কাছে প্রমাণিত হয়, অধিকাংশ ছায়াপথ নিজ নিজ কক্ষপথে বহাল থেকে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—পরস্পর থেকে খুব দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। জ্যোতির্বিদগণ এগুলো নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করেছেন। (আলোচনা চলছিল-মহাবিশ্ব ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে।)
এবার প্রশ্ন জাগছে, এই গবেষণার (ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং সেগুলোও পরস্পর থেকে খুব দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে) মাধ্যমে কি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের দিকে ইঙ্গিত করা সম্ভব হবে? ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের গবেষণায় জ্যোতির্বিদ স্লিফার এমন চল্লিশটি ছায়াপথ প্রমাণ করতে সফল হয়েছেন, যেগুলো এর কক্ষপথে বহাল থেকে খুব দ্রুত নড়াচড়া করে আমাদের থেকে ও তাদের পরস্পর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রখ্যাত আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল এ বিষয়ে সূক্ষ্ম একটি ফলাফলে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছেন; যার সারকথা হলো-ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে খুব দ্রুত দূরে সরে গেলেও তা ঘটছে পূর্ণ সংগতভাবে। পরবর্তী সময়ে এই গবেষণাটি 'ল হাবল বা ‘হাবলের সূত্র’ নামে খ্যাতি লাভ করে। এই সূত্রভিত্তিক গবেষণা করেই হাবল আরও অনেক ছায়াপথ আবিষ্কার এবং সেগুলো পরস্পর থেকে দূরে যাওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করতে সফল হয়েছেন। গবেষণায় তার সহযোগী ছিলেন মিল্টন হামসন। তিনি হাবলের সাথে মিলে ক্যালিফোর্নিয়ায় উইলসন পাহাড়ে কাজ করেছেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি আলোচনায় তারা এই গবেষণাটি প্রকাশ করেছেন।
ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে এবং সেগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়াটা পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত করছে, মহাবিশ্ব আক্ষরিক অর্থেই বিস্তৃতি লাভ করছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মাঝে হইচই সৃষ্টি করেছে। তারা এই সূত্রের সমর্থক ও উপেক্ষক দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়েছেন। তবে, বিভিন্ন গাণিতিক সমীকরণ ও মহাশূন্যে জ্যোতির্বিদবিদদের কর্তৃক বিভিন্ন গবেষণা চালানোর মাধ্যমে এ কথাই অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে—মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। [১৬৫]
সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রপঞ্জির রশ্মি নিয়ে গবেষণা করার জন্য বিভিন্ন শক্তিশালী বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করছে। [১৬৬]
তারা সুদীর্ঘ গবেষণার পর বুঝতে পেরেছেন, বর্ণালি রেখাসমূহ সর্বদা লালিমার দিকেই ধাবিত হয়। আর রশ্মির উৎস যখন জমিনে বিদ্যমান পর্যবেক্ষক থেকে দূরে সরে যায়, তখন আমরা বুঝতে পারি, রশ্মির কম্পাঙ্ক ক্ষীণ হয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছে, বর্ণালি রেখাসমূহ ঝুঁকে পড়া এ কথা প্রমাণ করে—প্রতিটি নক্ষত্র পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, মহাবিশ্ব সাধারণভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।
সে সত্তা কতই না মহান, যিনি আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে এই হাকিকত সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করেছেন।[১৬৭]
জ্ঞানজগতের আরেকটি মুজিযা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَ أَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيْهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ
আর আমি নাজিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচণ্ড রণশক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ উপকার। [সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৫]
কেউ কেউ মনে করেন, আয়াতে লৌহ অবতরণের বিষয়টি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; এর দ্বারা এ কথা বোঝানো হয়েছে, আল্লাহ তাআলা মানুষের উপকারার্থে লোহা সৃষ্টি করেছেন (আকাশ থেকে অবতীর্ণ করা বোঝানো হয়নি)। কিন্তু আমরা যদি শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নিয়ে ভাবি, তাহলে বুঝতে পারি—লোহাকে শারীরিকভাবেই আকাশ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে, এর দ্বারা কেবল সৃষ্টি করাকে বোঝানো হয়নি। এখান থেকে বুঝতে পারি—কুরআন কারিমের এই আয়াত বৈজ্ঞানিক একটি সূক্ষ্ম মুজিযার আধার। সাম্প্রতিক সময়ের ভৌগলিক আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের পৃথিবীতে বিদ্যমান লোহা পৃথিবীর বাইরের বিশাল নক্ষত্র থেকে এসেছে।
প্রকৃতির ভারী খনিগুলো বড় তারকা থেকেই সৃষ্টি হয়। আমাদের সৌরজগতে এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ উপাদান অনুপস্থিত, যার সাহায্যে তা লোহা তৈরি করতে পারে; তাই লোহা সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড় তারকারাজির মধ্যেই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব, যেখানে তাপমাত্রা কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। যখন কোনো তারকায় লোহার পরিমাণ নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছে যায়, তখন আর তারকার সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে না—পরিশেষে ছিটকে পড়ে এবং নোভা বা সুপারনোভায় (এমন তারকা, যার জ্যোতি হঠাৎ বৃদ্ধি পায়, আবার কয়েক মাস বা বছর থাকার পর লোপ পায়।) পরিণত হয়। এই ছিটকে পড়ার ফলে মহাকাশের বিভিন্ন দিগন্তে লোহার মতো উল্কা ছড়িয়ে যায়। এরপর সেগুলো শূন্যে স্থানান্তরিত হয়; সেখান থেকে বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের আকর্ষণশক্তি সেগুলোকে আকর্ষণ করে (এরপর সেখান থেকে জমিনে নিক্ষিপ্ত হয়।)। এই গবেষণায় প্রতীয়মান হয়, লোহা জমিন থেকে উত্থিত হয় না, বরং মহাশূন্যীয় তারকাসমূহের বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট উল্কার মাধ্যমে জমিনে নাজিল হয়। আলোচিত আয়াতটি এ কথাই প্রমাণ করে। কুরআন কারিম সপ্তম খ্রিষ্ট শতাব্দীতে এ বৈজ্ঞানিক তথ্য জানিয়েছিল, যখন বিজ্ঞানজগৎ এ ব্যাপারে ছিল তথ্যশূন্য।[১৬৮]
অন্য আয়াতে আরেকটি পরিষ্কার মুজিযার কথা উল্লেখ আছে। ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ أَمْشَاجِ
আমি মানুষকে মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছি। [সুরা দাহার, আয়াত : ২]
সমস্ত মুফাসসিরগণ একমত, মিশ্র শুক্রবিন্দু হলো—নারী ও পুরুষের বীর্যের মিশ্রণ। দুটি ভিন্ন শ্রেণির সংমিশ্রণ। কুরআন কারিম অবতীর্ণ হওয়ার দশ শতাব্দী পর অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কেউ জানত না, গর্ভস্থিত ভ্রূণটি এমন নিষিক্ত ও নিঃসৃত ডিম্বাণু থেকে তাদের জিন বহন করে—যা এমন এক বিন্দু তুচ্ছ পানির মতো, যা মাতা-পিতার বীর্যের সংমিশ্রণে তৈরি হয়—যাকে আমরা বর্তমানে ক্রোমোজম বলে ব্যক্ত করি।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন-
يُأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْتُكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى
হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। [সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩]
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন, তিনি মানুষকে পুরুষ ও নারী থেকে সৃষ্টি করেছেন। পূর্ববর্তী অনেক মুফাসসির বলেছেন, ভ্রূণ কেবল পুরুষের বীর্য থেকে তৈরি; সেটি মায়ের গর্ভে প্রতিপালিত হয়, সেখানে অবস্থিত রক্ত থেকে তার আহার্যের জোগান হয়। কিন্তু এই আয়াতের আলোকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হয়, পুরুষ ও নারী উভয়ের বীর্যের মিশ্রণে ভ্রূণ তৈরি হয়। এটা কুরআন কারিমে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত, সুতরাং এখানে ব্যাখ্যার কোনো অবকাশ নেই। [১৬৯]
মানুষের সৃষ্টির স্তরগুলো আরম্ভ হয় পিতার নিকট শুক্রাণু গঠনের মাধ্যমে। মায়ের সমস্ত ডিম্বাণু মৌলিকভাবেই তৈরি থাকে, যা কিনা ভ্রূণের মূল। প্রবাহিত শুক্রাণু বীর্যবিন্দুর সাদৃশ্য লাভ করে। এটাকেই কুরআন কারিম স্পষ্টভাবে বলেছে। ইরশাদ হয়েছে-
وَ بَدَا خَلْقَ الْإِنْسَانِ مِنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِنْ سُلُلَةٍ مِّنْ مَّاءٍ مهين
যিনি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানবসৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে। [সুরা সাজদাহ, আয়াত : ৭-৮]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
أَلَمْ نَخْلُقْكُمْ مِّنْ مَّاءٍ مَّهِينٍ
আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করিনি? [সুরা মুরসালাত, আয়াত : ২০]
তবে নিষিক্তকরণের কাজ সম্পাদনের জন্য একটি শুক্রাণু প্রয়োজন, যা পানির ফোঁটাসদৃশ বীর্য থেকে তৈরি হয়। কুরআন কারিম কয়েকটি আয়াতের সমষ্টিতে বিষয়টি এভাবে বলেছেন-
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِّنْ مَّنِي يُمْنَى
মানুষ কি মনে করে, তাকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে? সে কি স্খলিত বীর্য ছিল না? [সুরা কিয়ামাহ, আয়াত : ৩৬-৩৭]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ
মানুষকে বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। [সুরা নাহল, আয়াত : ৪]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
أَوَلَمْ يَرَ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ نُطْفَةٍ
মানুষ কি ভেবে দেখে না, আমি তাকে বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছি? [সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৭৭]
আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো-কুরআন কারিম পানিসদৃশ বীর্যের উপাদানের পরিচয় দিতে গিয়ে 'প্রবলবেগে স্খলিত পানি' বলার জন্য কর্তাবাচক শব্দ 'دافق' ব্যবহার করেছে। কর্মবাচক শব্দ 'مدفوق' ব্যবহার করেনি। অথচ তখনো অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে বীর্যের এই পরিচয় কেউ প্রদান করেনি। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ - خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ
অতএব, মানুষের দেখা উচিত কী বস্তু থেকে সে সৃজিত হয়েছে; সে সৃজিত হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে। [সুরা তারিক, আয়াত : ৬]
প্রাচীন অণুবীক্ষণের মাধ্যমে দেখা কঠিন হওয়ার কারণে ১৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ডালি ম্যাথিউস মানুষকে শুক্রাণু-জীবের মূল বলে আখ্যায়িত করেছেন—অর্থাৎ সতেরোশ খ্রিষ্টাব্দের মাত্র এক বছর পূর্বে। তিনি কোনোভাবেই পিতা-মাতা থেকে ভ্রূণ সৃষ্টির স্তরগুলো বোঝেননি। সপ্তম শতাব্দীতে এসে শুক্রাণু সৃষ্টির ব্যাপারে কুরআন কারিমের স্পষ্ট ঘোষণা আমরা বুঝতে পেরেছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا - وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا
তোমাদের কী হলো, তোমরা আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব আশা করছ না, অথচ তিনি তোমাদের বিভিন্ন রকমে সৃষ্টি করেছেন। [সুরা নুহ, আয়াত : ১৩-১৪]
ভ্রূণ সৃষ্টির প্রথম ধাপটি রেহেমে (জরায়ু) প্রবেশের পূর্বেই পূর্ণতা পায়। আপনি কুরআন কারিমের ভারসাম্যপূর্ণ বর্ণনা দেখলে বিমোহিত হয়ে যাবেন, ভ্রূণের সবগুলো পর্যায়কে আরবি শব্দ 'বুতুন-বাতনুনের বহুবচন'-এর দিকে সম্বোধিত করা হয়েছে; অর্থাৎ ভ্রূণ প্রাকৃতিকভাবে পেটের অনেকগুলো স্তরের মাঝে অবস্থান করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ
তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের পেটগুলোর মধ্যে এক সৃষ্টির পর আবার সৃষ্টি করে তিনটি আঁধারের মাঝে। [সুরা জুমার, আয়াত : ৬]
বর্তমানে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও প্রমাণিত, ভ্রূণ তিনটি পর্দার মাঝে আবৃত থাকে। কুরআন কারিম স্পষ্টভাবে ধাপগুলোর ভিন্নতার বর্ণনা দিয়েছে-যেগুলোতে ভ্রূণ সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় থাকে। সবগুলো সময়ের আবর্তন ভ্রূণের ওপর বর্তাতে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ (١٢) ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ (۱۳) ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ .
আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি; অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি; এরপর সে মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি; অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত্ত করেছি; অবশেষে একে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়! [সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১২-১৪ ]
ভ্রূণ রেহেমের প্রথম স্তরে জমাট রক্তের সদৃশ হয়। এই স্তরে প্রকৃতভাবে এর কোনো উপমা পাবেন না। এই স্তরে ভ্রূণটি লম্বাটে, কলবমুক্ত, নার্ভহীন থাকে-এর সাথে ঝুলন্ত শেষাংশ থেকে আহার্য গ্রহণ করে; এটা হলো-রেহেমে ভ্রূণের অবস্থানকালীন প্রথম স্তরের অবস্থা। এরপর শুরু হয় গঠনগত প্রাথমিক অঙ্গগুলোর গড়ন। ভ্রূণ এই স্তরে এসে বাঁকা হতে আরম্ভ করে; এর মাঝে সৃষ্টি হয় উঁচু-নিচু। শরীরের সেসব গঠন প্রকাশ পেতে শুরু করে, যা মেরুদণ্ডের হাড় তৈরি করে-ঠিক যেভাবে মাড়ি বা গোস্তের টুকরোর মাঝে দাঁতের আলামত প্রকাশ পায়। ভ্রূণটির আয়তন এ পরিমাণ হয় যে, তা চিবানো যায় এবং একটি অবস্থার জানান দেয়; তখন তাকে 'মুজগা বা গোস্তের টুকরো' শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। এই স্তরে এসে এই ব্যাখ্যাটিই এর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। (chewable mass-like embryo) প্রাথমিক অঙ্গ গড়নের এই স্তরটি সপ্তম সপ্তাহে গিয়ে অস্থي গড়নের সূচনা হয়। অষ্টম সপ্তাহে পেশীসমূহ দ্বারা অস্থিগুলো আবৃত করা হয়। এই স্তরটি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর সাথে মিলে যায়-
ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا .
এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি; অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি; এরপর সেই মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি; অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা ঢেকে দিয়েছি। [সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪]
কুরআন কারিমের পূর্বে ওহির সাথে সম্পৃক্ত অন্য কোনো গ্রন্থে এই ধরনের চ্যালেঞ্জিং বৈজ্ঞানিক কথা বলা হয়নি। অষ্টম সপ্তাহের বিদায়ের সাথে সাথে অঙ্গ গঠনের প্রথম স্তরটি (organogenesis) পূর্ণতা লাভ করে। ষষ্ঠ সপ্তাহের প্রাথমিক গঠন সৃষ্টির পর ভ্রূণ মানুষের আকার ধারণ করে। তখন জন্মগ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল বেড়ে ওঠা ও আকৃতির ভারসাম্য, মাথা ও শরীরের সাযুজ্যই বাকি থাকে। এই অবস্থাটা আল্লাহ তাআলার এই বাণীটির সাথে পূর্ণভাবে মিলে যায়-
ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
অবশেষে একে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়! [সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪]
মানুষের বিবেক-বুদ্ধি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে এ কথা মেনে নিতে বাধ্য, এ ধরনের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা কুরআন কারিম এত সূক্ষ্ম ও মনোজ্ঞ পদ্ধতিতে উপস্থাপন করতে পারা, এ কথার অকাট্য প্রমাণ বহন করে, এর উৎস কোনো মানুষ হতে পারে না। এসব তথ্য উপস্থাপনের জন্য মানুষের প্রয়োজন অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং যুগ হতে হবে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের যুগ-যাতে বিজ্ঞানের যেকোনো তথ্য-উপাত্তের ব্যাপরে সুনিশ্চিত হওয়ার ব্যবস্থা থাকে-যেমন শেষের তিন শতাব্দী। অথচ কুরআন অবতরণের যুগ না ছিল বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের যুগ, আর না সে যুগে কোনো অণুবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কার হয়েছিল। এজন্যই ইসলামের ব্যাপারে তিরস্কারকারীরা অহংকার, গোঁড়ামি, মূর্খতা আর কুরআন কারিমের ওহিলব্ধ দলিলাদির অপব্যাখ্যা ছাড়া জ্ঞানগত কোনো প্রমাণ পেশ করতে পারছে না। [১৭০]
আমরা যখন কুরআন কারিমের বিজ্ঞানসমৃদ্ধ আয়াতগুলো নিয়ে ভাবি, তখন বুঝতে পারি, তাতে ঝলমলে জাঁকজমকপূর্ণ মুজিযাসমৃদ্ধ ছায়া রয়েছে।
আমরা দুধভাইদের সাথে নারীর বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতে বৈজ্ঞানিক মুজিযা নিয়ে ভেবেছি। কুরআন কারিম দুধভাইকে আপন ভাইয়ের সাথে তুলনা করেছে। এই সূত্রেই আপন ভাইয়ের মতো দুধ ভাইয়ের সাথে বিবাহ হারাম করেছে। ইরশাদ হয়েছে-
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهُتُكُمْ وَ بَنْتُكُمْ وَ أَخَوْتُكُمْ وَ عَمْتُكُمْ وَ خُلْتُكُمْ وَبَنْتُ الْآخِ وَبَنْتُ الْأُخْتِ وَ أُمَّهُتُكُمُ الَّتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَ أَخَوْتُكُمْ مِّنَ الرَّضَاعَةِ .
তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকন্যা, ভগিনীকন্যা, তোমাদের সে মাতা-যারা তোমাদের স্তন্য পান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন। [সুরা নিসা, আয়াত: ২৩]
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দুগ্ধদাত্রী মায়ের দুধে শরীরের এমন কিছু অংশ থাকে, তিন থেকে পাঁচ ঢোক দুধ পান করার কারণেই দুগ্ধপানকারীর শরীরে অ্যান্টিবডি বা প্রতিরক্ষিকা হল তৈরিতে যে অংশটি অবদান রাখে। ... মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি গঠনে এই কয়েকটি ঢোক প্রত্যাশিত। এমনকি পরীক্ষাগারস্থ যে নবজাতকের রোগ-প্রতিরোধ-ব্যবস্থা পূর্ণরূপে গঠিত হয়নি, যখন তা দুগ্ধ পান করে, তখন তার শরীরেও দুগ্ধদাত্রীর কাছ থেকে রোগ-প্রতিরোধ-সংক্রান্ত কিছু কিছু জেনেটিক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়; ফলশ্রুতিতে দুগ্ধীয় মিরাসসূত্রে তার মাঝে দুধসম্পর্কীয় ভাই বা বোনের বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে-ভাই-বোনের মাঝে যদি বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, তাহলে রোগ প্রতিরোধক কণা-কণিকায় মিল থাকার কারণে নানা প্রকার রোগ সৃষ্টি হয়। [১৭১]
এখান থেকে আমাদের উদ্দিষ্ট বিষয়ে কুরআন কারিমের হিকমতের দিকটি খুঁজে পাই— দুগ্ধ সম্পর্কীয় ভাই-বোনের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়া কেন অনিবার্য! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ এ ব্যাপারে তৃপ্তিসহ পাঁচ ঢোক দুধ পানের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে; এ হলেই দুধ-সম্পর্কিত সূত্র তৈরি হয়ে যায়। [১৭২]
এই হলো কুরআন কারিমের মুজিযার কিছু দিক, যা প্রমাণ করে—আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরআন কারিম শব্দ ও অর্থসহ নাজিল করেছেন। আরও প্রমাণ করে—হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সমগ্র জগতের হিদায়াতের জন্য প্রেরিত হয়েছেন।
পশ্চিমা বিশ্বের নিষ্ঠাবান গবেষকগণ স্বীকার করেছেন, কুরআন কারিম চিরস্থায়ী মুজিযা। এদের মধ্যে এমিল ডারমেঙ্গেম অন্যতম। তিনি কুরআন কারিমের ব্যাপারে বলেছেন— প্রতিটি নবির জন্য তাঁর রিসালাতের পক্ষে দলিল প্রয়োজন, অপরিহার্য দরকার এমন কিছু মুজিযার, যার দ্বারা তিনি চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। কুরআন কারিম হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা।
