📘 নবীর সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা ও তার প্রভাব > 📄 দুনিয়াবি হাজত পূরণের উদ্দেশ্যে সমষ্টিগতভাবে কুরআন তিলাওয়াতের হুকুম কি?

📄 দুনিয়াবি হাজত পূরণের উদ্দেশ্যে সমষ্টিগতভাবে কুরআন তিলাওয়াতের হুকুম কি?


তৃতীয় প্রশ্ন: কোনো কোনো মুসলিম দেশে প্রচলন আছে যে, আশাপূরণ যেমন: পদোন্নতি লাভ, চাকরী পাওয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে কুরআন খতম করা হয়। এর হুকুম কি? অনুগ্রহপূর্বক আমাকে এ সম্পর্কে বলুন। আল্লাহ আপনাদেরকে বরকত দিন।
জবাব: প্রকাশ থাকে যে, আল-কুরআন হল মহান আল্লাহর কালাম। যে ব্যক্তি তা তিলাওয়াত করবে তার প্রতি হরফে দশ নেকী বা ততোধিক সাওয়াব হবে। আর যে জিনিস দ্বারা আখেরাতের সাওয়াবের প্রত্যাশা করা হয়, তা দ্বারা দুনিয়ার প্রতিদান আশা করা যায় না। অতঃপর যারা বলেন যে, কুরআন তিলাওয়াত চাকুরী লাভ বা ব্যবসায় উন্নতি ইত্যাদির অসীলা?! কুরআন সব রোগের ঔষধ, অন্তরের রোগের ঔষধ। শারীরিক রোগেরও ঔষধ। কিন্তু কুরআন তিলাওয়াত রিজিকের অসীলা এ ব্যাপারে কোনো দলিল আছে? রিজিকের অসীলা হলো তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, ( وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ) [الطلاق: ٢، ٣]
“যে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না”। [সূরা আত-তালাক: ২-৩]
অতএব আমরা বলব, যারা কুরআন তিলাওয়াতকে দলিল ছাড়াই রিজিকের অসীলা বানিয়েছে, তাদেরকে জিজ্ঞেস করব: আপনাদের দলিল কোথায়? আল্লাহ ভীতি রিজিকের অসীলা, এটা সত্য। কেননা আল্লাহ বলেছেন: ( وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ) [الطلاق: ٢، ٣]
"যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না”। [সূরা আত-তালাক: ২-৩]

📘 নবীর সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা ও তার প্রভাব > 📄 কিছু লোক বলেন যে, অধিকাংশ মানুষের আমল সে কাজটি সহীহ হওয়ার দলীল। কথাটি কতটুকু সহীহ?

📄 কিছু লোক বলেন যে, অধিকাংশ মানুষের আমল সে কাজটি সহীহ হওয়ার দলীল। কথাটি কতটুকু সহীহ?


চতুর্থ প্রশ্ন: কিছু লোক বলেন যে, অধিকাংশ মানুষের আমল সে কাজটি সহীহ হওয়ার দলিল। তারা নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করেন: "عَلَيْكُمْ بِالسَّوَادِ الْأَعْظَمِ” “তোমরা অধিকাংশ মানুষের জামাতের অনুসরণ করো।" এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
জবাব: তাদের এ দলিল সহীহ নয়; কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ﴾ [النساء : ٥٩]
"অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও” [সূরা নিসা: ৫৯] এখানে বিরোধ দেখা দিলে কার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বলেছে? আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে। কুরআনে একথা বলা হয়নি যে, "অধিকাংশ লোকের দিকে প্রত্যার্পণ করাও"। এখানে সংসদে ভোট বা এরূপ কোনো বিষয়ের ব্যাপার নয়; বরং আমাদের দলিল হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ। আমাদের জন্য ফরয হলো, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর দলিল দ্বারা যা সাব্যস্ত হয় সেদিকে প্রত্যার্পণ করা, যদিও সে মতের উপর একজন মাত্র লোক পাওয়া যায়।
عَلَيْكُمْ بِالسَّوَادِ الْأَعْظَمِ"
আর উক্তিটি যদি প্রমাণিত হাদীস হয়, তবে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, "সত্য অনুসারী অধিকাংশ মুসলিমের জামাত” কেননা الأعظم দ্বারা শুধু অধিকাংশ বুঝায় না; বরং মর্যাদার বিচারে বড় বুঝায়। আর মর্যাদার বিচারে বড় তো তারাই যাদের কথা ও কাজ কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক হয়। এ ব্যাখায় তখনই হবে যখন উক্ত উক্তিটি সহীহ হাদীস হবে। আমার ধারণা এটা ইবন মাস'উদ বা অন্য কারো বাণী।¹

টিকাঃ
¹ মুসনাদে আহমদ: ৪/২৭৮।

📘 নবীর সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা ও তার প্রভাব > 📄 ব্যাংকে ‘ইদা‘ (জমাকরণ) রাখার হুকুম কি?

