📄 সৃষ্টিজীবের সাথে নবিজির আচরণ
সেই সুখময় ইবাদাত, যা দুনিয়া এবং দুনিয়ার আসবাবের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না। পূর্ণাঙ্গীন আল্লাহভীতি, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং তার দরবারে রোনাজারি ও দুআ-মোনাজাতের মাধ্যমে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাস্যময় ললাট, উত্তম চরিত্র, দয়া, ভালোবাসা, দিলদারি এবং প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য অধিকার আদায়, এবং সকলের অবস্থান অনুপাতে সম্মান প্রদর্শন করার মাঝে কোনো পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হতো না। আর এগুলোকে তিনি এমনভাবে বাস্তবায়ন করতেন, যা অন্য কোনো মানুষের মাধ্যমে করা সম্ভব হয় না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لو تعلمون ما أعلم لضحكتم قليلا ولبكيتم كثيرا
যা আমি জানি, যদি তা তোমরা জানতে, তবে কম হাসতে এবং অধিক কাঁদতে।[২৯]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত মানবজাতির মাঝে সবচেয়ে প্রশস্ত মন, নম্র স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। বংশগতভাবে ছিলেন সব থেকে সম্মানি বংশের। নিজ সঙ্গী-সাথীদের থেকে পৃথক থাকতেন না, বরং তাদের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন। তাদের সাথে কথা বলতেন, তাদের সন্তানাদিদের সাথে হাসি মজাক করতেন, বাচ্চাদের কোলে তুলে নিতেন। গোলাম, আজাদ, বাঁদি, দরিদ্র, সকলের ডাকে সাড়া দিতেন। অসুস্থদের দেখতে যেতেন, চাই সে শহরের অপর প্রান্তেই হোক না কেন! প্রয়োজনগ্রস্তের প্রয়োজন মেটাতেন।[৩০] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনো সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে পা বিছিয়ে বসতে দেখা যায়নি-যাতে করে এর মাধ্যমে কারো কোনো সমস্যা কিংবা অস্বস্তি অনুভূত না হয়।
হজরত আবদুল্লাহ বিন হারেস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক হাস্যোজ্জল আর কাউকে দেখিনি।"[৩১] হজরত জাবের বিন সামুরাহ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে আমার শ'য়ের অধিক বার বসার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি একবার দেখলাম সাহাবায়ে কেরাম একে অপরকে কবিতা আবৃত্তি করে শুনাচ্ছেন, জাহেলী যুগের ঘটনাবলির স্মৃতিচারণ করছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপচাপ শুনছেন, মাঝে কখনো হাসির কথা আসলে মুচকি হাসছেন।[৩২]
হজরত শুরাইদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে উমাইয়া বিন সালতের কবিতা শুনানোর আদেশ করলেন, সুতরাং আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার কবিতা পড়ে শুনালাম।[৩৩]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত নরম মনোভাবের অধিকারী ছিলেন। দয়া ও ভালোবাসার মূর্তমান প্রতিক ছিলেন। মনুষ্য অনুভূতি ও উত্তম চরিত্রের নমুনা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতে সুন্দর ও সর্বোৎকৃষ্টভাবে উদ্ভাসিত হয়। হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কন্যা হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহাকে বলতেন- আমার উভয় পুত্রকে (হাসান, হুসাইন রা.) ডাকো, তারা দৌড়ে আসত। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের গালের সাথে লাগাতেন তারপর তাঁদের বুকের সাথে জড়িয়ে নিতেন।[৩৪] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নিজ দৌহিত্র হজরত হাসান বিন আলি রাদিআল্লাহু আনহুকে ডাকলেন, তিনি দৌড়ে আসলেন এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোলে উঠে বসলেন। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাড়িতে আঙুল দিয়ে খেলতে লাগলেন। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মুখ খুলে দিলেন এবং হাসান রাদিআল্লাহু আনহু নবিজির মুখে নিজের মুখ প্রবেশ করালেন।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন: জায়েদ বিন হারিসাহ রাদিআল্লাহু আনহু (যিনি নবিজির গোলাম ছিলেন) মদিনায় এসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে আগমন করলেন। তিনি দরজায় এসে হাঁক দিলেন, তার আওয়াজ শুনে ততক্ষণাৎ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সে সময় পুরোপুরি বস্ত্রাবৃত ছিলেন না। শরীর থেকে চাদর পড়ে যাচ্ছিল, এটা লক্ষ করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআনাকা করলেন এবং চুমু খেলেন।[৩৫]
হজরত উসামা বিন জায়েদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক কন্যা এসে তাঁকে খবর দিল, আমার সন্তান শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে। আপনি এখনই সেখানে আসুন! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সালাম জানালেন এবং বললেন, আল্লাহর জন্য যা, তা আল্লাহ তাআলা নিয়ে নিবেন। আর তার জন্য তা-ই, যা তিনি দান করেছেন। প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কেই সে মহান সত্তার কাছে লিখিত ও নির্ধারিত আছে। সেজন্য উচিত ধৈর্যধারণ করা, এবং এর বিনিময়ে সওয়াবের নিয়ত ও আকাঙ্ক্ষা রাখা। তথাপিও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কসম দিয়ে বললেন, আপনি অবশ্যই আগমন করুন! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন, আমরাও তার সাথে দাঁড়ালাম। যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে তাশরিফ আনলেন, বাচ্চাটিকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আনা হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাটিকে হাতে তুলে নিলেন। তখন বাচ্চাটির শ্বাস ফুরিয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে শুরু করল। হজরত সাদ রাদিআল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন- ইয়া রাসুলুল্লাহ, এটা কী? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা আল্লাহর রহমত- যা তিনি বান্দাদের মধ্যে যাকে খুশি তার অন্তরে ঢেলে দেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাঁর দয়ালু বান্দার ওপরই দয়া করেন।[৩৬]