কুরআন কারিমের বিস্ময়কর বর্ণনাপদ্ধতি ও হৃদয়গ্রাহী আলোচনাশক্তি আজ পর্যন্ত এ শক্তি রাখে, এর তিলাওয়াতকারীকে এ প্রশান্ত করবে—যদি সে ইবাদতকারী মুত্তাকিও না হয়। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোটা মানব ও দানবজগৎকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন—তারা যেন কুরআন কারিমের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করে দেখায় (না পারলে ছোট্ট একটি সুরা বা আয়াত তৈরি করে দেখায়; কেউ পারেনি। এই চ্যালেঞ্জটি ছিল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সত্যতার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল। [১৭৩]
টিকাঃ
[১৫২] edwin hubble (১৮৮৯-১৯৫৩)
[১৫৩] সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৩৮
[১৫৪] আল-মাউসুআতুল ফালাকিয়্যাহ, খলিল বাদাবি, পৃষ্ঠা: ২১。
[১৫৫] আশ-শামস, ইবরাহিম গোরি, খণ্ড: ১৮。
[১৫৬] আল-ইজাযুল কুরআনি ফি জাওয়িল ইকতিশাফিল ইলমিল হাদিস, মারওয়ান তাফতানজি, খণ্ড: ৩৮৪。
[১৫৭] লাফতাতুন ইলমিয়্যাতুন মিনাল কুরআন, ইয়াকুব ইউসুফ, পৃষ্ঠা: ৫৭。
[১৫৮] কিতাবুত তাওহিদ, আবদুল মজিদ জানদানি, পৃষ্ঠা: ৭২。
[১৫৯] আল-ইজাযুল কুরআনি ফি জুয়িল ইকতিশাফিল ইলমিল হাদিস, মারওয়ান তাফতানজি, পৃষ্ঠা: ৩৫২。
[১৬০] তাবিয়াতুল বাহরি ওয়া জাওয়াহিরুহ, মুহাম্মদ জামালুদ্দিন আল-ফিন্দি, পৃষ্ঠা: ২১০。
[১৬১] কাওকাবুন ইসমুহুল আরদ, জর্জ গামো, পৃষ্ঠা: ৭৪。
[১৬২] আল-ইজাযুল কুরআনি, মারওয়ান আত-তাফতানাজি, পৃষ্ঠা: ৩৯০-৩৯১。
[১৬৩] বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অবস্থাকে ডপলার ইফেক্ট (Doppler Effect) বলা হয়। নিরীক্ষক কর্তৃক সংযোজিত।
[১৬৪] আলো পরিমাপের এই সূত্রকে ফ্রনহফার লাইন (Fraunhofer Line) বলা হয়। নিরীক্ষক কর্তৃক সংযোজিত।
[১৬৫] আল-ইজাযুল কুরআনি, মারওয়ান আত-তাফতানাজি, পৃষ্ঠা: ১৮৯-১৯২。
[১৬৬] নাহনু ওয়াল কাওন, গোয়েল দোরুনি ও অন্যান্য, পৃষ্ঠা: ২৪১。
[১৬৭] কিসসাতু নুশুয়িল কাওন, মুখলিস রইস ও আলি মুসা, পৃষ্ঠা: ৪১。
[১৬৮] আল-মুজিযাতুল কুরআনিয়্যাহ, হারুন ইয়াহইয়া, পৃষ্ঠা: ৩৪。
[১৬৯] আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবি, খণ্ড: ১৬, পৃষ্ঠা: ৩৪২-৩৪২。
[১৭০] 'ইন্না খালাকনাল ইনসানা মিন নুতফাতিন আমশাজ শিরোনামের প্রবন্ধ-ডক্টর মুহাম্মদ দাহদুহ। সূত্র: htp://quran-m.com/firas/arabic/?page=show_der@id=1908@select_page=2
[১৭১] তাসিরু লাবানিল উম্মি আলাল আতফাল, ডক্টর মার্ক সাইরিজান, মাওকিউ জাদিদিল ইলমি-www.sciencealert.com.au/news/২০০৮১১০২-১৬৮৭৯.html
[১৭২] হজরত আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত আছে, কুরআন কারিমে দশ ঢোক দুধ পানের দ্বারা বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি বিধেয় ছিল। তারপর সেটি রহিত হয়ে পাঁচ ঢোক নির্ধারিত হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পরই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকাল হয়েছে। সহিহু মুসলিম, কিতাবুর রিজায়ি, বাবুত তাহরিমি বিখামসি রাজায়াতিন: হাদিস: ১৪৫২
[বি: দ্র: পাঁচ ঢোক দুধ পান করলে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে, এর কম হলে হারাম হবে না-এটা মুহতারাম গ্রন্থকারের মাজহাবের মতামত। তবে হানাফি মাজহাবের সিদ্ধান্ত হলো—এক ঢোক দুধ পান করলেই বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু এর জন্য দুটি শর্ত প্রযোজ্য: ১. অবশ্যই শিশুকে দুগ্ধ পানের বয়সসীমা-দুই থেকে আড়াই বছরের মাঝেই পান করতে হবে। ২. দুধ পেটে পৌঁছুতে হবে; তবে দুধ পান করলেই সতর্কতামূলকভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক হারামের ফাতাওয়া প্রদান করা হবে। তাদের প্রমাণ হলো—হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন-» يحرم قليل الرضاع وكثيره 'অল্প ও বেশি দুগ্ধপান (বৈবাহিক সম্পর্ককে) হারাম করবে।'- মাশকিলুল আসার, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা : ১৭৪, হাদিস: ৩৯৫৯।- অনুবাদক।
[১৭৩] হায়াতে মুহাম্মদ, এমিল ডারমেঙ্গেম, পৃষ্ঠা: ২৮৯/
📄 ঐতিহাসিক মুজিযা
বিরোধীদের চ্যালেঞ্জের জবাবে মুমিনদেরকে সাহায্য করার জন্য কুরআন কারিম পূর্ববর্তী উম্মাহর ইতিহাস বর্ণনার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। এমন অনেক মানুষের জীবনী সম্পর্কে দলিলনির্ভর পদ্ধতিতে ও নিতান্ত সূক্ষ্মভাবে সংবাদ দিয়েছে, যারা হাজার হাজার বছর পূর্বে জীবনযাপন করেছে—ঐতিহাসিকরা বস্তুজাগতিক প্রমাণের মাধ্যমে যে পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবেন না। কুরআন কারিম পূর্ববর্তী উম্মাহর ইতিহাস উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে অভিনবত্বের পথ অবলম্বন করেছে। স্পষ্ট করে দিয়েছে—এসব কাহিনির বর্ণনার পেছনে কেবল সান্ত্বনা ও প্রশান্তি দান উদ্দেশ্য নয়, বরং মূল তাৎপর্য হচ্ছে দিকপ্লাবী প্রভাব সৃষ্টি করে ব্যাপ্তিশীল মর্মবাণী সম্পর্কে অবহিত করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةً لِّأُولِي الْأَلْبَابِ : مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَ لكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَ تَفْصِيلَ كُلَّ شَيْءٍ وَ هُدًى وَ رَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُوْنَ
তাদের কাহিনিতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়; এটি কোনো মনগড়া কথা নয়। কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, তাদের জন্য পূর্বেকার কালামের সমর্থন, প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ। [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১১১]
ইমাম সুয়ুতি রাহিমাহুল্লাহর আলোচনা অনুপাতে ঐতিহাসিক মুজিযা হলো-অতীত শতাব্দী, প্রাচীন জাতিসমূহ, ঘূর্ণনশীল সংবিধানসমূহ সম্বলিত হওয়া; যেসব ঘটনার ছিটেফোটা বিরল কিছু আহলে কিতাব পণ্ডিত ছাড়া কেউ জানত না, যারা এগুলো শিক্ষা করতে নিজেদের জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। এমন ঘটনাগুলোই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণরূপে বিশুদ্ধভাবে হুবহু বর্ণনা করতেন—অথচ তিনি ছিলেন উম্মি, পড়ালেখা জানতেন না।[১৭৪]
