📄 পরিবারের সাথে
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে একজন সাধারণ মানুষের মতোই থাকতেন। যেমন উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ পরিচ্ছদ নিজেই পরিষ্কার করতেন। বকরির দুধ নিজেই দহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই সম্পাদন করতেন। তারপর তিনি বললেন- কাপড়ে নিজেই তালি লাগাতেন, নিজেই জুতা গাঁট দিতেন-এভাবে নিজের অন্যান্য কাজও সারতেন।[৫৪] হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহাকে প্রশ্ন করা হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে কীভাবে থাকতেন? তিনি জবাব দিলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের কাজকর্মে শরীক হতেন। আর যখন নামাজের সময় হয়ে যেত নামাজের জন্য বাহিরে চলে যেতেন।[৫৩]
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই জুতা ঠিক করতেন, নিজেই কাপড় সেলাই করে নিতেন-যেভাবে তোমরা ঘরের কাজ করে নাও।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে কোমল ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন, সবসময় তাঁর মুখে হাসি লেপ্টে থাকত।[৫৫]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমি এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি, যে তার পরিবারের বিষয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক দয়ালু ও রহমদিল ছিল।[৫৬]
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম- যে তার পরিবার পরিজনের নিকট অধিক প্রিয়। আর আমি নিজ পরিবার পরিজনের নিকট তোমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়।”[৫৭]
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কোনো খাবারের দোষ বর্ণনা করেননি। খেতে ইচ্ছে হলে খেয়ে নিতেন, পছন্দ না হলে রেখে দিতেন।[৫৮]
বিপদ-আপদে সামনে, সম্মান ও প্রাপ্তিতে পিছিয়ে
নিজ পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, নৈকট্যপ্রাপ্তদের সাথে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্ধারিত ব্যবহারবিধি এমন ছিল : যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যতটা নিকটবর্তী হতো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিপদ-আপদে তাকে সে পরিমাণ এগিয়ে রাখতেন এবং পুরস্কার, সম্মান আর গণিমতের বণ্টনে ঠিক ততটাই পিছিয়ে রাখতেন।
যখন উতবাহ বিন রবিআহ, শায়বা বিন রবিআহ এবং ওয়ালিদ বিন উতবাহ (যারা আরবের নামকরা বাহাদুর আর যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত ছিল) বদরের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীকে উত্তেজিত করে তুলছিল এবং সমকক্ষ যুদ্ধবাজদের আহ্বান করছিল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত হামজা, হজরত আলি এবং হজরত উবাইদা রাদিআল্লাহু আনহুমকে তলব করলেন এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেরণ করলেন। অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরবের সেসব যুদ্ধংদেহীদের ব্যাপারে পূর্ণ অবগত ছিলেন। মুহাজিরিনে কেরামের মাঝে এমন অনেক যুদ্ধবাজ লড়াকু সাহাবী ছিলেন, যারা আরবের সেসব যুদ্ধবাজদের মুখোমুখি হওয়ার পূর্ণ যোগ্যতা রাখতেন। বনি হাশেম গোত্রের এই জানবাজদের সকলেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রক্তের সম্পর্কের এবং সবচেয়ে কাছের লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য অপর কাউকে বিপদে ফেলেননি, বরং তাদেরকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা, তিনি তাদেরকে দুশমনের ওপর জয় দান করেছেন এবং তাদের বিজয়ী রূপে সম্মানিত করেছেন। হজরত হামজা, হজরত আলি রাদিআল্লাহু আনহুমা বিজয়ী এবং সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছেন, আর হজরত উবায়দা রাদিআল্লাহু আনহুকে বিজয়ী তবে আহত অবস্থায় আনা হয়।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সুদকে হারাম এবং জাহেলিয়াতের রক্তের বদলাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন, তখন তার শুরুতে নিজ চাচা হজরত আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব রাদি., এবং ভাতিজার (রবিআহ বিন হারেস বিন আবদুল মুত্তালিবের পুত্র) বিষয়ে বলেন।
বিদায় হজের ভাষণে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: 'জাহেলিয়াতের সময়কার সুদ আজ শেষ এবং বিলুপ্ত ঘোষিত হলো, এবং প্রথম সুদ যা আমি বিলুপ্ত করছি, সেটা আমার চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। জাহেলিয়াতের সময়কার রক্তের বদলাও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো, আর সেটা আমার ভাতিজার (রবিআহ বিন হারেসের ছেলে) রক্ত।”[৫৯]
সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশের ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য সাধারণ শাসক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বিপরীতে নিজ নৈকট্যপ্রাপ্তদের সবসময় পিছিয়ে রাখতেন এবং অন্যদের তাদের বিপরীতে প্রাধান্য দিতেন। হজরত আলি রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহার চাক্কি চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা খবর পেলেন, নবিজির দরবারে কিছু বাঁদি এসেছে। তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন এবং প্রার্থী হলেন-যাতে সেখান থেকে কোনো বাঁদি তার সাহায্য সহযোগিতার জন্য মিলে যায়। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আর সেখানে উপস্থিত হননি। সেজন্য হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা, হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহার নিকট বাঁদির বিষয়ে কথা বললেন, আর হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা নবিজির সাথে সে বিষয়ে কথা বললেন। সুতরাং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের এখানে আগমন করলেন। সে সময় আমরা ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়েছিলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে আমরা দাঁড়াতে চাইলাম, কিন্তু তিনি বললেন- থামো! আমি আমার বুকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পা মোবারকের শীতলতা অনুভব করলাম। তিনি বললেন: আমি কি তোমাদের চাওয়া জিনিসের চেয়ে উত্তম জিনিসের সংবাদ দেবো না? যখন তোমরা ঘুমানোর জন্য বিছানা গ্রহণ করবে ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ পড়বে। এটা তোমাদের জন্য সে জিনিস থেকে উত্তম হবে- যে জিনিসের প্রার্থনা তোমরা আমার কাছে করেছ।[৬০]
অন্য একটি বর্ণনায় ঘটনার সাথে এটাও যুক্ত করা হয়েছে : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন- আল্লাহর কসম, আহলে সুফফার সদস্যদের পেট ক্ষুধার তাড়নায় পিঠের সাথে লেগে যাচ্ছে—এই অবস্থায় আমি তোমাদের কিছুই দিতে পারব না। আমার কাছে তাদের জন্য খরচ করার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমি এগুলো বিক্রি করে, বিক্রয়মূল্য আহলে সুফফার ওপর ব্যয় করব।”[৬১]
কোমল উপলব্ধি ও আবেগের যথাযথ মর্যাদা
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতে নবুওয়ত ও হকের দাওয়াতের মহিমান্বিত দায়িত্ব, মনুষ্যজাতীর দুঃখ দুর্দশা, অবারিত দুশ্চিন্তা নিরাশার সাথে জীবন অতিবাহিত করা-পাথরের জন্যও সম্ভব ছিল না। তাঁর মনুষত্বের কোমল অনুভব, পবিত্র ও শ্রেষ্ঠতম আবেগ, গোটা জমিন ও জলভাগের জন্য প্রদর্শনীয় অংশ হয়ে আছে। এই মহামূল্যবান গুণাগুণ, দৃঢ় প্রত্যয়-যা আম্বিয়ায়ে কেরام আলাইহিমুস সালামের রীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আর তা আল্লাহর পথের দাওয়াহ ও একত্ববাদের আহ্বান পৌঁছানোর পথে এবং এর দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে অন্য কোনো বস্তুকে না পরওয়া করে, আর না কোনো বিষয়কে বিশেষ মূল্যায়ন করে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সকল বিশ্বস্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হতাশ করেননি, যারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতে লাব্বাইক বলে তার সঙ্গী হয়েছিল, হকের পথে নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছিল, উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে চিরন্তন জীবনের সফলতা অর্জন লাভ করেছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কথা প্রায়ই আলোচনা করতেন, তাদের জন্য নিয়মিত দুআ করতেন এবং তাদের পাশে উপস্থিত হতেন।
এই ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা মনুষ্যদেহ ছাড়িয়ে সেসব জড়প্রদার্থ বে-জান পাথর, পাহাড় এবং উঁচুনিচু উপাত্যকা ছাড়িয়ে এমন কোনো জায়গা বাকি রাখেনি, যেখানে ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ-তিতিক্ষার এই মনোহর দৃশ্য অবলোকন করেনি। সৌভাগ্য সে জায়গার, যারা তা অবলোকন করতে পেরেছিল। হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ পর্বতকে দেখে বললেন, এটা সেই পাহাড়, যা আমাদের ভালোবাসে এবং আমরা যাকে ভালোবাসি।[৬২]
হজরত আবু হামিদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলাম। যখন আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা মদিনায়ে মুনাওয়ারা, আর ওটা ওই পাহাড়-যা আমাদের ভালোবাসে, যাকে আমরা ভালোবাসি। [৬৩]
হজরত উকবাহ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন আহলে উহুদের নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাদের জন্য মাগফেরাতের দুআ করলেন। [৬৪]
হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি দেখেছি, যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আহলে উহুদের বিষয়ে আলোচনা করা হলো, তখন নবিজি আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আল্লাহর কসম, আমারও ইচ্ছা ছিল যে উহুদের শহিদদের সাথে আমিও পাহাড়ের গিরিপথে অবস্থান নেব। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের প্রিয়তম চাচা এবং দুধ ভাইয়ের শাহাদাতের মানসিক আঘাত (যারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসত ও বিশ্বাস করত এবং ইসলামের সাহায্য, সহযোগিতায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিল, এবং তাদের মৃতদেহের সাথে এমন দুর্ব্যবহার করা হয়েছিল, যা অন্য কারো সাথে করা হয়নি) আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের একনিষ্ঠ ধৈর্য ধারণের ক্ষমতায় সহ্য করতে পেরেছিল। কিন্তু যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ থেকে মদিনায় ফেরার সময় বনি আবদুল আশহালের বসতি অতিক্রম করছিলেন এবং তাদের শহিদদের জন্য কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন; এই দৃশ্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনুষ্য অনুভূতিকে বিদীর্ণ করে দিল, এবং আখিদ্বয় অশ্রুশিক্ত হয়ে গেল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'কিন্তু হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর জন্য অশ্রুপ্রবাহের কেউ নেই।' [৬৫]
মনুষ্য অনুভূতির এই উঁচুমাপের অনুভব ও আবেগ, নবুওয়ত ও ইসলামের দাওয়াহ পৌঁছানোর কঠিন দায়িত্ব ও আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমারেখা রক্ষার ব্যাপারে তিনি কখনো কোনো খামখেয়ালি করেননি। সিরাত গবেষক ও ঐতিহাসিকরা বলেন, যখন সাদ বিন মুআজ, আসইয়াদ বিন হাজির রাদিআল্লাহু আনহুমা বনি আশহালের বসতিতে ফেরত আসলেন, তাদের পরিবারের নারীদের বললেন- তৈরি হয়ে নাও এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা সাইয়্যিদুনা হজরত হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর জন্য মাতম করো-সে নারীরা তেমনই করল। যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন, তখন তাদের মসজিদে নববির দরজায় কান্নারত পেলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন! ঘরে ফিরে যাও, তোমাদের এখানে আগমনই দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্য একটি বর্ণনায় এটাও পাওয়া যায়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হলো, আনসারি রাদিআল্লাহু আনহুমা নিজেদের মহিলাদের কী উদ্দেশ্যে এখানে পাঠিয়েছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের জন্য আল্লাহ তাআলার দয়া ও মেহেরবাণীর দুআ করলেন। সুন্দর বাক্যে তাদের ডাকলেন এবং বললেন, আমার 'এটা উদ্দেশ্য ছিল না। আমি মৃতব্যক্তির ওপর রোনাজারি পছন্দ করি না। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কান্না করতে নিষেধ করলেন। [৬৬]
এরচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি, শেরে খোদা সায়্যিদুনা হজরত হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর হন্তারক ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহু যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখোমুখি হলেন। মুসলমানরা যখন মক্কা বিজয় করে নিলেন-পৃথিবী তখন ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহুর জন্য অন্ধকার হয়ে উঠল এবং পথ সংকীর্ণ হয়ে গেল। তার ওপর অদৃশ্য বিপদ-আপদ তৈরি হয়ে গেল। তিনি শাম, ইয়ামান এবং অন্য প্রদেশে পলায়নের ইচ্ছা করলেন। তাকে লোকেরা বলল- সরল মানুষ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কোনো লোককে হত্যা করেন না, যে তাঁর ধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছে। তিনি লোকেদের কথায় অশ্বস্ত হলেন এবং কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন। মুসলমান হওয়ার পর যখন তিনি প্রথমবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ইসলামগ্রহণকে স্বীকার করলেন এবং এমন কোনো কথা বললেন না, যার মাধ্যমে ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহুর অন্তরে কোনো প্রকার ভয়ভীতির সৃষ্টি হতে পারে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর হত্যার ঘটনা শুনলেন ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহুর মুখে। যখন ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহু বলে শেষ করলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে মনুষ্য অনুভূতি ও প্রবৃত্তি অবশ্যই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই বিশেষ প্রবৃত্তি এবং আবেগ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়তের অনুগত মস্তিষ্ক এবং দায়িত্বের অনুভূতির সামনে জয়ী হতে পারেনি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তার মুসলিম হওয়াকে অস্বীকার করতে পারতেন অথবা রেগে গিয়ে হত্যা করতে পারতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু তাঁকে এটুকু বললেন : হে আল্লাহর বান্দা, আমার সামনে এসো না। আমি চাই আমার দৃষ্টি তোমার ওপর না পড়ুক। ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, এরপর প্রতিটি ক্ষণে আমি ভীত থাকতাম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না আবার আমাকে দেখে ফেলে- এভাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিশ্রুত দিন চলে আসল। [৬৭]
