📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য 📄 বীরত্ব, বাহাদুরি ও লজ্জা-শরম

📄 বীরত্ব, বাহাদুরি ও লজ্জা-শরম


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতে বীরত্ব, বাহাদুরি ও লজ্জা-শরমের (যেগুলোকে লোকেরা পরস্পর বিরোধী ভাবে) একই নমুনা ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লজ্জা শরমের বিষয়ে হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্দানিশীন কুমারি নারীর চেয়ে অধিক লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো জিনিস অপছন্দনীয় হতো, তার প্রভাব নবিজির চেহারার মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়ে যেত।[৯৬]
তিনি লজ্জা-শরমের কারণে কাউকে এমন কিছু বলতেন না, যা তার কাছে অপছন্দনীয় হয়। সুতরাং এই দায়িত্ব অন্য কাউকে অর্পণ করতেন। হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: নবিজির মজলিসে একজন লোক ছিল, যার কাপড়ের অধিকাংশ সোনালী রঙের ছিল। যেহেতু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরমের কারণে কাউকে তার অপছন্দনীয় কাজের কথা বলতে পারতেন না—সেজন্য যখন সে দাঁড়াল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের বললেন, ভালো হতো তোমরা তাকে বলতে, সোনালী রঙের পোশাক পরিধান ছেড়ে দিতে।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন : যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো খারাপ কাজের সংবাদ পেতেন, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম নিয়ে বলতেন না—এমন কেন করলে? বরং তিনি বলতেন, লোকেদের কী হয়ে গেল যে, তারা এমন করছে! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সে কাজের বিরোধিতা করতেন ঠিকই, কিন্তু সে লোকের নাম উল্লেখ করতেন না।[৯৬]
বীরত্ব ও বাহাদুরি সম্পর্কে যতটুকু বলার- শেরে খুদা, হজরত আলী মুরতাজা রাদিআল্লাহু আনহুর সাক্ষ্যই তার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন: যখন রণক্ষেত্র উত্তপ্ত হয়ে উঠত এবং মনে হতো চোখ তার কুঠোরি থেকে বেরিয়ে আসবে, সে সময় আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তালাশ করতাম তার ছায়ায় আশ্রয় নিতে। কিন্তু আমরা দেখতাম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে শত্রুর নিকটবর্তী আর কেউ নেই। বদরের যুদ্ধে আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল-আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে অবস্থান করছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদের চেয়েও দুশমনের নিকটবর্তী ছিলেন।[৯৭]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব থেকে সুন্দর, সুশ্রী এবং শ্রেষ্ট দানবীর, উদার এবং বীরত্ব ও সাহসীকতায় শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ছিলেন। এক রাতে মদিনাবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল এবং যেদিক থেকে আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, লোকেরা সেদিকে এগিয়ে গেল। পথিমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফিরে আসতে দেখলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আওয়াজ শুনে তাদের আগেই সেদিকে গিয়েছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সময় আবু তালহা রাদিআল্লাহু আনহুর ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। তাতে জিনও বাঁধা ছিল না। তরবারি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধে ঝুলছিল। তিনি ঘোড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে বললেন, আমি এটাকে সমুদ্রের মতো পেয়েছি- দীপ্ত গতিসম্পন্ন। [৯৮]
উহুদ ও বদরের যুদ্ধে যখন বড় থেকে বড় বাহাদুর এবং সাহসীরা এদিক সেদিক পলায়নরত ছিল এবং ময়দান ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সে সময়ও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ খচ্চরের ওপর অনড়, অটল ছিলেন প্রশান্ত মনে। মনে হচ্ছিল যেন কোনোকিছুই হয়নি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কবিতাও পড়ছিলেন-
أنا النبي لا كذب ، أنا ابن عبدالمطلب
আমি নবি, এটা কোনো মিথ্যা নয়, আর আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।

টিকাঃ
[৯৫] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মানাকিব, ছিফাতুন নাবি অধ্যায়।
[৯৬] সুনানে আবি দাউদ。
[৯৭] কিতাবুশ শুফা, পৃষ্ঠা ৮৯।
[৯৮] আল-আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ৪২।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য 📄 স্নেহ ভালোবাসা ও সাধারণ দয়া