মানুষ তো মানুষই। শত শত শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে, একের পর এক বহু প্রজন্ম জন্ম নিয়েছে, কিন্তু তাদের স্বভাবের পরিবর্তন হয়নি, পাল্টেনি তাদের প্রকৃতি। এজন্য কুরআন কারিম অতীত জাতির সাথে তাদের কাছে প্রেরিত নবিদের আলোচনাও করেছে। বহু কাল অতীত হওয়ার পর মানুষের সামনে নতুনভাবে তাদেরকে তুলে ধরা হয়েছে, যেন এর দ্বারা অতীতের অনুরূপ সামাজিক ও আত্মিক রোগগুলোর চিকিৎসা করা যায়। সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বড় বড় রোগগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য অনেক ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, বহু প্রকার শিক্ষা ও নানা প্রকার ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সে রোগের জীবাণুগুলোর মূলোৎপাটন করা হয়েছে।[১৭৫]
উদাহরণস্বরূপ আমরা হজরত নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনাটি নিয়ে একটু ভেবে দেখব। নিজের জাতির হিদায়াতের জন্য তাঁর দাওয়াতের প্রারম্ভিক যুগ থেকে নিয়ে সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শ বছরের ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকেরা বড় বড় মিথ্যার যেসব পসরা সাজিয়েছিল, সেগুলোও বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে মুমিনদের সংখ্যাস্বল্পতা, জাহাজ নির্মাণ, মুমিনদের তাতে আরোহণ, মহাপ্লাবনের ঘটনা, নবির পুত্র ও স্ত্রীর ডুবে যাওয়ার ঘটনা; এরপর হজরত নুহ এবং তাঁর প্রতি ঈমান গ্রহণকারীদের সামনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়সহ-সবকিছু তুলে ধরা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিস্তারিত বিবরণ কীভাবে জানলেন, যার কিছু দিক মাত্র আহলে কিতাবদের গ্রন্থগুলোতে বিবৃত হয়েছে, আরও অজস্র দিক উল্লেখই হয়নি! অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো নিশ্চিতভাবে জানিয়েছেন। এজন্য আমাদের রব হজরত নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনাকে এভাবে শেষ করেছেন-
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ : مَا كُنْتَ تَعْلَمُهَا أَنْتَ وَ لَا قَوْمُكَ مِنْ قَبْلِ هَذَا ، فَاصْبِرْ إِنَّ الْعَاقِبَةَ لِلْمُتَّقِينَ .
এটি গায়েবের খবর; আমি আপনার প্রতি ওহি প্রেরণ করছি। ইতিপূর্বে এটা আপনার ও আপনার জাতির জানা ছিল না। আপনি ধৈর্যধারণ করুন। যারা ভয় করে চলে, সুপরিণাম তাদেরই জন্য। [সুরা হুদ, আয়াত: ৪৯]
এই চিরসত্য ঘটনাটি কুরআন কারিমের অনেকগুলো ঘটনার একটি। যা প্রমাণ করে, কুরআন কারিম এর ঐতিহাসিক প্রামাণ্যে মুজিযা। এর ওপর ভিত্তি করে অনেক মানুষের সভ্যতা ও বিভিন্ন জাতির রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
কুরআন কারিমের ঐতিহাসিক মুজিযাগুলোর স্পষ্ট আরেকটি উদাহরণ হলো— ফেরাউনের নামের সাথেই তার নৈকট্যপ্রাপ্ত হামানের মতো লোকের নাম উল্লেখ করা। আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের ভাষায় বলেছেন-
وَ قَالَ فِرْعَوْنُ يَأَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِّنْ إِلٰهِ غَيْرِي : فَأَوْقِدْ لِي يُهَامُنُ عَلَى الطَّيْنِ فَاجْعَلْ لِّي صَرْحًا لَّعَلَّى أَطَّلِعُ إِلَى إِلٰهِ مُوسَى : وَ إِنِّي لَأَظُنُّه مِنَ الْكَذِبِينَ.
ফেরাউন বলল, হে পারিষদবর্গ, আমি জানি না, আমি ব্যতীত তোমাদের কোনো উপাস্য আছে! হে হামান, তুমি ইট পোড়াও; অতঃপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ করো, যাতে আমি মুসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আমার তো ধারণা হচ্ছে, সে একজন মিথ্যাবাদী। [সুরা কাসাস, আয়াত: ৩৮]
ওল্ড টেস্টামেন্টের [১৭৬] একটি গ্রন্থে হামানের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, কুরআন কারিম ঠিক তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। সে ইরাকের ব্যবিলিয়ন শহরের বাদশার সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং ইসরাইলিদের অনেক বড় ক্ষতি করেছে। অথচ এটি সংঘটিত হয়েছে হজরত মুসা আলাইহিস সালামের প্রায় এগারোশ বছর পরে। ফেরাউন- কেন্দ্রিক গবেষণা কুরআন কারিমের বর্ণনাকে বিশুদ্ধ প্রমাণ করেছে। বিভিন্ন গ্রন্থ ও হায়রোগ্লিফ চিত্রলিপি থেকে হামানের গুরুত্বপূর্ণ ও পূর্ণ পরিচয় উদ্ধার হয়েছে; তা হলো-মিশরের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে হামানের নাম সরাসরি উল্লেখ আছে। বর্তমানে ভিয়েনার একটি জাদুঘরে পাথরের ওপরও তার নামটি পাওয়া যায়। এমনিভাবে মুজামু আসমায়িল আশখাসি ফিল ইমবারাতুরিয়্যাহ-dictionary of personal names of the new empire-নতুন সাম্রাজ্যের ব্যক্তিদের নামের অভিধান গ্রন্থেও তার নামটি এসেছে। মিশরীয় সমস্ত শিলালিপি ও কাষ্ঠলিপির ওপর ভিত্তি করে এই গ্রন্থটির রচনা শেষ হয়েছে। এ গ্রন্থে হামানের পদের কথা উল্লেখ রয়েছে; সে পাথরকাটা শ্রমিকদের দায়িত্বশীল ছিল।[১৭৭]
কুরআন কারিমের আরেকটি ঐতিহাসিক মুজিযা হলো-হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের যুগের মিশরের শাসকের জন্য 'মালিক-বাদশা' উপাধিটি ব্যবহার করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
وَ قَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَ سَبْعَ سُن بُلْتٍ خُضْرٍ وَ أُخَرَ يُبِسْةٍ : يَأَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِنْ كُنْتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُوْنَ .
বাদশা বলল-আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভি, এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভি খেয়ে যাচ্ছে; সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে পরিষদবর্গ, তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলো, যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাকো। [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৪৩]
অথচ তাওরাত মিশরের শাসকের জন্য 'ফেরাউন' উপাধিটি ব্যবহার করেছে। কুরআন কারিম ইউসুফ আলাইহিস সালামের যুগের শাসকের ক্ষেত্রে 'ফেরাউন' উপাধিটির ব্যবহার পরিত্যাগের কারণ হলো, সে যুগে মিশরের শাসকের জন্য 'ফেরাউন' উপাধিটির মূল 'বারউ' ব্যবহার করা হতো না, বরং তা 'রাজাপ্রাসাদ ও বাদশা' অর্থে ব্যবহৃত হতো। মিশরের শাসকের জন্য 'ফেরাউন' উপাধিটির ব্যবহার আরম্ভ হয় হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের তিরোধানের দুইশ বছর পর থেকে। [১৭৮] হজরত মুসা আলাইহিস সালামের যুগে মিশরের শাসকদের উপাধি ছিল 'ফেরাউন'। এখান থেকেই কুরআন কারিমের ঐতিহাসিক মুজিযা প্রতিভাত হয়ে ওঠে। বিষয়টি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম! কেবল হজরত মুসা আলাইহিস সালামের সময়েই মিশরের শাসকের জন্য 'ফেরাউন' উপাধিটি ব্যবহার করেছে কুরআন কারিম, অথচ তাওরাতে হজরত ইবরাহিম, ইউসুফ এবং মুসা আলাইহিমুস সালামের সবার যুগের জন্যই মিশরের শাসকের ক্ষেত্রে ‘ফেরাউন’ উপাধিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে; কিন্তু মিশরীয়রা হজরত ইবরাহিম ও ইউসুফ আলাইহিমাস সালামের যুগে মিশরের শাসকের জন্য ‘ফেরাউন’ উপাধিটি ব্যবহার করত না। [১৭৯]
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রাহিমাহুল্লাহর দারুণ একটি উক্তি উল্লেখ করে শিরোনামটির ইতি টানব। তিনি বলেছেন-এই ঘটনাগুলো মুহাম্মদ আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের নবুওয়্যাতের প্রমাণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উম্মি-নিরক্ষর। কোনো গ্রন্থ অধ্যয়ন করেননি, কোনো শিক্ষকের হাতে শিষ্যত্বও গ্রহণ করেননি! এমন মানুষ যখন এসব বাস্তব ঘটনা কোনো প্রকার বিকৃতি ছাড়া নির্ভুলভাবে বর্ণনা করেন, প্রমাণিত হয়, তিনি এসব ওহির মাধ্যমেই জানতে পেরেছেন-যা তাঁর নবুওয়্যাতের বিশুদ্ধতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।[১৮০]
টিকাঃ
[১৭৪] আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন, জালালুদ্দিন সুযুতি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা: ৩২৩。
[১৭৫] নাজরাতুন ফিল কুরআন, মুহাম্মদ আল-গাজালি, পৃষ্ঠা : ৯৫-৯৮。
[১৭৬] ইহুদিদের কুতুবুল মুকাদ্দাস-পবিত্র গ্রন্থসমূহ
[১৭৭] মুজিযাতুল কুরআনিয়্যাহ, হারুন ইয়াহইয়া, পৃষ্ঠা: ৭১-৭২。
[১৭৮] উইকিপিডিয়া ব্রিটানিকা বলেছে-'মালিক' উপাধিটি মিশরের সে সকল শাসকের জন্য ব্যবহার করা হতো, যারা খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৪০-১৬৪৮ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত শাসনক্ষমতায় আরোহণ করেছে। অর্থাৎ মিশরে হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের আগমনের প্রাক্কালে।-মুকিউ মাওসুআতুল ইজাজিল ইলমিয়্যি ফিল কুরআনি ওয়াস সুন্নাহ, www. ৫৫a.net/firas/arabic
[১৭৯] আল-মুজিযাতুল কুরআনিয়্যাহ, হারুন ইয়াহইয়া, পৃষ্ঠা: ৭৪-৭৫。
[১৮০] মাফাতিহুল গাইব, ইমাম রাজি, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১১৯১。
📄 মদিনার সংখ্যালঘু অমুসলিমদের সঙ্গে নবিজির আচরণ
মদিনায় হিজরত করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানকার নেতায় পরিণত হন। মদিনার অভ্যন্তরীণ মুশরিক ও ইহুদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাঁর সাথেই বসবাস করত। যখন ইসলামি রাজত্বের বিস্তৃতি ঘটে, তখন কোনো কোনো অঞ্চলে আগ থেকেই খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের অবস্থান ছিল। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল এবং সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় রীতিনীতির চর্চা স্বাধীনভাবেই পালন করত।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ওহি অবতরণের শুরুর দিকেই ইসলাম এই স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়েছে—যেন এর মাধ্যমে মনুষ্যত্ব সমুন্নত হতে পারে ও মানুষজন এর ছায়া অবলম্বন করে যেন সুখ অনুভব করতে পারে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন-চরিতই অমুসলিম সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে উত্তম সাক্ষী। ইসলামের শুরুর যুগে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের ওপর মক্কাবাসীদের নির্যাতন দেখে, তিনি নিজেও মক্কাবাসীদের নির্যাতন ও নিপীড়নে দগ্ধ হয়ে এবং তাদের নিষ্ঠুরতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও তিনি কাফির মুশরিকদের সাথে তাদের অনুরূপ নীতি অবলম্বন করেননি। এমনকি যখন আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও অনুগ্রহে বিজয় লাভ করেন, তখনো তিনি কুরআনের নির্দেশনা মেনে তাদের সাথে এমন আচরণ করেননি এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ
তুমি কি ঈমান আনার জন্য মানুষের সাথে জবরদস্তি করবে? [সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯৯]
উক্ত আয়াতে বর্ণিত নীতিকেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তবায়ন করেছেন এবং মানুষকে তার ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সকল মুসলমানের জন্য এ আয়াতকেই সংবিধান বানিয়েছেন। নিন্মোক্ত আয়াতের শানে নুজুল থেকে এর মর্মার্থ আরও জোরালোভাবে প্রতীয়মান হয়।
আল্লাহ তাআলার বাণী-
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ
দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হিদায়াত গোমরাহি থেকে পৃথক হয়ে গেছে। [সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬]
বর্ণিত আছে—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্ব থেকেই বনু সালিম ইবনু আউফ গোত্রের একজন আনসারি সাহাবির দুজন খ্রিষ্টান ছেলে ছিল। অতঃপর তারা দুজন খ্রিষ্টানদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে তেল নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদিনায় আসেন। বাবা তার দু ছেলেকে দেখে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে বলতে থাকে—তোমরা মুসলিম না হলে আমি তোমাদেরকে ছাড়ব না। তারা উভয়ে মুসলিম হতে অস্বীকার করে এবং তাদের মাঝে তর্কবিতর্কও শুরু হয়ে যায়। তাদের এ বিবাদের কথা রাসুলের কাছে পৌঁছে যায়। পিতা বলেন-ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার দেহের একটি অংশ [আমার ছেলে] জাহান্নামে যাবে; আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব, এটা কেমন করে হয়! এমন সময় আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন-
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই।
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পরে তাদের দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। [১৮১]
দেখতে পেলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই খ্রিষ্টান সন্তানের বাবাকে নির্দেশ দিলেন তাদেরকে নিজ আকিদা-বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেওয়ার জন্য, অথচ বাবার অধিকার ছিল সঠিক পথ অবলম্বন করানোর জন্য তাদেরকে চাপ প্রয়োগ করা। তবুও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তাদের নিজ আকিদা-বিশ্বাস এবং ইবাদতের স্বাধীনতায় ছেড়ে দিতে বলেছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার প্রথম সংবিধানেই প্রত্যেক ধর্মের স্বাধীনতার বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন। এর প্রমাণ হচ্ছে—তিনি মদিনার ইহুদিদের জন্য মুসলিমদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র একটি জাতি এবং সমাজব্যবস্থা গঠনের অনুমতি প্রদান করেছিলেন।[১৮২]
এমনিভাবে তিনি অমুসলিমদের সাথে ন্যায়সংগত ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করেছেন। এর একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে-আবদুর রহমান ইবনু আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন-কোনো এক সফরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আমরা একশ ত্রিশজন ছিলাম। একসময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন-
هَلْ مَعَ أَحَدٍ مِنْكُمْ طَعَامٌ؟
তোমাদের কারও সঙ্গে কি খাবার রয়েছে?