বোখারি শরিফে বর্ণিত আছে: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টি যখন আমার ওপর পড়ল, তিনি আমাকে লক্ষ করে বললেন- তুমিই কি ওয়াহশি? আমি বললাম- হ্যাঁ, আমিই ওয়াহশি। নবিজি বললেন- তুমিই কি হামজা রাদিআল্লাহু আনহুকে শহিদ করেছিলে? আমি বললাম- আপনার নিকট যে সংবাদ পৌঁছেছে, সেটা পুরোদস্তুর সত্য। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কি এই কাজটি করতে পারো যে, তুমি আমার সামনে আসবে না? [৬৮]
সেসব প্রকৃতিগত মনুষ্য অনুভূতি, প্রবৃত্তি ও শ্রেষ্ঠতম আবেগের ঝলক এখান থেকেও আমাদের সামনে আসে। একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটির সাথে মিশে যাওয়া একটি পুরাতন কবরের পাশে আসলেন। সে সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে কমলতা প্রকাশ পেল এবং তিনি কান্না করে ফেললেন। তারপর তিনি বললেন, 'এটা আমেনার সমাধিস্থল।' এটা সে সময়কার কথা-যখন তার মৃত্যুর অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। [৬৯]
টিকাঃ
[৫৩] সহিহুল বোখারি, কিতাবুস সালাহ।
[৫৪] মুসান্নিফে আব্দুর রাজ্জাক।
[৫৫] ইবনে আসাকির।
[৫৬] মুসনাদে আহমাদ, সহিহুল মুসলিম।
[৫৭] ইবনে মাজাহ।
[৫৮] বোখারি, মুসলিম।
[৫৯] সহিহুল মুসলিম, কিতাবুল হজ, হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। সেই ছেলের নাম কিছ বর্ণনায় 'ইয়াস' পাওয়া যায়।
[৬০] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল জিহাদ।
[৬১] আহমাদের বর্ণনায়, ৭/২৩-২৪।
[৬২] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি।
[৬৩] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি, তাবুকের যুদ্ধ।
[৬৪] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি।
[৬৫] ইবনে কাসির, ৩/৯৫। ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ এটাকে ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন।
[৬৬] ইবনে কাসির ৩/৯৬।
[৬৭] ইবনে হিশাম ৬/৭৬, বোখারি শরিফে এই ঘটনা কিতাবুল মাগাজি অধ্যায়ে হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর হত্যা পরিচ্ছদে উল্লেখ করা হয়েছে।
[৬৮] সহিহুল বোখারি, হামজা রাদিআল্লাহু আনহু হত্যা অধ্যায়।
[৬৯] বায়হাকি, সুফিয়ান সাওরি রাদিআল্লাহু আনহুর বর্ণনায়।
📄 ধৈর্য, সহনশীলতা ও অসহিষ্ণুতা
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম চরিত্র, ধৈর্য, সহনশীলতা ও অসহিষ্ণুতার সামনে সমস্ত মনুষ্যজাতীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা পিছিয়ে ছিল বহুগুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
নিশ্চয়ই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।[৭০]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং বলেন –
أدبني ربي فأحسن تأديبي
আমার শিক্ষা আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন এবং উত্তম করে তৈরি করেছেন।
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إن الله بعثني لتمام مكارم الأخلاق وكمال محاسن الافعال
আল্লাহ তাআলা আমাকে উত্তম চরিত্র এবং উৎকৃষ্ট কাজের পূর্ণতা দিয়ে প্রেরণ করেছেন।”[৭১]
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহার কাছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বললেন-
كان خلقه القرآن
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র ছিল কুরআনের বাস্তব নমুনা।