যখন বদরের যুদ্ধবন্দিদের সাথে হজরত আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুকে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং তার আহাজারি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানে আসছিল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমোতে পারছিলেন না। যখন আনসারি সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুম এ বিষয়ে অবগত হলেন, আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর বাঁধন খুলে দিলেন। আনসার সাহাবায়ে কেরামের এই মহানুভবতা, দয়ার্দ্রতা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে এজন্য স্বস্তি দিচ্ছিল না- কেননা তা আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু এবং অন্য বন্দিদের মাঝে পার্থক্য তৈরি করছিল। আনসার সাহাবায়ে কেরام ভাবলেন, আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর বাঁধন ঢিলা করে দেওয়ায় নবিজি খুশি হয়েছেন, আর তাই হজরত আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর মুক্তিপণ মাফ করতে চাইলেন-যাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও খুশি হয়ে যান। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা অস্বীকার করলেন।[৩৭]
এক গাম্য লোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, আপনারা কি আপনাদের সন্তানদের ভালোবাসেন? আমরা তো তাদের ভালোবাসি না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যদি আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তর থেকে দয়া বের করে নেন, তবে আমার কী করার আছে? [৩৮]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাদের প্রতি অনেক বেশি দয়ালু ছিলেন এবং তাদের সাথে অনেক নরম ও আদরের সম্পর্ক রাখতেন। হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : খেলায় মত্ত কিছু বাচ্চা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সালাম দিলেন।[৩৯]
হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সাথে গলা মেলাচ্ছিলেন, আমার এক ছোট ভাইকে দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- নাগায়ের, [৪০] কী হয়েছে?[৪১]
মুসলমানদের প্রতি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত বন্ধুসুলভ ও দয়ালু ছিলেন। তাঁদের অবস্থার পূর্ণ দেখভাল করতেন। মনুষ্য প্রবৃত্তিতে একঘেয়েমি ও সাময়িকভাবে দুর্বল অভিপ্রায় তেরি হয়—সেদিকেও তিনি পূর্ণ খেয়াল রাখতেন।
হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমাদের প্রতি ওয়াজ নসিহত করতেন, তা খুব ধীরগতিতে থেমে থেমে করতেন, যাতে আমাদের মাঝে একঘেয়েমি ভাব তৈরি না হয়। নামাজের সাথে এতটা গভীর ভালোবাসা সত্ত্বেও নামাজের মাঝে কোনো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনলে, তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং বলেন যে, আমি নামাজের জন্য দাঁড়াই এবং নিয়ত করি নামাজকে খুব দীর্ঘ করতে। সে অবস্থায় কোনো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনলে নামাজকে সংক্ষেপ করে দিই, যাতে মায়ের সমস্যা কিংবা কষ্টের কারণ না হয়।[৪২]
হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ সা., আল্লাহর কসম, আমি (নিজ মহল্লায়) ফজরের নামাজে মসজিদে উপস্থিত হই না, শুধুমাত্র অমুক ইমাম নামাজ দীর্ঘ করে বলে। এটা শুনে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পরিমাণ রাগান্বিত হয়ে নসিহত করলেন, আমি অন্য কোনো সময় তা দেখিনি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে সে লোক আছে, যে মানুষকে (নামাজের প্রতি) বিষণ্ণ করে তুলে। তোমাদের মধ্যে যে নামাজে ইমামতি করবে, তার জন্য উচিত- নামাজকে সংক্ষিপ্ত করা। কেননা নামাজে কমজোর লোকেরাও অংশ নেয়-বৃদ্ধ এবং প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তিও।[৪৩]
এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে এই ঘটনাও এসে যায় : হজরত আনজাশা রাদিআল্লাহু আনহু, যিনি মহিলা কাফেলার উষ্ট্রচালক ছিলেন। অত্যন্ত শ্রুতিমধুর কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। তার সুমধুর আওয়াজে উটনি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেত। সেকারণে মহিলাদের কষ্ট হতো। এটা লক্ষ করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আনজাশা রাদিআল্লাহু আনহুকে বললেন, একটু ধীরগতিতে উট হাকাও, যাতে এই দ্রুততার কারণে কাচপাত্র (কমজোর, দুর্বল আরোহী) সদৃশ্য কারো কষ্ট না হয়।[৪৪]
আল্লাহ তাআলা نবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্ষ মোবারককে বিদ্বেষ এবং কারো খারাপ কিছু চাওয়া থেকে পবিত্র রেখেছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, তোমাদের কেউ যেন আমার কাছে অন্য কারো বদগুমানি না করে। কেননা আমি চাই, যখন তোমাদের সামনে আমি উপস্থিত হব, তখন যেন আমার অন্তর পূর্ণ পরিষ্কার থাকে।[৪৫]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের ব্যাপারে দয়ালু পিতার মতো ছিলেন। সমস্ত মুসলিম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে এভাবে থাকতেন-যেন তারা নবিজির পরিবার পরিজনদের অন্তর্ভুক্ত, আর তাদের দায়িত্ব নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ন্যস্ত। তাদের প্রতি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দয়া এবং এমন প্রেমময় সম্পর্ক ছিল, যেমন কোলের বাচ্চার সাথে জন্মদাত্রী মায়ের সম্পর্ক হয়। মুসলমানদের দৌলত-সম্পদ এবং রিজিকের মধ্যে যে উন্নতি আল্লাহ তাআলা দান করেছিলেন, তার মাধ্যমে তো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো উপকার ছিল না। কিন্তু তাদের ঋণের বোঝা হালকা করার দায়িত্ব নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, যে সম্পত্তি ফেলে গেছে, তা তার সন্তানের মালিকানাধীন, আর যে ঋণ ইত্যাদি রেখে গিয়েছে, তা আদায় করা আমাদের দায়িত্বাধীন।[৪৬]
