📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য

📄 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য


রাসুলুল্লাহর সচ্চরিত্র, উত্তম গুণাবলি এবং সুনিপুণ দেহসৌষ্ঠব
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম চরিত্র, সৌন্দর্যমণ্ডিত গুণাবলি এবং অভিজাত জীবনচরিত সম্পর্কে হজরত হিন্দ বিন আবি হালাহ রাদিআল্লাহু আনহু (তিনি উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহার পুত্র এবং হজরত হাসান, হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুমার মামা ছিলেন। তিনি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও সুসাহিত্যিক ছিলেন) তার ভাষায় বলেন:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় আখেরাতের চিন্তা এবং আখেরাতের পরিণামের ভাবনায় নিমগ্ন থাকতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়মিত অবস্থা এমন ছিল, তিনি কখনো স্বস্তিবোধ করতেন না। অধিকাংশ সময় নিরবতার মাঝে পার করতেন। একদমই অপ্রয়োজনীয় কথা বলতেন না। যখন কথা বলার প্রয়োজন বোধ করতেন খুব স্পষ্ট করে মুখ খুলতেন এবং কথা বলতেন, [১] এবং সেভাবেই শেষ করতেন। তাঁর কথা, বক্তৃতা সবসময় পরিষ্কার, সুস্পষ্ট এবং ধীরগতিতে হতো। না তাতে অপ্রয়োজনীয় কোনো কথা থাকত, না তা অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ত হয়ে যেত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বভাব ছিল খুবই শান্ত, এবং কথাবার্তায় ছিলেন খুবই কোমল ও নম্র। রুক্ষতা, কঠোরতা ছিল তাঁর স্বভাববিরোধী। তিনি না কাউকে তিরস্কার করতেন, আর না নিজে তিরস্কৃত হওয়া পছন্দ করতেন।” নেয়ামতের [২] পূর্ণ সম্মান করতেন এবং তার খুব খেয়াল রাখতেন-সেটা পরিমাণে যত নগন্যই হোক না কেন! কখনোই তিনি নেয়ামতের দুর্নাম করতেন না। দুনিয়া এবং দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত যেকোনো ঘটনা ঘটত, সেসব নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো রাগান্বিত হতেন না। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলার কোনো নির্দেশ অমান্য করা হতো, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গোস্বার সামনে কেউ স্থির থাকতে পারত না-যতক্ষণ না তিনি এই কাজের ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিতেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জন্য না কখনো রাগান্বিত হতেন, না কখনো তার ক্ষতিপূরণ আদায় করতেন। যখন তিনি কোনোদিকে ইশারা করতেন, পুরো হাত দিয়ে ইশারা করতেন। যখন কোনো অবাক করা বিষয় বলতেন, বিস্তারিত বলতেন। কথা বলার সময় ডান হাতের কব্জিকে বাম হাতের আঙুল দিয়ে ধরে রাখতেন। কটু কিংবা অমনঃপুত কথা হলে সেদিক থেকে চেহারা মোবারক ঘুরিয়ে নিতেন এবং বিমুখ হয়ে যেতেন। কখনো আনন্দিত হলে মাথা নিচু করে নিতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাসি অধিকাংশ সময় তাবাসসুম ছিল, হাসলে শুধু নবিজির মুক্তার ন্যায় চকচকে এবং পবিত্র দাঁত মোবারক প্রকাশ পেত।
হজরত আলি রাদিআল্লাহু আনহু, যিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশের ছিলেন, যার ইলমের এক বিশাল ভাণ্ডার অর্জিত ছিল, যার চরিত্র, ভাবনা, দর্শন অন্য সাধারণ মানুষ থেকে উৎকৃষ্ট ছিল এবং যিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছের মানুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সেজন্য তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চারিত্রিক গুণাবলি এবং ব্যবহারবিধি সবচেয়ে ভালো জানতেন। তিনি নবিজির ঐশ্বর্যপূর্ণ চরিত্র সম্পর্কে বলতেন-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় নোংরা কথাবার্তা, নির্লজ্জতা এবং বেহুদা কাজ থেকে দূরে থাকতেন। ঘটনাক্রমেও এমন কোনো কথা কিংবা কাজ তাঁর দ্বারা সংঘটিত হতো না। কিছু ক্রয় করার সময় কখনোই তাঁর আওয়াজ উঁচু করতেন না। খারাপ কাজের শোধ কখনোই খারাপ কিছু দিয়ে নিতেন না, বরং ক্ষমা ও উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে তা সমাধা করতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কারো ওপর হাত তুলেননি, কেবল তখনই হাত তুলতেন—যখন যুদ্ধের ময়দানে কেউ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে লড়তে আসত। স্ত্রী কিংবা গোলামের ওপর কখনোই হাত তুলতেন না। আমি কখনোই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর ওপর করা অন্যায় অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে দেখিনি-যতক্ষণ না কেউ আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত গণ্ডির বাহিরে চলে যায়, অথবা মহিয়ানের ইজ্জত সম্মানে বিন্দুমাত্র আঁচড় ফেলে। হ্যাঁ, কেউ যদি আল্লাহ তাআলার কোনো নির্দেশকে অবমূল্যায়ন করে। কিংবা আল্লাহ তাআলার সম্মানে বিন্দুমাত্র আঁচ আনার চেষ্টা করে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের থেকে অধিক রাগান্বিত কেউ হতো না। যখন দুটি বিষয় থাকত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তুলনামূলক সহজ বিষয়টিকে গ্রহণ করতেন। যখন তিনি নিজ আবাসস্থলে আগমন করতেন, একদম সাধারণ মানুষের মতো থাকতেন। নিজের কাপড় পরিষ্কার করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন এবং নিজের সমস্ত প্রয়োজন নিজেই পূরণ করতেন।