দেখা গেল, এক ব্যক্তির সঙ্গে এক সা কিংবা তার কমবেশি পরিমাণ খাদ্য রয়েছে। সেটা দিয়ে আটা গোলানো হলো। অতঃপর দীর্ঘদেহী এলোমেলো চুলবিশিষ্ট এক মুশরিক একটি বকরির পাল হাঁকিয়ে নিয়ে এলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—
بَيْعًا أَمْ عَطِيَّةً، أَوْ قَالَ: أَمْ هِبَةٌ؟
বিক্রি করবে, না উপহার দেবে?[১৮৩]
সে বলল—না, বিক্রি করব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে একটা বকরি কিনে নিলেন। সেটি জবেহ করা হলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরির কলিজা ভুনা করার আদেশ দিলেন। আল্লাহর কসম, একশ ত্রিশজনের প্রত্যেককে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কলিজা অল্প অল্প করে সবার হাতে দিলেন; যারা অনুপস্থিত ছিল, তাদের জন্য তুলে রাখলেন। অতঃপর দুটি পাত্রে তিনি গোশত ভাগ করে রাখলেন। সবাই পরিতৃপ্ত হয়ে খেল। আর উভয় পাত্রে কিছু উদ্বৃত্ত রয়ে গেল। সেগুলো আমরা উটের পিঠে উঠিয়ে নিলাম।[১৮৪]
এই হলো-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণ ইনসাফ। যখন একশ ত্রিশজনের একটি দল প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত, তখন একজন মুশরিক বকরি নিয়ে যাওয়া অবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটি ন্যায্য মূল্য দিয়ে ক্রয় করলেন। তাঁর সাথে ছিল পর্যাপ্ত শক্তি এবং প্রয়োজনও ছিল খুব তীব্র। এদিকে লোকটিও ছিল কাফির এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসী। চাইলেই তিনি বিনা মূল্যে জোর করে নিতে পারতেন; তবে তিনি এমনটি করেননি। নিশ্চয়ই এটি ছিল ন্যায়পরায়ণতার সমুন্নত দৃষ্টান্ত।
তিনি তাঁর নিকটতম অমুসলিমদের সাথেও নিজ পরিবারের সদস্যদের ন্যায় আচরণ করতেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—এক ইহুদি বালক নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত করত, সে একবার অসুস্থ হলে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখার জন্য গেলেন। তিনি বালকটির মাথার নিকট বসে বলেন-
أَسْلِمْ
তুমি মুসলিম হয়ে যাও।
বালকটি তার পিতার দিকে তাকাল। পিতা তার ছেলেকে বলল—তুমি আবুল কাসিমের [১৮৫] কথা মেনে নাও। অতঃপর সে ইসলাম গ্রহণ করল। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় বললেন-
الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন।[১৮৬]
এমনকি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তাঁর অমুসলিম মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছিলেন। (পরবর্তীতে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার মা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন)
আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন—যখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কুরাইশবাসী চুক্তি করেছিল, তখন আমার মা [১৮৭]—তিনি তখন মুশরিক ছিলেন—তার পিতার সঙ্গে আমার নিকট আসেন। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা [১৮৮] রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন—হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা আমার কাছে এসেছেন; তিনি ইসলামের প্রতি আসক্ত নন। আমি কি তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব? জবাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
نَعَمْ صِلِيهَا
হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। [১৮৯]
এক ইহুদির জানাজা অতিক্রমকালে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দেখিয়েছিলেন মানবতার মুগ্ধকর এবং উত্তম দৃষ্টান্ত। আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলা রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত— সাহল ইবনু হুনাইফ [১৯০] ও কায়স ইবনু সাদ [১৯১] রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কাদিসিয়াতে উপবিষ্ট ছিলেন; তখন লোকেরা তাদের সামনে দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাচ্ছিল। জানাজাটি দেখে তারা দাঁড়িয়ে গেলেন। তাদেরকে বলা হলো—এ তো এ দেশীয় জিম্মি [অমুসলিম] ব্যক্তির জানাজা। তখন তারা বললেন—একদা নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তাকে বলা হলো—এটা তো এক ইহুদির জানাজা! তখন তিনি বললেন—
أَلَيْسَتْ نَفْسًا
সে কি মানুষ নয়? [১৯২]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই তাঁর উম্মতকে অমুসলিমদের সম্মান করা শিখিয়েছেন। এমনকি তাদের মৃতদেরকেও সম্মান করতে বলেছেন।
মোটামুটি সংক্ষিপ্তভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম আদর্শের কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সামনে আরেকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেই সমাপ্তি টানব, ইনশাআল্লাহ!
