📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবগত ও অভ্যাসগত কাজ এবং যে সব কাজ আমাদেরকে অনুসরণ করতে অত্যাবশ্যক করেছেন সেগুলোর মধ্যে পার্থক্য
একাদশ প্রশ্ন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবগত ও অভ্যাসগত কাজ এবং যে সব কাজ আমাদেরকে অনুসরণ করতে অত্যাবশ্যক করেছেন এর মধ্যে পার্থক্য আছে? জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
জবাব: প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলহামদুলিল্লাহ, উসূলে ফিকহবিদগণ এ প্রশ্নের উত্তর পরিপূর্ণ উত্তর দিয়েছেন।
সে সব কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবজাত যা শারীরিক চাহিদার কারণে করেছিলেন, যেমন: রাসূলের ঘুম, এটা কি জন্মগত বা স্বভাবজাত নাকি ইবাদতগত নাকি অভ্যাসগত? উত্তরে বলব, এ ধরণের কাজ স্বভাবজাত। তাঁর পিপাসা, পিপাসা পেলে পানি পান করা, ক্ষুধায় খাবার গ্রহণ করা ইত্যাদি কাজ তাঁর স্বভাবগত চাহিদা।
তাঁর কাপড়, চাদর ও পাগড়ি পরিধান হলো অভ্যাসগত কাজ। মাথায় চুল রাখা কি অভ্যাসগত নাকি ইবাদত সে ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। তবে অধিক বিশুদ্ধ কথা হলো এটা তাঁর অভ্যাসগত কাজ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে সব কাজ ইবাদতের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছিল সেগুলো ইবাদতগত। এটা জানা যাবে যখন এ কাজগুলো মানুষের স্বভাব বা অভ্যাস করতে চায় না। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজের মূল হলো তা'য়াব্বুদী বা ইবাদতগত হওয়া।
📄 সালাফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ দ্বারা কি বুঝায়?
দ্বাদশ প্রশ্ন: সালফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ দ্বারা কি বুঝায়? এ পথের অনুসারীদের আলামত কি? এ পথেই চলতে হবে?
জবাব: সালফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ দ্বারা বুঝায় আক্বিদা, ইবাদত, লেনদেন ইত্যাদি কাজে তাদের পথে চলা। এটা অনেক ব্যাপক অর্থের বাক্য।
সব মাসআলায় আমরা একথা বলতে পারি যে, এটা সালফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ বা তাদের বিরোধীদের পথ। কিন্তু সালফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ হলো: আক্বিদা, ইবাদত, লেনদেন ইত্যাদি কাজে তাদের পন্থা অনুসরণ করা।
এ পথের অনুসারীদের আলামত হলো: তারা দুনিয়া ও আখেরাতের সব কাজে সালাফে সালেহীনের মত আখলাক বা চরিত্র অবলম্বন করবে আর তাদের পথের অনুসরণ করবে। যারা নিরাপদ থাকতে চায় তাদের উচিত সালাফের এ সুন্দর পথে চলা।
📄 সুন্নাহকে সঠিকভাবে বুঝা ও সহিষ্ণুভাবে সুন্নতের উপর আমল করার পদ্ধতি কি?
ত্রয়োদশ প্রশ্ন: সুন্নাহকে সঠিকভাবে বুঝা ও সহিহভাবে সুন্নাহের উপর আমল করার পদ্ধতি কি?
জবাব: একথা জেনে রাখা দরকার যে, বুঝ বা জ্ঞান হলো মহান আল্লাহ তা'আলার এক মহা নিয়ামত। মানুষ স্বীয় প্রচেষ্টায় এটা লাভ করতে পারেনা। এটা আল্লাহর দান। এজন্যই আবু জুহাইফা যখন আলী ইবন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু 'আনুকে জিজ্ঞেস করছিলেন: سَأَلْتُ عَلِيًّا رَضِيَ اللهُ عَنْهُ هَلْ عِنْدَكُمْ شَيْءٌ مِمَّا لَيْسَ فِي القُرْآنِ؟، وَقَالَ ابْنُ عُيَيْنَةَ مَرَّةٌ: مَا لَيْسَ عِنْدَ النَّاسِ ؟ فَقَالَ: «وَالَّذِي فَلَقَ الحَبَّةَ وَبَرَأَ النَّسَمَةَ مَا عِنْدَنَا إِلَّا مَا فِي القُرْآنِ إِلَّا فَهُمَا يُعْطَى رَجُلٌ فِي كِتَابِهِ، وَمَا فِي الصَّحِيفَةِ قُلْتُ: وَمَا فِي الصَّحِيفَةِ؟ قَالَ: «العَقْلُ، وَفِكاكُ الأَسِيرِ، وَأَنْ لَا يُقْتَلَ مُسْلِمُ بِكَافِرٍ»