সবসময় নিজের জিহ্বা মোবারক নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। কেবল সে কথাই বলতেন, যার মাধ্যমে কোনো উপকার পাওয়া যায়। সকলের মন রক্ষা করে চলতেন, কখনো কারো প্রতি ঘৃণা পোষণ করতেন না। কোনো গোত্র কিংবা বংশের সম্মানিত ব্যক্তি আসলে তাদের সাথে খুব সম্মান এবং মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করতেন, তাদেরকে ভালো এবং উত্তম কাজে একতাবদ্ধ হতে উৎসাহিত করতেন, অনুগতদের বিষয়ে সতর্ক থাকার হুঁশিয়ারি করতেন। তিনি নিজের সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও উত্তম ব্যবহার থেকে কাউকে নিরাশ না করার আদেশ করতেন। তিনি নিজ পরিবার-পরিজনের নিয়মিত খবর রাখতেন। লোকেদের কাছে তাদের হাল-হাকিকত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন।
ভালো কাজের ব্যাপারে ভালো বলতেন এবং সেটাকে শক্তিশালী করতেন। খারাপ কাজকে খারাপ বলতেন এবং তাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লেনদেন সংযত এবং এক ধারায় ছিল। তিনি কখনো কোনো বিষয় থেকে সম্পূর্ণ গাফেল হয়ে যেতেন না। ভয় করতেন অন্য লোকেরাও যাতে গাফেল হয়ে পথভ্রষ্ট না হয়ে পড়ে। প্রত্যেক অবস্থায়, যেকোনো জায়গার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রয়োজন অনুপাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বিদ্যমান থাকত। তিনি না কারো প্রাপ্য আদায়ে সংকীর্ণ মনোভাব রাখতেন, না সীমাতিরিক্ত দিয়ে দিতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটবর্তী তারাই হতো-যারা সবার মধ্যে উত্তম এবং গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত হতো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট সবচেয়ে প্রিয় তারা হতো, যারা সকলের ভালো চাইত এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করত। সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং নৈকট্যপ্রাপ্ত সে ব্যক্তি ছিল-যে সহানুভব, ধৈর্য, পরোপকার এবং অন্যের সহযোগিতায় সবচেয়ে অধিক ভূমিকা রাখত। তিনি আল্লাহর নাম জপতে জপতে দাঁড়াতেন এবং জপতে জপতেই বসতেন। যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও আগমন করতেন, মজলিসের যেখানে জায়গা খালি পেতেন, সেখানেই বসে যেতেন এবং অন্যদেরও এই আদেশ করতেন। তিনি নিজ মজলিসে সকলকে (মনোযোগ এবং একাগ্রতার বিষয়ে) সমপরিমাণ অংশ দিতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে উপস্থিত সকল শ্রোতা ভাবত, তার থেকে অধিক মনোনিবেশ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য কারো প্রতি করেননি। যদি কোনো ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোনো কারণে বসতে বলত কিংবা কোনো প্রয়োজনে তাঁর সাথে কথা বলতে চাইত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদম শান্ত এবং নিবিড় হয়ে তার পূর্ণ কথা শুনতেন-যতক্ষণ না সে ব্যক্তি নিজের কথা শেষ করে চুপ হয়ে যেতেন। যদি কোনো ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কিছু চাইত বা সাহায্যপ্রার্থনা করত, তবে তার প্রয়োজন পূরণের পূর্বে তিনি ফিরতেন না, অথবা কমপক্ষে নরম ও মিষ্ট ভাষায় তাকে সন্তুষ্টির জবাব দিতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম ব্যবহার সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের দায়িত্ববান পিতা বনে গিয়েছিলেন। আর সকল মানুষের দায়িত্ব পালনে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো তফাৎ করেননি, বরং তাঁর কাছে সবার প্রাপ্তি বরাবর হতো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিস ইলম, আধ্যাত্মিকতা, লজ্জা, শরম, ধৈর্য, আমানতদারির মজলিস ছিল। না সেখানে কেউ তার কণ্ঠ উঁচু করত, না সেখানে কারো দোষচর্চা হতো। না কারো সম্মান কিংবা আত্মমর্যাদায় আঘাত করা হতো, না কারো অপারগতার ওপর ভর্ৎসনা করা হতো। সবাই একে অপরের সমমূল্যায়ণ পেত। শুধুমাত্র খোদাভীতির ওপর ভিত্তি করেই একের ওপর অপরের মর্যাদা বৃদ্ধি পেত। নবিজির মজলিসে ছোটরা বড়দের সম্মান করত, বড়রা ছোটদের স্নেহ এবং ভালোবাসায় আগলে রাখত। সেখানে অভাবগ্রস্তকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হতো। বিদেশী ও পথিকদের দেখভাল করা হতো এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের রক্ষার কড়া নির্দেশ থাকত।
হজরত আলি রাদিআল্লাহু আনহু আরও বলেন-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় হাস্যোজ্জল চেহারা ও সজীব হাস্যবদনে থাকতেন। তিনি খুবই শান্ত চরিত্রের এবং নরম মনের অধিকারি ছিলেন। [৩] না কঠিন মেজাজের ছিলেন, না কঠিন ভাষা ব্যবহার করতেন। আওয়াজ উঁচু করে কথা বলতেন না, বেহুদা ও অপ্রয়োজনীয় কথাও বলতেন না। না কারো ওপর দোষ চাপাতেন, আর না সংকীর্ণ মনের অধিকারী ছিলেন। যে কথা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পছন্দ না হতো তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন (অর্থাৎ তা থেকে নিবৃত্ত থাকতেন এবং কোনো কথা বলতেন না)। তবে সরাসরি বিমুখ ভাব প্রকাশ করতেন না, কোনো জবাবও দিতেন না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি কাজ থেকে নিজেকে সবসময় বাঁচিয়ে রাখতেন- ক. কারো দোষচর্চা করতেন না।
খ. কারো ওপর অন্যায় দোষ চাপাতেন না।