📄 স্নেহ ভালোবাসা ও সাধারণ দয়া


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বীরত্ব বাহাদুরির সাথে সাথে তিনি ছিলেন সীমাহীন কোমল মনের অধিকারী। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ দ্রুতই আদ্র ও অশ্রুসিক্ত হয়ে যেত। দুর্বল মানুষ ও প্রাণহীন বাকরুদ্ধ জানোয়ারের সাথেও তিনি উত্তম ব্যবহারের আদেশ করতেন। হজরত শাদ্দাদ বিন আউস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের সাথে সুন্দর ব্যবহারের আদেশ করেছেন। সেজন্য জবেহ করলেও ভালোভাবে করবে। তোমাদের মধ্যে যে জবাই করতে চায়, সে যেন তার ছুরিকে ধারালো করে নেয় এবং জবেহকৃত পশুকে আরাম দেয়![৯৯]
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি একটি বকরিকে জবেহ করার জন্য মাটিতে শুয়াল, এরপর ছুরি ধার দিতে শুরু করল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা দেখে বললেন, তুমি কি তাকে দুবার হত্যা করতে চাও? তাকে শুয়ানোর পূর্বেই কেন চুরি ধারালো করে নিলে না? [১০০]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে পশুদের খাদ্যপানি দেওয়ার আদেশ করেছেন এবং তাদেরকে পেরেশান করতে অথবা তাদের দ্বারা অন্যায্য বোঝা বহন করানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা করেছেন। জন্তু-জানোয়ারের কষ্ট দূর করা এবং আরাম দেওয়ার বিনিময়ে সওয়াব পাওয়ার এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের ঘোষণা করেছেন। পশুর মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার বর্ণনা করেছেন। হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : এক ব্যক্তি কোথাও সফরে ছিল। পথিমধ্যে তার কঠিন পিপাসা লাগল। সম্মুখেই একটি কূপ দৃষ্টিগোচর হলো। সে তাতে নেমে পড়ল। যখন কূপ থেকে বের হয়ে আসল, একটি কুকুরকে পিপাসায় কাদা চাটতে দেখল। সে মনে মনে অনুভব করল, পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল, এরও হয়তো এমন হয়েছে। লোকটি পুনরায় কূপে অবতরণ করল, নিজ চামড়ার মোজা পানি দিয়ে ভরাট করল, এরপর দাঁত দিয়ে ধরে ওপরে তুলল এবং কুকুরকে খাওয়াল। আল্লাহ তাআলা তার এই আমলকে কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল-ইয়া রাসুলুল্লাহ, অন্য এমন পশুর বিষয়েও কি এই বিনিময় পাব? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, প্রত্যেক ওই সৃষ্টজীব, যে সজীব প্রাণের অধিকারী—তার জন্য বিনিময় পাবে।[১০১]
হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, একজন নারীকে শুধু এজন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কেননা সে তার বিড়ালকে দানাপানি দেয়নি এবং তাকে ছেড়ে দিয়েছে-যাতে সে পোকামাকড়ের মাধ্যমেই নিজ উদর পুর্তি করে।[১০২]
হজরত সুহাইল বিন আমর রাদিআল্লাহু আনহু (অন্য বর্ণনায় সুহাইল বিন রবিআ বিন আমর রা.) বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি উটের ওপর সফর করছিলেন, যার পিঠ দুর্বলতার কারণে পেটের সাথে মিশে যাচ্ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই বাকশক্তিহীন পশুর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো! তাদের ওপর আরোহন করো ঠিকঠাকমতো। জবেহ করে তাদের গোস্ত ব্যবহার করতে হলে-এমনভাবে করো, যাতে সে ভালো অবস্থায় থাকে।[১০৩]
