📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 স্নেহ ভালোবাসা ও সাধারণ দয়া

📄 স্নেহ ভালোবাসা ও সাধারণ দয়া


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বীরত্ব বাহাদুরির সাথে সাথে তিনি ছিলেন সীমাহীন কোমল মনের অধিকারী। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ দ্রুতই আদ্র ও অশ্রুসিক্ত হয়ে যেত। দুর্বল মানুষ ও প্রাণহীন বাকরুদ্ধ জানোয়ারের সাথেও তিনি উত্তম ব্যবহারের আদেশ করতেন। হজরত শাদ্দাদ বিন আউস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের সাথে সুন্দর ব্যবহারের আদেশ করেছেন। সেজন্য জবেহ করলেও ভালোভাবে করবে। তোমাদের মধ্যে যে জবাই করতে চায়, সে যেন তার ছুরিকে ধারালো করে নেয় এবং জবেহকৃত পশুকে আরাম দেয়![৯৯]
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি একটি বকরিকে জবেহ করার জন্য মাটিতে শুয়াল, এরপর ছুরি ধার দিতে শুরু করল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা দেখে বললেন, তুমি কি তাকে দুবার হত্যা করতে চাও? তাকে শুয়ানোর পূর্বেই কেন চুরি ধারালো করে নিলে না? [১০০]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে পশুদের খাদ্যপানি দেওয়ার আদেশ করেছেন এবং তাদেরকে পেরেশান করতে অথবা তাদের দ্বারা অন্যায্য বোঝা বহন করানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা করেছেন। জন্তু-জানোয়ারের কষ্ট দূর করা এবং আরাম দেওয়ার বিনিময়ে সওয়াব পাওয়ার এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের ঘোষণা করেছেন। পশুর মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার বর্ণনা করেছেন। হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : এক ব্যক্তি কোথাও সফরে ছিল। পথিমধ্যে তার কঠিন পিপাসা লাগল। সম্মুখেই একটি কূপ দৃষ্টিগোচর হলো। সে তাতে নেমে পড়ল। যখন কূপ থেকে বের হয়ে আসল, একটি কুকুরকে পিপাসায় কাদা চাটতে দেখল। সে মনে মনে অনুভব করল, পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল, এরও হয়তো এমন হয়েছে। লোকটি পুনরায় কূপে অবতরণ করল, নিজ চামড়ার মোজা পানি দিয়ে ভরাট করল, এরপর দাঁত দিয়ে ধরে ওপরে তুলল এবং কুকুরকে খাওয়াল। আল্লাহ তাআলা তার এই আমলকে কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল-ইয়া রাসুলুল্লাহ, অন্য এমন পশুর বিষয়েও কি এই বিনিময় পাব? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, প্রত্যেক ওই সৃষ্টজীব, যে সজীব প্রাণের অধিকারী—তার জন্য বিনিময় পাবে।[১০১]
হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, একজন নারীকে শুধু এজন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কেননা সে তার বিড়ালকে দানাপানি দেয়নি এবং তাকে ছেড়ে দিয়েছে-যাতে সে পোকামাকড়ের মাধ্যমেই নিজ উদর পুর্তি করে।[১০২]
হজরত সুহাইল বিন আমর রাদিআল্লাহু আনহু (অন্য বর্ণনায় সুহাইল বিন রবিআ বিন আমর রা.) বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি উটের ওপর সফর করছিলেন, যার পিঠ দুর্বলতার কারণে পেটের সাথে মিশে যাচ্ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই বাকশক্তিহীন পশুর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো! তাদের ওপর আরোহন করো ঠিকঠাকমতো। জবেহ করে তাদের গোস্ত ব্যবহার করতে হলে-এমনভাবে করো, যাতে সে ভালো অবস্থায় থাকে।[১০৩]