গ. কারো দুর্বলতা কিংবা গোপন কাজের পিছনে লাগতেন না।
তিনি শুধু সেসব কথাই বলতেন, যার মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার আশংকা করতেন। যখন তিনি কথা বলতেন মজলিসে উপস্থিত সকল ব্যক্তি তাদের মাথা এভাবে নামিয়ে নিতেন, মনে হতো তাদের মাথার ওপর কোনো পাখি অবস্থান করছে। [৪] যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে শেষ করতেন, তখন তারা কথা বলত। কখনো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে উচ্চ আওয়াজে কথা বলত না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে যদি কোনো ব্যক্তি কথা বলত, বাকিরা খামুশ হয়ে তার কথা শুনত-যতক্ষণ না তার বলা শেষ হতো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে প্রত্যেক ব্যক্তির গুরুত্ব সে পরিমাণ হতো, তার আগের ব্যক্তির যে পরিমাণ মূল্যায়ণ করা হতো (অর্থাৎ পূর্ণ তৃপ্তিসহকারে তার কথা বলার সুযোগ থাকত, এবং পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা হতো)।
যে কথায় সবাই হাসত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সে কথায় হাসতেন। যে বিষয়ে সবাই আশ্চর্যবোধ করত, তিনিও সে কথায় আশ্চর্যবোধ প্রকাশ করতেন। মুসাফির এবং বিদেশীদের ভিন্ন চোখে দেখতেন না, তাদের সবধরনের কথা শুনতেন অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে-যতক্ষণ না কোনো সাহাবি হজরত এমন লোককে নিজের দিকে আকর্ষিত করত (যাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর পীড়াদায়ক না হয়)।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, 'যদি কোনো দুর্দশাগ্রস্ত তোমার সামনে আসে, তবে তাকে সাহায্য করো!' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু তাদের প্রশংসা বা কৃতজ্ঞতাই শুনতেন, যারা সে বিষয়ে সীমাতিক্রম করত না। কারো কথা বলার মাঝখানে তিনি কথা বলতেন না এবং কারো কথাকে মাঝখানে থামিয়ে দিতেন না। হ্যাঁ, যদি কেউ সীমা পার করে ফেলত, তবে তাকে চুপ হয়ে যেতে বলতেন কিংবা স্বয়ং সে মজলিস থেকে উঠে যেতেন—যাতে সে লোক কথা সমাপ্ত করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবার থেকে প্রশস্ত দিল, উদার মনোভাব, মিষ্টভাষী এবং দয়ালু চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। লেনদেনের ব্যাপারে খুবই সতর্ক এবং আমানতদারিতে সর্বোচ্চ স্তরের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রথমবার দেখত, সে ভীত হয়ে পড়ত। যখন তাঁর সান্নিধ্যে থাকত, তাঁর বিষয়ে জানাশোনা বাড়ত, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারী এবং শুভাকাঙ্ক্ষিতে পরিণত হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নৈকট্যপ্রাপ্তরা বলতেন, 'না, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বে এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকে দেখেছি, না নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর এমন কাউকে দেখেছি।[১]
আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিকে পরিপূর্ণতার সজ্জায় সজ্জিত করেছেন এবং দয়া ও ভালোবাসার সৌন্দর্যে অলঙ্কিত করেছেন। হজরত হিন্দ বিন আবি হালাহ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আত্মপ্রত্যয়, গাম্ভীর্য এবং শান ও শওকতের বাহক ছিলেন। অন্য সাধারণের নিকটও অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা চৌদ্দ তারিখ রাতের চাঁদের চেয়েও অধিক চমকদার ছিল।[২]
হজরত বারা বিন আ'জিব রাদিআল্লাহু আনহু বলতে-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝারি গড়নের ছিলেন। আমি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লাল আলখেল্লা পরিহিত দেখেছিলাম। এর থেকে সুন্দর কোনো কিছু আমি আর কখনো দেখিনি।[৩]
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বলতে-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝারি গড়নের ছিলেন, প্রায় দীর্ঘকায়। গাত্র ছিল অত্যন্ত গৌরবর্ণের, দাড়ি মোবারকের চুল ছিল কালো, মুখাবয়ব ছিল অত্যন্ত সুন্দর, ভ্রুযুগল ছিল দীর্ঘ। বর্ণনার শেষদিকে বলেন, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে কিংবা পরে তাঁর অনুরূপ কাউকে দেখিনি।[৪]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলে-আমি রেশম এবং রেশমের কাপড়কেও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হস্ত মোবারকের চেয়ে মোলায়েম পাইনি। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুগন্ধির সমতুল্য কোনো সুগন্ধিও পাইনি।[৫]

টিকাঃ
[১] অর্থাৎ অহংকারিদের মতো অমনোযোগিতা কিংবা আত্মম্ভরিতা দেখিয়ে কথা বলতেন না।
[২] এখানে المهين শব্দ আনা হয়েছে। এখানকার 'মিম' অক্ষরটিকে জবর, পেশ উভয়ই পড়া যায়। পেশযোগে পড়লে অর্থ দাঁড়াবে: তিনি কাউকে তিরস্কার করতেন না। আর যদি জবরযোগে পড়া হয়, তবে অর্থ দাঁড়াবে: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জন্য তিরস্কার কিংবা অপদস্থতা পছন্দ করতেন না। উদ্দেশ্য এমন হবে: না তিনি কঠোর ব্যবহার করতেন, না তিনি এমন দুর্বল মননের ছিলেন- যে প্রত্যেক বিষয়কেই মেনে নিবেন। বরং তিনি কমল এবং বড়ত্বের সমুষ্ঠি ছিলেন।
