📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 ধৈর্য, সহনশীলতা ও অসহিষ্ণুতা

📄 ধৈর্য, সহনশীলতা ও অসহিষ্ণুতা


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম চরিত্র, ধৈর্য, সহনশীলতা ও অসহিষ্ণুতার সামনে সমস্ত মনুষ্যজাতীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা পিছিয়ে ছিল বহুগুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
নিশ্চয়ই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।[৭০]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং বলেন –
أدبني ربي فأحسن تأديبي
আমার শিক্ষা আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন এবং উত্তম করে তৈরি করেছেন।
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إن الله بعثني لتمام مكارم الأخلاق وكمال محاسن الافعال
আল্লাহ তাআলা আমাকে উত্তম চরিত্র এবং উৎকৃষ্ট কাজের পূর্ণতা দিয়ে প্রেরণ করেছেন।”[৭১]
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহার কাছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বললেন-
كان خلقه القرآن
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র ছিল কুরআনের বাস্তব নমুনা।
দয়া ও ক্ষমা, সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, অন্তরের প্রশস্ততা এবং ধৈর্যধারণের যে ক্ষমতা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে বিদ্যমান ছিল, সেখানে কোনো বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধির জোর, কবির চিন্তাশক্তি ও ভাবনা পৌঁছাও ছিল অসম্ভব। যদি এই ঘটনাবলিকে বিশেষ এই পদ্ধতিতে উল্লেখ না করা হতো-যা কোনো প্রকার সন্দেহের ঊর্ধ্বে, তবে মনুষ্য মস্তিষ্ক আজ তা গ্রহণ করত না। কিন্তু এই বর্ণনা এমন পরিমাণ সহিহ এবং লাগাতার এমন বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য রাবী থেকে অন্য বিশ্বস্ত রাবীর মাধ্যমে এমন পন্থা ও পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর মাঝে এমন লাগাতার বিশুদ্ধ দলিল পাওয়ার গেছে, যার কারণে-সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক প্রামাণ্য বিষয়ের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি গ্রহণযোগ্য হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। এখানে আমরা তেমনই কিছু ঘটনা বর্ণনা করব।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দয়া, সহনশীলতা, বড় থেকে বড় শত্রুর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং মহানুভবতার এক নমুনা এমন ছিল : যখন মুনাফিকদের সরদার আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলকে[৭২] কবরে নামানো হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হলেন এবং নির্দেশ দিলেন, তাকে কবর থেকে বের করে আনো! এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জানুর ওপর রাখলেন এবং নিজ মুখের লালা তার ওপর লাগালেন এবং নিজ জামা মোবারক তাকে পরিধান করালেন।[৭৩]
হজরত আনাস বিন মালেক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হাঁটছিলাম। নজরানের একটি চাদর সে সময় نবিজির গায়ে সজ্জা করে ছিল-যার কেনারা ছিল পুরু। রাস্তায় এক গ্রাম্য ব্যক্তি নবিজির দেখা পেল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদর মোবারকে জোরে টান দিল। আমি মাথা উঁচিয়ে দেখলাম, চাদর টানার কারণে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গলায় দাগ পড়ে গিয়েছে। তারপর সেই গ্রাম্য লোকটি বলল- হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর যে সম্পদ তোমার কাছে ছিল, সেটা আমাকে নেওয়ার অনুমতি দাও! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে ফিরে তাকালেন এবং হেসে ফেললেন। অতঃপর বললেন, এটা তাকে দিয়ে দেওয়া হোক! [৭৪]