হজরত আবদুল্লাহ বিন জাফর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক আনসারির চৌহদ্দিতে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট ছিল। যখন উটটি নবিজিকে দেখল ছটফট করতে শুরু করল এবং তার চোখ থেকে পানি প্রবাহিত হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটটির কাছে গেলেন এবং তার কুঁজ ও গর্দানে নিজ মোবারক হাত বুলাতে লাগলেন। এতে করে উটটি শান্ত হয়ে গেল। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এই উটের মালিক কে? এক আনসারি যুবক বললেন—ইয়া রাসুলুল্লাহ, এটা আমার উট। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে জানোয়ারের মালিক করেছেন, সে জানোয়ারের ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় পাও না। সে আমার কাছে অভিযোগ করছে, তুমি তাকে কষ্ট দাও এবং সবসময় কাজে ব্যস্ত রাখো।[১০৪]
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যদি তোমরা কোনো সবুজ মাঠে যাও, তবে জমিন থেকে তাদের অধিকার নষ্ট কোরো না, আর যখন কোনো শুষ্ক ভূমিতে যাও-তখন তোমাদের উটকে দ্রুতগামী কোরো। রাতে ছাউনি স্থাপন করতে চাইলে, রাস্তায় কোরো না-কেননা সেখানে জন্তু- জানোয়ারের আসা যাওয়া চলতে থাকে এবং পোকামকড়েরা অবস্থান নেয়।[১০৫]
হজরত ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এক সফরে ছিলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো এক প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরে গেলেন। সেখানে আমরা একটি ছোট পাখি দেখলাম, সাথে দুটি ছানাও ছিল। আমরা দুটি ছানাকে নিয়ে নিলাম। পাখিটি এটা দেখে নিজের ডানা ঝাপটাতে লাগল। ইতোমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কে তার বাচ্চাকে ছিনিয়ে তাকে কষ্ট দিল? অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ করলেন, তার ছানাকে ফেরত দাও! সেখানে আমরা পিঁপড়ার একটি জনপদ দেখতে পেলাম এবং তা জ্বালিয়ে দিলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা কে করেছে? আমরা বললাম, আমরা করেছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আগুনের শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই আছে।[১০৬]
খাদেম, সেবক, শ্রমিক-যারা অন্য মানুষদের মতোই মানুষ এবং যাদের দয়া তাদের মালিকদের ওপর রয়েছে; নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে উত্তম ব্যবহারের শিক্ষা দিয়েছেন- সেটা সবার জন্যই অভিন্ন।
হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-তোমরা যা খাও, তাদের তা-ই খাওয়াও! যা তোমরা পরিধান করো, তাদেরও তা-ই পরিধান করাও! আর আল্লাহর সৃষ্টিজীবকে শাস্তির মুখোমুখি কোরো না,[১০৭] আল্লাহ তাআলা যাদেরকে তোমাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। তোমাদের খাদেম, সেবক—তোমাদেরই ভাই। যার ভাই তার দায়িত্বে আছে, তার উচিত সে যা খায় তা-ই যেন তার ভাইকে খাওয়ায়। যা সে পরে, তা-ই যেন তার ভাইকে পরায়। তাদের জন্য এমন কোনো কাজ বাধ্যতামূলক কোরো না, যা তাদের ক্ষমতার বাহিরে। আর যদি এমন করতেই হয়, তবে তার সাথে নিজেও কাজে হাত লাগাও।[১০৮]
হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-এক গ্রাম্য লোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসল এবং জিজ্ঞেস করল, আমি আমার গোলামকে একদিনে কতবার মাফ করব? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সত্তর বার।[১০৯]
আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকেই বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, শ্রমিককে তার শ্রমের মূল্য, তার ঘام শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই পরিশোধ করে দাও![১১০]