[৩] অর্থাৎ খুব দ্রুতই দয়ালু হয়ে যেতেন। অনেক বেশি মেহেরবান এবং দয়াময় ছিলেন। খুব দ্রুত এবং খুব সহজেই মাফ করে দিতেন। এখানের আরেকটি উদ্দেশ্য এটাও হয়, তিনি কখনো কারো সাথে ঝগড়া করতেন না। একটি মত এমনও পাওয়া যায়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য শান্ত, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং খুশু-খুজু।
[৪] অর্থাৎ বিলকুল নাড়াচাড়া করতেন না, নাড়ালে হয়তো মাথার উপর থেকে পাখি উড়ে যাবে।
[১] শামায়েলে তিরমিজি।
[২] হজর ত হাসান রাদিআল্লাহু আনহু থেকে হিন্দ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন (শামায়েলে তিরমিজি)।
[৩] বোখারী, মুসলিম।
[৪] বোখারী শরিফ, আল আদাবুল মুফরাদ, 'নবি সা. কারো দিকে ফিরলে পূর্ণ ফিরতেন' অনুচ্ছেদ।
[৫] বোখারী, মুসলিম।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 নবিজির দৃষ্টিতে দুনিয়ার অবস্থান এবং তার প্রতি অনীহা

📄 নবিজির দৃষ্টিতে দুনিয়ার অবস্থান এবং তার প্রতি অনীহা


দিনার, দেরহাম এবং দুনিয়ার মাল সম্পদ ও ঐশ্বর্যের সাথে নবিজির সম্পর্ক এমন ছিল যে, অর্থ সম্পদের বড় থেকে বড় স্তুপ, উচ্চ পর্যায়ের বাক্য, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টিতে অবস্থান তৈরির কোনো যোগ্যতা রাখত না। কেননা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইমানি, রূহানি দরসগাহে উপবিষ্ট ছাত্ররা-আরব অনারবে অবস্থানরত তার অনুসারী এবং শুভাকাঙ্ক্ষিরাও দিনার দেরহামকে মূল্যহীন টুকরোর চেয়ে অধিক মূল্যায়ন করেন না। তাদের দরবেশী জীবনযাপন, দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি অনীহা, অন্যের প্রয়োজনে নিজ সম্পদ ব্যয়ের প্রবণতা এবং অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা, শত্রুর সাথে নম্র ব্যবহার, একের ওপর অন্যকে প্রাধান্য না দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রামাণিক ঘটনাপুঞ্জি মনুষ্য মস্তিষ্ককে দ্বিধায় ফেলে দেয়।
যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারিদের অনুসারির এই হাল, সেখানে অনুমান করা যাক, স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- যিনি এই দুনিয়াবিমূখ দলের প্রধান, ইমাম, পথপ্রদর্শক ও প্রত্যেক ভালো, স্বচ্ছ, উত্তম কাজে তাদের নেতা-সেই মহান ব্যক্তির অবস্থান কেমন হবে এ বিষয়ে-তা কি আর বলার প্রয়োজন রাখে?
আর সেজন্য আমরা এই বিষয়ে কেবল সেসকল কথাগুলোই তুলে ধরব, যা সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুমের জবান হয়ে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। কেননা [১৯] ঘটনার চেয়ে অধিক বাস্তবসম্মত আর কিছু নেই এবং এরচেয়ে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য কোনো বিষয় হতেও পারে না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসিদ্ধ প্রভাবান্বিত উক্তি, যে উক্তির প্রতিটি অক্ষর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিপূর্ণ আদায় করে চলেছেন, এবং যেটাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো জীবনের মূলপাঠ ও মেরুদণ্ড হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়। সেটা হলো-
اللَّهُمَّ لَا عَيْشَ إِلَّا عَيْشُ الْآخِرَةِ
হে আল্লাহ, মুল জীবন তো আখেরাতের জীবন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন-
مالى وللدنيا وما أنا والدنيا إلا كراكب استظل تحت شجرة ثم راح وتركها
দুনিয়ার সাথে আমার কীসের সম্পর্ক! দুনিয়ার সাথে তো আমার এতটুকু সময়ের সম্পর্ক, যেমন কোনো মুসাফির চলার পথে গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য অবস্থান করে পুনরায় নিজ পথে চলতে শুরু করে-ছায়াকে উপেক্ষা করে।
হজরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চাটাইয়ের ওপর শয়নরত দেখলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিঠে চাটাইয়ের ছাপ পড়ে গিয়েছিল। এই দৃশ্য অবলোকন করে উমর রাদিআল্লাহু আনহুর চোখ ভিজে উঠল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?' উমর রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আল্লাহ তাআলার সমস্ত সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠ। অথচ আরাম আয়েশ করছে কেসরা-কায়সার!' এটা শুনে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করল, এবং তিনি বললেন, 'ইবনে খাত্তাব, তোমার কোনো সন্দেহ আছে?' পুনরায় তিনি বললেন, 'তাদের (কেসরা-কায়সার) দুনিয়ার জীবনে সকল সাধ পূরণ করে দেওয়া হচ্ছে।'[২০]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই প্রকার জীবনোপায় ও মাপকাঠি শুধু নিজের জন্যই অপছন্দ করতেন না, বরং আহলে বায়তের জন্যও এমন জীবনোপায়কে স্বাচ্ছন্দ্যযোগ্য ভাবতেন না। সেজন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন-
اللهم اجعل رزق ال محمدا قوتا
হে আল্লাহ, মুহাম্মাদের বংশধরদের রিজিক, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দিন![২১]
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বলতেন: কসম সে সত্তার, যার হাতে আবু হুরাইরার জীবন, আল্লাহ তাআলার নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার পরিবার কখনো লাগাতার তিনবেলা পেট ভরে গমের রুটি খেতে পারেননি-দুনিয়াকে বিদায় জানানোর পূর্ব পর্যন্ত।[২২]