📄 ব্যাংকে ‘ইদা‘ (জমাকরণ) রাখার হুকুম কি?


পঞ্চম প্রশ্ন: ব্যাংকে ইদা' (জমাকরণ) রাখার হুকুম কি?
জবাব: প্রয়োজনে ব্যাংকে ইদা' (আমানত জমা) রাখতে কোনো অসুবিধে নেই। কেননা কিছু মানুষ দলিল দেয় যে, ঘরে নিজের কাছে অর্থ রাখাটা বিপদজনক। ফলে নিরাপত্তার জন্য তারা ব্যাংকে জমা রাখে।
ব্যাংক যদি শুধু সুদ ভিত্তিকই লেনদেন করে তবে আমরা বলব, এ ধরণের ব্যাংকে কখনও অর্থ জমা রাখবেন না। কিন্তু সুদ ছাড়া অন্য কোনো খাতে জমা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে তার জমাকৃত অর্থ হালাল ও হারামের সাথে মিলিত হয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে এ ধরণের ক্ষেত্রে জমা রাখা জায়েয। কিন্তু এমতাবস্থায় বলব, যে সব ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদের লেনদেন করে সে ব্যাংকে জমা রাখা উচিত।
এখানে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সতর্ক করব: ব্যাংকে অর্থ জমা রাখাকে মানুষ ইদা' বা 'আমানত' বলে, কিন্তু এটা সঠিক নয়। কেননা আলেমদের মতে, আল-ওয়াদিয়া হলো: "একজন অন্য কাউকে তার সম্পদ আমানত রাখতে দেয়া, সে উক্ত সম্পদ খরচ করবেনা", পক্ষান্তরে ব্যাংকে সম্পদ রাখা হলো: "ব্যাংকের লকারে সম্পদ জমা রাখা এবং ব্যাংক বেচাকেনার কাজে উক্ত সম্পদ খরচ করবে"। এটাকে উলামা কিরাম করজ বা ঋণ বলে। এজন্যই ফিকহের কিতাবে এভাবে নস এসেছে, কেউ যদি অন্য কারো কাছে তার সম্পদ জমা রাখে, অতঃপর সে উক্ত মাল খরচের অনুমতি দেয় তবে তা অদীয়া' থেকে কর্জে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। অদীয়া' আর কর্জের মধ্যে পার্থক্য হলো, আমানতকারীর অবহেলা ব্যতীত অদীয়া' নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় না। কিন্তু কর্জের ক্ষেত্রে সব অবস্থাতেই ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

📘 নবীর সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা ও তার প্রভাব > 📄 “আমরা যে বিষয়ে একমত সে বিষয়গুলোতে ঐক্যবদ্ধ থাকব”, আর “যে ব্যাপারে মতানৈক্য করব সে ব্যাপারে একে অপরের কাছে ওজর পেশ করব”। এ কথাটি কতটুকু সঠিক?

📄 “আমরা যে বিষয়ে একমত সে বিষয়গুলোতে ঐক্যবদ্ধ থাকব”, আর “যে ব্যাপারে মতানৈক্য করব সে ব্যাপারে একে অপরের কাছে ওজর পেশ করব”। এ কথাটি কতটুকু সঠিক?


