📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 নবিজির সততা

📄 নবিজির সততা


একজন মানুষ যেসব উন্নত চরিত্রগুণে গুণান্বিত হয়ে শ্রেষ্ঠ ও মহৎ হয়, এর মধ্যে সততা অন্যতম। সততা তাই স্বাভাবিকতই কুরআন কারিমের গুরুত্বের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু; আল্লাহ তাআলাকে রব বিশ্বাসকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে সম্বোধন করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
يَآ أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَ كُوْنُوْا مَعَ الصَّدِقِيْنَ
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো। [সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৯]
আল্লাহ তাআলা সত্যবাদীদের সাথে থাকার নির্দেশ প্রদান করেছেন, এ কথা বোঝানোর জন্য, সমগ্র মুসলিম জাতিকে অবশ্যই সততার মহৎ গুণে গুণান্বিত হতে হবে। সততা প্রতিটি কল্যাণের চাবি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সততার গুণে ছিলেন অনন্য, অন্যতম, প্রধান উপমা। নবুওয়্যাতপ্রাপ্তির পূর্বেই কুরাইশদের পক্ষ থেকে তাঁকে উপাধি দেওয়া হয়েছিল—সাদিক বা সত্যবাদী সম্বোধনে, আমিন বা বিশ্বস্ত উপাধিতে। তারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিজেদের জরুরি বিষয়গুলো আমানত রেখে নিজেদের বস্তু ও গোপন বিষয়গুলোর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকত। যখনই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুওয়্যাত পেলেন, সাথে সাথে তাঁর বংশের লোকজনসহ আত্মীয়স্বজন প্রায় সকলেই শত্রুতা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, যুদ্ধংদেহি ভাব প্রকাশ করতে আরম্ভ করল। এই সঙ্গিন পরিস্থিতিতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মহান চরিত্রে ইস্পাতদৃঢ়ভাবে অবিচল থাকলেন; এমনকি সেসব আমানত ফিরিয়ে দিয়ে তাঁর সততার বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন—সবচেয়ে বড় শত্রুরা যেগুলো তাঁর কাছে আমানت রেখেছিল। [১১২]
আল্লাহ তাআলা যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিলেন- নিজের নিকটাত্মীয়দেরকে (পরকালের শান্তি সম্পর্কে) ভীতি প্রদর্শন করো, তিনি সাফা পর্বতে আরোহণপূর্বক বললেন-
أَرَأَيْتَكُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ خَيْلًا بِالْوَادِي تُرِيدُ أَنْ تُغِيرَ عَلَيْكُمْ أَكُنْتُمْ مُصَدِّقِ؟ قَالُوا نَعَمْ مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إِلَّا صِدْقًا قَالَ فَإِنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ .
আমি যদি তোমাদের সংবাদ দিই, উপত্যকার পাদদেশে একটি অশ্বারোহী বাহিনী ওত পেতে রয়েছে, তারা যেকোনো মুহূর্তে তোমাদের ওপর হামলে পড়তে পারে, তাহলে তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল- হ্যাঁ। আমরা তোমার ব্যাপারে কেবল সততার অভিজ্ঞতাই লালন করি। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-আমি তোমাদের অত্যাসন্ন কঠিন আজাব সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করছি।[১১৩]
নবিজির সবচেয়ে বড় শত্রু-নজর ইবনু হারিসও তাঁর সততার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন। সে কুরাইশের নেতৃস্থানীয় লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়—
يا معشر قريش، إنه والله لقد نزل بكم أمر ما أتيتم له بحيلة بعد، قد كان محمد فيكم غلاما حدثا، أرضاكم فيكم وأصدقكم حديثا، وأعظمكم أمانة حتى إذا رأيتم في صدغيه الشيب، وجاءكم بما جاءكم به قلتم: ساحر. لا والله ما هو بساحر؛ لقد رأينا السحرة ونفثهم وعقدهم، وقلتم : كاهن. لا والله ما هو بكاهن؛ قد رأينا الكهنة وتخالجهم، وسمعنا سجعهم. وقلتم: شاعر. لا والله ما هو بشاعر؛ قد رأينا الشعر وسمعنا أصنافه كلها؛ هزجه ورجزه، وقلتم: مجنون. لا والله ما هو بمجنون لقد رأينا الجنون فما هو بخنقه ولا وسوسته ولا تخليطه ، يا معشر قريش، فانظروا في شأنكم ، فإنه والله لقد نزل بكم أمر عظيم .
হে কুরাইশ সম্প্রদায়, আল্লাহর কসম, তোমাদের ওপর এমন কঠিন বিপদ আপতিত হয়েছে, যেরকম বিপদ প্রতিরোধের কোনো কৌশল তোমাদের এখনো হস্তগত হয়নি। মুহাম্মদ ছিল তোমাদের মাঝে তরুণ-যুবক, তোমাদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে সত্যবাদী, সবচেয়ে বড় আমানতদার। যখন তোমরা তার দুই জুলফিতে শুভ্রতা দেখলে-সে পদার্পণ করল প্রৌঢ়ত্বে, তোমাদের কাছে যা নিয়ে আসার তা নিয়ে এলো, তখন তোমরা তাকে বললে-জাদুকর। আল্লাহর কসম, তিনি জাদুকর নন। আমরা তো জাদু দেখেছি, দেখেছি জাদুর ফুঁৎকার ও গ্রন্থি। তোমরা বললে-সে জ্যোতিষী। আল্লাহর কসম, তিনি জ্যোতিষী নন। আমরা তো জ্যোতিষী ও তাদের অবস্থা দেখেছি, তাদের তুকতাক শুনেছি। তোমরা বললে-সে কবি। আল্লাহর কসম, তিনি কবি নন। আমরা কবিতা দেখেছি, কবিতার সমস্ত প্রকার শুনেছি, কবিতার ঝংকার-তরঙ্গ দেখেছি। তোমরা বললে-সে পাগল। আল্লাহর কসম, তিনি পাগল নন। আমরা পাগল দেখেছি। পাগলের কথায় যে জড়তা, আবোলতাবোল ও অমূলক বক্তব্য থাকে, তা তাঁর কথাবার্তায় অনুপস্থিত। তোমরা নিজেদের অবস্থান দেখো। আল্লাহর কসম, তোমরা এমন বিপদে কখনো নিপতিত হওনি।[১১৪]
এসবের চেয়ে বড় বিষয় হলো—তাঁর সততার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্যপ্রদান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَ الَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَ صَدَّقَ بِهِ أُولِّيكَ هُمُ الْمُتَّقُوْنَ .
যিনি সত্যসহ এসেছেন এবং যাঁরা তাঁকে সত্যায়ন করেছেন, তাঁরা মুক্তাকি। [সুরা জুমার, আয়াত: ৩৩]
যিনি সত্যসহ আগমন করেছেন, তিনি আমাদের নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর যিনি তাঁর প্রতি সপ্তাকাশের ওপার থেকে অবতীর্ণ কুরআন কারিমের বিষয়বস্তুকে সত্যায়ন করেছেন, তিনি আল্লাহ তাআলা। এই আয়াতের সাথে সংযুক্ত করে ইমাম ইবনু আশুর বলেছেন-সত্যসহ আগমনকারী হলেন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আর সত্যটি হলো আল-কুরআন।[১১৫]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদা-সর্বদা মুসলিমদেরকে তাঁদের কথা- কাজে সত্যপথে চলতে উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন-
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابًا.
তোমাদের জন্য সত্য অপরিহার্য। কারণ, সত্য নেকির পথে পরিচালিত করে, আর নেকি জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। মানুষ যখন সত্যপথে চলতে থাকে, সত্য অন্বেষণ করতে থাকে, তাকে আল্লাহর কাছে সিদ্দিক হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
তোমরা মিথ্যাকে পরিহার করে চলবে। কারণ, মিথ্যা পাপাচারের পথে পরিচালিত করে, আর পাপাচার জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়। মানুষ যখন অবিরত মিথ্যা বলে, মিথ্যাকে খোঁজে, তাকে আল্লাহর কাছে মিথ্যুক হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। [১১৬]
এমনকি অনেক সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইরশাদ করতেন-
اضْمَنُوا لِي سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ .
তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে আমার জন্য ছয়টি বস্তুর দায়িত্ব নাও, আমি তোমাদের জান্নাতের দায়িত্ব নেব। সেগুলো হলো :- কথা বললে সত্য বলো, প্রতিজ্ঞা করলে পূর্ণ করো, আমানত রাখা হলে তা প্রদান করো, তোমাদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করো, তোমাদের চোখকে নিচু রাখো এবং তোমাদের হাতকে (অপরাধ থেকে) বিরত রাখো। [১১৭]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহানুভবতার আরেকটি দিক হলো-তিনি নিজের পরবর্তী প্রজন্ম ও মুসলিমদের মাঝে সত্যকে ভালোবাসার শিক্ষা প্রোথিত করেছেন। এর সবচেয়ে বড় দলিল-আবুল হাওরা আস-সায়াদি বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি হাসান ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বললাম, আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন বিষয়টি সংরক্ষণ করেছেন? তিনি বললেন-
حَفِظْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ فَإِنَّ الصَّدْقَ طُمَأْنِينَةٌ وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةُ .
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সংরক্ষণ করেছি— সন্দেহপূর্ণ বিষয় ছাড়ো, নিশ্চিত বিষয় ধরো। কারণ, সত্য হলো তৃপ্ততা আর মিথ্যা হলো সংশয়তা। [১১৮]
এই ভালোবাসা এমনিতেই সৃষ্টি হয়নি; এর মূল রহস্য—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং প্রতিটি কথা ও কাজে এই গুণে গুণান্বিত ছিলেন; এমনকি ঠাট্টা ও মশকরার সময়, যখন মানুষ মিথ্যাকে বৈধ মনে করে, তখনো তিনি সত্যবাদিতার গুণে অবিচল থাকতেন। হজরত আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত-
أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ احْمِلْنِي قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ قَالَ وَمَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهَلْ تَلِدُ الْإِيلَ إِلَّا النُّوقُ .
জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলল—হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে আরোহণের জন্য কোনো জন্তু দিন। জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-আমি তোমাকে উটের বাচ্চায় আরোহণ করাব। লোকটি বলল-হে আল্লাহর রাসুল, আমি উটের বাচ্চা দিয়ে কী করব? জবাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—উটনি তো বাচ্চাই জন্ম দেয়। [১১৯]
একজন সাধারণ মুসলিমের সাথে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই রসিকতা ছিল হৃদ্যতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য। কিন্তু সেখানেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য শব্দই ব্যবহার করেছেন।
যুদ্ধের সময়ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা এর ব্যতিক্রম হতো না। বাকি যতটুকু মিথ্যা বলার অনুমতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দিয়েছেন, তা ছিল শত্রুর অনিষ্টতা থেকে বাঁচার জন্য, তাদের পক্ষ থেকে আশঙ্কাপূর্ণ ক্ষতিকে প্রতিরোধ করার জন্য; [১২০] কিন্তু সেখানেও তিনি সত্যই বলেছেন।
আমরা বদর যুদ্ধপূর্ববর্তী তাঁর অবস্থান দেখব, যেখানে কুরাইশরা মুসলিমদেরকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য যুদ্ধযাত্রা করেছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন, তাঁর সাথে হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু। উদ্দেশ্য ছিল—আরবের জনৈক বৃদ্ধের কাছ থেকে কুরাইশদের সংবাদ অবগত হওয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কুরাইশদের সম্পর্কে, মুহাম্মদ ও তাঁর সাথিদেরকে সম্পর্কে, যা জানে, সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। বৃদ্ধ বলল—তোমাদের দুজনের পরিচয় না দিলে আমি তোমাদের কিছুই বলব না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তুমি বললে আমরাও বলব। বৃদ্ধ বলল—তাহলে কি বিনিময় হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-হ্যাঁ। এবার বৃদ্ধ বলল—আমি জানতে পেরেছি, মুহাম্মদ ও তাঁর সাথিরা অমুক অমুক দিন বের হয়েছেন। যদি আমাকে সংবাদদাতা সঠিক বলে থাকে, তাহলে তাঁরা অমুক স্থানে আছেন। (বাস্তবেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে অবস্থান করছিলেন।) আর কুরাইশদের ব্যাপারে জানতে পেরেছি, তারা অমুক দিন যুদ্ধযাত্রা করেছে। যদি সাংবাদিক আমাকে সঠিক তথ্য দিয়ে থাকে, তাহলে তারা আজকে অমুক স্থানে অবস্থান করছে। (বাস্তবেও কুরাইশরা সেখানে অবস্থান করছিল।) কথা শেষ করে বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল—তোমরা কারা, এবার বলো? জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
نحن من ماء
আমরা পানি হতে সৃষ্টি।
তারপর সেখান থেকে চলে গেলেন। বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল-‘কীসের পানি থেকে? ইরাকের পানি থেকে কি?[১২১]
আমরা খুব সুন্দর একটি ঘটনার মাধ্যমে এই আলোচনাটি শেষ করতে চাচ্ছি, এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং বনু হাওয়াজিনের প্রতিনিধিদলের মাঝে সংঘটিত হয়েছিল; ইসলাম গ্রহণের প্রথম দিনেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সত্যবাদিতার গুরুত্ব শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাদেরকে বলেছিলেন—
أَحَبُّ الْحَدِيثِ إِلَيَّ أَصْدَقُهُ
আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বাণী হলো—সত্য কথা।[১২২]
এমনটিই ছিল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। যেখানে প্রতিটি বস্তু সত্যের শুভ্রতায় আলোকময় ছিল। কারলাইল[১২৩] তাই বলতে বাধ্য হয়েছেন— ...তোমরা কি মনে কর, একজন মিথ্যাবাদী মানুষ জনপ্রিয় একটি ধর্ম আবিষ্কার করতে পারে? সে তো একটি ইটের ঘরও নির্মাণ করতে পারে না। যখন লোকে চুন, চুনকাম, মাটি ও গৃহনির্মাণ-প্রয়োজনীয় সামগ্রী সম্পর্কে না জানে, তার দ্বারা বাড়ি নির্মাণ অসম্ভবপর। সে তো গড়বে ধ্বংসস্তুপের পাহাড় আর অনেক উপকরণের মিশেলে তৈরি বালুর চর! এমন ব্যক্তির নির্মিত ধর্মের দুইশ মিলিয়নেরও অধিক অনুসারীদের [১২৪] যুগও কি টিকে থাকার কথা! তারা তো বরং এমনভাবে ধ্বংস হয়ে পড়ার কথা, যাদের নামনিশানা পর্যন্ত থাকবে না। আমি খুব ভালোভাবেই জানি, এমন মানুষের জন্য প্রতিটি বিষয়ে স্বভাবগত নিয়মের অনুগামী হয়ে চলতে হয়, নতুবা তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান হয়। ওই কাফিররা ইসলামের নবির বিরুদ্ধে যা ছড়িয়েছে, তা মিথ্যা। এ মিথ্যা প্রচারণার কারণে মানুষেরা সে মিথ্যাকে সত্য ভাবতে আরম্ভ করেছে...
দুর্ভাগ্য, তাদের এ বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচারের কারণে গোষ্ঠীর পর গোষ্ঠী প্রতারিত হয়েছে!...[১২৫]

টিকাঃ
[১১২] সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: হাদিস: ১২৪৭৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনু কাসির, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২১৮-২১৯; তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, তাবারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৬৯।
[১১৩] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৪৭৭০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫০৭১।
[১১৪] সিরাতে ইবনু হিশাম খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৯৯-৩০০; আর-রওজুল উনুফ, আস-সুহাইলি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৬৮; উয়নুল আসার, ইবনু সায়্যিদিন নাস, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪২৭。
[১১৫] আত-তাহরির ওয়াত তানবির, ইবনু আশুর, খণ্ড: ২৪, পৃষ্ঠা : ৮৬।
[১১৬] সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬০৭, সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ৪৯৮৯, সুনানুত তিরিমিজি, হাদিস: ১৯৭১, ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩৮৪৯。
[১১৭] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ২২৮০৯। আল্লামা শুয়াইব বলেছেন-হাদিসটি হাসান লিগাইরিহি এবং বর্ণনাটির রাবিগণ নির্ভরযোগ্য; ইবনু হিব্বান: হাদিস: ২৭১; হাকিম, হাদিস: ৮০৬৬, তিনি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন, তবে বুখারি ও মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেননি।
[১১৮] সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৮, মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৭২৩。
[১১৯] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ৪৯৯৮; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৩৮৪৪।
[১২০] রিয়াদুস সালিহিন, ইমাম নববি, পৃষ্ঠা: ৫৬৫-৫৬৬。
[১২১] উয়নুল আসার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা: ৩২৯; সিরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনু কাসির, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা: ৩৯৬; আর-রওজুল উনুফ, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৭৩; সিরাতে ইবনু হিশাম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬১৫।
[১২২] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ২৩০৭; সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ২৬৯৩, মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৮৯৩৪。
[১২৩] টমাস কার্লাইল (১৭৯৫-১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দ) একজন প্রসিদ্ধ ইংরেজ লেখক। তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-আবতালে তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে একটি চমৎকার অধ্যায় রচনা করেছেন।
[১২৪] এই সংখ্যাটা ছিল কারলাইলের গ্রন্থ আল-আবতাল প্রকাশের সময়। কিন্তু ২০০৮ সালে মুসলিমদের সংখ্যা ১.৩ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। (সূত্র: আশ-শারকুল আউসাত পত্রিকা) বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা ১.৯ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। সূত্র: উইকিপিডিয়া-নিরীক্ষক。
[১২৫] আল-আবতাল, কারলাইল, পৃষ্ঠা: ৪৩।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মানুষের অধিকার

📄 নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মানুষের অধিকার


ইসলাম মানুষের প্রতি সম্মান-মর্যাদাসহ মহত্ত্বের দৃষ্টিতে তাকায়। যেমন : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْتُهُمْ فِي الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ وَ رَزَقْتُهُمْ مِّنَ الطَّيِّبُتِ وَفَضَّلْتُهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيْلًا .
নিশ্চয় আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; আমি তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। [সুরা বনি ইসরাইল : ৭০]
মানুষের অধিকারের প্রতি ইসলামের এই সুদৃষ্টি তাঁকে বিশেষ ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। এর অন্যতম হলো—সকল অধিকারের ব্যাপকতা। যেমন: রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শিক অধিকার। এই অধিকার মানুষের প্রত্যেকটি শ্রেণিকেই পরিব্যাপ্ত করবে-হোক সে মুসলিম বা অমুসলিম; বর্ণ, জাতি, ভাষা ও দ্বীনের মাঝে কোনো প্রকার ফারাক ছাড়াই এ অধিকার কার্যকরী। কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি ও পরিবর্তনের অবকাশ এতে নেই। এগুলো রাব্বুল আলামিনের শিক্ষার মাধ্যমে প্রয়োগ হবে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজ এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। নবিজির শেষ খুতবাটি মানুষের অধিকারের বর্ণনায় সমৃদ্ধ ও পরিব্যাপ্ত ছিল; সেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا إِلَى يَوْمِ تَلْقَوْنَ رَبَّكُمْ .
তোমাদের রক্ত এবং সম্পদ তোমাদের ওপর হারাম, যেমন আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তোমাদের এই দিনটি হারাম, এই মাসটি হারাম এবং এই শহরটি হারাম। [১২৬]
নবিজির এই খুতবাটি সামগ্রিকভাবে সকলের অধিকারকে শক্তিশালী করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী-রক্ত, সম্পদ ও অস্থাবর সম্পত্তি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণভাবে মানুষের মর্যাদাকে বড় করে দেখেছেন, তাদের সবচেয়ে বড় অধিকার-জীবনের অধিকার সংরক্ষণ করেছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন কবিরা গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি জবাবে বললেন-
الْكَبَائِرُ الْإِشْرَاكُ بِاللهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَقَتْلُ النَّفْسِ وَالْيَمِينُ الْغَمُوسُ .
কবিরা গুনাহ হলো-আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা, কোনো প্রাণকে (অন্যায়ভাবে) হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া। [১২৭]
হাদিসে প্রাণ হত্যার কথা বলা হয়েছে। অন্যায়ভাবে যেকোনো শ্রেণির প্রাণ হত্যাই এর অন্তর্ভুক্ত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মানবজীবনের হিতৈষণার কথা আলোচনা করেছেন, তখন আরও বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন। একপর্যায়ে তিনি আত্মহত্যাকেও হারাম ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ করেছেন-
مَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ يَتَرَدَّى فِيهِ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا وَمَنْ تَحَسَّى سُمَّا فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَسُمُّهُ فِي يَدِهِ يَتَحَسَّاهُ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا وَمَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَجَأُ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا .
যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে; চিরকাল সেখানে নিজেকে পাহাড় থেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে; তার হাতে বিষ থাকবে, সে চিরকাল সেখানে বিষপানে আত্মহত্যা করতে থাকবে। যে ব্যক্তি লৌহ-পদার্থ দ্বারা আত্মহত্যা করল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে; তার হাতে লৌহ-পদার্থ থাকবে, সে চিরকাল এর দ্বারা নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে। [১২৮]
জীবনের অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে, এমন প্রতিটি কাজকে ইসলাম হারাম করেছে-সে কাজটি হোক ভীতিকর, লাঞ্ছনাকর বা ক্ষতিকর।
হজরত হিশাম ইবনু হাকিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-
إِنَّ اللَّهَ يُعَذِّبُ الَّذِينَ يُعَذِّبُونَ النَّاسَ فِي الدُّنْيَا
নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সেসব মানুষকে আজাব দেবেন, যারা দুনিয়াতে মানুষকে কষ্ট দেয়। [১২৯]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোটা মানবজাতির মাঝে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন-ব্যক্তির মাঝে, দলের মাঝে, জাতি ও গোষ্ঠীর মাঝে, বিচারক ও বিচারপ্রার্থীর মাঝে, শাসক ও জনতার মাঝে; এগুলোর মাঝে কোনো শর্ত ও ব্যতিক্রম নেই; আরবি ও আজমির মাঝে কোনো তফাত নেই; সাদা ও কালোর মাঝে কোনো বিভেদ নেই; শাসক ও শাসিতের মাঝে কোনো ফারাক নেই। মানুষের মাঝে বেশকম হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِي عَلَى أَعْجَمِيٌّ وَلَا لِعَجَمِيٌّ عَلَى عَرَبِيَّ وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى .
হে মানবজাতি, তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা একজন। সাবধান, অনারবের ওপর আরবের, আরবের ওপর অনারবের, কৃষ্ণের ওপর লালের, লালের ওপর কৃষ্ণের-তাকওয়া ছাড়া মর্যাদার কোনো সূত্র নেই। [১৩০]
+++ আমরা সাম্যনীতির ক্ষেত্রে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ ও শিষ্টাচার দেখার চেষ্টা করব, যেন তাঁর মহানুভবতা খুব ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি।
হজরত আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন-হজরত আবু জর রাদিয়াল্লাহু আনহু হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তার মায়ের দিকে সম্বন্ধিত করে তিরস্কার করলেন, বললেন-হে কালো নারীর পুত্র, হজরত বেলাল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে অভিযোগ করলেন। নবিজি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। পরবর্তী সময়ে হজরত আবু জর নবিজির কাছে এলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পেরেই মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। হজরত আবু জর জানতে চাইলেন- আল্লাহর রাসুল, আমার ব্যাপারে এমন কোন সংবাদ পেয়েছেন, যার কারণে আপনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন-
أنت الذي تعير بلالا بأمه قال النبي صلى الله عليه وسلم : والذي أنزل الكتاب على محمد - أو ما شاء الله أن يحلف - ما لأحد علي فضل إلا بعمل ، إن أنتم إلا كطف الصاع .
তুমি বেলালকে ওর মায়ের প্রতি সম্বোধন করে তিরস্কার করেছ! নবিজি আরও বললেন-ওই সত্তার শপথ, যিনি মুহাম্মদের ওপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, অথবা অন্য কোনো শপথ করে বললেন-কেউ কেবল আমলের দ্বারা মর্যাদা লাভ করতে পারে। তোমাদের আমল তো সা (একটি পরিমাপ) পরিমাণ (সাধারণ ব্যাপার)।[১৩১]
সাম্যের অধিকারের সাথে আরেকটি অধিকার সংযুক্ত; তা হলো-ইনসাফ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি তাঁর সাহাবা কিরাম এবং উম্মাহকে শিখিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-
الْقُضَاهُ ثَلَاثَةُ وَاحِدُ فِي الْجَنَّةِ وَاثْنَانِ فِي النَّارِ فَأَمَّا الَّذِي فِي الْجَنَّةِ فَرَجُلُ عَرَفَ الْحَقَّ فَقَضَى بِهِ وَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَجَارَ فِي الْحُكْمِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ قَضَى لِلنَّاسِ عَلَى جَهْلٍ فَهُوَ فِي النَّارِ .
বিচারক তিন শ্রেণির। তাদের এক শ্রেণি হবে জান্নাতি, আর দুই শ্রেণি হবে জাহান্নামি। জান্নাতি হলো সে বিচারক, যে সত্যকে বুঝে সে অনুযায়ী ফয়সালা করে। আর যে বিচারক সত্যকে বুঝে নিপীড়নমূলক ফয়সালা করল, সে জাহান্নামি। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি না বুঝে মানুষের মাঝে ফয়সালা করল, সেও জাহান্নামি। [১৩২]
ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তির আত্মসমর্থনমূলক বক্তব্য উপস্থাপনের অধিকার হরণ করতে নিষেধ করতেন। নবিজি বলতেন-
فَإِنَّ لِصَاحِبِ الْحَقِّ مَقَالًا
অধিকারীর কথা বলার অধিকার রয়েছে।[১৩৩]
যে ব্যক্তি মানুষের বিচার ও ফয়সালার পদে আসীন, তাকে উদ্দেশ্য করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
فَإِذَا جَلَسَ بَيْنَ يَدَيْكَ الْخَصْمَانِ فَلَا تَقْضِيَنَّ حَتَّى تَسْمَعَ مِنْ الْآخَرِ كَمَا سَمِعْتَ مِنْ الْأَوَّلِ فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يَتَبَيَّنَ لَكَ الْقَضَاءُ .
যখন তোমার সামনে বিবদমান দু পক্ষ হাজির-প্রথমপক্ষ হতে যেভাবে শুনেছ, দ্বিতীয় পক্ষ থেকেও সেভাবে শ্রবণ করার আগ পর্যন্ত কখনো ফয়সালা করবে না। সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছুবার জন্য এটিই সতর্কপূর্ণ পদ্ধতি। [১৩৪]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিধান অনুযায়ী আকিদা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাও মানুষের অধিকারের শামিল। প্রমাণ-আল্লাহ তাআলার কালাম—
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ
ধর্মের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই। [সুরা বাকারা, আয়াত : ২৫৬]
নির্ধারিত কোনো একটি আকিদা-বিশ্বাস গ্রহণ করতে কাউকে চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। সংগত কারণেই মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেননি। অথচ তিনি তখন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও বিজয়ের অধিকারী ছিলেন। তারপরও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কুরাইশদের বললেন-
اذْهَبُوا فَأَنْتُمْ الطَّلَقَاءُ
চলে যাও, তোমরা মুক্ত-স্বাধীন।[১৩৫]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মানুষের অধিকারের তালিকা আরও প্রলম্বিত। যেমন মানুষের চিন্তা-চেতনা এবং ভাব ও স্বভাবের স্বাধীনতাও এখানে অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যদের মতামতকে সম্মান করতেন, মতামত প্রদানে উৎসাহ দিতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো মত প্রদান করতেন, বিপরীতে অন্য কেউ ভিন্নমত প্রদান করত এবং সে মতের মাঝে যদি কল্যাণ নিহিত থাকত, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মত প্রত্যাহার করে ভিন্নমতকে গ্রহণ করতেন।
উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে সংঘটিত ইতিহাসটি এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। সে সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মতকে প্রত্যাহার করে সংখ্যাগরিষ্ঠ যুবকদের মতকে বরণ করে নিয়েছিলেন; তারা মদিনার বাইরে গিয়ে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করাকে প্রাধান্য দিয়েছিল; অথচ এটা ছিল নবিজির মতের বিপরীত।[১৩৬]
মানব-অধিকারের দাবি হিসেবে ব্যক্তিজীবনের অনন্য অধিকার শুধু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-প্রণীত বিধানের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা হয়েছে, তা হলো-পর্যাপ্ত খোরপোষের অধিকার। এ ক্ষেত্রে সমস্ত মানবরচিত পদ্ধতি ও মানব-অধিকার সনদ নীরব।
পর্যাপ্ত খোরপোষের অধিকারের মর্ম হলো—প্রতিটি ব্যক্তি ইসলামি সালতানাতের নিয়ন্ত্রণে থেকে জীবনের যাবতীয় প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্জন করতে পারবে; লাভ করতে পারবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন, তার জন্য নিশ্চিত হবে যাপনযোগ্য জীবন। মূলত এই অধিকার মানবরচিত বিধানপ্রবর্তিত 'জীবিকা নির্বাহের ন্যূনতম অধিকারের' সম্পূর্ণ বিপরীত-যেটি মানুষের জীবনের ন্যূনতম সীমার প্রতি লক্ষ রাখে।[১৩৭]
পর্যাপ্ত খোরপোষের অধিকার আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়। যখন কোনো মানুষ অক্ষম হয়ে যায়, তখন জাকাত এই রুদ্ধতাকে দূর করে দেয়। জাকাতও যখন মুখাপেক্ষীর পর্যাপ্ত প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র এই প্রয়োজন পূরণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অধিকারকে সমর্থন করে বলেছেন—
مَا آمَنَ بِي مَنْ بَاتَ شَبْعَانًا وَجَارُهُ جَائِعُ إِلَى جَنْبِهِ وَهُوَ يَعْلَمُ بِهِ.
ওই ব্যক্তি আমার প্রতি ঈমান আনেনি, যে ব্যক্তি পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমাল, অথচ অন্যদিকে তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত; আর সে বিষয়টি জানে।[১৩৮]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশংসা করে বলেছেন—
إِنَّ الْأَشْعَرِيِّينَ إِذَا أَرْمَلُوا فِي الْغَزْوِ أَوْ قَلَّ طَعَامُ عِيَالِهِمْ بِالْمَدِينَةِ جَمَعُوا مَا كَانَ عِنْدَهُمْ فِي ثَوْبِ وَاحِدٍ ثُمَّ اقْتَسَمُوهُ بَيْنَهُمْ فِي إِنَاءٍ وَاحِدٍ بِالسَّوِيَّةِ فَهُمْ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُمْ .
আশয়ারিরা যখন যুদ্ধে আত্মনিয়োগ করে কিংবা মদিনায় তাদের প্রতিবেশীদের খাবার হ্রাস পায়, তখন তাদের নিকটে-থাকা সামান একটি কাপড়ে জমা করে; তারপর সেগুলো তাদের মাঝে সমানভাবে বণ্টন করে দেয়। তারা আমার দলভুক্ত, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত।[১৩৯]
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের অধিকার আদায়ে ছিলেন সবচেয়ে অগ্রগণ্য এবং এর মহান রক্ষক। তিনি মানবজাতির প্রতি যে রিসালাত নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তা ছিল ইনসানিয়াতের রিসালাত। এই রিসালাত এমন সমস্ত অধিকারের রক্ষক ছিল, যা প্রকৃত অর্থেই মানবতার সাথে সম্পৃক্ত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনসানিয়াত ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইনসানিয়াত-মহান মানবতা!

টিকাঃ
[১২৬] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৪৪০৬, ৪৬৬২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৭৯; সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ১৯৪৭; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৯৮৭৩。
[১২৭] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ২৬৫৩, সুনানুন নাসায়ি, হাদিস: ৪০০৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ৬৮৮৪。
[১২৮] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৫৭৭৮; সহিহু মুসলিম, হাদিস: ১০৯。
[১২৯] সহিহু মুসলিম, হাদিস : ২৬১৩; সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ৩০৪৫; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৫৩৬৬。
[১৩০] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ২৩৫৩৬; আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি, হাদিস: ১৪৪৪১
[১৩১] শুয়াবুল ঈমান, বাইহাকি, হাদিস: ৫১৩৫。
[১৩২] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ৩৫৭৩; সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ১৩২২; ইবনু মাজাহ, হাদিস: ২৩১৫。
[১৩৩] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ২৩০৬, ২৩৯০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০১。
[১৩৪] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ৩৫৮২; সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩১; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ৮৮২。
[১৩৫] সিরাতে ইবনু হিশাম: ২/৪১১; তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক: ২/৫৫; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনু কাসির: ৪/৩০১。
[১৩৬] আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : হাদিস : ১৩০৬১; আর-রওজুল উনুফ: ৫/২৪৫-২৪৬; উয়ুনুল আসার ইবনু সাইয়্যিদিন নাস: ১/৪১২; সিরাতুন নববিয়্যাহ-ইবনু কাসির: ৩/২৪
[১৩৭] মাওসুআতু হুকুকিল ইনসানি ফিল ইসলাম, খাদিজাতুন নাবরাবি: ৫০৫-৫০৯
[১৩৮] আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি, হাদিস: ৭৫০; আল-মুস্তাদরাক লিল হাকিম, হাদিস: ৭৩০৭; শুআবুল ইমান, বাইহাকি, হাদিস: ৩২৩৮。
[১৩৯] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ২৪৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫০০।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নারীর অধিকার

📄 নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নারীর অধিকার


ইসলাম নারীকে যত্ন ও অনুগ্রহের বেষ্টনীতে ঘিরে রেখেছে; তাকে উঁচু করেছে, তাকে সম্মানিত করেছে। কন্যা ও স্ত্রী হিসেবে, বোন ও মা হিসেবে ইসলাম নারীকে বিশেষ মর্যাদা ও সদাচরণের অধিকারী করেছে। ইসলামই প্রথম এই সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে- নারী ও পুরুষের সৃষ্টিমূল একই। সংগত কারণেই মানবিক অধিকারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
يأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَ خَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءٌ ةَ وَ اتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ هُ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا .
হে মানবসমাজ, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাঞ্চা করে থাকো এবং আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। [সুরা নিসা, আয়াত: ১]
এ বিষয়ে আরও অনেক আয়াত রয়েছে, যেগুলো নারী-পুরুষের সমন্বিত মানবতার মধ্যকার উদ্ভূত বৈষম্যকে তিরোহিত করে ইসলামের ফয়সালা বর্ণনা করেছে। ইসলামের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে, বর্বর যুগের নীতিমালা ও পূর্ববর্তী জাতিগুলোর কৃষ্টিকে অস্বীকার করে—যেগুলোতে নারীদেরকে নিচু করে উপস্থাপন করা হয়েছে-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর অধিকার রক্ষার জন্য দাঁড়িয়েছেন এবং নারীর জন্য এমন নির্ঝঞ্ঝাট অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যেখানে অতীতের দর্শনগুলো পৌঁছুতে পারেনি; এমনকি ভবিষ্যতেও কোনো জাতি সে পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে না। ইসলাম নারীর জন্য মা, বোন, বিবি এবং কন্যার মতো আদর, স্নেহ ও ভালোবাসাময় অধিকার নির্ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত চৌদ্দ শতাব্দী যাবৎ পশ্চিমা নারীরা তাদের অধিকার আদায় করার জন্য আন্দোলন করেই যাচ্ছে; কিন্তু হায়, এখনো তা সম্ভব হয়নি!
মৌলিকভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বপূর্ণ নীতির জন্য উঁচু স্তরের মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন। সেটা হলো-মর্যাদা ও অবস্থানগতভাবে নারীরা পুরুষের সমান। কেবল নারী হওয়ার কারণে তাদের মর্যাদা ও অবস্থান কখনো নিচু হবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ النِّسَاءَ شَقَائِقُ الرِّجَالِ
নিশ্চয় নারীরা পুরুষের অংশ-বোন।[140]
অর্থাৎ নারীরা পুরুষের সাথে পূর্ণরূপে সাদৃশ্যপূর্ণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রমাণিত-তিনি সর্বদা নারীদের জন্য অসিয়ত করতেন এবং সাহাবা কিরামকে বলতেন-
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا
নারীদের জন্য কল্যাণের অসিয়ত গ্রহণ করো।[১৪১]
বিদায় হজের ভাষণের প্রাক্কালে লক্ষ লক্ষ উম্মতের সামনে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নসিহতগুলো বারংবার উল্লেখ করেছেন।
আমরা যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-প্রদত্ত নারীর উচ্চতা ও মর্যাদা- বিষয়ক প্রবর্তিত বিষয়গুলো বর্ণনা করতে চাই, তখন আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-নারীদের প্রাচীন ও আধুনিক বর্বরতার পাল্লায় রাখা, যেন আমরা প্রকৃত অন্ধকারের স্বরূপ এবং এর চলমান অবস্থা অবলোকন করতে পারি; যাতে করে আমাদের সামনে ইসলামের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার ছায়ায় নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়।
জাহালাতের যুগে আরবের প্রথা ছিল-কন্যা-সন্তানকে জীবিত প্রোথিত করা। পক্ষান্তরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজকে মহা অপরাধ ও হারাম ঘোষণা করেছেন; জাহেলি যুগের বর্বর মানুষরূপী পশুগুলো কন্যা-সন্তানকে জীবিত প্রোথিত করা ও এ নির্মম অপরাধকে তুচ্ছ মনে করার ব্যাপারে যে কুরআন কারিমের তিরস্কার ঘোষিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর ভিত্তি করেই একে মহা অপরাধ ও হারাম সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَإِذَا الْمَوْءُ ودَةُ سُئِلَتْ، بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ
(স্মরণ করো সে-সময়কে) যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যা-সন্তানকে জিজ্ঞেস করা হবে-তাকে কোন অপরাধে হত্যা করা হয়েছে? [সুরা তাকবির, আয়াত: ৮-৯]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অপরাধকে অন্যতম বড় অপরাধ বলে গণ্য করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ قَالَ أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ قُلْتُ إِنَّ ذَلِكَ لَعَظِيمُ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ وَأَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ تَخَافُ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ أَنْ تُزَانِيَ حَلِيلَةَ جَارِكَ .
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম-আল্লাহর কাছে কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়? নবিজি বললেন—আল্লাহর সাথে শরিক করা, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম-অবশ্যই এটা বড় গুনাহ। তারপর কোন গুনাহটি বড়? নবিজি বললেন-তোমার সাথে আহার করবে-এই ভয়ে নিজ সন্তানকে হত্যা করা। আমি আবার জানতে চাইলাম-তারপর কোন গুনাহটি সবচেয়ে বড়? নবিজি বললেন—প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা। [১৪২]
নারীর অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিশু-কন্যাদের প্রতি অনুগ্রহের প্রতিও উৎসাহিত করেছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَنْ يَلِي مِنْ هَذِهِ الْبَنَاتِ شَيْئًا فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ
যে ব্যক্তি কন্যা-শিশুর (লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা ও বিয়ের) ঝামেলায় পতিত হয় এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করে, এই কন্যা শিশুরাই তার ও জাহান্নামের মাঝে অন্তরায় হবে।[১৪৩]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা-শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারে নির্দেশ প্রদানপূর্বক ইরশাদ করেছেন—
أَيُّمَا رَجُلٍ كَانَتْ عِنْدَهُ وَلِيدَةً فَعَلَّمَهَا فَأَحْسَنَ تَعْلِيمَهَا وَأَدَّبَهَا فَأَحْسَنَ تَأْدِيبَهَا ثُمَّ أَعْتَقَهَا وَتَزَوَّجَهَا فَلَهُ أَجْرَانِ .
যার একটি কন্যা-সন্তান আছে আর সে ব্যক্তি কন্যাটির সুন্দর শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করল, অতঃপর তাকে স্বাধীন করল ও বিয়ের ব্যবস্থা করল, সে দ্বিগুন নেকি পাবে।[১৪৪]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের প্রতি ওয়াজ-নসিহত করার জন্য একটি দিন বরাদ্দ রেখেছিলেন—সেখানে তাদের আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের প্রতি তিনি নির্দেশ প্রদান করতেন।
যখন কন্যা যৌবনে পদার্পণ করে, পরিণত যুবতী হয়ে যায়, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ ও বর্জন করার অধিকার প্রদান করেন। তার ইচ্ছার বাইরে কোনো পুরুষের সাথে বিয়ের ব্যাপারে তাকে জবরদস্তি করাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জায়েজ বলেননি। এ ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا وَالْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ فِي نَفْسِهَا وَإِذْنُهَا صُمَاتُهَا
প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজের বিয়ের ব্যাপারে নিজ অভিভাবকের চেয়ে বেশি হকদার। কুমারী নারীর কাছ থেকে তার নিজের ব্যাপারে অনুমতি গ্রহণ করা হবে, আর চুপ থাকা তার স্বীকৃতি বলে স্বীকৃত।[১৪৫]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেছেন-
لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
প্রাপ্তবয়স্কা নারীর নির্দেশ ছাড়া এবং কুমারী নারীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।
সাহাবা কিরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, কুমারীর অনুমতি কী? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
أَنْ تَسْكُتَ
চুপ থাকা।[১৪৬]
আর যখন সে কন্যা কারও স্ত্রীরূপে সংসারে প্রবেশ করবে, তার সাথে সদাচরণ ও সুসম্পর্ক গড়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অনুপ্রেরণা রয়েছে। তিনি এ কথা পরিষ্কারভাবে বলতেন-স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করা পুরুষের ব্যক্তিগত আভিজাত্য ও স্বভাবগত সভ্যতার প্রমাণ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করে বলেছেন-
إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا سَقَى امْرَأَتَهُ مِنْ الْمَاءِ أُجِرَ
পুরুষ যখন স্ত্রীকে পানি পান করায়, তাকে প্রতিদান প্রদান করা হয়।[১৪৭]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أُحَرِّجُ حَقَّ الضَّعِيفَيْنِ الْيَتِيمِ وَالْمَرْأَةِ
হে আল্লাহ, আমি দুজন দুর্বলের অধিকারের ব্যাপারে কষ্ট করি-এতিম এবং নারী।[১৪৮]
স্ত্রী যখন স্বামীকে অপছন্দ করতে আরম্ভ করে, তার সাথে সংসার করাকে সহ্য করতে পারে না, তার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ-বিচ্ছেদের বিধান রেখেছেন। এর পদ্ধতি হবে-খোলা।[১৪৯]
হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- সাবিত ইবনু কাইসের স্ত্রী নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বললেন-হে আল্লাহর রাসুল, আমি সাবিতের ধর্ম ও চরিত্র কোনোটির ওপরই বীতশ্রদ্ধ নই; তবে তার সাথে সংসার করলে আমি কুফরির ভয় করছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
فَتَرُدِّينَ عَلَيْهِ حَدِيقَتَهُ
তুমি কি তার বাগানটা (মোহর হিসেবে প্রাপ্ত) তাকে ফিরিয়ে দেবে? সে বলল-হ্যাঁ। সে স্বামীকে তার বাগানটা ফিরিয়ে দিলো। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়ে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ করে দিলেন। [১৫০]
যেহেতু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর জন্য পুরুষের মতো স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক অধিকার প্রমাণ করেছেন, সুতরাং তাদের জন্য ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া দেওয়া- নেওয়া, উকিল নিয়োগ করা এবং উপহার-উপঢৌকন দেওয়াসহ সবকিছুর অধিকার সাব্যস্ত রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো নারী বুদ্ধিমতী ও বোধসম্পন্ন থাকবে, তার এসব অধিকারে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
فَإِنْ أَنَسْتُمْ مِّنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوْا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
অতঃপর যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনার উন্মেষ আঁচ করতে পার, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পণ করো। [সুরা নিসা, আয়াত : ৬]
হজরত উম্মে হানি বিনতে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন দুজন মুশরিককে আশ্রয় দিলেন, তার ভাই হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে হত্যা করতে চাইলেন। এই ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালা ছিল এমন-
قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أُمَّ هَانِي
