📄 কুরআনের মাযায না থাকার দলীল
দশম প্রশ্ন: কতিপয় বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম বলেন যে, কুরআনের মাজায না থাকার সবচেয়ে বড় দলিল হলো: মাজাযের নফী করা জায়েয। কিন্তু কুরআনে এমন কিছু নাই যা নফী করা যায়।
আমার কাছে আর একটি বিষয় খটকা লাগে যে, কুরআনে অনেক খবর বা সংবাদ আছে, আর খবর বলা হয় যার বাহককে সত্যবাদি বা মিথ্যাবাদি বলা যায়। অথচ কুরআনে এমন কিছু নেই যা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা যায়। দয়া করে জানাবেন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
জবাব: খবরের ব্যাখ্যায় উলামা কিরামদের কথার অর্থ হলো: সংবাদদাতাকে একথা বলা যাবে যে, সে সত্যবাদি বা মিথ্যাবাদি, তাদের কথার উদ্দেশ্য হলো, খবরদাতার দিকে না তাকিয়ে স্বয়ং খবরটা। অর্থাৎ সংবাদদাতার দিকে বিবেচনা না করে শুধু সংবাদকে বিবেচনা করেই তা বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ খবরপ্রদানকারীর ব্যাপারে এটা বলা যাবে না যে, সে সত্যবাদি কিংবা মিথ্যাবাদি। সংবাদের দিক থেকে; এর সংবাদদাতার হিসেবে নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত খবরের ক্ষেত্রে এ কথা বলা যাবে না যে, এতে মিথ্যার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে মুসাইলামাতুল কাযযাব, যে নিজেকে নবী দাবী করেছিল তাঁর কথাকে বলা যাবে না যে, এতে সত্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
আর কুরআনে বা অন্য ক্ষেত্রে মাজাযের ব্যাপারে বলব: এটা আলেমগণের মতানৈক্যের স্থান। এ ব্যাপারে তাদের অনেক মতবিরোধ আছে। তবে আমাদের একথা জানা উচিত যে, শব্দের নানা অর্থ আছে। সিয়াক্ব তথা কথার পূর্বাপর ধরণই অর্থ নির্ধারণ করে। একটি শব্দ এক স্থানে এক অর্থ প্রদান করে, কিন্তু সেটি আবার পূর্বাপর ধরণের কারণে অন্যত্র আরেক অর্থ প্রদান করে।
যখন আমরা বলব: এটা শব্দের হাক্কিকত তথা মূল অর্থ, তখন আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কেননা কুরআনে বর্ণিত الْقَرْيَةِ আল-ক্বারইয়া শব্দটি গ্রামের অধিবাসী ও জনপদ দু অর্থেই ব্যবহৃত হয়। অতএব, আল্লাহর বাণী: إِنَّا مُهْلِكُوا أَهْلَ هَذِهِ الْقَرْيَةِ ﴾ [العنكبوت: ٣١]
"নিশ্চয় আমরা এ জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব", [সূরা 'আনকাবূত: ৩১] এখানে الْقَرْيَةِ দ্বারা জনপদকে বুঝানো হয়েছে। আবার কুরআনে আরেক জায়গায় বলা হয়েছে: وَسْتَلِ الْقَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا ﴾ [يوسف: ٨٢]
'আর যে জনপদে আমরা ছিলাম তাকে জিজ্ঞাসা করুন” [সূরা ইউসুফ: ৮২] এখানে الْقَرْيَةِ দ্বারা জনপদের অধিবাসীকে বুঝানো হয়েছে।
সুতরাং দেখুন একই শব্দ এক স্থানে অর্থ হলো জনপদ, আর অন্য স্থানে অর্থ হলো অধিবাসী।
কোনো বিবেকবানের পক্ষে একথা বলা সমীচীন হবে না যে, ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সন্তানেরা তাদের পিতার সাথে কথা: وَسْتَلِ الْقَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا ﴾ [يوسف: ٨٢]
“আর যে জনপদে আমরা ছিলাম তাকে জিজ্ঞাসা করুন” [সূরা ইউসূফ: ৮২] এখানে الْقَرْيَةِ দ্বারা একথা বুঝানো সম্ভব নয় যে, ইয়াকুব আলাইহিস সালাম জনপদে গিয়ে সেখানকার দেয়ালের কাছে জিজ্ঞেস করবে, এটা কখনও উদ্দেশ্য হতে পারে না।
ইবন তাইমিয়া রহ. এর মত হচ্ছে যে, আরবি ভাষা ও কুরআনে মাজায নেই। কেননা শব্দের অর্থ তার সিয়াক্ব তথা পূর্বাপর ধরণ বুঝে অর্থ নির্ধারিত হয়। যখন পূর্বাপর ধরণ (সিয়াক্ব) দ্বারা অর্থ নির্ধারিত হবে তখন হাক্কিকতই উদ্দেশ্য হবে, ফলে আর কোনো দ্বিধা থাকে না।