জায়েদ বিন সা'নাহ (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) রাদিআল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলেন এবং ঋণের টাকা ফেরত চাইলেন, যা তিনি তার থেকে গ্রহণ করেছিলেন। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধ মোবারকের কাপড় ধরে জোরে টানলেন, এবং কঠিন ভাষায় কথা বললেন। তারপর বললেন- তুমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর, বড়ই টালবাহানা করো। উমর রাদিআল্লাহু আনহু তাকে ধমকালেন, এবং উঁচু গলায় কথা বললেন। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা দীপ্তিময় ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাদিআল্লাহু আনহুকে বললেন- উমর, আমি এবং সে ব্যক্তি, উভয়ই তোমার নিকট অন্য কাজের হকদার ছিলাম। আমাকে তুমি ঋণ দ্রুত পরিশোধের পরামর্শ দিতে এবং তাকে নরম ভাষায় কথা বলার পরামর্শ দিতে। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঋণ পরিশোধের এখনো তিনদিন বাকি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাদিআল্লাহু আনহুকে সে ঋণ পরিশোধের আদেশ দিলেন এবং বিশ সা' অতিরিক্ত আদায় করতে বললেন—এটা উমর রাদিআল্লাহু আনহুর তাকে ভীত করার বিনিময় ছিল। আর এই কথাই তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে গেল। [৭৫]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : একবার মক্কার আশি জন অস্ত্রে সজ্জিত লোক 'তানঈম পর্বত' থেকে হঠাৎই নেমে আসল এবং ধোঁকায় ফেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষতি করতে চাইল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সকলকেই বন্দি করেলেন এবং জীবিত থাকতে দিলেন। [৭৬]
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নজদের দিকে সেনা অভিযানে ছিলাম। রাস্তায় দুপুর হয়ে এল এবং বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভূত হলো। এই এলাকায় অধিক পরিমাণে তৃণলতা ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বাবল গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করলেন এবং নিজ তরবারি তাতে ঝুলিয়ে রাখলেন। বাকিরাও বিভিন্ন গাছের ছায়ায় নিজেদের বিশ্রাম দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এই অবস্থায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ডাকলেন, আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। সেখানে এক গ্রাম্য ব্যক্তিকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বসা দেখলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আমি ঘুমিয়েছিলাম, এই ব্যক্তি আসল এবং আমার তরবারি ছিনিয়ে নিল। আমি জাগ্রত হয়ে দেখলাম সে তরবারি নিয়ে আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে বলল- তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারবে? আমি বললাম- আল্লাহ তাআলা। সে তরবারি কোষবদ্ধ করে নিল।"[৭৭] তারপর সে বসে পড়ল। আর এই হলো সে ব্যক্তি- যে তোমাদের সামনে বসে আছে। বর্ণনাকারী বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোনো শাস্তি দেননি।[৭৮]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নম্রতা, সহনশীলতার এই অবস্থান, সকল সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুমের নম্রতা মিলিয়েও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমকক্ষ ছিল না। অথচ সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন নম্রতা, ভদ্রতা, সহনশীলতার পূর্ণ সংমিশ্রণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থান সে সমস্ত বিষয়ে সকলের জন্য এক বন্ধুবর শিক্ষক, দয়ালু-মেহেরবান শুভাকাঙ্ক্ষী ও অভিভাবক ছিলেন। তার একটি নমুনা হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহুর বর্ণনায় আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি বলেন: একবার এক গ্রাম্য লোক মসজিদে পেশাব করে দিল। এটা দেখে লোকেরা তার ওপর হামলে পড়ল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও এবং যেখানে সে পেশাব করেছে সেখানে এক বালতি বা কয়েক বালতি পানি ঢেলে দাও, এবং স্মরণ রেখো, তোমাদের সহজাত নম্রতা সৃষ্টির জন্য পাঠানো হয়েছে। সংকীর্ণতা ও কঠোরতা তৈরি করতে পাঠানো হয়নি।[৭৯]
মুআবিয়া বিন হাকাম রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নামাজ পড়ছিলাম। এক ব্যক্তির হাঁচি আসল, আমি বললাম 'অ্যায়ারহামুকাল্লাহ'। লোকেরা এটা শুনে আমাকে দেখতে লাগল। আমি বললাম, তোমাদের মা তোমাদের জন্য কান্না করুক। কী এমন হয়েছে, যার জন্য তোমরা আমাকে এমন বাঁকা দৃষ্টিতে দেখছ? এটা শুনে লোকেরা নিজেদের জানুর ওপর আঘাত করতে লাগল। যখন আমি বুঝলাম আমাকে চুপ করতে ইশারা করা হচ্ছে, আমি চুপ হয়ে গেলাম।
যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ শেষ করলেন-আমার মা-বাবা তাঁর ওপর কুরবান হোক! আমি না নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে, তাঁর মতো কোনো অভিভাবক ও শিক্ষক পেয়েছি, আর না নবিজির পরে কেউ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে না ধমকালেন, না মারলেন আর না কোনো কঠিন ভাষা ব্যবহার করলেন। শুধুমাত্র এটুকু বললেন, নামাজে সাধারণ মনুষ্যসুলভ কথা বলার অনুমতি নেই। নামাজ শুধু তাসবিহ, তাকবির ও কোরআন তেলাওয়াতের জন্য।[৮০]
হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব দয়ালু ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর নিকট যদি কোনো প্রয়োজনগ্রস্ত আসত, তিনি অবশ্যই তার সাথে ওয়াদা করতেন এবং কিছু থাকলে তখনই তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিতেন। একবার তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন, এক গ্রাম্য লোক এগিয়ে আসল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাপড় ধরে বলতে লাগল, আমার একটি সাধারণ প্রয়োজন থেকে গেছে। আমার ভয় হচ্ছে, আমি আবার তা না ভুলে যাই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে গেলেন। যখন লোকটির কাজ সম্পন্ন হলো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় আসলেন এবং নামাজ আদায় করলেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, প্রশস্ততা এবং ধৈর্য ও শ্রেষ্ঠত্বের নমুনা সম্পর্কে নবিজির খাদেম হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু সাক্ষ্য সে সময় দিয়েছিলেন, যখন তিনি অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন : আমি দশবছর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমত করেছি। না তিনি কখনো 'হু' শব্দ ব্যবহার করেছেন, না কখনো বলেছেন সে কাজ তুমি কেন করলে না, বা সে কাজ তুমি কেন করলে?” [৮১]
হজরত সাদ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হলাম। তখন আমার কাপড়ে জাফরান ছড়ানো সুগন্ধির আলামত ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখে বললেন- নিক্ষেপ করো, এবং আমার পেটে একটি ছড়ি দিয়ে মারলেন, যা দ্বারা আমি ব্যাথা অনুভব করলাম। আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার কেসাসের অধিকার আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেট থেকে কাপড় সরিয়ে নিলেন এবং বললেন, কেসাস নিয়ে নাও![৮২]

টিকাঃ
[৭০] সূরা কলম।
[৭১] শরহুস সুন্নাহ, মিশকাতুল মাসাবিহ।
[৭২] নবম হিজরিতে তাবুক থেকে ফেরার পথে তার মৃত্যু হয়।
[৭৩] সহিহুল বোখারি।
[৭৪] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল জিহাদ।
[৭৫] বায়হাকির বর্ণনা অনুযায়ী।
[৭৬] সহিহুল মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ।
[৭৭] এখানে 'শামাহ' শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এটার দুটি অর্থ হতে পারে, যেমন: 'তিনি তরবারি কোষবদ্ধ করে নিলেন।' আর এই অর্থও হতে পারে, 'তিনি তরবারি বের করলেন এবং তা দেখলেন।'
[৭৮] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি।
[৭৯] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল অজু।
[৮০] সহিহুল মুসলিম, বাবে তাহরিমুল কালামি ফিস-সালাত।
[৮১] সহিহুল মুসলিম, নবিজি সা. এর উত্তম চরিত্র সম্পর্কিত অধ্যায়ে।
[৮২] কিতাবুশ শিফা। অবগত হওয়া উচিত, সাদ রা. এটা মজার ছলে বলেছিলেন, কেসাস নেওয়ার জন্য নয়।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 নবিজির বিনয়

📄 নবিজির বিনয়


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে বিনয় ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। কিন্তু তিনি কোনো জিনিসে সুখ্যাত ও সুপরিচিত হওয়াকে পছন্দ করতেন না, আর না এমন করাকে ভালো ভাবতেন—লোকেরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য দাঁড়িয়ে থাকুক এবং তাঁর প্রশংসায় অতিরঞ্জন করে কোনো স্বার্থ হাসিল করুক—যেমনটা পূর্বেকার উম্মতরা তাদের নবির সাথে করেছিল, অথবা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবদিয়্যাত (আল্লাহর বান্দা) ও রিসালাতের স্তর থেকে উঁচুতে তুলে ফেলুক!
