📘 নবীজির সংসার > 📄 কাফের হলেও মেহমানকে নবীজি ﷺ সম্মান করতেন

📄 কাফের হলেও মেহমানকে নবীজি ﷺ সম্মান করতেন


নববী রাহ. বলেন, “এই হাদীসে নবীজি ﷺ ও তাঁর পরিবারের ক্ষুধা ও দারিদ্রের ধৈর্য ধারণের বিবরণ উঠে এসেছে। এ থেকে দেখা যায়, সমাজের প্রধান কারও মেহমানদারিতে প্রথমে এগিয়ে আসবেন এবং নিজের সম্পদ থেকে খরচ করবেন। এরপর ভালো কাজে সহযোগিতা হিসেবে তিনি তার সাথিদের সাহায্য চাইতে পারেন। এ-হাদীস কষ্টের সময় একে অপরকে সাহায্য করার শিক্ষা দেয় এবং আনসার ও তার স্ত্রীর কষ্ট আমাদের অনুপ্রাণিত করে।” ৩০২
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, এক কাফের নবীজির মেহমান হলো। নবীজি ﷺ তাঁর জন্য একটি ভেড়ার দুধ দোহন করার আদেশ দিলেন এবং লোকটি তা পান করল। তিনি আবার দুধ দোহন করলেন, লোকটি আবার পান করল। এভাবে সে সাতটি ভেড়ার দুধ পান করল। পরদিন সকালে উঠে সে ইসলাম গ্রহণ করল। ৩০৩

টিকাঃ
৩০২. মুসলিম গ্রন্থের (১২/১৪) ব্যাখ্যায় নববী (রাহ.)।
৩০৩. বুখারী (৫৩৯৭) ও মুসলিম (২০৬৩)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 নবীজি ﷺ অতিথিদের নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করতেন

📄 নবীজি ﷺ অতিথিদের নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করতেন


জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. বলেন, “(খন্দকের যুদ্ধে) পরিখা খনন করা হচ্ছিল, তখন আমি নবীজিকে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তখন আমি আমার স্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমার কাছে কোনো কিছু আছে? আমি রাসূলুল্লাহকে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত দেখেছি।' সে একটি চামড়ার পাত্র এনে তা থেকে এক 'সা ৩০৪ পরিমাণ যব বের করে দিল। আমার বাড়িতে একটি বকরীর বাচ্চা ছিল। আমি সেটি যবেহ করলাম। আর সে (আমার স্ত্রী) যব পিষে দিল। আমি আমার কাজ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সেও তার কাজ শেষ করল এবং গোশত কেটে কেটে ডেকচিতে ভরলাম।
এরপর আমি রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে চললাম। তখন সে (স্ত্রী) বলল, 'আমাকে রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবীদের নিকট লজ্জিত করবেন না।' এরপর আমি রাসুলুল্লাহর কাছে গিয়ে চুপে চুপে বললাম, 'আল্লাহর রাসূল, আমরা আমাদের একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করেছি এবং আমাদের ঘরে এক সা যব ছিল, তা আমার স্ত্রী পিষে দিয়েছে। আপনি আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আসুন।' তখন নবী উচ্চঃস্বরে সবাইকে বললেন, “হে পরিখা খননকারীরা, জাবির খানার ব্যবস্থা করেছে। এসো, তোমরা সকলেই চল।” এরপর রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমার যাওয়ার আগে তোমাদের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও তৈরি করবে না। আমি (বাড়িতে) এলাম এবং রাসূলুল্লাহ সব সাহাবাদের নিয়ে এলেন। এরপর আমি আমার স্ত্রীর কাছে এলে সে বলল, 'আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।' আমি বললাম, 'তুমি যা বলেছ, আমি তা-ই করেছি।'
এরপর সে রাসূলুল্লাহর সামনে আটার খামির বের করে দিলে তিনি তাতে মুখের লালা মিশিয়ে দিলেন এবং বারাকাতের জন্য দুআ করলেন। এরপর তিনি ডেকচির কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তাতে মুখের লালা মিশিয়ে এর জন্য বারাকাতের দুআ করলেন। তারপর বললেন, “রুটি প্রস্তুতকারিণীকে ডাকো। সে আমার কাছে বসে রুটি প্রস্তুত করুক এবং ডেকচি থেকে পেয়ালা ভরে গোশত বেড়ে দিক। তবে (উনুন হতে) ডেকচি নামাবে না।”
তারা ছিলেন সংখ্যায় এক হাজার। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, তাঁরা সকলেই তৃপ্তি সহকারে খেয়ে বাকি খাদ্য রেখে চলে গেলেন। অথচ আমাদের ডেকচি আগের মতই টগবগ করছিল আর আমাদের আটার খামির থেকেও আগের মতোই রুটি তৈরি হচ্ছিল।” ৩০৫
মুহাজির এবং আনসাররা মূলত এ-ঘটনায় নবীজির অতিথি ছিলেন—যদিও খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল জাবিরের রাযি. ঘরে। কারণ খাবার পরিমাণে বেড়ে গিয়ে সবার জন্য যথেষ্ট হওয়া-এ-ঘটনা নবীজির মুজিযা ছিল; কারণ জাবির রাযি. এর খাদ্য গুটি কয়েকজনের জন্য যথেষ্ট ছিল। যেভাবে নবীজি সবাইকে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করলেন, তা মেহমানদারিতার উদার দৃষ্টান্ত।