অন্য এক বর্ণনায় এমন পাওয়া যায় : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এমন কোনো মুমিন নেই, দুনিয়া আখেরাতে যার আমার চেয়ে অধিক দায়ত্বিশীল কেউ আছে। যদি চাও এই আয়াত পড়ো-[৪৭]
النَّبِيُّ أَولَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِن أَنفُسِهِم
নবি মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের জীবনের চেয়েও ঘনিষ্ট ও বন্ধুপ্রতিম। [সূরা আহজাব : ০৬]
এজন্য যে মুমিন মৃত্যুবরণ করেছে এবং তার সম্পদ ছেড়ে গেছে, তবে সেটা তার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর অধিকার-সে সম্পদ যাই হোক না কেন! আর যদি মৃতব্যক্তির জিম্মায় কোনো ঋণ অথবা এমন কোনো সম্পত্তি থেকে যায়- যা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে, তবে আমার নিকট আসো, তা রক্ষার দায়িত্বশীল আমি হব।
টিকাঃ
[২৯] বোখারি, মুসলিম।
[৩০] আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত (রেওয়ায়েতে আবু নাঈম, আল হিলয়াহ)
[৩১] শামায়েলে তিরমিজি।
[৩২] বোখারি, আদাবুল মুফরাদ।
[৩৩] তিরমিজি।
[৩৪] বোখারী, আদাবুল মুফরাদ।
[৩৫] তিরমিজি
[৩৬] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মারছো।
[৩৭] ফাতহুল বারী ৮/৩২৪ (মিশরি সংস্করণ)।
[৩৮] আয়শা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। সহিহুল বোখারী।
[৩৯] সহিহুল বোখারী, কিতাবুল ইসতি'যান।
[৪০] ক্ষুদ্র পাখি, বাচ্চারা খেলা করে।
[৪১] আল আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা/৪০।
[৪২] সহিহুল বোখারি, কিতাবুস সালাহ।
[৪৩] সহিহুল বোখারি, কিতাবুস সালাহ।
[৪৪] আল আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ১৮৫, সহিহুল বোখারি, সহিহুল মুসলিম।
[৪৫] কিতাবুশ শুফা, পৃষ্ঠা ৫৫, আবু দাউদের বর্ণনায়।
[৪৬] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল ইসতিখরাজ।
[৪৭] সহিহুল বোখার, কিতাবুল ইসতিখরাজ।
📄 সমতা বিধান ও চারিত্রিক ভারসাম্য
আল্লাহ তাআলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উচ্চমাপের চরিত্র এবং প্রকৃতিগত ঐশ্বর্য দানে ধন্য করেছেন-যাতে আগত সকল শতাব্দি, বর্তমান-ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তা পরিপূর্ণতার মাধ্যম হয় এবং সেখান থেকেই সমতা বিধান, চারিত্রিক ভারসাম্য, নমনীয় উপলব্ধি, ভারসাম্য রক্ষা, গ্রহণযোগ্যতা, প্রাচুর্য ও অলসতা থেকে বাঁচার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন দুটি বিষয়ের মাঝে কোনো একটিকে প্রাধান্য দিতে হতো, তবে তিনি সেটাকেই গ্রহণ করতেন, যা তূলনামূলক সহজ অনুভূত হয়-অবশ্য তা গুনাহের ঘ্রাণ থেকেও মুক্ত হতে হবে। আর যদি তাতে গুনাহের আভাসমাত্রও পাওয়া যায়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা থেকে সবচেয়ে দূরে থাকতেন।[৪৮]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লৌকিকতা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত দুনিয়াবিমূখতা, দরবেশী জীবনযাপন এবং আত্মার প্রশান্তির জায়েজ মাধ্যম থেকে মুখফিরিয়ে নেওয়াকে অপছন্দ করতেন। হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- দীন সহজ, আর যে দীনের সাথে শক্তি পরীক্ষা করবে-দীন তার ওপর বিজয়ী হবে। এজন্য মধ্যমপন্থা এবং ভারসাম্য রক্ষা করে চলো এবং এর নিকটবর্তী থাকো, আশা রাখো এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো![৪৯]
এছাড়াও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: দাঁড়াও, ততটুকুই করো, যতটুকু করার সাধ্য তোমার মধ্যে আছে, এজন্য যে- আল্লাহর কসম, তিনি কখনো ক্লান্ত হবেন না, তুমিই ক্লান্ত হয়ে পড়বে।[৫০] হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহ তাআলার নিকট কোন দীন সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, সহজ ও সরল দীনে ইবরাহীমি।
হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : অতিরিক্ত ও কঠিন করা, চুলের চামড়া বের করা ব্যক্তি ধ্বংস হোক!"[৫১]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু সাহাবায়ে কেরام রাদিআল্লাহু আনহুমকে এক জায়গায় শিক্ষা এবং ওয়াজ-নসিহতদানে প্রেরণ করবেন। তখন তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন- সহজবোধ্য হও, সঙ্কীর্ণতা বেছে নিও না। সুসংবাদ দিও, হতাশ করো না! হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন-তার নেয়ামতের নিদর্শন তার বান্দার মাঝে দেখতে।[৫২]
টিকাঃ
[৪৮] সহিহুল মুসলিম।
[৪৯] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল ইমান।
[৫০] আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃষ্ঠা ১৮১।
[৫১] সহিহুল মুসলিস। অর্থাৎ দীনের বিষয়ে প্রতারণা করা এবং তার মাঝে অতিরিক্ত করা ব্যক্তিরা।
[৫২] তিরমিজি শরিফে এই হাদিসটি আবওয়াবুল আদবে আনা হয়েছে। ان الله يحب ان يرى اثر نعمته على عب : অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে যে নেয়ামতে সম্মানিত করেছেন, তার জীবনযাপনে প্রকাশ পায়। ধনাঢ্য, অবস্থাপণ্য ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তির মতো থাকে, তবে তা আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করা হয়, এবং অকারণেই নিজের দরিদ্রতার প্রকাশ করা হয়।
📄 পরিবারের সাথে