দয়া ও ক্ষমা, সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, অন্তরের প্রশস্ততা এবং ধৈর্যধারণের যে ক্ষমতা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে বিদ্যমান ছিল, সেখানে কোনো বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধির জোর, কবির চিন্তাশক্তি ও ভাবনা পৌঁছাও ছিল অসম্ভব। যদি এই ঘটনাবলিকে বিশেষ এই পদ্ধতিতে উল্লেখ না করা হতো-যা কোনো প্রকার সন্দেহের ঊর্ধ্বে, তবে মনুষ্য মস্তিষ্ক আজ তা গ্রহণ করত না। কিন্তু এই বর্ণনা এমন পরিমাণ সহিহ এবং লাগাতার এমন বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য রাবী থেকে অন্য বিশ্বস্ত রাবীর মাধ্যমে এমন পন্থা ও পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর মাঝে এমন লাগাতার বিশুদ্ধ দলিল পাওয়ার গেছে, যার কারণে-সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক প্রামাণ্য বিষয়ের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি গ্রহণযোগ্য হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। এখানে আমরা তেমনই কিছু ঘটনা বর্ণনা করব।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দয়া, সহনশীলতা, বড় থেকে বড় শত্রুর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং মহানুভবতার এক নমুনা এমন ছিল : যখন মুনাফিকদের সরদার আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলকে[৭২] কবরে নামানো হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হলেন এবং নির্দেশ দিলেন, তাকে কবর থেকে বের করে আনো! এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জানুর ওপর রাখলেন এবং নিজ মুখের লালা তার ওপর লাগালেন এবং নিজ জামা মোবারক তাকে পরিধান করালেন।[৭৩]
হজরত আনাস বিন মালেক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হাঁটছিলাম। নজরানের একটি চাদর সে সময় نবিজির গায়ে সজ্জা করে ছিল-যার কেনারা ছিল পুরু। রাস্তায় এক গ্রাম্য ব্যক্তি নবিজির দেখা পেল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদর মোবারকে জোরে টান দিল। আমি মাথা উঁচিয়ে দেখলাম, চাদর টানার কারণে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গলায় দাগ পড়ে গিয়েছে। তারপর সেই গ্রাম্য লোকটি বলল- হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর যে সম্পদ তোমার কাছে ছিল, সেটা আমাকে নেওয়ার অনুমতি দাও! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে ফিরে তাকালেন এবং হেসে ফেললেন। অতঃপর বললেন, এটা তাকে দিয়ে দেওয়া হোক! [৭৪]
জায়েদ বিন সা'নাহ (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) রাদিআল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলেন এবং ঋণের টাকা ফেরত চাইলেন, যা তিনি তার থেকে গ্রহণ করেছিলেন। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধ মোবারকের কাপড় ধরে জোরে টানলেন, এবং কঠিন ভাষায় কথা বললেন। তারপর বললেন- তুমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর, বড়ই টালবাহানা করো। উমর রাদিআল্লাহু আনহু তাকে ধমকালেন, এবং উঁচু গলায় কথা বললেন। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা দীপ্তিময় ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাদিআল্লাহু আনহুকে বললেন- উমর, আমি এবং সে ব্যক্তি, উভয়ই তোমার নিকট অন্য কাজের হকদার ছিলাম। আমাকে তুমি ঋণ দ্রুত পরিশোধের পরামর্শ দিতে এবং তাকে নরম ভাষায় কথা বলার পরামর্শ দিতে। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঋণ পরিশোধের এখনো তিনদিন বাকি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাদিআল্লাহু আনহুকে সে ঋণ পরিশোধের আদেশ দিলেন এবং বিশ সা' অতিরিক্ত আদায় করতে বললেন—এটা উমর রাদিআল্লাহু আনহুর তাকে ভীত করার বিনিময় ছিল। আর এই কথাই তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে গেল। [৭৫]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : একবার মক্কার আশি জন অস্ত্রে সজ্জিত লোক 'তানঈম পর্বত' থেকে হঠাৎই নেমে আসল এবং ধোঁকায় ফেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষতি করতে চাইল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সকলকেই বন্দি করেলেন এবং জীবিত থাকতে দিলেন। [৭৬]
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নজদের দিকে সেনা অভিযানে ছিলাম। রাস্তায় দুপুর হয়ে এল এবং বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভূত হলো। এই এলাকায় অধিক পরিমাণে তৃণলতা ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বাবল গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করলেন এবং নিজ তরবারি তাতে ঝুলিয়ে রাখলেন। বাকিরাও বিভিন্ন গাছের ছায়ায় নিজেদের বিশ্রাম দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এই অবস্থায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ডাকলেন, আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। সেখানে এক গ্রাম্য ব্যক্তিকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বসা দেখলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আমি ঘুমিয়েছিলাম, এই ব্যক্তি আসল এবং আমার তরবারি ছিনিয়ে নিল। আমি জাগ্রত হয়ে দেখলাম সে তরবারি নিয়ে আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে বলল- তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারবে? আমি বললাম- আল্লাহ তাআলা। সে তরবারি কোষবদ্ধ করে নিল।"