হে উম্মে হানি, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমরাও তাকে আশ্রয় দিয়েছি। [১৫১]
এ ফয়সালার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যুদ্ধকালীন ও স্বাভাবিক সময়ে অমুসলিমদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার ও প্রতিবেশী বানানোর অধিকার প্রদান করেছেন।
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার ছায়ায় মুসলিম নারী সম্মানজনক, আভিজাত্যপূর্ণ, অভিভাবকসুলভ জীবনযাপন করত।

টিকাঃ
[১৪০] সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ১১৩; সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ২৩৬; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ২৬২৩৮。
[১৪১] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৩৩৩১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৮。
[১৪২] সহিহুল বুখারি, হাদিস : ২০০১; সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ৩১৮২; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ৪১৩১。
[১৪৩] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৯。
[১৪৪] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৪৭৯৫。
[১৪৫] সহিহু মুসলিম, হাদিস: ১৪২১。
[১৪৬] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৫১৩৬。
[১৪৭] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৭১৯৫。
[১৪৮] সুনানু ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩৬৭৮; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ৯৬৬৪。
[১৪৯] অর্থাৎ স্ত্রী কোনোভাবে স্বামীকে রাজি করিয়ে তার কাছ থেকে তালাক নিয়ে নেবে। -অনুবাদক
[১৫০] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৫২৭৬。
[১৫১] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৩১৭০; সহিহু মুসলিম, হাদিস: ২৩৬।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 বৈজ্ঞানিক মুজিযা

📄 বৈজ্ঞানিক মুজিযা


কুরআন কারিম আরেক প্রকার মুজিযা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে; সেটি হলো-বৈজ্ঞানিক মুজিযা। এই মুজিযাটির ব্যাপারে প্রাচীন মুসলিম আলেমগণ আলোচনা করেননি। তাদের কাছে কুরআন কারিমের গুরুত্বপূর্ণ মুজিয়ার দিকগুলো ছিল-কুরআনের বালাগাত- অলংকার, নজম-শব্দের বুনন, কুরআনের ইতিহাস, কুরআনের ভাষা ইত্যাদি; তারা কুরআন কারিমের ইলমি-বৈজ্ঞানিক মুজিযা নিয়ে আলোচনার পথে হাঁটেননি। এই শিরোনামে আমার আলোচনার উদ্দেশ্য হলো-কুরআন কারিমের এমন অনুকরণময় বৈজ্ঞানিক মূলনীতিগুলোর নানা রঙ আলোচনা করা, যেগুলোর বিদ্যমানতা ও উদঘাটনে অনেক ওলামা কিরাম বিস্মিত হয়েছেন।
কুরআন কারিম এমন অনেক বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতসমৃদ্ধ গ্রন্থ, যে ইঙ্গিতসমূহ হিদায়াতপ্রাপ্তির উপলক্ষ্য হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা, কুরআন শুধুই বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ নয়।
বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতের উপমা হলো—কুরআন কারিম উদ্ভিদের কলম করা নিয়ে আলোচনা করেছে। তবে সেখানে কলম করার আলোচনা হয়েছে এক উদ্ভিদ থেকে অন্য উদ্ভিদে স্থানান্তর করার মাধ্যমে; এর মাধ্যমগুলোর একটি হলো বাতাস। কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَ أَرْسَلْنَا الرِّيحَ لَوَاقِحَ
আমি বৃষ্টি-গর্ভ বায়ু প্রেরণ করি। [সুরা হিজর, আয়াত : ২২]
কুরআন কারিমে উল্লিখিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক উদাহরণ হলো-মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ তত্ত্ব; এর বিশুদ্ধতা বর্তমান বিজ্ঞান পরীক্ষামূলক প্রমাণ দিয়ে সাব্যস্ত করেছে। চৌদ্দশ বছর পূর্বে কুরআন মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের তত্ত্ব দিয়েছে, অথচ তখন জ্যোতির্বিদ্যা মাত্র তার প্রাথমিক স্তর পাড়ি দিচ্ছিল। কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوْسِعُوْنَ
আর আমি আসমান নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি নিশ্চয়ই মহাসম্প্রসারণকারী। [সুরা যারিয়াত, আয়াত : ৪৭]
আয়াতে ' السَّمَاءُ ' শব্দটি কুরআন কারিমের বিভিন্ন জায়গায় 'মহাবিশ্ব' ও 'মহাকাশ' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনের এই আয়াত মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের তত্ত্ব উন্মোচন করেছে- যে তত্ত্বের সন্ধান বিজ্ঞান পেয়েছে আমাদের যুগে এসে; এমনকি বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন পর্যন্ত একটিই বৈজ্ঞানিক দর্শন প্রচলিত ছিল; সেটি হলো—মহাবিশ্বের প্রকৃতি হলো স্থির, তা অনন্তকাল থেকে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আলোচনা-পর্যালোচনা, গবেষণা ও হিসাব-নিকাশ করে বোঝা গেছে, এই মহাবিশ্বের একটি শুরু আছে এবং তা সুশৃঙ্খলভাবে প্রলম্বিত হচ্ছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বেলজিয়ামের পদার্থ ও জ্যোতির্বিদ জর্জ লুমিটার দর্শনের ভিত্তিতে প্রমাণ করেছেন-মহাবিশ্ব সর্বদা সঞ্চালিত হয়, প্রলম্বিত হয়। এই বাস্তবতাকে সমর্থন করেছেন মার্কিন জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল; মৃত্যু ১৯৫৩ ইং।[১৫২] তিনি প্রমাণ করেছেন-তারকারাজি ও গ্যালাক্সি বা ছায়াপথসমূহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সর্বদা সঞ্চালিত হতে থাকে। সঞ্চালিত হওয়ার এই পদ্ধতিটি সর্বদা প্রলম্বনশীল একটি রূপ। [১৫৩]
কুরআন কারিমের মুজিযামূলক কয়েকটি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে—
وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٌّ لَّهَا هُ ذُلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ هُ
সূর্য নিজ নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ। [সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৩৮]
নির্ধারিত কক্ষপথে চলতে থাকা একটি বিশাল মুজিযা। এটা সূর্যের বাহ্যিক চলা বোঝায় না, যেমনটা মানুষ উদয়কালে দেখতে পারে; বরং এটা প্রকৃত নড়াচড়াই বোঝায়; আবহাওয়াবিদরা বিষয়টি প্রমাণ করেছে। সৌর ইনসাইক্লোপিডিয়া বলছে-সূর্য তার কক্ষপথের চারদিকে প্রত্যেক পঁচিশ দিনে একবার ঘোরে। [১৫৪]
তেমনিভাবে গতি নির্ধারিত রয়েছে পৃথিবীর ছায়াপথের—যার অধীন সূর্যও আছে। আমাদের ছায়াপথ মহাশূন্যের অন্যান্য ছায়াপথ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৯৮০ কিলোমিটার দূরে সরে যায়।[১৫৫]
আরেকটি মুজিযা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيْنِ بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِينِ
তিনি পাশাপাশি দুটি সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরাল, যা তারা অতিক্রম করে না। [সুরা আর-রহমান, আয়াত : ১৯- ২০]
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে—ভূমধ্য সাগর যখন জিব্রালটার পাহাড়ের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে মিলিত হয়, তখন উভয়ের মাঝে একটি অন্তরায় থাকে। দুটি সাগরের পানির রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে জানা গেছে—ভূমধ্যসাগরের লবণাক্ততা ও উষ্ণতা আটলান্টিকের চেয়ে বেশি; উভয়টিতে অবস্থিত প্রাণীদের মধ্যেও বেশকম আছে।[১৫৬]
স্যার জন এমেরি মিশর বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশনের সাথে মিলে আকাবা উপসাগরের পানি সম্পর্কে কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন; যাতে প্রমাণিত হয়েছিল, রাসায়নিক এবং স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য ও গঠনগত দিক থেকে এটি লোহিত সাগরের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। [১৫৭]
মুজিযাপূর্ণ আরও আয়াত হলো—
وَ الْجِبَالَ أَوْتَادًا
এবং (আমি কি) পর্বতমালাকে পেরেক (বানাইনি)? [সুরা নাবা, আয়াত : ৭]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ
আর তিনি পৃথিবীর ওপর বোঝা রেখেছেন, যেন কখনো তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে-দুলে না পড়ে। [সুরা নাহল, আয়াত: ১৫]
আধুনিক যুগের ভূতাত্ত্বিকগণ গবেষণা করে জানতে পেরেছেন, পাহাড়ের নিচে এক প্রকারের সম্প্রসারিত শিকড় রয়েছে-যা এমন আঠালো স্তরে প্রোথিত, যেটির ওপর রয়েছে শিলার স্তর। আল্লাহ তাআলা এই সম্প্রসারিত শিকড় বানিয়েছেন মহাদেশগুলোকে ধারণ করে রাখার জন্য, যেন পৃথিবী ঘূর্ণনকালে সেগুলো নড়াচড়া না করে। এ বাস্তবতা সম্পর্কে গবেষকগণ নিশ্চিত হয়েছে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এসে।[১৫৮]
গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে, প্রত্যেক মহাদেশের ভিন্ন ভিন্ন পাহাড় রয়েছে, যেগুলো মহাদেশগুলোকে ধারণ করে রেখেছে। ভূখণ্ডের যে অংশে পাহাড় অবস্থিত, যেসব প্রস্তরের সমন্বয়ে তা গঠিত এবং তার আশপাশে অবস্থিত জমিনের প্রকৃতি প্রত্যেকটির সাথে পাহাড়ের উচ্চতার সাযুজ্য থাকে। ভূতাত্ত্বিকগণ গবেষণা করে পেয়েছেন, ভূখণ্ডে পাহাড় এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন এর দ্বারা জমিনকে হেলে-দুলে পড়া থেকে হেফাজত করা যায়।[১৫৯] কুরআন কারিম আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বেই এই সত্য বর্ণনা করেছে। আল্লাহ তাআলা এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই বলেছেন।
আল্লাহ তাআলার এই কথাটি নিয়ে একটু ভাবি। তিনি ইরশাদ করেছেন—
وَ الْبَحْرِ الْمَسْجُوْرِ
এবং (শপথ) উত্তাল সমুদ্রের। [সুরা তুর, আয়াত : ৬]
আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলার কসম বিবৃত হয়েছে। তিনি সমুদ্রকে বলেছেন—'তা উত্তাল'। কসম ব্যবহার করা হয় গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। অথচ আল্লাহর কালামে গুরুত্ব বোঝানোর কোনো প্রয়োজন নেই, তা এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَ مَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا
আল্লাহর চেয়ে বড় সত্যবাদী আর কে হতে পারে? [সুরা নিসা, আয়াত : ২২]
তারপরও কেন আল্লাহ তাআলা কসম খেয়েছেন? গাফিলদেরকে সতর্ক করার জন্য, অনুগতদেরকে পথ দেখানোর জন্য, কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
সমুদ্র উত্তাল হওয়ার মর্ম হলো-আগুন প্রজ্বলিত হওয়া উত্তপ্ত হওয়া। আল্লাহ তাআলার কসম খাওয়ার কারণ হলো-পরিষ্কারভাবে এ কথা প্রমাণ করা, সমুদ্রগুলোকে আগুন দ্বারা উত্তপ্ত করা হয়। এখানে উত্তাল সমুদ্র দ্বারা দুনিয়ার সমুদ্র উদ্দেশ্য, পরকালের সমুদ্র নয়। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ছিল বিজ্ঞানের যুগে কুরআনের এই হাকিকতকে উন্মুক্ত করা। সমুদ্রজ্ঞানীরাও যেন অনুধাবন করতে পারেন, ভূগর্ভে উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি মজুদ রয়েছে।[১৫৮]