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে একজন সাধারণ মানুষের মতোই থাকতেন। যেমন উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ পরিচ্ছদ নিজেই পরিষ্কার করতেন। বকরির দুধ নিজেই দহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই সম্পাদন করতেন। তারপর তিনি বললেন- কাপড়ে নিজেই তালি লাগাতেন, নিজেই জুতা গাঁট দিতেন-এভাবে নিজের অন্যান্য কাজও সারতেন।[৫৪] হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহাকে প্রশ্ন করা হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে কীভাবে থাকতেন? তিনি জবাব দিলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের কাজকর্মে শরীক হতেন। আর যখন নামাজের সময় হয়ে যেত নামাজের জন্য বাহিরে চলে যেতেন।[৫৩]
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই জুতা ঠিক করতেন, নিজেই কাপড় সেলাই করে নিতেন-যেভাবে তোমরা ঘরের কাজ করে নাও।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে কোমল ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন, সবসময় তাঁর মুখে হাসি লেপ্টে থাকত।[৫৫]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমি এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি, যে তার পরিবারের বিষয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক দয়ালু ও রহমদিল ছিল।[৫৬]
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম- যে তার পরিবার পরিজনের নিকট অধিক প্রিয়। আর আমি নিজ পরিবার পরিজনের নিকট তোমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়।”[৫৭]
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কোনো খাবারের দোষ বর্ণনা করেননি। খেতে ইচ্ছে হলে খেয়ে নিতেন, পছন্দ না হলে রেখে দিতেন।[৫৮]
বিপদ-আপদে সামনে, সম্মান ও প্রাপ্তিতে পিছিয়ে
নিজ পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, নৈকট্যপ্রাপ্তদের সাথে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্ধারিত ব্যবহারবিধি এমন ছিল : যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যতটা নিকটবর্তী হতো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিপদ-আপদে তাকে সে পরিমাণ এগিয়ে রাখতেন এবং পুরস্কার, সম্মান আর গণিমতের বণ্টনে ঠিক ততটাই পিছিয়ে রাখতেন।
যখন উতবাহ বিন রবিআহ, শায়বা বিন রবিআহ এবং ওয়ালিদ বিন উতবাহ (যারা আরবের নামকরা বাহাদুর আর যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত ছিল) বদরের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীকে উত্তেজিত করে তুলছিল এবং সমকক্ষ যুদ্ধবাজদের আহ্বান করছিল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত হামজা, হজরত আলি এবং হজরত উবাইদা রাদিআল্লাহু আনহুমকে তলব করলেন এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেরণ করলেন। অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরবের সেসব যুদ্ধংদেহীদের ব্যাপারে পূর্ণ অবগত ছিলেন। মুহাজিরিনে কেরামের মাঝে এমন অনেক যুদ্ধবাজ লড়াকু সাহাবী ছিলেন, যারা আরবের সেসব যুদ্ধবাজদের মুখোমুখি হওয়ার পূর্ণ যোগ্যতা রাখতেন। বনি হাশেম গোত্রের এই জানবাজদের সকলেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রক্তের সম্পর্কের এবং সবচেয়ে কাছের লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য অপর কাউকে বিপদে ফেলেননি, বরং তাদেরকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা, তিনি তাদেরকে দুশমনের ওপর জয় দান করেছেন এবং তাদের বিজয়ী রূপে সম্মানিত করেছেন। হজরত হামজা, হজরত আলি রাদিআল্লাহু আনহুমা বিজয়ী এবং সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছেন, আর হজরত উবায়দা রাদিআল্লাহু আনহুকে বিজয়ী তবে আহত অবস্থায় আনা হয়।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সুদকে হারাম এবং জাহেলিয়াতের রক্তের বদলাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন, তখন তার শুরুতে নিজ চাচা হজরত আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব রাদি., এবং ভাতিজার (রবিআহ বিন হারেস বিন আবদুল মুত্তালিবের পুত্র) বিষয়ে বলেন।
বিদায় হজের ভাষণে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: 'জাহেলিয়াতের সময়কার সুদ আজ শেষ এবং বিলুপ্ত ঘোষিত হলো, এবং প্রথম সুদ যা আমি বিলুপ্ত করছি, সেটা আমার চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। জাহেলিয়াতের সময়কার রক্তের বদলাও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো, আর সেটা আমার ভাতিজার (রবিআহ বিন হারেসের ছেলে) রক্ত।”[৫৯]
সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশের ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য সাধারণ শাসক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বিপরীতে নিজ নৈকট্যপ্রাপ্তদের সবসময় পিছিয়ে রাখতেন এবং অন্যদের তাদের বিপরীতে প্রাধান্য দিতেন। হজরত আলি রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহার চাক্কি চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা খবর পেলেন, নবিজির দরবারে কিছু বাঁদি এসেছে। তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন এবং প্রার্থী হলেন-যাতে সেখান থেকে কোনো বাঁদি তার সাহায্য সহযোগিতার জন্য মিলে যায়। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আর সেখানে উপস্থিত হননি। সেজন্য হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা, হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহার নিকট বাঁদির বিষয়ে কথা বললেন, আর হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা নবিজির সাথে সে বিষয়ে কথা বললেন। সুতরাং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের এখানে আগমন করলেন। সে সময় আমরা ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়েছিলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে আমরা দাঁড়াতে চাইলাম, কিন্তু তিনি বললেন- থামো! আমি আমার বুকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পা মোবারকের শীতলতা অনুভব করলাম। তিনি বললেন: আমি কি তোমাদের চাওয়া জিনিসের চেয়ে উত্তম জিনিসের সংবাদ দেবো না? যখন তোমরা ঘুমানোর জন্য বিছানা গ্রহণ করবে ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ পড়বে। এটা তোমাদের জন্য সে জিনিস থেকে উত্তম হবে- যে জিনিসের প্রার্থনা তোমরা আমার কাছে করেছ।[৬০]