হজরত আবদুল্লাহ বিন জাফর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক আনসারির চৌহদ্দিতে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট ছিল। যখন উটটি নবিজিকে দেখল ছটফট করতে শুরু করল এবং তার চোখ থেকে পানি প্রবাহিত হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটটির কাছে গেলেন এবং তার কুঁজ ও গর্দানে নিজ মোবারক হাত বুলাতে লাগলেন। এতে করে উটটি শান্ত হয়ে গেল। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এই উটের মালিক কে? এক আনসারি যুবক বললেন—ইয়া রাসুলুল্লাহ, এটা আমার উট। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে জানোয়ারের মালিক করেছেন, সে জানোয়ারের ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় পাও না। সে আমার কাছে অভিযোগ করছে, তুমি তাকে কষ্ট দাও এবং সবসময় কাজে ব্যস্ত রাখো।[১০৪]
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যদি তোমরা কোনো সবুজ মাঠে যাও, তবে জমিন থেকে তাদের অধিকার নষ্ট কোরো না, আর যখন কোনো শুষ্ক ভূমিতে যাও-তখন তোমাদের উটকে দ্রুতগামী কোরো। রাতে ছাউনি স্থাপন করতে চাইলে, রাস্তায় কোরো না-কেননা সেখানে জন্তু- জানোয়ারের আসা যাওয়া চলতে থাকে এবং পোকামকড়েরা অবস্থান নেয়।[১০৫]
হজরত ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এক সফরে ছিলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো এক প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরে গেলেন। সেখানে আমরা একটি ছোট পাখি দেখলাম, সাথে দুটি ছানাও ছিল। আমরা দুটি ছানাকে নিয়ে নিলাম। পাখিটি এটা দেখে নিজের ডানা ঝাপটাতে লাগল। ইতোমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কে তার বাচ্চাকে ছিনিয়ে তাকে কষ্ট দিল? অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ করলেন, তার ছানাকে ফেরত দাও! সেখানে আমরা পিঁপড়ার একটি জনপদ দেখতে পেলাম এবং তা জ্বালিয়ে দিলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা কে করেছে? আমরা বললাম, আমরা করেছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আগুনের শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই আছে।[১০৬]
খাদেম, সেবক, শ্রমিক-যারা অন্য মানুষদের মতোই মানুষ এবং যাদের দয়া তাদের মালিকদের ওপর রয়েছে; নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে উত্তম ব্যবহারের শিক্ষা দিয়েছেন- সেটা সবার জন্যই অভিন্ন।
হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-তোমরা যা খাও, তাদের তা-ই খাওয়াও! যা তোমরা পরিধান করো, তাদেরও তা-ই পরিধান করাও! আর আল্লাহর সৃষ্টিজীবকে শাস্তির মুখোমুখি কোরো না,[১০৭] আল্লাহ তাআলা যাদেরকে তোমাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। তোমাদের খাদেম, সেবক—তোমাদেরই ভাই। যার ভাই তার দায়িত্বে আছে, তার উচিত সে যা খায় তা-ই যেন তার ভাইকে খাওয়ায়। যা সে পরে, তা-ই যেন তার ভাইকে পরায়। তাদের জন্য এমন কোনো কাজ বাধ্যতামূলক কোরো না, যা তাদের ক্ষমতার বাহিরে। আর যদি এমন করতেই হয়, তবে তার সাথে নিজেও কাজে হাত লাগাও।[১০৮]
হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-এক গ্রাম্য লোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসল এবং জিজ্ঞেস করল, আমি আমার গোলামকে একদিনে কতবার মাফ করব? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সত্তর বার।[১০৯]
আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকেই বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, শ্রমিককে তার শ্রমের মূল্য, তার ঘام শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই পরিশোধ করে দাও![১১০]

টিকাঃ
[৯৯] মুসলিম শরিফ।
[১০০] তিবরানি, এবং হাকেমের ভাষ্যনুযায়ী এই হাদিসটি বোখারির শর্তে সঠিক।
[১০১] সহিহুল বোখারি; কিতাবুল মুসা'কাহ, সহিহুল মুসলিম; বাবু ফাজলু সাকয়ুল বাহায়িম।