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমাদের কাছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো কিছু ছিল না। আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতাম, কিন্তু এই ধারণায় দাঁড়াতাম না—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা পছন্দ করবেন না।[৮৩]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হলো— হে সৃষ্টিজীবের সেরা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা হজরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্থান।[৮৪]
হজরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার সামনে এভাবে আমার প্রশংসা অতিরঞ্জন করো না, যেভাবে খ্রিস্টানরা ঈসা বিন মারয়ামের সামনে করত। আমি তো শুধুমাত্র একজন গোলাম। তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং তার রাসুল বলো।[৮৫]
হজরত আবদুল্লাহ বিন আবি আওফা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে কোনো লৌকিকতা বা লজ্জা হতো না, কোনো গোলাম অথবা বিধবার সাথে চলতে—তাদের প্রয়োজন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত।[৮৬]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : মদিনার পরিচারিকা, ক্রীতদাসীদের কেউ নবিজির হাত ধরে নিত এবং যা কিছু বলার, বলত এবং যতদূর নিয়ে যাওয়ার, নিয়ে যেত।[৮৭]
আদি বিন হাতেম তাঈ রাদিআল্লাহু আনহু যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন, নবিজি তাঁকে নিজ ঘরে ডাকলেন। বাঁদি হেলান দেওয়ার জন্য বালিশ দিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকে নিজের এবং আদির মাঝে রেখে দিলেন এবং নিজে জমিনেই বসে পড়লেন। হজরত আদি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, আমি এর থেকে বুঝে গেলাম-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাদশাহ নন।[৮৮]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থদের শুশ্রুষা করতেন, জানাযায় অংশ নিতেন এবং গোলামের দাওয়াত গ্রহণ করতেন।[৮৯]
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুর্বলদের জন্য নিজের গতি শ্লথ করে দিতেন এবং তাদের জন্য দুআ করতেন।[৯০]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘমের রুটি এবং স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়া তরকারির আমন্ত্রণ হলেও তা গ্রহণ করতেন।”[৯১]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকেই বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- আমি গোলাম, গোলামদের মতোই খাই এবং তাদের মতোই বসি।[৯২]
হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নিকট উপস্থিত হলেন, আমি ছালের তৈরি চামড়ার বালিশ নবিজির সামনে উপস্থাপন করলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটিতে বসে পড়লেন এবং আমার ও তাঁর মাঝে বালিশটি রেখে দিলেন।[৯৩]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই ঘর পরিষ্কার করতেন, উট বাঁধতেন এবং পশুও নিজে চড়াতেন। নিজের খাদেমের সাথে খাবার সমান ভাগ করে নিতেন এবং আটা পেষার কাজে তার সহযোগী হতেন। বাজার থেকে সদাইও নিজে আনতেন।[৯৪]

টিকাঃ
[৮৩] তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ ৩/১৩২।
[৮৪] সহিহুল মুসলিম, কিতাবুল ফাদ্বায়িল।
[৮৫] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল আম্বিয়া।
[৮৬] বায়হাকি।
[৮৭] মুসনাদে আহমাদ ৩/১৯৮-২১৫।
[৮৮] জাদ্দুল মাআদ ১/৩৪।
[৮৯] শামায়েলে তিরমিজি।
[৯০] আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব লিল-মুনজারি।
[৯১] শামায়েলে তিরমিজি, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিনয় অধ্যায়, মুসনাদে আহমাদ ৩/২১১-২৮৯।
[৯২] কিতাবুশ শিফা।
[৯৩] আল-আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ১৭২।
[৯৪] কিতাবুশ শিফা পৃষ্ঠা ১০১, বোখারির বর্ণনা থেকে।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 বীরত্ব, বাহাদুরি ও লজ্জা-শরম

📄 বীরত্ব, বাহাদুরি ও লজ্জা-শরম