তিনি বলেন, আমি আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কুরআনে যা কিছু আছে তা ছাড়া আপনাদের নিকট কোনো কিছু আছে কি? (অর্থাৎ খিলাফতের কোনো অসিয়ত কি এসেছে, যার কথা তখন খুব প্রসার করে বলা হচ্ছিল) তিনি বললেন: না, সে আল্লাহর কসম! যিনি শস্যদানাকে বিদীর্ণ করেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেন। আল্লাহ কুরআন সম্পর্কে মানুষকে যে জ্ঞান দান করেছেন এবং সহীফার মধ্যে যা রয়েছে, এ ছাড়া আমি আর কিছু জানি না। আমি বললাম: এ সহীফাতে কি আছে? তিনি বললেন, 'দীয়াতের বিধান' এ ছাড়া দাস মুক্তকরণ এবং কোনো মুসলিমকে যেন কোনো কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা না হয় (এ সম্পর্কিত বিধান)।"¹
মানুষ জ্ঞানের বিচারে নানা রকম হয়ে থাকে। এজন্যই দেখবে উপরিউক্ত হাদীস থেকে কিছু আলেম দশটি হুকুম বের করেছেন, আবার কেউ এর চেয়েও অনেক বেশি বিধান ইজতিহাদ করে বের করেছেন। আবার কাউকে দেখবে সে কিছুই বের করতে পারেনি। এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করব, এক লোক ইমাম আহমদ রহ. এর মাযহাবের কিতাব 'আল-ফুরু" কিতাব হিফয করেছে। এটি অনেক বড় একটি কিতাব। কিন্তু সে কোনো মাস'আলারই হুকুম জানে না। তার সে জ্ঞান নেই। তার সঙ্গী সাথীরা তাকে উক্ত কিতাবের একটি কপি মনে করে সঙ্গে নিয়ে বের হতো, যখনই তাদের কাছে সন্দেহ হতো তখন তারা তাকে বলত, তুমি অমুক অধ্যায় বা পরিচ্ছেদ পড়। সে পড়লে তারা সেখান থেকে হুকুম রেব করত। সুতরাং এ সব আল্লাহর দান, তিনি যাকে খুশী তাকে দান করেন।
কিন্তু জ্ঞানের কিছু আসবাব তথা অর্জনের উপায় আছে, তা হলো: কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক জীবনকে গড়া, এতে গভীরভাবে চিন্তা গবেষণা করা, পূর্ববর্তী উলামাদের কিতাব বার বার পড়া।
টিকাঃ
¹ বুখারী, হাদীস নং ৩০৪৭।
📄 প্রাচীন নিদর্শন ভ্রমণ ও এর গুরুত্ব কি?
চতুর্দশ প্রশ্ন: আছার তথা প্রাচীন নিদর্শন সম্পর্কে এক লোক জিজ্ঞেস করেছে। এর গুরুত্ব কি? এগুলো পরিদর্শন করার হুকুম কি? আল্লাহ আপনাদের সকলকে হিফাযত করুন।
জবাব: আমরা জানি যে, প্রাচীন নিদর্শন যদি উপকারী হয় তবে এতে কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু এগুলোর পরিদর্শনকে যদি ইবাদতের অসীলা বানানো হয় এবং সে যদি বিশ্বাস করে যে, এর প্রভাব আছে, তবে এগুলো সরিয়ে ফেলা উচিত, বরং কখনও কখনও তা নিঃশেষ করে দেওয়া ওয়াজিব হয়ে পড়ে। কেননা আমিরুল মু'মিনিন 'উমর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর কাছে যখন খবর এলো যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে গাছের তলায় 'বাই'আতে রিদওয়ান' করেছেন সে গাছটির উদ্দেশ্যে একদল লোক বের হতো।
ফলে 'উমর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু উক্ত গাছটি কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। আলহামদুলিল্লাহ গাছটি খলিফার নির্দেশে কর্তিত হয়। বর্তমান যুগে যদি গাছটি বিদ্যমান থাকত তাহলে কি ঘটত?! মানুষ ক্বাবায় হজ্ব না করে সে গাছটিকে হজ্ব করত। কেননা বাতিলের প্রতি মানুষের ঝোঁক খুব বেশী।
ঐতিহাসিক নিদর্শন দু'ধরণের:
প্রথম হলো: যে সব প্রাচীন নিদর্শনের কোনো ভিত্তি নেই সেগুলো ভেঙ্গে ফেলাই ভালো।
দ্বিতীয়: যে সব প্রাচীন নিদর্শনের ভিত্তি আছে, তখন দেখতে হবে শরিয়ত কি এগুলো যিয়ারত করতে নির্দেশ দিয়েছে? যদি নির্দেশ দেয় তবে ভালো, নতুবা উত্তম হলো নিঃশেষ করে দেয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: হেরা পর্বত, সেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অহী নাযিল হয়েছিল। কিন্তু এটি কি আরোহণ করে সম্মান প্রদর্শনের স্থান? উত্তরে বলব, না। কখনো না। যদি এটি সম্মান প্রদর্শনের জায়গা হতো তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই সর্বপ্রথম এ কাজটি করতেন। এভাবে সাওর পর্বতের ব্যাপারেও বলা যায়।