ডক্টর জামালুদ্দিন আল-ফিন্দি তদীয় গ্রন্থ তাবিয়াতুল বাহরি ওয়া জাওয়াহিরুহু-তে বলেছেন—গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সমুদ্রের তলদেশে আবরণের মাঝে কিছু ফাঁকা ও গভীর গর্ত রয়েছে। এর কারণ হলো, সমস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যে আবরণের মাঝে বিভিন্ন সংকোচন ঘটলে তাতে কিছু ফাটল সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ফাটল সৃষ্টি হয় তাপমাত্রার ব্যবধানের ফলে তাপজনিত সম্প্রসারণ ও ঠান্ডাজনিত সংকোচনের প্রতিক্রিয়ায়। এ ধরনের দুর্বল সম্প্রসারিত স্থানগুলোর দৈর্ঘ্য অনুসারে জমিনের তলদেশের আবরণের ভেতর থেকে গলিত আগ্নেয়গিরির লাভা ছুটে আসে। এরপর প্রবলবেগে তা সমুদ্রের ওপর আছড়ে পড়ে; কিন্তু তা সমুদ্রের পানির ভারত্বের কারণে বাধার সম্মুখীন হয়; এমনকি সমুদ্রের নিজস্ব আগ্নেয়গিরি এর লাভাকে ওপরের দিকে ছুঁড়ে মারে। ক্রমাগত গলিত লাভার আঘাতের কারণে ওপরের দিকে শঙ্কুসদৃশ একটি মুখ তৈরি হয়। এই মুখ দিয়ে আসা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের কারণে অনেক দ্বীপপুঞ্জ বিস্ফোরণ ঘটে অদৃশ্য হয়ে যায়। যেমন: ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব হিন্দুস্থানের দ্বীপপুঞ্জের মাঝ থেকে কারাকাতো দ্বীপের বিস্ফোরণ ঘটে। ক্রমাগত দুই দিন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলে ভূখণ্ডের ১৪০০ ফিট ওপরে থাকা দ্বীপটি সমুদ্রে তলিয়ে যায়। কেবল এর মৌলিক চূড়ার একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া কিছুই টিকে ছিল না।[১৬০]
জর্জ গামো তদীয় গ্রন্থ কাওকাবুন ইসমুহুল আরদ-এ একটি পরিচ্ছেদ এনেছেন, যার শিরোনাম হলো—'জাহান্নাম আমাদের পায়ের নিচে'। তিনি সেখানে কথা বলেছেন সমুদ্রের তলদেশের উত্তপ্ততা নিয়ে, আগুন নিয়ে এবং আগ্নেয়গিরির তরঙ্গ নিয়ে। আলোচনার প্রারম্ভেই বলেছেন—গভীরতার সাথে সাথে তাপমাত্রার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। উত্তাল আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে বিচ্ছুরিত কালো ধোঁয়ার উত্তোলন, এর আশপাশে ছড়িয়ে-পড়া অস্থির উদ্দীপ্ত লাভা, উত্তপ্ত পানির ঝরনা—এসবই এ বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করছে, জ্বলন্ত আগুনের এমন অস্তিত্বের প্রমাণের প্রতি, যেগুলো দূরে নয়— বরং আমাদের সন্নিকটে, যা তৈরি করা হয়েছে অপরাধীদের জন্য।[১৬১]
এখানে নিশ্চিতভাবে মুজিযার বিষয়টি পরিষ্কার। আল্লাহ তাআলার কিতাব সাব্যস্ত করেছে, সমুদ্রের তলদেশ আগুন দ্বারা উত্তপ্ত। ইতিপূর্বে এমনকি কুরআন অবতীর্ণকালেও বিশাল এই হাকিকত সম্পর্কে জানা যায়নি। বিংশ শতাব্দীতে এসে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা ‘وَ البَحْرِ المَسْجُجور -'এবং (শপথ) উত্তাল সমুদ্রের।' [সুরা তুর, আয়াত : ৬]-আয়াতটি পড়ে বিস্মিত হয়ে বলছে-কে সেই সত্তা, যিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়েছেন, সমুদ্রের তলদেশ উত্তপ্ত-সেখানে এমন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটে, যা অগ্নিলাভা ছুড়ে মারে! [১৬২]
***
আমরা যখন আল্লাহ তাআলার এই বাণীটি-
وَ السَّمَاءَ بَنَيْنَهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوْسِعُوْنَ
আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমি অবশ্যই ব্যাপক ক্ষমতাশালী। [সুরা জারিয়াত, আয়াত : ৪৭]-
নিয়ে ভাবি, তখন বুঝতে পারি-কুরআন কারিমের যে আয়াতটি আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে, সেটি মহাবিশ্বের ক্রমাগত বিস্তৃতি নিয়ে কথা বলে (অর্থাৎ কুরআন কারিম বলে—পৃথিবী ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে।), জানিয়ে দিচ্ছে, তা স্থির নয়। যে হাকিকত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অবহিত করেছেন অনেক আগে; সে হাকিকত বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের প্রারম্ভে এসে জ্যোতির্বিদ ও মহাকাশবিজ্ঞানীরা উদ্‌ঘাটন করেছেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা মহাবিশ্বের স্থিতি ও অপরিবর্তনের পক্ষে স্লোগান দিত; উদ্দেশ্য ছিল-নতুন সৃষ্টি এবং স্রষ্টাকে অস্বীকার করা। কিন্তু আমাদের ছায়াপথের বাইরের ছায়াপথগুলো নিয়ে ডপলারের গবেষণার মাধ্যমে এর উল্টো প্রমাণিত হয়েছে।
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের বিখ্যাত গবেষক (C.doppler) সি. ডপলার দ্রুতগামী রেলগাড়ির অতিক্রমকালে এর হুইসিলের সাধারণ ভাব লক্ষ করেছেন। রেলগাড়ি-পর্যবেক্ষক এমন একটি আওয়াজ শুনতে পাবে, যা ক্রমাগত ও স্থির ধরনের। কিন্তু রেলগাড়িটি পর্যবেক্ষকের যতই কাছাকাছি হয়, আওয়াজের কম্পাঙ্ক বাড়তে থাকে। আবার যতটা দূরে চলে যায়, আওয়াজের কম্পাঙ্ক কমতে থাকে। বিষয়টি নিয়ে ডপলার গবেষণা করেছেন এবং এর একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন-রেলগাড়ির হুইসিল বাতাসের মধ্যে ক্রমাগত কিছু শব্দতরঙ্গ ছোড়ে। যখন শব্দের উৎস পর্যবেক্ষকের কাছাকাছি হয়, শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমতে থাকে এবং কম্পাঙ্ক বাড়তে থাকে। এর উল্টো যখন শব্দের উৎস পর্যবেক্ষক থেকে দূরে যেতে থাকে, তখন শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রলম্বিত হতে থাকে-এমনকি প্রলম্বিত হতে হতে সেটা পর্যবেক্ষকের কান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে, তখন শব্দের কম্পাঙ্ক কমে আসে।[১৬৩]
এমনিভাবে ডপলার ভেবে দেখেছেন, এই বিষয়টি রশ্মি-তরঙ্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পূর্ণ গতিশীল উৎস থেকে বিচ্ছুরিত আলো যখন পর্যবেক্ষকের চোখে পৌঁছে, সেই আলোর তরঙ্গে পরিবর্তন সূচিত হয়। আলোর উৎসস্থলটি যখন পর্যবেক্ষকের কাছে নড়াচড়া করে, তখন আলোর তরঙ্গ সংকুচিত হয়-অনুধাবিত আলো উঁচু কম্পাঙ্কের দিকে (নীল বর্ণের দিকে) সরে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় 'জাহজাহাতুজ-জারকা' তথা 'ব্লু শিফট বা নীল অপসারণ'। উৎসটি যখন পর্যবেক্ষকের কাছ থেকে দূরে নড়াচড়া করে, তখন রশ্মি-তরঙ্গ প্রলম্বিত হয়, অনুভবের রশ্মিটি নিচু কম্পাঙ্কের দিকে (লাল বর্ণের দিকে) সরে যায়-এই রূপটিকে রেড শিফট বা লাল অপসারণ বলা হয়। [১৬৪] জ্যোতির্বিদগণ যখন আমাদের ছায়াপথ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত নক্ষত্রপঞ্জি থেকে উৎসারিত রশ্মি নিয়ে গবেষণার জন্য বর্ণালিবীক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার আরম্ভ করছিল, তখন এই বিষয়টির গুরুত্ব প্রতিভাত হয়।
১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ স্লিফার আমাদের ছায়াপথ থেকে দূরে অবস্থিত অন্যান্য ছায়াপথের নক্ষত্রপঞ্জি থেকে উৎসারিত আলো নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে ডপলারের থিওরি প্রয়োগ করেন। তার কাছে প্রমাণিত হয়, অধিকাংশ ছায়াপথ নিজ নিজ কক্ষপথে বহাল থেকে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—পরস্পর থেকে খুব দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। জ্যোতির্বিদগণ এগুলো নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করেছেন। (আলোচনা চলছিল-মহাবিশ্ব ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে।)
এবার প্রশ্ন জাগছে, এই গবেষণার (ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং সেগুলোও পরস্পর থেকে খুব দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে) মাধ্যমে কি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের দিকে ইঙ্গিত করা সম্ভব হবে? ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের গবেষণায় জ্যোতির্বিদ স্লিফার এমন চল্লিশটি ছায়াপথ প্রমাণ করতে সফল হয়েছেন, যেগুলো এর কক্ষপথে বহাল থেকে খুব দ্রুত নড়াচড়া করে আমাদের থেকে ও তাদের পরস্পর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রখ্যাত আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল এ বিষয়ে সূক্ষ্ম একটি ফলাফলে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছেন; যার সারকথা হলো-ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে খুব দ্রুত দূরে সরে গেলেও তা ঘটছে পূর্ণ সংগতভাবে। পরবর্তী সময়ে এই গবেষণাটি 'ল হাবল বা ‘হাবলের সূত্র’ নামে খ্যাতি লাভ করে। এই সূত্রভিত্তিক গবেষণা করেই হাবল আরও অনেক ছায়াপথ আবিষ্কার এবং সেগুলো পরস্পর থেকে দূরে যাওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করতে সফল হয়েছেন। গবেষণায় তার সহযোগী ছিলেন মিল্টন হামসন। তিনি হাবলের সাথে মিলে ক্যালিফোর্নিয়ায় উইলসন পাহাড়ে কাজ করেছেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি আলোচনায় তারা এই গবেষণাটি প্রকাশ করেছেন।
ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে এবং সেগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়াটা পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত করছে, মহাবিশ্ব আক্ষরিক অর্থেই বিস্তৃতি লাভ করছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মাঝে হইচই সৃষ্টি করেছে। তারা এই সূত্রের সমর্থক ও উপেক্ষক দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়েছেন। তবে, বিভিন্ন গাণিতিক সমীকরণ ও মহাশূন্যে জ্যোতির্বিদবিদদের কর্তৃক বিভিন্ন গবেষণা চালানোর মাধ্যমে এ কথাই অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে—মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। [১৬৫]
সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রপঞ্জির রশ্মি নিয়ে গবেষণা করার জন্য বিভিন্ন শক্তিশালী বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করছে। [১৬৬]
তারা সুদীর্ঘ গবেষণার পর বুঝতে পেরেছেন, বর্ণালি রেখাসমূহ সর্বদা লালিমার দিকেই ধাবিত হয়। আর রশ্মির উৎস যখন জমিনে বিদ্যমান পর্যবেক্ষক থেকে দূরে সরে যায়, তখন আমরা বুঝতে পারি, রশ্মির কম্পাঙ্ক ক্ষীণ হয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছে, বর্ণালি রেখাসমূহ ঝুঁকে পড়া এ কথা প্রমাণ করে—প্রতিটি নক্ষত্র পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, মহাবিশ্ব সাধারণভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।
সে সত্তা কতই না মহান, যিনি আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে এই হাকিকত সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করেছেন।[১৬৭]