খায়বারের ইহুদিদের সাথে নবিজির উত্তম আচরণ
খায়বারের যুদ্ধে মুসলিমদের সাথে ইহুদিদের পরাজয়ের পর যখন তারা সন্ধি মেনে নেয়, তখন তারা ছিল দুর্বল অবস্থানে আর মুসলিমরা ছিল শক্তিশালী অবস্থানে। এ পরিস্থিতিতে মুসলিমরা চাইলেই পারত তাদের ওপর কোনো বিষয় চাপিয়ে দিতে। কিন্তু নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ক্ষেত্রে ভিন্নপন্থা অবলম্বন করে তাদের সাথে সদাচরণ করেছেন এবং উত্তম ব্যবহারের পরিচয় দিয়েছেন।
সাহল ইবনু আবু হাসমা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—তার গোত্রের কিছু লোক খায়বারে গিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তাদের একজনকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। যে অধিবাসীদের নিকটে লাশ পাওয়া যায়, তাদেরকে তারা বলল, তোমরা আমাদের সাথিকে হত্যা করেছ। তারা বলল, আমরা তাকে হত্যা করিনি, আর হত্যাকারী কে, তাও জানি না। এরপর তারা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা খায়বার গিয়েছিলাম আর আমাদের একজনকে সেখানে নিহত অবস্থায় পেয়েছি। তখন তিনি বললেন-
الكُبْرَ الكُبر
বড়দেরকে বলতে দাও, বড়দেরকে বলতে দাও।
তারপর তিনি তাদেরকে বললেন-
تَأْتُونَ بِالْبَيِّنَةِ عَلَى مَنْ قَتَلَهُ قَالُوا: مَا لَنَا بَيِّنَةٌ، قَالَ فَيَحْلِفُونَ قَالُوا: لَاَ نَرْضَى بِأَيْمَانِ اليَهُودِ، فَكَرِهَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُبْطِلَ دَمَهُ، فَوَدَاهُ مِائَةٌ مِنْ إِبِلِ الصَّدَقَةِ .
তোমাদেরকে তার হত্যাকারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করতে হবে। তারা বলল-আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই। তিনি বললেন, তাহলে ওরা কসম করবে। তারা বলল, ইহুদিদের কসমে আমাদের বিশ্বাস নেই। এই নিহত ব্যক্তির রক্ত বৃথা হয়ে যাক, তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করলেন না। তাই সাদাকার একশ উট দিয়ে তার রক্তপণ আদায় করলেন। [১৯৩]
হত্যাকাণ্ডটি যেহেতু ইহুদিদের এলাকায় ঘটেছে, তাই হত্যাকারী তাদের মধ্য থেকেই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সবচেয়ে বেশি। তবুও যেহেতু এ ধারণার কোনো প্রমাণ নেই, আর স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম হচ্ছে, সন্দেহ ও অনুমানের ভিত্তিতে দাবি কখনো কার্যকর হতে পারে না-এজন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কোনোরূপ শাস্তিও প্রদান করেননি। তিনি শুধু এতটুকু বলেছেন-তাদেরকে শপথ করতে হবে এই বলে- আমরা এরূপ কাজ করিনি।
শুধু তা-ই নয়, তিনি মুসলিমদের কোষাগার থেকে নিহত ব্যক্তির রক্তপণও পরিশোধ করে দিয়েছেন-যেন আনসারদের ক্ষোভ প্রশমিত হয় এবং ইহুদিদের কোনো ক্ষতি ছাড়াই এই ফিতনা থেমে যায়।
এই ছিল মদিনার অমুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়নিষ্ঠ ও দয়া এবং অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ।
সমাপ্ত
টিকাঃ
[১৮১] আসবাবুন-নুজুল, ওয়াহিদি আন-নিশাপুরি: ৫৩; লুবাবুন নুজুল, সুয়ুতি: ৩৭
[১৮২] আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনু কাসির: ২/৩২১; আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনু হিশাম: ১/৫০১; আর-রওজুল উনুফ, সুহাইলি: ২/৩৪৫
[১৮৩] এতে বুঝে আসে তাদের সাথে লেনদেন এবং তাদের হাদিয়া গ্রহণ করা যাবে। -ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার আসকালানি: ৪/৪১০। তবে কিছু কিছু হাদিয়া গ্রহণের ব্যাপারে মতানৈক্য আছে।
[১৮৪] সহিহুল বুখারি: ২৬১৮, ৫৩৮২; সহিহ মুসলিম: ২০৫৬
[১৮৫] নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কুনিয়াত তথা উপনাম。
[১৮৬] সহিহুল বুখারি, ১৩৫৬; সুনানুত তিরমিজি, ২২৪৭
[১৮৭] তিনি হলেন বনি আমের ইবনু লুআই গোত্রের অধিবাসী কুতাইলা বিনতে সাদ। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী। তিনিই আসমা ও আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহুর মা। তিনি অনেক পরে মুসলিম হয়েছেন; হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মুশরিক অবস্থায় মদিনায় আগমন করেন। উসদুল গাবা, ইবনুল আসির: ২/২৪২
[১৮৮] তিনি আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর মেয়ে আসমা। জুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহর অধীনে ছিলেন। নবুওয়্যাতের শুরুর দিকেই তিনি মুসলিম হয়েছেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়েরকে গর্ভে ধারণ অবস্থায় মদিনায় হিজরত করেন। কুবাতে এসে তাঁর গর্ভপাত হয়। জুমাদিউল উলা মাসের ৭৩ হিজরিতে তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর নিহত হবার কিছুক্ষণ পরেই তিনি ইন্তিকাল করেন। উসদুল গাবা, ইবনুল আসির: ৬/১২
[১৮৯] সহিহুল বুখারি: ২৬২০; সহিহ মুসলিম: ১০০৩
[১৯০] সাহল ইবনু হুনাইফ ইবনু ওয়াহিব—তিনি বদর যুদ্ধে এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধেও তিনি দৃঢ়তার সাথে নিজ ভূমিকায় অটল ছিলেন। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বসরায় গমনকালে তাকে মদিনার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেছিলেন। সিফফিন যুদ্ধে তিনি আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ছিলেন এবং আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে পারস্যের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। ৮৮ হিজরিতে কুফায় তিনি ইন্তিকাল করেন।-আল-ইস্তিআব, ইবনু আব্দিল বার: ২/২২৩; উসদুল গাবা, ইবনুল আসির: ২/৩৩৫; আল-ইসাবা, ইবনু হাজর আসকালানি: ৫৩২৩ নং জীবনী。
[১৯১] কায়স ইবনু সাদ ইবনু উবাদা—তিনি আরবের একজন প্রভাবশালী বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ও সম্ভ্রান্ত লোক ছিলেন। ছিলেন একজন দক্ষ সমরকুশলী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তাঁর স্থান ছিল তেমন, যেমন থাকে একজন শাসকের কাছে পুলিশ প্রধানের স্থান। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর হাতেই পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। তিনি সেখানেই ৫৯ হিজরি অথবা ৬০ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন। আল- ইসাবা, ইবনু হাজার আসকালানি: ৭১৭৬ নং জীবনী; উসদুল গাবা, ইবনুল আসির: ২৭২; আল-ইস্তিআব, ইবনু আবদিল বার: ২/২২৩
[১৯২] সহিহুল বুখারি: ১৩১৩; সহিহ মুসলিম: ৯৬১
[১৯৩] সহিহুল বুখারি: ৬১৪২; সহিহু মুসলিম: ১৬৬৯