[১০২] ইমাম নববি, মুসলিম শরিফের বর্ণনা মতে।
[১০৩] আবু দাউদ।
[১০৪] আবু দাউদ।
[১০৫] মুসলিম শরিফ।
[১০৬] আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ।
[১০৭] বোখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ৩৮।
[১০৮] বোখারি, আবু দাউদ।
[১০৯] তিরমিজি, আবু দাউদ।
[১১০] ইবনে মাজাহ।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 বিশ্ববিজেতা, পূর্ণতার চিরন্তন নমুনা

📄 বিশ্ববিজেতা, পূর্ণতার চিরন্তন নমুনা


উক্ত গ্রন্থের আলোচনার সমাপ্তিতে উসতাদ হজরত মাওলানা সাইয়িদ সুলায়মান নদবি রহিমাহুল্লাহর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'খুতবাতে মাদ্রাজ'-এর নির্বাচিত ও চয়নকৃত বাক্যমালায় সজ্জিত করা হয়েছে। যেখানে সাইয়িদ সাহেব রহিমাহুল্লাহ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ণতা, বিশ্ববিজয়ী ও অক্ষয় চিরন্তন নমুনা ও সার্বজনীন সকল স্তরের পরিপূর্ণতা—পার্থিব জীবনেরও প্রতিটি স্থানে, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি পেশা এবং কর্মব্যস্ততায়-সর্বোপরি সকলপ্রকার অবস্থানে ময়দান ও মাপকাঠি হিসেবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিপূর্ণ সার্বজনীন জীবনে রয়েছে সহযোগী এবং উত্তম পন্থার পরিচায়ক হিসেবে, যা অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও পরিপূর্ণতার নিরিখে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি লিখেন-
'এমন এক মনুষ্য জীবন, যা মনুষ্য জাতির প্রতিটি দল এবং মনুষ্য প্রবৃত্তির ভিন্ন প্রতিটি দৃষ্টান্ত এবং প্রত্যেক প্রকারের যথার্থ আবেগ এবং পূর্ণতার চরিত্রের রাঙায়িত একত্র-শুধুমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতেই স্থান পেয়েছে। যদি তুমি ধনাঢ্য হও, তবে মক্কার ব্যবসায়ী এবং বাহরাইনের গুদামওয়ালার অনুসরণ করো! যদি তুমি গরিব হও, তবে শুআবে আবি তালিবের বন্দি ও মদিনার মেহমানদের অবস্থা শুনো! যদি তুমি শাসক হও, তবে আরবের সুলতানের অবস্থা পড়ো! যদি তুমি অধীনস্থ হও, তবে কুরাইশের প্রভাবাধীনদের এক পলক দেখো! যদি তুমি বিজয়ী হও, তবে বদর, হুনাইনের সিপাহসালারের দিকে দৃষ্টি রাখো! যদি তুমি বিপর্যস্থ হও, তবে উহুদের লড়াই থেকে শিক্ষা অর্জন করো! যদি তুমি উস্তাদ কিংবা শিক্ষক হও, তবে আহলে সুফফাহর শিক্ষা কেন্দ্রের সম্মানিত শিক্ষককে দেখো! যদি শিষ্য হও, তবে রুহুল আমিনের সামনে বসা লোকের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করো! যদি তুমি ওয়ায়েজ কিংবা নসিহত করো, তবে মসজিদে মদিনার মিম্বারে দাঁড়ানো ব্যক্তির কথা শুনো! যদি তুমি একাকিত্ব কিংবা মানুষের অজান্তে আল্লাহকে ডাকার আবশ্যকতা সম্পন্ন করতে চাও, তবে মক্কার বন্ধু ও সাথিহীন নবির উত্তম আদর্শ তোমার সামনে আছে। যদি তুমি রবের করুণায় নিজ শত্রুদের মাথানত এবং বিরোধীদের দুর্বল করে থাকো, তবে মক্কা বিজয়ীর দৃশ্যায়ন করো! যদি তুমি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দুনিয়াবি কাজে শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা সঠিক বাতায়নে করতে চাও, তবে বনি নাজির, খাইবার এবং ফিদাকের জমিনের মালিকের কারবার এবং শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার দিকে দেখো! যদি তুমি এতিম হও, তবে আবদুল্লাহ ও আমেনার হৃদস্পন্দনকে ভুলো না! যদি ছোট হও, তবে হালিমা সাদিয়া রাদিআল্লাহু আনহার সন্তানকে দেখো! যদি তুমি যুবক হও, তবে মক্কার এক মেষপালকের জীবন অধ্যয়ন করো! যদি তুমি সফররত ব্যবসায়ি হও, তবে বুসরার কাফেলার প্রধানের দৃষ্টান্ত পেশ করো! যদি তুমি আদালতের বিচারক হও বা পঞ্চায়েতের