অন্য একটি বর্ণনায় ঘটনার সাথে এটাও যুক্ত করা হয়েছে : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন- আল্লাহর কসম, আহলে সুফফার সদস্যদের পেট ক্ষুধার তাড়নায় পিঠের সাথে লেগে যাচ্ছে—এই অবস্থায় আমি তোমাদের কিছুই দিতে পারব না। আমার কাছে তাদের জন্য খরচ করার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমি এগুলো বিক্রি করে, বিক্রয়মূল্য আহলে সুফফার ওপর ব্যয় করব।”[৬১]
কোমল উপলব্ধি ও আবেগের যথাযথ মর্যাদা
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতে নবুওয়ত ও হকের দাওয়াতের মহিমান্বিত দায়িত্ব, মনুষ্যজাতীর দুঃখ দুর্দশা, অবারিত দুশ্চিন্তা নিরাশার সাথে জীবন অতিবাহিত করা-পাথরের জন্যও সম্ভব ছিল না। তাঁর মনুষত্বের কোমল অনুভব, পবিত্র ও শ্রেষ্ঠতম আবেগ, গোটা জমিন ও জলভাগের জন্য প্রদর্শনীয় অংশ হয়ে আছে। এই মহামূল্যবান গুণাগুণ, দৃঢ় প্রত্যয়-যা আম্বিয়ায়ে কেরام আলাইহিমুস সালামের রীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আর তা আল্লাহর পথের দাওয়াহ ও একত্ববাদের আহ্বান পৌঁছানোর পথে এবং এর দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে অন্য কোনো বস্তুকে না পরওয়া করে, আর না কোনো বিষয়কে বিশেষ মূল্যায়ন করে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সকল বিশ্বস্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হতাশ করেননি, যারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতে লাব্বাইক বলে তার সঙ্গী হয়েছিল, হকের পথে নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছিল, উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে চিরন্তন জীবনের সফলতা অর্জন লাভ করেছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কথা প্রায়ই আলোচনা করতেন, তাদের জন্য নিয়মিত দুআ করতেন এবং তাদের পাশে উপস্থিত হতেন।
এই ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা মনুষ্যদেহ ছাড়িয়ে সেসব জড়প্রদার্থ বে-জান পাথর, পাহাড় এবং উঁচুনিচু উপাত্যকা ছাড়িয়ে এমন কোনো জায়গা বাকি রাখেনি, যেখানে ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ-তিতিক্ষার এই মনোহর দৃশ্য অবলোকন করেনি। সৌভাগ্য সে জায়গার, যারা তা অবলোকন করতে পেরেছিল। হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ পর্বতকে দেখে বললেন, এটা সেই পাহাড়, যা আমাদের ভালোবাসে এবং আমরা যাকে ভালোবাসি।[৬২]
হজরত আবু হামিদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলাম। যখন আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা মদিনায়ে মুনাওয়ারা, আর ওটা ওই পাহাড়-যা আমাদের ভালোবাসে, যাকে আমরা ভালোবাসি। [৬৩]
হজরত উকবাহ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন আহলে উহুদের নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাদের জন্য মাগফেরাতের দুআ করলেন। [৬৪]
হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি দেখেছি, যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আহলে উহুদের বিষয়ে আলোচনা করা হলো, তখন নবিজি আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আল্লাহর কসম, আমারও ইচ্ছা ছিল যে উহুদের শহিদদের সাথে আমিও পাহাড়ের গিরিপথে অবস্থান নেব। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের প্রিয়তম চাচা এবং দুধ ভাইয়ের শাহাদাতের মানসিক আঘাত (যারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসত ও বিশ্বাস করত এবং ইসলামের সাহায্য, সহযোগিতায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিল, এবং তাদের মৃতদেহের সাথে এমন দুর্ব্যবহার করা হয়েছিল, যা অন্য কারো সাথে করা হয়নি) আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের একনিষ্ঠ ধৈর্য ধারণের ক্ষমতায় সহ্য করতে পেরেছিল। কিন্তু যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ থেকে মদিনায় ফেরার সময় বনি আবদুল আশহালের বসতি অতিক্রম করছিলেন এবং তাদের শহিদদের জন্য কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন; এই দৃশ্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনুষ্য অনুভূতিকে বিদীর্ণ করে দিল, এবং আখিদ্বয় অশ্রুশিক্ত হয়ে গেল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'কিন্তু হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর জন্য অশ্রুপ্রবাহের কেউ নেই।' [৬৫]
মনুষ্য অনুভূতির এই উঁচুমাপের অনুভব ও আবেগ, নবুওয়ত ও ইসলামের দাওয়াহ পৌঁছানোর কঠিন দায়িত্ব ও আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমারেখা রক্ষার ব্যাপারে তিনি কখনো কোনো খামখেয়ালি করেননি। সিরাত গবেষক ও ঐতিহাসিকরা বলেন, যখন সাদ বিন মুআজ, আসইয়াদ বিন হাজির রাদিআল্লাহু আনহুমা বনি আশহালের বসতিতে ফেরত আসলেন, তাদের পরিবারের নারীদের বললেন- তৈরি হয়ে নাও এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা সাইয়্যিদুনা হজরত হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর জন্য মাতম করো-সে নারীরা তেমনই করল। যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন, তখন তাদের মসজিদে নববির দরজায় কান্নারত পেলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন! ঘরে ফিরে যাও, তোমাদের এখানে আগমনই দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্য একটি বর্ণনায় এটাও পাওয়া যায়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হলো, আনসারি রাদিআল্লাহু আনহুমা নিজেদের মহিলাদের কী উদ্দেশ্যে এখানে পাঠিয়েছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের জন্য আল্লাহ তাআলার দয়া ও মেহেরবাণীর দুআ করলেন। সুন্দর বাক্যে তাদের ডাকলেন এবং বললেন, আমার 'এটা উদ্দেশ্য ছিল না। আমি মৃতব্যক্তির ওপর রোনাজারি পছন্দ করি না। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কান্না করতে নিষেধ করলেন। [৬৬]
এরচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি, শেরে খোদা সায়্যিদুনা হজরত হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর হন্তারক ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহু যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখোমুখি হলেন। মুসলমানরা যখন মক্কা বিজয় করে নিলেন-পৃথিবী তখন ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহুর জন্য অন্ধকার হয়ে উঠল এবং পথ সংকীর্ণ হয়ে গেল। তার ওপর অদৃশ্য বিপদ-আপদ তৈরি হয়ে গেল। তিনি শাম, ইয়ামান এবং অন্য প্রদেশে পলায়নের ইচ্ছা করলেন। তাকে লোকেরা বলল- সরল মানুষ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কোনো লোককে হত্যা করেন না, যে তাঁর ধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছে। তিনি লোকেদের কথায় অশ্বস্ত হলেন এবং কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন। মুসলমান হওয়ার পর যখন তিনি প্রথমবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ইসলামগ্রহণকে স্বীকার করলেন এবং এমন কোনো কথা বললেন না, যার মাধ্যমে ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহুর অন্তরে কোনো প্রকার ভয়ভীতির সৃষ্টি হতে পারে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর হত্যার ঘটনা শুনলেন ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহুর মুখে। যখন ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহু বলে শেষ করলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে মনুষ্য অনুভূতি ও প্রবৃত্তি অবশ্যই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই বিশেষ প্রবৃত্তি এবং আবেগ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়তের অনুগত মস্তিষ্ক এবং দায়িত্বের অনুভূতির সামনে জয়ী হতে পারেনি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তার মুসলিম হওয়াকে অস্বীকার করতে পারতেন অথবা রেগে গিয়ে হত্যা করতে পারতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু তাঁকে এটুকু বললেন : হে আল্লাহর বান্দা, আমার সামনে এসো না। আমি চাই আমার দৃষ্টি তোমার ওপর না পড়ুক। ওয়াহশি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, এরপর প্রতিটি ক্ষণে আমি ভীত থাকতাম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না আবার আমাকে দেখে ফেলে- এভাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিশ্রুত দিন চলে আসল। [৬৭]
বোখারি শরিফে বর্ণিত আছে: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টি যখন আমার ওপর পড়ল, তিনি আমাকে লক্ষ করে বললেন- তুমিই কি ওয়াহশি? আমি বললাম- হ্যাঁ, আমিই ওয়াহশি। নবিজি বললেন- তুমিই কি হামজা রাদিআল্লাহু আনহুকে শহিদ করেছিলে? আমি বললাম- আপনার নিকট যে সংবাদ পৌঁছেছে, সেটা পুরোদস্তুর সত্য। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কি এই কাজটি করতে পারো যে, তুমি আমার সামনে আসবে না? [৬৮]
সেসব প্রকৃতিগত মনুষ্য অনুভূতি, প্রবৃত্তি ও শ্রেষ্ঠতম আবেগের ঝলক এখান থেকেও আমাদের সামনে আসে। একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটির সাথে মিশে যাওয়া একটি পুরাতন কবরের পাশে আসলেন। সে সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে কমলতা প্রকাশ পেল এবং তিনি কান্না করে ফেললেন। তারপর তিনি বললেন, 'এটা আমেনার সমাধিস্থল।' এটা সে সময়কার কথা-যখন তার মৃত্যুর অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। [৬৯]
টিকাঃ
[৫৩] সহিহুল বোখারি, কিতাবুস সালাহ।
[৫৪] মুসান্নিফে আব্দুর রাজ্জাক।
[৫৫] ইবনে আসাকির।
[৫৬] মুসনাদে আহমাদ, সহিহুল মুসলিম।
[৫৭] ইবনে মাজাহ।
[৫৮] বোখারি, মুসলিম।
[৫৯] সহিহুল মুসলিম, কিতাবুল হজ, হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। সেই ছেলের নাম কিছ বর্ণনায় 'ইয়াস' পাওয়া যায়।
[৬০] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল জিহাদ।
[৬১] আহমাদের বর্ণনায়, ৭/২৩-২৪।
[৬২] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি।
[৬৩] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি, তাবুকের যুদ্ধ।
[৬৪] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি।
[৬৫] ইবনে কাসির, ৩/৯৫। ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ এটাকে ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন।
[৬৬] ইবনে কাসির ৩/৯৬।
[৬৭] ইবনে হিশাম ৬/৭৬, বোখারি শরিফে এই ঘটনা কিতাবুল মাগাজি অধ্যায়ে হামজা রাদিআল্লাহু আনহুর হত্যা পরিচ্ছদে উল্লেখ করা হয়েছে।
[৬৮] সহিহুল বোখারি, হামজা রাদিআল্লাহু আনহু হত্যা অধ্যায়।
[৬৯] বায়হাকি, সুফিয়ান সাওরি রাদিআল্লাহু আনহুর বর্ণনায়।
📄 ধৈর্য, সহনশীলতা ও অসহিষ্ণুতা
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম চরিত্র, ধৈর্য, সহনশীলতা ও অসহিষ্ণুতার সামনে সমস্ত মনুষ্যজাতীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা পিছিয়ে ছিল বহুগুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