টিকাঃ
৩০৪. এক সা' হল ৩ কেজি ১৮৪.২৭২ গ্রাম সমপরিমাণ।
৩০৫. বুখারী (৪১০১) ও মুসলিম (২০৩৯)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 মেহমান হিসেবে যেমন ছিলেন নবীজি ﷺ

📄 মেহমান হিসেবে যেমন ছিলেন নবীজি ﷺ


নবীজি ﷺ অতিথি হিসেবে যথেষ্ট বিনয়ী ছিলেন। অনেক ছোট উপলক্ষ্যেও তাঁকে দাওয়াত করলে তিনি তা কবুল করতেন। তিনি বলতেন, “আমাকে হালাল পশুর পায়া বা কাঁধ যেটিই খেতে দাওয়াত দেয়া হোক, তবু তা আমি কবুল করব।” ৩০৬
ইবনে হাজর রাহ. বলেন, “নবীজি দুই অংশের কথাই বলেছেন। এখানে কাঁধের মাংস তাঁর পছন্দনীয় ছিল, আর পায়ের মাংস তাঁর কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।” ৩০৭
রাসূল ﷺ যে কারও দাওয়াত কবুল করতেন। এমনকি তিনি এক কিশোরের দাওয়াতও কবুল করেছিলেন। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, “এক দরজি বালক খাবার তৈরি করে আল্লাহর রাসূলকে দাওয়াত করল। সে আল্লাহর রাসূলের সামনে রুটি আর ঝোল দিল, যাতে লাউ ও গোশতের টুকরা ছিল। তারপর সে কাজে ফিরে গেল। আমি নবীকে দেখতে পেলাম, পেয়ালার কিনারা হতে তিনি লাউয়ের টুকরা খুঁজে নিয়ে খাচ্ছেন। সে-দিন হতে আমি সব সময় লাউ ভালোবাসি।” ৩০৮
এ-হাদীস থেকে শেখা যায় যে, উচ্চপদস্থ হলেও সমাজের কোনো নিচু শ্রেণির কেউ দাওয়াত দিলে তা কবুল করা উচিত। রাসূল ﷺ যে-কারও দাওয়াত কবুল করতেন। এর আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় এক ইহুদীর ঘটনায়। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, “এক ইহুদি নবীজিকে দাওয়াত দিয়ে পাউরুটি আর তেল বা চর্বি খেতে দিল যার গন্ধ বদলে গিয়েছিল। তিনি তার দাওয়াত কবুল করেছিলেন।” ৩০৯
রাসূলের সাথে হঠাৎ কেউ দাওয়াতে চলে এলে তার জন্য মেজবানের কাছে দাওয়াতের আবেদন জানাতেন। আবু মাসউদ আল-আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত, আবু শুয়াইব রাযি. নামক এক আনসারীর একজন গোশত-বিক্রেতা গোলাম ছিল। একদিন আবু শুয়াইব রাযি. তাকে বললেন, 'আমার জন্য পাঁচজন লোকের খাবার তৈরি করো। আমি আশা করছি, নবীজিকে দাওয়াত করব। সেই পাঁচজনের মধ্যে তিনি নিজে ছিলেন একজন। তিনি নবীজির চেহারায় ক্ষুধার ছাপ লক্ষ করেছিলেন। কাজেই তিনি তাঁকে দাওয়াত করলেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে আরেকজন লোক এলেন, যাকে দাওয়াত করা হয়নি। তখন নবী (আনসারীকে) বললেন, "সে আমাদের পিছে পিছে চলে এসেছে। তুমি কি তাকে অনুমতি দেবে? নাহলে সে চলে যাবে।” তিনি বললেন, 'আমি বরং অনুমতি দিচ্ছি, আল্লাহর রাসূল!' ৩১০

টিকাঃ
৩০৬. বুখারী (২৫৬৮)।
৩০৭. ফাতহুল বারী (১৯৯/৫)।
৩০৮. বুখারী (২০৯২) ও মুসলিম (২০৪১)।
৩০৯. আহমদ (১৩৭৮৯)।
৩১০. বুখারী (২৪৫৬) ও মুসলিম (২০৩৬)।