[৭৭] তারপর সে বসে পড়ল। আর এই হলো সে ব্যক্তি- যে তোমাদের সামনে বসে আছে। বর্ণনাকারী বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোনো শাস্তি দেননি।[৭৮]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নম্রতা, সহনশীলতার এই অবস্থান, সকল সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুমের নম্রতা মিলিয়েও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমকক্ষ ছিল না। অথচ সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন নম্রতা, ভদ্রতা, সহনশীলতার পূর্ণ সংমিশ্রণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থান সে সমস্ত বিষয়ে সকলের জন্য এক বন্ধুবর শিক্ষক, দয়ালু-মেহেরবান শুভাকাঙ্ক্ষী ও অভিভাবক ছিলেন। তার একটি নমুনা হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহুর বর্ণনায় আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি বলেন: একবার এক গ্রাম্য লোক মসজিদে পেশাব করে দিল। এটা দেখে লোকেরা তার ওপর হামলে পড়ল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও এবং যেখানে সে পেশাব করেছে সেখানে এক বালতি বা কয়েক বালতি পানি ঢেলে দাও, এবং স্মরণ রেখো, তোমাদের সহজাত নম্রতা সৃষ্টির জন্য পাঠানো হয়েছে। সংকীর্ণতা ও কঠোরতা তৈরি করতে পাঠানো হয়নি।[৭৯]
মুআবিয়া বিন হাকাম রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নামাজ পড়ছিলাম। এক ব্যক্তির হাঁচি আসল, আমি বললাম 'অ্যায়ারহামুকাল্লাহ'। লোকেরা এটা শুনে আমাকে দেখতে লাগল। আমি বললাম, তোমাদের মা তোমাদের জন্য কান্না করুক। কী এমন হয়েছে, যার জন্য তোমরা আমাকে এমন বাঁকা দৃষ্টিতে দেখছ? এটা শুনে লোকেরা নিজেদের জানুর ওপর আঘাত করতে লাগল। যখন আমি বুঝলাম আমাকে চুপ করতে ইশারা করা হচ্ছে, আমি চুপ হয়ে গেলাম।
যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ শেষ করলেন-আমার মা-বাবা তাঁর ওপর কুরবান হোক! আমি না নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে, তাঁর মতো কোনো অভিভাবক ও শিক্ষক পেয়েছি, আর না নবিজির পরে কেউ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে না ধমকালেন, না মারলেন আর না কোনো কঠিন ভাষা ব্যবহার করলেন। শুধুমাত্র এটুকু বললেন, নামাজে সাধারণ মনুষ্যসুলভ কথা বলার অনুমতি নেই। নামাজ শুধু তাসবিহ, তাকবির ও কোরআন তেলাওয়াতের জন্য।[৮০]
হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব দয়ালু ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর নিকট যদি কোনো প্রয়োজনগ্রস্ত আসত, তিনি অবশ্যই তার সাথে ওয়াদা করতেন এবং কিছু থাকলে তখনই তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিতেন। একবার তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন, এক গ্রাম্য লোক এগিয়ে আসল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাপড় ধরে বলতে লাগল, আমার একটি সাধারণ প্রয়োজন থেকে গেছে। আমার ভয় হচ্ছে, আমি আবার তা না ভুলে যাই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে গেলেন। যখন লোকটির কাজ সম্পন্ন হলো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় আসলেন এবং নামাজ আদায় করলেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, প্রশস্ততা এবং ধৈর্য ও শ্রেষ্ঠত্বের নমুনা সম্পর্কে নবিজির খাদেম হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু সাক্ষ্য সে সময় দিয়েছিলেন, যখন তিনি অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন : আমি দশবছর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমত করেছি। না তিনি কখনো 'হু' শব্দ ব্যবহার করেছেন, না কখনো বলেছেন সে কাজ তুমি কেন করলে না, বা সে কাজ তুমি কেন করলে?” [৮১]
হজরত সাদ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হলাম। তখন আমার কাপড়ে জাফরান ছড়ানো সুগন্ধির আলামত ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখে বললেন- নিক্ষেপ করো, এবং আমার পেটে একটি ছড়ি দিয়ে মারলেন, যা দ্বারা আমি ব্যাথা অনুভব করলাম। আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার কেসাসের অধিকার আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেট থেকে কাপড় সরিয়ে নিলেন এবং বললেন, কেসাস নিয়ে নাও![৮২]
টিকাঃ
[৭০] সূরা কলম।
[৭১] শরহুস সুন্নাহ, মিশকাতুল মাসাবিহ।
[৭২] নবম হিজরিতে তাবুক থেকে ফেরার পথে তার মৃত্যু হয়।
[৭৩] সহিহুল বোখারি।
[৭৪] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল জিহাদ।
[৭৫] বায়হাকির বর্ণনা অনুযায়ী।
[৭৬] সহিহুল মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ।