মধ্যস্থতাকারী হও, তবে কাবায় সূর্যের আলো নিপতিত হওয়ার পূর্বে প্রবেশ করা মধ্যস্থতাকারীকে দেখো-যিনি হাজরে আসওয়াদকে কাবার এক প্রান্তে দাঁড় করাচ্ছিলেন। মদিনার কাঁচা মসজিদে বসে থাকা ন্যায় বিচারককে দেখো, যার নিকট রাজা-বাদশাহ, আমির-গরিব সবাই সমান ছিল। যদি তুমি স্ত্রীর স্বামী হয়ে থাকো, তবে হজরত খাদিজা এবং হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহুমার স্বামীর জীবনী অধ্যয়ন করে দেখো! যদি তুমি সন্তানের জনক হও, তবে হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহার পিতা এবং হাসান-হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমার নানার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো! তুমি যা কিছুই হও এবং যেকোনো অবস্থাতেই থাকো, তোমার জীবনের জন্য দৃষ্টান্ত, জীবনাচরণের জন্য সহায়ক এবং জীবন সংস্করণের জন্য সমার্থক ও তোমার অন্ধকার গৃহের জন্য হেদায়েতের আলোকপ্রদীপ এবং সাহায্য-সহযোগিতা-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত ভাণ্ডারে সর্বক্ষণ এবং সর্বাবস্থায় বিদ্যমান পাবে। সেজন্য মনুষ্যত্বের স্তরের প্রতিটি শিক্ষানবিশ এবং ঈমানের নূরের প্রতিটি অনুসন্ধিৎসু কলবের জন্য শুধুমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতের দৃষ্টান্তই মুক্তিদিশা হতে পারে। তাঁর সামনে নুহ ও ইবরাহীম, আইয়ুব ও ইউনুস, মুসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালামের সিরাত বিদ্যমান আছে। যেহেতু সকল নবি আলাইহিমুস সালামের সিরাতই এক অঙ্গের দুটি কানের মতো। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত, চরিত্র ও কর্মপন্থা, দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ বাজার, যেখানে প্রত্যেক জিনিসের ক্রেতা এবং প্রত্যেক জিনিসের অন্বেষার জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দ্রব্য বর্তমান রয়েছে।[১১১]

টিকাঃ
[১১১] খুতবাতে মাদ্রাজ পৃষ্ঠা ৯৬-৯৮।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী

📄 নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতে অবগাহনকারী ব্যক্তি তাঁকে পাবে অকৃপণ ঝরনার বহমানতায়; মানবমহত্ত্বের সর্বপ্রকারের জন্য যিনি অনুপেক্ষ সমৃদ্ধ এক উৎস। আর এমন হবেই না-বা কেন! তাঁকে তো আল্লাহ তাআলা সমগ্র বনি আদমের মধ্য থেকে নির্বাচন করেছেন, তাঁর মাধ্যমে মোহর এঁটে দিয়েছেন নিজের নবি এবং রাসুলদের আগমন-ধারাবাহিকতায়। তাঁর জীবন ছিল সবচেয়ে বেশি জ্যোতির্ময়। মানবতা নিজের সূচনাতেই, সৃষ্টির প্রথম সকালেই তাঁকে চিনে নিয়েছিল; নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কারণে হয়েছেন আল্লাহর এই বাণীর অধিকারী-
وَ إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী। [সুরা কলাম, আয়াত : ৪]
তাঁর উত্তম চরিত্র ছিল তাঁর নবুওয়্যাতের প্রমাণ; ফলে দেখা গেছে, স্বচক্ষে তাঁর মহান চরিত্র প্রত্যক্ষ করার পর বা তাঁর তিরোধানের পর তাঁর মহান চরিত্রের বিষয়টি অধ্যয়ন করে কিংবা শুনে অগণিত মানুষ ঈমান গ্রহণ করেছে। তাঁর চরিত্র ছিল বাস্তবানুগ—উত্তম চরিত্রের প্রতিটি অধ্যায়ে যা জ্যোতির্ময় হয়ে ফুঠে উঠেছে।
সামনের আলোচনাগুলোতে আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্বের কিছু দিক জানতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 নবিজির সততা

📄 নবিজির সততা


একজন মানুষ যেসব উন্নত চরিত্রগুণে গুণান্বিত হয়ে শ্রেষ্ঠ ও মহৎ হয়, এর মধ্যে সততা অন্যতম। সততা তাই স্বাভাবিকতই কুরআন কারিমের গুরুত্বের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু; আল্লাহ তাআলাকে রব বিশ্বাসকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে সম্বোধন করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