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমরা আহলে বায়তরা এক চাঁদ পার করে পরবর্তী চাঁদ মাসে পৌঁছে যেতাম, কিন্তু আমাদের চুলায় আগুন ধরত না। শুধু খেজুর ও পানি আমাদের জীবনধারণের উৎস হতো।[২৩]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বর্ম এক ইহুদির কাছে বন্ধক রাখা হয়েছিল, এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থা এমন ছিল না যে-তা ফেরত আনবে। আর এ অবস্থাতেই তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।[২৪]
বিদায় হজের সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত উম্মতে মুহাম্মাদীর বিস্তৃতি ছিল। গোটা আরবজাহান নবিজির সীলমোহরে আবদ্ধ ছিল। সেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থা এমন ছিল, তিনি নিম্নমানের একটি হাওদায় আরোহিত ছিলেন। গায়ে একটি চাদর জড়ানো ছিল মাত্র, যার মূল্য চার দিরহামের বেশি ছিল না। সে-সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে আল্লাহ এমন হজ পালনের তাওফিক দাও, যার মাঝে কোনো অহংকার বা খ্যাতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি না হয়।"[২৫]
হজরত আবু জর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- আমার আকাঙ্ক্ষা নেই যে, আমার কাছে যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনা থাকে এবং তিনদিন অতিক্রান্ত হয়- তার মধ্য থেকে একটি দিনারও আমার কাছে বাকি থাকবে-শুধুমাত্র দীনি কোনো কাজের জন্য অল্পকিছু বাকি রাখা ছাড়া, অন্যথায় সব স্বর্ণ আমি আল্লাহর বান্দাদের এভাবে এভাবে বিলাতাম, তাদের আগেপিছে, ডানে-বামে তা লুটিয়ে পড়ত।[২৬]
হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : কখনো এমন হয়নি যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কোনো জিনিসের প্রার্থনা করা হয়েছে, আর তিনি এর জবাবে কিছুই বলেননি। [২৭]
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- দান, উদারতা, বদান্যতা প্রকাশে ঝড়ো হওয়ার চেয়েও দ্রুতগামী ছিলেন। [২৮]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, একবার এক ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কিছু প্রার্থনা করল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বকরি এবং ভেড়ার পাল দান করে দিলেন-যা পাহাড়ে চড়ানো অবস্থায় ছিল। সেসব বকরি নিয়ে লোকটি নিজ গোত্রের কাছে ফিরে গেল এবং বলতে শুরু করল, 'হে আমার সম্প্রদায়, ইসলাম গ্রহণ করে নাও! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে দান করছেন- যেন তার দারিদ্রতা এবং ক্ষুদপিপাসার কোনো ভয়ই নেই। একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে ন'হাজার দেরহাম হাদিয়া আসল। দেরহামগুলোকে একটি চাটাইয়ের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে সেগুলোকে ভাগ করতে শুরু করলেন এবং কোনো প্রার্থনাকারীকেই ফিরিয়ে দিলেন না-যতক্ষণ না সেগুলো শেষ হয়ে গেল।

টিকাঃ
[১৯] এই বিষয়ের ওপর বিস্তারিত জ্ঞান অর্জনের জন্য আবদুল্লাহ বিন মোবারক রহিমাহুল্লাহুর 'কিতাবুল জুহুদ' গ্রন্থটি অত্যন্ত উপকারী হবে।
[২০] হাদিসটির মূল ভাষ্য বোখারি এবং মুসলিমে রয়েছে।
[২১] সহিহুল বোখারি, সহিহুল মুসলিম।
[২২] বোখারি, আহমাদ, সহিহুল মুসলিম: কিতাবুল জুহুদ।
[২৩] বোখারি, মুসলিম।
[২৪] তিরমিজি
[২৫] হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, শামায়েলে তিরমিজি।
[২৬] বোখারি, মুসলিম।
[২৭] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল আদব।
[২৮] হাদিসের পূর্ণ অংশ বোখারি এবং মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 সৃষ্টিজীবের সাথে নবিজির আচরণ

📄 সৃষ্টিজীবের সাথে নবিজির আচরণ


সেই সুখময় ইবাদাত, যা দুনিয়া এবং দুনিয়ার আসবাবের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না। পূর্ণাঙ্গীন আল্লাহভীতি, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং তার দরবারে রোনাজারি ও দুআ-মোনাজাতের মাধ্যমে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাস্যময় ললাট, উত্তম চরিত্র, দয়া, ভালোবাসা, দিলদারি এবং প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য অধিকার আদায়, এবং সকলের অবস্থান অনুপাতে সম্মান প্রদর্শন করার মাঝে কোনো পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হতো না। আর এগুলোকে তিনি এমনভাবে বাস্তবায়ন করতেন, যা অন্য কোনো মানুষের মাধ্যমে করা সম্ভব হয় না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
لو تعلمون ما أعلم لضحكتم قليلا ولبكيتم كثيرا
যা আমি জানি, যদি তা তোমরা জানতে, তবে কম হাসতে এবং অধিক কাঁদতে।[২৯]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত মানবজাতির মাঝে সবচেয়ে প্রশস্ত মন, নম্র স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। বংশগতভাবে ছিলেন সব থেকে সম্মানি বংশের। নিজ সঙ্গী-সাথীদের থেকে পৃথক থাকতেন না, বরং তাদের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন। তাদের সাথে কথা বলতেন, তাদের সন্তানাদিদের সাথে হাসি মজাক করতেন, বাচ্চাদের কোলে তুলে নিতেন। গোলাম, আজাদ, বাঁদি, দরিদ্র, সকলের ডাকে সাড়া দিতেন। অসুস্থদের দেখতে যেতেন, চাই সে শহরের অপর প্রান্তেই হোক না কেন! প্রয়োজনগ্রস্তের প্রয়োজন মেটাতেন।[৩০] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনো সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে পা বিছিয়ে বসতে দেখা যায়নি-যাতে করে এর মাধ্যমে কারো কোনো সমস্যা কিংবা অস্বস্তি অনুভূত না হয়।