[৭৭] এখানে 'শামাহ' শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এটার দুটি অর্থ হতে পারে, যেমন: 'তিনি তরবারি কোষবদ্ধ করে নিলেন।' আর এই অর্থও হতে পারে, 'তিনি তরবারি বের করলেন এবং তা দেখলেন।'
[৭৮] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি।
[৭৯] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল অজু।
[৮০] সহিহুল মুসলিম, বাবে তাহরিমুল কালামি ফিস-সালাত।
[৮১] সহিহুল মুসলিম, নবিজি সা. এর উত্তম চরিত্র সম্পর্কিত অধ্যায়ে।
[৮২] কিতাবুশ শিফা। অবগত হওয়া উচিত, সাদ রা. এটা মজার ছলে বলেছিলেন, কেসাস নেওয়ার জন্য নয়।
📄 নবিজির বিনয়
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে বিনয় ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। কিন্তু তিনি কোনো জিনিসে সুখ্যাত ও সুপরিচিত হওয়াকে পছন্দ করতেন না, আর না এমন করাকে ভালো ভাবতেন—লোকেরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য দাঁড়িয়ে থাকুক এবং তাঁর প্রশংসায় অতিরঞ্জন করে কোনো স্বার্থ হাসিল করুক—যেমনটা পূর্বেকার উম্মতরা তাদের নবির সাথে করেছিল, অথবা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবদিয়্যাত (আল্লাহর বান্দা) ও রিসালাতের স্তর থেকে উঁচুতে তুলে ফেলুক!
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমাদের কাছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো কিছু ছিল না। আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতাম, কিন্তু এই ধারণায় দাঁড়াতাম না—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা পছন্দ করবেন না।[৮৩]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হলো— হে সৃষ্টিজীবের সেরা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা হজরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্থান।[৮৪]
হজরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার সামনে এভাবে আমার প্রশংসা অতিরঞ্জন করো না, যেভাবে খ্রিস্টানরা ঈসা বিন মারয়ামের সামনে করত। আমি তো শুধুমাত্র একজন গোলাম। তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং তার রাসুল বলো।[৮৫]
হজরত আবদুল্লাহ বিন আবি আওফা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে কোনো লৌকিকতা বা লজ্জা হতো না, কোনো গোলাম অথবা বিধবার সাথে চলতে—তাদের প্রয়োজন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত।[৮৬]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : মদিনার পরিচারিকা, ক্রীতদাসীদের কেউ নবিজির হাত ধরে নিত এবং যা কিছু বলার, বলত এবং যতদূর নিয়ে যাওয়ার, নিয়ে যেত।[৮৭]
আদি বিন হাতেম তাঈ রাদিআল্লাহু আনহু যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন, নবিজি তাঁকে নিজ ঘরে ডাকলেন। বাঁদি হেলান দেওয়ার জন্য বালিশ দিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকে নিজের এবং আদির মাঝে রেখে দিলেন এবং নিজে জমিনেই বসে পড়লেন। হজরত আদি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, আমি এর থেকে বুঝে গেলাম-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাদশাহ নন।[৮৮]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থদের শুশ্রুষা করতেন, জানাযায় অংশ নিতেন এবং গোলামের দাওয়াত গ্রহণ করতেন।[৮৯]
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুর্বলদের জন্য নিজের গতি শ্লথ করে দিতেন এবং তাদের জন্য দুআ করতেন।[৯০]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘমের রুটি এবং স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়া তরকারির আমন্ত্রণ হলেও তা গ্রহণ করতেন।”[৯১]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকেই বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- আমি গোলাম, গোলামদের মতোই খাই এবং তাদের মতোই বসি।[৯২]
হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নিকট উপস্থিত হলেন, আমি ছালের তৈরি চামড়ার বালিশ নবিজির সামনে উপস্থাপন করলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটিতে বসে পড়লেন এবং আমার ও তাঁর মাঝে বালিশটি রেখে দিলেন।[৯৩]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই ঘর পরিষ্কার করতেন, উট বাঁধতেন এবং পশুও নিজে চড়াতেন। নিজের খাদেমের সাথে খাবার সমান ভাগ করে নিতেন এবং আটা পেষার কাজে তার সহযোগী হতেন। বাজার থেকে সদাইও নিজে আনতেন।[৯৪]
টিকাঃ
[৮৩] তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ ৩/১৩২।
[৮৪] সহিহুল মুসলিম, কিতাবুল ফাদ্বায়িল।
[৮৫] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল আম্বিয়া।
[৮৬] বায়হাকি।
[৮৭] মুসনাদে আহমাদ ৩/১৯৮-২১৫।
[৮৮] জাদ্দুল মাআদ ১/৩৪।
[৮৯] শামায়েলে তিরমিজি।