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতে বীরত্ব, বাহাদুরি ও লজ্জা-শরমের (যেগুলোকে লোকেরা পরস্পর বিরোধী ভাবে) একই নমুনা ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লজ্জা শরমের বিষয়ে হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্দানিশীন কুমারি নারীর চেয়ে অধিক লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো জিনিস অপছন্দনীয় হতো, তার প্রভাব নবিজির চেহারার মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়ে যেত।[৯৬]
তিনি লজ্জা-শরমের কারণে কাউকে এমন কিছু বলতেন না, যা তার কাছে অপছন্দনীয় হয়। সুতরাং এই দায়িত্ব অন্য কাউকে অর্পণ করতেন। হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: নবিজির মজলিসে একজন লোক ছিল, যার কাপড়ের অধিকাংশ সোনালী রঙের ছিল। যেহেতু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরমের কারণে কাউকে তার অপছন্দনীয় কাজের কথা বলতে পারতেন না—সেজন্য যখন সে দাঁড়াল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের বললেন, ভালো হতো তোমরা তাকে বলতে, সোনালী রঙের পোশাক পরিধান ছেড়ে দিতে।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন : যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো খারাপ কাজের সংবাদ পেতেন, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম নিয়ে বলতেন না—এমন কেন করলে? বরং তিনি বলতেন, লোকেদের কী হয়ে গেল যে, তারা এমন করছে! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সে কাজের বিরোধিতা করতেন ঠিকই, কিন্তু সে লোকের নাম উল্লেখ করতেন না।[৯৬]
বীরত্ব ও বাহাদুরি সম্পর্কে যতটুকু বলার- শেরে খুদা, হজরত আলী মুরতাজা রাদিআল্লাহু আনহুর সাক্ষ্যই তার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন: যখন রণক্ষেত্র উত্তপ্ত হয়ে উঠত এবং মনে হতো চোখ তার কুঠোরি থেকে বেরিয়ে আসবে, সে সময় আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তালাশ করতাম তার ছায়ায় আশ্রয় নিতে। কিন্তু আমরা দেখতাম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে শত্রুর নিকটবর্তী আর কেউ নেই। বদরের যুদ্ধে আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল-আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে অবস্থান করছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদের চেয়েও দুশমনের নিকটবর্তী ছিলেন।[৯৭]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব থেকে সুন্দর, সুশ্রী এবং শ্রেষ্ট দানবীর, উদার এবং বীরত্ব ও সাহসীকতায় শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ছিলেন। এক রাতে মদিনাবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল এবং যেদিক থেকে আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, লোকেরা সেদিকে এগিয়ে গেল। পথিমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফিরে আসতে দেখলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আওয়াজ শুনে তাদের আগেই সেদিকে গিয়েছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সময় আবু তালহা রাদিআল্লাহু আনহুর ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। তাতে জিনও বাঁধা ছিল না। তরবারি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধে ঝুলছিল। তিনি ঘোড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে বললেন, আমি এটাকে সমুদ্রের মতো পেয়েছি- দীপ্ত গতিসম্পন্ন। [৯৮]
উহুদ ও বদরের যুদ্ধে যখন বড় থেকে বড় বাহাদুর এবং সাহসীরা এদিক সেদিক পলায়নরত ছিল এবং ময়দান ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সে সময়ও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ খচ্চরের ওপর অনড়, অটল ছিলেন প্রশান্ত মনে। মনে হচ্ছিল যেন কোনোকিছুই হয়নি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কবিতাও পড়ছিলেন-
أنا النبي لا كذب ، أنا ابن عبدالمطلب