হজরত আবদুল্লাহ বিন হারেস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক হাস্যোজ্জল আর কাউকে দেখিনি।"[৩১] হজরত জাবের বিন সামুরাহ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে আমার শ'য়ের অধিক বার বসার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি একবার দেখলাম সাহাবায়ে কেরাম একে অপরকে কবিতা আবৃত্তি করে শুনাচ্ছেন, জাহেলী যুগের ঘটনাবলির স্মৃতিচারণ করছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপচাপ শুনছেন, মাঝে কখনো হাসির কথা আসলে মুচকি হাসছেন।[৩২]
হজরত শুরাইদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে উমাইয়া বিন সালতের কবিতা শুনানোর আদেশ করলেন, সুতরাং আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার কবিতা পড়ে শুনালাম।[৩৩]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত নরম মনোভাবের অধিকারী ছিলেন। দয়া ও ভালোবাসার মূর্তমান প্রতিক ছিলেন। মনুষ্য অনুভূতি ও উত্তম চরিত্রের নমুনা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতে সুন্দর ও সর্বোৎকৃষ্টভাবে উদ্ভাসিত হয়। হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কন্যা হজরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহাকে বলতেন- আমার উভয় পুত্রকে (হাসান, হুসাইন রা.) ডাকো, তারা দৌড়ে আসত। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের গালের সাথে লাগাতেন তারপর তাঁদের বুকের সাথে জড়িয়ে নিতেন।[৩৪] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নিজ দৌহিত্র হজরত হাসান বিন আলি রাদিআল্লাহু আনহুকে ডাকলেন, তিনি দৌড়ে আসলেন এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোলে উঠে বসলেন। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাড়িতে আঙুল দিয়ে খেলতে লাগলেন। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মুখ খুলে দিলেন এবং হাসান রাদিআল্লাহু আনহু নবিজির মুখে নিজের মুখ প্রবেশ করালেন।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন: জায়েদ বিন হারিসাহ রাদিআল্লাহু আনহু (যিনি নবিজির গোলাম ছিলেন) মদিনায় এসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে আগমন করলেন। তিনি দরজায় এসে হাঁক দিলেন, তার আওয়াজ শুনে ততক্ষণাৎ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সে সময় পুরোপুরি বস্ত্রাবৃত ছিলেন না। শরীর থেকে চাদর পড়ে যাচ্ছিল, এটা লক্ষ করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআনাকা করলেন এবং চুমু খেলেন।[৩৫]
হজরত উসামা বিন জায়েদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক কন্যা এসে তাঁকে খবর দিল, আমার সন্তান শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে। আপনি এখনই সেখানে আসুন! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সালাম জানালেন এবং বললেন, আল্লাহর জন্য যা, তা আল্লাহ তাআলা নিয়ে নিবেন। আর তার জন্য তা-ই, যা তিনি দান করেছেন। প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কেই সে মহান সত্তার কাছে লিখিত ও নির্ধারিত আছে। সেজন্য উচিত ধৈর্যধারণ করা, এবং এর বিনিময়ে সওয়াবের নিয়ত ও আকাঙ্ক্ষা রাখা। তথাপিও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কসম দিয়ে বললেন, আপনি অবশ্যই আগমন করুন! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন, আমরাও তার সাথে দাঁড়ালাম। যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে তাশরিফ আনলেন, বাচ্চাটিকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আনা হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাটিকে হাতে তুলে নিলেন। তখন বাচ্চাটির শ্বাস ফুরিয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে শুরু করল। হজরত সাদ রাদিআল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন- ইয়া রাসুলুল্লাহ, এটা কী? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা আল্লাহর রহমত- যা তিনি বান্দাদের মধ্যে যাকে খুশি তার অন্তরে ঢেলে দেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাঁর দয়ালু বান্দার ওপরই দয়া করেন।[৩৬]
যখন বদরের যুদ্ধবন্দিদের সাথে হজরত আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুকে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং তার আহাজারি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানে আসছিল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমোতে পারছিলেন না। যখন আনসারি সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুম এ বিষয়ে অবগত হলেন, আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর বাঁধন খুলে দিলেন। আনসার সাহাবায়ে কেরামের এই মহানুভবতা, দয়ার্দ্রতা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে এজন্য স্বস্তি দিচ্ছিল না- কেননা তা আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু এবং অন্য বন্দিদের মাঝে পার্থক্য তৈরি করছিল। আনসার সাহাবায়ে কেরام ভাবলেন, আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর বাঁধন ঢিলা করে দেওয়ায় নবিজি খুশি হয়েছেন, আর তাই হজরত আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর মুক্তিপণ মাফ করতে চাইলেন-যাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও খুশি হয়ে যান। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা অস্বীকার করলেন।[৩৭]