ষষ্ঠ প্রশ্ন: আমরা প্রায়ই একটি কায়েদা শুনে থাকি যে, "আমরা যে বিষয়ে একমত সে বিষয়গুলোতে ঐক্য থাকব”, আর "যে ব্যাপারে মতানৈক্য করব সে ব্যাপারে একে অপরের কাছে ওজর পেশ করব"। এ কথাটি কতটুকু সঠিক?
জবাব: আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশটি সহীহ, তা হলো "আমরা যে বিষয়ে একমত সে বিষয়গুলোতে ঐক্য থাকব”। আর দ্বিতীয় অংশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা হলো:
আমরা যে বিষয়ে মতানৈক্য করব সেটি যদি এমন হয় যে, একপক্ষের নিকট সহীহ দলিল আছে, (অপর পক্ষের কাছে কোনো দলিল নাই) এবং এ মতানৈক্যটি ইজতিহাদি কোনো বিষয় নয়, সে ক্ষেত্রে বলব: যাদের কাছে দলিল নাই তাদেরকে ভুল না বলে বিরত থাকব না। যেমন: কেউ যদি আক্বীদাগত বিষয়ে মতানৈক্য করে তবে আমরা চুপ থাকব না। কেননা, -আলহামদুলিল্লাহ- আক্বিদার মূলনীতিসমূহ জ্ঞাত, সালাফে সালেহীন এর মূলনীতির ব্যাপারে ঐক্যমত, অতএব, যারা এর বিরোধী হবে তাদের বিরোধিতা আমরা করব।
অপরদিকে, ইজতিহাদভিত্তিক ফিকহি মাস'আলাসমূহে উক্ত কথাটি ঠিক আছে। ইজতিহাদভিত্তিক মাসআলায় আমরা কারো বিরোধিতা করব না। কেননা বিরোধীকে প্রত্যাখ্যান করা মানেই হলো তুমি যা বলেছ তাই সঠিক এবং তোমার বিরোধী লোকের মতটি ভুল। অথচ তুমি যেটা বলেছ তাতে যেমন ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি অপরপক্ষেরও ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে।
অতঃপর, মানুষ যদি তার মতের উপরই অন্যকে চলতে বলে এবং অন্যের মতকে ভ্রান্ত বলে তবে সে নিজেকে রিসালাতের আসনে সমাসীন করল। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই শুধু নিষ্পাপ। আর তোমার বা অন্যের ইজতিহাদ ভুল ও সঠিক দুয়ের সম্ভাবনা থাকে।
কিন্তু সমস্যা হলো, কিছু লোক এ গ্রহণযোগ্য মতানৈক্য উপর তাদের সম্পর্কস্থাপন ও সম্পর্কচ্যুতি স্থাপন করে এবং মানুষের কাছে এটাকে নিন্দনীয় করে তোলে। অথচ মাসআলাটি এমন যে তাতে ইজতিহাদ তথা মত প্রকাশের অবকাশ রয়েছে। (যারা এ মতপার্থক্যের উপর নির্ভর করে সম্পর্কচ্যুতি ও সম্পর্কস্থাপন করে থাকে) তাদের একাজটি ভুল। এটি সাহাবায়ে কিরামদের পন্থা নয়। সাহাবায়ে কিরাম -রাদিয়াল্লাহু 'আনহুম- অনেক বিষয়ে মতানৈক্য করেছেন।
এতদসত্ত্বেও তারা কেউ কারো ব্যাপারে খারাপ (সমালোচনামূলক) কথা বলেননি, কাউকে পথভ্রষ্টও বলেন নি। উপস্থিত অধিকাংশের নিকটই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাবের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় সাহাবাদের মতানৈক্যের ঘটনাটি অজানা নয়।
বনী কুরাইযার ইয়াহুদীরা আহযাবে অংশগ্রহণকারীদের একদল, কিন্তু তারা অঙ্গিকার ভঙ্গ করেছিল। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিবরীল এসে তাঁকে বনী কুরাইযা গোত্রের অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বনী কুরাইযা গোত্রের অভিমুখে যাত্রা করার নির্দেশ দেন, এবং তিনি তাদেরকে বললেন: لَا يُصَلِّنَّ أَحَدُ الْعَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ
"তোমাদের কেউ যেন বনী কুরাইযায় না গিয়ে আসরের নামায আদায় না করে"।¹ ফলে তারা সকলে বের হলো এবং পথে আসরের নামাযের ওয়াক্ত হলো। তাদের একদল বলল: আমরা নামায আদায় করে নিবো, যাতে ওয়াক্ত শেষ হয়ে না যায়।
আরেকদল বলল: আমরা এখন নামায পড়বো না, কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لَا يُصَلِّيَنَّ أَحَدُ الْعَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ "তোমাদের কেউ যেন বনী কুরাইযায় না গিয়ে আসরের নামায আদায় না করে"। ফলে একদল নামায পড়লো এবং অন্যদল বিলম্ব করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাউকেই প্রত্যাখ্যান করেননি এবং তিরস্কার করেননি। তারা নিজেরা নিজেদের মধ্যে কোনো মতানৈক্য করেননি এবং অন্যকে কেউ পথভ্রষ্টও বলেননি।
অতএব, ইজতিহাদভিত্তিক মতবিরোধপূর্ণ মাসআলার ক্ষেত্রে মানুষ অন্যকে তার মতের উপর চালানো জায়েয নয়। সে এ কাজ করা মানে নিজেকে রাসূল দাবী করা। তবে ইজতিহাদ নির্ভর নয়-বিশেষ করে আক্বিদাগত- এমন মাস'আলার ক্ষেত্রে অন্যের ভুল মেনে নেওয়া জায়েয নয়।

টিকাঃ
¹ বুখারী, হাদীস নং ৯৪৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00