নিশ্চয়ই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।[৭০]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং বলেন –
أدبني ربي فأحسن تأديبي
আমার শিক্ষা আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন এবং উত্তম করে তৈরি করেছেন।
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إن الله بعثني لتمام مكارم الأخلاق وكمال محاسن الافعال
আল্লাহ তাআলা আমাকে উত্তম চরিত্র এবং উৎকৃষ্ট কাজের পূর্ণতা দিয়ে প্রেরণ করেছেন।”[৭১]
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহার কাছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বললেন-
كان خلقه القرآن
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র ছিল কুরআনের বাস্তব নমুনা।
দয়া ও ক্ষমা, সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, অন্তরের প্রশস্ততা এবং ধৈর্যধারণের যে ক্ষমতা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে বিদ্যমান ছিল, সেখানে কোনো বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধির জোর, কবির চিন্তাশক্তি ও ভাবনা পৌঁছাও ছিল অসম্ভব। যদি এই ঘটনাবলিকে বিশেষ এই পদ্ধতিতে উল্লেখ না করা হতো-যা কোনো প্রকার সন্দেহের ঊর্ধ্বে, তবে মনুষ্য মস্তিষ্ক আজ তা গ্রহণ করত না। কিন্তু এই বর্ণনা এমন পরিমাণ সহিহ এবং লাগাতার এমন বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য রাবী থেকে অন্য বিশ্বস্ত রাবীর মাধ্যমে এমন পন্থা ও পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর মাঝে এমন লাগাতার বিশুদ্ধ দলিল পাওয়ার গেছে, যার কারণে-সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক প্রামাণ্য বিষয়ের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি গ্রহণযোগ্য হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। এখানে আমরা তেমনই কিছু ঘটনা বর্ণনা করব।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দয়া, সহনশীলতা, বড় থেকে বড় শত্রুর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং মহানুভবতার এক নমুনা এমন ছিল : যখন মুনাফিকদের সরদার আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলকে[৭২] কবরে নামানো হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হলেন এবং নির্দেশ দিলেন, তাকে কবর থেকে বের করে আনো! এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জানুর ওপর রাখলেন এবং নিজ মুখের লালা তার ওপর লাগালেন এবং নিজ জামা মোবারক তাকে পরিধান করালেন।[৭৩]
হজরত আনাস বিন মালেক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হাঁটছিলাম। নজরানের একটি চাদর সে সময় نবিজির গায়ে সজ্জা করে ছিল-যার কেনারা ছিল পুরু। রাস্তায় এক গ্রাম্য ব্যক্তি নবিজির দেখা পেল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদর মোবারকে জোরে টান দিল। আমি মাথা উঁচিয়ে দেখলাম, চাদর টানার কারণে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গলায় দাগ পড়ে গিয়েছে। তারপর সেই গ্রাম্য লোকটি বলল- হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর যে সম্পদ তোমার কাছে ছিল, সেটা আমাকে নেওয়ার অনুমতি দাও! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে ফিরে তাকালেন এবং হেসে ফেললেন। অতঃপর বললেন, এটা তাকে দিয়ে দেওয়া হোক! [৭৪]
জায়েদ বিন সা'নাহ (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) রাদিআল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলেন এবং ঋণের টাকা ফেরত চাইলেন, যা তিনি তার থেকে গ্রহণ করেছিলেন। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধ মোবারকের কাপড় ধরে জোরে টানলেন, এবং কঠিন ভাষায় কথা বললেন। তারপর বললেন- তুমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর, বড়ই টালবাহানা করো। উমর রাদিআল্লাহু আনহু তাকে ধমকালেন, এবং উঁচু গলায় কথা বললেন। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা দীপ্তিময় ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাদিআল্লাহু আনহুকে বললেন- উমর, আমি এবং সে ব্যক্তি, উভয়ই তোমার নিকট অন্য কাজের হকদার ছিলাম। আমাকে তুমি ঋণ দ্রুত পরিশোধের পরামর্শ দিতে এবং তাকে নরম ভাষায় কথা বলার পরামর্শ দিতে। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঋণ পরিশোধের এখনো তিনদিন বাকি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাদিআল্লাহু আনহুকে সে ঋণ পরিশোধের আদেশ দিলেন এবং বিশ সা' অতিরিক্ত আদায় করতে বললেন—এটা উমর রাদিআল্লাহু আনহুর তাকে ভীত করার বিনিময় ছিল। আর এই কথাই তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে গেল। [৭৫]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : একবার মক্কার আশি জন অস্ত্রে সজ্জিত লোক 'তানঈম পর্বত' থেকে হঠাৎই নেমে আসল এবং ধোঁকায় ফেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষতি করতে চাইল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সকলকেই বন্দি করেলেন এবং জীবিত থাকতে দিলেন। [৭৬]