📘 নবীজির সংসার > 📄 মাঝে মাঝে নিজেই কিছু সাহাবীর বাসায় মেহমান হিসেবে যেতেন

📄 মাঝে মাঝে নিজেই কিছু সাহাবীর বাসায় মেহমান হিসেবে যেতেন


আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, “এক দিন রাসূল ﷺ আবু বাকর ও উমারকে রাযি. দেখতে পেলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “এ-সময় কীসে তোমাদের ঘর থেকে বের করে এনেছে?” তারা বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, ক্ষুধার যন্ত্রণা।' তিনি বললেন, “যে-মহান আল্লাহর হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম, যা তোমাদের বের করে এনেছে, আমাকেও তা-ই বের করে এনেছে, চলো।” তারা উভয়ে তার সাথে চলতে লাগলেন। তারপর তিনি এক আনসারীর ৩১১ গৃহে এলেন, তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তার সহধর্মিণী তাঁকে দেখে বললেন, 'স্বাগতম!' রাসূল ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “অমুক কোথায়?” স্ত্রীলোকটি বলল, 'তিনি আমাদের জন্য খাবার পানি আনতে গিয়েছেন।'
তখন আনসারী ব্যক্তিটি এসে রাসূল ﷺ ও তাঁর দুই সাথিকে দেখতে পেয়ে বললেন, 'আল্লাহর প্রশংসা, আজ মেহমানের দিক হতে আমার থেকে সৌভাগ্যবান আর কেউ নেই।' তারপর তিনি গিয়ে একটি খেজুরের ছড়া নিয়ে আসলেন। তাতে কাঁচা, পাকা ও শুকনা খেজুর ছিল। তিনি বললেন, 'আপনার এ ছড়া থেকে খান।’
এরপর তিনি ছুরি নিলেন (ছাগল যবেহ করার জন্য)। তখন রাসূল ﷺ তাকে বললেন, "সাবধান, দুধওয়ালা বকরী যবেহ কোরো না।" তারপর তাদের জন্য (বকরী) যবেহ করলে তারা বকরীর গোশত ও কাঁদির খেজুর খেলেন এবং (মিঠা) পানি পান করলেন। তারা সকলে ক্ষুধা মিটালেন ও পরিতৃপ্ত হলেন। রাসূলুল্লাহ তখন আবু বাকর ও উমারকে রাযি. বললেন, “যে-সত্তার হাতে আমার জীবন, তার কসম, কিয়ামাতের দিন এ নিয়ামাত সম্বন্ধে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে। ক্ষুধা তোমাদের বাড়ি হতে বের করে এনেছে, অথচ তোমরা এ নিয়ামাত লাভ না করে ফিরে যাওনি।” ৩১২
লাকিত ইবনে সাবরাহ রাযি. বলেন, “রাসূলুল্লাহর কাছে আগত বনু মুনতাফিক গোত্রের প্রতিনিধি দলটির নেতা ছিলাম আমি (অথবা বলেন, আমি তাঁদের মধ্যেই ছিলাম)। আমরা যখন রাসূলুল্লাহর কাছে পৌঁছলাম, তখন তাঁকে তাঁর ঘরে পেলাম না, অবশ্য উম্মুল মুমিনীন আয়িশাকে রাযি. পেলাম। তিনি আমাদের জন্য 'খাযিরা' (একপ্রকার খাদ্য) তৈরির আদেশ দিলেন। আমাদের জন্য তা তৈরি করা হলো এবং আমাদের সামনে কিনা (অর্থাৎ খেজুরভর্তি একটি পাত্র) পেশ করা হলো। কিছুক্ষণ পর রাসূলুল্লাহ ﷺ এসে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনারা কি কিছু খেয়েছেন?” অথবা তিনি বললেন, "আপনাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে?” আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল!' আমরা রাসূলুল্লাহর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় এক রাখাল বকরীর পাল খোঁয়াড়ে নিয়ে এলেন। সাথে একটি বকরীর বাচ্চা ছিল, সেটি চিৎকার করছিল।
রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “ওহে অমুক, কী বাচ্চা জন্ম দিয়েছে?” সে বলল, 'মাদি।' তিনি বললেন, “সেটির পরিবর্তে আমাদের জন্য একটি বকরী যবেহ করো।” তারপর (প্রতিনিধি দলের নেতাকে উদ্দেশ্য করে) বললেন, “এমনটি মনে করবেন না যে, বকরীটি আপনাদের জন্যই যবেহ করছি; বরং আমাদের কাছে একশটি বকরী আছে। তাই আমরা এর সংখ্যা আর বাড়াতে চাই না। সেজন্যই কোনো বাচ্চা জন্ম হলে আমরা সেটির পরিবর্তে আরেকটি বকরী যবেহ করি।” ৩১৩
আয়নী রাহ. বলেন, “এ-হাদীসের শিক্ষা হলো, বাসায় অতিথি এলে বাসার মানুষের উচিত পরিবারের কর্তার অপেক্ষা না করে তাদের কিছু খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা। এ থেকে এটাও শিক্ষা পাওয়া যায়, মেজবানের উচিত তাদের সর্বোৎৃষ্টটা দিয়ে মেহমানদারি করা।” ৩১৪

টিকাঃ
৩১১. তিরমিযীর বর্ণনামতে (২৩৬৯) তার নাম আবু হাইসাম ইবনে আত-তায়্যিহান।
৩১২. মুসলিম (২০৩৮)।
৩১৩. আবু দাউদ (১৪২)।
৩১৪. আবু দাউদ গ্রন্থের (৩৩৫/১) ব্যাখ্যায় আয়নী (রাহ.)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00