এক গাম্য লোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, আপনারা কি আপনাদের সন্তানদের ভালোবাসেন? আমরা তো তাদের ভালোবাসি না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যদি আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তর থেকে দয়া বের করে নেন, তবে আমার কী করার আছে? [৩৮]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাদের প্রতি অনেক বেশি দয়ালু ছিলেন এবং তাদের সাথে অনেক নরম ও আদরের সম্পর্ক রাখতেন। হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : খেলায় মত্ত কিছু বাচ্চা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সালাম দিলেন।[৩৯]
হজরত আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : নবিজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সাথে গলা মেলাচ্ছিলেন, আমার এক ছোট ভাইকে দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- নাগায়ের, [৪০] কী হয়েছে?[৪১]
মুসলমানদের প্রতি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত বন্ধুসুলভ ও দয়ালু ছিলেন। তাঁদের অবস্থার পূর্ণ দেখভাল করতেন। মনুষ্য প্রবৃত্তিতে একঘেয়েমি ও সাময়িকভাবে দুর্বল অভিপ্রায় তেরি হয়—সেদিকেও তিনি পূর্ণ খেয়াল রাখতেন।
হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমাদের প্রতি ওয়াজ নসিহত করতেন, তা খুব ধীরগতিতে থেমে থেমে করতেন, যাতে আমাদের মাঝে একঘেয়েমি ভাব তৈরি না হয়। নামাজের সাথে এতটা গভীর ভালোবাসা সত্ত্বেও নামাজের মাঝে কোনো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনলে, তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং বলেন যে, আমি নামাজের জন্য দাঁড়াই এবং নিয়ত করি নামাজকে খুব দীর্ঘ করতে। সে অবস্থায় কোনো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনলে নামাজকে সংক্ষেপ করে দিই, যাতে মায়ের সমস্যা কিংবা কষ্টের কারণ না হয়।[৪২]
হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ সা., আল্লাহর কসম, আমি (নিজ মহল্লায়) ফজরের নামাজে মসজিদে উপস্থিত হই না, শুধুমাত্র অমুক ইমাম নামাজ দীর্ঘ করে বলে। এটা শুনে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পরিমাণ রাগান্বিত হয়ে নসিহত করলেন, আমি অন্য কোনো সময় তা দেখিনি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে সে লোক আছে, যে মানুষকে (নামাজের প্রতি) বিষণ্ণ করে তুলে। তোমাদের মধ্যে যে নামাজে ইমামতি করবে, তার জন্য উচিত- নামাজকে সংক্ষিপ্ত করা। কেননা নামাজে কমজোর লোকেরাও অংশ নেয়-বৃদ্ধ এবং প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তিও।[৪৩]
এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে এই ঘটনাও এসে যায় : হজরত আনজাশা রাদিআল্লাহু আনহু, যিনি মহিলা কাফেলার উষ্ট্রচালক ছিলেন। অত্যন্ত শ্রুতিমধুর কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। তার সুমধুর আওয়াজে উটনি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেত। সেকারণে মহিলাদের কষ্ট হতো। এটা লক্ষ করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আনজাশা রাদিআল্লাহু আনহুকে বললেন, একটু ধীরগতিতে উট হাকাও, যাতে এই দ্রুততার কারণে কাচপাত্র (কমজোর, দুর্বল আরোহী) সদৃশ্য কারো কষ্ট না হয়।[৪৪]
আল্লাহ তাআলা نবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্ষ মোবারককে বিদ্বেষ এবং কারো খারাপ কিছু চাওয়া থেকে পবিত্র রেখেছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, তোমাদের কেউ যেন আমার কাছে অন্য কারো বদগুমানি না করে। কেননা আমি চাই, যখন তোমাদের সামনে আমি উপস্থিত হব, তখন যেন আমার অন্তর পূর্ণ পরিষ্কার থাকে।[৪৫]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের ব্যাপারে দয়ালু পিতার মতো ছিলেন। সমস্ত মুসলিম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে এভাবে থাকতেন-যেন তারা নবিজির পরিবার পরিজনদের অন্তর্ভুক্ত, আর তাদের দায়িত্ব নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ন্যস্ত। তাদের প্রতি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দয়া এবং এমন প্রেমময় সম্পর্ক ছিল, যেমন কোলের বাচ্চার সাথে জন্মদাত্রী মায়ের সম্পর্ক হয়। মুসলমানদের দৌলত-সম্পদ এবং রিজিকের মধ্যে যে উন্নতি আল্লাহ তাআলা দান করেছিলেন, তার মাধ্যমে তো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো উপকার ছিল না। কিন্তু তাদের ঋণের বোঝা হালকা করার দায়িত্ব নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, যে সম্পত্তি ফেলে গেছে, তা তার সন্তানের মালিকানাধীন, আর যে ঋণ ইত্যাদি রেখে গিয়েছে, তা আদায় করা আমাদের দায়িত্বাধীন।[৪৬]