يَآ أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَ كُوْنُوْا مَعَ الصَّدِقِيْنَ
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো। [সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৯]
আল্লাহ তাআলা সত্যবাদীদের সাথে থাকার নির্দেশ প্রদান করেছেন, এ কথা বোঝানোর জন্য, সমগ্র মুসলিম জাতিকে অবশ্যই সততার মহৎ গুণে গুণান্বিত হতে হবে। সততা প্রতিটি কল্যাণের চাবি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সততার গুণে ছিলেন অনন্য, অন্যতম, প্রধান উপমা। নবুওয়্যাতপ্রাপ্তির পূর্বেই কুরাইশদের পক্ষ থেকে তাঁকে উপাধি দেওয়া হয়েছিল—সাদিক বা সত্যবাদী সম্বোধনে, আমিন বা বিশ্বস্ত উপাধিতে। তারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিজেদের জরুরি বিষয়গুলো আমানত রেখে নিজেদের বস্তু ও গোপন বিষয়গুলোর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকত। যখনই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুওয়্যাত পেলেন, সাথে সাথে তাঁর বংশের লোকজনসহ আত্মীয়স্বজন প্রায় সকলেই শত্রুতা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, যুদ্ধংদেহি ভাব প্রকাশ করতে আরম্ভ করল। এই সঙ্গিন পরিস্থিতিতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মহান চরিত্রে ইস্পাতদৃঢ়ভাবে অবিচল থাকলেন; এমনকি সেসব আমানত ফিরিয়ে দিয়ে তাঁর সততার বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন—সবচেয়ে বড় শত্রুরা যেগুলো তাঁর কাছে আমানت রেখেছিল। [১১২]
আল্লাহ তাআলা যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিলেন- নিজের নিকটাত্মীয়দেরকে (পরকালের শান্তি সম্পর্কে) ভীতি প্রদর্শন করো, তিনি সাফা পর্বতে আরোহণপূর্বক বললেন-
أَرَأَيْتَكُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ خَيْلًا بِالْوَادِي تُرِيدُ أَنْ تُغِيرَ عَلَيْكُمْ أَكُنْتُمْ مُصَدِّقِ؟ قَالُوا نَعَمْ مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إِلَّا صِدْقًا قَالَ فَإِنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ .
আমি যদি তোমাদের সংবাদ দিই, উপত্যকার পাদদেশে একটি অশ্বারোহী বাহিনী ওত পেতে রয়েছে, তারা যেকোনো মুহূর্তে তোমাদের ওপর হামলে পড়তে পারে, তাহলে তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল- হ্যাঁ। আমরা তোমার ব্যাপারে কেবল সততার অভিজ্ঞতাই লালন করি। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-আমি তোমাদের অত্যাসন্ন কঠিন আজাব সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করছি।[১১৩]
নবিজির সবচেয়ে বড় শত্রু-নজর ইবনু হারিসও তাঁর সততার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন। সে কুরাইশের নেতৃস্থানীয় লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়—
يا معشر قريش، إنه والله لقد نزل بكم أمر ما أتيتم له بحيلة بعد، قد كان محمد فيكم غلاما حدثا، أرضاكم فيكم وأصدقكم حديثا، وأعظمكم أمانة حتى إذا رأيتم في صدغيه الشيب، وجاءكم بما جاءكم به قلتم: ساحر. لا والله ما هو بساحر؛ لقد رأينا السحرة ونفثهم وعقدهم، وقلتم : كاهن. لا والله ما هو بكاهن؛ قد رأينا الكهنة وتخالجهم، وسمعنا سجعهم. وقلتم: شاعر. لا والله ما هو بشاعر؛ قد رأينا الشعر وسمعنا أصنافه كلها؛ هزجه ورجزه، وقلتم: مجنون. لا والله ما هو بمجنون لقد رأينا الجنون فما هو بخنقه ولا وسوسته ولا تخليطه ، يا معشر قريش، فانظروا في شأنكم ، فإنه والله لقد نزل بكم أمر عظيم .