যারা বলেন যে, কুরআনে মাজায আছে তারা নিম্নোক্ত আল্লাহর বাণী দ্বারা দলিল দেন,
فَوَجَدَا فِيهَا جِدَارًا يُرِيدُ أَن يَنقَضَّ ﴾ [الكهف: ٧٧]
"অতঃপর তারা সেখানে একটি প্রাচীর দেখতে পেল, যা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।" [সূরা আল-কাহফ: ৭৭]
তারা বলেন, ইরাদা শুধু যাদের অনুভূতি আছে তাদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। দেয়ালের কোনো অনুভূতি নেই। এটা তাদের মত। কিন্তু আমরা বলব: দেয়ালের ইরাদা আছে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ পাহাড়কে বলেছেন:
هَذَا جُبَيْلٌ يُحِبُّنَا وَيُحِبُّهُ»
"এ পাহাড়টি আমাদেরকে ভালবাসে, আমরাও তাকে ভালবাসি।"¹
মুহাব্বত ইরাদার চেয়েও খাস বা বেশি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। সুতরাং কে বলবে দেয়ালের ইচ্ছাশক্তি নাই, অথচ আল্লাহ বলেছেন, ﴿ يُرِيدُ أَن يَنقَضَّ ﴾ [الكهف: ٧৭]
"সেটি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।” [সূরা আল-কাহফ: ৭৭], হ্যাঁ কিছু লোক শুধু তাদের নিজেদের বুঝ অনুযায়ী সেটা বলতে পারেন। তারা বলেন, ইরাদা শুধু যাদের অনুভূতি আছে তাদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। অথচ হাদীসে এসেছে,
«هَذَا جُبَيْلٌ يُحِبُّنَا وَيُحِبُّهُ»
"এ পাহাড়টি আমাদেরকে ভালবাসে, আমরাও তাকে ভালবাসি।” এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, পাহাড়ের ভালবাসা আছে।
কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন: কিভাবে বুঝব যে, দেয়ালের পড়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, তবে আমরা বলব: সেটি হেলে যাওয়া বা ফেটে যাওয়ার দ্বারা বুঝা যাবে যে দেয়ালের ইচ্ছা শক্তি আছে।
টিকাঃ
¹ বুখারী, হাদীস নং ১৪৪১。
📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবগত ও অভ্যাসগত কাজ এবং যে সব কাজ আমাদেরকে অনুসরণ করতে অত্যাবশ্যক করেছেন সেগুলোর মধ্যে পার্থক্য
একাদশ প্রশ্ন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবগত ও অভ্যাসগত কাজ এবং যে সব কাজ আমাদেরকে অনুসরণ করতে অত্যাবশ্যক করেছেন এর মধ্যে পার্থক্য আছে? জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
জবাব: প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলহামদুলিল্লাহ, উসূলে ফিকহবিদগণ এ প্রশ্নের উত্তর পরিপূর্ণ উত্তর দিয়েছেন।
সে সব কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবজাত যা শারীরিক চাহিদার কারণে করেছিলেন, যেমন: রাসূলের ঘুম, এটা কি জন্মগত বা স্বভাবজাত নাকি ইবাদতগত নাকি অভ্যাসগত? উত্তরে বলব, এ ধরণের কাজ স্বভাবজাত। তাঁর পিপাসা, পিপাসা পেলে পানি পান করা, ক্ষুধায় খাবার গ্রহণ করা ইত্যাদি কাজ তাঁর স্বভাবগত চাহিদা।
তাঁর কাপড়, চাদর ও পাগড়ি পরিধান হলো অভ্যাসগত কাজ। মাথায় চুল রাখা কি অভ্যাসগত নাকি ইবাদত সে ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। তবে অধিক বিশুদ্ধ কথা হলো এটা তাঁর অভ্যাসগত কাজ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে সব কাজ ইবাদতের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছিল সেগুলো ইবাদতগত। এটা জানা যাবে যখন এ কাজগুলো মানুষের স্বভাব বা অভ্যাস করতে চায় না। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজের মূল হলো তা'য়াব্বুদী বা ইবাদতগত হওয়া।
📄 সালাফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ দ্বারা কি বুঝায়?
দ্বাদশ প্রশ্ন: সালফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ দ্বারা কি বুঝায়? এ পথের অনুসারীদের আলামত কি? এ পথেই চলতে হবে?