অন্য এক বর্ণনায় এমন পাওয়া যায় : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এমন কোনো মুমিন নেই, দুনিয়া আখেরাতে যার আমার চেয়ে অধিক দায়ত্বিশীল কেউ আছে। যদি চাও এই আয়াত পড়ো-[৪৭]
النَّبِيُّ أَولَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِن أَنفُسِهِم
নবি মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের জীবনের চেয়েও ঘনিষ্ট ও বন্ধুপ্রতিম। [সূরা আহজাব : ০৬]
এজন্য যে মুমিন মৃত্যুবরণ করেছে এবং তার সম্পদ ছেড়ে গেছে, তবে সেটা তার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর অধিকার-সে সম্পদ যাই হোক না কেন! আর যদি মৃতব্যক্তির জিম্মায় কোনো ঋণ অথবা এমন কোনো সম্পত্তি থেকে যায়- যা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে, তবে আমার নিকট আসো, তা রক্ষার দায়িত্বশীল আমি হব।

টিকাঃ
[২৯] বোখারি, মুসলিম।
[৩০] আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত (রেওয়ায়েতে আবু নাঈম, আল হিলয়াহ)
[৩১] শামায়েলে তিরমিজি।
[৩২] বোখারি, আদাবুল মুফরাদ।
[৩৩] তিরমিজি।
[৩৪] বোখারী, আদাবুল মুফরাদ।
[৩৫] তিরমিজি
[৩৬] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল মারছো।
[৩৭] ফাতহুল বারী ৮/৩২৪ (মিশরি সংস্করণ)।
[৩৮] আয়শা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। সহিহুল বোখারী।
[৩৯] সহিহুল বোখারী, কিতাবুল ইসতি'যান।
[৪০] ক্ষুদ্র পাখি, বাচ্চারা খেলা করে।
[৪১] আল আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা/৪০।
[৪২] সহিহুল বোখারি, কিতাবুস সালাহ।
[৪৩] সহিহুল বোখারি, কিতাবুস সালাহ।
[৪৪] আল আদাবুল মুফরাদ পৃষ্ঠা ১৮৫, সহিহুল বোখারি, সহিহুল মুসলিম।
[৪৫] কিতাবুশ শুফা, পৃষ্ঠা ৫৫, আবু দাউদের বর্ণনায়।
[৪৬] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল ইসতিখরাজ।
[৪৭] সহিহুল বোখার, কিতাবুল ইসতিখরাজ।

📘 নববি চরিত্রের সৌন্দর্য > 📄 সমতা বিধান ও চারিত্রিক ভারসাম্য

📄 সমতা বিধান ও চারিত্রিক ভারসাম্য


আল্লাহ তাআলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উচ্চমাপের চরিত্র এবং প্রকৃতিগত ঐশ্বর্য দানে ধন্য করেছেন-যাতে আগত সকল শতাব্দি, বর্তমান-ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তা পরিপূর্ণতার মাধ্যম হয় এবং সেখান থেকেই সমতা বিধান, চারিত্রিক ভারসাম্য, নমনীয় উপলব্ধি, ভারসাম্য রক্ষা, গ্রহণযোগ্যতা, প্রাচুর্য ও অলসতা থেকে বাঁচার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন দুটি বিষয়ের মাঝে কোনো একটিকে প্রাধান্য দিতে হতো, তবে তিনি সেটাকেই গ্রহণ করতেন, যা তূলনামূলক সহজ অনুভূত হয়-অবশ্য তা গুনাহের ঘ্রাণ থেকেও মুক্ত হতে হবে। আর যদি তাতে গুনাহের আভাসমাত্রও পাওয়া যায়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা থেকে সবচেয়ে দূরে থাকতেন।[৪৮]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লৌকিকতা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত দুনিয়াবিমূখতা, দরবেশী জীবনযাপন এবং আত্মার প্রশান্তির জায়েজ মাধ্যম থেকে মুখফিরিয়ে নেওয়াকে অপছন্দ করতেন। হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- দীন সহজ, আর যে দীনের সাথে শক্তি পরীক্ষা করবে-দীন তার ওপর বিজয়ী হবে। এজন্য মধ্যমপন্থা এবং ভারসাম্য রক্ষা করে চলো এবং এর নিকটবর্তী থাকো, আশা রাখো এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো![৪৯]
এছাড়াও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: দাঁড়াও, ততটুকুই করো, যতটুকু করার সাধ্য তোমার মধ্যে আছে, এজন্য যে- আল্লাহর কসম, তিনি কখনো ক্লান্ত হবেন না, তুমিই ক্লান্ত হয়ে পড়বে।[৫০] হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহ তাআলার নিকট কোন দীন সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, সহজ ও সরল দীনে ইবরাহীমি।
হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : অতিরিক্ত ও কঠিন করা, চুলের চামড়া বের করা ব্যক্তি ধ্বংস হোক!"[৫১]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু সাহাবায়ে কেরام রাদিআল্লাহু আনহুমকে এক জায়গায় শিক্ষা এবং ওয়াজ-নসিহতদানে প্রেরণ করবেন। তখন তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন- সহজবোধ্য হও, সঙ্কীর্ণতা বেছে নিও না। সুসংবাদ দিও, হতাশ করো না! হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন-তার নেয়ামতের নিদর্শন তার বান্দার মাঝে দেখতে।[৫২]

টিকাঃ
[৪৮] সহিহুল মুসলিম।
[৪৯] সহিহুল বোখারি, কিতাবুল ইমান।
[৫০] আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃষ্ঠা ১৮১।
[৫১] সহিহুল মুসলিস। অর্থাৎ দীনের বিষয়ে প্রতারণা করা এবং তার মাঝে অতিরিক্ত করা ব্যক্তিরা।
[৫২] তিরমিজি শরিফে এই হাদিসটি আবওয়াবুল আদবে আনা হয়েছে। ان الله يحب ان يرى اثر نعمته على عب : অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে যে নেয়ামতে সম্মানিত করেছেন, তার জীবনযাপনে প্রকাশ পায়। ধনাঢ্য, অবস্থাপণ্য ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তির মতো থাকে, তবে তা আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করা হয়, এবং অকারণেই নিজের দরিদ্রতার প্রকাশ করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00