টিকাঃ
[৯৯] মুসলিম শরিফ।
[১০০] তিবরানি, এবং হাকেমের ভাষ্যনুযায়ী এই হাদিসটি বোখারির শর্তে সঠিক।
[১০১] সহিহুল বোখারি; কিতাবুল মুসা'কাহ, সহিহুল মুসলিম; বাবু ফাজলু সাকয়ুল বাহায়িম।
[১০২] ইমাম নববি, মুসলিম শরিফের বর্ণনা মতে।
[১০৩] আবু দাউদ।
[১০৪] আবু দাউদ।
[১০৫] মুসলিম শরিফ।
[১০৬] আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ।
[১০৭] বোখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ৩৮।
[১০৮] বোখারি, আবু দাউদ।
[১০৯] তিরমিজি, আবু দাউদ।
[১১০] ইবনে মাজাহ।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য 📄 বিশ্ববিজেতা, পূর্ণতার চিরন্তন নমুনা

📄 বিশ্ববিজেতা, পূর্ণতার চিরন্তন নমুনা


উক্ত গ্রন্থের আলোচনার সমাপ্তিতে উসতাদ হজরত মাওলানা সাইয়িদ সুলায়মান নদবি রহিমাহুল্লাহর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'খুতবাতে মাদ্রাজ'-এর নির্বাচিত ও চয়নকৃত বাক্যমালায় সজ্জিত করা হয়েছে। যেখানে সাইয়িদ সাহেব রহিমাহুল্লাহ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ণতা, বিশ্ববিজয়ী ও অক্ষয় চিরন্তন নমুনা ও সার্বজনীন সকল স্তরের পরিপূর্ণতা—পার্থিব জীবনেরও প্রতিটি স্থানে, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি পেশা এবং কর্মব্যস্ততায়-সর্বোপরি সকলপ্রকার অবস্থানে ময়দান ও মাপকাঠি হিসেবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিপূর্ণ সার্বজনীন জীবনে রয়েছে সহযোগী এবং উত্তম পন্থার পরিচায়ক হিসেবে, যা অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও পরিপূর্ণতার নিরিখে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি লিখেন-
'এমন এক মনুষ্য জীবন, যা মনুষ্য জাতির প্রতিটি দল এবং মনুষ্য প্রবৃত্তির ভিন্ন প্রতিটি দৃষ্টান্ত এবং প্রত্যেক প্রকারের যথার্থ আবেগ এবং পূর্ণতার চরিত্রের রাঙায়িত একত্র-শুধুমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতেই স্থান পেয়েছে। যদি তুমি ধনাঢ্য হও, তবে মক্কার ব্যবসায়ী এবং বাহরাইনের গুদামওয়ালার অনুসরণ করো! যদি তুমি গরিব হও, তবে শুআবে আবি তালিবের বন্দি ও মদিনার মেহমানদের অবস্থা শুনো! যদি তুমি শাসক হও, তবে আরবের সুলতানের অবস্থা পড়ো! যদি তুমি অধীনস্থ হও, তবে কুরাইশের প্রভাবাধীনদের এক পলক দেখো! যদি তুমি বিজয়ী হও, তবে বদর, হুনাইনের সিপাহসালারের দিকে দৃষ্টি রাখো! যদি তুমি বিপর্যস্থ হও, তবে উহুদের লড়াই থেকে শিক্ষা অর্জন করো! যদি তুমি উস্তাদ কিংবা শিক্ষক হও, তবে আহলে সুফফাহর শিক্ষা কেন্দ্রের সম্মানিত শিক্ষককে দেখো! যদি শিষ্য হও, তবে রুহুল আমিনের সামনে বসা লোকের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করো! যদি তুমি ওয়ায়েজ কিংবা নসিহত করো, তবে মসজিদে মদিনার মিম্বারে দাঁড়ানো ব্যক্তির কথা শুনো! যদি তুমি একাকিত্ব কিংবা মানুষের অজান্তে আল্লাহকে ডাকার আবশ্যকতা সম্পন্ন করতে চাও, তবে মক্কার বন্ধু ও সাথিহীন নবির উত্তম আদর্শ তোমার সামনে আছে। যদি তুমি রবের করুণায় নিজ শত্রুদের মাথানত এবং বিরোধীদের দুর্বল করে থাকো, তবে মক্কা বিজয়ীর দৃশ্যায়ন করো! যদি তুমি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দুনিয়াবি কাজে শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা সঠিক বাতায়নে করতে চাও, তবে বনি নাজির, খাইবার এবং ফিদাকের জমিনের মালিকের কারবার এবং শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার দিকে দেখো! যদি তুমি এতিম হও, তবে আবদুল্লাহ ও আমেনার হৃদস্পন্দনকে ভুলো না! যদি ছোট হও, তবে হালিমা সাদিয়া রাদিআল্লাহু আনহার সন্তানকে দেখো! যদি তুমি যুবক হও, তবে মক্কার এক মেষপালকের জীবন অধ্যয়ন করো! যদি তুমি সফররত ব্যবসায়ি হও, তবে বুসরার কাফেলার প্রধানের দৃষ্টান্ত পেশ করো! যদি তুমি আদালতের বিচারক হও বা পঞ্চায়েতের মধ্যস্থতাকারী হও, তবে কাবায় সূর্যের আলো নিপতিত হওয়ার পূর্বে প্রবেশ করা মধ্যস্থতাকারীকে দেখো-যিনি হাজরে আসওয়াদকে কাবার এক প্রান্তে দাঁড় করাচ্ছিলেন। মদিনার কাঁচা মসজিদে বসে থাকা ন্যায় বিচারককে দেখো, যার নিকট রাজা-বাদশাহ, আমির-গরিব সবাই সমান ছিল। যদি তুমি স্ত্রীর স্বামী হয়ে থাকো, তবে হজরত খাদিজা এবং হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহুমার স্বামীর জীবনী অধ্যয়ন করে দেখো! যদি তুমি সন্তানের জনক হও, তবে হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহার পিতা এবং হাসান-হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমার নানার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো! তুমি যা কিছুই হও এবং যেকোনো অবস্থাতেই থাকো, তোমার জীবনের জন্য দৃষ্টান্ত, জীবনাচরণের জন্য সহায়ক এবং জীবন সংস্করণের জন্য সমার্থক ও তোমার অন্ধকার গৃহের জন্য হেদায়েতের আলোকপ্রদীপ এবং সাহায্য-সহযোগিতা-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত ভাণ্ডারে সর্বক্ষণ এবং সর্বাবস্থায় বিদ্যমান পাবে। সেজন্য মনুষ্যত্বের স্তরের প্রতিটি শিক্ষানবিশ এবং ঈমানের নূরের প্রতিটি অনুসন্ধিৎসু কলবের জন্য শুধুমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতের দৃষ্টান্তই মুক্তিদিশা হতে পারে। তাঁর সামনে নুহ ও ইবরাহীম, আইয়ুব ও ইউনুস, মুসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালামের সিরাত বিদ্যমান আছে। যেহেতু সকল নবি আলাইহিমুস সালামের সিরাতই এক অঙ্গের দুটি কানের মতো। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত, চরিত্র ও কর্মপন্থা, দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ বাজার, যেখানে প্রত্যেক জিনিসের ক্রেতা এবং প্রত্যেক জিনিসের অন্বেষার জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দ্রব্য বর্তমান রয়েছে।[১১১]