আমি নবি, এটা কোনো মিথ্যা নয়, আর আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।

টিকাঃ
[৯৫] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মানাকিব, ছিফাতুন নাবি অধ্যায়।
[৯৬] সুনানে আবি দাউদ。
[৯৭] কিতাবুশ শুফা, পৃষ্ঠা ৮৯।
[৯৮] আল-আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ৪২।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 স্নেহ ভালোবাসা ও সাধারণ দয়া

📄 স্নেহ ভালোবাসা ও সাধারণ দয়া


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বীরত্ব বাহাদুরির সাথে সাথে তিনি ছিলেন সীমাহীন কোমল মনের অধিকারী। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ দ্রুতই আদ্র ও অশ্রুসিক্ত হয়ে যেত। দুর্বল মানুষ ও প্রাণহীন বাকরুদ্ধ জানোয়ারের সাথেও তিনি উত্তম ব্যবহারের আদেশ করতেন। হজরত শাদ্দাদ বিন আউস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের সাথে সুন্দর ব্যবহারের আদেশ করেছেন। সেজন্য জবেহ করলেও ভালোভাবে করবে। তোমাদের মধ্যে যে জবাই করতে চায়, সে যেন তার ছুরিকে ধারালো করে নেয় এবং জবেহকৃত পশুকে আরাম দেয়![৯৯]
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি একটি বকরিকে জবেহ করার জন্য মাটিতে শুয়াল, এরপর ছুরি ধার দিতে শুরু করল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা দেখে বললেন, তুমি কি তাকে দুবার হত্যা করতে চাও? তাকে শুয়ানোর পূর্বেই কেন চুরি ধারালো করে নিলে না? [১০০]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে পশুদের খাদ্যপানি দেওয়ার আদেশ করেছেন এবং তাদেরকে পেরেশান করতে অথবা তাদের দ্বারা অন্যায্য বোঝা বহন করানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা করেছেন। জন্তু-জানোয়ারের কষ্ট দূর করা এবং আরাম দেওয়ার বিনিময়ে সওয়াব পাওয়ার এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের ঘোষণা করেছেন। পশুর মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার বর্ণনা করেছেন। হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : এক ব্যক্তি কোথাও সফরে ছিল। পথিমধ্যে তার কঠিন পিপাসা লাগল। সম্মুখেই একটি কূপ দৃষ্টিগোচর হলো। সে তাতে নেমে পড়ল। যখন কূপ থেকে বের হয়ে আসল, একটি কুকুরকে পিপাসায় কাদা চাটতে দেখল। সে মনে মনে অনুভব করল, পিপাসায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল, এরও হয়তো এমন হয়েছে। লোকটি পুনরায় কূপে অবতরণ করল, নিজ চামড়ার মোজা পানি দিয়ে ভরাট করল, এরপর দাঁত দিয়ে ধরে ওপরে তুলল এবং কুকুরকে খাওয়াল। আল্লাহ তাআলা তার এই আমলকে কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল-ইয়া রাসুলুল্লাহ, অন্য এমন পশুর বিষয়েও কি এই বিনিময় পাব? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, প্রত্যেক ওই সৃষ্টজীব, যে সজীব প্রাণের অধিকারী—তার জন্য বিনিময় পাবে।[১০১]
হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, একজন নারীকে শুধু এজন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কেননা সে তার বিড়ালকে দানাপানি দেয়নি এবং তাকে ছেড়ে দিয়েছে-যাতে সে পোকামাকড়ের মাধ্যমেই নিজ উদর পুর্তি করে।[১০২]
হজরত সুহাইল বিন আমর রাদিআল্লাহু আনহু (অন্য বর্ণনায় সুহাইল বিন রবিআ বিন আমর রা.) বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি উটের ওপর সফর করছিলেন, যার পিঠ দুর্বলতার কারণে পেটের সাথে মিশে যাচ্ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই বাকশক্তিহীন পশুর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো! তাদের ওপর আরোহন করো ঠিকঠাকমতো। জবেহ করে তাদের গোস্ত ব্যবহার করতে হলে-এমনভাবে করো, যাতে সে ভালো অবস্থায় থাকে।[১০৩]