হে কুরাইশ সম্প্রদায়, আল্লাহর কসম, তোমাদের ওপর এমন কঠিন বিপদ আপতিত হয়েছে, যেরকম বিপদ প্রতিরোধের কোনো কৌশল তোমাদের এখনো হস্তগত হয়নি। মুহাম্মদ ছিল তোমাদের মাঝে তরুণ-যুবক, তোমাদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে সত্যবাদী, সবচেয়ে বড় আমানতদার। যখন তোমরা তার দুই জুলফিতে শুভ্রতা দেখলে-সে পদার্পণ করল প্রৌঢ়ত্বে, তোমাদের কাছে যা নিয়ে আসার তা নিয়ে এলো, তখন তোমরা তাকে বললে-জাদুকর। আল্লাহর কসম, তিনি জাদুকর নন। আমরা তো জাদু দেখেছি, দেখেছি জাদুর ফুঁৎকার ও গ্রন্থি। তোমরা বললে-সে জ্যোতিষী। আল্লাহর কসম, তিনি জ্যোতিষী নন। আমরা তো জ্যোতিষী ও তাদের অবস্থা দেখেছি, তাদের তুকতাক শুনেছি। তোমরা বললে-সে কবি। আল্লাহর কসম, তিনি কবি নন। আমরা কবিতা দেখেছি, কবিতার সমস্ত প্রকার শুনেছি, কবিতার ঝংকার-তরঙ্গ দেখেছি। তোমরা বললে-সে পাগল। আল্লাহর কসম, তিনি পাগল নন। আমরা পাগল দেখেছি। পাগলের কথায় যে জড়তা, আবোলতাবোল ও অমূলক বক্তব্য থাকে, তা তাঁর কথাবার্তায় অনুপস্থিত। তোমরা নিজেদের অবস্থান দেখো। আল্লাহর কসম, তোমরা এমন বিপদে কখনো নিপতিত হওনি।[১১৪]
এসবের চেয়ে বড় বিষয় হলো—তাঁর সততার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্যপ্রদান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَ الَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَ صَدَّقَ بِهِ أُولِّيكَ هُمُ الْمُتَّقُوْنَ .
যিনি সত্যসহ এসেছেন এবং যাঁরা তাঁকে সত্যায়ন করেছেন, তাঁরা মুক্তাকি। [সুরা জুমার, আয়াত: ৩৩]
যিনি সত্যসহ আগমন করেছেন, তিনি আমাদের নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর যিনি তাঁর প্রতি সপ্তাকাশের ওপার থেকে অবতীর্ণ কুরআন কারিমের বিষয়বস্তুকে সত্যায়ন করেছেন, তিনি আল্লাহ তাআলা। এই আয়াতের সাথে সংযুক্ত করে ইমাম ইবনু আশুর বলেছেন-সত্যসহ আগমনকারী হলেন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আর সত্যটি হলো আল-কুরআন।[১১৫]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদা-সর্বদা মুসলিমদেরকে তাঁদের কথা- কাজে সত্যপথে চলতে উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন-
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابًا.
তোমাদের জন্য সত্য অপরিহার্য। কারণ, সত্য নেকির পথে পরিচালিত করে, আর নেকি জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। মানুষ যখন সত্যপথে চলতে থাকে, সত্য অন্বেষণ করতে থাকে, তাকে আল্লাহর কাছে সিদ্দিক হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
তোমরা মিথ্যাকে পরিহার করে চলবে। কারণ, মিথ্যা পাপাচারের পথে পরিচালিত করে, আর পাপাচার জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়। মানুষ যখন অবিরত মিথ্যা বলে, মিথ্যাকে খোঁজে, তাকে আল্লাহর কাছে মিথ্যুক হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। [১১৬]
এমনকি অনেক সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইরশাদ করতেন-
اضْمَنُوا لِي سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ .
তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে আমার জন্য ছয়টি বস্তুর দায়িত্ব নাও, আমি তোমাদের জান্নাতের দায়িত্ব নেব। সেগুলো হলো :- কথা বললে সত্য বলো, প্রতিজ্ঞা করলে পূর্ণ করো, আমানত রাখা হলে তা প্রদান করো, তোমাদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করো, তোমাদের চোখকে নিচু রাখো এবং তোমাদের হাতকে (অপরাধ থেকে) বিরত রাখো। [১১৭]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহানুভবতার আরেকটি দিক হলো-তিনি নিজের পরবর্তী প্রজন্ম ও মুসলিমদের মাঝে সত্যকে ভালোবাসার শিক্ষা প্রোথিত করেছেন। এর সবচেয়ে বড় দলিল-আবুল হাওরা আস-সায়াদি বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি হাসান ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বললাম, আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন বিষয়টি সংরক্ষণ করেছেন? তিনি বললেন-
حَفِظْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ فَإِنَّ الصَّدْقَ طُمَأْنِينَةٌ وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةُ .
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সংরক্ষণ করেছি— সন্দেহপূর্ণ বিষয় ছাড়ো, নিশ্চিত বিষয় ধরো। কারণ, সত্য হলো তৃপ্ততা আর মিথ্যা হলো সংশয়তা। [১১৮]
এই ভালোবাসা এমনিতেই সৃষ্টি হয়নি; এর মূল রহস্য—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং প্রতিটি কথা ও কাজে এই গুণে গুণান্বিত ছিলেন; এমনকি ঠাট্টা ও মশকরার সময়, যখন মানুষ মিথ্যাকে বৈধ মনে করে, তখনো তিনি সত্যবাদিতার গুণে অবিচল থাকতেন। হজরত আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত-
أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ احْمِلْنِي قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ قَالَ وَمَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهَلْ تَلِدُ الْإِيلَ إِلَّا النُّوقُ .
জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলল—হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে আরোহণের জন্য কোনো জন্তু দিন। জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-আমি তোমাকে উটের বাচ্চায় আরোহণ করাব। লোকটি বলল-হে আল্লাহর রাসুল, আমি উটের বাচ্চা দিয়ে কী করব? জবাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—উটনি তো বাচ্চাই জন্ম দেয়। [১১৯]
একজন সাধারণ মুসলিমের সাথে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই রসিকতা ছিল হৃদ্যতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য। কিন্তু সেখানেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য শব্দই ব্যবহার করেছেন।
যুদ্ধের সময়ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা এর ব্যতিক্রম হতো না। বাকি যতটুকু মিথ্যা বলার অনুমতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দিয়েছেন, তা ছিল শত্রুর অনিষ্টতা থেকে বাঁচার জন্য, তাদের পক্ষ থেকে আশঙ্কাপূর্ণ ক্ষতিকে প্রতিরোধ করার জন্য; [১২০] কিন্তু সেখানেও তিনি সত্যই বলেছেন।
আমরা বদর যুদ্ধপূর্ববর্তী তাঁর অবস্থান দেখব, যেখানে কুরাইশরা মুসলিমদেরকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য যুদ্ধযাত্রা করেছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন, তাঁর সাথে হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু। উদ্দেশ্য ছিল—আরবের জনৈক বৃদ্ধের কাছ থেকে কুরাইশদের সংবাদ অবগত হওয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কুরাইশদের সম্পর্কে, মুহাম্মদ ও তাঁর সাথিদেরকে সম্পর্কে, যা জানে, সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। বৃদ্ধ বলল—তোমাদের দুজনের পরিচয় না দিলে আমি তোমাদের কিছুই বলব না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তুমি বললে আমরাও বলব। বৃদ্ধ বলল—তাহলে কি বিনিময় হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-হ্যাঁ। এবার বৃদ্ধ বলল—আমি জানতে পেরেছি, মুহাম্মদ ও তাঁর সাথিরা অমুক অমুক দিন বের হয়েছেন। যদি আমাকে সংবাদদাতা সঠিক বলে থাকে, তাহলে তাঁরা অমুক স্থানে আছেন। (বাস্তবেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে অবস্থান করছিলেন।) আর কুরাইশদের ব্যাপারে জানতে পেরেছি, তারা অমুক দিন যুদ্ধযাত্রা করেছে। যদি সাংবাদিক আমাকে সঠিক তথ্য দিয়ে থাকে, তাহলে তারা আজকে অমুক স্থানে অবস্থান করছে। (বাস্তবেও কুরাইশরা সেখানে অবস্থান করছিল।) কথা শেষ করে বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল—তোমরা কারা, এবার বলো? জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
نحن من ماء
আমরা পানি হতে সৃষ্টি।
তারপর সেখান থেকে চলে গেলেন। বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল-‘কীসের পানি থেকে? ইরাকের পানি থেকে কি?[১২১]
আমরা খুব সুন্দর একটি ঘটনার মাধ্যমে এই আলোচনাটি শেষ করতে চাচ্ছি, এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং বনু হাওয়াজিনের প্রতিনিধিদলের মাঝে সংঘটিত হয়েছিল; ইসলাম গ্রহণের প্রথম দিনেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সত্যবাদিতার গুরুত্ব শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাদেরকে বলেছিলেন—
أَحَبُّ الْحَدِيثِ إِلَيَّ أَصْدَقُهُ
আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বাণী হলো—সত্য কথা।[১২২]