টিকাঃ
[১১১] খুতবাতে মাদ্রাজ পৃষ্ঠা ৯৬-৯৮।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য 📄 নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী

📄 নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতে অবগাহনকারী ব্যক্তি তাঁকে পাবে অকৃপণ ঝরনার বহমানতায়; মানবমহত্ত্বের সর্বপ্রকারের জন্য যিনি অনুপেক্ষ সমৃদ্ধ এক উৎস। আর এমন হবেই না-বা কেন! তাঁকে তো আল্লাহ তাআলা সমগ্র বনি আদমের মধ্য থেকে নির্বাচন করেছেন, তাঁর মাধ্যমে মোহর এঁটে দিয়েছেন নিজের নবি এবং রাসুলদের আগমন-ধারাবাহিকতায়। তাঁর জীবন ছিল সবচেয়ে বেশি জ্যোতির্ময়। মানবতা নিজের সূচনাতেই, সৃষ্টির প্রথম সকালেই তাঁকে চিনে নিয়েছিল; নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কারণে হয়েছেন আল্লাহর এই বাণীর অধিকারী-
وَ إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী। [সুরা কলাম, আয়াত : ৪]
তাঁর উত্তম চরিত্র ছিল তাঁর নবুওয়্যাতের প্রমাণ; ফলে দেখা গেছে, স্বচক্ষে তাঁর মহান চরিত্র প্রত্যক্ষ করার পর বা তাঁর তিরোধানের পর তাঁর মহান চরিত্রের বিষয়টি অধ্যয়ন করে কিংবা শুনে অগণিত মানুষ ঈমান গ্রহণ করেছে। তাঁর চরিত্র ছিল বাস্তবানুগ—উত্তম চরিত্রের প্রতিটি অধ্যায়ে যা জ্যোতির্ময় হয়ে ফুঠে উঠেছে।
সামনের আলোচনাগুলোতে আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্বের কিছু দিক জানতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px