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নজদের দিকে সেনা অভিযানে ছিলাম। রাস্তায় দুপুর হয়ে এল এবং বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভূত হলো। এই এলাকায় অধিক পরিমাণে তৃণলতা ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বাবল গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করলেন এবং নিজ তরবারি তাতে ঝুলিয়ে রাখলেন। বাকিরাও বিভিন্ন গাছের ছায়ায় নিজেদের বিশ্রাম দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এই অবস্থায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ডাকলেন, আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। সেখানে এক গ্রাম্য ব্যক্তিকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বসা দেখলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আমি ঘুমিয়েছিলাম, এই ব্যক্তি আসল এবং আমার তরবারি ছিনিয়ে নিল। আমি জাগ্রত হয়ে দেখলাম সে তরবারি নিয়ে আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে বলল- তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারবে? আমি বললাম- আল্লাহ তাআলা। সে তরবারি কোষবদ্ধ করে নিল।"[৭৭] তারপর সে বসে পড়ল। আর এই হলো সে ব্যক্তি- যে তোমাদের সামনে বসে আছে। বর্ণনাকারী বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোনো শাস্তি দেননি।[৭৮]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নম্রতা, সহনশীলতার এই অবস্থান, সকল সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুমের নম্রতা মিলিয়েও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমকক্ষ ছিল না। অথচ সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন নম্রতা, ভদ্রতা, সহনশীলতার পূর্ণ সংমিশ্রণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থান সে সমস্ত বিষয়ে সকলের জন্য এক বন্ধুবর শিক্ষক, দয়ালু-মেহেরবান শুভাকাঙ্ক্ষী ও অভিভাবক ছিলেন। তার একটি নমুনা হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহুর বর্ণনায় আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি বলেন: একবার এক গ্রাম্য লোক মসজিদে পেশাব করে দিল। এটা দেখে লোকেরা তার ওপর হামলে পড়ল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও এবং যেখানে সে পেশাব করেছে সেখানে এক বালতি বা কয়েক বালতি পানি ঢেলে দাও, এবং স্মরণ রেখো, তোমাদের সহজাত নম্রতা সৃষ্টির জন্য পাঠানো হয়েছে। সংকীর্ণতা ও কঠোরতা তৈরি করতে পাঠানো হয়নি।[৭৯]
মুআবিয়া বিন হাকাম রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নামাজ পড়ছিলাম। এক ব্যক্তির হাঁচি আসল, আমি বললাম 'অ্যায়ারহামুকাল্লাহ'। লোকেরা এটা শুনে আমাকে দেখতে লাগল। আমি বললাম, তোমাদের মা তোমাদের জন্য কান্না করুক। কী এমন হয়েছে, যার জন্য তোমরা আমাকে এমন বাঁকা দৃষ্টিতে দেখছ? এটা শুনে লোকেরা নিজেদের জানুর ওপর আঘাত করতে লাগল। যখন আমি বুঝলাম আমাকে চুপ করতে ইশারা করা হচ্ছে, আমি চুপ হয়ে গেলাম।
যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ শেষ করলেন-আমার মা-বাবা তাঁর ওপর কুরবান হোক! আমি না নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে, তাঁর মতো কোনো অভিভাবক ও শিক্ষক পেয়েছি, আর না নবিজির পরে কেউ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে না ধমকালেন, না মারলেন আর না কোনো কঠিন ভাষা ব্যবহার করলেন। শুধুমাত্র এটুকু বললেন, নামাজে সাধারণ মনুষ্যসুলভ কথা বলার অনুমতি নেই। নামাজ শুধু তাসবিহ, তাকবির ও কোরআন তেলাওয়াতের জন্য।[৮০]
হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব দয়ালু ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর নিকট যদি কোনো প্রয়োজনগ্রস্ত আসত, তিনি অবশ্যই তার সাথে ওয়াদা করতেন এবং কিছু থাকলে তখনই তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিতেন। একবার তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন, এক গ্রাম্য লোক এগিয়ে আসল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাপড় ধরে বলতে লাগল, আমার একটি সাধারণ প্রয়োজন থেকে গেছে। আমার ভয় হচ্ছে, আমি আবার তা না ভুলে যাই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে গেলেন। যখন লোকটির কাজ সম্পন্ন হলো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় আসলেন এবং নামাজ আদায় করলেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, প্রশস্ততা এবং ধৈর্য ও শ্রেষ্ঠত্বের নমুনা সম্পর্কে নবিজির খাদেম হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু সাক্ষ্য সে সময় দিয়েছিলেন, যখন তিনি অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন : আমি দশবছর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমত করেছি। না তিনি কখনো 'হু' শব্দ ব্যবহার করেছেন, না কখনো বলেছেন সে কাজ তুমি কেন করলে না, বা সে কাজ তুমি কেন করলে?” [৮১]
হজরত সাদ বিন উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হলাম। তখন আমার কাপড়ে জাফরান ছড়ানো সুগন্ধির আলামত ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখে বললেন- নিক্ষেপ করো, এবং আমার পেটে একটি ছড়ি দিয়ে মারলেন, যা দ্বারা আমি ব্যাথা অনুভব করলাম। আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার কেসাসের অধিকার আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেট থেকে কাপড় সরিয়ে নিলেন এবং বললেন, কেসাস নিয়ে নাও![৮২]
টিকাঃ
[৭০] সূরা কলম।
[৭১] শরহুস সুন্নাহ, মিশকাতুল মাসাবিহ।
[৭২] নবম হিজরিতে তাবুক থেকে ফেরার পথে তার মৃত্যু হয়।
[৭৩] সহিহুল বোখারি।
[৭৪] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল জিহাদ।
[৭৫] বায়হাকির বর্ণনা অনুযায়ী।
[৭৬] সহিহুল মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ।
[৭৭] এখানে 'শামাহ' শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এটার দুটি অর্থ হতে পারে, যেমন: 'তিনি তরবারি কোষবদ্ধ করে নিলেন।' আর এই অর্থও হতে পারে, 'তিনি তরবারি বের করলেন এবং তা দেখলেন।'
[৭৮] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মাগাজি।
[৭৯] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল অজু।
[৮০] সহিহুল মুসলিম, বাবে তাহরিমুল কালামি ফিস-সালাত।
[৮১] সহিহুল মুসলিম, নবিজি সা. এর উত্তম চরিত্র সম্পর্কিত অধ্যায়ে।
[৮২] কিতাবুশ শিফা। অবগত হওয়া উচিত, সাদ রা. এটা মজার ছলে বলেছিলেন, কেসাস নেওয়ার জন্য নয়।