এমনটিই ছিল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। যেখানে প্রতিটি বস্তু সত্যের শুভ্রতায় আলোকময় ছিল। কারলাইল[১২৩] তাই বলতে বাধ্য হয়েছেন— ...তোমরা কি মনে কর, একজন মিথ্যাবাদী মানুষ জনপ্রিয় একটি ধর্ম আবিষ্কার করতে পারে? সে তো একটি ইটের ঘরও নির্মাণ করতে পারে না। যখন লোকে চুন, চুনকাম, মাটি ও গৃহনির্মাণ-প্রয়োজনীয় সামগ্রী সম্পর্কে না জানে, তার দ্বারা বাড়ি নির্মাণ অসম্ভবপর। সে তো গড়বে ধ্বংসস্তুপের পাহাড় আর অনেক উপকরণের মিশেলে তৈরি বালুর চর! এমন ব্যক্তির নির্মিত ধর্মের দুইশ মিলিয়নেরও অধিক অনুসারীদের [১২৪] যুগও কি টিকে থাকার কথা! তারা তো বরং এমনভাবে ধ্বংস হয়ে পড়ার কথা, যাদের নামনিশানা পর্যন্ত থাকবে না। আমি খুব ভালোভাবেই জানি, এমন মানুষের জন্য প্রতিটি বিষয়ে স্বভাবগত নিয়মের অনুগামী হয়ে চলতে হয়, নতুবা তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান হয়। ওই কাফিররা ইসলামের নবির বিরুদ্ধে যা ছড়িয়েছে, তা মিথ্যা। এ মিথ্যা প্রচারণার কারণে মানুষেরা সে মিথ্যাকে সত্য ভাবতে আরম্ভ করেছে...
দুর্ভাগ্য, তাদের এ বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচারের কারণে গোষ্ঠীর পর গোষ্ঠী প্রতারিত হয়েছে!...[১২৫]

টিকাঃ
[১১২] সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: হাদিস: ১২৪৭৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনু কাসির, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২১৮-২১৯; তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, তাবারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৬৯।
[১১৩] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ৪৭৭০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫০৭১।
[১১৪] সিরাতে ইবনু হিশাম খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৯৯-৩০০; আর-রওজুল উনুফ, আস-সুহাইলি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৬৮; উয়নুল আসার, ইবনু সায়্যিদিন নাস, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪২৭。
[১১৫] আত-তাহরির ওয়াত তানবির, ইবনু আশুর, খণ্ড: ২৪, পৃষ্ঠা : ৮৬।
[১১৬] সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬০৭, সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ৪৯৮৯, সুনানুত তিরিমিজি, হাদিস: ১৯৭১, ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩৮৪৯。
[১১৭] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ২২৮০৯। আল্লামা শুয়াইব বলেছেন-হাদিসটি হাসান লিগাইরিহি এবং বর্ণনাটির রাবিগণ নির্ভরযোগ্য; ইবনু হিব্বান: হাদিস: ২৭১; হাকিম, হাদিস: ৮০৬৬, তিনি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন, তবে বুখারি ও মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেননি।
[১১৮] সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৮, মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৭২৩。
[১১৯] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ৪৯৯৮; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৩৮৪৪।
[১২০] রিয়াদুস সালিহিন, ইমাম নববি, পৃষ্ঠা: ৫৬৫-৫৬৬。
[১২১] উয়নুল আসার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা: ৩২৯; সিরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনু কাসির, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা: ৩৯৬; আর-রওজুল উনুফ, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৭৩; সিরাতে ইবনু হিশাম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬১৫।
[১২২] সহিহুল বুখারি, হাদিস: ২৩০৭; সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ২৬৯৩, মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ১৮৯৩৪。
[১২৩] টমাস কার্লাইল (১৭৯৫-১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দ) একজন প্রসিদ্ধ ইংরেজ লেখক। তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-আবতালে তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে একটি চমৎকার অধ্যায় রচনা করেছেন।
[১২৪] এই সংখ্যাটা ছিল কারলাইলের গ্রন্থ আল-আবতাল প্রকাশের সময়। কিন্তু ২০০৮ সালে মুসলিমদের সংখ্যা ১.৩ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। (সূত্র: আশ-শারকুল আউসাত পত্রিকা) বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা ১.৯ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। সূত্র: উইকিপিডিয়া-নিরীক্ষক。
[১২৫] আল-আবতাল, কারলাইল, পৃষ্ঠা: ৪৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00