জবাব: সালফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ দ্বারা বুঝায় আক্বিদা, ইবাদত, লেনদেন ইত্যাদি কাজে তাদের পথে চলা। এটা অনেক ব্যাপক অর্থের বাক্য।
সব মাসআলায় আমরা একথা বলতে পারি যে, এটা সালফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ বা তাদের বিরোধীদের পথ। কিন্তু সালফে সালেহীনদের মানহাজ তথা পথ হলো: আক্বিদা, ইবাদত, লেনদেন ইত্যাদি কাজে তাদের পন্থা অনুসরণ করা।
এ পথের অনুসারীদের আলামত হলো: তারা দুনিয়া ও আখেরাতের সব কাজে সালাফে সালেহীনের মত আখলাক বা চরিত্র অবলম্বন করবে আর তাদের পথের অনুসরণ করবে। যারা নিরাপদ থাকতে চায় তাদের উচিত সালাফের এ সুন্দর পথে চলা।
📄 সুন্নাহকে সঠিকভাবে বুঝা ও সহিষ্ণুভাবে সুন্নতের উপর আমল করার পদ্ধতি কি?
ত্রয়োদশ প্রশ্ন: সুন্নাহকে সঠিকভাবে বুঝা ও সহিহভাবে সুন্নাহের উপর আমল করার পদ্ধতি কি?
জবাব: একথা জেনে রাখা দরকার যে, বুঝ বা জ্ঞান হলো মহান আল্লাহ তা'আলার এক মহা নিয়ামত। মানুষ স্বীয় প্রচেষ্টায় এটা লাভ করতে পারেনা। এটা আল্লাহর দান। এজন্যই আবু জুহাইফা যখন আলী ইবন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু 'আনুকে জিজ্ঞেস করছিলেন: سَأَلْتُ عَلِيًّا رَضِيَ اللهُ عَنْهُ هَلْ عِنْدَكُمْ شَيْءٌ مِمَّا لَيْسَ فِي القُرْآنِ؟، وَقَالَ ابْنُ عُيَيْنَةَ مَرَّةٌ: مَا لَيْسَ عِنْدَ النَّاسِ ؟ فَقَالَ: «وَالَّذِي فَلَقَ الحَبَّةَ وَبَرَأَ النَّسَمَةَ مَا عِنْدَنَا إِلَّا مَا فِي القُرْآنِ إِلَّا فَهُمَا يُعْطَى رَجُلٌ فِي كِتَابِهِ، وَمَا فِي الصَّحِيفَةِ قُلْتُ: وَمَا فِي الصَّحِيفَةِ؟ قَالَ: «العَقْلُ، وَفِكاكُ الأَسِيرِ، وَأَنْ لَا يُقْتَلَ مُسْلِمُ بِكَافِرٍ»
তিনি বলেন, আমি আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কুরআনে যা কিছু আছে তা ছাড়া আপনাদের নিকট কোনো কিছু আছে কি? (অর্থাৎ খিলাফতের কোনো অসিয়ত কি এসেছে, যার কথা তখন খুব প্রসার করে বলা হচ্ছিল) তিনি বললেন: না, সে আল্লাহর কসম! যিনি শস্যদানাকে বিদীর্ণ করেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেন। আল্লাহ কুরআন সম্পর্কে মানুষকে যে জ্ঞান দান করেছেন এবং সহীফার মধ্যে যা রয়েছে, এ ছাড়া আমি আর কিছু জানি না। আমি বললাম: এ সহীফাতে কি আছে? তিনি বললেন, 'দীয়াতের বিধান' এ ছাড়া দাস মুক্তকরণ এবং কোনো মুসলিমকে যেন কোনো কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা না হয় (এ সম্পর্কিত বিধান)।"¹
মানুষ জ্ঞানের বিচারে নানা রকম হয়ে থাকে। এজন্যই দেখবে উপরিউক্ত হাদীস থেকে কিছু আলেম দশটি হুকুম বের করেছেন, আবার কেউ এর চেয়েও অনেক বেশি বিধান ইজতিহাদ করে বের করেছেন। আবার কাউকে দেখবে সে কিছুই বের করতে পারেনি। এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করব, এক লোক ইমাম আহমদ রহ. এর মাযহাবের কিতাব 'আল-ফুরু" কিতাব হিফয করেছে। এটি অনেক বড় একটি কিতাব। কিন্তু সে কোনো মাস'আলারই হুকুম জানে না। তার সে জ্ঞান নেই। তার সঙ্গী সাথীরা তাকে উক্ত কিতাবের একটি কপি মনে করে সঙ্গে নিয়ে বের হতো, যখনই তাদের কাছে সন্দেহ হতো তখন তারা তাকে বলত, তুমি অমুক অধ্যায় বা পরিচ্ছেদ পড়। সে পড়লে তারা সেখান থেকে হুকুম রেব করত। সুতরাং এ সব আল্লাহর দান, তিনি যাকে খুশী তাকে দান করেন।
কিন্তু জ্ঞানের কিছু আসবাব তথা অর্জনের উপায় আছে, তা হলো: কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক জীবনকে গড়া, এতে গভীরভাবে চিন্তা গবেষণা করা, পূর্ববর্তী উলামাদের কিতাব বার বার পড়া।
টিকাঃ
¹ বুখারী, হাদীস নং ৩০৪৭।