জ্ঞানজগতের আরেকটি মুজিযা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَ أَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيْهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ
আর আমি নাজিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচণ্ড রণশক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ উপকার। [সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৫]
কেউ কেউ মনে করেন, আয়াতে লৌহ অবতরণের বিষয়টি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; এর দ্বারা এ কথা বোঝানো হয়েছে, আল্লাহ তাআলা মানুষের উপকারার্থে লোহা সৃষ্টি করেছেন (আকাশ থেকে অবতীর্ণ করা বোঝানো হয়নি)। কিন্তু আমরা যদি শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নিয়ে ভাবি, তাহলে বুঝতে পারি—লোহাকে শারীরিকভাবেই আকাশ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে, এর দ্বারা কেবল সৃষ্টি করাকে বোঝানো হয়নি। এখান থেকে বুঝতে পারি—কুরআন কারিমের এই আয়াত বৈজ্ঞানিক একটি সূক্ষ্ম মুজিযার আধার। সাম্প্রতিক সময়ের ভৌগলিক আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের পৃথিবীতে বিদ্যমান লোহা পৃথিবীর বাইরের বিশাল নক্ষত্র থেকে এসেছে।
প্রকৃতির ভারী খনিগুলো বড় তারকা থেকেই সৃষ্টি হয়। আমাদের সৌরজগতে এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ উপাদান অনুপস্থিত, যার সাহায্যে তা লোহা তৈরি করতে পারে; তাই লোহা সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড় তারকারাজির মধ্যেই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব, যেখানে তাপমাত্রা কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। যখন কোনো তারকায় লোহার পরিমাণ নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছে যায়, তখন আর তারকার সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে না—পরিশেষে ছিটকে পড়ে এবং নোভা বা সুপারনোভায় (এমন তারকা, যার জ্যোতি হঠাৎ বৃদ্ধি পায়, আবার কয়েক মাস বা বছর থাকার পর লোপ পায়।) পরিণত হয়। এই ছিটকে পড়ার ফলে মহাকাশের বিভিন্ন দিগন্তে লোহার মতো উল্কা ছড়িয়ে যায়। এরপর সেগুলো শূন্যে স্থানান্তরিত হয়; সেখান থেকে বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের আকর্ষণশক্তি সেগুলোকে আকর্ষণ করে (এরপর সেখান থেকে জমিনে নিক্ষিপ্ত হয়।)। এই গবেষণায় প্রতীয়মান হয়, লোহা জমিন থেকে উত্থিত হয় না, বরং মহাশূন্যীয় তারকাসমূহের বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট উল্কার মাধ্যমে জমিনে নাজিল হয়। আলোচিত আয়াতটি এ কথাই প্রমাণ করে। কুরআন কারিম সপ্তম খ্রিষ্ট শতাব্দীতে এ বৈজ্ঞানিক তথ্য জানিয়েছিল, যখন বিজ্ঞানজগৎ এ ব্যাপারে ছিল তথ্যশূন্য।[১৬৮]
অন্য আয়াতে আরেকটি পরিষ্কার মুজিযার কথা উল্লেখ আছে। ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ أَمْشَاجِ
আমি মানুষকে মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছি। [সুরা দাহার, আয়াত : ২]
সমস্ত মুফাসসিরগণ একমত, মিশ্র শুক্রবিন্দু হলো—নারী ও পুরুষের বীর্যের মিশ্রণ। দুটি ভিন্ন শ্রেণির সংমিশ্রণ। কুরআন কারিম অবতীর্ণ হওয়ার দশ শতাব্দী পর অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কেউ জানত না, গর্ভস্থিত ভ্রূণটি এমন নিষিক্ত ও নিঃসৃত ডিম্বাণু থেকে তাদের জিন বহন করে—যা এমন এক বিন্দু তুচ্ছ পানির মতো, যা মাতা-পিতার বীর্যের সংমিশ্রণে তৈরি হয়—যাকে আমরা বর্তমানে ক্রোমোজম বলে ব্যক্ত করি।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন-
يُأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْتُكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى
হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। [সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩]
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন, তিনি মানুষকে পুরুষ ও নারী থেকে সৃষ্টি করেছেন। পূর্ববর্তী অনেক মুফাসসির বলেছেন, ভ্রূণ কেবল পুরুষের বীর্য থেকে তৈরি; সেটি মায়ের গর্ভে প্রতিপালিত হয়, সেখানে অবস্থিত রক্ত থেকে তার আহার্যের জোগান হয়। কিন্তু এই আয়াতের আলোকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হয়, পুরুষ ও নারী উভয়ের বীর্যের মিশ্রণে ভ্রূণ তৈরি হয়। এটা কুরআন কারিমে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত, সুতরাং এখানে ব্যাখ্যার কোনো অবকাশ নেই। [১৬৯]
মানুষের সৃষ্টির স্তরগুলো আরম্ভ হয় পিতার নিকট শুক্রাণু গঠনের মাধ্যমে। মায়ের সমস্ত ডিম্বাণু মৌলিকভাবেই তৈরি থাকে, যা কিনা ভ্রূণের মূল। প্রবাহিত শুক্রাণু বীর্যবিন্দুর সাদৃশ্য লাভ করে। এটাকেই কুরআন কারিম স্পষ্টভাবে বলেছে। ইরশাদ হয়েছে-
وَ بَدَا خَلْقَ الْإِنْسَانِ مِنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِنْ سُلُلَةٍ مِّنْ مَّاءٍ مهين
যিনি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানবসৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে। [সুরা সাজদাহ, আয়াত : ৭-৮]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
أَلَمْ نَخْلُقْكُمْ مِّنْ مَّاءٍ مَّهِينٍ
আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করিনি? [সুরা মুরসালাত, আয়াত : ২০]
তবে নিষিক্তকরণের কাজ সম্পাদনের জন্য একটি শুক্রাণু প্রয়োজন, যা পানির ফোঁটাসদৃশ বীর্য থেকে তৈরি হয়। কুরআন কারিম কয়েকটি আয়াতের সমষ্টিতে বিষয়টি এভাবে বলেছেন-
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِّنْ مَّنِي يُمْنَى
মানুষ কি মনে করে, তাকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে? সে কি স্খলিত বীর্য ছিল না? [সুরা কিয়ামাহ, আয়াত : ৩৬-৩৭]
আরও ইরশাদ হয়েছে—
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ
মানুষকে বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। [সুরা নাহল, আয়াত : ৪]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
أَوَلَمْ يَرَ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ نُطْفَةٍ
মানুষ কি ভেবে দেখে না, আমি তাকে বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছি? [সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৭৭]
আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো-কুরআন কারিম পানিসদৃশ বীর্যের উপাদানের পরিচয় দিতে গিয়ে 'প্রবলবেগে স্খলিত পানি' বলার জন্য কর্তাবাচক শব্দ 'دافق' ব্যবহার করেছে। কর্মবাচক শব্দ 'مدفوق' ব্যবহার করেনি। অথচ তখনো অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে বীর্যের এই পরিচয় কেউ প্রদান করেনি। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ - خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ
অতএব, মানুষের দেখা উচিত কী বস্তু থেকে সে সৃজিত হয়েছে; সে সৃজিত হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে। [সুরা তারিক, আয়াত : ৬]
প্রাচীন অণুবীক্ষণের মাধ্যমে দেখা কঠিন হওয়ার কারণে ১৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ডালি ম্যাথিউস মানুষকে শুক্রাণু-জীবের মূল বলে আখ্যায়িত করেছেন—অর্থাৎ সতেরোশ খ্রিষ্টাব্দের মাত্র এক বছর পূর্বে। তিনি কোনোভাবেই পিতা-মাতা থেকে ভ্রূণ সৃষ্টির স্তরগুলো বোঝেননি। সপ্তম শতাব্দীতে এসে শুক্রাণু সৃষ্টির ব্যাপারে কুরআন কারিমের স্পষ্ট ঘোষণা আমরা বুঝতে পেরেছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا - وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا
তোমাদের কী হলো, তোমরা আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব আশা করছ না, অথচ তিনি তোমাদের বিভিন্ন রকমে সৃষ্টি করেছেন। [সুরা নুহ, আয়াত : ১৩-১৪]
ভ্রূণ সৃষ্টির প্রথম ধাপটি রেহেমে (জরায়ু) প্রবেশের পূর্বেই পূর্ণতা পায়। আপনি কুরআন কারিমের ভারসাম্যপূর্ণ বর্ণনা দেখলে বিমোহিত হয়ে যাবেন, ভ্রূণের সবগুলো পর্যায়কে আরবি শব্দ 'বুতুন-বাতনুনের বহুবচন'-এর দিকে সম্বোধিত করা হয়েছে; অর্থাৎ ভ্রূণ প্রাকৃতিকভাবে পেটের অনেকগুলো স্তরের মাঝে অবস্থান করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ
তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের পেটগুলোর মধ্যে এক সৃষ্টির পর আবার সৃষ্টি করে তিনটি আঁধারের মাঝে। [সুরা জুমার, আয়াত : ৬]
বর্তমানে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও প্রমাণিত, ভ্রূণ তিনটি পর্দার মাঝে আবৃত থাকে। কুরআন কারিম স্পষ্টভাবে ধাপগুলোর ভিন্নতার বর্ণনা দিয়েছে-যেগুলোতে ভ্রূণ সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় থাকে। সবগুলো সময়ের আবর্তন ভ্রূণের ওপর বর্তাতে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ (١٢) ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ (۱۳) ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ .
আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি; অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি; এরপর সে মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি; অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত্ত করেছি; অবশেষে একে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়! [সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১২-১৪ ]
ভ্রূণ রেহেমের প্রথম স্তরে জমাট রক্তের সদৃশ হয়। এই স্তরে প্রকৃতভাবে এর কোনো উপমা পাবেন না। এই স্তরে ভ্রূণটি লম্বাটে, কলবমুক্ত, নার্ভহীন থাকে-এর সাথে ঝুলন্ত শেষাংশ থেকে আহার্য গ্রহণ করে; এটা হলো-রেহেমে ভ্রূণের অবস্থানকালীন প্রথম স্তরের অবস্থা। এরপর শুরু হয় গঠনগত প্রাথমিক অঙ্গগুলোর গড়ন। ভ্রূণ এই স্তরে এসে বাঁকা হতে আরম্ভ করে; এর মাঝে সৃষ্টি হয় উঁচু-নিচু। শরীরের সেসব গঠন প্রকাশ পেতে শুরু করে, যা মেরুদণ্ডের হাড় তৈরি করে-ঠিক যেভাবে মাড়ি বা গোস্তের টুকরোর মাঝে দাঁতের আলামত প্রকাশ পায়। ভ্রূণটির আয়তন এ পরিমাণ হয় যে, তা চিবানো যায় এবং একটি অবস্থার জানান দেয়; তখন তাকে 'মুজগা বা গোস্তের টুকরো' শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। এই স্তরে এসে এই ব্যাখ্যাটিই এর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। (chewable mass-like embryo) প্রাথমিক অঙ্গ গড়নের এই স্তরটি সপ্তম সপ্তাহে গিয়ে অস্থي গড়নের সূচনা হয়। অষ্টম সপ্তাহে পেশীসমূহ দ্বারা অস্থিগুলো আবৃত করা হয়। এই স্তরটি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর সাথে মিলে যায়-
ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا .
এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি; অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি; এরপর সেই মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি; অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা ঢেকে দিয়েছি। [সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪]
কুরআন কারিমের পূর্বে ওহির সাথে সম্পৃক্ত অন্য কোনো গ্রন্থে এই ধরনের চ্যালেঞ্জিং বৈজ্ঞানিক কথা বলা হয়নি। অষ্টম সপ্তাহের বিদায়ের সাথে সাথে অঙ্গ গঠনের প্রথম স্তরটি (organogenesis) পূর্ণতা লাভ করে। ষষ্ঠ সপ্তাহের প্রাথমিক গঠন সৃষ্টির পর ভ্রূণ মানুষের আকার ধারণ করে। তখন জন্মগ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল বেড়ে ওঠা ও আকৃতির ভারসাম্য, মাথা ও শরীরের সাযুজ্যই বাকি থাকে। এই অবস্থাটা আল্লাহ তাআলার এই বাণীটির সাথে পূর্ণভাবে মিলে যায়-
ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
অবশেষে একে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়! [সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪]
মানুষের বিবেক-বুদ্ধি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে এ কথা মেনে নিতে বাধ্য, এ ধরনের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা কুরআন কারিম এত সূক্ষ্ম ও মনোজ্ঞ পদ্ধতিতে উপস্থাপন করতে পারা, এ কথার অকাট্য প্রমাণ বহন করে, এর উৎস কোনো মানুষ হতে পারে না। এসব তথ্য উপস্থাপনের জন্য মানুষের প্রয়োজন অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং যুগ হতে হবে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের যুগ-যাতে বিজ্ঞানের যেকোনো তথ্য-উপাত্তের ব্যাপরে সুনিশ্চিত হওয়ার ব্যবস্থা থাকে-যেমন শেষের তিন শতাব্দী। অথচ কুরআন অবতরণের যুগ না ছিল বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের যুগ, আর না সে যুগে কোনো অণুবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কার হয়েছিল। এজন্যই ইসলামের ব্যাপারে তিরস্কারকারীরা অহংকার, গোঁড়ামি, মূর্খতা আর কুরআন কারিমের ওহিলব্ধ দলিলাদির অপব্যাখ্যা ছাড়া জ্ঞানগত কোনো প্রমাণ পেশ করতে পারছে না। [১৭০]
আমরা যখন কুরআন কারিমের বিজ্ঞানসমৃদ্ধ আয়াতগুলো নিয়ে ভাবি, তখন বুঝতে পারি, তাতে ঝলমলে জাঁকজমকপূর্ণ মুজিযাসমৃদ্ধ ছায়া রয়েছে।
আমরা দুধভাইদের সাথে নারীর বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতে বৈজ্ঞানিক মুজিযা নিয়ে ভেবেছি। কুরআন কারিম দুধভাইকে আপন ভাইয়ের সাথে তুলনা করেছে। এই সূত্রেই আপন ভাইয়ের মতো দুধ ভাইয়ের সাথে বিবাহ হারাম করেছে। ইরশাদ হয়েছে-
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهُتُكُمْ وَ بَنْتُكُمْ وَ أَخَوْتُكُمْ وَ عَمْتُكُمْ وَ خُلْتُكُمْ وَبَنْتُ الْآخِ وَبَنْتُ الْأُخْتِ وَ أُمَّهُتُكُمُ الَّتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَ أَخَوْتُكُمْ مِّنَ الرَّضَاعَةِ .
তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকন্যা, ভগিনীকন্যা, তোমাদের সে মাতা-যারা তোমাদের স্তন্য পান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন। [সুরা নিসা, আয়াত: ২৩]
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দুগ্ধদাত্রী মায়ের দুধে শরীরের এমন কিছু অংশ থাকে, তিন থেকে পাঁচ ঢোক দুধ পান করার কারণেই দুগ্ধপানকারীর শরীরে অ্যান্টিবডি বা প্রতিরক্ষিকা হল তৈরিতে যে অংশটি অবদান রাখে। ... মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি গঠনে এই কয়েকটি ঢোক প্রত্যাশিত। এমনকি পরীক্ষাগারস্থ যে নবজাতকের রোগ-প্রতিরোধ-ব্যবস্থা পূর্ণরূপে গঠিত হয়নি, যখন তা দুগ্ধ পান করে, তখন তার শরীরেও দুগ্ধদাত্রীর কাছ থেকে রোগ-প্রতিরোধ-সংক্রান্ত কিছু কিছু জেনেটিক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়; ফলশ্রুতিতে দুগ্ধীয় মিরাসসূত্রে তার মাঝে দুধসম্পর্কীয় ভাই বা বোনের বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে-ভাই-বোনের মাঝে যদি বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, তাহলে রোগ প্রতিরোধক কণা-কণিকায় মিল থাকার কারণে নানা প্রকার রোগ সৃষ্টি হয়। [১৭১]
এখান থেকে আমাদের উদ্দিষ্ট বিষয়ে কুরআন কারিমের হিকমতের দিকটি খুঁজে পাই— দুগ্ধ সম্পর্কীয় ভাই-বোনের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়া কেন অনিবার্য! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ এ ব্যাপারে তৃপ্তিসহ পাঁচ ঢোক দুধ পানের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে; এ হলেই দুধ-সম্পর্কিত সূত্র তৈরি হয়ে যায়। [১৭২]
এই হলো কুরআন কারিমের মুজিযার কিছু দিক, যা প্রমাণ করে—আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরআন কারিম শব্দ ও অর্থসহ নাজিল করেছেন। আরও প্রমাণ করে—হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সমগ্র জগতের হিদায়াতের জন্য প্রেরিত হয়েছেন।
পশ্চিমা বিশ্বের নিষ্ঠাবান গবেষকগণ স্বীকার করেছেন, কুরআন কারিম চিরস্থায়ী মুজিযা। এদের মধ্যে এমিল ডারমেঙ্গেম অন্যতম। তিনি কুরআন কারিমের ব্যাপারে বলেছেন— প্রতিটি নবির জন্য তাঁর রিসালাতের পক্ষে দলিল প্রয়োজন, অপরিহার্য দরকার এমন কিছু মুজিযার, যার দ্বারা তিনি চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। কুরআন কারিম হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা।
কুরআন কারিমের বিস্ময়কর বর্ণনাপদ্ধতি ও হৃদয়গ্রাহী আলোচনাশক্তি আজ পর্যন্ত এ শক্তি রাখে, এর তিলাওয়াতকারীকে এ প্রশান্ত করবে—যদি সে ইবাদতকারী মুত্তাকিও না হয়। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোটা মানব ও দানবজগৎকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন—তারা যেন কুরআন কারিমের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করে দেখায় (না পারলে ছোট্ট একটি সুরা বা আয়াত তৈরি করে দেখায়; কেউ পারেনি। এই চ্যালেঞ্জটি ছিল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সত্যতার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল। [১৭৩]

টিকাঃ
[১৫২] edwin hubble (১৮৮৯-১৯৫৩)
[১৫৩] সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৩৮
[১৫৪] আল-মাউসুআতুল ফালাকিয়্যাহ, খলিল বাদাবি, পৃষ্ঠা: ২১。
[১৫৫] আশ-শামস, ইবরাহিম গোরি, খণ্ড: ১৮。
[১৫৬] আল-ইজাযুল কুরআনি ফি জাওয়িল ইকতিশাফিল ইলমিল হাদিস, মারওয়ান তাফতানজি, খণ্ড: ৩৮৪。
[১৫৭] লাফতাতুন ইলমিয়্যাতুন মিনাল কুরআন, ইয়াকুব ইউসুফ, পৃষ্ঠা: ৫৭。
[১৫৮] কিতাবুত তাওহিদ, আবদুল মজিদ জানদানি, পৃষ্ঠা: ৭২。
[১৫৯] আল-ইজাযুল কুরআনি ফি জুয়িল ইকতিশাফিল ইলমিল হাদিস, মারওয়ান তাফতানজি, পৃষ্ঠা: ৩৫২。
[১৬০] তাবিয়াতুল বাহরি ওয়া জাওয়াহিরুহ, মুহাম্মদ জামালুদ্দিন আল-ফিন্দি, পৃষ্ঠা: ২১০。
[১৬১] কাওকাবুন ইসমুহুল আরদ, জর্জ গামো, পৃষ্ঠা: ৭৪。
[১৬২] আল-ইজাযুল কুরআনি, মারওয়ান আত-তাফতানাজি, পৃষ্ঠা: ৩৯০-৩৯১。
[১৬৩] বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অবস্থাকে ডপলার ইফেক্ট (Doppler Effect) বলা হয়। নিরীক্ষক কর্তৃক সংযোজিত।
[১৬৪] আলো পরিমাপের এই সূত্রকে ফ্রনহফার লাইন (Fraunhofer Line) বলা হয়। নিরীক্ষক কর্তৃক সংযোজিত।
[১৬৫] আল-ইজাযুল কুরআনি, মারওয়ান আত-তাফতানাজি, পৃষ্ঠা: ১৮৯-১৯২。
[১৬৬] নাহনু ওয়াল কাওন, গোয়েল দোরুনি ও অন্যান্য, পৃষ্ঠা: ২৪১。
[১৬৭] কিসসাতু নুশুয়িল কাওন, মুখলিস রইস ও আলি মুসা, পৃষ্ঠা: ৪১。
[১৬৮] আল-মুজিযাতুল কুরআনিয়্যাহ, হারুন ইয়াহইয়া, পৃষ্ঠা: ৩৪。
[১৬৯] আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবি, খণ্ড: ১৬, পৃষ্ঠা: ৩৪২-৩৪২。
[১৭০] 'ইন্না খালাকনাল ইনসানা মিন নুতফাতিন আমশাজ শিরোনামের প্রবন্ধ-ডক্টর মুহাম্মদ দাহদুহ। সূত্র: htp://quran-m.com/firas/arabic/?page=show_der@id=1908@select_page=2
[১৭১] তাসিরু লাবানিল উম্মি আলাল আতফাল, ডক্টর মার্ক সাইরিজান, মাওকিউ জাদিদিল ইলমি-www.sciencealert.com.au/news/২০০৮১১০২-১৬৮৭৯.html
[১৭২] হজরত আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত আছে, কুরআন কারিমে দশ ঢোক দুধ পানের দ্বারা বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি বিধেয় ছিল। তারপর সেটি রহিত হয়ে পাঁচ ঢোক নির্ধারিত হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পরই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকাল হয়েছে। সহিহু মুসলিম, কিতাবুর রিজায়ি, বাবুত তাহরিমি বিখামসি রাজায়াতিন: হাদিস: ১৪৫২
[বি: দ্র: পাঁচ ঢোক দুধ পান করলে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে, এর কম হলে হারাম হবে না-এটা মুহতারাম গ্রন্থকারের মাজহাবের মতামত। তবে হানাফি মাজহাবের সিদ্ধান্ত হলো—এক ঢোক দুধ পান করলেই বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু এর জন্য দুটি শর্ত প্রযোজ্য: ১. অবশ্যই শিশুকে দুগ্ধ পানের বয়সসীমা-দুই থেকে আড়াই বছরের মাঝেই পান করতে হবে। ২. দুধ পেটে পৌঁছুতে হবে; তবে দুধ পান করলেই সতর্কতামূলকভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক হারামের ফাতাওয়া প্রদান করা হবে। তাদের প্রমাণ হলো—হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন-» يحرم قليل الرضاع وكثيره 'অল্প ও বেশি দুগ্ধপান (বৈবাহিক সম্পর্ককে) হারাম করবে।'- মাশকিলুল আসার, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা : ১৭৪, হাদিস: ৩৯৫৯।- অনুবাদক।
[১৭৩] হায়াতে মুহাম্মদ, এমিল ডারমেঙ্গেম, পৃষ্ঠা: ২৮৯/

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00