হজরত আবদুল্লাহ বিন জাফর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক আনসারির চৌহদ্দিতে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট ছিল। যখন উটটি নবিজিকে দেখল ছটফট করতে শুরু করল এবং তার চোখ থেকে পানি প্রবাহিত হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটটির কাছে গেলেন এবং তার কুঁজ ও গর্দানে নিজ মোবারক হাত বুলাতে লাগলেন। এতে করে উটটি শান্ত হয়ে গেল। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এই উটের মালিক কে? এক আনসারি যুবক বললেন—ইয়া রাসুলুল্লাহ, এটা আমার উট। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে জানোয়ারের মালিক করেছেন, সে জানোয়ারের ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় পাও না। সে আমার কাছে অভিযোগ করছে, তুমি তাকে কষ্ট দাও এবং সবসময় কাজে ব্যস্ত রাখো।[১০৪]
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যদি তোমরা কোনো সবুজ মাঠে যাও, তবে জমিন থেকে তাদের অধিকার নষ্ট কোরো না, আর যখন কোনো শুষ্ক ভূমিতে যাও-তখন তোমাদের উটকে দ্রুতগামী কোরো। রাতে ছাউনি স্থাপন করতে চাইলে, রাস্তায় কোরো না-কেননা সেখানে জন্তু- জানোয়ারের আসা যাওয়া চলতে থাকে এবং পোকামকড়েরা অবস্থান নেয়।[১০৫]
হজরত ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এক সফরে ছিলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো এক প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরে গেলেন। সেখানে আমরা একটি ছোট পাখি দেখলাম, সাথে দুটি ছানাও ছিল। আমরা দুটি ছানাকে নিয়ে নিলাম। পাখিটি এটা দেখে নিজের ডানা ঝাপটাতে লাগল। ইতোমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কে তার বাচ্চাকে ছিনিয়ে তাকে কষ্ট দিল? অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ করলেন, তার ছানাকে ফেরত দাও! সেখানে আমরা পিঁপড়ার একটি জনপদ দেখতে পেলাম এবং তা জ্বালিয়ে দিলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা কে করেছে? আমরা বললাম, আমরা করেছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আগুনের শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই আছে।[১০৬]
খাদেম, সেবক, শ্রমিক-যারা অন্য মানুষদের মতোই মানুষ এবং যাদের দয়া তাদের মালিকদের ওপর রয়েছে; নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে উত্তম ব্যবহারের শিক্ষা দিয়েছেন- সেটা সবার জন্যই অভিন্ন।
হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-তোমরা যা খাও, তাদের তা-ই খাওয়াও! যা তোমরা পরিধান করো, তাদেরও তা-ই পরিধান করাও! আর আল্লাহর সৃষ্টিজীবকে শাস্তির মুখোমুখি কোরো না,[১০৭] আল্লাহ তাআলা যাদেরকে তোমাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। তোমাদের খাদেম, সেবক—তোমাদেরই ভাই। যার ভাই তার দায়িত্বে আছে, তার উচিত সে যা খায় তা-ই যেন তার ভাইকে খাওয়ায়। যা সে পরে, তা-ই যেন তার ভাইকে পরায়। তাদের জন্য এমন কোনো কাজ বাধ্যতামূলক কোরো না, যা তাদের ক্ষমতার বাহিরে। আর যদি এমন করতেই হয়, তবে তার সাথে নিজেও কাজে হাত লাগাও।[১০৮]
হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-এক গ্রাম্য লোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসল এবং জিজ্ঞেস করল, আমি আমার গোলামকে একদিনে কতবার মাফ করব? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সত্তর বার।[১০৯]
আবদুল্লাহ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকেই বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, শ্রমিককে তার শ্রমের মূল্য, তার ঘام শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই পরিশোধ করে দাও![১১০]

টিকাঃ
[৯৯] মুসলিম শরিফ।
[১০০] তিবরানি, এবং হাকেমের ভাষ্যনুযায়ী এই হাদিসটি বোখারির শর্তে সঠিক।
[১০১] সহিহুল বোখারি; কিতাবুল মুসা'কাহ, সহিহুল মুসলিম; বাবু ফাজলু সাকয়ুল বাহায়িম।
[১০২] ইমাম নববি, মুসলিম শরিফের বর্ণনা মতে।
[১০৩] আবু দাউদ।
[১০৪] আবু দাউদ।
[১০৫] মুসলিম শরিফ।
[১০৬] আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ।
[১০৭] বোখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ৩৮।
[১০৮] বোখারি, আবু দাউদ।
[১০৯] তিরমিজি, আবু দাউদ।
[১১০] ইবনে মাজাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00