[৯০] আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব লিল-মুনজারি।
[৯১] শামায়েলে তিরমিজি, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিনয় অধ্যায়, মুসনাদে আহমাদ ৩/২১১-২৮৯।
[৯২] কিতাবুশ শিফা।
[৯৩] আল-আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ১৭২।
[৯৪] কিতাবুশ শিফা পৃষ্ঠা ১০১, বোখারির বর্ণনা থেকে।
📄 বীরত্ব, বাহাদুরি ও লজ্জা-শরম
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতে বীরত্ব, বাহাদুরি ও লজ্জা-শরমের (যেগুলোকে লোকেরা পরস্পর বিরোধী ভাবে) একই নমুনা ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লজ্জা শরমের বিষয়ে হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্দানিশীন কুমারি নারীর চেয়ে অধিক লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো জিনিস অপছন্দনীয় হতো, তার প্রভাব নবিজির চেহারার মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়ে যেত।[৯৬]
তিনি লজ্জা-শরমের কারণে কাউকে এমন কিছু বলতেন না, যা তার কাছে অপছন্দনীয় হয়। সুতরাং এই দায়িত্ব অন্য কাউকে অর্পণ করতেন। হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: নবিজির মজলিসে একজন লোক ছিল, যার কাপড়ের অধিকাংশ সোনালী রঙের ছিল। যেহেতু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরমের কারণে কাউকে তার অপছন্দনীয় কাজের কথা বলতে পারতেন না—সেজন্য যখন সে দাঁড়াল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের বললেন, ভালো হতো তোমরা তাকে বলতে, সোনালী রঙের পোশাক পরিধান ছেড়ে দিতে।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন : যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো খারাপ কাজের সংবাদ পেতেন, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম নিয়ে বলতেন না—এমন কেন করলে? বরং তিনি বলতেন, লোকেদের কী হয়ে গেল যে, তারা এমন করছে! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সে কাজের বিরোধিতা করতেন ঠিকই, কিন্তু সে লোকের নাম উল্লেখ করতেন না।[৯৬]
বীরত্ব ও বাহাদুরি সম্পর্কে যতটুকু বলার- শেরে খুদা, হজরত আলী মুরতাজা রাদিআল্লাহু আনহুর সাক্ষ্যই তার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন: যখন রণক্ষেত্র উত্তপ্ত হয়ে উঠত এবং মনে হতো চোখ তার কুঠোরি থেকে বেরিয়ে আসবে, সে সময় আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তালাশ করতাম তার ছায়ায় আশ্রয় নিতে। কিন্তু আমরা দেখতাম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে শত্রুর নিকটবর্তী আর কেউ নেই। বদরের যুদ্ধে আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল-আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে অবস্থান করছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদের চেয়েও দুশমনের নিকটবর্তী ছিলেন।[৯৭]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব থেকে সুন্দর, সুশ্রী এবং শ্রেষ্ট দানবীর, উদার এবং বীরত্ব ও সাহসীকতায় শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ছিলেন। এক রাতে মদিনাবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল এবং যেদিক থেকে আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, লোকেরা সেদিকে এগিয়ে গেল। পথিমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফিরে আসতে দেখলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আওয়াজ শুনে তাদের আগেই সেদিকে গিয়েছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সময় আবু তালহা রাদিআল্লাহু আনহুর ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। তাতে জিনও বাঁধা ছিল না। তরবারি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধে ঝুলছিল। তিনি ঘোড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে বললেন, আমি এটাকে সমুদ্রের মতো পেয়েছি- দীপ্ত গতিসম্পন্ন। [৯৮]
উহুদ ও বদরের যুদ্ধে যখন বড় থেকে বড় বাহাদুর এবং সাহসীরা এদিক সেদিক পলায়নরত ছিল এবং ময়দান ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সে সময়ও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ খচ্চরের ওপর অনড়, অটল ছিলেন প্রশান্ত মনে। মনে হচ্ছিল যেন কোনোকিছুই হয়নি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কবিতাও পড়ছিলেন-
أنا النبي لا كذب ، أنا ابن عبدالمطلب
আমি নবি, এটা কোনো মিথ্যা নয়, আর আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।
টিকাঃ
[৯৫] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মানাকিব, ছিফাতুন নাবি অধ্যায়।
[৯৬] সুনানে আবি দাউদ。
[৯৭] কিতাবুশ শুফা, পৃষ্ঠা ৮৯।
[৯৮] আল-আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ৪২।